📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 স্বামী-স্ত্রীর গোপন তত্ত্ব সংরক্ষণ

📄 স্বামী-স্ত্রীর গোপন তত্ত্ব সংরক্ষণ


কুরআন মজীদে নেককার ও পরহেযগার স্ত্রীলোকদের গুণপনা বর্ণনা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে:
قانِتَاتٌ حَافِظَاتٌ لِّلْغَيْبِ بِمَا حَفِظَ اللَّهُ -
বিনয়ী আল্লাহ্ অপ্রকাশিত বিষয়ের সংরক্ষণকারী আল্লাহ্র সংরক্ষণের অধীন ও আনুকূল্যে। (সূরা নিসাঃ ৩৪)
এ আয়াতে যেসব অদৃশ্য-গোপন বিষয়াদির সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে, স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক বিশেষ সম্পর্ক পর্যায়ের বিষয়-ব্যাপারাদিও তার মধ্যে রয়েছে। এসব গোপন তত্ত্বের উল্লেখ বন্ধু-বান্ধবীদের মজলিসে-বৈঠকে-সভায় প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।
হাদীসে বলা হয়েছে:
إِنَّ مِنْ شَرِ النَّاسِ مَنْزِلَةَ عِنْدَ اللهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ الرَّجُلُ يُفْضِي إِلَى الْمَرْأَةِ وَقُفْضِيَ إِلَيْهِ ثُمَّ يَنْشُرُ سِرَّهَا -
কিয়ামতের দিন আল্লাহ্র কাছে অতীব নিকৃষ্টতম মর্যাদার হবে সে ব্যক্তি, যে স্ত্রীর কাছ থেকে স্বীয় প্রয়োজন পূর্ণ করে এবং পরে সে গোপন কথা প্রচার করে দেয়। (মুসলিম, আবূদাউদ)
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, নবী করীম (স) আমাদের নামায পড়ালেন, সালাম ফিরিয়ে আমাদের দিকে মুখ করে বললেন: বসে থাক সকলে এবং শোন। তোমাদের মধ্যে এমন কেউ আছে কি, যে নিজের স্ত্রীর কাছে গিয়ে ঘরের দুয়ার বন্ধ করে দেয় ও পর্দা ফেলে দেয়? পরে যখন বাইরে বের হয়ে আসে তখন লোকদের বলতে থাকে, আমি আমার স্ত্রীর সাথে এই এই করেছি?
রাসূলে করীম (স)-এর এ প্রশ্নের কেউ কোন জবাব দিল না। পরে তিনি মহিলা নামাযীদের লক্ষ্য করে বললেন: তোমাদের মধ্যেও কি এমন কেউ আছে যে এ ধরনের কথাবার্তা বলে? একটি যুবতী নারী নিজ হাটুর ওপর ভর করে নবী করীম (স)-কে দেখতে ও তাঁর কথা শুনতে চেষ্টা করছিল, সে বলল: আল্লাহ্র কসম, পুরুষরাও এ রকম কথাবার্তা বলে। এ কথা শুনে নবী করীম (স) বললেন:
هَلْ تَدْرُونَ مَا مَثَلُ مَنْ فَعَلَ ذَلكَ - أَنْ مَثَلَ مَنْ فَعَدَ ذَلِكَ مَثَلُ شَيْطَنٍ وَشَيْطَانَةٍ لَقَى أَحَدُهُمَا صَاحِبَهُ بِالسِّكَّةِ فَقَضَى حَاجَتَهُ مِنْهَا وَالنَّاسُ يَنْظُرُونَ -
যে লোক এরূপ করে তার দৃষ্টান্ত কি তা কি তোমরা জান? তার দৃষ্টান্ত শয়তান পুরুষ শয়তান নারীর মতো, যে নিজে স্ত্রীর সাথে রাজপথে মিলিত হয় এবং স্বীয় প্রয়োজন পূরণ করে, আর সমস্ত মানুষ চোখ খুলে এ নির্লজ্জ দৃশ্য অবলোকন করে। (আহমদ, আবূদাউদ)
এ ধরনের নির্বুদ্ধিতাজনক কাজের প্রতি চরম ঘৃণা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে একজন মুসলমানের জন্যে উপস্থাপিত দৃষ্টান্তই যথেষ্ট। কেননা এ অত্যন্ত জঘন্য কাজ। কোন মুসলমানই শয়তান-পুরুষ শয়তান-নারী হওয়া পছন্দ করতে পারে না

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 পরিবার পরিকল্পনা

📄 পরিবার পরিকল্পনা


মানব জাতি ও মানব বংশের স্থিতিই বিয়ে ও বিবাহিত জীবনের চরম লক্ষ্য। আর এ স্থিতিই নির্ভরশীল হচ্ছে বংশধারা প্রবাহ অব্যাহতভাবে জারী থাকার ওপর। এ কারণে ইসলাম বংশবৃদ্ধির ওপর খুব বেশি গুরুত্ব আরোপ করেছে এবং খুব বেশি পছন্দনীয় বলে ঘোষণা করেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে সন্তান— ছেলেই হোক কি মেয়েই হোক— অতীব কল্যাণ ও সমৃদ্ধির উপকরণ। কিন্তু সেই সঙ্গে ইসলাম যুক্তি সঙ্গত কারণ ও গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনের দরুন পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে বলে মত প্রকাশ করেছে। রাসূলে করীম (স)-এর যুগে জন্মহার প্রতিরুদ্ধ বা হ্রাস করার উদ্দেশ্যে আযল- শুক্র নিষ্ক্রমণকালে তা স্ত্রী-অঙ্গের বাইরে নিক্ষেপ করার প্রচলন ছিল। রিসালত যুগে সাহাবিগণ এ পন্থা গ্রহণ করতেন। হযরত জাবির (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে:
كُنَّا نَعْزِلُ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ الله صلى الله عليه وَسَلَّمَ وَالْقُرْآنُ يَتْرِلُ -
আমরা রাসূলে করীম (স)-এর জীবদ্দশায় ‘আযল’ করতাম, অথচ তখন কুরআন নাযিল হচ্ছিল। অপর হাদীসের ভাষা হচ্ছে:
كُنَّا نَعْزِلُ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَبَلَغَ ذَلِكَ رَسُولَ الله صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَلَمْ يَنْهَنَا
আমরা রাসূলে করীম (স)-এর জীবদ্দশায় ‘আযল’ করতাম। এ সংবাদ তাঁর কাছে পৌছলে তিনি আমাদের এ কাজ থেকে নিষেধ করেন নি। (মুসলিম)
আর একটি হাদীসে বলা হয়েছে:
وَجَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ يَارَسُولَ اللَّهِ - إِنَّ لِي جَارِيَةٌ وَأَنَا أَعْزِلُ عَنْهَا وَإِنِّي أَكْرَهُ أَنْ تَحْمِلَ وَأَنَا أُرِيدُ مَا يُرِيدُ الرِّجَالُ وَإِنَّ الْيَهُودَ تُحَدِّثُ أَنَّ الْعَزَّلَ الْمَؤدَةَ الصُّغْرَى فَقَالَ عَلَيْهِ السَّلَامُ كَذَبَتِ الْيَهُودُ لوارَادَ اللَّهُ أَنْ يَخْلُقَهُ مَا اسْتَطَعَتْ أَنْ تُصْرِفَهُ -
এক ব্যক্তি নবী করীম (স)-এর কাছে উপস্থিত হয়ে বললঃ হে রাসূল! আমার একটি দাসী আছে, আমি তার সাথে 'আযল' করি এবং সে গর্ভবতী হোক-তা আমি পছন্দ করি না। আর পুরুষরা যা সাধারণত চায়, আমিও তাই চাই। ওদিকে ইয়াহুদীরা বলে বেড়াচ্ছে যে, 'আযল' হচ্ছে ছোটখাটো গোপন হত্যা। তখন নবী করীম (স) বললেন, ইয়াহুদীরা মিথ্যা বলছে। আল্লাহ্ বাচ্চা জন্মাতে চাইলে তুমি তা রুখতে পার না। (اصحاب السنن)
রাসূলে করীম (স)-এর এ কথাটির তাৎপর্য হচ্ছে, 'আযল' করা সত্ত্বেও শুক্রকীট গর্ভধারে পৌঁছে যেতে পারে এবং অজ্ঞাতসারেই গর্ভের সঞ্চার হওয়া সম্ভব।
হযরত উমর ফারুক (রা)-এর মজলিসে 'আযল' সম্পর্কে আলোচনা হচ্ছিল। একজন বললেন, লোকেরা তো তাকে 'ছোট গোপন হত্যা' মনে করে। একথা শুনে হযরত আলী (রা) বললেন: 'মওদাহ' জীবন্ত প্রোথিত করা অর্থাৎ 'সন্তান হত্যা' বলা যেতে পারে তখন, যখন ভ্রূণ সাতটি পর্যায়ে অতিক্রম করে যায় অর্থাৎ মাটির নির্যাস শুক্রকীটে পরিণত হয়, পরে তা জমাটবাঁধা রক্ত রূপ লাভ করে, পরে তা হয় মাংসপিণ্ড, তার পরে অস্থিমজ্জা গড়ে উঠে, আর তার ওপর গোস্ত জমে। এসব পর্যায়ে অতিক্রম করেই মানবীয় আকার-আকৃতি লাভ করে। হযরত উমর (রা) বললেন: আপনি ঠিকই বলেছেন। আল্লহ্ আপনাকে দীর্ঘায়ু করুন。

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 কোন্ অবস্থায় পরিবার পরিকল্পনা জায়েয

📄 কোন্ অবস্থায় পরিবার পরিকল্পনা জায়েয


মাত্র কয়েকটি বিশেষ প্রয়োজনে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণ জায়েয হতে পারে। একটি প্রয়োজন হচ্ছে, মা'র জীবন বা স্বাস্থ্যের ওপর যদি রোগ বা প্রসবকালীন সংকটের দরুন হুমকি দেখা দেয়, তাহলে এ পদ্ধতি গ্রহণ করা যেতে পারে। এ সংকট বা হুমকির কথা অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে জানা যাবে, কিংবা কোন বিশ্বস্ত নির্ভরযোগ্য চিকিৎসাবিদ তা বলে দেবে। আল্লাহ্ নিজেই বলেছেন:
وَ لَا تُلْقُوا بِاَيْدِ يْكُمْ إِلَى التَّهْلُكَه -
তোমরা নিজেদের হাতেই নিজেদের ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না।
বলেছেন:
وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا -
তোমরা নিজেরাই নিজেদের হত্যা করো না। আল্লাহ্ নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতি অতীব দয়াবান।
দ্বিতীয় ভিত্তি হচ্ছে, বৈষয়িক অসুবিধা, সমস্যা ও অনিশ্চয়তা-অসহায়ত্বের মধ্যে পড়ে যাওয়ার আশংকা, যার দরুন দ্বীনী সমস্যা দেখা দিতে পারে বলে মনে করা হবে। যার ফলে মানুষ সন্তানাদির কারণে হারাম জিনিস গ্রহণ ও অবৈধ কাজে লিপ্ত হওয়ার পরিণতি দেখা দেবে। আল্লাহ্ বলেছেন:
يُرِيدُ اللهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ -
আল্লাহ্ তোমাদের প্রতি সহজতার বিধান করতে চান, তোমাদের কোন অসুবিধায় ফেলতে চান না। (সূরা বাকারা : ১৮৫)
مَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيَجْعَلَ عَلَيْكُمْ مِّنْ حَرَجٍ -
আল্লাহ্ তোমাদের ওপর সংকীর্ণ বা অসুবিধা চাপিয়ে দিতে চান না। (المائدة ٦)
তৃতীয় হচ্ছে, সন্তানদের স্বাস্থ্য নষ্ট হওয়ার কিংবা তাদের সঠিক লালন-প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে ব্যর্থ হওয়ার আশংকা। এ পর্যায়ে উল্লেখ্য হাদীস:
عَنْ أَسَامَةَ بْنِ زَيْدٍ أَنَّ رَجُلًا جَاءَ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللهِ إِنِّي أَعْزِلُ عَنِ امْرَأَتِي فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِمَ تَفْعَلُ ذَلِكَ - فَقَالَ الرَّجُلُ أَشْفِقُ عَلَى ولدهَا أَوْقَالَ عَلَى أَوْلَادِهَا فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لوكَانَ ضَارَّ الضَّرِّ فَارِسِ وَالرُّوْمَ -
হযরত উসামা ইবনে যায়দ থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসূলে করীমের কাছে উপস্থিত হয়ে বলল : ইয়া রাসূলুল্লাহ। আমি আমার স্ত্রীর সাথে আযল করে থাকি। তিনি জিজ্ঞেস করলেন : তুমি তা কেন কর? বলল: আমি তার স্তনের ব্যাপারে আশংকা বোধ করি। তখন নবী করীম (স) বললেন: ক্ষতি হওয়ার ভয় যদি যথার্থই হতো, তাহলে পারস্যবাসী ও রোমবাসীদেরও ক্ষতি সাধিত হতো। (مسلم)
এ কথার অর্থ এই দাঁড়ায় যে, নবী করীম (স)-এর মতে ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত পর্যায়ে এ কাজ করা হলে সামষ্টিকভাবে গোটা উম্মতের জন্যে কোনরূপ ক্ষতিকর ছিল না। আর তা যে ক্ষতিকর নয়, তার বড় প্রমাণ এই যে, পারস্য ও রোমান জাতি এ সময় বড় শক্তিশালী সরকার ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার অধিকারী ছিল, তাদের তো এ কাজের দরুন কোন ক্ষতি হয়নি।
শরীয়তের দৃষ্টিতে আরও একটি প্রয়োজনের উল্লেখ করা যায়। তা হচ্ছে দুগ্ধপোষ্য শিশুর মা'র আবার গর্ভসঞ্চার হলে শিশুর পক্ষে ক্ষতিকর হতে পারে। কেননা তখন মা'র দুগ্ধ নষ্ট হয়ে যেতে পারে, যার ফলে শিশু দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
নবী করীম (স) উম্মতের জন্যে সামষ্টিকভাবে কল্যাণকর কার্যাদি করার হেদায়েত দিতেন। আর যে সব কাজের ফলে উম্মতের ক্ষতি সাধিত হওয়ার আশংকা, তা পরিহার করে চলতে বলতেন। নবী করীম (স)-এর এ কথাটি সেই পর্যায়ের:
لَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ سِرًّا فَإِنَّ الْغَيْلَ يَدْرِكُ الْفَرِسُ فِيهِ عَشْرَةُ -
তোমরা তোমাদের সন্তানদের গোপন পন্থায় ধ্বংস করবে না। কেননা দুগ্ধপায়ী শিশুর বর্তমানে স্ত্রী সঙ্গম করলে শিশুর ক্ষতি হতে পারে। (ابوداؤد)
কিন্তু নবী করীম (স) এ কাজকে হারাম ধরে নিয়ে নিষেধ করেন নি। কেননা তাঁর সময়ে অন্যান্য জাতির লোকেরা এই পন্থা গ্রহণ করেছিল। কিন্তু তাতে তাদের কোন ক্ষতি হচ্ছিল না। শিশুকে দুধ খাওয়ানো কালে তদ্দরুন স্ত্রী সঙ্গম যদি চূড়ান্তভাবে নিষিদ্ধ করে দেয়া হতো তাহলে তাদের স্বামীদের তাতে কষ্ট হতো। দুগ্ধ সেবনের মেয়াদকাল দুই বছর পর্যন্ত চলতে থাকে। এ সব ব্যাপারের দিকে লক্ষ্য রেখে নবী করীম (স) বলেছেন:
لقَدْ هَمَّمْتُ أَنْ أَنْهَى عَنِ الْغَيْلَةِ ثُمَّ رَأَيْتُ فَارِسَ وَالرُّوْمَ يَفْعَلُوْ نَهُ وَلَا يَضُرُّ أَوْلَادَ هُمْ شَيْئًا -
দুগ্ধপায়ী শিশুর মা'র সাথে সঙ্গম করতে আমি নিষেধ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পারস্য ও রোমকদের সম্পর্কে আমি জানতে পারলাম যে, তারা এ কাজ করে; কিন্তু তাতে তাদের সন্তানের কোন ক্ষতি হয় না। (মুসলিম)
আল্লামা ইবনুল কাইয়্যেম উপরিউদ্ধৃত হাদীসদ্বয়ের মাঝে সমন্বয় বিধানের জন্যে একটি বিশ্লেষণ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন:
নবী করীম (স)-এর সম্মুখে দুটি দিকই ছিল। একটি হচ্ছে দুগ্ধ পোষ্য শিশুর বর্তমানে তার মা'র সাথে সঙ্গম করলে শিশুর ক্ষতি হওয়ার আশংকা। যদিও সে ক্ষতিটা হত্যা বা ধ্বংস করার পর্যায়ের নয়, তা সত্ত্বেও ক্ষতির আশংকার দরুন তিনি তা নিষেধ করেছেন। কিন্তু তা হারাম ঘোষণা করা হয়নি, পরে তিনি 'নিমিত্ত বন্ধকরণ' হিসেবে তা থেকে বিরত রাখতে চেয়েছেন। কিন্তু তাঁর সম্মুখে অপর একটি দিকও উদ্‌ঘাটিত হয়। তা হচ্ছে দুগ্ধ সেবনের মেয়াদের মধ্যে সঙ্গম নিষিদ্ধ হলে যে অসুবিধা ও বিপরীত হতে পারে, এই নিমিত্ত নিষিদ্ধকরণ দ্বারা তার প্রতিরোধ করা সম্ভবপর হবে না। বিশেষ করে নব্য যুবক ও যৌন উত্তেজনাসম্পন্ন ব্যক্তিদের চরম বিপর্যয়ে পড়ে যাওয়ার প্রবল আশংকা। এ কারণে তিনি মত গ্রহণ করলেন যে, এই কল্যাণ রোধ নিমিত্তরোধের বিপর্যয়ের তুলনায় অনেক প্রবল ও অগ্রাধিকার পাওয়ার দাবিদার। সেকালের দুটি বড় বড় প্রতিষ্ঠিত জাতির কর্ম পদ্ধতিও তার সম্মুখে প্রতিভাত ছিল। তারা এ কাজ পরিহার করেনি, এ সব কারণে তিনি এ কাজকে নিষিদ্ধ করেন নি।
আধুনিক কালের গর্ভ বন্ধকরণের নব নব উপায় ও পন্থা উদ্ভাবিত হয়েছে। ১ তা প্রয়োগ ব্যবহার করে কল্যাণের দিকটার সংরক্ষণ সম্ভব আর রাসূলে করীম (স) তাই চেয়েছিলেন অর্থাৎ দুগ্ধপায়ী শিশুকে ক্ষতি থেকে বাঁচানো। আর দুগ্ধ সেবনকালে স্ত্রী সঙ্গম নিম্নিদ্দকরণে যে বিপর্যয় ঘটার আশংকা, তা থেকেও তিনি উম্মতকে রক্ষা করতে চেয়েছেন।
এ আলোচনার আলোকে ইবনে হাম্বলের মতে 'আযল' জায়েয। তবে শর্ত হচ্ছে তার স্ত্রীর অনুমতিক্রমে হতে পারে। কেননা সঙ্গম স্বাদ ও তৃপ্তিলাভ এবং সন্তান এ উভয় দিকেই তার অধিকার রয়েছে। হযরত উমর (রা) স্ত্রীর অনুমতি ব্যতিরেকে 'আযল' করতে নিষেধ করেছেন।
এ থেকে ইসলামের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ দৃষ্টিকোণ স্পষ্ট হয়ে উঠে। নবী করীম (স) নারীদের অধিকারের ওপর সে সময়ই এতটা গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন, যখন দুনিয়ার মানুষ নারীর অধিকার বলতে কোন বস্তুর সাথ সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল।

টিকাঃ
১. মনে রাখা আবশ্যক, গ্রন্থকার এখানে পরিবার পরিকল্পনা পর্যায়ে কথা বলেছেন, জন্ম বন্ধ বা বন্ধ্যাকরণ সম্পর্কে নয়। কাজেই আধুনিক প্রক্রিয়া সমৃদ্ধ পরিবার পরিকল্পনা বা বন্ধ্যাকরণ জায়েয বলা যাবে না। বন্ধ্যাকরণ মূলত: আল্লাহর সৃষ্টি পরিবর্তন করার অপরাধ। তা যে গুণাহের কাজ ও হারাম এবং তা আল্লাহ্র নিষিদ্ধ স্পষ্ট সন্তান হত্যার কাজ, তাতে কোনই সন্দেহ নেই। তবে কেউ চরম ঠেকায় পড়ে গেলে সেকথা স্বতন্ত্র। - অনুবাদক

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 গর্ভপাত ঘটানো

📄 গর্ভপাত ঘটানো


ইসলাম গর্ভনিরোধক প্রতিক্রিয়া অবলম্বন করা জায়েয করেছে ঠিক সেই অবস্থায়, যখন তার প্রয়োজন তীব্র হয়ে দেখা দেয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও গর্ভের সঞ্চার হয়ে গেলে তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা কোন অবস্থাতেই জায়েয নয়।
ফিকাহবিদগণ এ বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেন যে, ভ্রুণে প্রাণের সঞ্চার হয়ে যাওয়ার পর গর্ভপাত করান সম্পূর্ণ হারাম ও অপরাধ। একাজ কোন মুসলমানের জন্যেই জায়েয হতে পারে না। কেননা তা একটা জীবন্ত ও পূর্ণাঙ্গ সত্তার ওপর অমানুষিক জুলুম। এ কারণে ফিকাহবিদগণ বলেছেন, গর্ভপাত করান কালে যদি ভ্রুণ জীবন্ত প্রসূত হয়ে মরে যায় তাহলে 'দিয়ত' — রক্তমূল্য— দিতে হবে। আর ভ্রূণ মৃত হলে জরিমানা দিতে হবে, যার পরিমাণ দিয়ত-এর অপেক্ষা কম হবে। কিন্তু তাঁরা বলেন, ভ্রুণকে বাঁচাতে গেলে মা'র জীবন নিঃশেষ হয়ে যাবে এবং গর্ভপাত করান ছাড়া প্রাণ বাঁচানর আর কোন উপায় নেই— তা যদি নির্ভরযোগ্য উপায়ে জানা যায়, তাহলে তখন গর্ভপাত করান জরুরী হয়ে পড়ে। শরীয়তের সাধারণ নিয়ম হচ্ছে, দুটো ক্ষতিকর ব্যাপারের মধ্য থেকে অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিকর পন্থা গ্রহণ করতে হবে। এ নিয়মের দৃষ্টিতে প্রসূতির প্রাণ বাঁচানর জন্যে মা'র জীবনকে বিপদে নিক্ষেপ করা যায় না। যেহেতু মা'র জীবনই হলো আসল। তার অধিকারই অগ্রগণ্য। অতএব ভ্রুণের জীবন রক্ষার জন্যে মার জীবন কুরবান করা কিছুতেই বাঞ্ছনীয় হতে পারে না।
ইমাম গাজ্জালী বলেছেন: গর্ভ নিরোধ ও গর্ভপাত— এ দুটোর মধ্যে পার্থক্য করতে হবে। গর্ভ নিরোধ সন্তান হত্যার সমান কাজ নয়। কেননা সন্তান হত্যা বলা যাবে তখন যখন গর্ভে সন্তানের অস্তিত্ব লাভ করবে। গর্ভে সন্তানের অস্তিত্ব লাভের কয়েকটি পর্যায় রয়েছে। প্রথম পর্যায় হচ্ছে, জরায়ুতে শুক্রকীটের স্থিতি লাভ এবং তাতে প্রাণ বা জীবন গ্রহণের যোগ্যতা হওয়া। এরূপ অবস্থায় তা বিনষ্ট করা গুনাহের কাজ। আর তাতে রূহ ফুঁকা হয়ে গেলে এবং সুস্থ পূর্ণাঙ্গ সম্পন্ন হয়ে উঠলে তখন তা বিনষ্ট করা অধিক মাত্রার গুণাহের কারণ। আর চূড়ান্ত মাত্রার গুনাহ হচ্ছে, শিশুর জন্মের পর তাকে হত্যা করা।
(কিন্তু ইমাম গাজ্জালী একথা কি করে ভুলে গেলেন যে, শুক্রকীট বিনষ্ট করণও নিশ্চয়ই গুণাহ্ এবং তা জায়েয করা হলে দুনিয়ায় মানুষ সৃষ্টির আল্লাহর ইচ্ছাকেই সম্পূর্ণ ব্যর্থ করে দেয়া যেতে পারে, আর তা কখনই জায়েয হতে পারে না। বর্তমানে সেই পন্থাই উদ্ভাবিত ও ব্যাপকভাবে অবলম্বিত হচ্ছে। মূলত পুরুষ দেহ থেকে নির্গত শুক্রকীটই হছে পুরুষের সন্তান, যা হত্যা করতে কুরআন মজীদে বার বার নিষেধ করা হয়েছে। আর তা খাদ্যাভাবের আশংকায় হলে তো এ হারাম অত্যন্ত তীব্র হয়ে যাবে।) - অনুবাদক

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00