📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 ভ্রু সরুকরণ

📄 ভ্রু সরুকরণ


মাত্রাতিরিক্ত রূপ ও সৌন্দর্য অর্জনের আর একটি আধুনিক উপায় হচ্ছে, চুল বা পশম উপড়ান। আর তা সাধারণত, কপালের ভ্রূর চুল উপড়িয়ে ভ্রূকে যথাসম্ভব সরু করা। কিন্তু এ কাজটি ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম। রাসূলে করীম (স) এ কাজ যে করে, তার ওপর অভিশাপ বর্ষণ করেছেন। হাদীসে উদ্ধৃত হয়েছে:
لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ النَّامِصَةَ وَالْمُتَنَمِّصَةَ .
যে স্ত্রীলোক চুল বা পশম উপড়ায় এবং যে অপরের দ্বারা এ কাজ করায় রাসূলে করীম (স) উভয়ের ওপর অভিশাপ বর্ষণ করেছেন। (আবূ দাউদ)
চুল বা পশম উপড়ানর ব্যাপারটি আরও কঠিন হারাম হয়ে দেখা দেয়, যখন তা চরিত্রহীনা মেয়েদের নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায় এবং তাদের একটি বিশেষত্ব হয়ে দাঁড়ায়। হানাফী মাযহাবের কোন কোন আলেম বলেছেন: মেয়েদের মুখমণ্ডলের চুল উপড়িয়ে পরিষ্কার করা, লাল রঙ লাগান, নকশা আঁকা ও নখে পালিশ লাগানো জায়েয। তবে তা স্বামীর অনুমতিক্রমে হতে হবে। কেননা এসব কাজ সৌন্দর্যের অলংকারের মধ্যে গণ্য। কিন্তু ইমাম নববী মুখমণ্ডলের চুল বা পশম উপড়ানর তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তিনি এ কাজকে পূর্বোদ্ধৃত হাদীসের ভিত্তিতে হারাম বলেছেন। অবশ্য আবূ দাউদ তাঁর 'সুনান' গ্রন্থে লিখেছেন, যে নারী তার ভ্রূতে নকশা ও ছবি বানিয়ে সেটিকে সরু করে, হাদীস তাকে نامصه বলা হয়েছে। এতে করে ইমাম নববীর মতের প্রতিবাদ হয়ে গেছে। কেননা মুখমণ্ডলের চুল বা পশম দূর করা অভিশপ্ত কাজের মধ্যে গণ্য নয়।
'তাবারানী' গ্রন্থে বর্ণনা উদ্ধৃত হয়েছে, আবু ইসহাকের স্ত্রী যুবতী ছিলেন। সৌন্দর্যের পিপাসু ছিলেন। তিনি হযরত আয়েশা (রা)-এর কাছে উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন: স্ত্রী কি তার স্বামীর জন্যে মুখমণ্ডলের পশম দূর করতে পারে? হযরত আয়েশা (রা) বললেন: 'কষ্টের ব্যাপারগুলো সাধ্যমত দূর কর?

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 চুলে জোড়া লাগানো

📄 চুলে জোড়া লাগানো


স্ত্রীলোকের পক্ষে নিজের মাথার চুলের সঙ্গে অপরের চুলের (পরচুলা) জোড়া লাগিয়ে সৌন্দর্য বৃদ্ধি করাও হারাম। তা আসল চুল হোক, কি নকল চুল।
ইমাম বুখারী হযরত আয়েশা, আসমা, ইবনে মাসউদ, ইবনে উমর ও আবূ হুরায়রা (রা) সূত্রে হাদীস উদ্ধৃত করেছেন:
أَنَّ رَسُولَ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَعَنَ الوَاصِلَةَ وَالْمُسْتَوْصِلَةَ .
চুলে যে জোড়া লাগায় এবং যে অন্যদের দ্বারা এ কাজ করায় উভয় নারীর ওপর রাসূলে করীম (স) অভিশাপ বর্ষণ করেছেন।
নারী সম্পর্কে যখন একথা, তখন পুরুষরা এ কাজ করলে তো নিশ্চয়ই এ অভিশাপে পড়ে যাবে, তা নিঃসন্দেহে বলা চলে। নবী করীম (স) এ কাজকে ليس অর্থাৎ প্রতারণা বলে অভিহিত করেছেন। এমনকি যে নারীর মাথার চুল কোন রোগের কারণে ঝড়ে পড়ে যায়, তার পক্ষে অন্য কারো চুল নিজের মাথায় জড়ান জয়েয নয়। বিবাহের কনে- যাকে স্বামীর কাছে পাঠান হচ্ছে- তার জন্যেও এ কাজ হারাম।
হযরত আয়েশ (রা) থেকে বর্ণিত, আনসার বংশের একটি মেয়ে বিয়ে দেয়ার পর রোগে মাথার চুল পড়ে যায়। সে তার নিজের মাথায় অন্য চুল লাগাবার ইচ্ছা করে। এ বিষয়ে নবী করীম (স)-কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন:
لَعَنَ اللهُ الواصلة والمُسْتَوصلة .
যে চুল জোড়া লাগায় এবং যে অন্য কারো দ্বারা এ কাজ করায়- উভয় নারীর ওপরই আল্লাহ্ তা'আলা অভিশাপ বর্ষণ করেছেন।
হযরত আসমা (রা) তাঁর একটি মেয়েলি-রোগের কারণে চুল পড়ে যাওয়ায় এ কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করলে নবী করীম (স) উপরিউক্ত উক্তিই করেন।
সায়ীদ ইবনুল মুসাইয়্যিব বলেন: হযরত মুয়াবিয়া মদীনায় এলেন- এটাই ছিল তাঁর শেষ আগমন। তখন তিনি আমাদের সামনে ভাষণ দিলেন। ভাষণ ব্যাপদেশে তিনি এক গোছা চুল বের করলেন এবং বললেন:
مَا كُنْتُ أَرَى أَحَدًا يَفْعَلُ هَذَا غَيْرَ الْيَهُودُ أَنَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَمَّاهُ الزُّورَ يَعْنِي الْوَاصِلَةَ فِي الشَّعْرِ -
ইয়াহুদী ছাড়া আর কেউ এ ফ্যাশন করে বলে আমি মনে করি না। নবী করীম (স) এ কাজকে মিথ্যা-ধোঁকা বলে অভিহিত করেছেন অর্থাৎ 'চুলের সাথে অপরের চুল জড়ান'।
অপর এক বর্ণনা মতে হযরত মুয়াবিয়া মদীনাবাসীদের বলেন:
أَيْنَ عُلَمَاءُكُمْ ؟ سَمِعْتُ رَسُولَ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَنْهَى عَنْ مِثْلِ هَذِهِ وَيَقُولُ إِنَّمَا هَلَكَتْ بَنُوا اسْرَائِيلَ حِيْنَ اتَّخَذَ هَذِهِ نِسَاءُ هُمْ -
তোমাদের আলিমগণ এখন কোথায়? রাসূলে করীম (স) এ ধরনের কাজ করতে নিষেধ করেছেন তা আমি নিজে শুনতে পেয়েছি। তাঁকে এ-ও বলতে শুনেছি যে, বনী ইসরাঈলী মেয়েরা যখন এ ফ্যাশন শুরু করেছিল তখনই তাদের ধ্বংস শুরু হয়ে গিয়েছিল। (বুখারী)
নবী করীম (স) এ কাজকে মিথ্যা-ধোঁকা বলে অভিহিত করেছেন। তাতে এ কাজ নিষিদ্ধ হওয়ার তাৎপর্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আসলে এ কাজ এক প্রকার ধোঁকা ও প্রতারণাই বটে এবং তা মিথ্যার সাহায্যে। এ ধরনের কাজের অনুমতি থাকলে ধোঁকা প্রতারণা করাও জায়েয হয়ে যেত অথচ ইসলামে তা ভয়ানক গুনাহর কাজ। নবী করীম (স) বলেছেন:
مَنْ غَشِنَا فَلَيْسَ مِنَّا -
যে আমাদের ধোঁকা দেবে, সে আমার উম্মতের মধ্যে গণ্য নয়।
ইমাম খাত্তাবী বলেছেন: এ কাজ নিষিদ্ধ এজন্যে যে, এতে মানুষকে ধোঁকা দেয়া হয়, প্রতারিত করা হয়। উপরন্তু এ কাজ দ্বারা আল্লাহ্ আসল সৃষ্টিরূপ পরিবর্তন করে দেয়া হয় এবং সেটাই হচ্ছে বড় অপরাধ। হযরত ইবনে মাসউদ বর্ণিত উপরে উদ্ধৃত হাদীসে এদিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। আর হাদীসসমূহে চুলের সঙ্গে চুল জড়ান ও মেশান- তা স্বাভাবিক হোক, কি কৃত্রিম – মূলত ধোঁকা ও প্রতারণারই কাজ। তবে চুলের সাথে চুল ছাড়া অন্য কিছু- সূতা, বস্ত্রখণ্ড ইত্যাদি জড়ান হলে তা নাজায়েয হবে না। এ পর্যায়ে হযরত সাইদ ইবনে জুবাইর (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেছেন:
لابأس بالنوامل -
সূতা, রেশম কিংবা খোপা বানানর পশম জড়ালে তা দোষের হবে না। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলও তা জায়েয বলেছেন।

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 খেজাব লাগানো

📄 খেজাব লাগানো


মাথার চুল ও দাড়িতে খেজাব লাগানর এক প্রকারের সৌন্দর্য-চর্চার ব্যাপার। ইয়াহুদী ও খ্রীস্টান প্রভৃতি আহলি কিতাব লোকেরা খেজাব লাগিয়ে দাড়ি ও চুলের রং পরিবর্তন করার পক্ষপাতি নয়। কেননা তাদের ধারণা হচ্ছে, সৌন্দর্য-চর্চা ও রূপ বৃদ্ধিকরণ দ্বীনদারী ও আল্লাহ্ পরস্তির পরিপন্থী। আর দ্বীনদারীর ক্ষেত্রে দুনিয়াত্যাগী, বৈরাগী, বৈষ্ণব প্রভৃতি সীমালংঘন ও অতিরিক্ত বাড়াবাড়িকারীদের এ-ই হচ্ছে নীতি। কিন্তু রাসূলে করীম (স) এ লোকদের অনুসরণ করতে ও অনুরূপ আচার-আচরণ অবলম্বন করতে নিষেধ করেছেন, যেন মুসলমানরা অন্তরের ও বাইরের দিক দিয়ে নিজেদের স্বতন্ত্র সত্তা ও নীতি আদর্শের বৈশিষ্ট্য ও বিশেষত্ব অক্ষুণ্ণ রাখতে সক্ষম হয়। হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, হযরত নবী করীম (স) এ লোকদের অনুসরণ করতে ও অনুরূপ আচার-আচরণ অবলম্বন করতে নিষেধ করেছেন, যেন মুসলমানরা অন্তরের ও বাইরের দিক দিয়ে নিজেদেও স্বতন্ত্র সত্তা ও নীতি-আদর্শের বৈশিষ্ট্য ও বিশেষত্ব অক্ষুণ্ণ রাখতে সক্ষম হয়। হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, হযরত নবী করীম (স) বলেছেন:
إِنَّ الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى لَا يَصْبِغُونَ فَخَالِفُوهُمْ - (بخاری)
ইয়াহুদী খ্রিস্টানরা খেজাব লাগায় না। তোমরা তাদের বিরোধিতা কর।
এ আদেশটি মুস্তাহাব ধরনের, সাহাবিগণ তাই মনে করেছেন। কেননা এ আদেশটি থাকা সত্ত্বেও সকল সাহাবী খেজাব লাগান নি। যেমন হযরত আবূ বকর ও উমর (রা) লাগিয়েছেন, কিন্তু হযরত আলী ও উবাই ইবনে কায়াব (রা) লাগান নি। (فتح الباری)
কিন্তু খেজাব কি দিয়ে লাগান হবে? কালো কিংবা যে কোন রঙ লাগন যায় কি? না, কালো খেজাব লাগান পরিহার করতে হবে? এ প্রশ্নের জবাব এই যে, যেসব লোক বার্ধক্যে পৌঁছে গেছে, তদের পক্ষে কালো খেজাব লাগান বাঞ্ছনীয় নয়। কেননা মক্কা বিজয়কালে হযরত আবূ বকর (রা) তখন তাঁর পিতা আবৃ কাহাফাকে রাসূলে করীমের কাছে উপস্থিত করালেন, তিনি দেখলেন, তার মাথার চুল একেবারে সাদা হয়ে দেছে। তখন তিনি বললেন:
غَيْرُوا هَذَا وَجَنِّبُوهُ السَّوَادَ
এ চুলের রঙ পরিবর্তন করে দাও। তবে কালো বরং পরিহার কর। (মুসলিম)
কিন্তু যে লোকের অবস্থা বা বয়স আবু কাহাফার মত হয়নি, সে যদি কালো খেজাব ব্যবহার করে তাহলে উপরিউক্ত হাদীস অনুযায়ীই নাজায়েয হবে না। ইমাম জুহরী এ মতই প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন:
كُنَّا نَخْضِبُ بالسَّوَادِ إِذَا كَانَ الْوَجْهُ جَدِيداً فَلَمَّا فَغَضَ الْوَجْهُ وَالْأَسْنَانُ تَرَكْنَاهُ -
আমাদের মুখমণ্ডল যখন তরজাতা ছিল, নব্যতা ও তারুণ্যপূর্ণ ছিল, তখন আমরা কালো খেজাব ব্যবহার করেছি। কিন্তু যখন আমাদের মুখমণ্ডল ও দাঁতে পরিবর্তন শুরু হয়ে গেল, তখন আমরা তা ত্যাগ করেছি। (ফাতহুল বারী)
কালো খেজাব ব্যবহার করা সাধারণভাবে জায়েয বলে মত জানিয়েছেন সায়াদ ইবনে আবূ ওয়াক্কাস, উকবা ইবনে আমের, হাসান ও হুসাইন এবং জরীর প্রমুখ সাহাবী (রা)।
কিন্তু অপর কতক আলিমের মতে কালো খেজাব লাগান জায়েয নয়। তবে তাঁদের মতেও জিহাদের সময় শত্রু পক্ষকে ভীত-সন্ত্রস্ত্র করার উদ্দেশ্যে তা লাগান যেতে পারে, যেন শত্রুপক্ষ মনে করে যে, সেনাবাহিনীর সব লোকই যুবক। তাতে তারা অনেকটা শংকিত বোধ করবে। (ফতহুল বারী)
হযরত আবু যর গিফারী (রা) বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে:
إِنْ أَحْسَنَ مَا غَيَّرْتُمْ بِهِ الشَّيْبَ الْحِنَا وَالْكَتَمُ -
বার্ধক্যের শ্বেত-শুভ্রবর্ণ পরিবর্তন করার উত্তম দ্রব্য হচ্ছে হেনা ও কাতাম।
'কাতাম' হচ্ছে একটা ইয়েমেনী ঘাস। তার রক্ত লালমুখী কালো। আর 'হেনা' বর্ণ লাল। হযরত হাসান (রা) বর্ণনা করেছেন: হযরত আবূ বকর 'হেনা' ও 'কাতাম' উভয় প্রকার খেজাবই ব্যবহার করেছেন আর হযরত উমর (রা) কেবলমাত্র খালেস হেনাই ব্যবহার করেছেন খেজাব হিসেবে।

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 দাড়ি বাড়ানো— লম্বাকরণ

📄 দাড়ি বাড়ানো— লম্বাকরণ


আমাদের আলোচ্য বিষয়ের মধ্যে গণ্য একটি ব্যাপার হচ্ছে দাড়ি বৃদ্ধিকরণ। হযরত ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (স) বলেছেন:
خَالِفُوا الْمُشْرِكِينَ وَفَرُوا اللَّحَى وَاحْفُوا الشَّوَارِبَ -
তোমরা মুশরিকদের বিরোধিতা কর এবং দাড়ি বাড়াও, আর গোঁফ কাট। (বুখারী)
وفروا 'দাড়ি বাড়াও' অর্থাৎ দাড়ি রেখে দাও, ছেড়ে দাও- আপনা থেকে বাড়তে দাও। হাদীসে এ আদেশের কারণও বলা হয়েছে। তা হচ্ছে মুশরিকদের বিরোধিতা। আর এ মুশরিক বলতে অগ্নিপূজারী মজুসীদের বোঝান হয়েছে। কেননা ওরা দাড়ি কেটে ফেলত। ওদের অনেকে আবার দাড়ি মুণ্ডনও করত।
আর রাসূলে করীম (স) এদেরই বিরোধীতা করতে বলেছেন। তিনি মুসলমানদের এমনভাবে গড়ে তুলতে ও প্রশিক্ষণ দিতে চেয়েছিলেন, যেন তাদের স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ণ থাকে। যেন তারা ঈমান-আকিদার দিক দিয়েও যেমন মুশরিকদের থেকে ভিন্নতর, তেমনি বাহ্যিক দিক দিয়েও যেন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন হয়ে ওঠে। তবে দাড়ি মুণ্ডনের ব্যাপরটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। কেননা তাতে যেমন প্রকৃতির বিরোধীতা হয় তেমনি নারীদের সাথে সাদৃশ্য সৃষ্টি করা হয় অথচ দাড়ি হচ্ছে পুরুষের লক্ষণ পরিচায়ক। বাহ্যিকভাবে তাই পুরুষকে নারী থেকে স্বতন্ত্র করে দেয়।
তবে দাড়ি ছেড়ে দেয়া- বাড়ানর এই নির্দেশটির অর্থ এই নয় যে, দাড়ির কোন কিছু আদৌ কাটা যাবে না। কেননা দাড়ি অনেক সময় সীমাতিরিক্ত মাত্রায় বেড়ে যায় যে, তা দেখতেও খারাপ লাগবে। তাতে সে ব্যক্তির পক্ষে বিশেষ কষ্ট ও অসুবিধার কারণ দেখা দিতে পারে। তাই তার দৈর্ঘ্য-প্রস্থ থেকে কাটা যেতে পারে। তিরমিজী শরীফে হাদীস উদ্ধৃত হয়েছে: أنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَأْخُذُ من لحيته من عَرْضُهَا وَطُولُهَا - (ابوب الاداب)
নবী করীম (স) তাঁর দাড়ির দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ থেকে কাটতেন। প্রাচীনকালের লোকদের অনেকেই তা করতেন। ইয়ায বলেছেন: يَكْرَهُ حَلْقُ اللَّحْيَةِ وَقَصُّهَا وَتَحْذُ يُفُهَا
দাড়ি মুণ্ডন করা, তা কেটে ছেটে সমান সমান বানান মাকরূহ। কিন্তু যদি বড় হয়ে যায়, তাহলে তার দৈর্ঘ্য-প্রস্থ থেকে কেটে ফেলা ভালই। (ফতহুল বারী)
আবূ শামাহ্ বলেছেন: এ কালে এমন লোক দেখা যায়, যারা দাড়ি মুণ্ডন করে অথচ অগ্নিপূজারীদের সম্পর্কে একথা সর্বজনবিদিত যে, তারা দাড়ি কর্তন করত।
এ পর্যায়ে আমি বলতে চাই, বহু সংখ্যক মুসলমান ইসলামের দুশমন, ইয়াহুদী ও খ্রিস্টান প্রভৃতি সাম্রাজ্যবাদীদের অনুসরণ-করতে গিয়ে দাড়ি মুণ্ডন করতে শুরু করেছে। আর তা করে তারা সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে ওদের কাছে পরাজয় স্বীকার করে নিচ্ছে। কেননা বিজিত লোকেরাই বিজয়ী জাতির সংস্কৃতির অনুকরণ ও অনুসরণ করে থাকে অথচ রাসূলে করীম (স) যে কাফিরদের বিরোধীতা করতে বলেছে এবং তাদের সাথে সাদৃশ্য রক্ষা করতে নিষেধ করেছেন, তা তারা বেমালুম ভুলে বসেছে। হাদীসে বলা হয়েছে:
مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ -
যে ব্যক্তি যে জাতির সাথে সাদৃশ্য রক্ষা করবে, সে তাদের মধ্যেই গণ্য হবে।
বহু সংখ্যক ফিকাহবিদ দাড়ি বাড়ান সংক্রান্ত রাসূলে করীম (স)-এর হাদীসের প্রেক্ষিতে দাড়ি মুণ্ডন করাকে সম্পূর্ণ হারাম বলেছেন। কেননা এ আদেশ পালন করা ওয়াজিব। এই বিশেষ আদেশ মুশরিকদের বিরোধিতাকরণের ওপর ভিত্তিশীল। আর তাদের বিরোধিতা করা মুসলমানদের জন্যে ওয়াজিব। আগের কালের কোন লোক এই ওয়াজিব তরক করেছেন বলে কোন প্রমাণ নেই।
কিন্তু এ কালের কিছু কিছু আলিম কালের প্রভাবে প্রভাবিত হয়েও সাধারণ প্রচলন দেখে বলতে শুরু করেছেন যে, দাড়ি মুণ্ডনে কোন দোষ নেই। তাঁরা আরও বলতে শুরু করেছেন যে, দাড়ি লম্বা করে রাখা রাসূলে করীম (স)-এর নিজস্ব অভ্যাসগত কাজ ছিল। তা শরীয়তের কোন ব্যাপার নয় এবং তা ইবাদত পর্যায়ভুক্তও নয়। কিন্তু সত্য কথা হচ্ছে দাড়ি ছেড়ে দেয়া- লম্বা করা কেবলমাত্র রাসূলের নিজের কাজ দ্বারাই প্রমাণিত নয়। তার সাথে কারণ হিসেবে যুক্ত রয়েছে কাফিরদের বিরোধিতা। ইমাম ইবনে তাইমিয়া লিখেছেন, সর্বক্ষেত্রে কাফির মুশরিকদের বিরোধিতা শরীয়তের নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের মধ্যে গণ্য। বাহ্যিক সাদৃশ্য প্রীতি প্রণয় ভালবাসা বন্ধুত্বের ভাব জাগিয়ে তোলে অন্তরের মধ্যে। ঠিক যেমন অন্তরের ভালবাসা বাহ্যিক সাদৃশ্য সৃষ্টি করে। মানুষের অনুভূতি ও বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে এর সত্যতা প্রমাণিত। তিনি আরও লিখেছেন, কাফির মুশরিকদের বিরোধিতার আদেশ এবং তাদের সাথে সাদৃশ্যকরণের নিষেধ কুরআন, হাদীস ও ইজমা থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত। আর যে জিনিসে বা কাজে কোন খারাবীর কারণ নিহিত, তাই হারাম বলা যাবে। কাফিরদের বাহ্যিক কাজ-কর্মের সাথে সাদৃশ্য খারাপ চরিত্র ও কার্যকলাপের অনুসরণের কারণ। বরং সাদৃশ্যের এ কাজের ধারা আকীদা-বিশ্বাস বলয় পর্যন্ত প্রভাবিত করতে পারে বলে আশংকা করা যায়। এ প্রভাবটা ধরা যায় না, কেননা তাতে যে আসল দোষের উদ্রেক হয়, তা বাহ্যত চোখে পড়ে না। কিন্তু তা একবার বসে গেলেই তা দূর করা খুব কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কাজেই যা-ই কোন খরাবীর নিমিত্ত হবে, তা-ই শরীয়তের দৃষ্টিতে হারাম হবে, এতে আর কোন সন্দেহ নেই।
(اقتضاء الصراط المستقيم)
সর্বশেষ উল্লেখ্য, দাড়ি মুণ্ডন সম্পর্কে তিনটি কথা। একটি কথা হচ্ছে, দাড়ি মুণ্ডন করা হারাম। দ্বিতীয় কথা, দাড়ি মুণ্ডন মাকরূহ।
এই কথাটি ফতহুল বারী গ্রন্থে কাযী ইয়াযের নামে উদ্ধৃত হয়েছে। তাতে দ্বিতীয় কোন ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়নি। আর তৃতীয় কথা হচ্ছে, তা জায়েয।
এ কালের বেশ কিছু সংখ্যক আলিম এ মত পোষণ করলে এর মধ্যে মাঝামাঝি, সত্য নিকটবর্তী ও অধিক ইনসাফপূর্ণ কথা হচ্ছে, দাড়ি মণ্ডন মাকরূহ, হারাম নয়। কেননা রাসূলে করীমের যে কোন আদেশই নিরংকুশভাবে ওয়াজিব হয়ে যায় না, যদিও কাফির মুশরিকদের বিরোধিতা করার কারণ ভিত্তি হিসেবে উদ্ধৃত হয়েছে। তার অতি স্পষ্ট দৃষ্টান্ত হচ্ছে ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদের বিরোধিতা করার জন্যে খেজাব লাগিয়ে বার্ধক্যের শ্বেতবর্ণ পাল্টে দিতে আদেশ করেছেন। কিন্তু কোন কোন সাহাবী এ আদেশ পালন করতে গিয়ে তা করেন নি। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে, এ পর্যায়ের আদেশ মুস্তাহাব পর্যায়ের।
এ কথা সত্য যে, আগের কালের কোন মুসলমান দাড়ি মুণ্ডন করেছেন বলে জানা যায় না। তা এজন্যেও তো হতে পারে যে, সেকালে লোকেরা দাড়ি মুণ্ডন প্রয়োজন মনে করতেন না; বরং তা রাখাই তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00