📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 নারী ও পুরুষের মাঝে সাদৃশ্য সৃষ্টি

📄 নারী ও পুরুষের মাঝে সাদৃশ্য সৃষ্টি


নবী করীম (স) ঘোষণা করেছেন, নারীর জন্যে পুরুষালী পোশাক পরিধান করা এবং পুরুষদের জন্যে নারীসুলভ পোশাক পরা সম্পূর্ণ হারাম। (আহমদ, আবূ দাউদ, নাসায়ী, ইবনে মাজা, ইবনে হাবান)
উপরন্তু তিনি পুরুষের সাথে নারীর এবং নারীর সাথে পুরুষের সাদৃশ্যকারীদের ওপর অভিশাপ করেছেন। (বুখারী)
সাদৃশ্যকরণ পর্যায়ে কথাবার্তা, গতিবিধি, চলাফেরা, ওঠাবসা ও পোশাক পরা ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই গণ্য।
স্বীয় প্রকৃতিকে অস্বীকার করা ও স্বভাবের দাবিসমূহের প্রতিপূরণ করতে প্রস্তুত না হওয়া-তার বিপরীত আচার-আচরণ অবলম্বন করাই হচ্ছে মানব জীবনে ও সমাজ ক্ষেত্রে বিপর্যয় সৃষ্টি হওয়ার মৌল কারণ। পুরুষ এক বিশেষ স্বভাব-প্রকৃতির অধিকারী। নারীদের স্বভাব ও প্রকৃতি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ধরনের। একজনের স্বভাব প্রকৃতির সাথে অপর জনের স্বভাব-প্রকৃতির আদৌ কোন মিল বা সাদৃশ্য নেই। কিন্তু পুরুষ যখন 'নারী' হবার চেষ্টা চালায় এবং নারীরা পুরুষালী চালচলন ও স্বভাব-প্রকৃতি ধারণ করতে চায়, তখন চরম নৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়ই হয় অনিবার্য পরিণতি।
যে পুরুষকে আল্লাহ্ তা'আলা পুরুষ বানিয়েছেন, কিন্তু সে নিজেকে নারী বানাতে ও নারীর সাথে সাদৃশ্য করতে চায় এবং যে নারীকে আল্লাহ তা'আলা নারী বানিয়েছেন, কিন্তু সে নিজেকে পুরুষালী বিশেষত্বে ভূষিত করতে চায়, এ উভয়ের ওপর রাসূলে করীম (স) অভিসম্পাত করেছেন, দুনিয়া ও আখেরাত উভয় ক্ষেত্রেই তারা অভিশপ্ত। আল্লাহ্ ফেরেশতাগণও এ অভিসম্পাতে একাত্ম।
এ কারণেই নবী করীম (স) পুরুষদের জন্যে হলুদ বর্ণের কাপড় নিষেধ করেছেন। হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন:
نَهَانِي رَسُولُ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنِ التَّخَتُمِ بِالذَّهَبِ وَعَنْ لِبَاسِ وَعَنْ لِبَاسِ الْمُعَصْفَرِ القسى
রাসূলে করীম (স) আমাকে স্বর্ণের অঙ্গুরীয়, রেশমী পোশাক ও হলুদ বর্ণের কাপড় ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন। (মুসলিম)
হযরত ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেছেন : রাসূলে করীম (স) আমার পরনে দুখানি হলুদ কাপড় দেখতে পেয়ে বললেন :
إِنَّ هَذِهِ مِنْ ثِيَابِ الْكُفَّارِ فَلَا تَلْبِسْهَا .
এ হচ্ছে কাফিরদের কাপড়। কাজেই তুমি তা পরবে না।

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 খ্যাতি ও অহংকারের পোশাক

📄 খ্যাতি ও অহংকারের পোশাক


পানীয়, খাদ্য ও পরিধেয় সব পবিত্র জিনিষই মুসলমানের জন্যে হালাল। তবে তাতে শর্ত হচ্ছে তা গ্রহণে যেন সীমালংঘন করা না হয় এবং কোনরূপ অহংকার ও গৌরব প্রকাশ না পায়।
আরবী পরিভাষায় ‘ইসরাফ’ বলতে বোঝায় হালাল জিনিসের মাত্রাতিরিক্ত ও সীমালংঘনমূলক ব্যবহার। আর অহংকারী গৌরবী মনোভাবও মানসিক ব্যাপার। বাইরে তার প্রকাশ খুব কমই ঘটে। নিজেকে বড় কিছু মনে করে অহমিকায় পড়ে যাওয়াই হচ্ছে অহংকার। অন্যদের তুলনায় নিজেকে বড় বলে জাহির করাই হচ্ছে গৌরব। আল্লাহ্ তা'আলা কুরআন মজীদে ঘোষণা করেছেন :
وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ كُلِّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ -
আত্মগৌরবে মগ্ন ও অহংকারী কোন ব্যক্তিই আল্লাহ্ পছন্দ করেন না, ভালবাসেন না। (সূরা আল-হাদীদ : ২৩)
নবী করীম (স) বলেছেন :
مَنْ جَرَّ ثَوْبُهُ خُيَلاءً لَمْ يَنْظُرِ اللهُ إِلَيْهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ .
যে লোক তার কাপড় অহংকার সহকারে টানবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তার প্রতি নজরও দেবেন না। (বুখারী, মুসলিম)
অহংকার ও গৌরবের ভাবধারা থেকে মুসলমানকে দূরে রাখার জন্যেই নবী করীম (স) খ্যাতি ও প্রসিদ্ধির পোশাক পরতে নিষেধ করেছেন। যে ধরনের পোশাক পরলে জনসাধারণ থেকে স্বতন্ত্র কেউ- এটা প্রকাশ পায় ও পোশাকের দরুন তার বড়ত্ব জাহির হয়, তা-ই হচ্ছে খ্যাতি ও প্রসিদ্ধির পোশাক। রাসূলে করীম (স) বলেছেন:
مَنْ لَبِسَ ثَوْبَ شُهْرَةٍ الْبَسَهُ اللَّهُ ثَوْبَ مُذلَّةٌ يَوْمَ الْقِيَامَةِ -
যে লোক খ্যাতি ও সমৃদ্ধির পোশাক পরিধান করবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তাকে লাঞ্ছণা ও অবমাননার পোশাক পরিয়ে দেবেন। (আহমদ, আবূ দাউদ, নিসায়ী, ইবনে মাযাহ)
এক ব্যক্তি হযরত ইবনে উমর (রা)-এর কাছে জিজ্ঞেস করল: আমি কোন ধরনের পোশাক পরব? তখন তিনি বললেন:
مَالَا يَزْدَرِيكَ فِيهِ السُّفَهَاءُ وَلَا يُعِيبُكَ بِهِ الْحُكَمَاءُ -
তুমি সেই পোশাক পরবে, যার দরুন নিজ্ঞান-নির্বোধ লোকেরা তোমাকে হালকা ও অগম্ভীর মনে করবে না (অর্থাৎ হীন ও নীচ ধরনের পোশাক) এবং বুদ্ধিমান লোকেরা তাতে কোন দোষ বের করতে না পারে (অর্থাৎ ভারস্যামা নষ্ট হয়, এমন পোশাক পরবে না)। (তিবরানী)

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 মাত্রাতিরিক্ত সৌন্দর্যের জন্যে আল্লাহ্র সৃষ্টি বিকৃতকরণ

📄 মাত্রাতিরিক্ত সৌন্দর্যের জন্যে আল্লাহ্র সৃষ্টি বিকৃতকরণ


সৌন্দর্য বৃদ্ধির চেষ্টায় এমন সব কাজ করা, যার ফলে আল্লাহ্র সৃষ্টিই বিকৃত হয়ে যায়, ইসলাম আদৌ তা সমর্থন করে না। কুরআন এ কাজকে শয়তানের 'অহী' বা পরামর্শ বলে অভিহিত করেছে। কুরআনের ঘোষণা অনুযায়ী শয়তান তার কু-প্ররোচনা সম্পর্কে নিজেই বলেছে:
وَلَامُرَ نَّهُمْ فَلَيُغَيِّرُنَّ خَلْقَ اللَّه
আমি আমার অনুসরণকারীদের আদেশ করব। ফলে তারা আল্লাহ্র সৃষ্টিকেই বিকৃত করে দেবে। (সূরা আন-নিসা: ১১৯)

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 দেহে চিত্র অংকন, দাঁত শানিতকরণ ও সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্যে অপারেশন করান

📄 দেহে চিত্র অংকন, দাঁত শানিতকরণ ও সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্যে অপারেশন করান


শরীরে বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে নানা চিত্র অংকন করান এবং দাঁত শানিত করান ইসলামে নিষিদ্ধ। হাদীসে উদ্ধৃত হয়েছে :
وَقَدْ لَعَنَ الرَّسُولُ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْوَاشِمَةَ وَالْمُسْتَوْشِمَةَ والوَاشِرَةَ وَالْمُسْتَوْ شَرَةَ -
যে মেয়েলোক দেহে উল্কি (সুচিবিদ্ধ করে চিত্র অংকন) করে, যে তা করায়, যে দাঁত শানিত বানায় এবং যে তা বানাতে বলে, এ সব কয়টি শ্রেণীর লোকের ওপরই নবী করীম (স) অভিসম্পাত করেছেন। (মুসলিম)
উল্কি বানানর জন্যে সাধারণত নীল রং ব্যবহার করা হয় এবং খুবই বিশ্রী ধরনের চিত্রাদি অংকন করান হয়। তার ফলে মুখাবরণ ও হাত কুশ্রী হয়ে যায়।
আরব এবং বিশেষ করে মেয়েরা এ কাজে তো অনেক দূর এগিয়ে গেছে। তারা তাদের সমগ্র গাত্রে এ উল্কি আঁকিয়ে থাকে। কোন কোন ধর্মানুসারী লোক তো তাদের দেবদেবীর ছবি ও প্রতীকসমূহের চিত্র আঁকিয়ে থাকে। খ্রিস্টানরা নিজেদের হাত ও বুকের ওপর ক্রুশ-এর চিত্র আঁকায়।
এসব খারাবী ছাড়াও একটা বড় খারাবী হচ্ছে, উল্কি বানানর সময় দেহে সূচ বিদ্ধ করা হয় বলে তাতে খুবই কষ্ট ও যন্ত্রণা অনুভূত হয়। এ কারণে এ কাজ করা ও করান উভয়ই ইসলামে নিষিদ্ধ ও অভিশপ্ত।
'অশ্রু' দাঁতসমূহকে শানিত ও তীক্ষ্ণ সরু বানান ও যে বানাতে বলে এ উভয়ের ওপর রাসূলে করীম (স) অভিশাপ বর্ষণ করেছেন। যে নারী অন্যের দ্বারা এ কাজ করায়, তার ওপরও অভিসম্পাত। কোন পুরুষ এ কাজ করলে সেও সে অভিশাপের মধ্যে পড়ে যাবে নিঃসন্দেহে।
দাঁত সম্পর্কে একথা যেমন সত্য তেমনি দাঁতসমূহের মধ্যে খোদাই করা ও গর্ত রচনা করাকেও হারাম ঘোষণা করেছেন রাসূলে করীম (স)। হাদীসে উদ্ধৃত হয়েছে:
وَ لَعَنَ الْمُتَفَلِجَاتِ لِلْحُسْنِ الْمُغِيرَات خَلْقَ الله - (বুখারী, মুসলিম)
দাঁতসমূহের মধ্যে ফারাক ও খোদাই করায় যেসব স্ত্রীলোক সৌন্দর্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে, তাদের ওপরও রাসূলে করীম (স) অভিসম্পাত করেছেন। কেননা তারা আল্লাহ্ সৃষ্টির স্বাভাবিক অবস্থাকে বিকৃতি করে দেয়।
নারীদের মধ্যে অনেকেরই মুখের দাঁতে স্বাভাবিকভাবে ফাঁক থাকে, অনেকের আবার তা থাকে না। যাদেও তা থাকে না, তারা কৃত্রিমভাবে তা করিয়ে নেয়। ফলে সে লোকদের ধোকা দেয়। সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্যেই এ কৃত্রিমতার আশ্রয় লওয়া হয়। এর ফলে ইসলামের দৃষ্টিতে তার স্বাভাব-প্রকৃতিতেও কৃত্রিমতা এসে যায়। ইসলাম তা আদৌ বরদাশত করতে রাজী নয়।
উপরে যে হাদীসসমূহ উদ্ধৃত হয়েছে, তা সহীহ্। এসব হাদীসের ভিত্তিতে আমরা সৌন্দর্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে অপরেশন (অস্ত্রোপচার) করান সম্পর্কে শরীয়তের হুকুম জানতে পারি। এ কালের দেহ ও যৌন আস্বাদন পূজারী সভ্যতাই এসব অস্ত্রোপচারের প্রচলন করেছে। একালের বস্তুবাদী পাশ্চাত্য সভ্যতার এ এক অন্যতম অবদান বলতে হবে। লোকেরা এ প্ররোচনায় পড়ে নিজেদের নাক কিংবা বক্ষ (স্তন) প্রভৃতির আকৃতি মনমতো ও লোভনীয় বানাবার উদ্দেশ্যে পুরুষ ও নারী হাজার হাজার টাকা ব্যয় করছে। প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের কাজ আল্লাহ্ অভিশাপই টেনে আনে। এ কাজ যেমন কষ্টদায়ক, তেমনি আল্লাহ্র বানান আকৃতিকে শুধু-শুধুই পরিবর্তন করার শামিল। আর আসলেও অস্ত্রোপচারে যে পরিবর্তনটুকু আনা যায়, তা অতিসামান্য, প্রকৃত কোন পরিবর্তন সাধন সম্ভবই নয়। বড়জোর দৈহিক পরিবর্তনই করান যেতে পারে, আত্মিক নয়।
তবে যদি কারো কোন ত্রুটি থাকে, যা মূল দেহ কাঠামোর ওপর অতিরিক্ত এবং সেটির কারণে কষ্ট অনুভূত হয় কিংবা মানসিক কুণ্ঠায় জর্জরিত হতে থাকে, তবে তার চিকিৎসা করানয় কোন দোষ নেই। তবে উদ্দেশ্য হতে হবে শুধু সে অসুবিধাটা দূর করান। কেননা তাতে সে কষ্ট পাচ্ছে, জীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। এটা জায়েয এজন্যে যে, আল্লাহ্ দ্বীনে আমাদের জন্যে কোন কষ্টের কারন রাখেন নি। (المرأة بين البيت والمجتمع ص ١٠٥)
হাদীস থেকেও এ মতের সমর্থন পাওয়া যায়। হাদীসে সৌন্দর্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে অস্ত্রোপচার' নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কাজেই এ উদ্দেশ্যে অস্ত্রোপচার করা হলে নিশ্চয়ই অভিশাপের উপযুক্ত হতে হবে। কিন্তু কোন কষ্ট দূর করা বা প্রয়োজন পূরণ করার উদ্দেশ্যে তা করান হলে তাতে কোনই দোষ হতে পারে না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00