📄 স্ত্রীর স্বামীর মেহমানদের খেদমত করা
এ পর্যন্তকার আলোচনা থেকে একথাও স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, স্বামীর উপস্থিতিতে, তার মেহমানদের খেদমতের কাজ স্ত্রী করতে পারে। তবে সেজন্য শর্ত হচ্ছে- তার পোশাক, সৌন্দর্য-অলংকার ও কথাবার্তা, চালচলন ইত্যাদি ইসলামী নিয়ম-নীতি ও সভ্যতা ভব্যতার অনুকূল হতে হবে। এমতাবস্থায় মেহমান পুরুষ তাকে (স্ত্রীকে) দেখবে এবং সেও দেখবে তাদের, এটা অতি স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু তাতে কোন দোষ হবে না। কেননা এ ক্ষেত্রে কোন পক্ষ থেকেই কোনরূপ সীমালংঘন বা বিপদ সঙ্ঘটিত হওয়ার কোন আশংকা নেই।
হযরত সহল ইবনে সায়াদ আল-আনসারী (রা) বর্ণনা করেছেন:
لَمَا أَعْرَسَ أَبُو أُسَيْدِ السَّاعِدِى دَعَا النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَسْحَابَهُ فَمَا صَنَعَ لَهُمْ طَعَامًا وَلَا قَدِمَ إِلَيْهِمْ إِلَّا امْرَأَتُهُ أَمْ أَسَيْدِ بَلَتْ ثَمَرَاتٍ فِي قَوْرٍ مِّنْ حِجَارَةٍ مِّنَ اللَّيْلِ فَلَمَا فَرَغَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنَ الطَّعَامِ أَمَانَتْهُ لَهُ فَسَقَتْهُ تُنْحِفُهُ بِذَالِكَ .
আবু উসাইদ সায়েদী বিবাহ উপলক্ষে নবী করীম (স) ও তাঁর সাহাবিগণকে আহ্হ্বান করলেন। এ উপলক্ষে রান্না-বান্না করে খাবার প্রস্তুত করা ও তা পেশ করার কাজ তাঁর স্ত্রী উম্মে উসাইদ সম্পন্ন করলেন। পাথরের একটি পাত্রে কিছু খেজুর রাত থেকেই ভিজাবার জন্যে রেখে দিলেন। নবী করীম (স) খাবার খেয়ে নিলে পর তা নিজ হাতে খুলে নবী করীম (স)-এর কাছে তা পান করার জন্যে তোহফা স্বরূপ পেশ করলেন। (বুখারী, মুসলিম)
ইবনে হাজার আল-আসকালানী যেমন বলেছেন, এ হাদীস থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, স্বামীর মেহমান ও নিমন্ত্রিত লোকদের খেদমতের জন্যে স্ত্রীর অগ্রসর হওয়া ও তাদের সামনে উপস্থিত হওয়া সম্পূর্ণ জায়েয। তবে বলাই বাহুল্য যে, তা করা যাবে যদি কোন নৈতিক বিপদের আশঙ্কা না থাকে তবে। এ সময় দেহকে পূর্ণ মাত্রায় আবৃত রাখতে হবে। এরূপ অবস্থায় স্বামীর পক্ষে স্ত্রীর দ্বারা মেহমানদের খেদমত ও খাবার পরিবেশন করার কাজ করান জায়েয। কিন্তু স্ত্রী যদি দেহ আবৃতকরণ পর্যায়ে ইসলামের ধার্য করা নিয়ন্ত্রণ ও বাধ্যবাধকতা রক্ষা না করে- বর্তমানে যেমন প্রায়শ দেখা যায়- তাহলে পুরুষদের সম্মুখে আসা স্ত্রীর জন্যে জায়েয নয়।
📄 প্রকৃতি বিরোধী কাজ কবীরা গুনাহ
যৌন কামনা-বাসনা নিয়ন্ত্রণের ও সংগঠনের যে পন্থা ইসলাম গ্রহণ করেছে, সেই পর্যায়ে একটি জরুরী কথা হচ্ছে, ইসলামে জ্বেনা ও তার উপায় ও কারণসমূহ যেমন হারাম, তেমনি 'লেওয়াতাত' বা 'লুত জাতি'র প্রকৃতি পরিপন্থী কাজকেও সম্পূর্ণ হারাম করে দেয়া হয়েছে।
এ জঘন্য ও বীভৎস কার্য যেমন প্রকৃতি-বিরোধী, কলঙ্ক-কালিমা লেপনকারী, পৌরুষ খর্বকারী, তেমনি নারীর অধিকার হরণের অপরাধও বটে এবং সেজন্যে তা একটা বড় জুলুম।
যে সমাজেই এ জঘন্য কাজের প্রসারতা হবে, সে সমাজের জন-জীবন চরম বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে যাবে। তারা এ কুৎসিত কাজে অভ্যস্ত হয়ে তার দাসে পরিণত হবে। তাছাড়া চরিত্র, সুস্থ রুচি ও পবিত্রতা - সব কিছুই হারিয়ে ফেলবে। এ পর্যায়ে কুরআনে বিধৃত লূত জাতির কিসসাই সঠিক জ্ঞান লাভের জন্যে যথেষ্ট। এ জাতির লোকেরা এহেন জঘন্য ও বীভৎস কাজ শুরু করে তার ব্যাপক প্রচলন করেছিল। বৈধ ও পবিত্র স্ত্রীদের তারা ত্যাগ করেছিল এবং এ হারাম কার্য অবলম্বন করেছিল। এ কারণে আল্লাহর নবী হযরত লূত (আ) তাদের বললেনঃ
آتَاتُونَ الذِّكْرَانَ مِنَ الْعَلَمِينَ وَتَذَرُونَ مَا خَلَقَ لَكُمْ رَبُّكُمْ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ ، بَلْ أَنْتُمْ قَوْمٌ عَدُونَ .
দুনিয়ার মধ্যে কেবল তোমরাই এমন যে, তোমরা পুরুষদের কাছে যাও। আর তোমাদের জন্যে যে স্ত্রীদের আল্লাহ্ সৃষ্টি করেছেন, তাদের পরিত্যাগ করছ? বরং তোমরা তো সীমালংঘনকারী লোক। (সূরা শু'আরা : ১৬৫-১৬৬)
কুরআন মজীদ এ কাজকে প্রত্যাখ্যান করেছে, এ কাজকে জুলুম, বাড়াবাড়ি, মূর্খতা, বিপর্যয় ও অপরাধ বলে ঘোষণা করেছে। এটা মানব স্বভাবের চরম বিকৃতি, হেদায়েতের পথ থেকে চরম বিভ্রান্তি। নৈতিকতার চরম বিপর্যয়ও রুচির মারাত্মক অসুস্থতা। এ লোকদের পরীক্ষার জন্যে আল্লাহ্ তা'আলা মানুষের আকৃতিতে ফেরেশতাদের পাঠিয়েছিলেন। এদের প্রতি জাতির জনগণ যে আচরণ গ্রহণ করেছিল, তার প্রতিশোধ স্বরূপ আল্লাহ্ তাদের ওপর কঠিন আযাব নাযিল করেন। কুরআনে তাই বলা হয়েছে:
وَلَمَّا جَاءَتْ رُسُلُنَا لُوطًا شَيْئَ بِهِمْ وَضَاقَ بِهِمْ ذَرْعًا وَقَالَ هَذَا يَوْمٌ عَصِيت - وَجَاءَ قَوْمُهُ يُهْرَعُونَ إِلَيْهِ ، وَمِنْ قَبْلُ كَانُوا يَعْمَلُونَ السَّيِّاتِ قَالَ يَا قَوْمٍ هَؤُلَاءِ بَنَاتِي هُنَّ أَطْهَرُ لَكُمْ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَلَا تُخْزُوْنَ فِي ضَيْفِي أَلَيْسَ مِنْكُمْ رَجُلٌ رَّ شِيْدَ - قَالُوا لَقَدْ عَلَمْتَ مَا لَنَا فِي بَنَاتِكَ مِنْ حَقِّ وَإِنَّكَ لَتَعْلَمُ مَانُرِيدُ - قَالَ لَوْ أَنَّ لِي بِكُمْ قُوَّةً أَوْ أَوِى إِلَى رُكْنٍ شَدِيدٍ - قَالُوا يَالُوطُ إِنَّا رُسُلُ رَبِّكَ لَنْ تُصَلُّوا إِلَيْكَ -
আমাদের ফেরেশতাগণ যখন লূত-এর কাছে পৌঁছল, তাদের আগমনে সে ঘাবড়ে গেল, মনটা খারাপ হয়ে গেল। বলতে লাগল, আজ বড় বিপদের দিন। এ মেহমানদের আগমনে তার জাতির লোকেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার ঘরের দিকে দৌড়ে এল। পূর্ব থেকেই তারা এরূপ দুষ্কৃতি ও জঘন্য কাজে অভ্যস্ত ছিল। লূত তাদের বলল: ভাইরা আমার মেয়েরা বয়েছে, ওরাই তোমাদের জন্যে পবিত্রতর। আল্লাহকে অবশ্য ভয় করবে, আর আমার মেহমানদের ব্যাপারে আমাকে লজ্জিত কর না। তোমাদের মধ্যে সমঝদার ব্যক্তি কি কেউ নেই? তারা জবাবে বলল: তোমার তো জানাই আছে যে, তোমার মেয়েদের ক্ষেত্রেও আমাদের কোন অংশ নেই। তুমি এ-ও জান যে, আমরা কি চাই। লূত বলল: হায়, আমার যদি এতটা ক্ষমতা থাকত যে, আমি তোমাদের শায়েস্তা করে দিতে পারতাম কিংবা কোন সুদৃঢ় সহায়ই হতো যার আশ্রয় আমি গ্রহণ করতাম। তখন ফেরেশতাগণ তাঁকে বললঃ হে লূত! আমরা তো তোমার আল্লাহ্ প্রেরিত ফেরেশতা। এ লোকেরা তোমার কোন ক্ষতিই করতে পারবে না। (সূরা হুদ: ৭৭-৮১)
এ দুষ্কৃতি ও জঘন্য কাজ যে করবে, তাকে কি শাস্তি দেয়া যেতে পারে, তা নিয়ে ফিকাহবিদদের মধ্যে বিভিন্ন মত রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, লেওয়াতাতকারীকে কি জেনাকারীর দণ্ড দেয়া হবে কিংবা লেওয়াতাতকারী ও যার সাথে তা করা হয়েছে এ উভয়কে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে- হত্যা করা হবে? আর হত্যা করা হলে তাকে কি দিয়ে হত্যা করা হবে, তরবারি দ্বারা কিংবা আগুনে জ্বালিয়ে মারা হবে? অথবা উচ্চ প্রাচীরের ওপর থেকে ফেলে দিয়ে মারা হবে?
এ ধরনের অপরাধের বাপারে ইসলামের এ কঠোরতাকে নির্মমতা মনে করা যেতে পারে। কিন্তু ইসলামী সমাজকে এ ধরনের পংকিল ও কদর্য কার্যকলাপ থেকে পরিত্র রাখা এরূপ কঠোর শাস্তি প্রয়োগ ছাড়া কিছুতেই সম্ভব নয়। কেননা এ গুনাহ, সংক্রামক, ক্ষতিকর। এ গুনাহ্ সমাজে প্রচলিত হলে ধ্বংস আর ধ্বংস ছাড়া অন্য কোন পরিণতিই হতে পারে না।
📄 হস্তমৈথুন
অনেক যুবক যৌন উত্তেজনা দমনের উদ্দেশ্যে নিজ হস্তদ্বয়ের আশ্রয় গ্রহণ করে থাকে। নিজ হাতের মৈথুনের সাহায্যে শুক্র নিষ্কাশন করে স্নায়ুমণ্ডলীকে শান্ত করে থাকে। অধুনা একে 'গোপন স্বভাব' নামে অভিহিত করা হয়।
অনেক বিশেষজ্ঞই এ কাজকে হারাম বলেছেন। ইমাম মালিক এ ব্যাপারে কুরআন মজীদের নিম্নোদ্ধৃত আয়াতকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করেছেন:
وَالَّذِينَ هُمْ لِفُرُوجِهِمْ حَافِظُونَ إِلَّا عَلَى ازْوَاجِهِمْ أَوْمًا مَلَكَتْ أَيْمَا نُهُمْ فَانَّهُمْ غَيْرُ مَلُومِينَ - فَمَنِ ابْتَغَى وَرَاءَ ذَلِكَ فَأُولَئِكَ هُمُ الْعَادُونَ -
আর যারা তাদের যৌন অঙ্গের সংরক্ষণ করে- তাদের স্ত্রীদের ও দাসীদের ছাড়া- তাদের প্রতি কোন তিরস্কার নেই। এর বাইরে অন্য কোন পন্থা যারাই অবলম্বন করবে, তারাই আসলে সীমালংঘনকারী। (সূরা মুমিনূন: ৪-৭)
ইমাম মালিকের মতে- যারা হস্তমৈথুন করে, তারা কুরআন ঘোষিত বৈধ পন্থা বাদ দিয়ে ভিন্নতর পন্থার আশ্রয় গ্রহণ করে। অতএব তা হারাম।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল থেকে বর্ণিত, তিনি শুক্রকে দেহের অপরাপর আবর্জনার মতোই এক আবর্জনা বিশেষ মনে করতেন। আর উপরিউক্ত উপায়ে তাঁর বহিষ্কারকরণকে জায়েয মনে করতেন। যেমন 'সিন্তা' লাগান। ইমাম ইবনে হাজমও এ মত সমর্থন করেছেন। হাম্বলী মাযহাবের আলিমগণ দুই শর্তে এ কাজকে জায়েয বলেছেন। একটি হলো, তা করা না হলে জেনাকারীতে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা হওয়া। আর দ্বিতীয় হচ্ছে, বিয়ে করতে অক্ষম হওয়া।
এ প্রেক্ষিতে আমরা ইমাম আহমদের মত গ্রহণ করতে পারি কেবল সে অবস্থায়, যখন যৌন উত্তেজনা অদম্য হয়ে উঠবে এবং তার দরুন জ্বেনা ব্যভিচার করে বসতে পারে এ ভয় তীব্র হয়ে উঠবে। যেমন শিক্ষারত ছাত্র ও বিদেশে কর্মরত নিঃসঙ্গ ব্যক্তি। আর তার সম্মুখে যদি বিদ্যমান থাকে যৌন উত্তেজনার অসংখ্য কারণ। এরূপ অবস্থায় যে কোন ব্যক্তির পক্ষে আত্মসংযম করে থাকা খুবই কঠিন ও দুষ্কর হয়ে পড়ে। এ ধরনের ব্যক্তির পক্ষে তার যৌন উত্তেজনা দমন করার জন্যে এ উপায় অবলম্বন করা খুব বেশি দোষের হবে না। তবে তাতেও শর্ত এই যে, এ কাজে সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া এবং এ পন্থাকে স্থায়ীভাবে গ্রহণ করা কিছুতেই জায়েয হবে না।
তবে নবী করীম (স) বিবাহ করতে অসমর্থ মুসলিম যুবকদের যে পথ দেখিয়েছেন, তাই সর্বোত্তম পন্থা। তা হচ্ছে তার উচিত বেশি বেশি রোযা রাখা। কেননা রোযা মানুষের ইচ্ছাশক্তিকে সুসংযত ও সুসংহত করে। ধৈর্য শিক্ষা দেয়, ধৈর্যধারণে অভ্যস্ত করে তোলে। রোযা মানুষের মধ্যে তাকওয়ার শক্তিকে বাড়িয়ে দেয়, আল্লাহকে হাযের-নাজের জানার ভাবধারাকে প্রবল করে তোলে। এ পর্যায়ে নবী করীম (স)-এর বাণী হচ্ছেঃ
يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجُ فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ وَأَحْصَنُ الفَرَجِ وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصُّومِ فَانَّهُ لَهُ وِجَاءُ -
হে যুবক সমাজ! তোমাদের মধ্যে যারা স্ত্রী সঙ্গমে সক্ষম তাদের বিয়ে করা কর্তব্য। কেননা এ বিয়ে তাকে চক্ষু নত রাখতে অভ্যস্ত করবে এবং তার যৌন অঙ্গকে পবিত্র ও সুরক্ষিত রাখবে। আর যে যুবক বিয়ে করতে অসমর্থ হবে, তার রোযা রাখা উচিত। কেননা এ রোযাই তার ঢালস্বরূপ হবে। (বুখারী)
📄 ইসলামে বৈরাগ্যবাদ নেই
ইসলামে যৌন উত্তেজনাকে লাগামমুক্ত ও অবাধ করে দেয়া হয়নি। কেননা তা করে দেয়া হলে তা কোন সীমা বা বাধা-বন্ধন, শর্ত-প্রতিবন্ধকতা মেনে চলতে প্রস্তুত হবে না। এ কারণেই জ্বেনা-ব্যভিচার এবং তৎসংশ্লিষ্ট ও সেদিকে টেনে নেয়ার যাবতীয় কার্যক্রমকেও হারাম করে দেয়া হয়েছে। অপরদিকে এ স্বভাবজাত প্রবণতার সাথে সাংঘর্ষিক ও তাকে সমূলে উৎখাতকারী ভাবধারাকেও ইসলাম একবিন্দু সমর্থন করেনি। এ কারণেই ইসলাম বিবাহ করার উৎসাহ দিয়েছে এবং অবিবাহিত বা চিরকুমার হয়ে থাকা কিংবা নিজেকে নপুংসক বানানোর প্রচণ্ড বিরোধিতা করে। অতএব সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোন মুসলিম পুরুষ বা নারীর বিয়ে না করে থাকা এ উদ্দেশ্যে যে, সে দুনিয়ার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করে আল্লাহর জন্যে উৎসর্গীকৃত থাকতে চায় কিংবা সম্পূর্ণ নির্ঝঞ্ঝাট একমুখিতা নিয়ে আল্লাহ্ ইবাদতে মশগুল হয়ে থাকতে চায়—আদৌ জায়েয নয়। ইসলামে এরূপ মনোভাব বা কর্মনীতির একবিন্দু সমর্থন নেই।
রাসূলে করীম (স)-এর কোন কোন সাহাবীর মধ্যে দুনিয়া ত্যাগের প্রবণতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। কিন্তু নবী করীম (স) যখনই তা টের পেলেন, তখনই ঘোষণা করে দিলেন যে, দুনিয়া ত্যাগ করা ইসলামী জীবনধারা পরিহার ও রাসূলের সুন্নাতকে অগ্রাহ্য করার শামিল। বস্তুত এ এক খ্রিস্টানসূলভ প্রবণতা। রাসূলে করীম (স) এ প্রবণতাকে সম্পূর্ণ ইসলাম বিরোধী বলে ঘোষণা করলেন। আবু কালাবা থেকে বর্ণিত:
أراد أَنَاسٌ مِنْ أَصْحَابِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يُرْفَضُوا الدُّنْيَا وَيَتْرُكُوا النِّسَاءَ وَيَتَرَ هُبُوا فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم فَغَلَّظَ فِيهِمُ الْمَقَالَةَ ثُمَّ قَالَ إِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ بِالشَّدِيدِ - شَدَّدُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ فَشَدَّدَ اللهُ عَلَيْهِ فَأُولَئِكَ بَقَايَاهُمْ فِي الْأَدْيَارِ وَالصَّوَامِعِ فَاعْبُدُ وا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوْ بِهِ وَحَجُّوا وَاعْتَمِرُوا وَاسْتَقِيمُوا يَسْتَقِيمُ بِكُمْ -
কিছু সংখ্যক সাহাবী দুনিয়া ত্যাগ করার, স্ত্রী সংসর্গ বর্জন করার ও বৈরাগ্যবাদ অবলম্বন করার ইচ্ছা গ্রহণ করলেন। কিন্তু নবী করীম (স) এ ব্যাপারটিকে খুব শক্তভাবে ধরলেন। বললেন: তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা দ্বীন পালনে চরম কঠোরতা ও কৃষ্ণ সাধনার নীতি অবলম্বন করে ধ্বংস হয়ে গেছে। তারা নিজেরাই যখন কৃষ্ণতা গ্রহণ করল, তখন আল্লাহ্ও তাদের প্রতি কঠোরতা প্রয়োগ করলেন। এ কালের গির্জা-মঠ ও খানকাসমূহে অবস্থানকারী লোকেরা তাদেরই উত্তরাধিকারী। অতএব তোমরা আল্লাহ্ ইবাদত কর এবং কাউকেই তাঁর শরীক বানিও না। হজ্জ কর, উমরা কর আর সোজা ঋজু পথ অবলম্বন কর, তাহলে তোমাদের সাথে যথাযথ আচরণ করা হবে। (আব্দুর রাজ্জাক ইবনে জরির-ইবনে মুনযির)
এ হাদীসের বর্ণনাকারী বলেন: এ লোকদের সম্পর্কেই নিম্নোদ্ধৃত আয়াতটি নাযিল হয়েছে:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُحَرِّمُوا طَيِّبَاتِ مَا أَحَلَّ اللَّهُ لَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا ، إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ -
হে ঈমানদার লোকেরা! আল্লাহ্ তোমাদের জন্যে যেসব পবিত্র জিনিস হালাল করেছেন, তোমরা তা হারাম কর না। আর সীমালংঘন কর না কেননা আল্লাহ্ সীমালংঘনকারীদের আদৌ ভালবাসেন না। (সূরা মায়িদা: ৮৭)
মুজাহিদ বলেছেন: উসমান ইবনে মজয়ূন ও আবদুল্লাহ্ ইবনে আমর প্রমুখ সাহাবী স্ত্রী সংসর্গমুক্ত জীবন যাপন করার, নিজেদের 'খাসি' বানানর এবং চট বস্ত্র পরিধান করার সংকল্প গ্রহণ করলেন। পূর্বোদ্ধৃত ও তৎপরবর্তী আয়াত এ পর্যায়েই নাযিল হয়েছিল।
একদল সাহাবী নবী করীম (স)-এর ঘরে উপস্থিত হয়ে তাঁর ইবাদত-বন্দেগী সম্পর্কে তাঁর বেগমদের কাছ থেকে জানতে চেষ্টা করতে লাগলেন। তাঁরা যখন যা জানবার জেনে নিলেন, তখন তাঁদের কাছে তা খুবই স্বল্প ও অপর্যাপ্ত মনে হলো। তখন তাঁরা নিজেরাই বলতে লাগলেন:
أَيْنَ نَحْنُ مِنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَقَدْ غَفَرَ اللهُ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ وَمَا تَأَخَّر - فَقَالَ أَحَدُ هُمْ أَمَّا أَنَا فَأَصُومُ الدُّهْرَ فَلَا أَقْطَرُ وَقَالَ الثَّانِي وَأَنَا أَقُومُ اللَّيْلَ فَلَا أَنَامُ وَقَالَ الثَّالِثُ وَأَنَا أَعْتَزِلُ النِّسَاءَ فَلَا أَتَزَوْجُ أَبَداً فَلَمَّا بَلَغَ ذَلِكَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَيْنَ لَهُمْ خَطَايَا هُمْ عَوْجَ طَرِيقِهِمْ وَقَالَ لَهُمْ وَإِنَّمَا أَنَا أَعْلَمُكُمْ بِاللَّهِ وَأَخْشَاكُمْ لَهُ وَلَكِنِّي أَقُومُ وَأَنَا وَأَصُومُ وَأَفْطِرُ وَاتَزَوَّجُ النِّسَاءُ فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنَّي -
রাসূলে করীমের সাথে আমাদের কি তুলনা হতে পারে? আল্লাহ্ই তাঁর আগের ও পরের সব গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন। অতঃপর তাদের একজন বলল: আমি তো সারাটিকাল ধরে রোযা রাখব, রোযা ভঙ্গ করব না। দ্বিতীয় জন বলল: আমি সারারাত জাগ্রত থেকে ইবাদত করব, একটুও ঘুমাব না। তৃতীয় জন বলল: আমি নারী সংসর্গ বর্জন করে চলব, কখনই বিয়ে করব না। পরে নবী করীম (স) যখন এ সংবাদ জানতে পারলেন, তখন তিনি তাঁদের ভুল ধারণা ও তাদের অবলম্বিত নীতির বক্রতা ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিলেন। তিনি বললেন: আল্লাহ্ সম্পর্কে আমি তোমাদের চেয়ে বেশি জানি, তোমাদের আপেক্ষা আমি তাঁকে ভয়ও করি বেশি। তা সত্ত্বেও আমি যেমন রাত জাগরণ করে ইবাদত করি তেমনি ঘুমাইও। আমি রোযাও থাকি, রোযা ভাঙ্গিও, আর স্ত্রী গ্রহণ করে দাম্পত্য জীবনও যাপন করছি। এই হচ্ছে আমার নীতি ও আদর্শ। অতএব যে তা পরিহার করবে, সে আমার উম্মতের মধ্যে গণ্য নয়। (বুখারী)
হযরত সা'দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রা) বলেছেন:
رَدَّ رَسُولُ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى عُثْمَانَ ابْنِ مَظْعُوْنَ التَّبَتُّلَ وَلَوْ أَذِنَ لَهُ لَاخْتَصَيْنَا
উসমান ইবনে মজয়ূন স্ত্রী সংসর্গহীন জীবন গ্রহণ করতে চাইলে রাসূলে করীম (স) তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি যদি তাঁকে অনুমতি দিতেন তাহলে আমরা খাসি করে নপুংসক হয়ে যেতাম। (বুখারী)
এ প্রেক্ষিতেই বিশেষজ্ঞগণ মত দিয়েছেন যে, মুসলিম মাত্রেরই বিয়ে করা ফরয। সাধ-সামর্থ্য থাকা পর্যন্ত তা পরিহার করে চলা মাত্রই জায়েয নয়। অপরদের মতে যে লোক বিয়ে করতে ইচ্ছুক এবং তা না করলে নিজের চরিত্র রক্ষার ব্যাপারে আশংকা বোধ করে তার অবশ্যই বিয়ে করা উচিত।
অভাব-অনটন রিস্কের অপ্রশস্ততা বা দায়িত্ব বোঝা বহনের সাহসহীনতার কারণে বিয়ে না করা কোন মুসলমানেরই শোভা পায় না। বরং তার উচিত আল্লাহর সাহায্য ও অনুগ্রহ লাভের জন্যে প্রাণপণ চেষ্টা করা। কেননা যারা নিজেদের চরিত্রের পবিত্রতা রক্ষার উদ্দেশে বিয়ে করবে, আল্লাহ্ তাদের প্রতি অনুগ্রহ বর্ষণের ওয়াদা করেছেন। আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেছেন:
وَانْكِحُوا الْأَيَامَى مِنْكُمْ وَالصَّالِحِيْنَ مِنْ عِبَادِكُمْ وَإِمَائِكُمْ ، إِنْ يَكُونُو فُقَرَاء يُغْنِيهِمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ .
তোমাদের মধ্যকার অবিবাহিত ব্যক্তিদের এবং তোমদের দাস-দাসীদের মধ্যে যারা সচ্চরিত্র, তাদের বিয়ে দাও। তারা গরীব হলে আল্লাহ্ তাঁর অনুগ্রহ দিয়ে তাদের ধনী বানিয়ে দেবেন। (সূরা নূরঃ ৩২)
রাসূলে করীম (স) বলেছেন:
ثَلَاثَةٌ حَقٌّ عَلَيْهِمْ عَوْنُهُمْ النَّاكِحُ الَّذِي يُرِيدُ الْعَفَافُ وَالْكَاتِبُ الَّذِي يُرِيدُ الْأَدَاءَ وَالْغَزِي فِي سَبِيلِ الله -
তিন ব্যক্তির সাহায্য করা আল্লাহ্র দায়িত্ব। তারা হচ্ছে: নিজ চরিত্রের পবিত্রতা রক্ষার উদ্দেশ্যে বিবাহকারী, মনিবের সাথে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে মুক্তির চুক্তিকারী, যদি সে বাস্তবিকই সেই অর্থ দিতে ইচ্ছুক হয় এবং আল্লাহ্র পথে যোদ্ধা। (আহমদ, নাসাঈ, তিরমিযী, ইব্ন মাজা, হাকিম)