📄 কুকুর দ্বারা শিকার করা
কুকুর বা বাজ, শিকরা ইত্যাদি দ্বারা যখন শিকার করতে চাওয়া হবে, তখন নিম্নোক্ত শর্তসমূহ পালন করতে হবে:
একটি হচ্ছে, জন্তু বা পাখিটিকে শিকার করার কাজটি রীতিমতো শিক্ষা ও ট্রেনিং দিতে হবে।
দ্বিতীয় এই যে, শিক্ষাপ্রাপ্ত জন্তু বা পাখিটি তার মালিকের জন্যে শিকার করবে, নিজের খাওয়ার জন্যে নয়। কুরআনের ইঙ্গিত থেকে তাই বুঝতে পারা যায়।
আর তৃতীয় হচ্ছে, সেটিকে শিকারের উদ্দেশ্যে পাঠানোর সময় সেটির ওপর 'বিস্মিল্লাহ' বলে দিতে হবে।
নিম্নোদ্ধৃত আয়াতে এ সব কটি শর্তের কথা বলে দেয়া হয়েছে:
يَسْئَلُونَكَ مَاذَا أُحِلَّ لَهُمْ قُلْ أُحِلَّ لَكُمُ الطَّيِّبَتِ وَمَا عَلَّمْتُمْ مِنَ الْجَوَارِحِ مُكَلِّبِيْنَ تُعَلِّمُونَهُنَّ مِمَّا عَلَّمَكُمُ اللهُ فَكُلُوا مِمَّا أَمْسَكْنَ عَلَيْكُمْ وَاذْكُرُوا اسْمَ اللَّهُ عَلَيْهِ
লোকেরা তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে তাদের জন্যে কি কি হালাল করা হয়েছে? তুমি বল, তোমাদের জন্যে হালাল করা হয়েছে সব পাক-পবিত্র উৎকৃষ্ট দ্রব্য এবং যেসব শিকারী জন্তু বা পাখি তোমরা শিখিয়ে পড়িয়ে তৈয়ার করে নিয়েছ শিকার করার জন্যে- ওরা যা তোমাদের জন্যে আটকিয়ে রাখবে তা তোমরা খাও এবং তার ওপর তোমরা আল্লাহ্ নাম উচ্চারণ কর।
১. শিকারী জন্তু বা পাখি শিক্ষাদানের ব্যাপারটিও সুস্পষ্ট। তা হচ্ছে সেটির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করা, নিজ আদেশ মতো সেটিকে পরিচালিত করতে পারা, যখন যেদিকে ইচ্ছা সেটিকে চালিত করতে পারা এবং সেটির সে অনুযায়ী কাজ করতে প্রস্তুত হওয়া। শিকার করে মালিকের কাছে উপস্থিত করতে অভ্যস্ত হওয়া, মালিকের অনুপস্থিতিতে তার জিনিসপত্রের রক্ষণাবেক্ষণ করা। মালিক সেটিকে তাড়ালে তাড়িত হওয়া। এ সব শর্ত আরোপের ব্যাপারে কোন কোন ফিকাহবিদের কিছুটা দ্বিমত আছে বটে, কিন্তু মোট কথা হলো, প্রচলিত নিয়মে শিকারী জন্তু বা পাখিকে সুশিক্ষিত করে তুলতে হবে।
২. মালিকের জন্যে শিকার রক্ষা করার অর্থ, শিকারী জন্তু বা পাখি শিকারটিকে নিজে খাবে না; মালিকের জন্যে রেখে দেবে। নবী করীম (স) বলেছেন:
اِذَا أَرْسَلْتَ الْكَلْبَ فَأَكَلَ مِنَ الصَّيْدِ فَلَا تَأْكُلُ فَإِنَّمَا أَمْسَكَ عَلَى نَفْسِهِ فَإِذَا رْسَلْتَهُ فَقَتَلَ وَلَمْ يَا كُلْ قَلُلْ فَإِنَّمَا أَمْسَكَ عَلَى صَاحِبِهِ -
তুমি যখন শিকার করার উদ্দেশ্যে কুকুর প্রেরণ কর, তখন সে শিকার করে তা থেকে যদি কিছু খায়, তাহলে তুমি তা খাবে না। কেননা প্রমাণিত হয়েছে যে, সেটি শিকারকে নিজের জন্যেই ধরে রেখেছে। আর পাঠানর পর শিকার করে যদি নিজে না খায়, তাহলে তুমি তা খেতে পার। কেননা প্রমাণিত হয়েছে যে, সেটি তার মালিকের জন্যে শিকারকে ধরে রেখেছে। (আহমদ)
কোন কোন ফিকাহবিদ শিকারী জন্তু- কুকুর ও শিকারী পাখি যেমন বাজ। শিকরার মধ্যে পার্থক্য করেছেন। বলেছেন, শিকারী পাখি যদি শিকার থেে কিছু খায়ও তবু তা খাওয়া মুবাহ। কিন্তু কুকুর খেলে তা খাওয়া যায়েয নয়।
এই দুটি শর্তে যথেষ্ট যৌক্তিকতা রয়েছে। কুকুরকে শিকার কার্যের জনে শিক্ষিত করে তোলা ও তার শিকার করে শিকারটিকে মালিকের জন্যে ধরে রা' মানুষের উচ্চ মর্যাদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কুকুরের উচ্ছিষ্ট খাবার থেকে মানুষ দূরে রাখার উদ্দেশ্যেই এ শর্ত আরোপ করা হয়েছে। কেননা কুকুর শিক্ষাপ্র হলে ও শিকার করে সেটিকে মালিকের জন্যে ধরে রাখলে তখন সেটি এক শিকার যন্ত্র মাত্র, শিকারী শিকার কাজে ব্যবহার করেছে। যেমন শিকারী তীর বল্লম বা বন্দুক চালিয়ে থাকে।
৩. কুকুর পাঠানর সময় বিসমিল্লাহ্ বলাটা তীর নিক্ষেপ বা বল্লম কিংবা চালান কালে বিস্মিল্লাহ্ বলার মতোই। কুরআনের আয়াতে তারই নির্দেশ দেয়া হয়েছে:
فَاذْكُرُ وَاسْمَ اللَّهُ عَلَيْهِ -
৪. এ বিষয়ে বহু সহীহ্ হাদীসও বর্ণিত হয়েছে, যেমন হযরত আদী ইবনে হাতিম (রা) বর্ণিত হাদীসসমূহ।
উপরিউক্তি শর্ত থেকে একথাও সুস্পষ্ট হয়ে উঠে যে, প্রেরিত কুকুরটির সাথে অপর কোন কুকুর শরীক হলে এ দুয়ের শিকার খাওয়া হালাল হবে না। হযরত আদী (রা) জিজ্ঞেস করলেন:
إِنِّي أُرْسِلُ كَلْبِي أَجِدُ مَعَهُ كَلْبًا لَا أَدْرِي أَيُّهُمَا أَخَذَهُ .
আমি আমার কুকুর শিকারের জন্যে পাঠাই, পরে সেটির সঙ্গে দ্বিতীয় একটি অপরিচিত কুকুরও দেখতে পাই, তখন কি করব?
নবী করীম (স) বললেন:
فَلَا تَأْكُلْ - فَانَّمَا سَمِّيْتَ عَلَى كَلْبِكَ وَلَمْ تُسَمٌ عَلَى غَيْرِهِ -
তাহলে তুমি শিকার খাবে না। কেননা তুমি তো বিসমিল্লাহ বলেছ তোমার নিজের প্রেরিত কুকুরটির ওপর; অপরটির ওপর নয়। (আর তুমি জান না এ দুটির মধ্যে কোন্ট শিকার করেছে?)।
তীর নিক্ষেপ করা বা শিকার পাঠানর সময় বিসমিল্লাহ্ বলতে যদি ভুলে যায়, তাহলে খাওয়ার সময় এই ভুল শুধরে নিলেই চলবে। আল্লাহ দয়া করে মুসলিম উম্মতের অনেক ভুল-ভ্রান্তিই মাফ করে দিয়েছেন এবং দেন। এটাও সেই পর্যায়ের গণ্য।
📄 তীর নিক্ষেপের পর শিকার মৃতাবস্থায় পাওয়া
এ রকমটা প্রায় ঘটে ও ঘটতে পারে যে, শিকারী শিকারের উদ্দেশ্যে তীর নিক্ষেপ করল, তা শিকারকে বিদ্ধ করল, পরে তা চোখের আড়ালে পড়ে যায়, হারিয়ে যায়। কিছু সময় পর সেটি মৃত্যু অবস্থায় পাওয়া যায়- কয়েকদিন পর পাওয়ার ঘটনাও বিরল নয়। এরূপ অবস্থায় কয়েকটি শর্তে শিকারটি হালাল হতে পারে:
১. সেটি যেন পানিতে পড়ে না থাকে। এ পর্যায়ে হাদীস হচ্ছে : রাসূলে করীম (স) বলেছেন :
إِذَا رَمَيْتَ سَهْمَكَ فَإِنْ وَجَدْتَهُ قَدْ قُتِلَ فَكُلْ إِلَّا أَنْ تَجِدَهُ قَدْ وَقَعَ فِي مَاءٍ (বুখারী, মুসলিম) فَانَّكَ لَا تَدْرِي الْمَاءُ قَتَلَهُ أَمْ سَهْمُكَ .
তুমি যখন তোমার তীর নিক্ষেপ করলে শিকারকে লক্ষ্য করে তখন সেটি পাও নিহত অবস্থায়, তাহলে তুমি সেটি খাও। তবে যদি সেটিকে পানিতে পড়া অবস্থায় দেখ, তাহলে খাবে না। কেননা শিকারটি তোমার তীরের আঘাতে মরেছে না পানিতে ডুবে মরেছে, তা তুমি জান না।
২. অপর কোন তীরের চিহ্ন তার ওপর থাকবে না, যার ফলে জানা যেতে পারে যে, অপর কোন তীরই তার মৃত্যুর কারণ হয়নি। হযরত আদী ইবনে হাতিম (রা) বললেন :
يَا رَسُولَ اللَّهِ أَرْمِي الصَّيْدَ فَأَجِدُ فِيْهِ سَهْمِي مِنَ الْغَد.
ইয়া রাসূল! আমি তো শিকার করার জন্যে তীর নিক্ষেপ করি। পরের দিন সেটি আমি পাই, তার ওপর আমার তীর বিদ্ধ হয়ে আছে।
নবী করীম (স) বললেন : اذَا عَلِمْتَ أَنَّ سَهْمَكَ قَتَلَهُ وَلَمْ تَرَ فِيْهِ أَشْرَسَبْعِ فَكُلْ -
তুমি যদি নিশ্চিতভাবেই জানতে পার যে, তোমার নিক্ষিপ্ত তীরই ওটিকে মেরেছে এবং তার ওপর কোন হিংস্র জন্তুর কোন চিহ্ন না পাওয়া যায়, তাহলে তুমি তা খেতে পার। (তিরমিযী)
৩. শিকারটা যেন পঁচে যাওয়ার উপক্রম না হয়। কেননা সুস্থ মানব প্রকৃতি পঁচা জিনিস খেতে ঘৃণা করে। তা ছাড়া তার ক্ষতিকর দিক তো রয়েছেই। মুসলিম শরীফে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে : নবী করীম (স) হযরত আবু সা'লাবা (রা)-কে বললেন : اذا رَمَيْتَ سَهْمَكَ فَغَابَ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ وَأَدْرَكْتَهُ فَكُلِّ مَا لَمْ يَنْتَنِ -
তুমি তীর নিক্ষেপ করার পর তা যদি তিনটি দিন অদৃশ্য হয়ে থাকে এবং তার পর তুমি শিকারের খোঁজ পাও, তাহলে তা পঁচে না গেলে তুমি খেতে পার।