📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 নৃত্য ও যৌন শিল্পকর্ম

📄 নৃত্য ও যৌন শিল্পকর্ম


ইসলাম যৌন উত্তেজক নৃত্য পেশা হিসেবে গ্রহণ করা আদৌ সমর্থন করে না। অনুরূপভাবে এমন কাজেও ইসলামে অনুমোদন নেই, যা মন-মেজাজে যৌন উত্তেজনা বৃদ্ধি করে। অশ্লীল গান, নির্লজ্জ অভিনয় এবং এ ধরনের অন্যান্য অর্থহীন কাজকর্ম এ পর্যায়ে পড়ে। বর্তমান কালে একে যদিও Art বা শিল্পকলা— এ লোভনীয় নামে অভিহিত করা হয় এবং তাকে উন্নতি-অগ্রগতি লাভের জন্যে অপরিহার্য মনে করা হয় কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে তা চরম গুমরাহী ভিন্ন আর কিছুই নয়।
বস্তুত বৈবাহিক সম্পর্ক ভিন্ন অন্য কোনভাবেই নারী-পুরুষের যৌন সম্পর্ক ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম ঘোষিত হয়েছে। যেসব কথা ও কাজ এ পথ উন্মুক্ত করে দেয়, ইসলামের দৃষ্টিতে তা সবই সম্পূর্ণ হারাম। কুরআন জ্বেনা-ব্যভিচার হারাম ঘোষণার জন্যে যে মুজিযাপূর্ণ পদ্ধতি অবলম্বন করেছে, তাতেই এই তত্ত্ব নিহিত। কুরআনের ঘোষণা হচ্ছে:
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَى أَنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً ، وَسَاءَ سَبِيلًا -
জ্বেনা-ব্যভিচারের নিকটেও ঘেঁষবে না। কেননা তা অত্যন্ত নির্লজ্জতার কাজ এবং খুবই কদর্য পথ ও উপায়। (সূরা বনী-ইসরাইল: ৩২)
ওপরে আমরা যা যা বলেছি, উপরন্তু যেসব কথাকে লোকেরা যৌন উত্তেজক মনে করে, তা সবই এ ব্যভিচারের নিকটবর্তী করে দেয়ার উপকরণ। বরং তা-ই মানুষকে সেদিকে উদ্বুদ্ধ করে, তার প্রতি আকর্ষণ তীব্র করে তোলে। কাজেই এ পর্যায়ে যত কাজ আছে তা যারা করে তারা খুবই মারাত্মক কাজ করে, তাতে সন্দেহ নেই।

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 ভাস্কর্য, প্রতিকৃতি ও ক্রুশ নির্মাণ শিল্প

📄 ভাস্কর্য, প্রতিকৃতি ও ক্রুশ নির্মাণ শিল্প


ইসলামে প্রতিকৃতি হারাম। উপরে বিস্তারিতভাবে তার বিশ্লেষণ দেয়া হয়েছে। প্রতিকৃতি নির্মাণ আরো কঠিনভাবে হারাম। বুখারী শরীফে উদ্ধৃত হয়েছে, সায়ীদ ইবনুল হাসান বলেন:
كُنْتُ عِنْدَ ابْنِ عَبَّاسٍ إِذْ جَاءَهُ رَجُلٌ فَقَالَ يَا ابْنَ عَبَّاسٍ إِنِّي رَجُلٌ أَنَّمَا مَعِيشَتِي مِنْ صَنَعَة يَدِى وَإِنِّي أَصْنَعُ هذه التَّصَاوِيرَ فَقَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ لا أُحَدِّثُكَ الأَمَا سَمِعْتُ مِنْ رَسُولِ الله صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَمِعْتُهُ يَقُولُ منْ صَوَّرَ صُورَةً فَإِنَّ اللَّهَ يَعَنِيَّةً حَتَّى يَنْفَخُ فِيْهَا الرُّوْحُ وَلَيْسَ بِنَافِخَ فِيْهَا أَبَدًا فَرَا بِالرَّجُلِ رَبْوَةٌ شَدِيدَةً فَقَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ وَيْحَكَ إِنْ أَبَيْتَ إِلَّا أَنْ تَصْنَعَ فَعَلَيْكَ بِهَذَا الشَّجَرِ وَكُلِّ شَيْءٍ لَيْسَ فِيهِ الرُّوحُ -
আমি ইবনে আব্বাস (রা)-এর কাছে উপস্থিত ছিলাম। এ সময় এক ব্যক্তি এল। বলল: হে ইবনে আব্বাস! হাতের কারিগরিই আমার জীবিকার উপায়। আমি এ ধরনের ছবি তৈরী করি। ইবনে আব্বাস (রা) বললেন: আমি স্বয়ং রাসূলে করীম (স)-কে যা বলতে শুনেছি, তোমাকে আমি ঠিক তাই শোনাব। আমি তাঁকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি ছবি বা প্রতিকৃতি নির্মাণ করবে তাতে রূহ দেয়ার শান্তি আল্লাহ্ তাকে দেবেন, কিন্তু সে তাতে রূহ কখনই দিতে পারবে না। এ কথা শুনে প্রতিক্রিয়ায় লোকটির মুখমণ্ডল বিকৃত ও ম্লান হয়ে গেল। ইবনে আব্বাস তাকে বললেন: তুমি যদি ছবি বা প্রতিকৃতি বানাতেই চাও, তাহলে গাছ ইত্যাদি নিষ্প্রাণ জিনিসের ছবি বানাও। (বুখারী)
মূর্তি, ক্রুশ- এধরনের সব জিনিস সম্পর্কে এ একই বিধান প্রযোজ্য।
তবে ফটোগ্রাফীর ছবি সম্পর্কে তো আমরা পূর্বেই বলেছি যে, শরীয়তের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ দৃষ্টিকোণ হচ্ছে, তা জায়েয। আর খুব বেশি বললে মাকরূহই বলা যায়। তবে শর্ত এই যে, সেই কাজটা মূলতঃ কোন হারাম উদ্দেশ্যে হতে পারবে না। যেমন নারীর যৌন আকর্ষণমূলক অঙ্গসমূহকে উলঙ্গ করে তোলা, নারী-পুরুষের চুম্বনরত অবস্থায় ছবি এবং যেসবের বড়ত্ব বা পবিত্রতা প্রতিষ্ঠা করা হয়, সেসবের ছবি তোলা- যেমন ফেরেশতা, নবী-রাসূল ইত্যাদির ছবি।

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 মাদক ও জ্ঞান-বুদ্ধির বিনষ্টকারী দ্রব্যাদি শিল্প

📄 মাদক ও জ্ঞান-বুদ্ধির বিনষ্টকারী দ্রব্যাদি শিল্প


পূর্বেই বলা হয়েছে, মাদক- মদ্য প্রচলনে যে কোন রকমের অংশগ্রহণ বা সাহায্য সহযোগিতাকে ইসলাম হারাম ঘোষণা করেছে। তা বানান- প্রস্তুত করণ, বন্টন বা পান করা- করান, সবই সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। যে লোকই এ কাজ করবে, সে-ই রাসূলের ভাষায় অভিশপ্ত।
হাশীশ ও আফিমের ন্যায় বিবেক-বুদ্ধি বিলোপকারী যাবতীয় দ্রব্যাদি মাদক দ্রব্যের মতই হারাম। এসব জিনিসের লেন-দেন, ক্রয়-বিক্রয়, বিলি-বন্টন ও তার উৎপাদন শিল্প- সবই হারাম। মুসলমানের পক্ষে এমন কোন শিল্পকর্ম বা পেশা অবলম্বন করা যা হারাম কাজের ওপর ভিত্তিশীল কিংবা যার দ্বারা কোন হারাম কাজের প্রচলন ঘটে ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অপছন্দনীয়, অবাঞ্ছনীয়।

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 ব্যবসা করে উপার্জন করা

📄 ব্যবসা করে উপার্জন করা


ইসলাম কুরআনী ঘোষণা ও রাসূলের সুন্নাতের মাধ্যমে ব্যবসা করার ওপর খুব বেশি গুরুত্ব আরোপ করেছে এবং তা করার জন্যে বলিষ্ঠ আহ্বান জানিয়েছে। এ উদ্দেশ্যে বিদেশ সফরের জন্যেও উৎসাহ দিয়েছে এবং তাকে আল্লাহ্র অনুগ্রহ সন্ধান বলেছে। ওপরন্তু ব্যবসায়ের জন্যে যারা বিদেশ সফর করে তাদের উল্লেখ করা হয়েছে আল্লাহর পথে জিহাদকারী লোকদের সাথে। বলা হয়েছে:
وَأَخَرُونَ يَضْرِبُونَ فِي الْأَرْضِ يَبْتَغُونَ مِنْ فَضْلِ اللَّهِ لَا وَأَخَرُونَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ الله -
কিছু লোক আল্লাহ্র অনুগ্রহের সন্ধানে বিদেশ সফর করবে এবং অপর কিছু লোক আল্লাহ্র পথে যুদ্ধ-জিহাদ করবে। (সূরা মুজাম্মিল: ২০)
আন্তর্জাতিক ব্যবসার জন্যে সামুদ্রিক যোগাযোগ ও যাতায়াত পথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ পথই মানুষে ও জাতিসূহের জন্যে অভ্যন্তরীন ও বৈদেশিক বাণিজ্যের অবাধ সুযোগ করে দিয়েছে। এ ব্যাপরটাকে আল্লাহ তা'আলা মানুষের প্রতি তাঁর এক বিশেষ অনুগ্রহের অবদান বলে উল্লেখ করেছেন। সমুদ্র নিয়ন্ত্রণ ও অনুকূল বানান ও জাহাজ চালানর সুযোগ দানের অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করে আল্লাহ তা'আলা নিজেই বলেছেন:
وَتَرَى الْفُلْكَ فِيهِ مَوَاجِرَ لِتَبْتَغُوا مِنْ فَضْلِهِ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ -
আর তোমরা দেখতে পাও, নদী-সমুদ্রে নৌকা-জাহাজ পানির বক্ষ দীর্ণ করে চলাচল করছে, যেন তোমরা তাঁর অনুগ্রহের সন্ধান করতে পার এবং তাঁর শোকর আদায় করতে পার। (সূরা ফাতির: ১২)
কোন কোন আয়াতে সেই সাথে বাতাস চালাবার কথাও বলা হয়েছে:
وَمِنْ أَيْتِهِ أَنْ يُرْسِلَ الرِّيحَ مُبَشِّرَاتِ وَلِيُذِ يُقَكُمْ مِّنْ رَّحْمَتِهِ وَلِتَجْرِيَ الْفُلْكَ بِأَمْرِهِ وَلِتَبْتَغُوا مِنْ فَضْلِهِ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ (الروم ٤٦)
তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে এটাও যে, তিনি বাতাসসমূহকে সুসংবাদ দেয়ার ও তোমাদেরকে তাঁর রহমতের সাথে পরিচিতকরণের জন্যে পাঠান এবং এজন্যেও যে, নৌকা-জাহাজগুলো তাঁর নির্দেশে চলতে পারে এবং তোমরা তাঁর অনুগ্রহের সন্ধান করতে ও তাঁর শোকর আদায় করতে পার।
আল্লাহ তা'আলা মক্কায় লোকদের প্রতি অনুগ্রহ করে তাদের জন্যে এমন সব ব্যবস্থা কার্যকর করে দিয়েছেন যে, তাদের নগর মক্কা সমগ্র আরব উপদ্বীপের মধ্যে একটি বিশেষ ও বিশিষ্ট ধরনের ব্যবসা কেন্দ্র হয়ে গিয়েছিল। হযরত ইবরাহীম (আ) দো'আ করেছিলেন:
فَاجْعَلْ أَفْئِدَةً مِّنَ النَّاسِ تَهْوِي إِلَيْهِمْ وَارْزُقْهُمْ مِنَ الثَّمَرَاتِ لَعَلَّهُمْ يَشْكُرُونَ - (ابراهیم - ۳۷)
অতএব হে আল্লাহ্! তুমি লোকদের মনকে তাদের প্রতি আগ্রহী বানিয়ে দাও এবং তাদের রিস্ক দাও নানা প্রকারের ফলমূল দিয়ে, যেন তারা শোকর করতে পারে।
এ দো'আও মক্কাবাসীদের জন্যে খুবই কল্যাণকর প্রমাণিত হয়েছে। অনুরূপভাবে কুরাইশদের প্রতিও আল্লাহ্ তা'আলা অনুগ্রহ করেছিলেন ইয়েমেনমুখী শীতকালীন ব্যবসায়ী সফর এবং সিরিয়ামুখী গ্রীষ্মকালীন ব্যবসায়ী সফরে সুষ্ঠু ও নিরাপদ ব্যবস্থা করে দিয়ে। আর তাদের এ সফরকালীন নিরাপত্তা ছিল আল্লাহ্ বিশেষ অনুগ্রহ এবং তা করা হয়েছিল এজন্যে যে, তারা কাবা ঘরের খেদমতে আঞ্জাম দিত। অতএব তাদের উচিত একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করে তাঁর এ অনুগ্রহের শোকর আদায় করা। কেননা তিনিই কাবা ঘরের একমাত্র রব্ব একমাত্র অনুগ্রহকারী আল্লাহ।
لإِيلافِ قُرَيْشِ الْفِهِمْ رِحلة الشتاء والصيف - فَلْيَعْبُدُوا رَبِّ هَذَا الْبَيْتِ .. الَّذِي أَطْعَمَهُمْ مِنْ جُوعٍ وَآمَنَهُمْ مِنْ خَوْفٌ -
যেহেতু কুরাইশরা অভ্যস্ত হয়েছে অর্থাৎ শীতকালীন ও গ্রীষ্মকালীন বিদেশ সফরে তাদের অভ্যাস রয়েছে। অতএব তাদের কর্তব্য এ ঘরে আল্লাহ্ ইবাদত করা, যিনি তাদের ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্যে খেতে দিয়েছেন এবং সকল প্রকারের ভয়-ভীতি থেকে নিরাপত্তা দান করেছেন। (সূরা কুরাইশ)
ইসলাম মুসলমানকে আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী লেন-দেন ও যাতায়াত-যোগাযোগের বিরাট সুযোগ করে দিয়েছে। প্রত্যেক বছর হজ্জের সময় এ সুযোগ আসে। আল্লাহ্ তা'আলা স্পষ্ট ভাষায় এ হজ্জকালীন সফরের কথা উল্লেখ করে বলেছেন:
يَأْتُوكَ رِجَالًا وَعَلَى كُلِّ ضَامِرٍ يَأْتِينَ مِنْ كُلِّ فَجٍّ عَمِيقٍ - لِيَشْهَدُوا مَنَا فِعَ لَهُمْ وَيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ -
তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং প্রত্যেক ধরনের সরয়ারীতে আরোহণ করে প্রত্যেক গভীর-সংকীর্ণ গলি খুঁজি দিয়ে, যেন তারা তাদের জন্যে রক্ষিত কল্যাণের ব্যবস্থাসমূহ দেখতে পারে ও আল্লাহ্র নাম উচ্চারণ করতে পারে।
আয়াতে উল্লিখিত 'কল্যাণকর ব্যবস্থাসমূহের' মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা হচ্ছে ব্যবসা। কিন্তু মুসলমানরা হজ্জের সময় ব্যবসা করতে কুণ্ঠাবোধ করত। তারা মনে করত, হজ্জের সময় ব্যবসা করলে হজ্জের খালেস নিয়তে দোষ প্রবেশ করবে এবং তাদের ইবাদতের পরিচ্ছন্নতা ও নিষ্কলুষতা বিনষ্ট হবে। এ পর্যায়ে কুরআন মজীদে স্পষ্ট ভাষায় বলে দেয়া হয়েছে:
لَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَنْ تَبْتَغُوا فَضْلًا مِنْ رَّبِّكُمْ -
তোমরা যদি হজ্জকালে তোমাদের আল্লাহ্ কাছ থেকে অনুগ্রহ পেতে চাও, তবে তাতে তোমাদেব কোন দোষ হবে না। (সূরা বাকারা : ১৯৮)
যে সব লোক মসজিদে বসে সকাল সন্ধা আল্লাহ্ তসবীহ জপে কুরআন মজীদ তাদের উদ্দেশ্য করে বলেছেঃ
رِجَالٌ لَا تُلْهِيهِمْ تِجَارَةً وَلَا بَيْعٌ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ وَإِقَامِ الصَّلوةِ وَإِيتَاءِ الزَّكوة -
এমন বহু লোক রয়েছে, ব্যবসা বা নগদ বেচা-কেনা যাদের আল্লাহর যিকির নামায কায়েম করা ও যাকাত দেয়ার দ্বীনী কাজ-কর্ম থেকে ভুলিয়ে রাখতে পারে না। (সূরা আন-নূরঃ ৩৭)
এর অর্থ কুরআনের দৃষ্টিতে মুসলমান মসজিদের মধ্যে বন্দী হয়ে থাকা লোক হতে পারে না। নয় তারা দরবেশ, পরনির্ভরশীল বা দুনিয়া ত্যাগী যোগী-সন্ন্যাসী বা বৈরাগী। অনুরূপভাবে তারা দুনিয়ার কাজে একান্তভাবে মশগুল হয়ে যাওয়া লোকও নয়। আসলে তারা হচ্ছে কাজের লোক। আর তাদের বিশেষত্ব হচ্ছে, তাদের বৈষয়িক কাজ দ্বীনী দায়িত্ব পালন থেকে তাদের বিরত ও বিস্মৃত করে রাখতে পারে না।
কুরআন মজীদে ব্যবসা সংক্রান্ত কথাবার্তার কিয়দংশ আমরা উপরে তুলে ধরলাম।
এরপর সুন্নত ও হাদীসের কথা। নবী করীম (স) নিজে ব্যবসা করার ওপর খুব বেশি গুরুত্ব আরোপ করেছেন এবং তা করার জন্যে বলিষ্ঠ আহ্বান জানিয়েছে। এ ব্যাপারটি তাঁর কাছে ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি নিজে কথা ও কাজ দ্বারা এ কাজের ভিত্তি সুদৃঢ় করে দিয়েছেন।
এ পর্যায়ে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কথাসমূহের মধ্য থেকে কতিপয় নীতিকথা এখানে উল্লেখ করছি:
التَّاجِرُ الْأَمِينُ الصَّدُوقُ مَعَ الشُّهَدَاءِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ - (ابن ماجه، حاكم)
বিশ্বস্ত সত্যাশ্রয়ী ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন শহীদদের সাথে অবস্থান করবে।
النَّاجِرُ الصَّدُوقُ الْأَمِينُ مَعَ النَّبِيِّينَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاء -
সততা পরায়ণ বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী নবী স্বয়ং সিদ্দীক ও শহীদদের সঙ্গী হবেন।
নবী করীম (স) ব্যবসায়ীদের মুজাহিদ ও আল্লাহ্র পথে শাহাদত বরণকারীদের সমান মর্যাদায় উল্লেখ করেছেন দেখেও আমাদের মনে কোন বিস্ময়ের উদ্রেক হয় না। কেননা, জীবনের অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে প্রমাণ করেছে যে, জিহাদ কেবলমাত্র যুদ্ধের ময়দানেই অনুষ্ঠিত হয় না, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও এই জিহাদ অবশ্যম্ভাবী।
রাসূলে করীম (স) ওয়াদা করেছেন, ব্যসায়ীরা আল্লাহ্র কাছে এ উচ্চ মর্যাদা লাভ করবে এবং পরকালে তাদের জন্যে হবে এই অশেষ সওয়াব। কেননা, ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে প্রায়ই লোভ ও লালসার দাসত্ব হতে দেখা যায়। যে কোন উপায়ে মুনাফা লুণ্ঠনের প্রবনতা খুবই প্রকট হয়ে থাকে এ ক্ষেত্রে। আর ধন ধন সৃষ্টি করে, মুনাফা আরও মুনাফা লাভের জন্যে মানুষকে প্ররোচিত করে। কিন্তু যে ব্যবসায়ী সততা ন্যায়পরায়ণতা ও বিশ্বস্ততা রক্ষা করে, সে তো জিহাদকারী ব্যক্তি। সে প্রতিনিয়ত লোভ-লালসার সাথে মুকাবিলা করে চলছে। অতএব মুজাহিদের মর্যাদা তার জন্যে খুবই শোভনীয় এবং বাঞ্ছনীয়।
ব্যবসায়ের ধর্ম হচ্ছে, তা মানুষকে ধন-দৌলতের স্তুপে ডুবিয়ে দেয়। সে দিন-রাত মূলধন ও মুনাফার হিসেব করতেই নিমগ্ন হয়ে থাকে। এমন কি আমরা দেখতে পাচ্ছি, নবী করীম (স) মিম্বরের ওপর দাঁড়িয়ে খোতবা দিচ্ছেন, এমন সময় একটি ব্যবসায়ী কাফেলা পণ্য-দ্রব্য-সম্ভার নিয়ে তথায় উপস্থিত হয়। লোকেরা এই কাফেলার পৌঁছার খবর পাওয়ার সাথে সাথে রাসূলের খোত্ত্বার প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে সেদিকে দৌড়ে গেল। এ প্রক্ষিতেই কুরআন মজীদের নিম্নোক্ত আয়াতটি নাযিল হয়:
وَإِذَا رَأَوْا تِجَارَةً أَوَلَهْوًا نِ انْفَضُّوا إِلَيْهَا وَتَرَكُوكَ قَائِمًا ، قُلْ مَا عِنْدَ اللَّهِ خَيْرٌ مِنَ اللهْوِ وَمِنَ التِّجَارَةِ ، وَاللَّهُ خَيْرُ الرَّزِقِينَ .
ওরা যখন কোন ব্যবসা বা আনন্দানুষ্ঠান দেখে তখন ওরা সেদিকেই দৌড়ে যায় এবং হে নবী তোমাকে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় ফেলে যায়। যা কিছু আল্লাহ্র কাছে রয়েছে তা এ আনন্দানুষ্ঠান ও ব্যবসা অপেক্ষা অনেক ভাল ও কল্যাণময় এবং আল্লাহই হচ্ছে সর্বত্তম রিযিকদাতা। (সূরা জুমা'আঃ ১১)
কাজেই যে লোক এ ঘর্ণাবর্তে পড়েও দৃঢ় ঈমানদার ও প্রত্যয়শীল, আল্লাহ্র ভয়ে ভরপুর অন্তর ও আল্লাহ্ যিকিরে সিক্ত হয়ে থাকতে পারে, সে তো নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ নিয়ামত প্রাপ্ত নবী, সিদ্দীক ও শহীদদের মধ্যে গণ্য হবে।
ব্যবসার ব্যাপারে আমাদের পথ-প্রদর্শনের জন্যে রাসূলে করীম (স)-এর কর্মনীতিই যথেষ্ট। তিনি যেমন আধ্যাত্মিক দিকের প্রতি পূর্ণ মাত্রায় গুরুত্বারোপ করেছেন, তেমনি মদীনায় তাকওয়ার ও আল্লাহর সন্তুষ্টির ভিত্তিতে মসজিদও কায়েম করেছিলেন। যেন তা আল্লাহ্র ইবাদত, ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা ও চর্চা এবং দ্বীনী দাওয়াত প্রচারের কেন্দ্র হওয়ার সাথে সাথে রাষ্ট্র এবং সরকারেরও কেন্দ্র (Head Quarter) হতে পারে। তিনি মানুষের অর্থনৈতিক দিকের ওপরও যথাযথ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি খালেস ইসলামী বাজার সৃষ্টি করেছিলেন, যার ওপর ইয়াহুদীদের কোন কর্তৃত্ব বা আধিপত্য চলতে পারত না। পূর্ব থেকে চলে আসা বনু কায়নুকা বাজার ইয়াহুদীদেরই কর্তৃত্বাধীন ছিল। নবী করীম (স কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বাজারের ব্যবস্থাপনা ও নিয়ম-কানুন নিজেই প্রচলন করেছিলে এবং নিজেই সেটার দেখাশোনা করতেন। এ বাজারটির বৈশিষ্ট্য এই ছিল যে তথায় কোনরূপ ধোঁকা-প্রতারণা ঠকাঠকির কারবার বা মাপে-ওজনে কোনরূপ কম-বেশি করার কিংবা পণ্যদ্রব্য আটক করে লোকদের কষ্ট দেয়ার কোন সুযোগই ছিল না।
এ সবের সাথে সাথে আমরা লক্ষ্য করছি, রাসূলে করীমের সাহাবিগণের মধ্যে সুবিজ্ঞ ব্যবসায়ী, সুদক্ষ কারিগর, কৃষক এবং সামাজিক জীবনের প্রয়োজনীয় সকল কাজ ও বিদ্যার দক্ষতাসম্পন্ন ও পেশাবলম্বনকারী লোক রয়েছেন।
রাসূলে করীম (স) লোকদের মধ্যে বসবাস করতেন। তাঁর ওপর আল্লাহ্ ফরমান- কুরআনের আয়াত নাযিল হতো। লোকদের মধ্যে তিনি তা পাঠ করে শোনাতেন। জিবরাঈল (আ) সকাল-সন্ধ্যা ওহী নিয়ে তাঁর কাছে আসতেন। সাহবিগণের অবস্থা ছিল এই যে, তাঁরা রাসূলে করীম (স) থেকে এক মুহূর্তের তরেও বিচ্ছিন্ন হওয়া পছন্দ করতেন না। এসব সত্ত্বের আমরা দেখি, সমস্ত সাহাবী নিজ নিজ কাজ ও পেশায় মগ্ন রয়েছেন। কেউ হয়ত ব্যবসায়ী সফর করেছেন, কেউ নিজের খেজুরের বাগান নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। আবার কেউ কেউ নিজের পেশা ও কারিগরি কাজ নিয়ে মশগুল থাকার দরুন রাসূলে করীমের কাছে উপস্থিত হয়ে দ্বীন শেখার কাজ থেকে বঞ্চিত থাকছেন। ফলে তিনি তাঁর অপর এক ভাই- যিনি রাসূলের দরবারে উপস্থিত থাকতে পেরেছিলেন- থেকে সব কিছু জেনে নিচ্ছেন। এটা তাঁদের কর্তব্যও ছিল। কেননা রাসূলে করীম (স) স্থায়ী নীতি হিসাবে ঘোষণা করে দিয়েছিলেনঃ
فَلْيُبَلِّغَ الشَّاهِدُ الْغَائِبَ -
উপস্থিত লোক যেন অনুপস্থিত ব্যক্তির কাছে সবকিছু পৌঁছে দেয়।
অধিকাংশ আনসার কৃষিকাজে রত থাকতেন। আর মুহাজিররা সাধারণত: ব্যবসায়ী ছিলেন। আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা) মুহাজির ছিলেন। তাঁর কর্মনীতি আমাদের সম্মুখে চিরভাস্বর হয়ে আছে। তাঁর দ্বীনী ভাই সা'দ ইবনে আনসারী তাঁকে তাঁর অর্ধেক সম্পদ, তাঁর দুটি বাড়ির একটি এবং দুই স্ত্রীর মধ্য থেকে একজন স্ত্রীকে তালাক দিয়ে তাঁর কাছে বিবাহ দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি এ বিরাট ত্যাগের জবাবে অনুরূপ বিরাট আত্মসম্মানবোধ দেখালেন। তিনি সা'দ (রা)-কে বললেন:
بَارَكَ اللَّهُ لَكَ فِي مَالِكَ وَأَهْلِكَ لَا حَاجَةً لِي فِي ذَلِكَ هَلْ مِنْ سُوقٍ فِيهِ تِجَارَةٌ -
আল্লাহ্ আপনার ধন-মাল ও পরিবার-পরিজনে বরকত দিন। আমার ওসবের কোন প্রয়োজন হবে না। এখানে ব্যবসা করার মতো কোন বাজার থাকলে আমাকে দেখিয়ে দিন, আমি ব্যবসা করব।
সা'দ বললেন, হ্যাঁ, বনু কায়নুকার বাজার রয়েছে তো! পরের দিন তিনি পনির ও ঘি সহ বাজারে চলে গেলেন ও বিক্রি করেন। তিনি এ ব্যাবসা চালিয়ে প্রচুর সম্পদ উপার্জন করেন। মৃত্যুকালে তিনি এক বিপুল বৈভব রেখে গিয়েছিলেন।
হযরত আবূ বকর (রা)-এর দৃষ্টান্ত আরও ভাস্বর। তিনি বরাবর ব্যবসাই করেছেন। এজন্যে প্রাণপণ খাটা-খাটুনি করতেন। এমন কি খলীফা নির্বাচিত হওয়ার দিনও তিনি বাজারে যাওয়ার ইচ্ছা করলেন।
হযরত উমর (রা) নিজের সম্পর্কে বলেন :
الْهَانِي الصَّفَقُ بِالْأَسْوَاقِ عَنْ سَمَاعِ حَدِيْثِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ -
বাজারের কেনা-বেচা আমাকে এমনভাবে মশগুল করে রেখেছিল যে, আমি রাসূলে করীম (স)-এর হাদীস শ্রবণ থেকে বঞ্চিত থেকে গেলাম।
হযরত উসমান (রা) ও অপরাপর সাহাবী সম্পর্কে এই কথা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00