📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 শিকারী সম্পর্কিত কথা

📄 শিকারী সম্পর্কিত কথা


স্থলভাগে শিকারীর জন্যে সেই শর্ত যা যবেহকারীর জন্যে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। আর তা হচ্ছে, তাকে মুসলিম হতে হবে অথবা আহলি কিতাব। আহলি কিতাব পর্যায়ে পড়ে এমন লোকের শিকারও খাওয়া যাবে- যেমন দাবি ও মাজুসী।
ইসলামের শিক্ষা হচ্ছে, নিরর্থক শিকার করা অর্থাৎ খাওয়ার উদ্দেশ্য না নিয়ে অথবা অপর কোন সুফল পূর্ণ কাজের উদ্দেশ্যে না রেখে শিকার করা বাঞ্ছনীয় নয়। কেননা বিনা কারণে ও উদ্দেশ্যহীনভাবে প্রাণী হত্যা করার অনুমতি ইসলাম দেয়নি। হাদীসে বলা হয়েছে:
مَنْ قَتَلَ عُصْفُوراً عَبَثًا عَجٌ إِلَى الله يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَقُولُ يَارَبِّ إِنَّ فُلَانًا قَتَلَنِي عَبَثًا وَلَمْ يَقْتُلِي مَنْفَعَةً - (نسائی، ابن حبان)
যে লোক কোন পাখি অর্থহীন উদ্দেশ্যহীনভাবে হত্যা করবে, কিয়ামতের দিন তা আল্লাহ্র কাছে ফরিয়াদ করবে, হে আল্লাহ্ অমুক লোকটি আমাকে অর্থহীনভাবে হত্যা করেছিল, কোন ফায়দা লাভের জন্যে হত্যা করেনি।
অপর একটি হাদীসে বলা হয়েছে:
مَا مِنْ انْسَانٍ يَقْتُلُ عُصْفُورًا فَمَا فَوْقَهَا بِغَيْرِ حَقَّهَا إِلَّا سَأَلَهُ اللَّهُ عَنْهَا يَوْمَ القيامة - قِيلَ يَا رَسُولَ الله وَمَا حَقَّهَا ؟ قَالَ أَنْ يُذْبَحَهَا فَيَاكُلْهَا وَلَا يُقْطَعُ رَأْسَهَا فَيُرْمَى بِهِ - (نسائی - حاکم)
যে লোক কোন চড়ুই বা তার বড় কোন পাখি অন্যায়ভাবে হত্যা করবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার বিষয়ে নিশ্চয়ই কৈফিয়ত চাইবেন। সাহাবী বললেন হে রাসূল, ওদের আবার কি হক রয়েছে? বললেন: ওদের হক হচ্ছে ওদের যবেহ করে খেতে হবে, ওদের মস্তক কেটে নিক্ষেপ করে দেয়া নয়।
শিকারীর জন্যে আরও শর্ত হচ্ছে, সে যেন হজ্জ কিংবা উমরার জন্যে ইহরাম বাধা অবস্থার লোক না হয়। কেননা ইহরাম বাধা অবস্থায় মুসলিম পূর্ণাঙ্গ শান্তি নিরাপত্তা ও বিপদ মুক্তির অবস্থায় অবস্থান করে। এ ব্যাপারে তার ক্ষেত্র অত্যন্ত প্রশস্ত। তার চারপার্শ্বের সব জীব এবং পাখিরাও পূর্ণ নিরাপত্তা লাভ করে থাকে। এমন কি ইহরাম বাধা মুসলিমের হাতের বা তীরের নাগালের মধ্যেও যদি কোন শিকার এসে যায়, তবুও সে শিকার থেকে বিরত থাকবে। এ হচ্ছে মুসলিমের ধৈর্যের প্রশিক্ষণ পর্যায়ের ব্যবস্থা। তাই কুরআনে বলা হয়েছে:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَيَبْلُوَنَّكُمُ اللَّهُ بِشَيْءٍ مِّنَ الصَّيْدِ تَنَالُهُ أَيْدِيْكُمْ وَرِمَاحُكُمْ لِيَعْلَمَ اللهُ مَنْ يُخَافُهُ بِالْغَيْبِ ، فَمَنِ اعْتَدَى بَعْدَ ذَلِكَ فَلَهُ عَذَابٌ أَلِيمٌ - (المائدة : ٩٤)
হে ঈমানদার লোকেরা, আল্লাহ শিকার জাতীয় জিনিস দ্বারা তোমাদের অবশ্যই পরীক্ষা করবেন। তোমাদের হাত ও তীর তা নাগালের মধ্যে পেয়ে যাবে। আল্লাহকে অজ্ঞাতসারে কে সে ভয় করে, তা তিনি জানতে চান। এতদসত্ত্বেও যদি কেউ সীমালংঘন করে, তবে তার জন্যে পীড়াদায়ক আযাব রয়েছে।
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَقْتُلُوا الصَّيْدَ وَأَنْتُمْ حُرُمٌ -
হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা ইহরাম বাঁধা থাকা অবস্থায় শিকার করবে না। (সূরা মায়িদা: ৯৫)
وَحُرِّمَ عَلَيْكُمْ صَيْدُ الْبَرِّ مَا دُمْتُمْ حُرُمًا
তোমরা যতক্ষণ ইহরাম বাধা অবস্থায় থাকবে, ততক্ষণ তোমাদের জন্যে স্থলভাগে শিকার করা হারাম করা হয়েছে। (সূরা মায়িদা: ৯৬)

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 শিকার প্রাণী সম্পর্কিত শর্ত

📄 শিকার প্রাণী সম্পর্কিত শর্ত


যে জন্তু বা প্রাণী শিকার করা হবে, সে সম্পর্কে শর্ত হচ্ছে, তা এমন জন্তু বা প্রাণী হবে যাকে ধরে তার গলা বা মজ্জাস্থি (marrow)-তে যবেহ করা সম্ভব হবে না। যদি তা সম্ভব হয় তা হলে তা অবশ্যই নির্দিষ্ট নিয়মে যবেহ করতে হবে, তা না করা হলে হালাল হবে না।
যদি তীর নিক্ষেপ করা বা শিক্ষাপ্রাপ্ত কুকুরের দ্বারা শিকার করা না হয়, আর তা এমন অবস্থায় হস্তগত হয় যে, তার মধ্যে এখনও জীবনের স্থিতি রয়েছে তা হলে প্রচলিত নিয়মে গলদেশে যবেহ করতে হবে। কিন্তু যদি তা স্থিতিশীল জীবন নেই, এমন অবস্থায় হস্তগত হয় তাহলে সেটি যবেহ না করাই সঙ্গত। আর যদি তার সেই অবস্থায় সেটিকে মৃত্যুর জন্যে ছেড়ে দেয়া হয়, তাহলে কোন গুনাহ হবে না। বুখারী ও মুসলিম-এ হাদীস উদ্ধৃত হয়েছে:
وَإِذَا أَرْسَلْتَ كَلْبُكَ فَاذْكُرِ اسْمَ اللَّهِ عَلَيْهِ فَإِنْ أَمْسَكَ فَادْرَكْتَهُ حَيًّا - فَاذْبَحْه
তুমি যখন তোমার শিকারী কুকুর পাঠাবে তখনই তার ওপর আল্লাহ্ নাম উচ্চারণ করবে। পরে তা যদি শিকারকে তোমার জন্যে আটকে রাখে আর তুমি সেটি জীবন্ত অবস্থায় হাতে পাও তাহলে তুমি যবেহ করবে।

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 শিকার করার উপায়

📄 শিকার করার উপায়


যে সব উপায়ে শিকার করা যায় তা দু'ধরনের:
১. তীক্ষ্ণ শানিত অস্ত্র, যেমন তলোয়ার, বল্লম ইত্যাদি। কুরআনের আয়াতে এ দিকের ইঙ্গিত পাওয়া যায়:
تَنَا لَهُ أَيْدِيْكُمْ وَرِمَاحُكُمْ -
তা পায় তোমাদের হস্ত এবং তীরসমূহ। (সূরা মায়িদা : ৯৪)
২. শিকারী জন্তু, যাকে শিকার কার্যের জন্যে রীতিমত শিক্ষিত ও ট্রেনিং প্রাপ্ত করা হয়েছে, যেমন কুকুর, বাজ ইত্যাদি। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
قُلْ أُحِلَّ لَكُمُ الطَّيِّبَتُ : وَمَا عَلَّمْتُمْ مِّنَ الْجَوَارِحِ مُكَلِّبِينَ تُعَلِّمُونَهُنَّ مِمَّا عَلَّمَكُمُ اللهُ
তোমাদের জন্যে হালাল করা হয়েছে সব পাক-পবিত্র জিনিস, আর তোমাদের যেসব শিকারী জন্ত ট্রেনিং প্রদত্ত, আল্লাহ্ তোমাদের যা শিখিয়েছেন তা দিয়ে তোমরাও শিক্ষিত করে তোল (সূরা মায়িদা : ৪)

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 শানিত অস্ত্র দ্বারা শিকার করা

📄 শানিত অস্ত্র দ্বারা শিকার করা


অস্ত্র দ্বারা শিকার করানোর দুটি শর্ত রয়েছে:
প্রথম, অস্ত্রটি শিকারের দেহের মধ্যে এমনভাবে বিদ্ধ হয়ে যাবে যে, এই জখমই সেটির মৃত্যুর কারণ হবে। অস্ত্রের চাপে পড়ে যেন মৃত্যু না হয়। হযরত আদী ইবনে হাতিম (রা) নবী করীম (স)-কে জিজ্ঞেস করলেন:
إِنِّي أَرْمِي بِلْمِعْرَاضِ الصَّيْدَ فَأَصِيبُهُ -
আমি ফলা ছাড়া তীর দ্বারাই শিকার করি। আর তা লক্ষ্য ভেদ করে, সেটি খাওয়া কি জায়েয?
রাসূলে করীম (স) জবাবে বললেন:
إِذَا رَمَيْتَ بِالْمِعْرَاضِ فَخَرَقَ فَكُلِّ وَمَا أَصَابَ بِعَرْضِهِ فَلَا تَأْكُلْ -
যখন তুমি তীর নিক্ষেপ কর, তার ধারালো দিকটা যদি দেহে ঢুকে যায় তাহলে তা খাও। আর যদি পাশাপাশি লাগে ও তার আঘাতে মরে তাহলে তা খাবে না। (বুখারী, মুসলিম)
এ হাদীস থেকে জানা গেল, শিকারীর দেহে ঢুকে পড়াটাই আসল লক্ষ্য। যদি শিকারের মৃত্যু হয় ভারী বোঝার তলায় চাপা পড়ে তাহলে তা খাওয়া জায়েয হবে না। এ হিসেবে বন্দুক ও পিস্তল-রিভালবারের গুলী দ্বারা শিকার করা জন্তু হালাল হবে। কেননা এই গুলী দেহাভ্যন্তরে তীর, বল্লাম ও তরবারীর তুলনায়ও অধিক শানিত ও গভীরভাবে প্রবেশ করে। এ পর্যায়ে ইমাম আহমদ কর্তৃক উদ্ধৃত একটি হাদীস হচ্ছে:
لَا تَا كُلَّ مِنَ الْبَنْدقَة الا مَا ذَكَيْتَ -
বন্দুক দ্বারা শিকার করা জন্তু বা পাখি খাবে না, তবে যবেহ করলে তা খেতে পার।
আর বুখারী উদ্ধৃত হযরত ইবনে উমর (রা)-এর একটি উক্তি হচ্ছে: বন্দুক দ্বারা করা শিকার 'মওকুযা' লাঠির আঘাতে মরা জন্তুর মতোই হারাম, এতে বুন্দেকা অর্থ 'মাটির ঢিলা'। তা নিক্ষেপ করে শিকার করা জন্তু নিশ্চয়ই হারাম। কিন্তু এখানে 'বন্দুক' বলতে আমরা আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র মনে করছি এবং তার দ্বারা শিকার করা জন্তু অবশ্যই হালাল হবে।
'বুন্দেকা'র সাথে সাদৃশ্য সম্পন্ন জিনিস হচ্ছে প্রস্তর খণ্ড বা পাকা ইটের ঢুকরা। নবী করীম (স) বলেছেন:
إِنَّهَا لَا تُصِيدُ صَيْدًا وَلَا تَنْكَاءُ عَدُوا لَكنَّهَا تُكْسِرُ السِّنَّ وَتَفْقَأُ الْعَيْنَ -
প্রস্তরখণ্ড বা ইটের টুকরা দ্বারা শিকার করা যায় না, শত্রুকেও গভীরভাবে জখম করা চলে না। তবে তদ্দ্বারা দাঁত ভাঙ্গা যায় ও চক্ষু ফোটান যায়। (বুখারী, মুসলিম)
দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, হাতিয়ার নিক্ষেপ করা বা অস্ত্র চালানের সময় আল্লাহ্ নাম উচ্চারণ করতে হবে। নবী করীম (স) হযরত আদী ইবনে হাতিম (রা)-কে যেমন শিক্ষা দিয়েছেন। ও বিষয়ে তাঁর বর্ণনা করা হাদীসসমূহ বিশেষ গুরুত্বের অধিকারী।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00