📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 সুরার ব্যবসা

📄 সুরার ব্যবসা


নবী করীম (স) সুরা কম কি বেশি পরিমাণ পান করাকেই শুধু হারাম করে ক্ষান্ত হন নি। সুরার ব্যবসা করাকেও তিনি হারাম ঘোষণা করেছেন। এমনকি, অমুসলিমদের সাথেও এ ব্যবসা জায়েয নয়। কাজেই সুরার আমদানী বা রফতানী পর্যায়ের ব্যবসা করা কোন মুসলমানদের জন্যেই জায়েয হতে পারে না। সুরা উৎপাদনের কারখানা নির্মাণ বা 'বার' খুলে বসা- কোনটিই জায়েয নয়। সুরার দোকানে চাকরী করাও সমানভাবে নিষিদ্ধ। এ কারণেই নবী করীম (স) সুরার ব্যাপারে দশ ব্যক্তির ওপর অভিশাপ বর্ষণ করেছেন। তারা হচ্ছে :
وَعَاصِرَهَا وَمُعْتَصِرَهَا وَشَارِبَهَا وَحَامِلَهَا وَالْمَحْمُولَةَ إِلَيْهَا وَسَاقِيْهَا وَبَائِعَهَا وَاكِلَ ثَمَنهَا وَالْمُشْتَرى لَهَا وَالْمُشْتَرَاةُ لَه .
সুরা উৎপাদনকারী, যে উৎপাদন করায়, মদ্যপায়ী, বহনকারী, যার কাছে বহন করে নেয়া হয়, যে পান করায় পরিবেশনকারী, বিক্রয়কারী, মূল্য গ্রহণ ও ভক্ষণকারী, ক্রয়কারী এবং যার জন্যে তা ক্রয় করা হয়- এ সকলেরই ওপর অভিশাপ। (তিরমিযী, ইবনে মাযাহ)
أَنَّ اللهَ حَرَّمَ الخَمْرَ فَمَنْ أَدْرَكَتْهُ هَذِهِ الْآيَةُ وَعِنْدَهُ مِنْهَا شَيْءٌ فَلَا يَشْرَبُ وَلَا يَبِيعُ -
আল্লাহ্ তা'আলা সুরা পান হারাম করেছেন। কাজেই যে-ই এ হুকুম জানতে পারবে তার কাছে তার কিছু পরিমাণ থাকলেও তা পানও করতে পারবে না, তা বিক্রয়ও করবে না। (মুসলিম)
হাদীস বর্ণনাকারী বলেন, এ সময় যার কাছে সুরা মজুদ ছিল। তারা সকলেই তা মদীনার পথে-ঘাটে প্রবাহিত করে দিয়েছিলেন।
সুরা পানের সব পথ বন্ধ করার উদ্দেশ্যে ঘোষণা করা হয়েছে, কোন মুসলমান যেন এমন কোন ব্যক্তির কাছে আঙ্গুর বিক্রয় না করে, যার সম্পর্কে জানা যাবে সে, সে অঙ্গুর দ্বারা সুরা তৈয়ার করবে।
হাদীসে বলা হয়েছে :
مَنْ حَبَسَ الْعِنَبَ أَيَّامَ القِطَافِ حَتَّى يَبِيْعَهُ مِنْ يَهُودِي أَوْ نَصْرَانِي أَوْ مِمَّنْ يَتَّخِذُهُ خَمْرًا فَقَدْ تَقَحْمَ النَّارَ عَلَى بَصِيرَةٍ -
যে লোক আঙ্গুরের ফসল কেটে রাখাই করবে কোন ইয়াহুদী, খ্রিস্টান বা এমন ব্যক্তির কাছে বিক্রয় করার উদ্দেশ্যে যে তা থেকে সুরা তৈরী করবে, তাহলে সে জেনে-শুনেই আগুনে ঝাপ দিল। (আল তিবরানী ফিল আওসাত)

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 মুসলমান সুরা উপঢৌকন দিতে পারে না

📄 মুসলমান সুরা উপঢৌকন দিতে পারে না


সূরা বিক্রয় করা ও তার মূল্য ভক্ষণ করাই মুসলমানদের জন্যে হারাম নয়, কোন মুসলিম ব্যক্তিই তা কোন অমুসলিমকে উপঢৌকন স্বরূপ দেয়াও সম্পূর্ণ হারাম। তার জন্যেও এ উপঢৌকন আসতে পারে না। কেননা মুসলমান পবিত্র। সে পবিত্র জিনিস ছাড়া অন্য কিছু উপঢৌকন বা মেহমানী হিসেবে কাউকে দিতেও পারে না, সে নিজেও গ্রহণ করতে পারে না। এক ব্যক্তি রাসূলে করীমের খেদমতে হাদিয়া হিসেবে সুরা পেশ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল। নবী করীম (স) তা জানতে পেরে তাকে বললেন যে, আল্লাহ্ তা'আলা সুরা হারাম করেছেন। তখন লোকটি বলল: তাহলে আমি তা বিক্রয় করে দিই? রাসূল বললেন:
إِنَّ الَّذِي حَرَّمَهَا حَرَّمَ أَنْ يُكَارَمَ بِهَا الْيَهُودَ .
যিনি তা পান করা হারাম করেছেন তিনিই তা কোন ইয়াহুদীকে তোহফাস্বরূপ দেয়াও হারাম করেছেন। তখন লোকটি বলল, তাহলে আমি তা নিয়ে কি করব? রাসূলে করীম (স) বললেন: মদীনার অলিগলিতে তা প্রবাহিত কর।

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 সুরা পানের আসর পরিহার করা

📄 সুরা পানের আসর পরিহার করা


এ প্রেক্ষিতেই মুসলিম মাত্রকেই সুরা পানের আসর বা মজলিস পরিহার করে চলবার জন্যে আদেশ করা হয়েছে। মদ্যপায়ীদের সঙ্গে ওঠা-বসা করাও তাদের জন্যে নিষেধ। হযরত উমর (রা) বর্ণনা করেছন: হযরত রাসূলে করীম (স) ইরশাদ করেছেনঃ
ن كَانَ يُؤْمِنُ بِالله وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلَا يَقْعُدُ عَلَى مَائِدَةٍ تَدَارَ عَلَيْهَا الْخَمْرُ .
আল্লাহ্ ও পরকালের প্রতি ঈমানদার ব্যক্তি যেন এমন মজলিসে বা টেবিলে একত্রে না বসে, যেখানে সুরা পরিবেশন করা হয়। (আহমদ)
অপরদিকে মুসলিম মাত্রেই কর্তব্য অন্যায় ও পাপকার্য বন্ধ করার জন্যে চেষ্টা করা। কিন্তু তা করা যদি সম্ভবই না হয়, তাহলে সে নিজে তো অন্তত সেখান থেকে কেটে পড়বে।
হযরত উমর ইবনে আবদুল আজীজ মদ্যপায়ীদের সঙ্গে সঙ্গে সে লোকদেরও দোররা মারতেন, যারা তাদের মজলিসে উঠা-বসা করত- নিজেরা তা পান না করলেও। একবার কতিপয় মদ্যপায়ী ধরে আনা হলো। তিনি তাদের শাস্তি দেবার নির্দেশ দিলেন। কেউ বললেন, এদের মধ্যে এমন এক ব্যক্তিও রয়েছে যে রোযা রাখে। তখন তিনি বললেন: তাহলে তো ওকেই প্রথম শাস্তি দিতে হবে। তোমরা কি আল্লাহ্র এ ফরমান শুনতে পাওনিঃ
وَقَدْ نَزَّلَ عَلَيْكُمْ فِي الْكِتَابَ أَنْ إِذا سَمِعْتُمْ آيَاتِ اللَّهِ يُكْفَرُ بِهَا وَيُسْتَهْزَأَبِهَا فَلَا تَقْعُدُوا مَعَهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيْثٍ غَيْرِهِ إِنَّكُمْ إِذَا مِثْلُهُمْ - (النساء ১৪০)
তোমাদের কুরআনে এ ফরমান নাযিল হয়েছে যে, তোমরা যখন আল্লাহ্র আয়াত অস্বীকার করতে ও তার প্রতি ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা কথাবার্তা শুনতে পাবে, তখন তোমরা তার সাথে আর বসবে না। পরে যদি তারা অন্য কোন কথায় মনোযোগ দেয়, তখন অবশ্য অন্য কথা। কিন্তু ঐ সময়ও যদি তোমরা তাদের সাথে বসা থাক, তাহলে তোমারাও অনুরূপ অপরাধে অপরাধী হবে।

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 সুরা রোগ—ঔষধ নয়

📄 সুরা রোগ—ঔষধ নয়


এসব অকাট্য দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে বোঝা যায়, ইসলাম সুরা বিরোধী সংগ্রামে অত্যন্ত কঠিন ও অনমনীয় ভূমিকা গ্রহণ করেছে। মুসলিমকে তা থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চেয়েছে। মুসলমান ও সুরা পানের মাঝে দুর্লংঘ্য প্রাচীর দাঁড় করাতে চেয়েছে। যেন একটি ক্ষুদ্র ছিদ্র পথও উন্মুক্ত না থাকে। সুরাকে কোন কাজে ব্যবহার করার কোন সুযোগই মুসলমানদের জন্যে উন্মুক্ত রাখা হয়নি।
মুসলমানের জন্যে মদ্যপান- সামান্য পরিমাণও জায়েয রাখা হয়নি। তা ক্রয়-বিক্রয়ও করা যেতে পারে না। হাদিয়া-তোহফা হিসেবে তা কারো জন্যে পেশ করাও যেতে পারে না। তা তৈরী করাও নিষেধ, স্বীয় দোকানে, অফিসে বা বসবাসের ঘরে তা রাখাও সম্পূর্ণ হারাম। উৎসব-দাওয়াত যিয়াফত- মেহমানদারীতে তা পেশ করা যেতে পারে না। অমুসলিম মেহমানদের মেহমানদারীও করা যেতে পারে না তা দিয়ে। অনুরূপভাবে খাদ্য পানীয়ের সাথে তা মিলিয়ে দেয়ারও কোন অনুমতি নেই ইসলামে।
তবে ঔষধ হিসেবে সুরা ব্যবহার করা যায় কিনা- আজকের মানুষের এ একটা প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাসূলে করীম (স)-কেও এ প্রশ্ন করা হয়েছিল। জবাবে তিনি বললেনঃ
إِنَّهَ لَيْسَ بِدَوَاء لَكِنَّهُ دَاءُ -
সুরা কোন ঔষধ নয় আসলে তা ব্যাধি মাত্র। (মুসলিম, আহম্মদ, আবু দাউদ, তিরমিযী)
রাসূলে করীম (স) বলেছেন:
الله أنزل الداء والدواء وَجَعَلَ لَكُمْ دَاءً وَدَواء فَتَدَاؤُوا وَلَا إِنَّ تداورا بِحَرَم -
আল্লাহ্ রোগ-ব্যাধি ও তার ঔষধ উভয়ই নাযিল করেছে। তোমাদের রোগের চিকিৎসার ব্যবস্থাও তিনি করে দিয়েছেন। অতএব তোমরা চিকিৎসা করবে, তবে হারাম জিনিস দ্বারা নয়। (আবূ দাউদ)
إِنَّ اللَّهَ لَمْ يَجْعَلْ شِفَاءَ كُمْ فِيْمَا حُرِّمَ عَلَيْكُمْ -
যে সব জিনিস তোমাদের জন্যে হারাম করা হয়েছে, আল্লাহ তাতে তোমাদের রোগের আরোগ্য রাখেন নি।
সুরা ও অনান্য হারাম দ্রব্য দ্বারা চিকিৎসা করান নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এটা কোন বিস্ময়োদ্দীপক ব্যাপার নয়। কেননা একটি জিনিস হারাম করার অর্থ হচ্ছে তা থেকে দূরে থাকতে বলা, তা সম্পূর্ণ ও সর্বতোভাবে পরিহার করে চলতে নিদের্শ দেয়া। এক্ষণে তাই যদি ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে সে হারাম জিনিসের মধ্যেই ডুবে থাকতে হবে, তার দিকেই উৎসাহ যোগান হবে। আর তাহলে সে জিনিস হারাম করাটাই অর্থহীন হয়ে যায়। ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম এ যুক্তিই দেখিয়েছেন।
তিনি আরও বলেছেন: হারাম জিনিস ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করার অনুমতি থাকলে তার প্রতি মানুষের আগ্রহ ও আকর্ষণই বৃদ্ধি পাবে। কেননা তার প্রতি মনের একটা স্বাভাবিক প্রবণতা রয়েছে। বিশেষ করে তা যখন উপকারী প্রমাণিত হবে, রোগ নিরাময়কারী ও স্বাস্থ্যদানকারী মনে হবে, তখন তা থেকে বিরত থাকা সম্ভব হবে না। সুরাকে ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করার অনুমতি থাকলে তা লালসা চরিতার্থ করার উপায় হয়ে দাঁড়াবে। এ পর্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম লিখেছেনঃ
ঔষধ দ্বারা আরোগ্য লাভের জন্যে তা আগ্রহ ও আন্তরিকতা সহকারে ব্যবহার করা কর্তব্য। তাকে উপকারী মনে করতে হবে। আল্লাহ্ তাতে যে আরোগ্য রেখেছেন তার বরকত লাভ সম্ভব হবে বলে মনে করতে হবে। কিন্তু একজন মুসলমান বিশ্বাস করে যে, সুরা অকাট্যভাবে হারাম। এ বিশ্বাসের কারণেই তার পক্ষে সুরার দ্বারা আরোগ্য লাভ সম্ভব হবে না। এরূপ বিশ্বাস সুরা সম্পর্কে ভাল ধারণার সৃষ্টি হতে দেবে না। তা আগ্রহ সহকারে গ্রহণ করাও কঠিন। বরং বান্দা ঈমানে যতটা পরিপাক হবে, সুরাকে সে তত বেশি ঘৃণাই করবে। তাকে খারাপ মনে করবে, তা সে সহ্যই করতে পারবে না। এরূপ অবস্থায় সুরা ব্যবহারে রোগমুক্তি লাভ সম্ভব হবে না বরং তাতে তার রোগ বেড়েই যাবে। (زاد المعادج 3 ص ۱۱۵-۱۱۲)
এ সব কথাই সত্য। তবুও প্রয়োজন ও ঠেকা-বাধাও শরীয়তের দৃষ্টিতে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এ জন্যে তার প্রতি লক্ষ্য রেখে শরীয়তের বিধান রচনা করা হয়েছে। যে রোগে মানুষের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ে আর তার জন্যে সুরা বা সুরা মিশ্রিত কোন ঔষধ যদি একমাত্র ঔষধ রূপে চিহ্নিত করা হয়, তা ছাড়া যদি এমন আর কোন ঔষধই পাওয়া না যায়, যা তার বিকল্প হতে পারে- কোন ঈমানদার মুসলিম ডাক্তারই যদি তার ব্যবস্থা দিয়ে থাকে যার মধ্যে ঈমানী বলিষ্ঠতা বর্তমান, কেবলমাত্র এরূপ অবস্থায়ই তা ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। (তবে এরূপ অবস্থা খুব যে দেখা যায় তা নয়) কেননা শরীয়ত মানুষের জীবনে সহজতা নিয়ে আসে, প্রতিবন্ধকতা ও অসুবিধা দূর করে। অবশ্য ইসলামের এ অনুমতি নির্দিষ্ট ও সংকীর্ণ সীমার মধ্যেই কাজে লাগাতে হবে, তা লংঘন করা যাবে না। আল্লাহ্ তো বলেই দিয়েছেন:
فَمَنِ اضْطُرَّ غَيْرَبَاغِ وَلَا عَادٍ فَإِنَّ رَبُّكَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ -
কেউ যদি কঠিনভাবে ঠেকায় পড়ে যায় কিন্তু সে নিজে ইচ্ছুক ও আগ্রহী নয়, সীমালংঘনকারীও নয়, তাহলে আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, দয়াবান।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00