📄 গর্ভপাত ঘটানো
ইসলাম গর্ভনিরোধক প্রতিক্রিয়া অবলম্বন করা জায়েয করেছে ঠিক সেই অবস্থায়, যখন তার প্রয়োজন তীব্র হয়ে দেখা দেয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও গর্ভের সঞ্চার হয়ে গেলে তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা কোন অবস্থাতেই জায়েয নয়।
ফিকাহবিদগণ এ বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেন যে, ভ্রুণে প্রাণের সঞ্চার হয়ে যাওয়ার পর গর্ভপাত করান সম্পূর্ণ হারাম ও অপরাধ। একাজ কোন মুসলমানের জন্যেই জায়েয হতে পারে না। কেননা তা একটা জীবন্ত ও পূর্ণাঙ্গ সত্তার ওপর অমানুষিক জুলুম। এ কারণে ফিকাহবিদগণ বলেছেন, গর্ভপাত করান কালে যদি ভ্রুণ জীবন্ত প্রসূত হয়ে মরে যায় তাহলে 'দিয়ত' — রক্তমূল্য— দিতে হবে। আর ভ্রূণ মৃত হলে জরিমানা দিতে হবে, যার পরিমাণ দিয়ত-এর অপেক্ষা কম হবে। কিন্তু তাঁরা বলেন, ভ্রুণকে বাঁচাতে গেলে মা'র জীবন নিঃশেষ হয়ে যাবে এবং গর্ভপাত করান ছাড়া প্রাণ বাঁচানর আর কোন উপায় নেই— তা যদি নির্ভরযোগ্য উপায়ে জানা যায়, তাহলে তখন গর্ভপাত করান জরুরী হয়ে পড়ে। শরীয়তের সাধারণ নিয়ম হচ্ছে, দুটো ক্ষতিকর ব্যাপারের মধ্য থেকে অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিকর পন্থা গ্রহণ করতে হবে। এ নিয়মের দৃষ্টিতে প্রসূতির প্রাণ বাঁচানর জন্যে মা'র জীবনকে বিপদে নিক্ষেপ করা যায় না। যেহেতু মা'র জীবনই হলো আসল। তার অধিকারই অগ্রগণ্য। অতএব ভ্রুণের জীবন রক্ষার জন্যে মার জীবন কুরবান করা কিছুতেই বাঞ্ছনীয় হতে পারে না।
ইমাম গাজ্জালী বলেছেন: গর্ভ নিরোধ ও গর্ভপাত— এ দুটোর মধ্যে পার্থক্য করতে হবে। গর্ভ নিরোধ সন্তান হত্যার সমান কাজ নয়। কেননা সন্তান হত্যা বলা যাবে তখন যখন গর্ভে সন্তানের অস্তিত্ব লাভ করবে। গর্ভে সন্তানের অস্তিত্ব লাভের কয়েকটি পর্যায় রয়েছে। প্রথম পর্যায় হচ্ছে, জরায়ুতে শুক্রকীটের স্থিতি লাভ এবং তাতে প্রাণ বা জীবন গ্রহণের যোগ্যতা হওয়া। এরূপ অবস্থায় তা বিনষ্ট করা গুনাহের কাজ। আর তাতে রূহ ফুঁকা হয়ে গেলে এবং সুস্থ পূর্ণাঙ্গ সম্পন্ন হয়ে উঠলে তখন তা বিনষ্ট করা অধিক মাত্রার গুণাহের কারণ। আর চূড়ান্ত মাত্রার গুনাহ হচ্ছে, শিশুর জন্মের পর তাকে হত্যা করা।
(কিন্তু ইমাম গাজ্জালী একথা কি করে ভুলে গেলেন যে, শুক্রকীট বিনষ্ট করণও নিশ্চয়ই গুণাহ্ এবং তা জায়েয করা হলে দুনিয়ায় মানুষ সৃষ্টির আল্লাহর ইচ্ছাকেই সম্পূর্ণ ব্যর্থ করে দেয়া যেতে পারে, আর তা কখনই জায়েয হতে পারে না। বর্তমানে সেই পন্থাই উদ্ভাবিত ও ব্যাপকভাবে অবলম্বিত হচ্ছে। মূলত পুরুষ দেহ থেকে নির্গত শুক্রকীটই হছে পুরুষের সন্তান, যা হত্যা করতে কুরআন মজীদে বার বার নিষেধ করা হয়েছে। আর তা খাদ্যাভাবের আশংকায় হলে তো এ হারাম অত্যন্ত তীব্র হয়ে যাবে।) - অনুবাদক
📄 স্বামী-স্ত্রীর সামাজিক অধিকার
বিবাহ একটা সুসংবদ্ধ বন্ধন, একটা সুদৃঢ় প্রতিশ্রুতি। পুরুষ ও নারীর মাঝে সুদৃঢ় বন্ধন গড়ে তোলার জন্যেই আল্লাহ্ তা'আলা এ ব্যবস্থা কার্যকর করেছেন। বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর উভয়ই উভয়ের জুড়ি। ব্যক্তিত্বের দিক দিয়ে স্বতন্ত্র হলেও বাস্তবতার দৃষ্টিতে তারা একে অপরের জুড়ি। একজন অপরজনের প্রতিভু। প্রত্যেকেরই নিজস্ব কামনা-বাসনা ও আশা-আকাঙ্ক্ষা পরস্পর সম্পৃক্ত, সংযোজিত।
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার এ সম্পর্কের চূড়ান্ত দৃঢ়তা ও অবিচ্ছিন্নতার কথা বোঝাবার উদ্দেশ্যেই কুরআন মজীদে বলা হয়েছে:
هٰنَّ لِبَاسٌ لَّكُمْ وَاَنْتُمْ لِبَاسٌ لَّهُنَّ -
স্ত্রীরা তোমাদের পোশাক, তোমরা তাদের জন্যে পোশাক। (البقرة 187)
এ আয়াতের আসল বক্তব্য হচ্ছে, স্বামী-স্ত্রীকে পরস্পর সুসংবদ্ধ, পরস্পরের গোপনীয়তা আচ্ছাদনকারী, পরস্পরের সমর্থক-সাহায্যকারী এবং একজন অপরজনের জন্যে সৌন্দর্য বিধায়ক হতে হবে। অন্য কথায় প্রত্যেকেরই অপরজনের ওপর অধিকার রয়েছে। সে অধিকার পুরামাত্রায় অবশ্যই আদায় করতে হবে। এ অধিকার সম্পূর্ণ সমান, পুরুষদের প্রকৃতি অনুযায়ী তাদের দেয়া বিশেষ বিশেষ অধিকার ছাড়া আল্লাহ্ কথা থেকেই তা স্পষ্ট। তিনি বলেন:
وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوْفِ م وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ -
স্ত্রীদের জন্যে রয়েছে সেসব যা আছে তাদের ওপর সুস্পষ্ট ও প্রচলিত বা সাধারণ নিয়মে। তবে পুরুষদের জন্যে তাদের ওপর একটা অগ্রাধিকার রয়েছে।
সে অগ্রাধিকারের পর্যায় হচ্ছে পরিচালক নিয়ন্ত্রক দায়িত্বশীল ও জবাবদিহি করতে বাধ্য হওয়ার। নবী করীম (স)-কে এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন: আমাদের ওপর আমাদের স্ত্রীদের কি অধিকার রয়েছে? জবাবে তিনি বললেন:
اَنْ تُطْعِمَهَا اِذَا طَعِمْتَ وَتَكْسُوهَا اِذَا اكْتَسَيْتَ وَلَا تَضْرِبُ الْوَجْهَ وَلَا تُقَبِّحْ وَلَا تَهْجُرُ اِلَّا فِي الْبَيْتِ -
তা হচ্ছে, তাদের নিজেদের সঙ্গে খাওয়াবে, নিজেদের মতোই পরাবে। আর মুখমণ্ডলের ওপর মারবে না, তাকে খারাপ-অশ্লীল গালাগালি করবে না এবং তাকে তার ঘর ছাড়া অন্য কোথাও ছাড়বে না। (আবূ দাউদ, ইবনে হাব্বান)
কাজেই নিজ স্ত্রীর ভরণ-পোষণের ব্যাপারে ঔদাসিন্য বা উপেক্ষা দেখান কোন মুসলমানের পক্ষেই জায়েয নয়। হাদীসে বলা হয়েছে:
كَفَى بِالْمَرْءِ إِثْمًا أَنْ تُضِيْعَ مَنْ يَقُوْتُ -
একজন লোকের গুনাহগার হওয়ার জন্যে এতটুকুই যথেষ্ট যে, যাদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব তার ওপর অর্পিত, তাদের প্রতি সে ব্যাপারে চরম উপেক্ষা দেখাবে। (আবূ দাউদ, নিসায়ী, হাফেম)
স্ত্রীর মুখের ওপর মারার কোন অনুমতি ইসলাম দেয়নি। কেননা এ কাজ মানবীয় সম্মান ও মর্যাদা পরিপন্থী। তাতে দেহের সর্বাধিক সম্মানার্হ ও মর্যাদাসম্পন্ন অঙ্গ- দেহের সমস্ত সৌন্দর্য যেখানে কেন্দ্রীভূত- আহত ও ক্ষুণ্ণ হয়। নাফরমান ও স্বেচ্ছাচারী স্ত্রীকে প্রয়োজন মতো সুশিক্ষাদান ও গড়ে তোলার প্রশ্নে কখনও স্ত্রীকে হালকাভাবে মারাও যেতে পারে। কিন্তু তাকে কষ্ট দেয়া ও মুখমণ্ডলকে ক্ষতবিক্ষত করার মতো মারা কিছুতেই জায়েয হতে পারে না। স্ত্রীকে গালাগালি করাও জায়েয নয়। তার মনে কষ্ট দেয়া, তার জন্যে অসহনীয় কথাবার্তা বলা এমন কি তার জন্যে বদ দো'আ করা প্রভৃতিও সম্পূর্ণ নাজায়েয।
স্ত্রীর ওপর স্বামীর অধিকার পর্যায়ে নিম্নোদ্ধৃত হাদীসটি উল্লেখ্য। নবী করীম (স) বলেছেন:
لا يَحِلُّ لِامْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِالله أَنْ تَأْذَنَ فِي بَيْتِ زَوْجِهَا وَهُوَ كَارِهُ وَلَا تَخْرُجُ وَهُوَ كَارِهُ وَلَا تُطِيعُ فِيهِ أَحداً وَلَا تَعْتَزِلُ فِرَا شَهُ وَلَا تَضْرِبُهُ فَإِنْ كَانَ هُوَ أَظْلَمَ فَلْتَاتِهِ حَتَّى تُرْضِيهِ - فَإِنْ قَبلَ مِنْهَا وَقَبِهَا وَتَعْمَتْ وَقَبِلَ اللَّهُ عُذْرَ هَا وَافْلَحَ حُجْتَهَا وَإِنْ هُوَ لَمْيَرَضِ فَقَدْ أَبْلَغَتْ عِنْدَ اللَّهِ عُدْرَهَا
যে স্ত্রীলোক আল্লাহ্ প্রতি ঈমানদার, তার পক্ষে তার স্বামীর ঘরে এমন ব্যক্তিকে আসবার অনুমতি দেয়া বৈধ নয়, যাকে তার স্বামী পছন্দ করে না। স্বামীর অনুমতি ব্যতীত ঘরের বাইরে যাওয়াও তার জন্যে জায়েয নয়। এ ব্যাপারে অপর কারো কথা মান্য করাও তার উচিত নয়, স্বামীর শয্যা থেকে দূরে থাকাও নয় বাঞ্ছনীয়। স্বামী যদি অত্যাচারী হয়, তা হলে তাকে সন্তুষ্ট রাখার জন্যে সাধ্যমত চেষ্টা চালাবে। তার এই খিদমত স্বামী গ্রহণ করলে তো ভালই। আল্লাহ্ তার ওযর কবুল করে নেবেন এবং তার সত্যপন্থী হওয়াটাও প্রকাশ করে দেবেন। আর স্বামী যদি রাজি না হয়, তাহলে আল্লাহ্র কাছে তার অক্ষমতার ওযর পৌঁছে যাবে। (الحاكم)
📄 স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক ধৈর্য ধারণ
মুসলিম স্বামী মাত্রেরই কর্তব্য তার স্ত্রীর ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ করা। বিশেষ করে তার মধ্যে যদি এমন কিছু লক্ষ্য করে যা তার পছন্দ নয়। মানুষের মধ্যে মানুষ হওয়ার কারণে যে সব দোষত্রুটি স্বাভাবিক ভাবেই থাকে আর স্ত্রীলোকদের মধ্যে নারীত্বজনিত যে সব দুর্বলতা লক্ষ্য করা যায়, তা সহ্য করে নিতে অভ্যস্ত হওয়া স্বামীর একান্তই কর্তব্য। অনুরূপভাবে স্ত্রীর দোষগুলোর তুলনায় তার গুণগুলো এবং ত্রুটি-বিচ্যুতি অপেক্ষা ভাল ভাল দিকগুলোর প্রতিই নজর প্রকট করে রাখা বাঞ্ছনীয়। হাদীসে বলা হয়েছে:
لَا يَفْرُكُ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةً إِنْ سَخطا مِنْهَا خُلُقًا رَضِي مِنْهَا غَيْرَهُ -
কোন ঈমানদার পুরুষ যেন কোন ঈমানদার নারীকে ঘৃণা না করে। কেননা তার মধ্যে একটি ব্যাপার যদি অপছন্দনীয় থাকে তাহলে অপরাপর গুণাবলী নিশ্চয়ই পছন্দনীয় পাওয়া যাবে। (মুসলিম)
আর আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন:
وعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ ، فَإِنْ كَرِهْتُمُوْ هُنَّ فَعَسَى أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًاو يَجْعَلَ اللَّهُ فِيْهِ خَيْرًا كَثِيرًا -
তোমরা স্ত্রীদের সাথে ভালভাবে বসবাস ও জীবন যাপন কর (ভাল আচরণ গ্রহণ কর)। তোমরা যদি তাদের অপছন্দ কর, তাহলে অসম্ভব নয় যে আল্লাহ্ তাদের মধ্যে অনেক কিছুই ভাল ও কল্যাণ জমা করে রেখেছেন। (النساء 19)
ইসলাম যেভাবে স্বামীকে স্ত্রীদের অপছন্দনীয় ব্যাপারাদিতে ধৈর্য ধারণ করতে ও পরম সহিষ্ণুতা দেখাতে বলেছে, অনুরূপভাবে স্ত্রীদেরও নির্দেশ দিয়েছে নিজ নিজ স্বামীকে যথাসাধ্য সন্তুষ্ট রাখার জন্যে চেষ্টা চালিয়ে যেতে এবং স্বামীকে অসন্তুষ্ট রেখে রাত যাপন না করতে। হাদীসে বলা হয়েছেঃ
ثَلَاثَةٌ لَا تَرْتَفِعُ صَلَاتُهُمْ فَوْقَ رُءُوسِهِمْ شِبْرًا - رَجُلٌ أَمْ قَوْمًا وَهُمْ لَهُ كَارِهُونَ وَامْرَأَةٌ بَاتَتْ وَزَوْجُهَا عَلَيْهَا سَاخِطٌ وَأَخَوَانِ مُتَصَرِمَانِ -
তিন ব্যক্তির নামায তাদের মাথার এক বিগত উপরেও যায় না। এক ব্যক্তি সে, যে লোকদের ইমামতি করে অথচ সেই লোকেরা তাকে পছন্দ করে না। দ্বিতীয় সেই স্ত্রীলোক, যে স্বামীকে অসন্তুষ্ট অবস্থায় রেখে রাত যাপন করে। আর তৃতীয় এমন দুই ভাই যারা পরস্পরের সাথে লড়াই-ঝগড়ায় লিপ্ত। (ইবনে মাযাহ, ইবনে হাব্বান)
📄 স্বামী-স্ত্রীর বিরোধ দেখা দিলে
পুরুষ ঘর ও পরিবারের কর্তা, পরিচালক ও নিয়ন্ত্রক। তাকে এ উদ্দেশ্যেই সৃষ্টি করা হয়েছে এবং তার মধ্যেই এর যোগ্যতা পাওয়া যায় বিধায় জীবন সংগ্রাম ক্ষেত্রে তার মর্যাদাও এরূপই বলে এবং মোহরানা ও খরচাদি বহনের দায়িত্ব তারই বলে এ মর্যাদায় তাকে অধিষ্ঠিত করা হয়েছে। অতএব তার আনুগত্য না করা ও আনুগত্য-বহির্ভূত কাজ করা, তার অবাধ্য হওয়া এবং তাকে ডিঙিয়ে যাওয়ার কোন অধিকার স্ত্রীর থাকতে পারে না। এরূপ যদি করা হয়ই তাহলে পারস্পরিক সম্পর্ক খুব খারাপ হয়ে যাওয়া অবধারিত। সংসার তরণী হাবুডুবু খাবে এবং কোন প্রকৃত মাঝির অনুপস্থিতির কারণে তা সম্পূর্ণরূপে নিমজ্জিত হয়ে যাওয়াও অসম্ভব নয়।
স্বামী যখন লক্ষ্য করবে যে, স্ত্রীর পক্ষ থেকে তাকে অমান্য করা হচ্ছে, স্ত্রী তার বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে চলছে, তখন ভাল ভাল উপদেশ, যুক্তিপূর্ণ প্রাণস্পর্শী কথাবার্তা দ্বারা তাকে সংশোধন করার সাধ্যমত চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালাতে হবে। কিন্তু উপদেশ কার্যকর না হলে তাকে তার শয্যায় পরিহার ও বর্জন করতে হবে, যেন তার মধ্যে নারীসুলভ ভাবধারা জাগ্রত হয় এবং শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করে ও বাধ্য-অনুগত হয়ে যায়।
এ ব্যবস্থাপনা কার্যকর না হলে তার ওপর হাত তোলা যেতে পারে। কিন্তু তাই বলে চরম মাত্রার মারধোর, নিপীড়ন ও মুখের ওপর আঘাত করা কিছুতেই চলবে না, তা সম্পূর্ণ পরিহার করতে হবেই। কোন কোন স্ত্রীলোকের জন্যে হালকা ধরনের মারধোর অনেকটা কল্যাণকর ও সঞ্জীবক হয়ে দেখা দেয়। মারধোর অর্থ চাবুক বা ডান্ডা বা লাঠি দ্বারা মারা নয়। নবী করীম (স)-এর একটি উক্তি থেকে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট আলো পাওয়া যায়। তাঁর কোন খাদেম কোন ব্যাপারে তাঁকে রাগিয়েছিল কোন বিশেষ কাজের জন্যে। তখন তিনি বলেছিলেন:
لَوْ لَا الْقِصَاصُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ لَاوْجَعْتُكَ بِهذا السواك -
কিয়ামতের দিন বদলা নেয়ার ব্যবস্থা না থাকলে আমি তোমাকে এ মিসওয়াক দ্বারাই আঘাত দিতাম। (তাবকাতে ইবনে সা'আদ)
মারধোর করাটা রাসূলে করীম (স) আদৌ পছন্দ করেন নি। তিনি বলেছেন:
عَلَامَ يَضْرِبُ أَحَدُكُمْ امْرَأَتَهُ ضَرْبَ العَبْدِ وَلَعَلَّهُ أَنْ يُجَامِعَهَا فِي آخِرِ الْيَوْمِ -
তোমাদের এক একজন নিজ স্ত্রীকে এমনভাবে মারধোর করে কেন, যেমন মনিব তার দাসকে মারছে? আর তারপরই সম্ভবত রাত্রিকালেই সে তার সাথে সঙ্গম করবে। (মুসনাদে আহমদ)
যারা স্ত্রীলোকদের মারধোর করে তাদের সম্পর্কে নবী করীম (স) বলেছেন:
لَا تَجِدُونَ أُولَئِكَ خِيَارَ كُمْ -
এ ধরনের লোক তোমাদের মধ্যে কখনও ভাল লোক বলে গণ্য হতে পারে না। (আহমদ, আবুদাউদ, নাসাঈ)
হাফেয ইবনুল হাজার লিখেছেন:
তোমাদের মধ্যে যারা ভাল লোক তারা কখনও নিজেদের স্ত্রীদের মারধোর করবে না—রাসূল করীম (স)-এর এ কথা থেকে বোঝা যায় যে, স্ত্রীদের মারা মোটামুটি জায়েয বটে। তবে তার সঠিক সময় হচ্ছে তখন, যখন স্বামী তার স্ত্রীর মধ্যে যে ব্যাপারে তার আনুগত্য করা কর্তব্য সেই ব্যাপারেই আবাধ্যতা দেখতে পায়। এরূপ অবস্থায় সে তাকে বাধ্য ও আনুগত্য চাপানর উদ্দেশ্যে মারতে পারে। তবে যদি ধমক-ভীতি প্রদর্শন ইত্যাদির দ্বারা কাজ চলে যায়, তাহলে মারপিট অবশ্যই পরিহার করতে হবে। কেননা তাতে স্ত্রীর মনে স্বামীর প্রতি ঘৃণা তীব্র হয়ে উঠে। আর তা সম্প্রীতিপূর্ণ দাম্পত্য জীবনের পরিপন্থী। অথচ বিবাহিত জীবনের তা-ই হচ্ছে আসল লক্ষ্য কিন্তু আল্লাহ্ নাফরমানী সংক্রান্ত কোন ব্যাপারে যদি তাকে মারতে হয় তবে তা স্বতন্ত্র কথা।
নাসায়ী গ্রন্থে হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেছেন:
مَا ضَرَبَ رَسُولُ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ امْرَأَةً لَهُ وَلَا خَدمًا قَطُّ وَلَا ضَرَبَ بِيَدِهِ شَيْئًا قَطَ اِلا فِي سَبِيلِ اللهِ أَوْ تَنْتَهِكُ حُرِّمَاتُ اللهِ فَيَنْتَقِمُ اللَّهِ -
রাসূলে করীম (স) তাঁর কোন বেগমকে কিংবা কোন খাদেমকে কখনই মারেন নি। অপর কাউকেও তিনি কখনও মারবার জন্যে হাত তোলেন নি। তবে আল্লাহ্র পথে কিংবা আল্লাহর মর্যাদার অমর্যাদাকরণের দরুন আল্লাহরই ওয়াস্তে কাউকে শাস্তি দিয়ে থাকলে সে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ব্যাপার। (ফাতহুলবারী ৯ খণ্ড, পৃ. ২৪৯)
কিন্তু এসব পদক্ষেপও যদি ব্যর্থ হয় ও আ-ফলপ্রসু হয়ে যায় এবং পারস্পরিক বিরোধ বৈষম্য বিস্তীর্ণ ও গভীরতর হয়ে পড়ার আশংকা দেখা দেয়, তাহলে তখনই ইসলামী সমাজের প্রভাবশালী কর্তৃত্বসম্পন্ন ও কল্যাণকামী লোকেরা তাতে হস্তক্ষেপ করে সংশোধনের জন্যে চেষ্টা চালাবে। তার পন্থা হচ্ছে, স্বামীর পক্ষ থেকে একজন ও স্ত্রীর পক্ষ থেকে একজন সালিশকারী নিয়োগ করতে হবে, যারা বাস্তবিকই উভয়ের কল্যাণকামী হবে। তারা স্বামী-স্ত্রীকে মিলিত করতে ও যে বিরোধ দেখা দিয়েছে তা দূর করতে চেষ্টা করবে, তা হলে আল্লাহ্ নিশ্চয়ই তাদের মধ্যে মিলমিশ সৃষ্টি করে দেবেন। এসব ব্যাপারে মহান আল্লাহ্ ঘোষণা হচ্ছেঃ
وَالَّتِي تَخَافُونَ نُشُوزَ هُنَّ فَعِظُوهُنَّ وَاهْجُرُو هُنَّ فِي الْمَضَاجِعِ وَاضْرِبُوهُنَّ جِ فَإِنْ أَطَعْنَكُمْ فَلَا تَبْغُوا عَلَيْهِنَّ سَبِيلًا - إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيًّا كَبِيرًا - وَإِنْ خفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُو احَكَمًا مِّنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِّنْ أَهْلِهَا ، إِنْ يُرِيدَا أَصْلَحَ يُوَفِّقِ اللَّهُ بَيْنَهُمَا ، إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا خَبِيرًا -
যে সব স্ত্রী সম্পর্কে তোমরা বিদ্রোহ ও অবাধ্যতার আশংকা বোধ করবে, তাদের বোঝও - উপদেশ দাও। তোমাদের শয্যায় তাদের ত্যাগ কর এবং তাদের মার। পরে যদি তারা তোমাদের আনুগত্য করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে তোমরা দোষ তালাস করে বেড়িও না। নিশ্চিত জানবে, আল্লাহ্ উচ্চতর ও বড়ই মহান। আর তোমাদের পরস্পরের বিচ্ছেদের আশংকা দেখা দিলে স্বামীর আত্মীয়ের মধ্য থেকে একজন ও স্ত্রীর আত্মীয়দের মধ্য থেকে একজন সালিশ নিযুক্ত কর। এরা দুজন যদি বাস্তবিকই সংশোধনের চেষ্টা প্রচেষ্টা চালায়, তাহলে আল্লাহ্ তাদের মধ্যে সামঞ্জস্য সৃষ্টি করে দেবেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ ও সর্ববিষয়ে অবহিত। (النساء 34-35)