📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 কোন্ অবস্থায় পরিবার পরিকল্পনা জায়েয

📄 কোন্ অবস্থায় পরিবার পরিকল্পনা জায়েয


মাত্র কয়েকটি বিশেষ প্রয়োজনে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণ জায়েয হতে পারে। একটি প্রয়োজন হচ্ছে, মা'র জীবন বা স্বাস্থ্যের ওপর যদি রোগ বা প্রসবকালীন সংকটের দরুন হুমকি দেখা দেয়, তাহলে এ পদ্ধতি গ্রহণ করা যেতে পারে। এ সংকট বা হুমকির কথা অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে জানা যাবে, কিংবা কোন বিশ্বস্ত নির্ভরযোগ্য চিকিৎসাবিদ তা বলে দেবে। আল্লাহ্ নিজেই বলেছেন:
وَ لَا تُلْقُوا بِاَيْدِ يْكُمْ إِلَى التَّهْلُكَه -
তোমরা নিজেদের হাতেই নিজেদের ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না।
বলেছেন:
وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا -
তোমরা নিজেরাই নিজেদের হত্যা করো না। আল্লাহ্ নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতি অতীব দয়াবান।
দ্বিতীয় ভিত্তি হচ্ছে, বৈষয়িক অসুবিধা, সমস্যা ও অনিশ্চয়তা-অসহায়ত্বের মধ্যে পড়ে যাওয়ার আশংকা, যার দরুন দ্বীনী সমস্যা দেখা দিতে পারে বলে মনে করা হবে। যার ফলে মানুষ সন্তানাদির কারণে হারাম জিনিস গ্রহণ ও অবৈধ কাজে লিপ্ত হওয়ার পরিণতি দেখা দেবে। আল্লাহ্ বলেছেন:
يُرِيدُ اللهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ -
আল্লাহ্ তোমাদের প্রতি সহজতার বিধান করতে চান, তোমাদের কোন অসুবিধায় ফেলতে চান না। (সূরা বাকারা : ১৮৫)
مَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيَجْعَلَ عَلَيْكُمْ مِّنْ حَرَجٍ -
আল্লাহ্ তোমাদের ওপর সংকীর্ণ বা অসুবিধা চাপিয়ে দিতে চান না। (المائدة ٦)
তৃতীয় হচ্ছে, সন্তানদের স্বাস্থ্য নষ্ট হওয়ার কিংবা তাদের সঠিক লালন-প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে ব্যর্থ হওয়ার আশংকা। এ পর্যায়ে উল্লেখ্য হাদীস:
عَنْ أَسَامَةَ بْنِ زَيْدٍ أَنَّ رَجُلًا جَاءَ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللهِ إِنِّي أَعْزِلُ عَنِ امْرَأَتِي فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِمَ تَفْعَلُ ذَلِكَ - فَقَالَ الرَّجُلُ أَشْفِقُ عَلَى ولدهَا أَوْقَالَ عَلَى أَوْلَادِهَا فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لوكَانَ ضَارَّ الضَّرِّ فَارِسِ وَالرُّوْمَ -
হযরত উসামা ইবনে যায়দ থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসূলে করীমের কাছে উপস্থিত হয়ে বলল : ইয়া রাসূলুল্লাহ। আমি আমার স্ত্রীর সাথে আযল করে থাকি। তিনি জিজ্ঞেস করলেন : তুমি তা কেন কর? বলল: আমি তার স্তনের ব্যাপারে আশংকা বোধ করি। তখন নবী করীম (স) বললেন: ক্ষতি হওয়ার ভয় যদি যথার্থই হতো, তাহলে পারস্যবাসী ও রোমবাসীদেরও ক্ষতি সাধিত হতো। (مسلم)
এ কথার অর্থ এই দাঁড়ায় যে, নবী করীম (স)-এর মতে ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত পর্যায়ে এ কাজ করা হলে সামষ্টিকভাবে গোটা উম্মতের জন্যে কোনরূপ ক্ষতিকর ছিল না। আর তা যে ক্ষতিকর নয়, তার বড় প্রমাণ এই যে, পারস্য ও রোমান জাতি এ সময় বড় শক্তিশালী সরকার ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার অধিকারী ছিল, তাদের তো এ কাজের দরুন কোন ক্ষতি হয়নি।
শরীয়তের দৃষ্টিতে আরও একটি প্রয়োজনের উল্লেখ করা যায়। তা হচ্ছে দুগ্ধপোষ্য শিশুর মা'র আবার গর্ভসঞ্চার হলে শিশুর পক্ষে ক্ষতিকর হতে পারে। কেননা তখন মা'র দুগ্ধ নষ্ট হয়ে যেতে পারে, যার ফলে শিশু দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
নবী করীম (স) উম্মতের জন্যে সামষ্টিকভাবে কল্যাণকর কার্যাদি করার হেদায়েত দিতেন। আর যে সব কাজের ফলে উম্মতের ক্ষতি সাধিত হওয়ার আশংকা, তা পরিহার করে চলতে বলতেন। নবী করীম (স)-এর এ কথাটি সেই পর্যায়ের:
لَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ سِرًّا فَإِنَّ الْغَيْلَ يَدْرِكُ الْفَرِسُ فِيهِ عَشْرَةُ -
তোমরা তোমাদের সন্তানদের গোপন পন্থায় ধ্বংস করবে না। কেননা দুগ্ধপায়ী শিশুর বর্তমানে স্ত্রী সঙ্গম করলে শিশুর ক্ষতি হতে পারে। (ابوداؤد)
কিন্তু নবী করীম (স) এ কাজকে হারাম ধরে নিয়ে নিষেধ করেন নি। কেননা তাঁর সময়ে অন্যান্য জাতির লোকেরা এই পন্থা গ্রহণ করেছিল। কিন্তু তাতে তাদের কোন ক্ষতি হচ্ছিল না। শিশুকে দুধ খাওয়ানো কালে তদ্দরুন স্ত্রী সঙ্গম যদি চূড়ান্তভাবে নিষিদ্ধ করে দেয়া হতো তাহলে তাদের স্বামীদের তাতে কষ্ট হতো। দুগ্ধ সেবনের মেয়াদকাল দুই বছর পর্যন্ত চলতে থাকে। এ সব ব্যাপারের দিকে লক্ষ্য রেখে নবী করীম (স) বলেছেন:
لقَدْ هَمَّمْتُ أَنْ أَنْهَى عَنِ الْغَيْلَةِ ثُمَّ رَأَيْتُ فَارِسَ وَالرُّوْمَ يَفْعَلُوْ نَهُ وَلَا يَضُرُّ أَوْلَادَ هُمْ شَيْئًا -
দুগ্ধপায়ী শিশুর মা'র সাথে সঙ্গম করতে আমি নিষেধ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পারস্য ও রোমকদের সম্পর্কে আমি জানতে পারলাম যে, তারা এ কাজ করে; কিন্তু তাতে তাদের সন্তানের কোন ক্ষতি হয় না। (মুসলিম)
আল্লামা ইবনুল কাইয়্যেম উপরিউদ্ধৃত হাদীসদ্বয়ের মাঝে সমন্বয় বিধানের জন্যে একটি বিশ্লেষণ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন:
নবী করীম (স)-এর সম্মুখে দুটি দিকই ছিল। একটি হচ্ছে দুগ্ধ পোষ্য শিশুর বর্তমানে তার মা'র সাথে সঙ্গম করলে শিশুর ক্ষতি হওয়ার আশংকা। যদিও সে ক্ষতিটা হত্যা বা ধ্বংস করার পর্যায়ের নয়, তা সত্ত্বেও ক্ষতির আশংকার দরুন তিনি তা নিষেধ করেছেন। কিন্তু তা হারাম ঘোষণা করা হয়নি, পরে তিনি 'নিমিত্ত বন্ধকরণ' হিসেবে তা থেকে বিরত রাখতে চেয়েছেন। কিন্তু তাঁর সম্মুখে অপর একটি দিকও উদ্‌ঘাটিত হয়। তা হচ্ছে দুগ্ধ সেবনের মেয়াদের মধ্যে সঙ্গম নিষিদ্ধ হলে যে অসুবিধা ও বিপরীত হতে পারে, এই নিমিত্ত নিষিদ্ধকরণ দ্বারা তার প্রতিরোধ করা সম্ভবপর হবে না। বিশেষ করে নব্য যুবক ও যৌন উত্তেজনাসম্পন্ন ব্যক্তিদের চরম বিপর্যয়ে পড়ে যাওয়ার প্রবল আশংকা। এ কারণে তিনি মত গ্রহণ করলেন যে, এই কল্যাণ রোধ নিমিত্তরোধের বিপর্যয়ের তুলনায় অনেক প্রবল ও অগ্রাধিকার পাওয়ার দাবিদার। সেকালের দুটি বড় বড় প্রতিষ্ঠিত জাতির কর্ম পদ্ধতিও তার সম্মুখে প্রতিভাত ছিল। তারা এ কাজ পরিহার করেনি, এ সব কারণে তিনি এ কাজকে নিষিদ্ধ করেন নি।
আধুনিক কালের গর্ভ বন্ধকরণের নব নব উপায় ও পন্থা উদ্ভাবিত হয়েছে। ১ তা প্রয়োগ ব্যবহার করে কল্যাণের দিকটার সংরক্ষণ সম্ভব আর রাসূলে করীম (স) তাই চেয়েছিলেন অর্থাৎ দুগ্ধপায়ী শিশুকে ক্ষতি থেকে বাঁচানো। আর দুগ্ধ সেবনকালে স্ত্রী সঙ্গম নিম্নিদ্দকরণে যে বিপর্যয় ঘটার আশংকা, তা থেকেও তিনি উম্মতকে রক্ষা করতে চেয়েছেন।
এ আলোচনার আলোকে ইবনে হাম্বলের মতে 'আযল' জায়েয। তবে শর্ত হচ্ছে তার স্ত্রীর অনুমতিক্রমে হতে পারে। কেননা সঙ্গম স্বাদ ও তৃপ্তিলাভ এবং সন্তান এ উভয় দিকেই তার অধিকার রয়েছে। হযরত উমর (রা) স্ত্রীর অনুমতি ব্যতিরেকে 'আযল' করতে নিষেধ করেছেন।
এ থেকে ইসলামের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ দৃষ্টিকোণ স্পষ্ট হয়ে উঠে। নবী করীম (স) নারীদের অধিকারের ওপর সে সময়ই এতটা গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন, যখন দুনিয়ার মানুষ নারীর অধিকার বলতে কোন বস্তুর সাথ সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল।

টিকাঃ
১. মনে রাখা আবশ্যক, গ্রন্থকার এখানে পরিবার পরিকল্পনা পর্যায়ে কথা বলেছেন, জন্ম বন্ধ বা বন্ধ্যাকরণ সম্পর্কে নয়। কাজেই আধুনিক প্রক্রিয়া সমৃদ্ধ পরিবার পরিকল্পনা বা বন্ধ্যাকরণ জায়েয বলা যাবে না। বন্ধ্যাকরণ মূলত: আল্লাহর সৃষ্টি পরিবর্তন করার অপরাধ। তা যে গুণাহের কাজ ও হারাম এবং তা আল্লাহ্র নিষিদ্ধ স্পষ্ট সন্তান হত্যার কাজ, তাতে কোনই সন্দেহ নেই। তবে কেউ চরম ঠেকায় পড়ে গেলে সেকথা স্বতন্ত্র। - অনুবাদক

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 গর্ভপাত ঘটানো

📄 গর্ভপাত ঘটানো


ইসলাম গর্ভনিরোধক প্রতিক্রিয়া অবলম্বন করা জায়েয করেছে ঠিক সেই অবস্থায়, যখন তার প্রয়োজন তীব্র হয়ে দেখা দেয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও গর্ভের সঞ্চার হয়ে গেলে তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা কোন অবস্থাতেই জায়েয নয়।
ফিকাহবিদগণ এ বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেন যে, ভ্রুণে প্রাণের সঞ্চার হয়ে যাওয়ার পর গর্ভপাত করান সম্পূর্ণ হারাম ও অপরাধ। একাজ কোন মুসলমানের জন্যেই জায়েয হতে পারে না। কেননা তা একটা জীবন্ত ও পূর্ণাঙ্গ সত্তার ওপর অমানুষিক জুলুম। এ কারণে ফিকাহবিদগণ বলেছেন, গর্ভপাত করান কালে যদি ভ্রুণ জীবন্ত প্রসূত হয়ে মরে যায় তাহলে 'দিয়ত' — রক্তমূল্য— দিতে হবে। আর ভ্রূণ মৃত হলে জরিমানা দিতে হবে, যার পরিমাণ দিয়ত-এর অপেক্ষা কম হবে। কিন্তু তাঁরা বলেন, ভ্রুণকে বাঁচাতে গেলে মা'র জীবন নিঃশেষ হয়ে যাবে এবং গর্ভপাত করান ছাড়া প্রাণ বাঁচানর আর কোন উপায় নেই— তা যদি নির্ভরযোগ্য উপায়ে জানা যায়, তাহলে তখন গর্ভপাত করান জরুরী হয়ে পড়ে। শরীয়তের সাধারণ নিয়ম হচ্ছে, দুটো ক্ষতিকর ব্যাপারের মধ্য থেকে অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিকর পন্থা গ্রহণ করতে হবে। এ নিয়মের দৃষ্টিতে প্রসূতির প্রাণ বাঁচানর জন্যে মা'র জীবনকে বিপদে নিক্ষেপ করা যায় না। যেহেতু মা'র জীবনই হলো আসল। তার অধিকারই অগ্রগণ্য। অতএব ভ্রুণের জীবন রক্ষার জন্যে মার জীবন কুরবান করা কিছুতেই বাঞ্ছনীয় হতে পারে না।
ইমাম গাজ্জালী বলেছেন: গর্ভ নিরোধ ও গর্ভপাত— এ দুটোর মধ্যে পার্থক্য করতে হবে। গর্ভ নিরোধ সন্তান হত্যার সমান কাজ নয়। কেননা সন্তান হত্যা বলা যাবে তখন যখন গর্ভে সন্তানের অস্তিত্ব লাভ করবে। গর্ভে সন্তানের অস্তিত্ব লাভের কয়েকটি পর্যায় রয়েছে। প্রথম পর্যায় হচ্ছে, জরায়ুতে শুক্রকীটের স্থিতি লাভ এবং তাতে প্রাণ বা জীবন গ্রহণের যোগ্যতা হওয়া। এরূপ অবস্থায় তা বিনষ্ট করা গুনাহের কাজ। আর তাতে রূহ ফুঁকা হয়ে গেলে এবং সুস্থ পূর্ণাঙ্গ সম্পন্ন হয়ে উঠলে তখন তা বিনষ্ট করা অধিক মাত্রার গুণাহের কারণ। আর চূড়ান্ত মাত্রার গুনাহ হচ্ছে, শিশুর জন্মের পর তাকে হত্যা করা।
(কিন্তু ইমাম গাজ্জালী একথা কি করে ভুলে গেলেন যে, শুক্রকীট বিনষ্ট করণও নিশ্চয়ই গুণাহ্ এবং তা জায়েয করা হলে দুনিয়ায় মানুষ সৃষ্টির আল্লাহর ইচ্ছাকেই সম্পূর্ণ ব্যর্থ করে দেয়া যেতে পারে, আর তা কখনই জায়েয হতে পারে না। বর্তমানে সেই পন্থাই উদ্ভাবিত ও ব্যাপকভাবে অবলম্বিত হচ্ছে। মূলত পুরুষ দেহ থেকে নির্গত শুক্রকীটই হছে পুরুষের সন্তান, যা হত্যা করতে কুরআন মজীদে বার বার নিষেধ করা হয়েছে। আর তা খাদ্যাভাবের আশংকায় হলে তো এ হারাম অত্যন্ত তীব্র হয়ে যাবে।) - অনুবাদক

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 স্বামী-স্ত্রীর সামাজিক অধিকার

📄 স্বামী-স্ত্রীর সামাজিক অধিকার


বিবাহ একটা সুসংবদ্ধ বন্ধন, একটা সুদৃঢ় প্রতিশ্রুতি। পুরুষ ও নারীর মাঝে সুদৃঢ় বন্ধন গড়ে তোলার জন্যেই আল্লাহ্ তা'আলা এ ব্যবস্থা কার্যকর করেছেন। বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর উভয়ই উভয়ের জুড়ি। ব্যক্তিত্বের দিক দিয়ে স্বতন্ত্র হলেও বাস্তবতার দৃষ্টিতে তারা একে অপরের জুড়ি। একজন অপরজনের প্রতিভু। প্রত্যেকেরই নিজস্ব কামনা-বাসনা ও আশা-আকাঙ্ক্ষা পরস্পর সম্পৃক্ত, সংযোজিত।
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার এ সম্পর্কের চূড়ান্ত দৃঢ়তা ও অবিচ্ছিন্নতার কথা বোঝাবার উদ্দেশ্যেই কুরআন মজীদে বলা হয়েছে:
هٰنَّ لِبَاسٌ لَّكُمْ وَاَنْتُمْ لِبَاسٌ لَّهُنَّ -
স্ত্রীরা তোমাদের পোশাক, তোমরা তাদের জন্যে পোশাক। (البقرة 187)
এ আয়াতের আসল বক্তব্য হচ্ছে, স্বামী-স্ত্রীকে পরস্পর সুসংবদ্ধ, পরস্পরের গোপনীয়তা আচ্ছাদনকারী, পরস্পরের সমর্থক-সাহায্যকারী এবং একজন অপরজনের জন্যে সৌন্দর্য বিধায়ক হতে হবে। অন্য কথায় প্রত্যেকেরই অপরজনের ওপর অধিকার রয়েছে। সে অধিকার পুরামাত্রায় অবশ্যই আদায় করতে হবে। এ অধিকার সম্পূর্ণ সমান, পুরুষদের প্রকৃতি অনুযায়ী তাদের দেয়া বিশেষ বিশেষ অধিকার ছাড়া আল্লাহ্ কথা থেকেই তা স্পষ্ট। তিনি বলেন:
وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوْفِ م وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ -
স্ত্রীদের জন্যে রয়েছে সেসব যা আছে তাদের ওপর সুস্পষ্ট ও প্রচলিত বা সাধারণ নিয়মে। তবে পুরুষদের জন্যে তাদের ওপর একটা অগ্রাধিকার রয়েছে।
সে অগ্রাধিকারের পর্যায় হচ্ছে পরিচালক নিয়ন্ত্রক দায়িত্বশীল ও জবাবদিহি করতে বাধ্য হওয়ার। নবী করীম (স)-কে এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন: আমাদের ওপর আমাদের স্ত্রীদের কি অধিকার রয়েছে? জবাবে তিনি বললেন:
اَنْ تُطْعِمَهَا اِذَا طَعِمْتَ وَتَكْسُوهَا اِذَا اكْتَسَيْتَ وَلَا تَضْرِبُ الْوَجْهَ وَلَا تُقَبِّحْ وَلَا تَهْجُرُ اِلَّا فِي الْبَيْتِ -
তা হচ্ছে, তাদের নিজেদের সঙ্গে খাওয়াবে, নিজেদের মতোই পরাবে। আর মুখমণ্ডলের ওপর মারবে না, তাকে খারাপ-অশ্লীল গালাগালি করবে না এবং তাকে তার ঘর ছাড়া অন্য কোথাও ছাড়বে না। (আবূ দাউদ, ইবনে হাব্বান)
কাজেই নিজ স্ত্রীর ভরণ-পোষণের ব্যাপারে ঔদাসিন্য বা উপেক্ষা দেখান কোন মুসলমানের পক্ষেই জায়েয নয়। হাদীসে বলা হয়েছে:
كَفَى بِالْمَرْءِ إِثْمًا أَنْ تُضِيْعَ مَنْ يَقُوْتُ -
একজন লোকের গুনাহগার হওয়ার জন্যে এতটুকুই যথেষ্ট যে, যাদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব তার ওপর অর্পিত, তাদের প্রতি সে ব্যাপারে চরম উপেক্ষা দেখাবে। (আবূ দাউদ, নিসায়ী, হাফেম)
স্ত্রীর মুখের ওপর মারার কোন অনুমতি ইসলাম দেয়নি। কেননা এ কাজ মানবীয় সম্মান ও মর্যাদা পরিপন্থী। তাতে দেহের সর্বাধিক সম্মানার্হ ও মর্যাদাসম্পন্ন অঙ্গ- দেহের সমস্ত সৌন্দর্য যেখানে কেন্দ্রীভূত- আহত ও ক্ষুণ্ণ হয়। নাফরমান ও স্বেচ্ছাচারী স্ত্রীকে প্রয়োজন মতো সুশিক্ষাদান ও গড়ে তোলার প্রশ্নে কখনও স্ত্রীকে হালকাভাবে মারাও যেতে পারে। কিন্তু তাকে কষ্ট দেয়া ও মুখমণ্ডলকে ক্ষতবিক্ষত করার মতো মারা কিছুতেই জায়েয হতে পারে না। স্ত্রীকে গালাগালি করাও জায়েয নয়। তার মনে কষ্ট দেয়া, তার জন্যে অসহনীয় কথাবার্তা বলা এমন কি তার জন্যে বদ দো'আ করা প্রভৃতিও সম্পূর্ণ নাজায়েয।
স্ত্রীর ওপর স্বামীর অধিকার পর্যায়ে নিম্নোদ্ধৃত হাদীসটি উল্লেখ্য। নবী করীম (স) বলেছেন:
لا يَحِلُّ لِامْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِالله أَنْ تَأْذَنَ فِي بَيْتِ زَوْجِهَا وَهُوَ كَارِهُ وَلَا تَخْرُجُ وَهُوَ كَارِهُ وَلَا تُطِيعُ فِيهِ أَحداً وَلَا تَعْتَزِلُ فِرَا شَهُ وَلَا تَضْرِبُهُ فَإِنْ كَانَ هُوَ أَظْلَمَ فَلْتَاتِهِ حَتَّى تُرْضِيهِ - فَإِنْ قَبلَ مِنْهَا وَقَبِهَا وَتَعْمَتْ وَقَبِلَ اللَّهُ عُذْرَ هَا وَافْلَحَ حُجْتَهَا وَإِنْ هُوَ لَمْيَرَضِ فَقَدْ أَبْلَغَتْ عِنْدَ اللَّهِ عُدْرَهَا
যে স্ত্রীলোক আল্লাহ্ প্রতি ঈমানদার, তার পক্ষে তার স্বামীর ঘরে এমন ব্যক্তিকে আসবার অনুমতি দেয়া বৈধ নয়, যাকে তার স্বামী পছন্দ করে না। স্বামীর অনুমতি ব্যতীত ঘরের বাইরে যাওয়াও তার জন্যে জায়েয নয়। এ ব্যাপারে অপর কারো কথা মান্য করাও তার উচিত নয়, স্বামীর শয্যা থেকে দূরে থাকাও নয় বাঞ্ছনীয়। স্বামী যদি অত্যাচারী হয়, তা হলে তাকে সন্তুষ্ট রাখার জন্যে সাধ্যমত চেষ্টা চালাবে। তার এই খিদমত স্বামী গ্রহণ করলে তো ভালই। আল্লাহ্ তার ওযর কবুল করে নেবেন এবং তার সত্যপন্থী হওয়াটাও প্রকাশ করে দেবেন। আর স্বামী যদি রাজি না হয়, তাহলে আল্লাহ্র কাছে তার অক্ষমতার ওযর পৌঁছে যাবে। (الحاكم)

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক ধৈর্য ধারণ

📄 স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক ধৈর্য ধারণ


মুসলিম স্বামী মাত্রেরই কর্তব্য তার স্ত্রীর ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ করা। বিশেষ করে তার মধ্যে যদি এমন কিছু লক্ষ্য করে যা তার পছন্দ নয়। মানুষের মধ্যে মানুষ হওয়ার কারণে যে সব দোষত্রুটি স্বাভাবিক ভাবেই থাকে আর স্ত্রীলোকদের মধ্যে নারীত্বজনিত যে সব দুর্বলতা লক্ষ্য করা যায়, তা সহ্য করে নিতে অভ্যস্ত হওয়া স্বামীর একান্তই কর্তব্য। অনুরূপভাবে স্ত্রীর দোষগুলোর তুলনায় তার গুণগুলো এবং ত্রুটি-বিচ্যুতি অপেক্ষা ভাল ভাল দিকগুলোর প্রতিই নজর প্রকট করে রাখা বাঞ্ছনীয়। হাদীসে বলা হয়েছে:
لَا يَفْرُكُ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةً إِنْ سَخطا مِنْهَا خُلُقًا رَضِي مِنْهَا غَيْرَهُ -
কোন ঈমানদার পুরুষ যেন কোন ঈমানদার নারীকে ঘৃণা না করে। কেননা তার মধ্যে একটি ব্যাপার যদি অপছন্দনীয় থাকে তাহলে অপরাপর গুণাবলী নিশ্চয়ই পছন্দনীয় পাওয়া যাবে। (মুসলিম)
আর আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন:
وعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ ، فَإِنْ كَرِهْتُمُوْ هُنَّ فَعَسَى أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًاو يَجْعَلَ اللَّهُ فِيْهِ خَيْرًا كَثِيرًا -
তোমরা স্ত্রীদের সাথে ভালভাবে বসবাস ও জীবন যাপন কর (ভাল আচরণ গ্রহণ কর)। তোমরা যদি তাদের অপছন্দ কর, তাহলে অসম্ভব নয় যে আল্লাহ্ তাদের মধ্যে অনেক কিছুই ভাল ও কল্যাণ জমা করে রেখেছেন। (النساء 19)
ইসলাম যেভাবে স্বামীকে স্ত্রীদের অপছন্দনীয় ব্যাপারাদিতে ধৈর্য ধারণ করতে ও পরম সহিষ্ণুতা দেখাতে বলেছে, অনুরূপভাবে স্ত্রীদেরও নির্দেশ দিয়েছে নিজ নিজ স্বামীকে যথাসাধ্য সন্তুষ্ট রাখার জন্যে চেষ্টা চালিয়ে যেতে এবং স্বামীকে অসন্তুষ্ট রেখে রাত যাপন না করতে। হাদীসে বলা হয়েছেঃ
ثَلَاثَةٌ لَا تَرْتَفِعُ صَلَاتُهُمْ فَوْقَ رُءُوسِهِمْ شِبْرًا - رَجُلٌ أَمْ قَوْمًا وَهُمْ لَهُ كَارِهُونَ وَامْرَأَةٌ بَاتَتْ وَزَوْجُهَا عَلَيْهَا سَاخِطٌ وَأَخَوَانِ مُتَصَرِمَانِ -
তিন ব্যক্তির নামায তাদের মাথার এক বিগত উপরেও যায় না। এক ব্যক্তি সে, যে লোকদের ইমামতি করে অথচ সেই লোকেরা তাকে পছন্দ করে না। দ্বিতীয় সেই স্ত্রীলোক, যে স্বামীকে অসন্তুষ্ট অবস্থায় রেখে রাত যাপন করে। আর তৃতীয় এমন দুই ভাই যারা পরস্পরের সাথে লড়াই-ঝগড়ায় লিপ্ত। (ইবনে মাযাহ, ইবনে হাব্বান)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00