📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 শিকার প্রাণী সম্পর্কিত শর্ত

📄 শিকার প্রাণী সম্পর্কিত শর্ত


যে জন্তু বা প্রাণী শিকার করা হবে, সে সম্পর্কে শর্ত হচ্ছে, তা এমন জন্তু বা প্রাণী হবে যাকে ধরে তার গলা বা মজ্জাস্থি (marrow)-তে যবেহ করা সম্ভব হবে না। যদি তা সম্ভব হয় তা হলে তা অবশ্যই নির্দিষ্ট নিয়মে যবেহ করতে হবে, তা না করা হলে হালাল হবে না।
যদি তীর নিক্ষেপ করা বা শিক্ষাপ্রাপ্ত কুকুরের দ্বারা শিকার করা না হয়, আর তা এমন অবস্থায় হস্তগত হয় যে, তার মধ্যে এখনও জীবনের স্থিতি রয়েছে তা হলে প্রচলিত নিয়মে গলদেশে যবেহ করতে হবে। কিন্তু যদি তা স্থিতিশীল জীবন নেই, এমন অবস্থায় হস্তগত হয় তাহলে সেটি যবেহ না করাই সঙ্গত। আর যদি তার সেই অবস্থায় সেটিকে মৃত্যুর জন্যে ছেড়ে দেয়া হয়, তাহলে কোন গুনাহ হবে না। বুখারী ও মুসলিম-এ হাদীস উদ্ধৃত হয়েছে:
وَإِذَا أَرْسَلْتَ كَلْبُكَ فَاذْكُرِ اسْمَ اللَّهِ عَلَيْهِ فَإِنْ أَمْسَكَ فَادْرَكْتَهُ حَيًّا - فَاذْبَحْه
তুমি যখন তোমার শিকারী কুকুর পাঠাবে তখনই তার ওপর আল্লাহ্ নাম উচ্চারণ করবে। পরে তা যদি শিকারকে তোমার জন্যে আটকে রাখে আর তুমি সেটি জীবন্ত অবস্থায় হাতে পাও তাহলে তুমি যবেহ করবে।

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 শিকার করার উপায়

📄 শিকার করার উপায়


যে সব উপায়ে শিকার করা যায় তা দু'ধরনের:
১. তীক্ষ্ণ শানিত অস্ত্র, যেমন তলোয়ার, বল্লম ইত্যাদি। কুরআনের আয়াতে এ দিকের ইঙ্গিত পাওয়া যায়:
تَنَا لَهُ أَيْدِيْكُمْ وَرِمَاحُكُمْ -
তা পায় তোমাদের হস্ত এবং তীরসমূহ। (সূরা মায়িদা : ৯৪)
২. শিকারী জন্তু, যাকে শিকার কার্যের জন্যে রীতিমত শিক্ষিত ও ট্রেনিং প্রাপ্ত করা হয়েছে, যেমন কুকুর, বাজ ইত্যাদি। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
قُلْ أُحِلَّ لَكُمُ الطَّيِّبَتُ : وَمَا عَلَّمْتُمْ مِّنَ الْجَوَارِحِ مُكَلِّبِينَ تُعَلِّمُونَهُنَّ مِمَّا عَلَّمَكُمُ اللهُ
তোমাদের জন্যে হালাল করা হয়েছে সব পাক-পবিত্র জিনিস, আর তোমাদের যেসব শিকারী জন্ত ট্রেনিং প্রদত্ত, আল্লাহ্ তোমাদের যা শিখিয়েছেন তা দিয়ে তোমরাও শিক্ষিত করে তোল (সূরা মায়িদা : ৪)

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 শানিত অস্ত্র দ্বারা শিকার করা

📄 শানিত অস্ত্র দ্বারা শিকার করা


অস্ত্র দ্বারা শিকার করানোর দুটি শর্ত রয়েছে:
প্রথম, অস্ত্রটি শিকারের দেহের মধ্যে এমনভাবে বিদ্ধ হয়ে যাবে যে, এই জখমই সেটির মৃত্যুর কারণ হবে। অস্ত্রের চাপে পড়ে যেন মৃত্যু না হয়। হযরত আদী ইবনে হাতিম (রা) নবী করীম (স)-কে জিজ্ঞেস করলেন:
إِنِّي أَرْمِي بِلْمِعْرَاضِ الصَّيْدَ فَأَصِيبُهُ -
আমি ফলা ছাড়া তীর দ্বারাই শিকার করি। আর তা লক্ষ্য ভেদ করে, সেটি খাওয়া কি জায়েয?
রাসূলে করীম (স) জবাবে বললেন:
إِذَا رَمَيْتَ بِالْمِعْرَاضِ فَخَرَقَ فَكُلِّ وَمَا أَصَابَ بِعَرْضِهِ فَلَا تَأْكُلْ -
যখন তুমি তীর নিক্ষেপ কর, তার ধারালো দিকটা যদি দেহে ঢুকে যায় তাহলে তা খাও। আর যদি পাশাপাশি লাগে ও তার আঘাতে মরে তাহলে তা খাবে না। (বুখারী, মুসলিম)
এ হাদীস থেকে জানা গেল, শিকারীর দেহে ঢুকে পড়াটাই আসল লক্ষ্য। যদি শিকারের মৃত্যু হয় ভারী বোঝার তলায় চাপা পড়ে তাহলে তা খাওয়া জায়েয হবে না। এ হিসেবে বন্দুক ও পিস্তল-রিভালবারের গুলী দ্বারা শিকার করা জন্তু হালাল হবে। কেননা এই গুলী দেহাভ্যন্তরে তীর, বল্লাম ও তরবারীর তুলনায়ও অধিক শানিত ও গভীরভাবে প্রবেশ করে। এ পর্যায়ে ইমাম আহমদ কর্তৃক উদ্ধৃত একটি হাদীস হচ্ছে:
لَا تَا كُلَّ مِنَ الْبَنْدقَة الا مَا ذَكَيْتَ -
বন্দুক দ্বারা শিকার করা জন্তু বা পাখি খাবে না, তবে যবেহ করলে তা খেতে পার।
আর বুখারী উদ্ধৃত হযরত ইবনে উমর (রা)-এর একটি উক্তি হচ্ছে: বন্দুক দ্বারা করা শিকার 'মওকুযা' লাঠির আঘাতে মরা জন্তুর মতোই হারাম, এতে বুন্দেকা অর্থ 'মাটির ঢিলা'। তা নিক্ষেপ করে শিকার করা জন্তু নিশ্চয়ই হারাম। কিন্তু এখানে 'বন্দুক' বলতে আমরা আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র মনে করছি এবং তার দ্বারা শিকার করা জন্তু অবশ্যই হালাল হবে।
'বুন্দেকা'র সাথে সাদৃশ্য সম্পন্ন জিনিস হচ্ছে প্রস্তর খণ্ড বা পাকা ইটের ঢুকরা। নবী করীম (স) বলেছেন:
إِنَّهَا لَا تُصِيدُ صَيْدًا وَلَا تَنْكَاءُ عَدُوا لَكنَّهَا تُكْسِرُ السِّنَّ وَتَفْقَأُ الْعَيْنَ -
প্রস্তরখণ্ড বা ইটের টুকরা দ্বারা শিকার করা যায় না, শত্রুকেও গভীরভাবে জখম করা চলে না। তবে তদ্দ্বারা দাঁত ভাঙ্গা যায় ও চক্ষু ফোটান যায়। (বুখারী, মুসলিম)
দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, হাতিয়ার নিক্ষেপ করা বা অস্ত্র চালানের সময় আল্লাহ্ নাম উচ্চারণ করতে হবে। নবী করীম (স) হযরত আদী ইবনে হাতিম (রা)-কে যেমন শিক্ষা দিয়েছেন। ও বিষয়ে তাঁর বর্ণনা করা হাদীসসমূহ বিশেষ গুরুত্বের অধিকারী।

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 কুকুর দ্বারা শিকার করা

📄 কুকুর দ্বারা শিকার করা


কুকুর বা বাজ, শিকরা ইত্যাদি দ্বারা যখন শিকার করতে চাওয়া হবে, তখন নিম্নোক্ত শর্তসমূহ পালন করতে হবে:
একটি হচ্ছে, জন্তু বা পাখিটিকে শিকার করার কাজটি রীতিমতো শিক্ষা ও ট্রেনিং দিতে হবে।
দ্বিতীয় এই যে, শিক্ষাপ্রাপ্ত জন্তু বা পাখিটি তার মালিকের জন্যে শিকার করবে, নিজের খাওয়ার জন্যে নয়। কুরআনের ইঙ্গিত থেকে তাই বুঝতে পারা যায়।
আর তৃতীয় হচ্ছে, সেটিকে শিকারের উদ্দেশ্যে পাঠানোর সময় সেটির ওপর 'বিস্মিল্লাহ' বলে দিতে হবে।
নিম্নোদ্ধৃত আয়াতে এ সব কটি শর্তের কথা বলে দেয়া হয়েছে:
يَسْئَلُونَكَ مَاذَا أُحِلَّ لَهُمْ قُلْ أُحِلَّ لَكُمُ الطَّيِّبَتِ وَمَا عَلَّمْتُمْ مِنَ الْجَوَارِحِ مُكَلِّبِيْنَ تُعَلِّمُونَهُنَّ مِمَّا عَلَّمَكُمُ اللهُ فَكُلُوا مِمَّا أَمْسَكْنَ عَلَيْكُمْ وَاذْكُرُوا اسْمَ اللَّهُ عَلَيْهِ
লোকেরা তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে তাদের জন্যে কি কি হালাল করা হয়েছে? তুমি বল, তোমাদের জন্যে হালাল করা হয়েছে সব পাক-পবিত্র উৎকৃষ্ট দ্রব্য এবং যেসব শিকারী জন্তু বা পাখি তোমরা শিখিয়ে পড়িয়ে তৈয়ার করে নিয়েছ শিকার করার জন্যে- ওরা যা তোমাদের জন্যে আটকিয়ে রাখবে তা তোমরা খাও এবং তার ওপর তোমরা আল্লাহ্ নাম উচ্চারণ কর।
১. শিকারী জন্তু বা পাখি শিক্ষাদানের ব্যাপারটিও সুস্পষ্ট। তা হচ্ছে সেটির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করা, নিজ আদেশ মতো সেটিকে পরিচালিত করতে পারা, যখন যেদিকে ইচ্ছা সেটিকে চালিত করতে পারা এবং সেটির সে অনুযায়ী কাজ করতে প্রস্তুত হওয়া। শিকার করে মালিকের কাছে উপস্থিত করতে অভ্যস্ত হওয়া, মালিকের অনুপস্থিতিতে তার জিনিসপত্রের রক্ষণাবেক্ষণ করা। মালিক সেটিকে তাড়ালে তাড়িত হওয়া। এ সব শর্ত আরোপের ব্যাপারে কোন কোন ফিকাহবিদের কিছুটা দ্বিমত আছে বটে, কিন্তু মোট কথা হলো, প্রচলিত নিয়মে শিকারী জন্তু বা পাখিকে সুশিক্ষিত করে তুলতে হবে।
২. মালিকের জন্যে শিকার রক্ষা করার অর্থ, শিকারী জন্তু বা পাখি শিকারটিকে নিজে খাবে না; মালিকের জন্যে রেখে দেবে। নবী করীম (স) বলেছেন:
اِذَا أَرْسَلْتَ الْكَلْبَ فَأَكَلَ مِنَ الصَّيْدِ فَلَا تَأْكُلُ فَإِنَّمَا أَمْسَكَ عَلَى نَفْسِهِ فَإِذَا رْسَلْتَهُ فَقَتَلَ وَلَمْ يَا كُلْ قَلُلْ فَإِنَّمَا أَمْسَكَ عَلَى صَاحِبِهِ -
তুমি যখন শিকার করার উদ্দেশ্যে কুকুর প্রেরণ কর, তখন সে শিকার করে তা থেকে যদি কিছু খায়, তাহলে তুমি তা খাবে না। কেননা প্রমাণিত হয়েছে যে, সেটি শিকারকে নিজের জন্যেই ধরে রেখেছে। আর পাঠানর পর শিকার করে যদি নিজে না খায়, তাহলে তুমি তা খেতে পার। কেননা প্রমাণিত হয়েছে যে, সেটি তার মালিকের জন্যে শিকারকে ধরে রেখেছে। (আহমদ)
কোন কোন ফিকাহবিদ শিকারী জন্তু- কুকুর ও শিকারী পাখি যেমন বাজ। শিকরার মধ্যে পার্থক্য করেছেন। বলেছেন, শিকারী পাখি যদি শিকার থেে কিছু খায়ও তবু তা খাওয়া মুবাহ। কিন্তু কুকুর খেলে তা খাওয়া যায়েয নয়।
এই দুটি শর্তে যথেষ্ট যৌক্তিকতা রয়েছে। কুকুরকে শিকার কার্যের জনে শিক্ষিত করে তোলা ও তার শিকার করে শিকারটিকে মালিকের জন্যে ধরে রা' মানুষের উচ্চ মর্যাদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কুকুরের উচ্ছিষ্ট খাবার থেকে মানুষ দূরে রাখার উদ্দেশ্যেই এ শর্ত আরোপ করা হয়েছে। কেননা কুকুর শিক্ষাপ্র হলে ও শিকার করে সেটিকে মালিকের জন্যে ধরে রাখলে তখন সেটি এক শিকার যন্ত্র মাত্র, শিকারী শিকার কাজে ব্যবহার করেছে। যেমন শিকারী তীর বল্লম বা বন্দুক চালিয়ে থাকে।
৩. কুকুর পাঠানর সময় বিসমিল্লাহ্ বলাটা তীর নিক্ষেপ বা বল্লম কিংবা চালান কালে বিস্মিল্লাহ্ বলার মতোই। কুরআনের আয়াতে তারই নির্দেশ দেয়া হয়েছে:
فَاذْكُرُ وَاسْمَ اللَّهُ عَلَيْهِ -
৪. এ বিষয়ে বহু সহীহ্ হাদীসও বর্ণিত হয়েছে, যেমন হযরত আদী ইবনে হাতিম (রা) বর্ণিত হাদীসসমূহ।
উপরিউক্তি শর্ত থেকে একথাও সুস্পষ্ট হয়ে উঠে যে, প্রেরিত কুকুরটির সাথে অপর কোন কুকুর শরীক হলে এ দুয়ের শিকার খাওয়া হালাল হবে না। হযরত আদী (রা) জিজ্ঞেস করলেন:
إِنِّي أُرْسِلُ كَلْبِي أَجِدُ مَعَهُ كَلْبًا لَا أَدْرِي أَيُّهُمَا أَخَذَهُ .
আমি আমার কুকুর শিকারের জন্যে পাঠাই, পরে সেটির সঙ্গে দ্বিতীয় একটি অপরিচিত কুকুরও দেখতে পাই, তখন কি করব?
নবী করীম (স) বললেন:
فَلَا تَأْكُلْ - فَانَّمَا سَمِّيْتَ عَلَى كَلْبِكَ وَلَمْ تُسَمٌ عَلَى غَيْرِهِ -
তাহলে তুমি শিকার খাবে না। কেননা তুমি তো বিসমিল্লাহ বলেছ তোমার নিজের প্রেরিত কুকুরটির ওপর; অপরটির ওপর নয়। (আর তুমি জান না এ দুটির মধ্যে কোন্ট শিকার করেছে?)।
তীর নিক্ষেপ করা বা শিকার পাঠানর সময় বিসমিল্লাহ্ বলতে যদি ভুলে যায়, তাহলে খাওয়ার সময় এই ভুল শুধরে নিলেই চলবে। আল্লাহ দয়া করে মুসলিম উম্মতের অনেক ভুল-ভ্রান্তিই মাফ করে দিয়েছেন এবং দেন। এটাও সেই পর্যায়ের গণ্য।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00