📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 বিয়ের পয়গাম দেয়ার হারাম পন্থা

📄 বিয়ের পয়গাম দেয়ার হারাম পন্থা


তালাকপ্রাপ্তা বা স্বামী-মরা স্ত্রীলোককে তার ইদ্দতের মধ্যে- ইদ্দত শেষ হওয়ার পূর্বেই নতুন করে বিয়ের প্রস্তাব যে কোন মুসলমানের জন্যেই জায়েয নয়। কেননা ইদ্দতটা তো প্রাক্তন বিয়ের প্রতি সম্মান দেখানর উদ্দেশ্যে পালিত হয়ে থাকে। কাজেই এ ব্যাপারে কোনরূপ বাড়াবাড়ি করা কারো পক্ষেই জায়েয নয়। তবে স্বামী মরা স্ত্রীলোকটি ইদ্দত শেষে তার সাথে বিয়ে করতে আগ্রহী কিনা তা ইশারা-ইঙ্গিতে জানাবার জন্যে ইদ্দত পালনকালেই চেষ্টা করতে পারে কিন্তু প্রকাশ্যে ও স্পষ্ট ভাষায় নয়। আল্লাহ্ তা'আলা বলেছেন:
لَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ فِيْمَا عَرَّضْتُمْ بِهِ مِنْ خِطْبَةِ النِّسَاءِ -
বিয়ের পয়গাম সম্পর্কে ইশারা-ইঙ্গিতে বলা হলে তাতে তোমাদের গুনাহ হবে না।
বিয়ের একটি প্রস্তাব সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার পূর্বেই তার ওপর আর একটি বিয়ের প্রস্তাব দেয়া জায়েয নয়- যদি প্রথম প্রস্তাবের কথাবার্তা সাফল্যের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। কেননা প্রথম প্রস্তাবদাতার প্রস্তাব সম্পর্কে একটা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হোক, এটা তার অধিকার। এ অধিকার অবশ্যই পূরণ হতে হবে। লোকদের পারস্পরিক সম্পর্ক রক্ষা ও অসৌজন্যমূলক আচরণ পরিহার করে চলার জন্যেই এরূপ করা জরুরী। অন্যথায়, প্রথম প্রস্তাবদাতার অধিকার হরণ করা হবে। আর তা নিশ্চয়ই বাড়াবাড়িমূলক কার্যক্রম। কিন্তু প্রথম প্রস্তাবদাতা নিজেই যদি ইচ্ছা ত্যাগ বা প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নেয় অথবা নিজেই অপরকে প্রস্তাব দেয়ার অনুমতি দিয়ে দেয়, তাহলে দ্বিতীয় কারো পক্ষে প্রস্তাব দেয়ায় কোন দোষ নেই। রাসূলে করীম (স) বলেছেনঃ
الْمُؤْمِنُ أَخُو الْمُؤْمِنِ فَلَا يَحِلُّ لِلْمُؤْمِنِ أَنْ يُبْتَاعَ عَلَى بَيْعِ أَخِيهِ وَلَا يَنْطَتْ على خطبة أخيه -
একজন মুমিন অপর মুমিনের ভাই। কাজেই অপর ভাইয়ের ক্রয়ের ওপর ক্রয় করা এবং অপর ভাইয়ের বিয়ের প্রস্তাবের ওপর প্রস্তাব পেশ করা জায়েয নয়। (মুসলিম)
নবী করীম (স) আরও বলেছেন:
لَا يَخْطَبُ الرَّجُلُ عَلَى خِطْبَةِ الرَّجُلِ حَتَّى يَتْرُكَ الْخَاطِبُ قَبْلَهُ أَوْيَاذَنَ لَهُ -
একজনের বিয়ের প্রস্তাব পরিত্যক্ত না হওয়া বা তার ওপর প্রস্তাব দেয়ার অনুমতি না দেয়ার পূর্বে অপর কারো প্রস্তাব দেয়া জায়েয নয়। (বুখারী)

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 কুমারী কন্যার অনুমতি, তার ওপর জোর না করা

📄 কুমারী কন্যার অনুমতি, তার ওপর জোর না করা


যুবতী কুমারী কন্যা তার বিয়ের ব্যাপারে সর্বাধিক গুরুত্ব পাওয়ার অধিকারী। তার মতের প্রতি গুরুত্ব না দেয়া বা তার সম্মতি-অনুমতির প্রতি লক্ষ্য না রাখা তার পিতা বা অভিভাবকের জন্যে মোটেই জায়েয নয়। নবী করীম (স) বলেন:
الطَّيِّبُ أَحَقُّ بِنَفْسِهَا مِنْ وَلِيهَا وَالْبِكْرُ تُسْتَأْذَنُ فِي نَفْسِهَا وَإِذْنُهَا صمَاتُهَا -
পূর্বে স্বামী পাওয়া মেয়ে তার নিজের ব্যাপারে তার অভিভাবকের অপেক্ষা বেশি অধিকার সম্পন্না। আর কুমারী কন্যার কাছ থেকে তার নিজের ব্যাপারে অবশ্যই অনুমতি নিতে হবে। (বুখারী, মুসলিম)
এক যুবতী মেয়ে নবী করীম (স)-এর কাছে উপস্থিত হয়ে জানাল যে, তার পিতা পিতার ভাইর পুত্রের সাথে তাকে বিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এ বিয়ে তার পছন্দ নয়। তখন নবী করীম (স) এ বিষয়ে ফয়সালা করার ইখতিয়ার তাকেই দিলেন। মেয়েটি বলল: আমার পিতা যে আত্মীয়তা করেছে সে তা কার্যকর করেছে কিন্তু আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, আমি নারীকুলকে জানিয়ে দেব যে:
أَنْ لَيْسَ لِلْأَبَاءِ مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٌ -
মেয়েদের ব্যাপারে বাপদের কিছু করার ইখতিয়ার নেই। (ইবনে মাযাহ)
মেয়ের জন্যে দ্বীনদার চরিত্রবান সমমানের ছেলের কাছ থেকে বিয়ের প্রস্তাব এলে তার বিয়ে বিলম্বিত করার পিতার কোন অধিকার নেই। নবী করীম (স) বলেছেন:
ثَلَاثُ لَا يُؤَخِّرُنَّ الصَّلوةُ إِذَا أَتَتْ وَالْجَنَازَةُ إِذَا حَضَرَتْ وَلَا بِمُ إِذَا وُجِدَتْ لَهَا كُفا -
তিনটি ব্যাপার বিলম্বিত করা জায়েয নয়ঃ নামায- তার সময় হয়ে গেলে, জানাযা- লাশ উপস্থিত হলে এবং বিয়ে-যোগ্য মেয়ের বিয়ে- যদি সমান মানের প্রস্তাব পাওয়া যায়। (তিরমিযী)
তিনি আরও বলেছেনঃ
إِذَا أَتَاكُمْ مَنْ تَرْضُونَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَزَوِّجُوهُ إِلَّا تَفْعَلُوهُ فَكُنْ فِتْنَةٌ فِي الْأَرْضِ وَفَسَادُ كَبِيرٌ -
যার দ্বীনদারী ও চরিত্র তোমাদের পছন্দ মতো হবে, তার কাছে বিয়ে দাও। যদি তা না কর, তাহলে পৃথিবীতে চরম অশান্তি ও বিরাট বিপর্যয় দেখা দেবে। (তিরমিযী)

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 মুহাররম মেয়েলোক

📄 মুহাররম মেয়েলোক


প্রত্যেক মুসলিম পুরুষের জন্যে নিম্নলিখিত মহিলাদের বিয়ে করা সম্পূর্ণ হারাম।
১. পিতার স্ত্রী- পিতার তালাক দেয়া স্ত্রী হোক কিংবা রেখে মরে গিয়ে থাক, উভয় অবস্থায় একই বিধান। ইসলামের পূর্বে জাহিলিয়াতের যুগে পিতার স্ত্রী বিয়ে করার প্রচলন ছিল। ইসলাম তাকে হারাম ঘোষণা করেছে। কেননা পিতার স্ত্রী তো মা সমতুল্য, পিতার সাথে তার একবার বিয়ে হয়ে যাওয়াই এ হারাম হওয়ার জন্যে যথেষ্ট। কেননা সন্তানের কাছে পিতার মর্যাদা অনেক বড় ও সম্ভ্রমপূর্ণ। পুত্রের জন্যে পিতার স্ত্রী চিরতরে হারাম হওয়ার কারণে তার প্রতি সন্তানের লোভ ও লালসা করাও চূড়ান্তভাবে হারাম হয়ে গেছে। ফলে পুত্র ও পিতার স্ত্রীর মধ্যে সম্মান ও মর্যাদার সম্পর্ক চিরদিনের জন্যে স্থায়ী ও অবিচল-অপরিবর্তিত হয়ে থাকল।
২. মা- গর্ভধারিণী, দাদী-নানীও অনুরূপভাবে হারাম।
৩. কন্যা- পুত্রের কন্যা ও মেয়ের কন্যাও এর মধ্যে শামিল, এভাবে এ তালিকা যতই লম্বা হোক না কেন।
৪. ভগ্নি- আপন হোক কিংবা মার দিক দিয়ে অথবা পিতার দিক দিয়েই হোক।
৫. ফুফু- পিতার বোন, আপন হোক কিংবা অন্য যে রকমই হোক।
৬. খালা- মা'র বোন
৭. ভাইয়ের কন্যা
৮. বোনের কন্যা
ইসলামে এ সব মহিলাদের 'মাহারিম' বা 'মুহাররমাত' বলে অভিহিত করা হয়েছে। কেননা মুসলিম ব্যক্তির জন্যে এরা চিরকালের তরে হারাম। কোন সময় এবং কোন অবস্থাতেই তারা হালাল নয়, এদের বিয়ে করা জায়েয নয়। এ সম্পর্কের দিক দিয়ে পুরুষটিকেও 'মুহাররম' বলা হয়।

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 এসব মেয়ে বিয়ে করা হারাম হওয়ার কারণ

📄 এসব মেয়ে বিয়ে করা হারাম হওয়ার কারণ


ক. সুসভ্য ও সুরুচিসম্পন্ন মানুষের প্রকৃতি স্বীয় মা-বোন-কন্যাকে স্বীয় যৌন লালসা চরিতার্থ করার জন্যে ব্যবহার করতে কখনই রাজি বা প্রস্তুত হতে পারে না। মানুষ তো দূরের কথা, কোন-কোন পশুও তা করতে প্রস্তুত হয় না। খালা ও ফুফুর প্রতিও নিজের গর্ভধারিণী মার মতোই সম্ভ্রম বোধ থাকে, থাকে তেমনি শ্রদ্ধা-ভক্তি। অনুরূপভাবে চাচা এবং মামাও যে কোন নারীর জন্যে পিতার সমতুল্য শ্রদ্ধা-ভক্তিভাজন হয়ে থাকে।
খ. ইসলামী শরীয়তে এসব 'মুহাররমাত' সম্পর্কে অনুরূপ সিদ্ধান্ত না দিলে তাদের প্রতি যৌন লালসাবোধকে চিরতরে হারাম করা না হলে এদের পরস্পরের মধ্যে যৌন সম্পর্ক গড়ে উঠা অসম্ভব ছিল না, কেননা এদের পরস্পরের মধ্যে নিভৃত একাকীত্বে খুব বেশি মেলামেশা হয়ে থাকে স্বাভাবিক পারিবারিক জীবন যাপনের কারণে।
গ. এসব নিকট-আত্মীয়তা সম্পন্ন লোকদের পরস্পরের মধ্যে গভীর আবেগপূর্ণ সম্পর্ক হয়ে থাকে, এ কারণে প্রতিটি মানুষ তাদের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ করে। তাদের প্রতি গভীর-তীব্র সহানুভূতি ও হৃদয়াবেগ অনুভব করে। এ কারণে প্রেম-প্রীতি সহকারে এর বাইরের মহিলাদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনই বাঞ্ছনীয়। এতে করে নতুন আত্মীয়তার সূত্রে আপনজন, আত্মীয়-স্বজনের পরিধি সমাজের মধ্যে অনেক ব্যাপক ও সম্প্রসারিত হয়ে পড়ে এবং ভালবাসা ও সহানুভূতি সম্পর্কের ক্ষেত্রও বিস্তীর্ণ হয়ে যায়। কুরআনে সেদিকে ইঙ্গিত করেই বলা হয়েছে:
وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً -
এবং তোমাদের মধ্যে বন্ধুতা ও ভালবাসার সম্পর্ক সৃষ্টি করে দিয়েছেন। (রুম - ২১)
ঘ. এসব নিকটাত্মীয়তা সম্পন্ন লোকদের পরস্পরের মধ্যে যে স্বাভাবিক আবেগ রয়েছে, তা স্থায়ী হয়ে থাকা একান্তই জরুরী ও অপরিহার্য। তাদের মধ্যে যে স্থায়ী সম্পর্ক রয়েছে তা এ ভাবেই অটুট ও অক্ষয় হয়ে থাকতে পারে, তা পরিপক্কতা লাভ করতে পারে। তাদের ভালবাসা ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রভৃতির জন্যে সুদৃঢ় ভিত্তি রচিত হতে পারে। কিন্তু তার বিপরীত এদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হওয়ার সুযোগ থাকলে এদের পরস্পরের মতদ্বৈততা হিংসা-বিদ্বেষ ও ঝগড়া-ফাসাদ হওয়া ছিল অবধারিত। আর তার ফলে পারিবারিক জীবনে আসত গভীর ভাঙন ও বিরাট বিপর্যয়। পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা ও শত্রুতা এক অনিবার্য পরিণতি হয়ে দেখা দিত।
ঙ. এসব নিকটাত্মীয়তা সম্পন্ন নারী-পুরুষের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক হলে তাদের যে বংশ সৃষ্টি হতো তা সর্বদিক দিয়ে দুর্বল ও অকর্মণ্য হয়ে পড়া খুবই স্বাভাবিক। কোন পরিবারে দৈহিক বা বিবেক-বুদ্ধিগত কোন দুর্বলতা বা ত্রুটি থাকলে তা বংশানুক্রমে সংক্রমিত হয়ে সেই বংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যেত।
চ. প্রত্যেক নারী তার পক্ষ সমর্থনকারী ও তার পক্ষে চেষ্টা-প্রচেষ্টাকারী পুরুষের মুখাপেক্ষী এবং তার ওপর অনেকটা নির্ভরশীল। তার স্বামীর সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটলে এরূপ ব্যক্তির অপরিহার্যতা তীব্র হয়ে উঠে। তখন স্বার্থরক্ষা ও তার পক্ষ সমর্থন করার জন্যে কেউ না থাকলে নারীর অসহায়ত্ব মর্মান্তিক হয়ে পড়ে। কিন্তু তার বিয়ে যদি এসব অতি আপনজনের মধ্যে কারো সাথে হয়ে যায়, তাহলে তার পক্ষে কথা বলার কোন লোক কোথাও পাওয়া যাবে না। কেননা তখন তার আপনজনই তার প্রতিদ্বন্দ্বী বা শত্রু হয়ে দাঁড়াবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00