📄 বিদ্যুৎ স্পর্শে যবেহ করা বা টিনবদ্ধ গোশত খাওয়া
দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে, আহলি কিতাব- ইয়াহূদ-খ্রিষ্টানদের যবেহ করার নিয়ম কি আমাদের নিয়মের অনুরূপ হতে হবে? আমরা যেমন তীক্ষ্ণ অস্ত্র দ্বারা গলা কেটে দিই, ওদের যবেহেও কি এ রকমেরই হতে হবে?
অধিকাংশ বিশেষজ্ঞই এ ব্যাপারে এ শর্তটি আরোপ করেছেন। তবে মালিকী মাযহাবের আলেম জামায়াত ফতোয়া দিয়েছেন যে, তা জরুরী শর্ত নয়।
কাযী ইবনুল আরাবী সূরা আল-মায়িদা'র আয়াতের তাফসীরে বলেছেন: এ কথা অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, আহলি কিতাবের শিকার ও খাবার আল্লাহ্ জায়েয বলে ঘোষিত জিনিসগুলোর মধ্যে গণ্য। তা নিঃশর্তে হালাল। এ কথাটি বিশেষভাব বলা হয়েছে, যেন এ ব্যাপারে সব শোবাহ সন্দেহ দূরীভূত হয়ে যায়, ভুল ধারণার লেশমাত্র অবিশিষ্ট না থাকে। আমার নিকট জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, খ্রিস্টানরা মুরগীর গলা মুচড়িয়ে দিয়ে মারে। পরে তারা তা রান্না করে। এরূপ অবস্থায় কি আমরা তাদের সাথে খাবারে শরীক হতে পারি? ওদের খাবার কি খাওয়া যেতে পারে? আমি বললাম, খাওয়া যেতে পারে। কেননা তা খ্রিস্টান এবং তাদের পাদ্রী-পণ্ডিতদের খাবার। যদিও আমাদের মতে যবেহ করার এ নিয়ম ঠিক নয়। কিন্তু আল্লাহ্ তো ওদের খাবার আমাদের জন্যে সাধারণভাবে হালাল করে দিয়েছেন। আর ওরা ওদের দ্বীনে যেখানেই জায়েয মনে করে, তা আমাদের জন্যেও হালাল! তবে যে সব আহার্যে আল্লাহ্ তা'আলা ওদেরকে মিথ্যাবাদী বলেছেন, সেগুলো খাওয়া যাবে না। আমাদের বিশেষজ্ঞগণ বলেছেন, এ আহলি কিতাবরা ওদের কন্যাদের আমাদের কাছে বিয়ে দেয়। তাদের সাথে সঙ্গম জায়েয। এমতাবস্থায় ওদের যবেহ করা জন্তু আমরা খাব না কেন? হালাল-হারামের দৃষ্টিতে বিবেচনা করা হলে যৌন সঙ্গমের তুলনায় খাদ্য খাওয়ার ব্যাপারটি অনেক কম গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
এ তাফসীরকারই অপর এক স্থানে লিখেছেন:
ওরা যবেহ করে না, গলায় ফাঁস দিয়ে বা মাথা নিষ্পেষিত করে মারে। তারপর ওরা তা খায়। এ কারণে তা আমাদের জন্য মুর্দার ও হারাম। কিন্তু এ (নাজায়েয হওয়া ও উপরে বর্ণিত জায়েয হওয়ার) ব্যাপারদ্বয়ের মাঝে কোন বৈপরীত্য নেই। কেননা আহলি কিতাব যেটিকে সঠিক যবেহ মনে করে তা খাওয়া আমাদের জন্যে অবশ্যই হালাল হবে। যদিও আমাদের দৃষ্টিতে ওদের যবেহ করার এ নিয়ম ঠিক নয়। কিন্তু যে সম্পর্কে ওরা নিজেরাই মনে করে, এ যবেহটা ঠিক নয়, তা আমাদের জন্যেও হালাল নয়। 'যবহে' অর্থ, 'জন্তুটির প্রাণ বের করা হবে ওটি খাওয়া হালাল-করণের ইচ্ছায়।'
মালিকী মাযহাবের অনুসারী একটি জামায়াতের এই মত।
এ আলোচনার আলোকে আমরা আহলি কিতাব লোকদের টিনবন্দী ও সংরক্ষিত মোরগ বা গরুর গোস্ত সম্পর্কিত শরীয়তের নির্দেশ বুঝতে পারি। ওদের দেশে মোরগগুলো বিদ্যুৎ স্পর্শে যবেহ করার কাজ করা হয়। এ গুলোকে ওরা নিজেরা যতক্ষণ হালল খাদ্য মনে করতে থাকবে, আয়াতটির সাধারণ ঘোষণা অনুসারে তা আমাদের জন্যে হালাল বিবেচিত হতে থাকবে।১
তবে কমিউনিস্ট দেশসমূহে তৈরী টিনবন্দী গোশত খাওয়া আমাদের জন্যে আদৌ জায়েয হতে পারে না। কেননা ওরা 'ধর্ম' নামের সব কিছুকেই অবিশ্বাস ও অস্বীকার করেছে। কাজেই ওরা আহলি কিতাব-এর মধ্যে গণ্য নয়。
টিকাঃ
১. কিন্তু এ কথাটি সর্ববাদীসম্মত নয়। সাধারণভাবে জানা আছে যে, টিনবন্দী গোস্ত শরীয়ত মুতাবিক যবেহ করা জন্তু বা প্রাণীর নয়। এক কোপে কাটা বা যবেহ করার সময় সচেতনভাবে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়নি, তা কেবলমাত্র আহলি কিতাব লোকদের মনে করলেই আমাদের জন্যেও হালাল হতে পারে না। সাধারণত যে রকমটা হয়ে থাকে, সে দৃষ্টিতে ফতোয়া দেয়া আবশ্যক। তাই যে জন্তু শরীয়তসম্মত নিয়মে যবেহ করা হয়নি, তা খাওয়া জায়েয নয়। তার যবেহকারী মুসলিম হলেও নয়। - অনুবাদক
📄 অগ্নিপূজক প্রভৃতির যবেহ করা জন্তু
অগ্নিপূজক বা প্রাচীন পারসিক ধর্মাবলম্বীদের যবেহ করা জন্তুর গোস্ত খাওয়া সম্পর্কে ইলমওয়ালারা বিভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। অনেকেই তা খেতে নিষেধ করেছেন। কেননা ওরা আসলে মুশরিক। অপরাপর মনীষীরা বলেছেন, তা খাওয়া হালাল। কেননা নবী করীম (স) বলেছেন:
سَنُّوا بِهِمْ سُنَّةَ أَهْلِ الْكِتٰبِ -
ওদের সাথে আহলি-কিতাব সুলভ আচরণ করো। (মালিক, শাফী) এ কারনেই 'হিজর' নামক স্থানের অগ্নিপূজারীদের কাছ থেকে জিযিয়া নেয়া হয়েছিল। (বুখারী)।
ইবনে হাজম তাঁর আল-মুহলা' গ্রন্থে লিখেছেন:
إِنَّهُمْ أَهْلُ كِتَابٍ فَحُكْمُهُمْ كَحُكْمِ أَهْلِ الْكِتٰبِ فِي كُلِّ ذَلِكَ .
ওরাও আহলি কিতাব। অতএব সর্ব ব্যাপারে ওদের সাথে আহলি কিতাবের ন্যায় আচরণ গ্রহণ করতে হবে।১
ইমাম আবূ হানীফার মতে ছাবী ধর্মাবলম্বীরা আহলি কিতাব। (অনেকে ব্রাহ্মণদেরও আহলি কিতাব মনে করে। বলা হয়, ওদের প্রতি কিতাব নাযিল হয়েছিল, যদিও তারা হারিয়ে ফেলেছে।)
টিকাঃ
১. জমহুর আলিমদের মতে মজুসী- অগ্নিপূজক বা পারসিকদের যবেহ করা জন্তু খাওয়া জায়েয নয়। হযরত ইবনে মাসউদ, হযরত ইবনে আব্বাস, হযরত আলী, হযরত জাবির, ইমাম মালিক, ইমাম জুহরী, ইমাম শাফিয়ী, হানাফী ফিকাহবিদগণ এবং ইমাম আহমদ প্রমুখ এ মত প্রকাশ করেছেন। ইবনে কুদামাহর মতে নবী করীম (স)-এর উপরিউক্ত উক্তি 'ওদের সাথে আহলি কিতাবের ন্যায় আচরণ গ্রহণ কর' কথাটি কেবলমাত্র জিযিয়া ধার্য করা পর্যায়ে প্রযোজ্য। ওদের যবেহ করা জন্তু খাওয়া ও ওদের মেয়ে বিয়ে করার ব্যাপারে এ নির্দেশ নয়। (আল মুগনী জ ৮ পৃ ৫৭)।
আল্লামা জাসসাস বলেন, মজুসীদের সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। অধিকাংশ ফিকাহবিদের মতে ওরা আহলি কিতাব নয়। খুব কম লোকই ওদের আহলি কিতাব মনে করে। কুরআনে মাত্র দুটি সম্প্রদায়কে আহলি কিতাব বলা হয়েছে। মজুসীদেরও আহলি কিতাব গণ্য করে দুটির পরিবর্তে তিনটি সম্প্রদায়ের কথা বলা হতো। নবী করীম (স)-ও 'ওরা আহলি কিতাব' একথা বলেন নি। আহলি কিতাবের ন্যায় আচরণ করতে বলেছেন মাত্র। আর তাও ওদের কাছ থেকে জিযিয়া আদায় করার ব্যাপারে। (আহকামুল কুরআন জ ২ পৃ ৪০) - অনুবাদক।
📄 দৃষ্টির অন্তরালবর্তী জিনিসের খোঁজ করা অনাবশ্যক
যা চোখের অন্তরালে অবস্থিত, সে বিষয়ে প্রশ্ন করা ও খোঁজ খবর লওয়ার জন্যে চেষ্টা করা- কিভাবে যবেহ করা হয়েছে, যবেহর সব কয়টি শর্ত পূর্ণ হয়েছে কিনা, যবেহ কালে আল্লাহ্ নাম উচ্চারণ করা হয়েছে কিনা- এ ধরনের অজানা বিষয়সমূহ জানতে চেষ্টা করা মুসলিম ব্যক্তির দায়িত্বভুক্ত নয়। কেননা মুসলিম ব্যক্তি যবেহ করে থাকলে অপরাপর অজানা বিষয়াদি- সে অজ্ঞ-মূর্খ, ফাসিক বা কিতাবী- যাই হোক না কেন, তা খাওয়া সম্পূর্ণ হালাল।
পূর্বেই বলা হয়েছে, সাহাবীগণ প্রশ্ন করলেন, ইয়া রাসূল, লোকেরা আমাদের কাছে গোস্ত নিয়ে আসে, তারা যবেহ কালে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করেছে, কি করেনি তা আমরা জানি না, এ অবস্থায় কি করব? রাসূল বললেন: তোমরা বিসমিল্লাহ বলে আহার কর।
এ হাদীস সম্পর্কে বিশেষজ্ঞগণ বলেছেন:
এ হাদীসটি প্রমাণ করে যে, কাজ কর্ম ও হস্তক্ষেপ ইত্যাদি সব কিছুই যথার্থ ও ঠিকঠাক আছে মনে করতে হবে, যতক্ষণ তার খারাপ বা বাতিল হওয়ার অকাট্ট দলিল পাওয়া যাবে。