📄 সাধারণ গোসলখানায় নারীর প্রবেশ
নারীর পর্দা ও ইজ্জত রক্ষার উদ্দেশ্যে ইসলাম যে কড়াকড়ি নীতি গ্রহণ করেছে, তাতে রাসূলে করীম (স) সাধারণ গোসল খানায় নারীদের প্রবেশ করা ও অন্যান্য নারীদের সামনে পরিধানের কাপড় খুলে ফেলার ব্যাপারে খুবই কড়া নিষেধবাণী উচ্চারণ করেছেন। কেননা এসব সাধারণ নারী অন্যান্য মেয়েদের দৈহিক গুণাবলী তাদের সাধারণ সভা-মজলিসে বর্ণনা করে খুবই স্বাদ গ্রহণ করতে অভ্যস্ত।
নবী করীম (স) পুরুষদেরও কোন লুঙ্গী-গামছা না পরে, সাধারণ গোসলখানায় প্রবেশ করতে নিষেধ করেছেন। কেননা অন্যদের সামনে উলঙ্গ হওয়াটা ইসলামে আদৌ পছন্দনীয় কাজ নয়। হযরত জাবির (রা) থেকে বর্ণিত, হযরত নবী করীম (স) বলেছেন:
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِالله وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلَا يَدْخُلُ الْحَمَامَ إِلَّا بِمِنْزَرٍ وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِالله وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلَا يُدْخِلُ حَلِيْلَتَهُ الْحَمَامَ -
যে লোক আল্লাহ্ ও পরকালের প্রতি ঈমানদার, সে যেন সাধারণ গোসল খানায় লুঙ্গী ছাড়া প্রবেশ না করে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ্ ও পরকালের প্রতি ঈমানদার, সে যেন তার স্ত্রীকে সাধারণ গোসলখানায় প্রবেশ করতে না দেয়।
হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত:
أَنَّ رَسُولَ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنْ دُخُولِ الْحَمَامَاتِ ثُمَّ رَخّص لِلرِّجَالِ أَنْ يَدْخُلُوهَا بِالْمَازِرِ -
রাসূলে করীম (স) গোসলখানায় প্রবেশ করতে প্রথমে সাধারণভাবে নিষেধ করে দিয়েছিলেন। পরে পুরুষদের জন্য লুঙ্গীসহ প্রবেশ করার অনুমতি দিয়েছেন। (আবুদাউদ)
মেয়েদের জন্যে সুবিধা দান করা হয়েছে এক্ষেত্রে যে, তাদের কোন রোগের চিকিৎসা কিংবা নেফাস ইত্যাদি নিরাময়তার জন্যে গোসলখানায় প্রবেশ করতে পারে।
হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আমর (রা) থেকে বর্ণিত:
أنَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ فِي شَأْنِ الْحَمَا مَاتِ فَلَا يَدْخُلُهَا الرِّجَالُ الَّا بِمُثْزَرٍ وَامْنَعُوهَا النِّسَاءَ إِلَّا مَرِيضَةً أَوْنُفَسَاءَ -
নবী করীম (স) সাধারণ গোসলখানাসমূহ পর্যায়ে বলেছেন, তাতে পুরুষরা যেন লুঙ্গী না নিয়ে প্রবেশ না করে। আর মেয়েদের তোমরা তাতে প্রবেশ করা থেকে নিষেধ কর। তবে রোগীনী কিংবা নেফাসের স্ত্রীলোক প্রবেশ করতে পারে। (ইবনে মাযাহ, আবু দাউদ)
এ হাদীসের সনদে কিছুটা দুর্বলতা রয়েছে। কিন্তু শরীয়তের সাধারণ বিধানে রোগীদের জন্যে যেমন অনেক সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়েছে, অনেক ইবাদত ও ওয়াজিব কাজ করা থেকে রেহাই দান করা হয়েছে, সে দৃষ্টিতে এ হাদীসের প্রতিপাদ্য অনেকটা শক্তিশালী হয়ে উঠে। যেমন ইসলামী আইনের প্রসিদ্ধ মূলনীতি স্বরূপ বলা হয়েছে:
مَا حُرِّمَ لِسَدِّ الدَّرِيعَةِ يُبَاحُ الْحَاجَةِ وَالْمُصْلِحَة -
কোন হারাম কাজ বন্ধ করার জন্যে তার কারণ বা পথও হারাম ঘোষিত হয়ে থাকলে প্রয়োজন ও সাধারণ জনকল্যাণের প্রশ্নে তা মুবাহ হয়ে যায়।
এ দিক দিয়েও উপরিউক্ত কথার সত্যতা জানা যায়।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণিত হাদীসও এ কথারই সমর্থন দেয়। হাদীসটি এই:
اِنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ اِتَّقُوا بَيْتًا يُقَالُ لَهُ الْحَمَّامُ قَالُوا يَا رَسُولَ اللهِ إِنَّهُ يَذْهَبُ الدَّرَنَ وَيَنْفَعُ الْمَرِيضِ قَالَ فَمَنْ دَخَلَ فَلْيَسْتُرُ -
নবী করীম (স) বলেছেন: তোমরা ‘হাম্মাম’ নামক ঘর থেকে দূরে সরে থাকবে। সাহাবিগণ বললেন: ইয়া রাসূল! হাম্মাম তো ময়লা দূর করে ও রোগীকে উপকার দেয়? তখন তিনি বললেন: তাহলে যে-ই তাতে প্রবেশ করবে সে যেন স্বীয় লজ্জাস্থান আবৃত রাখে। (হাকেম)
এমতাবস্থায় কোন নারী যদি কোনরূপ ওযর বা প্রয়োজন ব্যতীতই তাতে প্রবেশ করে, তাহলে সে একটা হারাম কাজ করল এবং এজন্যে রাসূলে করীম (স) যে কঠোর বাণী উচ্চারণ করেছেন, সে তার যোগ্য হলো। আবুল মুলাইছ আল-হাযালী (রা) বর্ণনা করেছেন:
إِنَّ نِسَاءً مِنْ أَهْلِ حِمْصَ أَوْ مِنْ أَهْلِ الشَّامِ دَخَلْنَ عَلَى عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا فَقَالَتْ أَنْتُنَّ اللَّاتِي تَدْخُلْنَ نِسَاءَ كُنَّ الْحَمَا مَاتِ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ مَا مِنْ امْرَاةٍ تَضَعُ ثِيَابَهَا فِي غَيْرِ بَيْتِ زَوْجِهَا إِلَّا هَلَكَتِ السَّتْرُ بَيْنَهَا وَبَيْنَ رَبِّهَا -
হিমস কিংবা সিরিয়ার কিছু সংখ্যক মেয়েলোক হযরত আয়েশা (রা)-এর কাছে উপস্থিত হলো। তিনি বললেন: তোমরা কি সাধারণ গোসলখানায় প্রবেশ কর? আমি রাসূলে করীম (স)-কে বলতে শুনেছি, যে নারী তার স্বামীর ঘর ছাড়া অন্য কোথাও তার কাপড় খুলে ফেলে সে তার ও তার আল্লাহ্র মধ্যকার পর্দাকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলে। (তিরমিযী)
হযরত উম্মে সালমা (রা) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (স) বলেছেন:
أَيُّهَا امْرَأَةٍ نَزَعَتْ ثِيَابَهَا فِي غَيْرِ بَيْتِهَا خَرَّقَ اللَّهُ عَنْهَا سَتْرَهُ -
যে নারী তার নিজের ঘর ছাড়া অন্যত্র স্বীয় পরিধানের কাপড় খুলে ফেলে আল্লাহ্ তার পর্দাকে ছিন্নভিন্ন করে দেন। (আহমদ, তাবরানী, হাকেম)
সাধারণ গোসলখানায় মেয়েদের প্রবেশ পর্যায়ে ইসলামের যখন এতটা কড়াকড়ি অথচ তা চার দেওয়াল পরিবেষ্টিত ও তাতে কেবল নারীরাই প্রবেশ করে, তখন সেই নির্লজ্জ ও ভবঘুরে মেয়েদের সম্পর্কে কি বলা হবে, যারা রাস্তাঘাটে নিজেদের লজ্জাস্থান উন্মুক্ত করে বেড়ায়, মধু আহরণকারীদের লালসা উত্তেজিত করে তোলে, সমুদ্রতীরে নিজেদের দেহের প্রদর্শনী করে, লোভাতুর কামাতুর দৃষ্টিগুলোর জন্যে দর্শন স্বাদ গ্রহণের ব্যবস্থা করে ও যৌন আবেগকে উত্তেজিত করার কাজে সদা লিপ্ত থাকে?...... আসলে এরা তাদের ও মহান আল্লাহ্র মধ্যে রক্ষিত লজ্জা-শরমের সব আড়াল আবডালকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলেছে। পুরুষরাও এ গুনাহে সমানভাবে শরীক। কেননা তাদের তো দায়িত্বশীল ও রক্ষণাবেক্ষণকারী নিযুক্ত করা হয়েছে নারীদের জন্যে।.......হায়! পুরুষদের কাণ্ডজ্ঞান কি কোন দিনই ফিরে আসবে না?
📄 নারীদের উলঙ্গতা-উচ্ছৃঙ্খলতা হারাম
মুসলিম নারী কাফির কিংবা জাহিলিয়াতের যুগের নারীদের থেকে স্বতন্ত্র ও ভিন্নতর চরিত্রের অধিকারিণী হয়ে থাকে। নৈতিক চরিত্র, পবিত্রতা, সতীত্ব ও লজ্জা-শরমের সভ্রম রক্ষা করাই মুসলিম নারীদের বিশেষত্ব।
পক্ষান্তরে জাহিলী নারীর চরিত্র হচ্ছে নগ্নতা-উচ্ছৃঙ্খলতা ও পুরুষদের মধ্যে যৌন উত্তেজনা জাগিয়ে তোলার দক্ষতা দেখান। কুরআনে ব্যবহৃত শব্দ تبرج অর্থঃ খুলে যাওয়া, উন্মুক্ত হওয়া, প্রকাশিত হওয়া, প্রকশিত হয়ে পড়া। সধারণ লোকদের দেখতে পারা। এ সাদৃশ্যের কারণে আরবী ব্যবহার হচ্ছেঃ
بُرُوجُ السَّمَاءِ، يُرُوجُ مُشَيِّدَةٌ -
এ জন্যে যে, আকাশমণ্ডল সুউচ্চে অবস্থিত এবং তা দৃষ্টিমানের সম্মুখে প্রকাশিত।
আল্লামা যামাখশারী বলেছেন تبرج শব্দের নিঘূঢ় তত্ত্ব হচ্ছে, যা গোপন রাখা কর্তব্য তাকে বিশেষ যত্ন ও ব্যবস্থাপনা সহকারে প্রকাশ করে দেয়া। আরবী কথন হচ্ছে: سفته بازح 'প্রকাশমান নৌকা'- কেননা তার ওপর কোন পর্দা নেই। এ অর্থের সামঞ্জস্যের কারণে নারীর পুরুষদের জন্যে আবরনমুক্ত ও উলঙ্গ হওয়া অর্থে এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। কেননা এ করে নারী তার সমস্ত সৌন্দর্য ও দৈহিক লালিমা কান্তি পুরুষের সম্মুখে উন্মুক্ত করে দেয়। ইমাম যামাখশারী এ অর্থে একটা নতুন দিকে ইঙ্গিত করেছেন, তা হচ্ছে উদ্যোগ-আয়োজন করে গোপনীয় জিনিসকে প্রকাশ করে দেয়া অথচ তা গোপন করে রাখাই বাঞ্ছনীয় ছিল। দেহের বিশেষ বিশেষ অঙ্গ, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের হেলানো-দোলানো, কথা বলার ও চলার বিশেষ ধরন ও ভঙ্গি বা অলংকারাদি এসব ভিন্ পুরুষের সম্মুখে প্রকাশ করাই 'তাবাররুজ'।
এ 'তাবাররুজ'-এর বিভিন্ন রূপ ও ভঙ্গি রয়েছে, প্রাচীনকালের লোকেরা যেমন তা জানত, এ কালের লোকদেরও তা ভালভাবে জানা। কুরআনের নিম্নোদ্ধৃত আয়াতের তাফসীরকারগণ তার উল্লেখ করেছেন:
وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرُّجْنَ تَبَرُّجَ الجَاهِلِيَّةِ الْأُولى -
হে মেয়েরা! তোমরা তোমাদের ঘরে স্থিতি গ্রহণ করে থাক এবং প্রাচীন জাহিলিয়াতের সময়ের মতো প্রদর্শনী করে বেড়িও না।
মুজাহিদ বলেছেন: তখন মেয়েরা লীলায়িত ভঙ্গিতে চলাফেরা করত।
মুকাতিল বলেছেন: মেয়েরা তাদের ওড়না মাথার ওপর রাখত, কিন্তু শক্ত করে বাঁধত না। ফলে গলার হার, কানের বালা ও গলা-গ্রীবা উন্মুক্ত হয়ে যেত।
প্রাচীন জাহিলী যুগের এই ছিল 'তাবাররুজ' অর্থাৎ পুরুষদের সাথে মাখামাখি ব্যাপকভাবে হতো। চলনে বলনে বিশেষ লাস্যতা দেখা যেত। নারীর ওড়না এমনভাবে ব্যবহৃত হতো যে, তার দেহ ও অলংকারের সৌন্দর্য প্রকাশ হয়ে পড়ে। কিন্তু আধুনিক জাহিলিয়াত এমন সব ভঙ্গি ও বৈচিত্র্য অর্জন করেছে যে, তাতে প্রাচীন জাহিলিয়াতকে অনেক পিছনে ফেলে দিয়েছে।
📄 কোন্ অবস্থায় তাবাররুজ হয় না
নিম্নোদ্ধৃত নিয়মাবলী পালন করে চললে মুসলিম নারী 'তাবাররুজ'-এর সীমা ত্যাগ করে ইসলামী সভ্যতার পরিবেশে অনুপ্রবেশ করতে পারে:
(ক) দৃষ্টি নত রাখা- কেননা লজ্জা-শরমই হচ্ছে নারীর সবচাইতে অধিক মূল্যবান সৌন্দর্য। আর লজ্জা-শরমের বড় প্রকাশ পাওয়া যায় দৃষ্টি নত রাখার মাধ্যমে। তাই আল্লাহ্ বলেছেন এ ভাষায়:
وَقُلْ لِلْمُؤْمِنَت يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ -
এবং বল ঈমানদার মহিলাদের, তারা যেন তাদের দৃষ্টির একাংশ নত রাখে।
(খ) পুরুষদের সাথে নিবিড় ঘনিষ্ঠতা এড়িয়ে চলতে হবে- এ কালের সিনেমা হল, মিটিং-জনসভা ও হোটেল-রেস্তোরা ও কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস কক্ষ ও করিডোরে-কেন্টিনের ভিড়ে এ মাখামাখিটা পুরামাত্রায় লক্ষ্য করা যায়। হযরত মা'কাল ইবনে ইয়াসার (রা) রাসূলে করীম (স)-এর বাণী বর্ণনা করেছেনঃ
لَا أَنْ يُطْعَنَ فِي رَأْسِ أَحَدِكُمْ بِمَخِيطٍ مِنْ حَدِيدٍ خَيْرٌ لَهُ مِنْ أَنْ تَمسُ امْرَأَةً لَا تَحِلُّ لَهُ -
যে স্ত্রীলোকটি হালাল নয়, তাকে স্পর্শ করা অপেক্ষা নিজের মাথায় লৌহ শলাকা বসিয়ে দেয়া অনেক উত্তম। (তিবরানী, বায়হাকী)
(গ) তার পোশাক-পরিচ্ছেদ ইসলামী শরীয়তের আদব-কায়দা ও নিয়ম-নীতি সম্মত হতে হবে- আর শরীয়তসম্মত পোশাক বলতে বোঝায় তা, যাতে নিম্নোদ্ধৃত গুণাবলী রয়েছে:
১. সমস্ত দেহ আবৃত করে, কুরআন নিজেই ما ظهر منها 'যা স্বতঃই প্রকাশ হয়ে পড়ে' বাদ দিয়েছে, তা ছাড়া- অর্থাৎ মুখমণ্ডল ও পাঞ্জাদ্বয় ব্যতীত সমস্ত শরীর ঢাকতে হবে।
২. কাপড়ের অভ্যন্তর থেকে দেহ বা দেহের কান্তি দৃশ্যমান হতে পারবে না। নবী করীম (স) জানিয়ে দিয়েছেন:
إِنَّ مِنْ أَهْلِ النَّارِ نِسَاء كَاسِيَاتٌ عَرِيَاتٌ مَائِلَاتُ مُمِيلَاتٌ لَا يَدْخُلَنَّ الْجَنَّةَ وَلَا يَجِدْنَ رِيحَهَا
যে সব মেয়েলোক কাপড় পরেও ন্যাংটা, পুরুষদের প্রতি আকৃষ্ট এবং পুরুষদেরও আকৃষ্টকারী, তারা জাহান্নামী, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না এবং জান্নাতের সুঘ্রাণও কিছু পাবে না।
পোশাক পরেও যদি পোশাক পরার উদ্দেশ্য- শরীর আবৃতকরণ- অপূর্ণ থেকে যায়, কাপড় খুব পাতলা হওয়ার দরুন দেহের সব কিছুই বাইরে থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠে, তাহলেই কাপড় পরেও ন্যাংটা থাকা হয়।
বনু তামীম গোত্রের কিছু সংখ্যক মেয়েলোক হযরত আয়েশা (রা)-এর কাছে উপস্থিত হয়। তাদের পরনে খুবই পাতলা কাপড় ছিল। তা দেখে হযরত আয়শা (রা) বললেন:
إِنْ كُنْتُنَّ مُؤْمِنَاتٍ فَلَيْسَ هَذَا بِثِيبِ الْمُؤْمِنَاتِ -
তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তাহলে জেনে রাখ, এটা মুমিন মহিলাদের পোশাক নয়, যা তোমরা পরেছ।
একটি বিয়ের কনে হযরত আয়েশা (রা)-এর কাছে উপস্থিত হলো। তার পরিধানে ছিল খুবই স্বচ্ছ পাতলা কাপড়। তখন তিনি বললেন:
لَمْ تُؤْمِنْ بِسُورَةِ النُّورِ امْرَأَةٌ تَلْبِسُ هَذَا
যে ব্যক্তি এ ধরনের পোষক পরিধান করে, সে সূরা আন-নূরে বিধৃত বিধানের প্রতি ঈমান আনে নি।
৩. পোশাক এমন আটসাট হবে না, যার দরুন দেহের উচ্চ-নীচ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সবই বাইরে দৃশ্যমান হয়ে উঠে, যদিও তা স্বচ্ছ পাতলা নয়। পাশ্চাত্য-সভ্যতা যে পোশাকের প্রবর্তন করেছে, তা এ পর্যায়ের বড় নিদর্শন। এ সভ্যতা দেহ ও যৌনতার পূজারী, এ সভ্যতার প্রভাবে ফ্যাশন-উদ্ভাবনকারীরা এমনভাবে কাপড় কাটে যে, স্তনদ্বয়, নিতম্ব ও উরুদ্বয় প্রভৃতি যৌনাঙ্গসমূহ দর্শকদের সম্মুখে প্রকটভাবে ভেসে উঠে। সে পোশাক এমন ঢং-এ বানান হয় যে, তাতে যৌন আবেগে আলোড়নের সৃষ্টি হয়। এ ধরনের পোশাক পরিধানকারী নারীও 'কাপড় পরা সত্ত্বেও ন্যাংটার মধ্যে গণ্য'- এ কাপড় ও পোশাক স্বচ্ছ ও পাতলা কাপড় অপেক্ষাও অনেক বেশি বিপদের আহ্বানকারী।
৪. পুরুষদের জন্যে নির্দিষ্ট পোশাক মেয়েরা পরবে না। যেমন কোন পাভলুন। এটা এ কালের পুরুষদের জন্যে নির্দিষ্ট বিশেষ পোশাক। কেননা নবী করীম (স) পুরুষদের সাথে সাদৃশ্য সৃষ্টিকারী নারীদের ওপর অভিশাপ বর্ষণ করেছেন, যেমন অভিশাপ দিয়েছেন সেসব পুরুষদের ওপর যারা মেয়েদের সাথে সাদৃশ্য সৃষ্টি করে। এ জন্যেই নবী করীম (স) মেয়েদেরকে পুরুষদের পোশাক পরতে নিষেধ করেছেন এবং পুরুষদের নিষেধ করেছেন মেয়েদের পোশাক পরতে।
৫. ইয়াহুদী, খ্রিস্টান, অগ্নিপূজারী, কাফির মেয়েদের বিশেষ বিশেষ পোশাকও পরবে না। কেননা ওদের সাথে সাদৃশ্য করতে ইসলামে নিষেধ করা হয়েছে। পুরুষ ও নারীর মধ্যে যেমন পার্থক্য করতে চায় ইসলাম, তেমনি বাইরে ও অন্তরে কাফির জাতিগুলোর অন্ধ অনুসরণ করা থেকেও মুক্তি কামনা করে। এ কারণেই বহু বহু ব্যাপারে কাফিরদের বিরোধিতা করার জন্যে ইসলাম সুস্পষ্ট ভাষায় নির্দেশ দিয়েছে। রাসূলে করীম (স) নিম্নোদ্ধৃত বাণীটি এ পর্যায়ের:
مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ -
যে লোক অপর যে-জাতির সাথে সাদৃশ্য করবে, সে তাদের মধ্যেই গণ্য হবে।
(ঘ) চলাফেরা ও কথাবার্তায় তাকে গাম্ভীর্য ও দৃঢ়তা অবলম্বন করতে হবে। তার দেহের ও মুখমণ্ডলের সমস্ত গতিবিধি ফেরানো ঘোরানয় যৌন আবেগকে উত্তেজিত করণ থেকে পূর্ণমাত্রায় বিরত থাকতে হবে। কেননা চলাফেরা কথাবার্তায় লাস্যতা ও লীলাময়তা চরিত্রহীন কাফির মেয়েদের বিশেষত্ব, মুসলিম মহিলাদের চরিত্র নয়। আল্লাহ্র এ কথাটি এ পর্যায়ে পুনঃ পঠনীয়:
فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ حَرَضٌ -
নিম্ন নম্র কন্ঠস্বরে কথা বলবে না, বললে অন্তরের রোগ সম্পন্ন ব্যক্তি লালায়িত হয়ে পড়বে। (সূরা আহযাবঃ ৩২)
(ঙ) সুগন্ধি, আতর-স্নো-পাউডার ইত্যাদির দ্বারা স্বীয় গোপন সৌন্দর্যের প্রতি পুরুষদের মনে আকর্ষণ সৃষ্টি করতে পারবে না। আল্লাহ্ বলেছেন:
وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيَعْلَمَ مَا يُخْفِينَ مِنْ زِينَتِهِنَّ -
মাটিতে পা শক্তভাবে ফেলে চলবে না, কেননা তা করা হলে যে রূপ-সৌন্দর্য-অলংকার তারা লুকিয়ে রেখেছে, তা তারা জেনে যাবে।
জাহিলিয়াতের যমানায় মেয়েরা যখন লোকদের মধ্যে চলাফেরা করত তখন তারা নিজেদের পা ঝনাৎ করে মাটিতে ফেলত। ফলে পায়ের অলংকার ঝংকার দিয়ে উঠত ও লোকেরা সে ধ্বনি শুনতে পেত। এ কারণে কুরআনে তা করতে নিষেধ করেছে। কেননা এরূপ করা হলে লালসা-কাতর পুরুষদের মনে যৌন চিন্তা-ভাবনা তীব্র হয়ে জেগে উঠবে। সে নারী সম্পর্ক সে ভাবতে শুরু করবে যে, এ নারী পুরুষদেরকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করতে ইচ্ছুক।
বিভিন্ন সুগন্ধি মেখে বায়ু পরিমণ্ডল ভারাক্রান্ত করে তুলে, যৌন আবেগকে উত্তেজিত করে ও পুরুষদের নিজেদের প্রতি আকৃষ্ট করতে চেষ্টা করে যেসব মেয়ে, তাদের সম্পর্কেও এ কথাই প্রযোজ্য। হাদীসে বলা হয়েছে:
المرأَةُ إِذَا اسْتَعْطَرَتْ فَمَرَّتْ بِالْمَجْلِسِ فَهِيَ كَذَا وَكَذَا يَعْنِي زَانِيَةٌ -
মেয়েলোক আতর-সুগন্ধি মেখে সভা-মজলিসে উপস্থিত হলে সে এই-এই অর্থাৎ জ্বেনাকারী। (আবূ দাউদ, তিরমিযী)
এই বিস্তারিত আলোচনা থেকে আমরা নিঃসন্দেহে জানতে পারলাম যে, মেয়েরা ঘরের 'কারাগারে' (?) বন্দী হয়ে পড়ে থাকুক এবং কবর ছাড়া আর কোন স্থানে বের হয়ে না যাক, ইসলাম সে বাধ্যবাধকতা আদৌ আরোপ করেনি। বরং নামাযের জামাতে শরীক হওয়া, জ্ঞান শিক্ষা লাভ ও অন্যান্য জৈবিক ও পারিবারিক প্রয়োজন পূরণার্থে ঘরের বাইরে যাওয়া মুসলিম মহিলাদের জন্যে সম্পূর্ণ জায়েয। সাহাবী মহিলা ও তাঁদের পরবর্তী কালের মুসলিম মহিলাগণ তা-ই করতেন। তাঁদের অনেকে যুদ্ধে শরীক হওয়ার জন্যেও বের হয়েছেন। রাসূলে করীম (স)-এর সঙ্গেও বের হয়েছেন। তাঁর পরে খলীফা ও ইসলামী সেনানাধ্যক্ষের সঙ্গেও বাইরে গেছেন। নবী করীম (স) তাঁর বেগম হযরত সাওদা (রা)-কে বলেছেন:
قَدْ أَذِنَ اللَّهُ لَكُنَّ أَنْ تَخْرُجْنَ لِحَوَتِجِكُنَّ -
আল্লাহ্ তোমাদের অনুমতি দিয়েছেন, তোমরা তোমাদের প্রয়োজনে ঘরের বাইরে যেতে পার। (বুখারী)
তিনি আরও বলেছেন:
إِذَا اسْتَأْذَنَتْ امْرَأَةً أَحَدَكُمْ إِلَى الْمَسْجِدِ فَلَا يَمْنَعْهَا
তোমাদের কোন স্ত্রী যদি তোমাদের কাছে মসজিদে নামাযে যাওয়ার জন্যে অনুমতি চায়, তাহলে তাকে যেন নিষেধ না কর। (বুখারী)
অপর এক হাদীসে বলা হয়েছে:
لَا تَمْنَعُوا أَمَاءَ اللهُ مَسَاجِدَ الله .
তোমরা আল্লাহ্র দাসীদেরকে মসজিদে যেতে নিষেধ করবে না। (মুসলিম)
কোন কোন আলিম এ পর্যায়ে খুবই কঠোরতা করে থাকেন। তাঁদের মতে ভিন্ পুরুষ-দেহের কোন একটি অংশের ওপরও নজর দেয়া স্ত্রীলোকদের জন্যে হারাম। তাঁরা দলিল হিসেবে উম্মে সালমা (রা)-এর দাস নরহান বর্ণিত একটি হাদীস পেশ করেন। হাদীসটি হচ্ছে:
أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لَهَا وَلِمَيْمُونَةً وَقَدْ دَخَلَ عَلَيْهَا ابْنُ أُمِّ مَكْتُوْم احْتَجَبَا - فَقَالَتَا أَنَّهُ أَعْمَى قَالَ أَفَعُمْيَا وَإِنْ انْتُمَا السْتُمَا تَبْصِرَانِ -
হযরত উম্মে সালমা ও মায়মুনার ঘরে আবদুল্লাহ্ ইবনে উম্মে মাকতুম প্রবেশ করলে নবী করীম (স) তাদের দুজনকে বললেন: তোমরা পর্দা কর। তাঁরা বললেন: ও তো অন্ধ: নবী করীম (স) বললেন, তোমরা দুজনও কি অন্ধ? তোমরা দুজনও কি দেখতে পাও না?
কিন্তু বিশেষজ্ঞগণের মতে এ হাদীসটি সহীহ্ নয়। কেননা এ হাদীসের বর্ণনাকারী নরহান উম্মে সালমার দাস, তার হাদীস দলিল হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।
আর যদি হাদীসটি সহীহ হয়ও তবু বলতে হবে, এটা হচ্ছে নবী করীম (স)-এর তাঁর বেগমদের জন্যে তাঁদের মান-মর্যাদার দৃষ্টিতে অতিরিক্ত কড়াকড়ি। পর্দার ব্যাপারে তাঁদের প্রতি রাসূলে করীমের এ কড়াকড়ি ছিল। আবু দাউদ প্রমুখ হাদীস বিশারদ এ দিকে ইঙ্গিতও করেছেন। কাজেই সহীহ্ প্রমাণিত হাদীসই দলিল হিসেবে অবশিষ্ট থাকল। আর তা হচ্ছে:
أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمَرَ فَاطِمَةَ بِنْتِ قَيْسٍ أَنْ تَقْضِي عَدَّ تَهَا فِي بَيْتِ أَمْ شُرَيْكَ ثُمَّ أَسْتَدْرَكَ فَقَالَ تِلْكَ امْرَأَةٌ يَخْشَاهَا أَصْحَابِي اعْتَدِي عِنْدَ ابْنِ أُمِّ مَكْتُومٍ فَإِنَّهُ رَجُلٌ أَعْمَى تَضَعِينَ ثِيَابَكَ وَلَا يَرَاكِ -
নবী করীম (স) ফাতিমা বিনতে কায়স (রা)-কে উম্মে সুরাইকের ঘরে ইদ্দত পালনের নির্দেশ দিলেন, কিন্তু পরে তিনি এ নির্দেশ সংশোধন করে বললেন: ও মেয়েলোকটিকে আমার সাহাবীরা ভয় করেন। তার চাইতে বরং তুমি ইবনে উম্মে মকতুমের কাছ থেকে ইদ্দত পালন কর। কেননা সে অন্ধ ব্যক্তি। তুমি কাপড় ছাড়বে, কিন্তু সে তোমাকে দেখতে পাবে না। (কুরতুবী)
📄 স্ত্রীর স্বামীর মেহমানদের খেদমত করা
এ পর্যন্তকার আলোচনা থেকে একথাও স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, স্বামীর উপস্থিতিতে, তার মেহমানদের খেদমতের কাজ স্ত্রী করতে পারে। তবে সেজন্য শর্ত হচ্ছে- তার পোশাক, সৌন্দর্য-অলংকার ও কথাবার্তা, চালচলন ইত্যাদি ইসলামী নিয়ম-নীতি ও সভ্যতা ভব্যতার অনুকূল হতে হবে। এমতাবস্থায় মেহমান পুরুষ তাকে (স্ত্রীকে) দেখবে এবং সেও দেখবে তাদের, এটা অতি স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু তাতে কোন দোষ হবে না। কেননা এ ক্ষেত্রে কোন পক্ষ থেকেই কোনরূপ সীমালংঘন বা বিপদ সঙ্ঘটিত হওয়ার কোন আশংকা নেই।
হযরত সহল ইবনে সায়াদ আল-আনসারী (রা) বর্ণনা করেছেন:
لَمَا أَعْرَسَ أَبُو أُسَيْدِ السَّاعِدِى دَعَا النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَسْحَابَهُ فَمَا صَنَعَ لَهُمْ طَعَامًا وَلَا قَدِمَ إِلَيْهِمْ إِلَّا امْرَأَتُهُ أَمْ أَسَيْدِ بَلَتْ ثَمَرَاتٍ فِي قَوْرٍ مِّنْ حِجَارَةٍ مِّنَ اللَّيْلِ فَلَمَا فَرَغَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنَ الطَّعَامِ أَمَانَتْهُ لَهُ فَسَقَتْهُ تُنْحِفُهُ بِذَالِكَ .
আবু উসাইদ সায়েদী বিবাহ উপলক্ষে নবী করীম (স) ও তাঁর সাহাবিগণকে আহ্হ্বান করলেন। এ উপলক্ষে রান্না-বান্না করে খাবার প্রস্তুত করা ও তা পেশ করার কাজ তাঁর স্ত্রী উম্মে উসাইদ সম্পন্ন করলেন। পাথরের একটি পাত্রে কিছু খেজুর রাত থেকেই ভিজাবার জন্যে রেখে দিলেন। নবী করীম (স) খাবার খেয়ে নিলে পর তা নিজ হাতে খুলে নবী করীম (স)-এর কাছে তা পান করার জন্যে তোহফা স্বরূপ পেশ করলেন। (বুখারী, মুসলিম)
ইবনে হাজার আল-আসকালানী যেমন বলেছেন, এ হাদীস থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, স্বামীর মেহমান ও নিমন্ত্রিত লোকদের খেদমতের জন্যে স্ত্রীর অগ্রসর হওয়া ও তাদের সামনে উপস্থিত হওয়া সম্পূর্ণ জায়েয। তবে বলাই বাহুল্য যে, তা করা যাবে যদি কোন নৈতিক বিপদের আশঙ্কা না থাকে তবে। এ সময় দেহকে পূর্ণ মাত্রায় আবৃত রাখতে হবে। এরূপ অবস্থায় স্বামীর পক্ষে স্ত্রীর দ্বারা মেহমানদের খেদমত ও খাবার পরিবেশন করার কাজ করান জায়েয। কিন্তু স্ত্রী যদি দেহ আবৃতকরণ পর্যায়ে ইসলামের ধার্য করা নিয়ন্ত্রণ ও বাধ্যবাধকতা রক্ষা না করে- বর্তমানে যেমন প্রায়শ দেখা যায়- তাহলে পুরুষদের সম্মুখে আসা স্ত্রীর জন্যে জায়েয নয়।