📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 মুশরিক নারী

📄 মুশরিক নারী


১৬. মুশরিক নারী বিয়ে করাও হারাম। আর মুশরিক নারী তারা যারা মূর্তি পূজা করে। প্রাচীন আরব ও ভারতীয় হিন্দু মুশরিকগণ এ পর্যায়ে গণ্য। আল্লাহ্ তা'আলা স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন:
وَلَا تَنْكِحُوا الْمُشْرِكَاتِ حَتَّى يُؤْمِنُ ، وَلَا مَةٌ مُؤْمِنَةٌ خَيْرٌ مِنْ مُّشْرِكَةٍ وَلَوْ أَعْجَبَتْكُمْ ، وَلَا تُنْكِحُوا الْمُشْرِكِينَ حَتَّى يُؤْمِنُوا وَلَعَبْدٌ مُؤْمِنٌ خَيْرٌ مِنْ مُشْرِكَ وَلَوْ أَعْجَبَكُم أَو لَئِكَ يَدْعُونَ إِلَى النَّارِ وَاللَّهُ يَدْعُوا إِلَى الْجَنَّةِ والمغفرة باذنه -
মুশরিক নারী তাওহীদী ঈমান গ্রহণ না করা পর্যন্ত তাদের বিয়ে করবে না। জেনে রাখ, ঈমানদার দাসীও মুশরিক নারীর তুলনায় অনেক ভাল, সে তোমার যতই পছন্দ ও মনলোভা হোক। তোমরা মুশরিকদের কাছে নিজেদের মেয়ে বিয়ে দেবে না, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনবে। কেননা একজন ঈমানদার দাসও মুশরিকের তুলনায় অনেক ভাল, সে তোমাদের যতই পছন্দ হোক। ওরা জাহান্নামের দিকে ডাকে আর আল্লাহ্ জান্নাত ও ক্ষমার দিকে ডাকেন তাঁর অনুমতিক্রমে। (البقرة 221)
এ আয়াত স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছে যে, কোন মুসলমানের পক্ষে মুশরিক নারী বিয়ে করা জায়েয নয়। মুসলিম নারীর পক্ষেও জায়েয নয় মুশরিক পুরুষ বিয়ে করা। কেননা তওহীদী দ্বীন ও মুশরিকী ধর্মের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান। ঈমানদার লোক তো জান্নাতের দিকে মানুষকে নিয়ে যায় আর মুশরিকরা নিয়ে যায় জাহান্নামে। ওরা ঈমানদার এক আল্লাহ্, রাসূল, নবুওয়্যত, পরকালের প্রতি। আর এরা আল্লাহর সঙ্গে শিরক করে, নবুওয়্যত অস্বীকার করে এবং পরকালকে করে অবিশ্বাস।
অথচ বিয়ে হচ্ছে মনের শান্তি, স্থিতি ও বন্ধুতা সম্প্রীতির ব্যাপার। কাজেই তাতে এ দুটি পরস্পর বিরোধী ভাবধারা একত্র সমাবেশ অসম্ভব।

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 আহলি কিতাব নারী

📄 আহলি কিতাব নারী


কুরআন মজীদ ইয়াহূদ ও খ্রিস্টান এই দুই আহলি কিতাব সম্প্রদায়ের মেয়ে বিয়ে করার অনুমতি মুসলমানকে দিয়েছে। তাদের সাথে বিশেষ আচরণ গ্রহণ করারও নির্দেশ রয়েছে। তারা যদিও নিজেদের দ্বীনের অনেক কিছুই রদ-বদল করে ফেলেছে, তবুও তারা যে আসমানী দ্বীনের অনুসারী তা অবশ্যই মানতে হবে। তাই তাদের যবাই করা জন্তু খাওয়া যেমন মুবাহ করেছে তেমনি তাদের মেয়ে বিয়ে করাও জায়েয ঘোষণা করছে। আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেছেন:
وطعام الذينَ أُوتُوا الْكِتَابَ حِلُّ لَّكُمْ - وَطَعَامُكُمْ حِلٌّ لَّهُمْ والمُحصنت منَ الْمُؤْمِنَت والمُحْصَنَتُ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الكتاب مِنْ قَبْلِكُمْ إِذَا أَتَيْتُمُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ مُحْصِنِينَ غَيْرَ مُسَا فَحِيْنَ وَلَا مُتَّخِذِي اخْدَانٍ -
আহলি কিতাবের খাদ্য তোমাদের জন্যে হালাল, তোমাদের খাদ্য তাদের জন্যে হালাল। আর পবিত্র চরিত্র ও সতীত্ব সম্পন্ন মুমিন স্ত্রীলোক এবং তোমাদের পূর্বে কিতাব পাওয়া পবিত্র চরিত্র ও সতীত্ব সম্পন্ন স্ত্রী লোকও যদি তোমরা তাদের মোহরানা আদায় করে দাও, পবিত্রতা রক্ষাকারী হিসেবে, জেনাকার হিসেবে নয় এবং বন্ধুতার সূত্র গ্রহণকারী হিসেবেও নয়। (المائدة ٥)
অবশ্য এটা ইসলামের উদার নীতিসমূহের মধ্যে একটা বিশেষ দিক। দুনিয়ার অন্যান্য জাতি ও ধর্মসমূহে এর দৃষ্টান্ত খুব কমই পাওয়া যায়। এসব আহলি কিতাবকে কুফর ও গুমরাহ বলা সত্ত্বেও এসব ধর্মাবলম্বী নারী নিজ নিজ ধর্মে অবিচল থেকেও মুসলমানের স্ত্রী ও তার ঘরের রানী হতে পারে বলে ইসলাম ঘোষণা করেছে। তারা হতে পারে মুসলিম ব্যক্তির মনের সান্ত্বনা, তার গোপনীতার সাক্ষী এবং তার সন্তানের মা। ইসলাম তার অনুমতি দিয়েছে, এমতাবস্থায়ও যখন ইসলামে স্ত্রীত্বের সম্পর্ক ও তার গোপন তত্ত্ব পর্যায়ে কুরআন বলেছে:
وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ موَدَّةً وَرَحْمَةً.
আল্লাহ্ একটি নিদর্শন হচ্ছে, তিনি তোমাদের জন্যে তোমাদেরই মধ্যে স্ত্রী বানিয়ে দিয়েছেন, যেন তোমরা তাদের কাছে সান্ত্বনা লাভ করতে পার এবং তোমাদের মধ্যে বন্ধুতা-ভালবাসা ও দয়া-সহানুভূতি সৃষ্টি করেছেন। (الروم 12)
এ পর্যায়ে একটি বিষয়ে সতর্ক করে দিয়ে একান্তই অপরিহার্য। একজন দ্বীনদার- দ্বীনের প্রতি ঐকান্তিক নিষ্ঠা ও আকর্ষণ সম্পন্ন মুসলিম মহিলা কেবলমাত্র বংশানুক্রমিক মুসলিম মহিলার তুলনায় অনেক উত্তম। রাসূলে করীম (স) আমাদের এ কথা শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন:
أظْفَرُ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ -
দ্বীনদার নারীকে বিয়ে কর, সেই তোমার সাফল্যের কারণ হবে। (তা না করা হলে) তোমাদের হাত মাটি-মিশ্রিত হোক। (بخاری)
এ থেকে জানা গেল যে, যে কোন আহলি কিতাব নারীর তুলনায় যে কোন মুসলিম নারী মুসলিম পুরুষের জন্যে স্ত্রীরূপে উত্তম হতে পারে।
তাছাড়া এ ধরনের স্ত্রী গ্রহণ করা হলে তার সন্তানের ওপর তার আকীদা-বিশ্বাসের প্রভাব পড়বে এবং তাদেরও বিভ্রান্ত করবে- এ আশংকা যখন তীব্র ও নিশ্চিত, তখন দ্বীন রক্ষার উদ্দেশ্যেই এসব আশংকা থেকে রক্ষা পাওয়া ও এ ধরনের স্ত্রী গ্রহণ না করাই বাঞ্ছনীয়।
এতদ্ব্যতীত কোন দেশে যদি মুসলমানদের সংখ্যা কম থাকে, তাহলে, এরূপ অবস্থায় মুসলিম পুরুষদের আহলি কিতাব স্ত্রী গ্রহণ সম্পূর্ণ হারাম হওয়া উচিত। কেননা তখন মুসলিম পুরুষরা যদি মুসলিম মেয়েদের বাদ দিয়ে আহলি কিতাব মেয়ে বিয়ে করে, তাহলে মুসলিম নারীদের বিয়ে হওয়া সম্ভব হবে না এবং তার ফলে তারা চরমভাবে দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়বে। কেননা তাদের বিয়ে তো অমুসলিম পুরুষদের সাথে হতে পারে না, তা জায়েয নয় বলে। তখন ওদের কেউ বিয়ে করার থাকবে না। এরূপ অবস্থা মুসলিম সমাজের পক্ষে খুবই মারাত্মক হয়ে দেখা দেবে। তাই আহলি কিতাব মেয়ে বিয়ে করা মুসলিম পুরুষের জন্যে জায়েয হলেও এরূপ অবস্থায় তার অবকাশ না রাখাই উক্ত বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার একমাত্র উপায় বলে বিবেচিত।

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 অমুসলিম পুরুষের সাথে মুসলিম নারীর বিয়ে

📄 অমুসলিম পুরুষের সাথে মুসলিম নারীর বিয়ে


মুসলিম নারীকে অমুসলিম পুরুষের কাছে বিয়ে দেয়া সম্পূর্ণ রূপে হারাম, সে অমুসলিম আহলি কিতাব হোক কি অন্য কেউ। মুসলিম নারীর জন্যে তা কোন অবস্থায়ই জায়েয নয়। এ পর্যায়ে কুরআনী হুকুম পূর্বেও উদ্ধৃত হয়েছে। হুকুমটি এই:
وَلَا تُنْكِحُو الْمُشْرِكِينَ حَتَّى يُؤْمِنُوا -
তোমরা তোমাদের মেয়ে মুশরিকদের কাছে বিয়ে দেবে না, যতক্ষণ না তারা ঈমান গ্রহণ করবে। (البقرة 221)
হিজরত করে আসা মুমিন নারীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে:
فَإِنْ عَلِمْتُمُوهُنَّ مُؤْمِنَةً فَلَا تُرْجِعُوا هُنَّ إِلَى الْكُفَّارِ لَاهُنَّ حِلٌّ لَّهُمْ وَلَا هُمْ يُحِلُّونَ لَهُنَّ .
হিজরত করে আসা মহিলাদের তোমরা যদি মুমিন বলে জান, তাহলে তাদের কাফিরদের কাছে ফেরত পাঠিয়ে দিও না। কেননা এরা তাদের জন্যে হালাল নয়, তারাও হালাল নয় এদের জন্যে। (الممتحنة 10)
এখানে আহলি কিতাবদের বাদ দিয়ে একথা বলা হয়নি। কাজেই মুসলিম মহিলাদের কাফির মুশরিক-অমুসলিম পুরুষদের কাছে বিয়ে দেয়া হারাম হওয়ার ব্যাপারে কোন ভিন্নমতের অবকাশ নেই।
ইসলামে ইয়াহুদী-খ্রিস্টান মেয়ে বিয়ে করা জায়েয করা হয়েছে, কিন্তু মুসলিম নারীকে তাদের কাছে বিয়ে দেয়া হারাম করা হয়েছে, তার মূলে যুক্তি সঙ্গত কারণ রয়েছে। কেননা পুরুষই হয় ঘরের পরিবারের কর্তা ও নারীর ওপর কর্তৃত্বসম্পন্ন। সে-ই সব বিষয়ে প্রত্যক্ষভাবে দায়ী। উপরন্তু ইসলাম আহলি কিতাব স্ত্রীকে তার আকীদা-বিশ্বাসের পূর্ণ স্বাধীনতার অধিকার দিয়েছে। শরীয়তের আইন বিধানের সাহায্যে তার অধিকার সম্পর্কের সংরক্ষণও করেছে। তার মান-মর্যাদা রক্ষারও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। কিন্তু ইয়াহুদী খ্রিস্টান (বা হিন্দু) ধর্ম অপর কোন ধর্মাবলম্বী স্ত্রীর কোনরূপ অধিকার মর্যাদা বা স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়নি। তার অধিকার রক্ষা করা হবে বলে কোন প্রতিশ্রুতিও পাওয়া যায় নি। এরূপ অবস্থায় ইসলাম কোন মুসলিম নারীকে অমুসলিম পুরুষের কাছে বিয়ে দেয়ার অনুমতি দিয়ে তাকে এই কঠিন বিপদে কি করে ঠেলে দিতে পারে? এই মুসলিম নারীর দ্বীনী আকীদা ও চরিত্র সংরক্ষণে নিশ্চয়তা দেয় না এমন পুরুষের কাছে তাদের সমর্পণ করার নীতি গ্রহণ করা- কিছুতেই সম্ভবপর নয়।
মূলত স্বামীর উচিত স্ত্রীর ধর্ম বিশ্বাস ও চরিত্রকে সম্মান ও মর্যাদা দেয়া। দুজনের মধ্যে উত্তম সম্পর্ক এরূপ করা হলেই রক্ষা পেতে পারে। মুসলমানরা তো ইয়াহুদী খ্রিস্টানদের- তাদের আকীদা-বিশ্বাসের অনেক মৌলিক পরিবর্তন সাধিত হওয়া সত্ত্বেও আসমানী ধর্মে বিশ্বাসী বলে মনে করে। তওরাত ও ইনজীল আল্লাহ্র কিতাব বলে মানে। হযরত মূসা ও ঈসা (আ) আল্লাহ্র মহান নবী ও রাসূল ছিলেন বলেও বিশ্বাস করে। এ কারণে কোন আহলি কিতাব নারীর পক্ষে একজন মুসলিমের স্ত্রী হয়ে স্বধর্মে স্থিত হয়ে জীবন যাপন করা ও শান্তি-সুখে থাকা খুবই সম্ভবপর। কেননা সেই স্বামী তো তার (স্ত্রীর) আমল, দ্বীন, কিতাব ও নবীকে মান্য করে। শুধু তাই নয়, তাকে সত্য সঠিক না মানলে মুসলিমানের ঈমানই শুদ্ধ ও সঠিক হয় না বলেও সে জানে। কিন্তু ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদের আচরণ সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা ইসলামকে আদৌ স্বীকৃতি দেয় না। ইসলামের কিতাব এবং তার রাসূলকেও তারা মানে না। তাহলে একজন ইসলামে বিশ্বাসী নারী কি করে এরূপ স্বামীর স্ত্রীত্বে সুখে-শান্তিতে জীবন যাপন করতে পারে? কেননা সে তো দ্বীন ও ইসলামী ইবাদত-বন্দেগী পালন করবে এবং ইসলামের মান-মর্যাদা, তার রীতি-নীতির বাস্তবতা রক্ষা করতে চেষ্টিত হবে। শরীয়তের হারাম থেকে নিজেকে রক্ষা করবে এবং কর্তব্যগুলো পালন করবে। কিন্তু এরূপ স্বামীর অধীন থেকে তা কার্যত সম্ভবপর হবে না। কেননা তাকে তো তার অমুসলিম স্বামীর কর্তৃত্ব মেনে চলতে হবে।
এ আলোকেই মুসলিম পুরুষের জন্যে মূর্তি পূজারী মুশরিক নারী বিয়ে করাকে ইসলামে হারাম ঘোষণা করার যৌক্তিকতা বুঝতে পারা যায়। কেননা ইসলাম শিরক ও মূর্তি পূজার সম্পূর্ণ বিরোধী, তা পূর্ণমাত্রায় অস্বীকারকারী। ফলে এ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কাম্য পরম প্রীতি ও বন্ধুতা ভালবাসা গড়ে উঠা ও স্থায়ী হওয়া সম্ভব নয়।

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 ব্যভিচারে অভ্যস্ত নারী

📄 ব্যভিচারে অভ্যস্ত নারী


ব্যভিচারে অভ্যস্ত ও বেশ্যাবৃত্তিতে লিপ্ত ও প্রকাশ্যভাবে এ পেশা অবলম্বনকারী নারী বিয়ে করা কোন ঈমানদার মুসলমানের জন্যে জায়েয নয়। হযরত মুরসাদ ইবনে আবুল মুরসাদ (রা) নবী করীম (স)-এর কাছে এমন একটি বেশ্যাকে বিয়ে করার অনুমতি চেয়েছিলেন যার সাথে জাহিলিয়াতের যুগে তাঁর সম্পর্ক ছিল। এ মেয়েটির নাম ছিল 'ইনাক'। এ কথা শুনে নবী করীম (স) তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। এ সময় কুরআনের আয়াত নাযিল হল:
الزَّانِي لَا يَنْكِحُ إِلَّا زَانِيَةً أَوْ مُشْرِكَةً وَالزَّانِيَةُ لَا يَنْكِحُهَا إِلَّا زَانٍ أَوْ مُشْرِكْ ۚ وَحُرِّمَ ذَلِكَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ
ব্যভিচারকারী পুরুষ ব্যভিচারকারী বা মুশরিক নারী ছাড়া আর কাউকে বিয়ে করবে না এবং ব্যভিচারী নারীকে ব্যভিচারকারী বা মুশরিক পুরুষ ছাড়া আর কেউ বিয়ে করবে না, ঈমানদার লোকদের জন্যে এরা হারাম। (النور 3)
নবী করীম (স) সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে আয়াতটি পাঠ করে শোনালেন এবং তাঁকে বললেন: لا ينكحها না, তুমি তাকে বিয়ে করবে না।
তার কারণ হচ্ছে, আল্লাহ্ তা'আলা ঈমানদার পুরুষদের জন্যে ঈমানদার সচ্চরিত্র সম্পন্ন নারীদের এবং আহলি কিতাব সমাজের অনুরূপ ধরনের মেয়েদের বিয়ে করা জায়েয করে দিয়েছেন। আর তা জায়েয করা হয়েছে এই শর্তে যে, তারা মু’মিন হবে এবং ব্যভিচারী হবে না।
কাজেই যে লোক আল্লাহ্ কিতাবের এ নির্দেশ অমান্য করবে, তা পালন করতে প্রস্তুত হবে না, সে তো মুশরিক। তাকে বিয়ে করতে তারই মতো আর একজন মুশরিক পুরুষই রাজি হতে পারে, কোন মুমিন তা পারে না। আর যে ব্যক্তি এ হুকুম মানল, কবুল করল, কিন্তু তা সত্ত্বেও তার বিপরীত আমল করতে গিয়ে যে বিয়ে হারাম করা হয়েছে, তা করতে প্রস্তুত হলো, সে তো ব্যভিচারী হয়ে গেল।
সূরা নূর-এর উপরিউক্ত আয়াতটি উক্ত সূরার অপর একটি আয়াতের পরে উদ্ধৃত হয়েছে। সে পূর্ববর্তী আয়াতটিতে ব্যভিচারের দণ্ডের উল্লেখ করে বলা হয়েছে:
الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا مِائَةُ جَلْدَةٍ -
ব্যভিচারকারী নারী ও পুরুষ উভয়কেই এবং প্রত্যেককেই একটি করে চাবুক মার। (النور 2)
এ হচ্ছে ব্যভিচারের দৈহিক দণ্ড। আর উপরে যা বলা হয়েছে তা হচ্ছে ব্যভিচারের নৈতিক ও প্রশিক্ষণমূলক দণ্ড। কেননা ব্যভিচারী নারী বা পুরুষ বিয়ে করা হারাম করে দেয়ার মূল লক্ষ্যই হচ্ছে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাসম্পন্ন স্থানে অবস্থান করতে না দেয়া, তার জাতীয়তা অস্বীকার করা। আর বর্তমান প্রচলিত কথানুযায়ী তার অধিকারসমূহ হরণ করা- তা থেকে তাকে বঞ্চিত রাখা।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম পূর্বোক্ত আয়াতটির ব্যাখ্যাদানের পর লিখেছেন:
কুরআনের এ হুকুমটি যেমন সুস্পষ্ট ও অবশ্য পালনীয়, তেমনি তা বিবেক-বুদ্ধি ও প্রকৃতিসম্মতও। আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর বান্দাদের জন্যে কোন চরিত্রহীন নারীর স্বামী, দয়ূস বা বন্ধু-সঙ্গী হতে সম্পূর্ণ হারাম করে দিয়েছেন। আল্লাহ্ তা'আলা মানুষকে যে প্রকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন, তা-ই এরূপ কাজকে অত্যন্ত জঘন্য, দোষযুক্ত ও বীভৎস জ্ঞান করে। এ কারণেই কোন ব্যক্তিকে খুব বেশি গাল-মন্দ করতে হলে বলা হয়ঃ 'ফাহেশা স্ত্রীর স্বামী'। এ জন্যে বাস্তবিকই এরূপ হওয়া মুসলমানের জন্যে আল্লাহ্ তা'আলা হারাম করে দিয়েছেন। এ হারাম ঘোষণায় এ কথাও স্পষ্ট হয়ে গেল যে, স্ত্রীর এ পাপ স্বামীর শয্যা ও বংশকেও চরমভাবে বিপর্যস্ত করে দেবে অথচ আল্লাহ্ তা'আলা বংশধারা পরম পবিত্র ও কল্যাণময় ভিত্তির ওপর সংস্থাপিত করতে চান। এটাকে তাঁর একটি বিশেষ নিয়ম বলেও ঘোষণা করেছেন। কিন্তু জ্বেনা শুক্রকীটের সংমিশ্রণের পথ করে দেয়, বংশ সন্দেহপূর্ণ হয়ে যায়। এ জন্যে শরীয়তের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তা ব্যভিচারী নারীকে বিয়ে করা হারাম করে দিয়েছে। তবে তওবা করলে ও নিজের গর্ভধারা পবিত্র করে নিলে (অনন্ত এক হায়েয কাল অপেক্ষা করলে) ভিন্ন কথা (অর্থাৎ তখন বিয়ে করা জায়েয)। (اغاثة اللهفان ج اص ٦٦-٦٧)
ব্যভিচারিণীকে বিয়ে করা হারাম হওয়ার আর একটি কারণ হচ্ছে, ব্যভিচারী নারী অত্যন্ত 'খবীস' হয়ে থাকে। অথচ আল্লাহ তা'আলা বিষয়টিকে একটা বন্ধুতা- ভালবাসা-সম্প্রীতির পবিত্র বন্ধন বানিয়েছেন। বন্ধুতা প্রকৃত ভালবাসা। কোন 'খবীস' মেয়ে পবিত্র চরিত্রের পুরুষের প্রিয়তমা স্ত্রী হতে পারে না। স্বামীকে আরবী ভাষায় বলা হয় زوج 'যাওজুন'। এ শব্দটি ازدواج 'ইযদিওয়াজ' থেকে নির্গত। আর তার অর্থ সাদৃশ্য সামঞ্জস্য সম্পন্ন হয়ে থাকে সর্বদিক দিয়ে। কিন্তু 'খবীস' ও 'পবিত্র' এ দুয়ের মাঝে পূর্ণ মাত্রায় ঘৃণ্য ও বিতৃষ্ণার ভাব প্রকট হয়ে থাকা অবধারিত। শরীয়তের দৃষ্টিতে, সাধারণ মূল্যবোধের বিচারেও, ফলে এ দুজনের মধ্যে কাম্য পারস্পরিক আন্তরিকতা ও সুগভীর প্রেম প্রণয়ন ভালবাসা ও মিলমিশ হওয়া সম্ভব নয়। তাই আল্লাহ্ তা'আলা সত্যই বলেছেন:
الْخَبِيثَاتُ لِلْخَبِيثِينَ وَالْخَبِيثُونَ لِلْخَبِيثَاتِ وَالطَّيِّبَتُ لِلطَّيِّبِينَ وَالطَّيِّبُونَ للطيبة -
খবীস নারী খবীস পুরুষদের জন্যে এবং খবীস পুরুষ খবীস নারীদের জন্যে। আর পবিত্র চরিত্রা নারী পবিত্র চরিত্র পুরুষদের জন্যে এবং পবিত্র চরিত্র পুরুষ পবিত্র চরিত্রা নারীদের জন্যে। (সূরা নূর: ২৬)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00