📄 হারাম কৃষিকার্য
ইসলাম যে সব উদ্ভিদ খাওয়া হারাম ঘোষণা করেছে কিংবা যার ব্যবহার ক্ষতিকর, তার চাষাবাদও হারাম। যেমন গাঁজা, আফিম ইত্যাদি।
তামাক সম্পর্কেও এ কথা। তবে তা হারাম যাঁরা মনে করেন, তামাক খাওয়া হারাম তাঁদের মতে। অনেকে এ মতটাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। আর যাদের মতে তামাক খাওয়া মাকরূহ, তাদের মতে তার চাষাবাদও মাকরূহ।
অমুসলিমদের কাছে বিক্রয় করে অর্থ পাওয়া যাবে- এ উদ্দেশ্যে কোন হারাম জিনিসের চাষাবাদ করা মুসলমানের পক্ষে জায়েয নয়। মুসলমান হারাম জিনিসের প্রচলন করার কাজ কখনই করতে পারে না। তাই শূকর লালন-পালন করা ও অমুসলমান খৃস্টান প্রভৃতির নিকট বিক্রয় করার উদ্দেশ্যে- মুসলমানদের জন্যে জায়েয নয়। আমরা পূর্বেই বলেছি ইসলামের দৃষ্টিতে হালাল আঙুর এমন ব্যক্তির কাছে বিক্রয় করা জায়েয নয়, যে তা দিয়ে সুরা (মদ) বানাবে বলে জানা যাবে।
📄 শিল্প ইত্যাদি
ইসলাম কৃষিকর্মের উৎসাহ দিয়েছে। তার সৌন্দর বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছে। এ কাজে বিপুল সওয়াব হওয়ার কথাও বলে দিয়েছে। কিন্তু মুসলিম মিল্লাতের লোকেরা কেবল কৃষিকর্মে মগ্ন হয়ে থাকবে- যেমন ঝিনুকের পোকা (Sea sell) ঝিনুকের মধ্যেই বন্দী থাকে- তা আদৌ পছন্দনীয় নয়। শুধু কৃষিকার্যকে যথেষ্ট মনে করা ও চাষের গরুর পিছনে পিছনে চলতে থাকাকে ইসলাম মুসলমানদের জন্যে পছন্দ করে না। কেননা তাই যদি হয় তাহলে সম্ভাব্য জাতীয় বিপদ-আপদের মুকাবিলা করা তাদের পক্ষে সম্ভবপর হবে না। এ কারণে নবী করীম (স) যদি কৃষিকাজকে লাঞ্ছনার কাজ বলে থাকেন, তাহলে তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। কেননা কালের বাস্তবতা সেই কথার সত্যতা প্রকট করে তুলেছে। তিনি বলেন:
اِذَا تَبَا يَعْتُمْ بِالْعَيْنَة وَأَخَذْتُمْ أَذْنَابَ الْبَقَرِ وَرَضِيْتُمْ بِالزِّرْعِ وَتَرَكْتُمُ الْجِهَادَ سَلَّطَ اللهُ عَلَيْكُمْ ذلالا يَنْزِعُهُ عَنْكُمْ حَتَّى تَرْجِعُوا إِلى دِينِكُمْ -
তোমরা যদি সুদভিত্তিক বেচা-কেনার কাজ কর ও গরু-মহিষের লেজুর ধরেই পড়ে থাক, জিহাদে মনোযোগ না দিয়ে কৃষিকার্যে মগ্ন হয়ে থাক, তাহলে আল্লাহ্ তোমাদের ওপর লাঞ্ছনা চাপিয়ে দেবেন। পরে তা দূর করা যাবে না যতক্ষণ না তোমরা তোমাদের দ্বীনের প্রতি প্রত্যাবর্তন করবে। (আবু দাউদ)
এ কারণে কৃষি কার্যেরে সঙ্গে সঙ্গে শিল্প-পেশার কাজ করাও জরুরী। এসবের সাহায্যেই সচ্ছল-স্বচ্ছন্দ জীবনের প্রয়োজন এবং একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী উম্মত- একটি সুদৃঢ় ও স্বয়ংসম্পূর্ণ সরকার ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার দাবিসমূহ পূরণ হতে পারে। শিল্প পেশা ইসলামের দৃষ্টিতে একটা বৈধ কাজ-ই নয়- যেমন কোন কোন আলিম ও ইমাম বলেছেন- তা ফরযে কিফায়াও অর্থাৎ মুসলিম সমাজে সর্ব প্রকারের শিল্প ব্যবসায়ে পারদর্শী এত বেশি লোকের বর্তমান থাকা আবশ্যক যেন জাতীয় প্রয়োজন পূরণ হতে কোন অসুবিধাই না হয় ও তার নিজের যাবতীয় কাজ সুসম্পন্ন করা তার পক্ষে সম্ভব হয়। শিল্প পেশার কোন দিক যদি এমন অনটন দেখা দেয় যে, সে কাজ করার লোকই পাওয়া যায় না, তাহলে গোটা সমাজ ও জাতিই সেজন্যে দোষী ও গুনাহগার হবে- বিশেষ করে নেতৃবৃন্দ ও রাষ্ট্র পরিচালকবৃন্দ সেজন্যে দায়ী হবে।
ইমাম গাজালী (র) বলেছেন:
সেসব জ্ঞান অর্জনই ফরযে কিফায়া, যা ছাড়া মানুষের বৈষয়িক জীবন চলতে পারে না। যেমন চিকিৎসা বিদ্যা, দেহের সুস্থতা রক্ষার জন্যে তা একান্তই জরুরী। অংক বা হিসাববিদ্যা, পারস্পরিক লেন-দেন, অসীয়ত ও মীরাস বন্টনসহ যাবতীয় কাজে তা অপরিহার্য। সে সব বিদ্যা- এমন যে, তা জানা-লোক বর্তমান না থাকলে জনগণকে কঠিন অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়। আর কেউ যখন এ ধরনের কাজে লেগে যায়, তখন অন্যরা এ কাজের দায়িত্ব থেকে মুক্তি লাভ করে। এ কারণে আমাদের মতে চিকিৎসা ও হিসাববিদ্যা ফরযে কিফায়া। বনেদী ধরনের কাজ ও শিল্পও ফরযে কিফায়া ছাড়া আর কিছু নয়। যেমন জমি চাষাবাদ, হালচাষ, কাপড় বুনন, পশু পালন ইত্যাদি। ক্ষৌর কার্য ও দর্জীকর্ম করাও এ ফরয়ে কিফায়াই। কোন দেশে এসবের ব্যবস্থা না থাকলে ধ্বংস ও বিপর্যয় ব্যাপক হয়ে আসবে। কেননা যিনি রোগ সৃষ্টি করেছেন, তিনি তার ঔষধ এবং চিকিৎসারও ব্যবস্থা করেছেন, তার ব্যবহারের নিয়ম পদ্ধতিও বলে দিয়েছেন। কাজেই সে সব ত্যাগ করে নিজেদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়া কিছুতেই জায়েয হতে পারে না। ( احياء العلوم ج ١ ص ٥)
কুরআন মজীদে বহু প্রকারের শিল্পকর্মের প্রতি ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে এবং সেগুলো যে দুনিয়ার মানুষের প্রতি আল্লাহ্ বড় নিয়ামত, তা স্পষ্ট করে বলা হয়েছে: যেমন হযরত দাউদ (আ) সম্পর্কে বলা হয়েছে:
وَالنَّالَهُ الْحَدِيدَ - أَنِ اعْمَلْ سَابِغَاتِ وَقَدِرْ فِي السَّرْدِ -
আমরা তার জন্যে লোহাকে নরম করে দিয়েছি, নির্দেশ দিয়েছি, বর্ম তৈয়ার কর এবং তার কড়াগুলো ঠিক পরিমাণ মতো বানাও। (সূরা সাবা : ১০-১১)
وَعَلَّمْنَاهُ صَنْعَةَ لَبُوسٍ لَّكُمْ لِتُحْصِنِكُمْ مِنْ بَأْسِكُمْ ، فَهَلْ أَنْتُمْ شَاكِرُونَ .
আর আমরা তাকে বর্ম তৈয়ার করার শিল্পবিদ্যা শিক্ষা দিয়েছিলাম, যেন তা যুদ্ধে তোমাদের প্রতিরক্ষা করতে পারে। তাহলে তোমরা কি শোকর আদায় করবে? (সূরা আম্বিয়া : ৮০)
হযরত সুলায়মান (আ) সম্পর্কে বলা হয়েছে।
وَأَسَلْنَا لَهُ عَيْنَ القِطْرِ، وَمِنَ الجِنِّ مَنْ يَعْمَلُ بَيْنَ يَدَيْهِ بِإِذْنِ رَبِّهِ وَمَنْ يُزِغْ مِنْهُمْ عَنْ أَمْرِنَا نُذِقْهُ مِنْ عَذَابِ السَّعِيرِ - يَعْمَلُونَ لَهُ مَا يَشَاءُ مِنْ مَحَارِيْبَ وَتَمَاثِيْلَ وَجِفَانِ كَالْجَوَابِ وَقُدُ وررأسيات ، اعْمَلُوا آلَ دَاؤُدَ شُكْرًا. (سبا : ১২-১৩)
আর আমরা তার জন্যে তামার ঝর্ণা প্রবাহিত করেছি এবং এমন জ্বিন তার অধীন করে দিয়েছি যারা তাদের আল্লাহ্র নির্দেশে তার সম্মুখে কাজ করত। তাদের মধ্যে যে যে আমার নির্দেশ অমান্য করত, তাকে আমরা জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডলির আযাবের স্বাদ আস্বাদ করাতাম! তারা তার (সুলায়মানের) জন্য যা সে চাইত, নির্মাণ করত, উঁচু উঁচু প্রাসাদ ইমারত, প্রতিকৃতি, বড় বড় পানি সঞ্চয় পাত্র- যেমন লগন ও স্বস্থানে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত ডেগসমূহ। হে দাউদ বংশধরেরা! শোরক আদায়কারী হিসেবে কাজ কর।
কুরআনের যুল-কারনাইনের সুউচ্চ সুদৃঢ় প্রাচীর নির্মাণেরও উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে:
مَا مَكَّنِي فِيْهِ رَبِّي خَيْرٌ فَا عِينُونِي بِقُوَّةٍ أَجْعَلْ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُمْ رَدْمًا - أَتُونِي زيرَ الْحَدِيدِ ، حَتَّى إِذا ساوَى بَيْنَ الصَّدَ فَيْنِ قَالَ انْفُخُوا ، حَتَّى إِذَا جَعَلَهُ نَاراً لَا قَالَ أَتُونِي أَفْرِغْ عَلَيْهِ قطراً - فَمَا اسْطَاعُوا أَنْ يَظْهَرُوهُ وَمَا اسْتَطَاعُوا لَهُ نَقْبًا
আমার রব্ব আমাকে যা কিছু দিয়েছেন তা অনেক। তোমরা শুধু শ্রম-মেহনত করেই আমার সাহায্য কর। আমি তোমাদের ও তাদের মাঝখানে বাঁধ বেঁধে দেব। আমাকে লোহার চাদর এনে দাও। শেষে দুটো পর্বতের মধ্যকার শূণ্যতাকে সে যখন ভরাট করে দিল, তখন লোকদের বলল, এখন আগুন জ্বালাও। যখন এই অগ্নি-প্রাচীর আগুনের মতো সম্পূর্ণ লাল বর্ণ ধারণ করল, তখন সে বলল, আনো এখানে আমি তার ওপর গলিত তামা ঢেলে দেব। এ বাঁধটি এতই দৃঢ় বানান হয়েছিল যে, ইয়াজুজ-মাজুজ তার ওপর চড়েও আসতে পারত না, আর তার মধ্যে সুরঙ্গ রচনাও তাদের জন্যে আরো কঠিন ছিল। (সূরা কাহাফ: ৯৫-৯৭)
হযরত নূহের নৌকা নির্মাণের কাহিনীও কুরআনে উদ্ধৃত হয়েছে। তাতে এক সুদৃঢ় জাহাজ নির্মাণের ইশারা বিধৃত, যা নদী সমুদ্রে পাহাড়ের মতো উন্নত হয়ে চলতে সক্ষম। বলা হয়েছে:
وَمِنْ آيَاتِهِ الْجَوَارِ فِي الْبَحْرِ كَالْأَعْلَامِ -
নদী-সমূদ্রের বুকে পর্বতের ন্যায় মাথা উঁচু করে চলমান জাহাজগুলো আল্লাহরই নিদর্শন বিশেষ। (সূরা শূরা: ৩২)
কুরআনের বহু সংখ্যক সূরায় সর্বপ্রকারের শিকার-বিদ্যা ও কার্যের উল্লেখ হয়েছে। যেমন মৎস্য শিকার, সামুদ্রিক জন্তু শিকার, স্থলভাগের জন্তু শিকার এবং মণি-মুক্তা আহরণের উদ্দেশ্যে ডুবুরি বিদ্যা ইত্যাদি।
সর্বোপরি কুরআন মজীদে লোহার সঠিক মূল্য ও কর্যকারিতার উল্লেখ হয়েছে।
তার পূর্বের কোন ধর্মগ্রন্থ বা মানবরচিত গ্রন্থেও তার উল্লেখ পাওয়া যায়না। কুরআনে রাসূল প্রেরণ ও কিতাব নাযিল করণের উল্লেখ করার পর বলা হয়েছে:
وَأَنْزَ لَنَا الْحَدِيدَ فِيهِ بَأْسٌ شَدِيدٌ وَمَنَا فِعُ لِلنَّاسِ -
এবং আমরা লোহা সৃষ্টি করেছি। তাতে কঠিন শক্তি নিহিত রয়েছে এবং আছে জনগণের অশেষ অসীম কল্যাণ।
এ আয়াতটি যে সূরা'র অন্তর্ভুক্ত, সেই গোটা সূরা'র নামই রাখা হয়েছে 'আল-হাদীদ' বা 'লৌহ'। এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, লৌহ শিল্পের ওপর ইসলাম বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
বস্তুত ইসলামের দৃষ্টিতে মানব সমাজের প্রয়োজন পূরণ ও প্রকৃত কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যে যে শিল্পকর্মই করা হবে, তা-ই 'আমলে সালেহ'- নেক আমল বিবেচিত হবে। যদি সে কাজে সত্যিই আন্তরিকতা রক্ষা করা হয় এবং যেরূপ নৈপূণ্য ও দক্ষতা অবলম্বন করতে ইসলাম নির্দেশ দিয়েছে, তা পুরোমাত্রায় অবলম্বিত হয়।
মানব সমাজে অত্যন্ত হীন ও নগণ্য বিবেচিত কত শিল্প-পোশাকে ইসলাম অত্যন্ত মর্যাদাবান বানিয়েছে। যেমন ছাগল চরানর রাখালকে লোকেরা সম্মানের চোখে দেখত না। কিন্তু নবী করীম (স) বলেছেন:
مَا بَعَثَ اللَّهُ نَبِيًّا إِلَّا رَعَى الْغَنَمَ - আল্লাহ্ প্রেরিত প্রত্যেক নবীই ছাগল চরিয়েছেন। সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন:
وَأَنْتَ يَا رَسُولَ الله . হে রাসূল! আপনিও কি ছাগল চরিয়েছেন? জবাবে তিনি বললেন:
نَعَمْ كُنْتُ أَرْعَاهَا عَلَى قَرَارِيْطَ لِأَهْلِ مَكَّةَ - হ্যাঁ, আমি মজুরীর বিনিময়ে মক্কার লোকদের ছাগল চরিয়েছি। (বুখারী)
খাতামুন্নাবীয়ীন হযরত মুহাম্মাদ (স) ছাগল চরিয়েছেন। বড় কথা, সে ছাগল তাঁর নিজের ছিল না। বরং তা ছিল মক্কার লোকদের এবং তিনি তা নির্দিষ্ট পরিমাণ মজুরীর বিনিময়ে চরিয়েছিলেন। এ কথার উল্লেখ করে নবী করীম (স) তাঁর সাহাবীদের শিক্ষা দিচ্ছিলেন যে, যারা কাজ করে- কাজ করে উপার্জন করে, তাদেরই গৌরব। যারা নিষ্কর্মা বসে থাকে ও উপার্জনহীন থেকে লোকদের ওপর দিয়ে খায়, তাদের কোন গৌরব বা মর্যাদা নেই।
কুরআন মজীদে হযরত ঈসা (আ)-এর কিস্সা উদ্ধৃত হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, তিনি একজন বৃদ্ধ শায়খের কাছে শ্রমিক হিসেবে ক্রমাগত আটটি বছর পর্যন্ত কাজ করেছেন। তাঁর এ শ্রমের মজুরী ছিল, বৃদ্ধের কন্যাদের একজনকে তাঁর কাছে বিয়ে দেয়া। হযরত ঈসা (আ) তার কাছে খুবই ভাল শ্রমিক বলে গণ্য হচ্ছিলেন, খুবই বিশ্বস্ত কর্মী ছিলেন তিনি। বৃদ্ধের এক কন্যা অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তা সহকারে বলেছিল:
يَابَتِ اسْتَأْجِرْهُ ۚ إِنَّ خَيْرَ مَنِ اسْتَأْجَرْتَ الْقَوِيُّ الْأَمِينُ -
হে পিতা, তুমি ওকে শ্রমিক হিসেবে মজুরীর বিনিময়ে ঠিক করে রাখ। নিজের রাখা কর্মচারী উত্তম তো সে-ই হতে পারে, যে শক্তিশালী এবং বিশ্বস্ত। (সূরা কাসাস: ২৬)
হযরত ইবনে আবাস (রা) বর্ণনা করেছেন, হযরত দাউদ বর্ম ও তৈজসপত্র নির্মাতা ছিলেন। হযরত আদম ছিলেন জমি চাষকারী। হযরত নূহ (আ) ছিলেন মিস্ত্রী, হযরত ইদরীস (আ) ছিলেন দর্জী এবং হযরত মূসা (আ) ছিলেন ছাগলের রাখাল।
অতএব মুসলমান যে কোন হালাল পেশা গ্রহণ করে সন্তুষ্ট থাকতে পারে। প্রত্যেক নবীই কোন-না-কোন পেশা অবশ্যই অবলম্বন করতেন। সহীহ হাদীসে বলা হয়েছে:
مَا أَكَلَ أَحَدٌ طَعَامًا قَطُّ خَيْرًا مِنْ أَنْ يَأْكُلَ مِنْ عَمَلِ يَدِهِ وَأَنْ نَبِيُّ اللَّهِ دَاؤُدُ كَانَ يَا كُلُّ مِنْ عَمَلِ يَدِهِ -
নিজের শ্রমের বিনিময়ে উপার্জিত খাদ্যের তুলনায় উত্তম খাবার কেউ খেতে পারে না। আর আল্লাহ্ নবী দাউদ (আ) শ্রম করেই উপার্জন করতেন ও খাবার জোটাতেন। (বুখারী)
📄 নিষিদ্ধ কাজ ও পেশা
তবে কিছু কিছু কাজ ও পেশা ইসলাম মুসলমানদের জন্যে হারাম ঘোষণা করেছে। কেননা এসব কাজ ও পেশা লোকদের আকীদা, বিশ্বাস, চরিত্র, মান-সম্মান ও সাংস্কৃতিক মূল্যমানকে ভয়ানকভাব ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত করে。
📄 বেশ্যাবৃত্তি
বেশ্যাবৃত্তি একটা পেশা হিসেবে পাশ্চত্যের ও পাশ্চাত্যানুসারী অনেকগুলো দেশেই স্বীকৃত ও সমর্থিত। এজন্যে রীতিমত অনুমতি ও সরকারী লাইসেন্স দেয়া হয়, দেয়া হয় অবাধ নির্বিরোধ সুযোগ-সুবিধা। এই বৃত্তিটিকেও দেশ চলতি অন্যান্য পেশার মতো একটা পেশার মর্যাদা দেয়া হয় এবং এ পেশা সংক্রান্ত যাবতীয় অধিকার দান করা হয়।
কিন্তু ইসলাম এ পেশার ওপর কুঠোরাঘাত করেছে এবং স্বাধীনা কিংবা ক্রীতদাস কোন রমণীকেই স্বীয় স্ত্রী-অঙ্গের দ্বারা কোনরূপ উপার্জন করার অনুমতি দেয়নি।
জাহিলিয়াতের যুগে কেউ কেউ তার ক্রীতদাসীর ওপর দৈনিক হারে 'কর' ধার্য করত। এ 'কর' তাদের মালিকদের রীতিমত আদায় করে দিতে তারা বাধ্য ছিল। সেজন্যে তাঁকে যে কোন উপায়েই হোক উপার্জন করতে হতো। এ কারণে অনেক দাসীই ধার্যকৃত 'কর' আদায়ের নিমিত্তে বেশ্যাবৃত্তি করতে বাধ্য হতো। অনেক দাসী-মালিক আবার সরাসরি দাসীকে এ কাজে নিয়োজিত করত। আর তার বিনিময়ে সে মোটা পরিমাণ উপার্জন করত। উত্তরকালে ইসলাম এসে নারীদের এ চরম দুর্দশা ও জঘন্য কাজকর্মের বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি দান করে। এ সময়ই আল্লাহ্র ফরমান নাযিল হয়: وَلَا تُكْرِهُوا فَتَيَاتِكُمْ عَلَى الْبِغَاءِ إِنْ أَرَدْنَ تَحَصُّنَا لِتَبْتَغُوا عَرَضَ الحيوةِ الدُّنْيَا
তোমরা তোমাদের দাসী বা কন্যাদের বেশ্যাবৃত্তি করতে বাধ্য কর না- ওরা তো পবিত্রতা ও সতীত্ব রক্ষা করে থাকতে চায়- শুধু এজন্যে যে, এর মাধ্যমে তোমরা বৈষয়িক স্বার্থ লাভ করবে। (সূরা আন-নূরঃ ৩৩)
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণনা করেছেন: মুনাফিক প্রধান আবদুল্লাহ ইবনে উবাই রাসূলে করীম (স)-এর কাছে উপস্থিত হলো। তার সাথে ছিল 'মুয়াযাত" নাম্নী এক অনিন্দ্যসুন্দরী দাসী। সে বলল: ইয়া রাসূল! এই মেয়েটি অমুক ইয়াতীমের মালিকানাধীন দাসী। আপনি কি ওকে বেশ্যাবৃত্তি করার অনুমতি দেবেন? তাহলে সে ইয়াতীমরা অনেক মুনাফা লাভ করতে পারত। নবী করীম (স) জবাবে স্পষ্ট ভাষায় বললেন: 'না'।
নবী করীম (স) এই বীভৎস পেশার পথ চিরতরে বন্ধ করে দিলেন, তার রোজগারে যারই কোন ফায়দা হোক, বড় কোন প্রয়োজনই পূরণ হোক এবং বহু বড় মহৎ উদ্দেশ্যেই হোক-না-কেন, ইসলামী সমাজকে সর্ব প্রকারের পাপ কার্যের পংকিলতা থেকে মুক্ত ও পবিত্র রাখাই ইসলামের লক্ষ্য।