📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 ইসলামে বৈরাগ্যবাদ নেই

📄 ইসলামে বৈরাগ্যবাদ নেই


ইসলামে যৌন উত্তেজনাকে লাগামমুক্ত ও অবাধ করে দেয়া হয়নি। কেননা তা করে দেয়া হলে তা কোন সীমা বা বাধা-বন্ধন, শর্ত-প্রতিবন্ধকতা মেনে চলতে প্রস্তুত হবে না। এ কারণেই জ্বেনা-ব্যভিচার এবং তৎসংশ্লিষ্ট ও সেদিকে টেনে নেয়ার যাবতীয় কার্যক্রমকেও হারাম করে দেয়া হয়েছে। অপরদিকে এ স্বভাবজাত প্রবণতার সাথে সাংঘর্ষিক ও তাকে সমূলে উৎখাতকারী ভাবধারাকেও ইসলাম একবিন্দু সমর্থন করেনি। এ কারণেই ইসলাম বিবাহ করার উৎসাহ দিয়েছে এবং অবিবাহিত বা চিরকুমার হয়ে থাকা কিংবা নিজেকে নপুংসক বানানোর প্রচণ্ড বিরোধিতা করে। অতএব সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোন মুসলিম পুরুষ বা নারীর বিয়ে না করে থাকা এ উদ্দেশ্যে যে, সে দুনিয়ার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করে আল্লাহর জন্যে উৎসর্গীকৃত থাকতে চায় কিংবা সম্পূর্ণ নির্ঝঞ্ঝাট একমুখিতা নিয়ে আল্লাহ্ ইবাদতে মশগুল হয়ে থাকতে চায়—আদৌ জায়েয নয়। ইসলামে এরূপ মনোভাব বা কর্মনীতির একবিন্দু সমর্থন নেই।
রাসূলে করীম (স)-এর কোন কোন সাহাবীর মধ্যে দুনিয়া ত্যাগের প্রবণতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। কিন্তু নবী করীম (স) যখনই তা টের পেলেন, তখনই ঘোষণা করে দিলেন যে, দুনিয়া ত্যাগ করা ইসলামী জীবনধারা পরিহার ও রাসূলের সুন্নাতকে অগ্রাহ্য করার শামিল। বস্তুত এ এক খ্রিস্টানসূলভ প্রবণতা। রাসূলে করীম (স) এ প্রবণতাকে সম্পূর্ণ ইসলাম বিরোধী বলে ঘোষণা করলেন। আবু কালাবা থেকে বর্ণিত:
أراد أَنَاسٌ مِنْ أَصْحَابِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يُرْفَضُوا الدُّنْيَا وَيَتْرُكُوا النِّسَاءَ وَيَتَرَ هُبُوا فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم فَغَلَّظَ فِيهِمُ الْمَقَالَةَ ثُمَّ قَالَ إِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ بِالشَّدِيدِ - شَدَّدُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ فَشَدَّدَ اللهُ عَلَيْهِ فَأُولَئِكَ بَقَايَاهُمْ فِي الْأَدْيَارِ وَالصَّوَامِعِ فَاعْبُدُ وا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوْ بِهِ وَحَجُّوا وَاعْتَمِرُوا وَاسْتَقِيمُوا يَسْتَقِيمُ بِكُمْ -
কিছু সংখ্যক সাহাবী দুনিয়া ত্যাগ করার, স্ত্রী সংসর্গ বর্জন করার ও বৈরাগ্যবাদ অবলম্বন করার ইচ্ছা গ্রহণ করলেন। কিন্তু নবী করীম (স) এ ব্যাপারটিকে খুব শক্তভাবে ধরলেন। বললেন: তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা দ্বীন পালনে চরম কঠোরতা ও কৃষ্ণ সাধনার নীতি অবলম্বন করে ধ্বংস হয়ে গেছে। তারা নিজেরাই যখন কৃষ্ণতা গ্রহণ করল, তখন আল্লাহ্ও তাদের প্রতি কঠোরতা প্রয়োগ করলেন। এ কালের গির্জা-মঠ ও খানকাসমূহে অবস্থানকারী লোকেরা তাদেরই উত্তরাধিকারী। অতএব তোমরা আল্লাহ্ ইবাদত কর এবং কাউকেই তাঁর শরীক বানিও না। হজ্জ কর, উমরা কর আর সোজা ঋজু পথ অবলম্বন কর, তাহলে তোমাদের সাথে যথাযথ আচরণ করা হবে। (আব্দুর রাজ্জাক ইবনে জরির-ইবনে মুনযির)
এ হাদীসের বর্ণনাকারী বলেন: এ লোকদের সম্পর্কেই নিম্নোদ্ধৃত আয়াতটি নাযিল হয়েছে:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُحَرِّمُوا طَيِّبَاتِ مَا أَحَلَّ اللَّهُ لَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا ، إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ -
হে ঈমানদার লোকেরা! আল্লাহ্ তোমাদের জন্যে যেসব পবিত্র জিনিস হালাল করেছেন, তোমরা তা হারাম কর না। আর সীমালংঘন কর না কেননা আল্লাহ্ সীমালংঘনকারীদের আদৌ ভালবাসেন না। (সূরা মায়িদা: ৮৭)
মুজাহিদ বলেছেন: উসমান ইবনে মজয়ূন ও আবদুল্লাহ্ ইবনে আমর প্রমুখ সাহাবী স্ত্রী সংসর্গমুক্ত জীবন যাপন করার, নিজেদের 'খাসি' বানানর এবং চট বস্ত্র পরিধান করার সংকল্প গ্রহণ করলেন। পূর্বোদ্ধৃত ও তৎপরবর্তী আয়াত এ পর্যায়েই নাযিল হয়েছিল।
একদল সাহাবী নবী করীম (স)-এর ঘরে উপস্থিত হয়ে তাঁর ইবাদত-বন্দেগী সম্পর্কে তাঁর বেগমদের কাছ থেকে জানতে চেষ্টা করতে লাগলেন। তাঁরা যখন যা জানবার জেনে নিলেন, তখন তাঁদের কাছে তা খুবই স্বল্প ও অপর্যাপ্ত মনে হলো। তখন তাঁরা নিজেরাই বলতে লাগলেন:
أَيْنَ نَحْنُ مِنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَقَدْ غَفَرَ اللهُ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ وَمَا تَأَخَّر - فَقَالَ أَحَدُ هُمْ أَمَّا أَنَا فَأَصُومُ الدُّهْرَ فَلَا أَقْطَرُ وَقَالَ الثَّانِي وَأَنَا أَقُومُ اللَّيْلَ فَلَا أَنَامُ وَقَالَ الثَّالِثُ وَأَنَا أَعْتَزِلُ النِّسَاءَ فَلَا أَتَزَوْجُ أَبَداً فَلَمَّا بَلَغَ ذَلِكَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَيْنَ لَهُمْ خَطَايَا هُمْ عَوْجَ طَرِيقِهِمْ وَقَالَ لَهُمْ وَإِنَّمَا أَنَا أَعْلَمُكُمْ بِاللَّهِ وَأَخْشَاكُمْ لَهُ وَلَكِنِّي أَقُومُ وَأَنَا وَأَصُومُ وَأَفْطِرُ وَاتَزَوَّجُ النِّسَاءُ فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنَّي -
রাসূলে করীমের সাথে আমাদের কি তুলনা হতে পারে? আল্লাহ্ই তাঁর আগের ও পরের সব গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন। অতঃপর তাদের একজন বলল: আমি তো সারাটিকাল ধরে রোযা রাখব, রোযা ভঙ্গ করব না। দ্বিতীয় জন বলল: আমি সারারাত জাগ্রত থেকে ইবাদত করব, একটুও ঘুমাব না। তৃতীয় জন বলল: আমি নারী সংসর্গ বর্জন করে চলব, কখনই বিয়ে করব না। পরে নবী করীম (স) যখন এ সংবাদ জানতে পারলেন, তখন তিনি তাঁদের ভুল ধারণা ও তাদের অবলম্বিত নীতির বক্রতা ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিলেন। তিনি বললেন: আল্লাহ্ সম্পর্কে আমি তোমাদের চেয়ে বেশি জানি, তোমাদের আপেক্ষা আমি তাঁকে ভয়ও করি বেশি। তা সত্ত্বেও আমি যেমন রাত জাগরণ করে ইবাদত করি তেমনি ঘুমাইও। আমি রোযাও থাকি, রোযা ভাঙ্গিও, আর স্ত্রী গ্রহণ করে দাম্পত্য জীবনও যাপন করছি। এই হচ্ছে আমার নীতি ও আদর্শ। অতএব যে তা পরিহার করবে, সে আমার উম্মতের মধ্যে গণ্য নয়। (বুখারী)
হযরত সা'দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রা) বলেছেন:
رَدَّ رَسُولُ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى عُثْمَانَ ابْنِ مَظْعُوْنَ التَّبَتُّلَ وَلَوْ أَذِنَ لَهُ لَاخْتَصَيْنَا
উসমান ইবনে মজয়ূন স্ত্রী সংসর্গহীন জীবন গ্রহণ করতে চাইলে রাসূলে করীম (স) তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি যদি তাঁকে অনুমতি দিতেন তাহলে আমরা খাসি করে নপুংসক হয়ে যেতাম। (বুখারী)
এ প্রেক্ষিতেই বিশেষজ্ঞগণ মত দিয়েছেন যে, মুসলিম মাত্রেরই বিয়ে করা ফরয। সাধ-সামর্থ্য থাকা পর্যন্ত তা পরিহার করে চলা মাত্রই জায়েয নয়। অপরদের মতে যে লোক বিয়ে করতে ইচ্ছুক এবং তা না করলে নিজের চরিত্র রক্ষার ব্যাপারে আশংকা বোধ করে তার অবশ্যই বিয়ে করা উচিত।
অভাব-অনটন রিস্কের অপ্রশস্ততা বা দায়িত্ব বোঝা বহনের সাহসহীনতার কারণে বিয়ে না করা কোন মুসলমানেরই শোভা পায় না। বরং তার উচিত আল্লাহর সাহায্য ও অনুগ্রহ লাভের জন্যে প্রাণপণ চেষ্টা করা। কেননা যারা নিজেদের চরিত্রের পবিত্রতা রক্ষার উদ্দেশে বিয়ে করবে, আল্লাহ্ তাদের প্রতি অনুগ্রহ বর্ষণের ওয়াদা করেছেন। আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেছেন:
وَانْكِحُوا الْأَيَامَى مِنْكُمْ وَالصَّالِحِيْنَ مِنْ عِبَادِكُمْ وَإِمَائِكُمْ ، إِنْ يَكُونُو فُقَرَاء يُغْنِيهِمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ .
তোমাদের মধ্যকার অবিবাহিত ব্যক্তিদের এবং তোমদের দাস-দাসীদের মধ্যে যারা সচ্চরিত্র, তাদের বিয়ে দাও। তারা গরীব হলে আল্লাহ্ তাঁর অনুগ্রহ দিয়ে তাদের ধনী বানিয়ে দেবেন। (সূরা নূরঃ ৩২)
রাসূলে করীম (স) বলেছেন:
ثَلَاثَةٌ حَقٌّ عَلَيْهِمْ عَوْنُهُمْ النَّاكِحُ الَّذِي يُرِيدُ الْعَفَافُ وَالْكَاتِبُ الَّذِي يُرِيدُ الْأَدَاءَ وَالْغَزِي فِي سَبِيلِ الله -
তিন ব্যক্তির সাহায্য করা আল্লাহ্‌র দায়িত্ব। তারা হচ্ছে: নিজ চরিত্রের পবিত্রতা রক্ষার উদ্দেশ্যে বিবাহকারী, মনিবের সাথে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে মুক্তির চুক্তিকারী, যদি সে বাস্তবিকই সেই অর্থ দিতে ইচ্ছুক হয় এবং আল্লাহ্‌র পথে যোদ্ধা। (আহমদ, নাসাঈ, তিরমিযী, ইব্‌ন মাজা, হাকিম)

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 প্রস্তাবিত কনেকে দেখা

📄 প্রস্তাবিত কনেকে দেখা


মুসলমান বিয়ে করার সংকল্প গ্রহণ করলে এবং কোন নির্দিষ্ট মেয়েকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিলে বিয়ে অনুষ্ঠানের পূর্বে তাকে প্রস্তাবকারীর দেখা শরীয়তসম্মত বিধান। এ দেখার কাজটা করা হলে সে বুঝে-শুনে সম্মুখে অগ্রসর হতে পারে। চোখ বন্ধ করে এ ধরনের কাজের দিকে অগ্রসর হওয়া কোনক্রমেই উচিত নয়। কেননা তাতে পরে অনুতাপ করার কারণ ঘটতে পারে ও নিজের মনেও হতাশা জাগতে পারে। এ ব্যবস্থাকে কার্যকর করা হলে তার কোন আশংকা থাকার কথা নয়।
বস্তুত : চোখ বা দৃষ্টি মনের প্রতিনিধিত্ব করে। ফলে দুজনের চক্ষুদ্বয়ের মিলনে দুজনের হৃদয়ে মিলন খুবই সম্ভবপর। বিয়ের পূর্বে স্বামী-স্ত্রী (বর-কনের) পরস্পরের সম্প্রীতি ও আন্তরিকতা সৃষ্টি হওয়ার আশা করা যায়, যা দাম্পত্য জীবনের স্থায়িত্বের জন্যে একান্তই অপরিহার্য।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন:
كُنْتُ عِنْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَآتَاهُ رَجُلٌ فَأَخْبَرَهُ إِنَّهُ تُزَوِّجُ امْرَأَةً مِّنَ الْأَنْصَارِ فَقَالَ رَسُولُ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْظُرْتَ الَيْهَا – قَالَ لَا قَالَ فَاذْهَبْ فَانْظُرْ إِلَيْهَا فَإِنَّ فِي أَعْيُنِ الْأَنْسَارِ شَيْئًا
আমি রাসূলে করীম (স)-এর কাছে উপস্থিত ছিলাম। এ সময় সেখানে এক ব্যক্তি এল। সে নবী করীম (স)-কে আনসার বংশের একটি মহিলাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত করেছেন। তখন নবী করীম (স) জিজ্ঞেস করলেন: তুমি কি তাকে দেখেছ? লোকটি বলল: না। তখন নবী করীম (স) বললেন: এখনই যাও এবং তাকে দেখে নাও। কেননা আনসার বংশের মেয়েদের চোখে কিছু একটা (ত্রুটি) থাকে।
হযরত মুগীরা ইবনে শু'বা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি একটি মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। তখন নবী করীম (স) বললেন:
أَنْظُرْ إِلَيْهَا فَإِنَّهُ أُحْرَى أَنْ يُؤْدَمَ بَيْنَكُمَا فَأَتَى أَبَوَيْهَا فَا خُبَرَ هُمَا بِقَوْلِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَكَأَنَّهُمَا كَرِهَا ذَلِكَ فَسَمِعَتْ ذَلِكَ الْمَرْأَةُ وَهِيَ فِي خَدْرِهَا فَقَالَتْ إِنْ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمَرَكَ أَنْ يُنْظُرَ فَانْظُرْ قَالَ الْمُغِيرَةُ فَنَظَرْتُ إِلَيْهَا فَتَزَوَّجْتُهَا
তুমি আগে তাকে দেখ। কেননা এ বিয়ে-পূর্ব দর্শনে তোমাদের মধ্যে মিলমিশ স্থাপিত হওয়ার খুব বেশি সম্ভাবনা আছে। মুগীরা মেয়েটির পিতামাতার কাছে উপস্থিত হলেন এবং নবী করীম (স) যা বলেছেন, তা তাদের জানিয়ে দিলেন। তারা ব্যাপারটিকে খুব ভাল মনে করল না। কিন্তু মেয়েটি নিজেই যখন পর্দার আড়াল থেকে এ কথা শুনতে পেল, তখন বলল, যদি রাসূলে করীম (স)-ই দেখার জন্যে বলে থাকেন, তাহলে দেখে নিন। মুগীরা বললেন: মেয়টির এ কথা শুনে আমি তাকে দেখলাম এবং তাকে বিয়ে করলাম। (আহমদ, ইবনে মাযাহ, তিরমিযী, দারেমী, ইবনে হাব্বান)
প্রস্তাবিত কনেকে কতটা দেখা যেতে পারে, নবী করীম (স) সুস্পষ্ট ভাষায় তার কোন সীমা নির্দিষ্ট করে দেননি। কিছু সংখ্যক বিশেষজ্ঞ বলেছেন: শুধু মুখমণ্ডল ও পাঞ্জাদ্বয় দেখা যেতে পারে। কিন্তু প্রস্তাবিত কনের ব্যাপারে তো এটা কোন বিশেষ ব্যবস্থা নয়, এটা তো অপ্রস্তাবিতা মহিলাকে দেখার ব্যাপারেও কার্যকর। বিয়ের পয়গাম না দেয়া হলেও তা দেখা জায়েয। বিয়ের পয়গাম দেয়া হলে সংশ্লিষ্ট মেয়েকে দেখার অনুমতিই প্রমাণ করে যে, সাধারণ অবস্থায় যতটা দেখা জায়েয, এ অবস্থায় তার চাইতে অনেক বেশি দেখার অনুমতি থাকা আবশ্যক এবং তা জায়েয হওয়া উচিত।
হাদীসে বলা হয়েছে:
اذا خَطَبَ أَحَدُكُمُ الْمَرأَةَ فَقَدَرَ أَنْ يُنْظُرَ مِنْهَا بَعْضٍ مَا يَدْعُوهُ الى نكاحها فَلْيَفْعَلْ - (ابوداؤد )
তোমাদের কেউ যখন কোন মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দেবে তখন সম্ভবপর হলে তার এমন কিছু অংশ তার দেখা উচিত, যা তাকে বিয়ে করতে উদ্বুদ্ধ করবে।
একদিকে কিছু বিশেষজ্ঞের মতে প্রস্তাবিতা কনেকে ভালভাবে দেখার অনুমতি আছে এবং অপরদিকে অপর কিছু আলিম এ ব্যাপারে খুব সংকীর্ণ দৃষ্টি রাখেন। এর মধ্যে মধ্যম মাত্রাই ভাল ও ভারসাম্যপূর্ণ। কিছু সংখ্যক বিশেষজ্ঞ এমত পোষণ করেন যে, বিয়ের প্রস্তাবদাতা পুরুষের পক্ষে প্রস্তাবিতা কনেকে দেখার এরূপ অনুমতি থাকা উচিত যে, মেয়ে যে পোশাকে তার বাপ-ভাই ও মুহাররম পুরুষদের সামনে আসা-যাওয়া করে, ঠিক সেই পোশাকেই তাকে দেখবে। শুধু তাই নয়, প্রস্তাবিতা কনের বুদ্ধি-বিবেচনা ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ গুণাবলীও পর্যবেক্ষণ বা পরীক্ষা করে দেখার জন্যে মেয়ের একজন মুহাররম পুরুষসহ তারা এমন এক স্থানে বসবে, যেখানে মেয়ে সাধারণত যাওয়া-আসা করে। তবে শর্ত এই যে, সেই স্থানটি বৈধ ধরনের হতে হবে এবং প্রস্তাবিতা কনে শরীয়তসম্মত পোশাক পরে থাকবে। এ মতের ভিত্তি হচ্ছে উপরিউক্ত হাদীসের অংশ, যাতে বলা হয়েছেঃ তার এমন কিছু অংশ দেখা উচিত যা তাকে বিয়ে করতে উদ্বুদ্ধ করবে।
প্রস্তাবদাতা পুরুষ প্রস্তাবিতা মেয়েকে তার এবং তার ঘরের লোকদের জানিয়ে রীতিমত আনুষ্ঠানিকভাবেও দেখতে পারে; আর কাউকে কিছু না জানিয়েও দেখতে পারে। তবে বিশেষ পয়গাম দেয়ার ও বিয়ে করার বাস্তব ও দৃঢ় সংকল্প থাকা অনিবার্য শর্ত বিশেষ। হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ্ তাঁর স্ত্রী সম্পর্কে বলেছেন: আমি তাকে দেখার জন্যে গাছের তলায় লুকিয়ে ছিলাম।
হযরত মুগীরা (রা) বর্ণিত উপরোদ্ধৃত হাদীস থেকে জানা গেল, কোন মুসলিম পিতামাতা যদি কোন রসম-রেওয়াজের নামে তাদের কন্যাকে দেখা থেকে এমন ব্যক্তিকে বাধা দেয় বা দেখাতে অস্বীকার করে, যে তাকে সত্যই বিয়ে করতে ইচ্ছুক, তাহলে সেসব রসম-রেওয়াজকে অবশ্যই শরীয়তসম্মত হতে হবে, তার বিপরীত নয়। শরীয়তকে রসম-রেওয়াজ বা প্রথা-প্রচলনের অধীন করে দেয়া তো শরীয়ত লংঘনের শামিল। কিন্তু দেখার এই অনুমতির সুযোগ পেয়ে কোন যুবক ছেলে কোন যুবতীর গলায় হাত দেবে, বিয়ের প্রস্তাবের দোহাই দিয়ে এক সঙ্গে থিয়েটার-সিনেমা, খেলার মাঠ বা হাটে-বাজারে চলে যাবে ও পরিভ্রমণ করবে এবং সঙ্গে কোন মুহাররম পুরুষ থাকবে না, তা করতে দেয়া মা-বাবার পক্ষে জায়েয নয়, প্রস্তাবদাতা পুরুষটির বা প্রস্তাবিতা কনের পক্ষেও এতটা উচ্ছৃঙ্খল হওয়া কোনক্রমেই জায়েয হতে পারে না। অথচ একালের পাশ্চাত্য সভ্যতার দাসানুদাসরা মেয়ে দেখার বা ছেলে দেখার নাম করে এ সব করে বেড়াচ্ছে।
সত্যি কথা হচ্ছে, চরম পন্থা তা ডান দিকে হোক বা বাম দিকে, ইসলামী জীবন ব্যবস্থার সাথে তার কোন সামঞ্জস্যই নেই।

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 বিয়ের পয়গাম দেয়ার হারাম পন্থা

📄 বিয়ের পয়গাম দেয়ার হারাম পন্থা


তালাকপ্রাপ্তা বা স্বামী-মরা স্ত্রীলোককে তার ইদ্দতের মধ্যে- ইদ্দত শেষ হওয়ার পূর্বেই নতুন করে বিয়ের প্রস্তাব যে কোন মুসলমানের জন্যেই জায়েয নয়। কেননা ইদ্দতটা তো প্রাক্তন বিয়ের প্রতি সম্মান দেখানর উদ্দেশ্যে পালিত হয়ে থাকে। কাজেই এ ব্যাপারে কোনরূপ বাড়াবাড়ি করা কারো পক্ষেই জায়েয নয়। তবে স্বামী মরা স্ত্রীলোকটি ইদ্দত শেষে তার সাথে বিয়ে করতে আগ্রহী কিনা তা ইশারা-ইঙ্গিতে জানাবার জন্যে ইদ্দত পালনকালেই চেষ্টা করতে পারে কিন্তু প্রকাশ্যে ও স্পষ্ট ভাষায় নয়। আল্লাহ্ তা'আলা বলেছেন:
لَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ فِيْمَا عَرَّضْتُمْ بِهِ مِنْ خِطْبَةِ النِّسَاءِ -
বিয়ের পয়গাম সম্পর্কে ইশারা-ইঙ্গিতে বলা হলে তাতে তোমাদের গুনাহ হবে না।
বিয়ের একটি প্রস্তাব সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার পূর্বেই তার ওপর আর একটি বিয়ের প্রস্তাব দেয়া জায়েয নয়- যদি প্রথম প্রস্তাবের কথাবার্তা সাফল্যের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। কেননা প্রথম প্রস্তাবদাতার প্রস্তাব সম্পর্কে একটা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হোক, এটা তার অধিকার। এ অধিকার অবশ্যই পূরণ হতে হবে। লোকদের পারস্পরিক সম্পর্ক রক্ষা ও অসৌজন্যমূলক আচরণ পরিহার করে চলার জন্যেই এরূপ করা জরুরী। অন্যথায়, প্রথম প্রস্তাবদাতার অধিকার হরণ করা হবে। আর তা নিশ্চয়ই বাড়াবাড়িমূলক কার্যক্রম। কিন্তু প্রথম প্রস্তাবদাতা নিজেই যদি ইচ্ছা ত্যাগ বা প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নেয় অথবা নিজেই অপরকে প্রস্তাব দেয়ার অনুমতি দিয়ে দেয়, তাহলে দ্বিতীয় কারো পক্ষে প্রস্তাব দেয়ায় কোন দোষ নেই। রাসূলে করীম (স) বলেছেনঃ
الْمُؤْمِنُ أَخُو الْمُؤْمِنِ فَلَا يَحِلُّ لِلْمُؤْمِنِ أَنْ يُبْتَاعَ عَلَى بَيْعِ أَخِيهِ وَلَا يَنْطَتْ على خطبة أخيه -
একজন মুমিন অপর মুমিনের ভাই। কাজেই অপর ভাইয়ের ক্রয়ের ওপর ক্রয় করা এবং অপর ভাইয়ের বিয়ের প্রস্তাবের ওপর প্রস্তাব পেশ করা জায়েয নয়। (মুসলিম)
নবী করীম (স) আরও বলেছেন:
لَا يَخْطَبُ الرَّجُلُ عَلَى خِطْبَةِ الرَّجُلِ حَتَّى يَتْرُكَ الْخَاطِبُ قَبْلَهُ أَوْيَاذَنَ لَهُ -
একজনের বিয়ের প্রস্তাব পরিত্যক্ত না হওয়া বা তার ওপর প্রস্তাব দেয়ার অনুমতি না দেয়ার পূর্বে অপর কারো প্রস্তাব দেয়া জায়েয নয়। (বুখারী)

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 কুমারী কন্যার অনুমতি, তার ওপর জোর না করা

📄 কুমারী কন্যার অনুমতি, তার ওপর জোর না করা


যুবতী কুমারী কন্যা তার বিয়ের ব্যাপারে সর্বাধিক গুরুত্ব পাওয়ার অধিকারী। তার মতের প্রতি গুরুত্ব না দেয়া বা তার সম্মতি-অনুমতির প্রতি লক্ষ্য না রাখা তার পিতা বা অভিভাবকের জন্যে মোটেই জায়েয নয়। নবী করীম (স) বলেন:
الطَّيِّبُ أَحَقُّ بِنَفْسِهَا مِنْ وَلِيهَا وَالْبِكْرُ تُسْتَأْذَنُ فِي نَفْسِهَا وَإِذْنُهَا صمَاتُهَا -
পূর্বে স্বামী পাওয়া মেয়ে তার নিজের ব্যাপারে তার অভিভাবকের অপেক্ষা বেশি অধিকার সম্পন্না। আর কুমারী কন্যার কাছ থেকে তার নিজের ব্যাপারে অবশ্যই অনুমতি নিতে হবে। (বুখারী, মুসলিম)
এক যুবতী মেয়ে নবী করীম (স)-এর কাছে উপস্থিত হয়ে জানাল যে, তার পিতা পিতার ভাইর পুত্রের সাথে তাকে বিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এ বিয়ে তার পছন্দ নয়। তখন নবী করীম (স) এ বিষয়ে ফয়সালা করার ইখতিয়ার তাকেই দিলেন। মেয়েটি বলল: আমার পিতা যে আত্মীয়তা করেছে সে তা কার্যকর করেছে কিন্তু আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, আমি নারীকুলকে জানিয়ে দেব যে:
أَنْ لَيْسَ لِلْأَبَاءِ مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٌ -
মেয়েদের ব্যাপারে বাপদের কিছু করার ইখতিয়ার নেই। (ইবনে মাযাহ)
মেয়ের জন্যে দ্বীনদার চরিত্রবান সমমানের ছেলের কাছ থেকে বিয়ের প্রস্তাব এলে তার বিয়ে বিলম্বিত করার পিতার কোন অধিকার নেই। নবী করীম (স) বলেছেন:
ثَلَاثُ لَا يُؤَخِّرُنَّ الصَّلوةُ إِذَا أَتَتْ وَالْجَنَازَةُ إِذَا حَضَرَتْ وَلَا بِمُ إِذَا وُجِدَتْ لَهَا كُفا -
তিনটি ব্যাপার বিলম্বিত করা জায়েয নয়ঃ নামায- তার সময় হয়ে গেলে, জানাযা- লাশ উপস্থিত হলে এবং বিয়ে-যোগ্য মেয়ের বিয়ে- যদি সমান মানের প্রস্তাব পাওয়া যায়। (তিরমিযী)
তিনি আরও বলেছেনঃ
إِذَا أَتَاكُمْ مَنْ تَرْضُونَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَزَوِّجُوهُ إِلَّا تَفْعَلُوهُ فَكُنْ فِتْنَةٌ فِي الْأَرْضِ وَفَسَادُ كَبِيرٌ -
যার দ্বীনদারী ও চরিত্র তোমাদের পছন্দ মতো হবে, তার কাছে বিয়ে দাও। যদি তা না কর, তাহলে পৃথিবীতে চরম অশান্তি ও বিরাট বিপর্যয় দেখা দেবে। (তিরমিযী)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00