📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 শরীয়ত অনুযায়ী যবেহ করার শর্ত

📄 শরীয়ত অনুযায়ী যবেহ করার শর্ত


শরীয়ত অনুযায়ী যবেহ করার জরুরী শর্ত হচ্ছে:
১. জন্তু যবেহ বা নহর করতে হবে ধারাল অস্ত্র দ্বারা। যেন রক্ত প্রবাহিত হতে পারে ও রগগুলো যেন ভালভাবে কেটে যায়। সে অস্ত্র পাথরেরও হতে পারে, লৌহ বা কাষ্ট নির্মিতও হতে পারে কিংবা হযরত আদী ইবনে হাতেম তায়ী বলেন:
قُلْتُ يَا رَسُولَ الله اننا نَصِيدُ الصَّيْدَ فَلَا نَجِدُ سَكَيْنًا إِلَّا الظَّرَارَ وَشِقَّةَ الْعَصَا - فَقَالَ أَمِرَ الدَّمَ بِمَا شِئْتَ وَاذْكُرِ اسْمَ اللَّهِ عَلَيْهِ -
আমি বললাম, হে রাসূল! আমরা জন্তু শিকার করি, কিন্তু তখন আমাদের কাছে ছুরি-চাকু থাকে না, থাকে শানিত পাথর বা বাঁশের খণ্ড। তখন আমরা কি করব? রাসূল (স) বললেন: রক্ত প্রবাহিত কর যে জিনিস দ্বারাই সম্ভব হোক এবং তার ওপর আল্লাহ্ নাম উচ্চারণ কর। (মুসনাদে আহমাদ, আবূ দাউদ, নিসায়ী, ইবনে মাজাহ)
২. গলদেশে ছুরি চালাতে হবে অথবা গলার নিচের অংশে ছুরি বসিয়ে দিতে হবে, (প্রচলিত ভাষায় এটাই নহর) যার ফলে জন্তুটির মৃত্যু সঙ্ঘটিত হবে।
যবেহ'র পূর্ণত্বের পন্থা হচ্ছে, খাদ্যনালী ও গলার মধ্যের বড় দুটি রগ কেটে দিতে হবে। কিন্তু যখন নির্দিষ্ট স্থানে ছুরি চালান অসম্ভব হয়ে পড়বে, যেমন একটা গুরু কুয়ার মধ্যে পড়ে গেছে, তার মাথা ভিতরে, পায়ের দিকটা বাইরে রয়েছে যা স্বাভাবিক নিয়মে যথাস্থানে যবেহ করা যাবে না। তখন তার অবস্থা হবে শিকার করা জন্তুর মতো। তখন ধারাল অস্ত্র সাধ্যমত যে-কোন স্থানে চালিয়ে রক্ত প্রবাহিত করতে হবে। তা করা হলে হালাল হয়ে যাবে।
বুখারী-মুসলিমে হযরত রাফে ইবনে খদীজা (রা) থেকে হাদীস উদ্ধৃত হয়েছে। তিনি বলেন:
كُنَّا مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي سَفَرِهِ فَنَدَّ بَعِيْرٌ مِنْ ابْلِ الْقَوْمِ وَلَمْ يَكُنْ مَعَهُمُ الخَيْلُ فَرَمَاهُ رَجُلٌ بِسَهُم فَحَبَسَهُ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنْ هَذِهِ الْبَهَائِمَ أَوَائِدٌ كَأَوَابِدِ الْوَحْشِ فَمَا فَعَلَ مِنْهَا هُذَا فَافْعَلُوا بِهِ هَكَذَا
এক পরিভ্রমণে আমরা নবী করীম (স)-এর সঙ্গে ছিলাম। সহসা একটি উট নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল। তখন লোকদের সঙ্গে ঘোড়া ছিল না বলে দ্রুত গতিতে গিয়ে সেটাকে ধরা গেল না। এক ব্যক্তি তীর নিক্ষেপ করে উটকে বেঁধে ফেলল। তা দেখে নবী করীম (স) বললেন: এসব চতুষ্পদ জন্তু এভাবে আয়াত্তের বাইরে চলে গেলে তখন তোমরাও তার অনুরূপ আচরণই করবে।
৩. যবেহ করার সময় আল্লাহ্ ছাড়া আর কারো নাম উচ্চারণ করা যাবে না। এ এক সর্ববাদী সম্মত কথা। তার কারণ হচ্ছে, জাহিলিয়াত যুগে লোকেরা তাদের উপাস্যদের দেবী দেবতা-মূর্তির নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে জন্তু যবেহ করত। যবেহ করার সময় তারা সে সব দেব-দেবীর নাম উচ্চারণ করত অথবা নির্দিষ্ট স্থানে বলিদান করত। কুরআন মজিদে এসব হারাম করা হয়েছে। পূর্বেই এতদসংক্রান্ত আয়াতের উল্লেখ করা হয়েছে।
৪. যে জন্তুটি যবেহ করা হচ্ছে, তার ওপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করতে হবে। কুরআনের আয়াতে তা সুস্পষ্ট ভাষায় বলে দেয়া হয়েছে এ ভাষায়:
فَكُلُوا مِمَّا ذُكِرَ اسْمُ اللَّهُ عَلَيْهِ إِنْ كُنْتُمْ بِأَيْتِهِ مُؤْمِنِينَ -
তোমরা যদি আল্লাহ্র আয়াতসমূহের প্রতি ঈমানদার হয়ে থাক, তাহলে যেসব জন্তু যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়েছে তোমরা সেগুলো খাও। (সূরা আন'আম: ১১৮)
ইরশাদ হয়েছে:
وَلَانَا كُلُوا مِمَّا لَمْ يُذكَرِ اسْمُ الله عَلَيْهِ وَإِنَّهُ لفسق - (الانعام ۱۲۱)
যেসব জন্তু যবেহকালে আল্লাহ্ও নাম উচ্চারণ করা হয়নি, তোমরা তা খেও না। কেননা তা খাওয়া ফাসিকী (ইসলামের সীমালংঘনমূলক) কাজ।
রাসূলে করীম (স) বলেছেন:
مَا أَنْهِرَ الدَّمُ وَذُكِرَ اسْمُ اللَّهُ عَلَيْهِ فَكُلُوا
যে জন্তুর রক্ত প্রবাহিত করা হয়েছে এবং তখন তার ওপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়েছে, তোমরা তা খাও। (বুখারী)
যেসব হাদীসে শিকার করার উদ্দেশ্যে তীর নিক্ষেপ করার এবং শিক্ষা দেয়া কুকুরকে শিকারের উদ্দেশ্যে পাঠাবার সময় আল্লাহ্ নাম উচ্চারণ করার কথা বলা হয়েছে, তা উপরিউক্ত মতেরই সমর্থক। কোন কোন আলেমের মতে আল্লাহ্ নাম উচ্চারণ তো জরুরী; কিন্তু ঠিক যবেহ করার মুহূর্তেই এ নাম নিতে হবে, এমনটা প্রয়োজন নয়। খাওয়ার সময় নাম উচ্চারণও যথেষ্ট। কেননা যে লোক খাওয়ার সময় আল্লাহ্ নাম উচ্চারণ করে সে তো নিশ্চয়ই এমন জিনিস খায় না, যার ওপর আল্লাহ্ নাম উচ্চারণ করা হয়নি। হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেছেন:
أَنَّ قَوْمًا حَدِيثِى عَهْدٍ بِجَاهِلِيَّةٍ قَالُوا لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنْ قُوْمًا يَأْتُونَنَا بِاللَّحْمَانِ لَا نَدْرِي اذْكَرَ اسْمَ اللَّهُ عَلَيْهَا أَمْ لَمْ يَذْكُرُوا - أَتَأْكُلُ مِنْهَا أَمْ لَا فَقَالَ رَسُولُ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَذْكُرُ وَاسْمَ اللَّهُ وَكُلُوا
নতুন ইসলাম গ্রহণকারী কিছু লোক নবী করীম (স)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, লোকেরা আমাদের নিকট গোস্ত নিয়ে আসে, তারা তার ওপর আল্লাহ্ নাম উচ্চারণ করেছিল কিনা, তা আমাদেও জানা নেই। এক্ষণে আমরা তা খাব, না খাব না? নবী কারীম (স) জবাবে বললেন: তোমরা আল্লাহর নাম উচ্চারণ কর এবং খাও। (বুখারী)

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 যবেহ করার এ নিয়মের তাৎপর্য

📄 যবেহ করার এ নিয়মের তাৎপর্য


জন্তু যবেহ করার এরূপ নিয়ম বিধিবদ্ধ করার মৌল কারণ হচ্ছে, জন্তুটির প্রাণ যেন এমনভাবে সংহার করা হয়, যাতে করে সেটির কম-সে-কম কষ্ট ভোগ হয়। যবেহ'র অস্ত্রটি খুব ধারাল হওয়ার ও গলদেশে যবেহ করার শর্ত এ জন্যেই করা হয়েছে। কেননা এসব জিনিস দ্বারা যবেহ করা হলে জন্তুটির কন্ঠদেশ রুদ্ধ করার মতো অবস্থা হয়। নবী করীম (স) ছুরিটিকে অতিশয় ধারাল বানানো এবং জন্তুটিকে শান্তি দানের নির্দেশ দিয়েছেন। বলেছেন: إِنَّ اللَّهَ كَتَبَ لَإِحْسَانَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ فَإِذَا قَتَلْتُمْ فَأَحْسِنُوا الْقَتْلَةَ وَإِذَا ذَبَحْتُمْ فَأَحْسِنُوا الذَّبْحَةَ وَلَيُحِدُّ أَحَدُكُمْ سَفْرَتَهُ وَلَيُرِيحَ ذَبِيْحَتَهُ
আল্লাহ্ তা'আলা প্রতিটি ব্যাপারে ও ক্ষেত্রে দয়াশীলতা অবলম্বন ফরয করে দিয়েছেন। কাজেই তোমরা যখন হত্যা করবে, তখন অবশ্যই দয়াশীলতা সহকারে হত্যা করবে। আর যখন যবেহ করবে, তখনও সুন্দর ও উত্তমভাবে যবেহ করবে। তোমাদের প্রত্যেকেরই কর্তব্য যবেহ করার সময় যার যার ছুরিকে খুব ধারাল বানিয়ে নেয়া এবং যবেহ করার পর সেটাকে ধীরে ধীরে প্রশান্তি লাভ করার সুযোগ দেয়া। (মুসলিম)
এ সহানুভূতি ও দয়াশীলতা পর্যায়ে হযরত ইবনে উমর বর্ণিত একটি হাদীসে উল্লেখ। তিনি বলেন: إِنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمَرَ أَنْ تُحِدَّ الشَّقَارِ وَإِنْ تُوَارِي عَنِ الْبَهَائِمِ وَقَالَ إِذَا ذَبَحَ أَحَدُكُمْ فَلْيُجْهِزْ -
নবী করীম (স) আদেশ করেছেন ছুরি শানিত করতে এবং অপরাপর জন্তু থেকে গোপন রাখতে। তাই বরেছেন: তোমাদের কেউ যখন যবেহ করার কাজ করবে, তখন তা যেন সম্পূর্ণতায় পৌঁছায়। (ইবনে মাযাহ)
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেছেন, এক ব্যক্তি একটি বকরী শোয়ায়ে তার ছুরিতে ধার দিতেছিল। তা দেখে নবী করীম (স) বললেনঃ اتُرِيدُ أَنْ تُمِيتَهَا مَوْتَاتٍ - هَلَا أَحْدَدْتَ شُفْرَتَكَ قَبْلَ أَنْ تُضْجِعَهَا
তুমি কি বকরীটিকে কয়েকবার মারতে চাও? ওটিকে শোয়াবার আগে কেন তুমি তোমার ছুরিকে শানিত করে নাও নি। (হাকেম)
হযরত উমর (রা) দেখতে পেলেন, এক ব্যক্তি তার পা দিয়ে চেপে ধরে তার বকরীটিকে হেঁচড়িয়ে টেনে নিয়ে যাচ্ছে যবেহ করার উদ্দেশ্যে। তখন তিনি লোকটিকে বললেন:
(আব্দুর রায্‌যাক) وَيْلَكَ قُدْهَا إِلَى الْمَوْتِ قَوْدًا جَمِيلًا - তোমার জন্যে দুঃখ! তুমি বকরীটিকে খুব ভালভাবে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাও।
এ পর্যায়ে ইসলামী চিন্তাধারা সাধারণভাবে এরূপেই আমরা পাচ্ছি। আর তা হচ্ছে, বোবা জন্তুর প্রতি দয়াশীলতা এবং ওটিকে সব রকমের কষ্ট থেকে নিষ্কৃতি দেয়া- যতটা সম্ভব।
জাহিলিয়াতের যুগে লোকেরা উষ্ট্রের ঝুঁটি (Hump) জীবন্ত অবস্থায় কেটে নিয়ে খেতে খুব ভালবাসত। আর তারা জীবন্ত অবস্থায় দুম্বার পিছনে ঝুলে থাকা চাকতি কেটে নিয়ে যেত। তাতে করে ওদের কষ্টের সীমা থাকত না। এ কারণে নবী করীম (স) জীবন্ত জন্তুর দেহাংশ কেটে নেয়াকে হারাম করে দিয়েছেন। বলেছেন : مَا قُطِعَ مِنَ البَهِيمَةِ وَهِي حَيَّةٌ فَهُوَ مَيْتَةٌ - জন্তুর জীবন্ত অবস্থায় তার দেহাংশ কেটে নেয়া হলে সেটাকে মৃত মনে করতে হবে (এবং তা হারাম)। (আহমদ আবু দাউদ, তিরমিযী)

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণের তাৎপর্য

📄 যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণের তাৎপর্য


যবেহ করার সময় আল্লাহ্ নাম উচ্চারণ করার অপরিহার্যতার মূলে গভীর সূক্ষ্ম কারণ নিহিত। সে বিষয়ে অবহিত হওয়া ও সে দিকে লক্ষ্য দেয়া বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে।
মূর্তিপূজারী ও জাহিলিয়াতের লোকেরা যবেহ করার সময় তাদের মা'বুদদের নাম উচ্চারণ করত। ইসলামে তদস্থলে আল্লাহর নাম উচ্চারণের বিধান দেয়া হয়েছে। কেননা মুশরিকরা যখন যবেহ করার সময় তাদের উপাস্যদের নাম লয়, তখন এক আল্লাহ্র প্রতি ঈমানদার লোকেরা অনুরূপ সময়ে তা না করে কি থাকতে পারে?
দ্বিতীয়ত: জন্তুগুলোও তো মানুষেরই মতো এক আল্লাহ্র সৃষ্টি। মানুষ যে ওগুলোর প্রাণ হরণ করবে, তাতে আল্লাহ্র অনুমতি থাকা একান্তই আবশ্যক। যবেহ করার সময় আল্লাহ্ নাম উচ্চারণ করা হলে এই অনুমতি লাভেরই ঘোষণা হয়ে যায়। এ সময় সে যেন বলছে, আমি এ কাজটি করছি এ জন্যে নয় যে, ওগুলো দুর্বল, অক্ষম ও অসহায়। আমি ওগুলোর ওপর জুলুম করতে চাইনা। বরং যবেহ করার এই যে কাজটি আমি করছি, তা একমাত্র আল্লাহ্ অনুমতিক্রমেই করছি। তার নাম নিয়েই আমি শিকার করছি এবং তাঁরই নাম সহকারে আমি তা খাচ্ছি।

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 ইয়াহুদী ও খৃষ্টানদের যবেহ করা জন্তু

📄 ইয়াহুদী ও খৃষ্টানদের যবেহ করা জন্তু


জন্তু যবেহ করার ব্যাপারে ইসলাম কত কড়াকড়ি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, তা আমরা এর পূর্বে দেখেছি। বস্তুত ইসলামে এ ব্যাপারটি অত্যন্ত গুরুত্ববহ। আরব মুশরিক ও জাহিলিয়াতের লোকেরা জন্তু যবেহ করার ব্যাপারটিকে তাদের আকীদা অনুযায়ী ধর্মের অঙ্গ ও পূজা-উপাসনার অপরিহার্য অনুষ্টানের মধ্যে গণ্য করে নিয়েছিল। তারা জন্তু যবেহ করে আসলে তাদের দেবদেবী-উপাস্যদের সন্তুষ্টি ও নৈকট্যই অর্জন করতে চেয়েছে। এই কারণে দেবদেবীর উদ্দেশ্যে বলিদানের জন্যে নির্দিষ্ট স্থানেই তারা জন্তু যবেহ করত। আর তখন তাদের দেবদেবীর নাম উচ্চারণ করত।
ইসলাম এসব বন্ধ করে দিয়ে যবেহ করার সময় একমাত্র আল্লাহর নাম উচ্চারণ করার ব্যবস্থা দৃঢ়ভাবে স্থাপিত ও কার্যকর করল। আল্লাহ্ ছাড়া অপর কারো নাম লওয়াকে সম্পূর্ণ নিষেধ করে দিল। ওসব নির্দিষ্ট 'স্থান' সমূহে জন্তু যবেহ করা এবং এক আল্লাহ্ ছাড়া অন্যদের নামে উৎসর্গীকৃত জন্ত হারাম করে দিয়েছে।
আহলি কিতাব- ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানরা মূলত তওহীদে বিশ্বাসী ছিল। কিন্তু পরে তাদের ঈমানী আকীদায় শির্ক অনুপ্রবেশ করে। কেননা তাদের কাছে সে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছেছিল এমন সব লোকের মাধ্যমে, যারা শিরকী-আকীদার দোষ ও মালিন্য থেকে নিজেদের বিশ্বাস ও মনমানসকে মুক্ত করে নিতে পারেনি। এ কারণে মুসলিমদের মনে এ ভাবটা জেগে ওঠার খুব বেশি সম্ভাবনা ছিল যে, ওদেরকে মূর্তিপূজারী মুশরিক মনে করে তদনুরূপ আচরণই ওদের সাথে অবলম্বন করতে হবে। কিন্তু আল্লাহ্ তা'আলা ওদের ব্যাপারে মূর্তিপূজারীদের থেকে ভিন্নতর রীতি অবলম্বন করার নির্দেশ দিলেন। খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে ওদের সাথে একত্রিত হওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে, যেমন অনুমতি দেয়া হয়েছে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের। আল্লাহ্ তা'আলা কুরআনের সর্বশেষ অবতীর্ণ আয়াতে ইরশাদ করেছেন:
الْيَوْمَ أُحِلَّ لَكُمُ الطَّيِّبْتُ ، وَطَعَامُ الَّذِينَ أُوتُوا الكَتَبَ حِلٌّ مِن لَّكُمْ وَطَعَا مُكُمْ حِلٌّ لَهُمْ -
আজকের দিনে তোমাদের জন্যে সব পবিত্র উৎকৃষ্ট খাদ্য হালাল করে দেয়া হলো, আর তাদের খাদ্যও, যাদের কিতাব দেয়া হয়েছে— তোমাদের জন্যে হালাল এবং তোমাদের খাদ্যও হালাল তাদের জন্যে। (সূরা মায়িদা: ৫)
এক কথায় এ আয়াতের অর্থ হচ্ছে সকল প্রকার পবিত্র উৎকৃষ্ট খাদ্য সম্পূর্ণ হালাল। অতএব 'বহীরা' 'সায়েয়া' অসীলা বা 'হাম' বলতে আর কিছু নেই। আর ইয়াহুদী খ্রিস্টান আহলি কিতাব জাতিগুলোর খাদ্য মৌলিকভাবে তোমাদের জন্যে হালাল। আল্লাহ্ তা কখনই হারাম করেন নি। তোমাদের খাদ্যও তাদের জন্যে হালাল। তাহলে তাদের যবেহ করা বা শিকার করা জন্তুর গোস্ত খাওয়াও তোমাদের জন্যে জায়েয। অনুরূপভাবে তোমরা যা যবেহ কর বা শিকার কর তা তাদের খাওয়াতেও কোন নিষেধ নেই।
তবে আরবের মুশরিকদের ব্যাপারে ইসলাম খুব বেশি কঠোরতা অবলম্বন করেছে। কিন্তু আহলি কিতাবের সাথে নম্র আচরণ গ্রহণ করেছে। তার কারণ হচ্ছে, আহলি কিতাব লোকেরা ওহী, নবুওয়্যাত এবং মোটামুটি দ্বীনের মৌলিক নিয়ম নীতিগুলো মানে। এ কারণে তারা ঈমানদারদের খুবই নিকটে অবস্থিত। খাওয়া-দাওয়ায় তাদের সাথে শরীক হওয়া, তাদের কন্যা বিয়ে করা এবং তাদের সাথে মিলমিশ করা শরীয়তসম্মত বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এতে করে তাদের জন্যে সুযোগ দেয়া হয়েছে যে, তারা ইসলামকে লোকদের ঘরে, কথা ও কাজ, নৈতিকতা ও লেনদেনের ক্ষেত্রে তা আসল রূপে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পাবে। এ উপায়েই তারা জানতে পারবে যে, মূলত ইসলাম এমন এক দ্বীন, যা উচ্চতর তত্ত্ব ও সত্য, পূর্ণাঙ্গ নিয়মাদি, অতীব উত্তম বিশ্বাস ব্যবস্থা সমূহের ওপর ভিত্তিশীল। এতে শির্ক ও অর্থহীন কথাবার্তার কোন স্থান নেই।
কুরআনের ঘোষণা: طَعَامُ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ - কিতাবপ্রাপ্ত লোকদের খাদ্য।
কথাটি খুবই সাধারণ ও ব্যাপক অর্থ জ্ঞাপক। সর্বপ্রকারের খাদ্যই এর অন্তর্ভুক্ত। ওদের যবেহ করা জন্তুর গোস্ত এবং অন্যান্য খাদ্য সবই হালাল। কাজেই এ সবকিছুই আমাদের স্থায়ীভাবেই হালাল। তবে যদি কিছু হারাম করে দেয়া হয়ে থাকে যেমন মৃত জন্তু, প্রবাহিত রক্ত ও শূকরের গোস্ত- এগুলো খাওয়া জায়েয নয়। এটা সর্ববাধিসম্মত মত। তা যে কোন কিতাবী লোকের কাছেই হোক কিংবা হোক কোন মুসলিমের কাছে- তাতে কোন পার্থক্য নেই।
তবে এখানে কতগুলো বিষয় বিশেষভাবে মুসলমানদের জন্যে বিবেচনা প্রয়োজন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00