📄 বৈবাহিক সম্পর্কের দরুন বিয়ে হারাম
১১. স্ত্রীর মা— অর্থাৎ শাশুড়ী। তাকে বিয়ে করাও হারাম। কোন নারীর কন্যা বিয়ে করলেই সেই নারী তার জন্যে হারাম হয়ে যাবে—সে কন্যার সাথে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কার্যকর হোক আর নাই হোক, কেননা শাশুড়ি মা'র সমান।
১২. পালিতা কন্যা- অর্থাৎ যে স্ত্রীর সাথে স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক কার্যকর হয়েছে, তার কন্যা স্বামীর জন্যে হারাম। যদি সে সম্পর্ক বাস্তবভাবে কার্যকর না হয়ে থাকে, তাহলে তার কন্যা বিয়ে করায় কোন দোষ নেই।
১৩. স্বীয় ঔরসজাত পুত্রের স্ত্রী। পালিত পুত্রের স্ত্রী হারাম নয়। কেননা ইসলামে কোন ছেলেকে লালন-পালন করলেও সে আপন ঔরসজাত ছেলে হয়ে যায় না। জাহিলিয়াতের যুগে এ ব্যবস্থা কার্যকর ছিল, কিন্তু ইসলাম তা বাতিল করে দিয়েছে। কেননা তাতে বাস্তব ও প্রকৃত অবস্থাকে অস্বীকার করা হয়। তাতে হালালকে হারাম ও হারামকে হালাল গণ্য করা হয়। আল্লাহ্ তা'আলা বলেছেন:
وَمَا جَعَلَ أَدْعِيَاءَكُمْ أَبْنَاءَ كُمْ ، ذَلِكُمْ قَوْلُكُمْ بَأَفْوَاهِكُمْ -
তোমাদের মুখ ডাকা পুত্রকে প্রকৃত পুত্র বানিয়ে দেয়া হয়নি। কেননা তাতো শুধু তোমাদের মুখের কথা মাত্র। (সূরা আহযাব: ৪) আর শুধু মুখের কথায় প্রকৃত ও বাস্তব কখনও পরিবর্তিত হয়ে যায় না। পর আপন হয়ে যায় না।
এ তিনজনের সাথে বিয়ের সম্পর্ক স্থাপন হারাম বৈবাহিকতার কারণে। বৈবাহিকতার দরুন যে আত্মীয়তা গড়ে উঠে, তাতে এ বিবাহ হারাম হওয়া একান্তই বাঞ্ছনীয়।
📄 দুই বোনকে একসঙ্গে স্ত্রী বানান
১৪. দুই বোনকে একসঙ্গে স্ত্রীরূপে গ্রহণ হারাম। জাহিলিয়াতের যুগে এরূপ করার ব্যাপক প্রচলন ছিল। কিন্তু ইসলাম তা হারাম করে দিয়েছে। তার কারণ, দুই বোনের পারস্পরিক আপনত্বের সম্পর্ক এরূপ অবস্থায় টিকে থাকতে পারে না। অথচ ইসলামের লক্ষ্য হচ্ছে এ সম্পর্ককে অটুটু ও অপরিবর্তিত রাখা। কিন্তু দুই বোন যখন সতীন হয়ে দাঁড়াবে, তখন এই সম্পর্ক শেষ হয়ে যাবে, দু'জন দু'জনার শত্রুতে পরিণত হবে অতি স্বাভাবিকভাবেই।
কুরআন মজীদে দুই বোনকে এক সঙ্গে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করাকে স্পষ্ট ভাষায় হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। রাসূলে করীম (স) অতিরিক্ত এই নির্দেশ দিয়েছেনঃ
لَا يَجْمَعُ بَيْنَ الْمَرْأَةِ وَعَمْتِهَا وَلَا بَيْنَ الْمَرْأَةِ وَخَالَتِهَا .
একটি মেয়ে ও তার ফুফু এবং একটি মেয়ে ও তার খালাকে এক সঙ্গে স্ত্রী বানান যাবে না। (বুখারী, মুসলিম)
তিনি আরও বলেছেন:
إِنَّكُمْ إِنْ فَعَلْتُمْ ذَلِكَ قَطَعْتُمْ أَرْحَامَكُمْ -
তোমরা যদি এরূপ কাজ কর তাহলে তোমরা নিকটাত্মীয়তার সম্পর্ককে ছিন্ন করার অপরাধ করবে। (ইবনে হিব্বান)
অথচ ইসলাম এই নিকটাত্মীয়তার সম্পর্ক (صله رحمی) কে অটুটু রাখতে বদ্ধপরিকর। তাহলে তাতে এমন কাজ কি করে জায়েয হতে পারে, যা এই পরিণতির সৃষ্টি করে?
📄 পরস্ত্রী
১৫. যেসব মেয়ে কোন পুরুষের স্ত্রী হয়ে আছে এই অবস্থায় অপর কোন স্বামী গ্রহণ করা তাদের জন্যে সম্পূর্ণ হারাম।
এরূপ একজন স্ত্রীলোককে অন্য কোন পুরুষের পক্ষে বিয়ে করা জায়েয হতে পারে কেবলমাত্র দুটি অবস্থায়:
ক. তার বর্তমান স্বামী হয় মরে যাবে কিংবা তালাক দেবে এবং এভাবে তার স্বামীত্ব অপমৃত্যু ও নিঃশেষ হয়ে যাবে।
খ. অতঃপর স্ত্রীলোকটির জন্যে আল্লাহ্ তা'আলা যে ইদ্দতের মেয়াদ নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, তা পূর্ণ হবে এবং পূর্ববর্তী স্বামীর প্রতি তার কর্তব্য পালিত হয়ে যাবে, তার জন্যে সংরক্ষণের ব্যবস্থা কায়েম হবে। স্ত্রীলোক গর্ভবতী হলে তার সন্তান প্রসবেই এই মেয়াদ সমাপ্ত হয়ে যাবে। সেই মেয়াদ সংক্ষিপ্ত হোক কি দীর্ঘ।
যে স্ত্রীর স্বামী মরে গেছে, তার জন্যে ইদ্দতের এ মেয়াদ হচ্ছে চার মাস দশ দিন।
আর তালাক প্রাপ্তা হলে তার ইদ্দতের মেয়াদ তিন হায়েয। তার গর্ভে কোন সন্তান নেই সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার জন্যে এ মেয়াদ একান্তই জরুরী। কেননা প্রাক্তন স্বামীর কাছ থেকে তার গর্ভে সন্তান থাকার আশংকা তো রয়েছেই। কাজেই দুই ধারার বংশের সংমিশ্রণ বন্ধের জন্যে এ ইদ্দত পালন অপরিহার্য।
তবে স্ত্রী যদি অল্প বয়স্কা বা হায়েয বন্ধ হয়ে যাওয়া বৃদ্ধা হয়, তাহলে তাদের ইদ্দত হচ্ছে মাত্র তিন মাস। আল্লহ্ তা'আলা ইরশাদ করেছেন:
وَالمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنْفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوءٍ ، وَلَا يَحِلُّ لَهُنَّ أَنْ يُكْتُمْنَ مَا خَلَقَ اللَّهُ فِي أَرْحَامِهِنَّ إِنْ كُنْ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ -
তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীরা তিন হায়েয শুকিয়ে যাওয়ার মেয়াদ পর্যন্ত নিজেদের বিরত রাখবে। তাদের গর্ভে আল্লাহ্ যা সৃষ্টি করেছেন তাকে গোপন করা তাদের জন্যে জায়েয নয় যদি তারা আল্লাহ্ ও পরকালের প্রতি ঈমানদার হয়ে থাকে। (সূরা বাকারা : ২২৮)
বলেছেন:
واللَّئِي يَئِسْنَ مِنَ الْمَحِيضِ مِنْ نِسَاءَكُمْ إِنِ ارْتَبْتُمْ فَعِدْتُهُنَّ ثَلَاثَةَ أَشْهُرٍ وَاللَّنِي لَمْ يَحِضْنَ ، وَأُولَاتُ الْأَحْمَالِ أَجَلُهُنَّ أَنْ يُضَعْنَ حَمْلَهُنَّ
তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যাদের হায়েয হওয়ার আশা নেই তাদের সম্পর্কে তোমাদের মনে সন্দেহ হলে তারা তিন মাস পর্যন্ত ইদ্দত পালন করবে। তাদেরও ইদ্দত এ মেয়াদ যাদের হায়েয বন্ধ হয়েছে এবং গর্ভবতী স্ত্রীদের ইদ্দত হচ্ছে গর্ভ প্রসব। (الطلاق : 4)
আরও বলেছেন:
وَالَّذِينَ يُتَوَ فُوْنَ مِنْكُمْ وَيَذَرُونَ أَزْوَاجًا يَتَرَ بُصْنَ بِأَنْفُسِهِنَّ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَعَشْرًا -
তোমাদের মধ্য থেকে যারা মরে যায় ও স্ত্রী রেখে যায়, সেই স্ত্রীরা চার মাস দশদিন ইদ্দত পালনে রত থাকবে। (সূরা বাকারা : ২৩৪)
উপরিউল্লিখিত পনের প্রকারের নারীদের বিয়ে করা ইসলামে হারাম। কুরআন মজীদের সূরা আন-নিসা'র তিনটি আয়াতে তা একসঙ্গে ঘোষণা করা হয়েছে। সেই আয়াত তিনটি এই:
وَلَا تَنْكِحُوا مَا نَكَحَ أَبْؤُكُمْ مِنَ النِّسَاءِ إِلَّا مَا قَدْ سَلَفَ ، إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَمَعْنَا وَسَاءَ سَبِيلًا - حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ أُمَّهُتُكُمْ وَبَنْتُكُمْ وَأَخَوَاتُكُمْ وَعَمَّا تُكُمْ وَخْتُكُمْ وَبَنَاتُ الْآخِ وَبَنَاتُ الْأُخْتِ وَأُمَّهَاتُكُمُ اللَّتِي أَرْضَعْنَكُمْ وَأَخَو تُكُمْ مِنَ الرَّضَاعَةِ وَأُمَّهَتُ نِسَاءَكُمْ وَرَبَّائِبُكُمُلاتِي فِي حُجُورِكُمْ مِنْ نِسَاءَكُمُ الَّتِي دَخَلْتُمْ بِهِنَّ فَإِنْ لَّمْ تَكُوْ نُوا دَخَلْتُمْ بِهِنَّ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ وَحَلَائِلُ أَبْنَائِكُمُ الَّذِينَ مِنْ أَصْلَا بِكُمْ ، وَأَنْ تَجْمَعُوا بَيْنَ الْأَخْتَيْنِ إِلَّا مَا قَدْ سَلَفَ ، إِنَّ اللَّهَ كَانَ غَفُورًا رَّحِيمًا - وَالْمُحْصَنَتُ مِنَ النِّسَاءِ
তোমাদের পিতা যে মেয়েলোক বিয়ে করেছে, তোমরা তাদের বিয়ে করো না। তার পূর্বে যা হয়ে গেছে, (তা বাদে) এটা সুস্পষ্ট নির্লজ্জতা, অত্যন্ত পাপ ও খুবই খারাপ পন্থা, সন্দেহ নেই। তোমাদের প্রতি হারাম করা হয়েছে, তোমাদের মা'দের। তোমাদের কন্যাদের, বোনদের, তোমাদের ফুফুদের, তোমাদের খালাদের, তোমাদের ভাইঝিদের, তোমাদের ভাগ্নীদের এবং তেমাদের সেসব মা, যারা তোমাদের দুধ পান করিয়েছে, আর তোমাদের দুধ-বোনদের এবং তোমাদের স্ত্রীদের মা'দের (শাশুড়ীদের), আর তোমাদের স্ত্রীদের কন্যাদের, যারা তোমাদের স্ত্রীদের কোলে লালিত এবং তোমাদের সে সব স্ত্রীদের গর্ভজাত যাদের সাথে তোমাদের স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে। যদি স্বামী-সম্পর্ক স্থাপিত না হয়ে থাকে, তাহলে তাদের কন্যাদের বিয়ে করায় কোন দোষ হবে না এবং তোমাদের ঔরসজাত পুত্রদের স্ত্রীদের। আর তোমাদের দুই বোনকে এক সঙ্গে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করবে (তা-ও নিষিদ্ধ) তবে পূর্বে যা হয়ে গেছে, তার কথা নয়। নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, দয়াবান। সে সব স্ত্রীলোকও হারাম যারা বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ রয়েছে ........। (সূরা আন্-নিসা: ২২-২৪)
📄 মুশরিক নারী
১৬. মুশরিক নারী বিয়ে করাও হারাম। আর মুশরিক নারী তারা যারা মূর্তি পূজা করে। প্রাচীন আরব ও ভারতীয় হিন্দু মুশরিকগণ এ পর্যায়ে গণ্য। আল্লাহ্ তা'আলা স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন:
وَلَا تَنْكِحُوا الْمُشْرِكَاتِ حَتَّى يُؤْمِنُ ، وَلَا مَةٌ مُؤْمِنَةٌ خَيْرٌ مِنْ مُّشْرِكَةٍ وَلَوْ أَعْجَبَتْكُمْ ، وَلَا تُنْكِحُوا الْمُشْرِكِينَ حَتَّى يُؤْمِنُوا وَلَعَبْدٌ مُؤْمِنٌ خَيْرٌ مِنْ مُشْرِكَ وَلَوْ أَعْجَبَكُم أَو لَئِكَ يَدْعُونَ إِلَى النَّارِ وَاللَّهُ يَدْعُوا إِلَى الْجَنَّةِ والمغفرة باذنه -
মুশরিক নারী তাওহীদী ঈমান গ্রহণ না করা পর্যন্ত তাদের বিয়ে করবে না। জেনে রাখ, ঈমানদার দাসীও মুশরিক নারীর তুলনায় অনেক ভাল, সে তোমার যতই পছন্দ ও মনলোভা হোক। তোমরা মুশরিকদের কাছে নিজেদের মেয়ে বিয়ে দেবে না, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনবে। কেননা একজন ঈমানদার দাসও মুশরিকের তুলনায় অনেক ভাল, সে তোমাদের যতই পছন্দ হোক। ওরা জাহান্নামের দিকে ডাকে আর আল্লাহ্ জান্নাত ও ক্ষমার দিকে ডাকেন তাঁর অনুমতিক্রমে। (البقرة 221)
এ আয়াত স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছে যে, কোন মুসলমানের পক্ষে মুশরিক নারী বিয়ে করা জায়েয নয়। মুসলিম নারীর পক্ষেও জায়েয নয় মুশরিক পুরুষ বিয়ে করা। কেননা তওহীদী দ্বীন ও মুশরিকী ধর্মের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান। ঈমানদার লোক তো জান্নাতের দিকে মানুষকে নিয়ে যায় আর মুশরিকরা নিয়ে যায় জাহান্নামে। ওরা ঈমানদার এক আল্লাহ্, রাসূল, নবুওয়্যত, পরকালের প্রতি। আর এরা আল্লাহর সঙ্গে শিরক করে, নবুওয়্যত অস্বীকার করে এবং পরকালকে করে অবিশ্বাস।
অথচ বিয়ে হচ্ছে মনের শান্তি, স্থিতি ও বন্ধুতা সম্প্রীতির ব্যাপার। কাজেই তাতে এ দুটি পরস্পর বিরোধী ভাবধারা একত্র সমাবেশ অসম্ভব।