📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 সাময়িক বিয়ে

📄 সাময়িক বিয়ে


ইসলামে বিয়ে একটি সুদৃঢ় বন্ধন; একটি দুরতিক্রম্য প্রতিশ্রুতি। উভয় পক্ষ থেকে চিরদিনের একত্র জীবন যাপনের অপরিসীম আগ্রহ ও উৎসাহের ফলশ্রুতি। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মানসিক প্রশান্তি, বন্ধুতা-ভালবাসা ও দয়া-সহানুভূতির ভাবধারার স্থিতিলাভই হয় তার কাম্য। বংশের ধারা অব্যাহত রেখে মানবতার অগ্রগতিকে স্থায়িত্ব দান তার চরম লক্ষ্য। কুরআন মজীদে আল্লাহ্ তা'আলা বলেছেন:
وَاللهُ جَعَلَ لَكُمْ مِّنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا وَجَعَلَ لَكُمْ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ بَنِينَ وَحَفْدَةً -
আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের নিজেদের মধ্য থেকেই তোমাদের জন্যে জুড়ি বানিয়ে দিয়েছেন এবং তেমাদের এ জুড়ি থেকেই সন্তান-সন্ততি ও নাতিপুতি বানানর ব্যবস্থা করেছেন। (النحل : 72)
এ কারণে বিয়ে সব সময়ই স্থায়ী ভিত্তিতে হওয়া উচিত। কিন্তু সাময়িক বা অস্থায়ী বিয়ে সে রকম হয় না। তা হয় একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ পারিশ্রমিকের বিনিময়ে একটা নির্দিষ্ট সময়কালের জন্যে। ফলে বিয়ের যে তাৎপর্য কুরআনের আলোকে উপরে বলা হলো, তা এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। রাসূলে করীম (স) শরীয়তের বিধান পূর্ণত্ব ও স্থিতি লাভের পূর্বে এরূপ বিয়ের অনুমতি দিয়েছিলেন। এ অনুমতির ক্ষেত্রেও সময় ছিল দীর্ঘদিনের সফর ও যুদ্ধযাত্রা, কিন্তু পরে তিনি নিজেই তা চিরদিনের তরে হারাম করে দিয়েছেন।
শুরুতে এরূপ বিয়ের অনুমতি দেয়ার কারণ ছিল। তখন মানুষ জাহিলিয়াত ত্যাগ করে ইসলামের দিকে যাওয়ার একটা ক্রান্তিলগ্ন বা সন্ধিক্ষণের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল। জাহিলিয়াতের যুগে জ্বেনা ব্যভিচার ছিল সহজ, অবাধ, সর্বপ্রকার বাধামুক্ত।
ইসলাম আগমনের পর এ লোকদেরই যখন জিহাদের জন্যে দূরদেশে দীর্ঘ দিনের জন্যে যাত্রা করতে হয়, তখন তাদের স্ত্রীদের থেকে এতদিন বিচ্ছিন্ন ও নিঃসম্পর্ক থাকা খুব কষ্টকর হয়ে দাড়াল। এদিকে নও-মুসলিমদের মধ্যে যেমন খুব শক্ত ঈমানদার লোক ছিলেন, তেমনি ছিলেন দুর্বল ঈমানদারও। বিশেষ করে দুর্বল ঈমানদার লোকদের ব্যাপারে তাদের জ্বেনায় লিপ্ত হয়ে পড়ার আশংকা তীব্র হয়ে দেখা দিল অথচ তা সর্বাধিক নির্লজ্জতার পাপ ও বীভৎস কাজ।
অপরদিকে শক্ত ঈমানদার লোকেরা নিজেদের 'খাসি' বানিয়ে যৌন শক্তিকে দমন করে রাখার সংকল্প গ্রহণ করলেন! এ পর্যায়ে হযরত ইবনে মাসউদ (রা) বলেছেন:
كُنَّا نَعْزُو مَعَ رَسُولِ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَلَيْسَ مَعَنَا نِسَاءً فَقُلْنَا إِلَّا نَسْتَخْصِي فَنَهَا نَا رَسُولُ الله صَلَّى اللَّ اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ ذَلِكَ وَرَخَّصَ لَنَا أنْ تَنْكِحَ الْمَرْأَةَ بِالثَّوْبِ إِلَى أَجَلٍ -
আমরা রাসূলে করীম (স)-এর সঙ্গে যুদ্ধযাত্রা করতাম। এ সময় আমাদের স্ত্রীরা আমাদের সঙ্গে থাকত না। তখন আমরা বললাম, আমরা কি 'খাসি' হয়ে যাব? কিন্তু নবী করীম (স) আমাদের সে কাজ করতে নিষেধ করলেন এবং কোন নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে কাপড় ইত্যাদির বিনিময়ে বিয়ে করার অনুমতি দিলেন। (বুখারী, মুসলিম)
এভাবে এ সাময়িক বিয়ের অনুমতি হয়, (আরবী) ভাষায় একেই বলা হয় 'মুতয়া' বিয়ে। আর তা হয় দুর্বল ও শক্তিশালী ঈমানদার উভয় শ্রেণীর মুসলমানের সাময়িক কষ্ট ও সমস্যা দূর করার উদ্দেশ্যে। ইসলাম মুসলমানদের বিবাহিত ও দাম্পত্য জীবনের জন্যে শরীয়তের যে বিধান চালু করতে চেয়েছিল, এটা ছিল সেই দিকেরই একটি পদক্ষেপ। ইসলামের লক্ষ্য ছিল এমন এক বৈবাহিক ও দাম্পত্য জীবন-বিধান উপস্থাপন, যা বিয়ের সকল উদ্দেশ্যকেই বাস্তবায়িত করবে। আর তা হচ্ছে চরিত্রের পবিত্রতা, সতীত্ব রক্ষা, বিবাহিত জীবনের স্থায়ীত্ব বিধান, বংশ ধারা অব্যাহত রাখা, প্রেম-প্রীতি-ভালবাসা ও পারিবারিক জীবনের পরিধি বৈবাহিক সম্পর্কের সূত্রে প্রশস্ততর করা।
কুরআন যেমন করে মদ্যপান ও সুদ হারাম করায় ক্রমিক পদ্ধতি অবলম্বন করেছে- জাহিলিয়াতের যুগে এ দুটো সর্বত্র ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে ছিল-জ্বেনা হারাম করা ও লজ্জাস্থানের মর্যাদা রক্ষার ক্ষেত্রেও অনুরূপভাবে ক্রমিক নিয়ম অবলম্বন করেছে। তাই প্রথম দিকে প্রয়োজনের দৃষ্টিতে 'মুতয়া' বিয়ের অনুমতি দিয়েছেন। পরে এ ধরনের বিয়েকে নবী করীম (স) সম্পূর্ণ হারাম ঘোষণা করেছেন। হযরত আলী ও বহু সাহাবীর সূত্রে এ পর্যায়ে হাদীস বর্ণিত হয়েছে। হযরত মাবুরাতা আল-জুহানী থেকে বর্ণিত হয়েছে ও
انَّهُ غَزَا مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمْ فِي فَتْحِ مَكَّةَ فَأَذِنَ لَهُمْ فِي مُتْعَة النِّسَاءِ قَالَ فَلَمْ يَخْرُجُ حَتَّى حَرَّمَهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ -
তিনি নবী করীম (স)-এর সঙ্গে মক্কা বিজয় অভিযানে গমন করেছিলেন। এ সময় তিনি তাদের অনুমতি দিয়েছিলেন মুতয়া পন্থায় স্ত্রী গ্রহণের। তিনি আরও বলেন: কিন্তু নবী করীম (স) মক্কা থেকে বের হয়ে আসার পূর্বেই তা হারাম করে দেন।
তাঁরই বর্ণিত অপর এশটি হাদীসের ভাষা হচ্ছে:
وَإِنَّ اللَّهَ حَرَّمَ ذَلِكَ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ
আর আল্লাহ্ তা'আলা এ বিয়েকে কিয়ামত পর্যন্ত সময়ের জন্যে হারাম করে দিয়েছেন।
এক্ষণে প্রশ্ন উঠেছে, এই হারাম ঘোষণা কি এখনও কার্যকর, এখনও তা অব্যাহত হয়ে আছে, যেমন মা, কন্যা বিয়ে করা চিরকালের তরে হারাম কিংবা এই হারাম করণটা কি মৃত জীব, রক্ত ও শূকর গোশত হারাম হওয়ার মতো?...... তাহলে প্রয়োজন দেখা দিলেও জ্বেনার মধ্যে পড়ার আশংকা তীব্র হলে তখন এরূপ বিয়ে মুবাহ হয়ে যাবে?
সাধারণভাবে সমস্ত সাহাবী সমাজ এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ এক মত যে, 'মুতয়া' বিয়ে চিরতরে ও চূড়ান্তভাবে হারাম, পূর্বের সেই হারাম ঘোষণা এখনও পূর্ণ মাত্রায় কার্যকর ও অব্যাহত ও অপরিবর্তিত হয়ে আছে। শরীয়ত চূড়ান্ত রূপ লাভ করেছে বলে এক্ষণে তাতে এ ধরনের বিয়ের কোন অবকাশ থাকতে পারে না।
অবশ্য হযরত ইবনে আব্বাস (রা) ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, উত্তরকালেও প্রয়োজনের কারণে তা জায়েয ও মুবাহ। একজন লোক তাঁর কাছে 'মুতয়া' নিয়মে স্ত্রী গ্রহণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি তাকে অনুমতি দিয়েছিলেন। তাঁর গোলাম তাঁকে জিজ্ঞেস করল: খুব শক্ত ও কঠিন ঠেকার সময়ই কি তা জায়েয? ইবনে আব্বাস (রা) বললেনঃ হ্যা।
পরবর্তীকালে তিনি নিজেই যখন জানতে পারলেন যে, লোকেরা এক্ষেত্রে বেশ বাড়াবাড়ি শুরু করেছে এবং প্রয়োজন ছাড়াও এই পন্থা অবলম্বন করছে, তখন তিনি তাঁর এই মত প্রত্যাহার করেন এবং এর সমর্থনে ফতওয়া দেয়াও বন্ধ করে দেন। (زاد المعارج ع ص ٧)

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 একসঙ্গে একাধিক স্ত্রী গ্রহণ

📄 একসঙ্গে একাধিক স্ত্রী গ্রহণ


ইসলাম প্রকৃতির সাথে পুরামাত্রায় সামঞ্জস্যশীল দ্বীন। বাস্তবতার সাথে মুকাবিলা করার যোগ্যতাসম্পন্ন এক পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। তা যেমন অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি থেকে মানুষকে বিরত রাখে, তেমনি প্রয়োজনের তুলনায় কোন অসম্পূর্ণতা অক্ষমতাই তাতে নেই। একসঙ্গে একাধিক স্ত্রী রাখার অনুমতি তাতে রয়েছে দেখে আমরা একথার বাস্তব প্রমাণ পাই। কেননা তা বহু মানবিক, ব্যক্তিগত ও সামাজিক গুরুতর প্রয়োজনে একসঙ্গে একাধিক স্ত্রী রাখার অনুমতি দিয়েছে মুসলমানকে।
ইসলামের পূর্বে বিভিন্ন জাতি ও ধর্মানুসারী জনগোষ্ঠীর মধ্যে বহু সংখ্যক মেয়েলোককে এক-এক ব্যক্তির স্ত্রীত্বে গ্রহণ করার ব্যাপক প্রচলন ছিল। কোন কোন সময় তাদের সংখ্যা দশজনকেও ছাড়িয়ে যেত, একশ দুশ তিনশ পর্যন্তও পৌঁছে যেত এবং তাতে কোনরূপ শর্ত আরোপ করা হতো না, থাকত না কোনরূপ বাধা-বন্ধন। কিন্তু দ্বীন-ইসলাম এসে এই একাধিক স্ত্রী গ্রহণের ক্ষেত্রে বিশেষ নিয়ম, শর্ত ও নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করেছে।
প্রথম নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে, ইসলাম একসঙ্গে ও এক সময়ে চারজন স্ত্রী গ্রহণের শেষ সীমা নির্ধারিত করেছে। গাইলান আস মাকাফী নামক এক ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করে। তখন তার স্ত্রীত্বে দশজন মেয়েলোক ছিল। নবী করীম (স) তাকে বললেনঃ
اختر منهن أربعا وفارق سائرهن -
তুমি এদের মধ্যে থেকে চারজন গ্রহণ কর। আর অবশিষ্টদের বিচ্ছিন্ন করে দাও। (শাফেয়ী, আহমদ, তিরমিযী)
অনুরূপভাবে ইসলাম গ্রহণকালে যার আটজন বা পাঁচজন স্ত্রী থাকত তাকেও রাসূলে করীম (স) চারজনের অধিক রাখতে নিষেধ করে দিলেন।
তবে নবী করীম (স)-এর নিজের এক সঙ্গে নয়জন স্ত্রী রাখার ব্যাপারটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ধরনের। আল্লাহ্ তা'আলা তাঁকে দাওয়াতী কাজের প্রয়োজন এবং তাঁর অন্তর্ধানের পর মুসলিম উম্মতের প্রয়োজনের দিকে লক্ষ্য রেখে এরূপ করার বিশেষ অনুমতি দিয়েছিলেন।

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 একসঙ্গে একাধিক স্ত্রী গ্রহণের শর্ত—সুবিচার

📄 একসঙ্গে একাধিক স্ত্রী গ্রহণের শর্ত—সুবিচার


একসঙ্গে একধিক স্ত্রী গ্রহণের অনুমতি ইসলাম দিয়েছে এ শর্তে যে, ব্যক্তির নিজের দৃঢ় প্রত্যয় থাকতে হবে যে, সে তাঁর স্ত্রীদের মধ্যে পূর্ণ সুবিচার রক্ষা করতে পারবে। খাওয়া-পরা-রাত যাপন করা ও ব্যয়ভার বহনের দিক দিয়ে। যে লোক পূর্ণ সুবিচার ভারসাম্য ও সমতার মাঝে এ সব অধিকার যথাযথভাবে আদায় করতে পারবে বলে নিজের সম্পর্কে দৃঢ় প্রত্যয়ের অধিকারী নয়, তার পক্ষে একাধিক স্ত্রী গ্রহণ সম্পূর্ণ হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। আল্লাহ্ তা'আলার বাণী:
فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً -
যদি তোমরা সেই সুবিচার করতে পারবে না বলে ভয় পাও তাহলে মাত্র একজন স্ত্রী গ্রহণ করবে। (النساء 3)
আর নবী করীম (স) বলেছেন:
مَنْ كَانَتْ لَهُ امْرَأَتَانِ يَمِيلُ لِاِحْدَاهُمَا عَلَى الْأَخْرِى جَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَجُرُّ أَحَدَ شَقَّيْه سَاقِطًا أَوْمَئِلًا -
যে লোকের দুজন স্ত্রী এবং সে তাদের মধ্যে একজনকে অপরজনের ওপর অগ্রাধিকার দেয়, সে কিয়ামতের দিন তার পড়ে যাওয়া বা ঝুঁকে পড়া এক পার্শ্ব টানতে টানতে উপস্থিত হবে। (اهل السنن)
এ হাদীসে দুজনের একজনের প্রতি ঝুঁকে পড়া সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে। এই ঝুঁকে পড়ার অর্থ অপরজনের ন্যায্য অধিকার হরণ করা, তার প্রতি অবিচার করা। নিছক মনের ঝোঁকে কোন গুনাহ্ নয়। কেননা মনের টান বা ঝোঁক এমন একটা ব্যাপার, যার ওপর কারো ইচ্ছামূলক কোন ক্ষমতা নেই। আর সেজন্যে আল্লাহ্ তা'আলা এ ব্যাপারে কাউকে পাকড়াও করেন না এবং এই ত্রুটি ধর্তব্যের মধ্যে গণ্য হবে না। আল্লাহ্ নিজেই বলেছেন:
وَلَنْ تَسْتَطِيعُوا أَنْ تَعْدِلُوا بَيْنَ النِّسَاء وَلَوْ حَرَصْتُمْ فَلَا تَمِيلُوا كُلِّ الْمَيْلِ -
তোমরা শত চাইলেও তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে (আদর্শ স্থানীয় ও পূর্ণ মাত্রায়) সুবিচার ও ভারসাম্য রক্ষা করতে সক্ষম হবে না। কাজেই কোন একজনের প্রতি পূর্ণ মাত্রায় ঝুঁকে পড়া পরিহার করে চল। (النساء ١٢٩)
এ কারণেই নবী করীম (স) সব কিছু বন্টন করতেন ও তাতে সুবিচার করতেন তাঁর বেগমদের মধ্যে এবং সেই সঙ্গে বলতেন:
اللهم هذا قِسْمِي فِيمَا أَمْلِكُ - فَلَاتُوا خَذْنِي فِيمَا تَمْلِكُ وَلَا أَمْلِكُ -
হে আল্লাহ্ আমি আমার সাধ্যমত সুবিচারপূর্ণ বন্টন করলাম। তাই আমার সাধ্যের অতীত ও তোমার ক্ষমতাভুক্ত যে ইনসাফ তা করতে না পারার দরুন আমাকে তুমি পাকড়াও করো না।
এই সাধ্যের অতীত বলে বুঝিয়েছেন: মনের ঝোঁক ও টান কেবলমাত্র বিশেষভাবে একজনের প্রতি মনের মাত্রাতিরিক্ত টান- প্রেম-ভালবাসা থাকা কিছুমাত্র অস্বাভাবিক নয়। এ ব্যাপারে মানুষ অনেক সময় অক্ষম হয়ে যায়, হয় একান্তই অসহায়।
নবী করীম (স) যখন বিদেশ সফরে ইচ্ছা করতেন, তখন স্ত্রীদের মধ্যে যাঁর নাম কুরআনে'র মাধ্যমে জানা যেত, তাকেই সঙ্গে নিয়ে রওয়ানা হতেন।

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 একাধিক স্ত্রী গ্রহণের অনুমতির যৌক্তিকতা

📄 একাধিক স্ত্রী গ্রহণের অনুমতির যৌক্তিকতা


বস্তুত ইসলাম আল্লাহ্ তা'আলার সর্বশেষ দ্বীন, সর্বশেষ নবী ও রাসূলের মাধ্যমে অবতীর্ণ জীবন বিধান। তা এক চিরন্তন ও সর্বসাধারণ্যে প্রযোজ্য শরীয়ত উপস্থাপিত করেছে। মানব জীবনের সকল দিক ও বিভাগ সম্পর্কিত আইন-বিধান তাতে বিদ্যমান। সর্বকালে, সর্বযুগে ও সর্বদেশে তা প্রয়োগযোগ্য ও নিশ্চিত কার্যকর। প্রতিটি মানুষই তার জীবন-সমস্যার সমাধান তা থেকে লাভ করতে পারে। তাতে নগরবাসীর জন্যে বিধান রয়েছে, গ্রাম বা প্রান্তরবাসীর জন্যে নয় কিংবা শীতপ্রধান দেশের লোকদের জন্যে বিধান রয়েছে, গ্রীষ্মপ্রধান দেশের লোকদের প্রয়োজনাবলীর প্রতি ভ্রূক্ষেপ করা হয়নি- এ শরীয়ত তেমন নয়। অথবা এরূপও নয় যে, তাতে এককালের এক বংশের লোকদের প্রয়োজন পূরণ করা হয়েছে, অপর কোন কালের বা বংশের লোকেরা তা থেকে বিধান লাভ করতে পারে না।
বস্তুত তা যেমন ব্যক্তিদের প্রয়োজন পূরণ করে, তেমনি করে সমাজ ও সমষ্টিরত্ত। নির্বিশেষে সমগ্র মানুষের কল্যাণের সুষ্ঠু ব্যবস্থা তাতে রয়েছে।
লোকদের বিচিত্র অবস্থা লক্ষণীয়। কেউ তার বংশের ধারা অব্যাহত রাখতে ইচ্ছুক; কিন্তু তার স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও তার একটিও সন্তান নেই। তার কারণ বন্ধ্যাত্ব রোগ কিংবা অন্য যা-ই হোক না কেন। এরূপ অবস্থায় সে স্ত্রীর জন্যে কি সম্মানজনক এবং সে ব্যক্তির জন্যে উত্তম পন্থা এ নয় যে, সে লোকটি তার প্রথম স্ত্রীকে নিজের সঙ্গে রেখে এবং তার প্রাপ্য যাবতীয় অধিকার যথাযথভাবে আদায় করতে থেকে আর একজন স্ত্রী গ্রহণ করবে, যেন তার সন্তান লাভের স্বাভাবিক কামনা-বাসনা পূর্ণ হতে পারে।
কোন কোন মানুষের যৌন শক্তি খুব প্রবল ও প্রচণ্ড হতে পারে। যৌন আবেগ ও উত্তেজনা তার জন্যে অদম্য হতে পারে। কিন্তু স্ত্রী সেদিক দিয়ে অনাসক্তা বা অনাগ্রহী অথবা অক্ষম কিংবা হতে পারে সে চিররুগ্না, স্বামীর দাবি পূরণে অসমর্থ। স্ত্রীর ঋতুকাল দীর্ঘতর হতে পারে, আর তার স্বামী সেজন্য দীর্ঘদিন ধৈর্য ধারণ করে থাকতে অক্ষম। এরূপ অবস্থায় কোন বালিকা বন্ধু (girl friend) গ্রহণ করার পরিবর্তে শরীয়তসম্মতভাবে আর একটি বিয়ে করা কি তার জন্যে শোভন নয়?
অনেক সময় দেশে পুরুষদের তুলনায় মেয়েদের সংখ্যা অনেক বেশি হয়ে থাকে। বিশেষ করে জাতীয় যুদ্ধে যখন যুবকরা দলে দলে প্রাণ দান করে, তখন তো বহু মেয়েই স্বামীহারা হয়ে জীবন কাটাতে বাধ্য হয়। কেননা তাদের বিয়ে করার মতো পুরুষ খুঁজে পাওয়া যায় না। অনুরূপ অবস্থায় সমাজের সার্বিক কল্যাণ এবং বিশেষ করে নারী সমাজের কল্যাণ এতেই হতে পারে যে, তারা দাম্পত্য জীবন বঞ্চিত ও কুমারী বৃদ্ধা হয়ে থাকার পরিবর্তে 'সতীন' হয়ে থাকাকে অগ্রাধিকার দেবে। তার ফলে তারা স্ত্রীত্বের মর্যাদা ও স্বামীর প্রেম-ভালবাসা, মানসিক প্রশান্তি ও নৈতিক পবিত্রতা সহকারে জীবন অতিবাহিত করার সুযোগ লাভ করতে পারবে। হতে পারবে সন্তানের মা। এরূপ জীবনধারাই তো প্রকৃতপক্ষে তাদের প্রকৃতির প্রতিধ্বনি।
পুরুষ সংখ্যার তুলনায় অধিক সংখ্যক বিবাহক্ষম নারীদের নিম্নোক্ত তিনটি অবস্থার মধ্যে যে কোন একটি দেখা দেয়া অনিবার্য:
- হয় তারা জীবনভর বঞ্চনার তিক্ত বিষ পান করতে থাকবে ও এভাবেই গোটা জীবন অতিবাহিত করবে;
- অথবা তারা মুক্ত-স্বাধীন স্বেচ্ছাচারী হয়ে পুরুষদের খেলার পুতুল ও লালসার ইন্ধন হয়ে জীবন নিঃশেষ করবে;
- কিংবা ব্যয়ভার বহনে সক্ষম ও শুভ আচরণ গ্রহণে আগ্রহী বিবাহিত পুরুষদের সাথে তাদের বিয়ে হওয়াকে বৈধ মনে করা হবে।
অনাসক্ত ও সুবিবেচকদের দৃষ্টিতে বিচার করলে নিঃসন্দেহে বোঝা যাবে যে, এ শেষোক্ত অবস্থাই সুবিচার ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান। সামাজিক শৃঙ্খলা ও নৈতিক স্বাস্থ্যের দৃষ্টিতেও এ ব্যবস্থাই উত্তম। আর ইসলাম এ সমাধানই পেশ করেছে মানবীয় এ জটিল সমস্যাটির। আল্লাহ্ সত্যই বলেছেন:
وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ حُكْمًا لِقَوْمٍ يُقِنُونَ -
আল্লাহ্র প্রতি দৃঢ় প্রত্যয়শীল লোকদের জন্যে আল্লাহ্ দেয়া বিধানের তুলনায় উত্তম বিধান আর কে দিতে পারে? (সূরা মায়িদা: ৫০)
ইসলামে একসঙ্গে একাধিক স্ত্রী গ্রহণের অনুমতির মৌল তত্ত্ব ও প্রসঙ্গ কথা এ-ই। অথচ পাশ্চাত্য খ্রিস্টান পাদ্রীরা এটা নিয়েই মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটিয়ে পৃথিবীব্যাপী ঝড় তুলেছে। কিন্তু তাদের নিজেদের অবস্থা হচ্ছে এই যে, তারা পুরুষদের জন্যে অসংখ্য প্রেমিক-বান্ধবী-রক্ষিতা রাখার অবাধ সুযোগ ও অনুমতি দিয়েছে এবং তাতে কোনরূপ আইন বা নৈতিকতার নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করেনি। এহেন নৈতিকতা ও ধর্মবিবর্জিত কার্যক্রমের ফল তারা লাভ করছে অসংখ্য অবৈধ অনাথ সন্তান রূপে। এর দরুন যে সামাজিক কলুষতার সৃষ্টি হয়েছে, তা অকথ্য ও দুরপনেয়। এ মহাসত্যের আলোকে কোন্ বিধানটি অধিকতর মানবিক ও কল্যাণকর পাশ্চাত্য না ইসলামের, তা অবশ্য গুরুত্ব সহকারে বিবেচ্য।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00