📄 সামষ্টিক পর্যায়ে প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থা থাকলে ব্যক্তি-প্রয়োজন অবশিষ্ট থাকে না
এক ব্যক্তি তার নিজ দেশে খাদ্যবস্তু পায় না বা তার কাছে তা নেই, এটা হতে পারে। কিন্তু তাই বলে সে সব দিক দিয়ে চরম ঠেকায় পড়ে গেছে এবং এখন সে হারাম খাদ্য না খেলে তার প্রাণ বাঁচে না, একথাটি গ্রহণীয় হতে পারে না। কেননা সে যে দেশের নাগরিক ও যে সমাজের একজন, সে দেশ ও সমাজের বা তার লোকজনের কাছে তো বিপুল খাদ্যসম্ভার মজুদই রয়েছে। এরূপ অবস্থায় ঠেকায়-পড়া ব্যক্তির প্রয়োজন পূরণ করতে হবে অন্যান্য লোকের উদ্বৃত্ত খাদ্যসম্ভার থেকে। এরূপ ব্যবস্থার সাহায্যে এ লোকটিকে হারাম খাওয়া থেকে রক্ষা করা যেতে পারে এবং তা একান্তই কর্তব্য। বস্তুত পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্যে সে ইসলামী সমাজের পূর্ণত্ব বিধান করতে হবে। এ সমাজের প্রত্যেকে অপর প্রত্যেকের জন্যে দায়ী। এ সমাজের সমস্ত ব্যক্তিসত্তার সমষ্টি এক অভিন্ন ব্যক্তিসত্তায় পরিণত হয়ে থাকে। এ ধরনের সমাজই হতে পারে শিশাঢালা প্রাচীর বিশেষ। তার প্রতিটি ইট খণ্ড অপরাপর ইট খণ্ডসমূহের জন্যে পৃষ্ঠপোষক। (হাদীসের মর্ম)
সমষ্টিক দায়িত্ব পালন পর্যায়ে ইমাম ইবনে হাজম-এর একটি উদ্ধৃতি ইসলামের ফিকাহবিদদের জন্যে দিশারী হয়ে আছে। তিনি লিখেছেন:
কোন মুসলিম ব্যক্তির জনে চরম ঠেকায়-পড়া অবস্থায়ও মুর্দার বা শূকরের মাংস আহার করা কোন ক্রমেই জায়েয হতে পারে না। কেননা তার মুসলিম বা অমুসলিম প্রতিবেশীর কাছে অতিরিক্ত খাদ্যবস্তু মজুদ রয়েছে। এমতাবস্থায় তার কর্তব্য হচ্ছে ক্ষুধার্ত ব্যক্তিকে খাবার দেয়া। এ প্রেক্ষিতে ঠেকায়-পড়া লোকটির জন্যে মুর্দার বা শূকরের মাংস খেতে বাধ্য মনে করা যায় না। তার পক্ষে তার প্রতিবেশীর কাছ' থেকে খাদ্য-পাণীয়ের অতিরিক্ত অংশ হাসিল করা সম্পূর্ণ বৈধ- তার এ অধিকার রয়েছে। এ উদ্দেশ্যে তাকে যদি লড়াইও করতে হয় এবং তাতে সে মৃত্যুও বরণ করে, তাহলে হত্যাকারীর 'কিসাস' হতে হবে। আর এ অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণের পথে বাধাদানকারীকে যদি হত্যাও করতে হয় তবু তা করা যাবে এবং নিহত ব্যক্তির ওপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হবে। কেননা এ নিহত ব্যক্তি একজন ঠেকায়-পড়া ক্ষুধার্ত ব্যক্তিকে তার বৈধ অধিকার লাভের পথে বাধা দিয়েছে। এ কারণে সে বিদ্রোহী লোকদের মধ্যে গণ্য হবে। আর তার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্যে আল্লাহ্ তা'আলা নির্দেশ দিয়েছেন:
فَإِنْ بَغَتْ احدا هُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَاتِلُوا التي تبغى حَتَّى تَفِيءَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ -
পরে তাদের একটি পক্ষ যদি অপর পক্ষের ওপর আক্রমণ চালায়, তাহলে এ সীমালংঘনকারীদের ওপর যুদ্ধ চালাও, যেন শেষ পর্যন্ত তারা আল্লাহ্ বিধানের দিকে প্রত্যাবর্তন করে। (সূরা হুযরাত: ৯)
সত্যি কথা, যে ভাইর অধিকার হরণ বা অস্বীকার করা হয় কিংবা তার পথে বাধার সৃষ্টি করে মূলত সে-ই বিদ্রোহী। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা) এ কারনেই যাকাত দিতে অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। (المحلى لابن حزم)
📄 যবেহ করার শরীয়তসম্মত পন্থা
সামুদ্রিক জীব সবই হালাল
জীব-জন্তু তাদের অবস্থান ও বসবাস স্থানের দৃষ্টিতে দুটি ভাগে বিভক্ত। হয় তারা সমুদ্রবাসী, নয় স্থল অধিবাসী।
সামুদ্রিক জীব বলতে বোঝায় যেসব প্রাণী যা পানিতে অবস্থান ও বসবাস করে এবং পানি ভিন্ন যাদের জীবন অকল্পনীয়। শরীয়তের দৃষ্টিতে মূলত তা সবই হালাল, তা যেখানেই পাওয়া যাক না কেন। তা পানির মধ্য থেকে জীবিতই ধরা হোক, কি মৃত মরে ভেসে উঠুক আর নাই উঠুক। ক্ষুদ্রাকার ও বিরাটাকার মাছসমূহ এর মধ্যে পড়ে। আর সামদ্রিক কুকুর কিংবা সামুদ্রিক শূকর বলতে যে জীবগুলোকে বোঝায় তাও এবং এ ধরনের অপরাপর মাছ জাতীয় জীব- সবই হালাল পর্যায়ে গণ্য। তাকে ধরেছে বা মেরেছে কিংবা শিকার করেছে- সে মুসলিম কি কাফির- সে প্রশ্ন এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অবান্তর। বস্তুত সমুদ্রে যা কিছু এবং যত কিছুই রয়েছে তা সব হালাল করে দিয়ে আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর বান্দাদের প্রতি বিশাল পর্যায়ের অনুগ্রহ দান করেছেন। সামুদ্রিক জীবদের মধ্য থেকে বিশেষ কোন শ্রেণীকে হারাম ঘোষণা করা হয়নি এবং তাদের যবেহ করার কোন শর্তও আরোপ করা হয়নি। বরং মানুষকে এক্ষেত্রে অবাধ অনুমতি দেয়া হয়েছে, সে নিজের কষ্ট ও অভাব লাঘবের জন্যে যতটা ইচ্ছা সংগ্রহ করে ব্যবহার করতে পারে। আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর বান্দাদের প্রতি তার বিশেষ অনুগ্রহের কথা প্রকাশ প্রসঙ্গেই ইরশাদ করেছেন: ( النحل : ١٤ ) وَهُوَ الَّذِي سَخَّرَ الْبَحْرَ لِتَأْكُلُوا مِنْهُ لَحْمًا طَرِيًّا
সেই মহান আল্লাহই নদী-সমুদ্রকে নিয়ন্ত্রিত ও নিয়োজিত করে রেখেছেন, যেন তোমরা তা থেকে তাজা গোশ্ত গ্রহণ করতে পার। বলেছেন: أُحِلَّ لَكُمْ صَيْدُ الْبَحْرِ وَطَعَا مُهُ مَتَاعًا لَكُمْ وَلِلسَّيَّارَةِ -
তোমাদের জন্যে সমুদ্রের শিকার ও খাদ্য হালাল করে দেয়া হয়েছে। তা তোমাদের ও পরিভ্রমণকারীদের জন্যে সামগ্রী। (সূরা মায়িদা : ৯৬) এ দুটি আয়াতে সব সামুদ্রিক জীবকেই সাধারণভাবে ও নির্বিশেষে হালাল করার কথা ঘোষিত হয়েছে।
📄 সামুদ্রিক জীব সবই হালাল
জীব-জন্তু তাদের অবস্থান ও বসবাস স্থানের দৃষ্টিতে দুটি ভাগে বিভক্ত। হয় তারা সমুদ্রবাসী, নয় স্থল অধিবাসী।
সামুদ্রিক জীব বলতে বোঝায় যেসব প্রাণী যা পানিতে অবস্থান ও বসবাস করে এবং পানি ভিন্ন যাদের জীবন অকল্পনীয়। শরীয়তের দৃষ্টিতে মূলত তা সবই হালাল, তা যেখানেই পাওয়া যাক না কেন। তা পানির মধ্য থেকে জীবিতই ধরা হোক, কি মৃত মরে ভেসে উঠুক আর নাই উঠুক। ক্ষুদ্রাকার ও বিরাটাকার মাছসমূহ এর মধ্যে পড়ে। আর সামদ্রিক কুকুর কিংবা সামুদ্রিক শূকর বলতে যে জীবগুলোকে বোঝায় তাও এবং এ ধরনের অপরাপর মাছ জাতীয় জীব- সবই হালাল পর্যায়ে গণ্য। তাকে ধরেছে বা মেরেছে কিংবা শিকার করেছে- সে মুসলিম কি কাফির- সে প্রশ্ন এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অবান্তর। বস্তুত সমুদ্রে যা কিছু এবং যত কিছুই রয়েছে তা সব হালাল করে দিয়ে আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর বান্দাদের প্রতি বিশাল পর্যায়ের অনুগ্রহ দান করেছেন। সামুদ্রিক জীবদের মধ্য থেকে বিশেষ কোন শ্রেণীকে হারাম ঘোষণা করা হয়নি এবং তাদের যবেহ করার কোন শর্তও আরোপ করা হয়নি। বরং মানুষকে এক্ষেত্রে অবাধ অনুমতি দেয়া হয়েছে, সে নিজের কষ্ট ও অভাব লাঘবের জন্যে যতটা ইচ্ছা সংগ্রহ করে ব্যবহার করতে পারে। আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর বান্দাদের প্রতি তার বিশেষ অনুগ্রহের কথা প্রকাশ প্রসঙ্গেই ইরশাদ করেছেন: ( النحل : ١٤ ) وَهُوَ الَّذِي سَخَّرَ الْبَحْرَ لِتَأْكُلُوا مِنْهُ لَحْمًا طَرِيًّا
সেই মহান আল্লাহই নদী-সমুদ্রকে নিয়ন্ত্রিত ও নিয়োজিত করে রেখেছেন, যেন তোমরা তা থেকে তাজা গোশ্ত গ্রহণ করতে পার। বলেছেন: أُحِلَّ لَكُمْ صَيْدُ الْبَحْرِ وَطَعَا مُهُ مَتَاعًا لَكُمْ وَلِلسَّيَّارَةِ -
তোমাদের জন্যে সমুদ্রের শিকার ও খাদ্য হালাল করে দেয়া হয়েছে। তা তোমাদের ও পরিভ্রমণকারীদের জন্যে সামগ্রী। (সূরা মায়িদা : ৯৬) এ দুটি আয়াতে সব সামুদ্রিক জীবকেই সাধারণভাবে ও নির্বিশেষে হালাল করার কথা ঘোষিত হয়েছে।
📄 স্থলভাগের হারাম জীব-জন্তু
স্থলভাগের জীব-জন্তু ও প্রাণীকূলের মধ্যে কেবলমাত্র শূকর মাংস, মৃত, রক্ত এবং অ-আল্লাহ্ নামে উৎসর্গীকৃত বা যবেহকৃত ছাড়া আর কোনটিকেই হারাম ঘোষণা করা হয়নি। এ পর্যায়ের কথা পূর্বেই আলোচিত হয়েছে।
কিন্তু কুরআন মজীদেই হালাল-হারাম ঘোষণার কিছু দায়িত্ব আল্লাহ্ তা'আলা হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর ওপর অর্পন করেছেন। তাঁর দায়িত্ব বর্ণনা পর্যায়ে বলা হয়েছে:
يُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ
তিনি লোকদের জন্যে পবিত্র উৎকৃষ্ট দ্রব্যাদি হালাল করেন এবং খারাপ পচা-নিকৃষ্ট জিনিসসমূহ হারাম করেছেন। (সূরা আল-আরাফ : ১৫৭) 'খবীস' বলেতে বোঝায় তা, যা সাধারণভাবে মানব সমষ্টির সুস্থ রুচিতে জঘন্য মনে হয়- কিছু সংখ্যক লোক যদি তা পছন্দ করেও। এ পর্যায়েরই একটি হদীস হচ্ছে:
نَهَى النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ أَكْلِ لُحُومِ الْحُمُرِ الْأَهْلِيَّة يَوْمَ خَيْبَرَ -
নবী করীম (স) খায়বর যুদ্ধের দিনে গার্হস্থ্য গাধার গোশত খেতে নিষেধ করেছেন। (বুখারী)
বুখারী ও মুসলিমে উদ্ধৃত হয়েছেঃ
نهى عَنْ أَكْلِ كُلِّ ذِي نَابٍ مِنَ السَّبَاعِ وَكُلِّ ذِي مَخْلَبٍ مِنَ الطَّيْرِ -
নবী করীম (স) নখরধারী সব হিংস্র জীব এবং সব ছিড়ে খাওয়া পাখির গোশত খেতে নিষেধ করেছেন।
বাঘ, শৃগাল, চিতা ইত্যাদি প্রথম পর্যায়ের জন্তু। আর চিল, শকুন, বাজ প্রভৃতি নখরধারী পাখিগুলো দ্বিতীয় পর্যায়ের।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা)-এর মত হচ্ছে, কুরআন মজীদের যে চারটি জীব হারাম বলে উল্লিখিত হয়েছে, তাছাড়া আর কোনটিই হারাম নয়। মনে হচ্ছে, হাদীসে যেসব জন্তুর গোস্ত খেতে নিষেধ করা হয়েছে তাঁর মতে তা খাওয়া হারাম নয়, মাকরূহ মাত্র। অথবা এও হতে পারে যে, তিনি হয়ত এ হাদীস কয়টি জানতেই পারেন নি।
তিনি বলেছেন: كَانَ أَهْلُ الْجَا هليَّة يَأْكُلُونَ أَشْيَاءَ وَيَتْرُ كُونَ أَشْيَاءَ تَقَدُّرًا فَبَعَثَ اللَّهُ نَبِيِّهُ وَأَنْزَلَ كِتَابَهُ فَأَحَلُّ حَلَا لَهُ وَحَرَّمَ حَرَامَهُ فَمَا أَحَلٌ فَهُوَ حَلَالٌ وَمَا حَرَّمَ فَهُوَ حَرَامٌ وَمَا سَكَتَ عَنْهُ فَهُوَ عَفْو وَتَلَا قُلْ لَا أَجِدُ فِيْمَا أُوحِيَ إِلَى مُحَرَّمًا على طاعم الآية - (আবু দাউদ)
ইসলাম-পূর্ব যুগে লোকেরা অনেক কিছু খেত, আর অনেক কিছু খারাপ মনে করে খেত না। পরে আল্লাহ্ তাঁর নবীকে পাঠালেন এবং তাঁর কিতাব নাযিল করলেন। তাতে তাঁর হালাল ও হারাম সংক্রান্ত ঘোষণা প্রকাশ করলেন। কাজেই তাতে যা হালাল, তা হালালই আর তাতে যা হারাম তা হারামই। আর যে বিষয়ে নীরবতা অবলম্বন করা হয়েছে, তা সবই নির্দোষ ও মাফ।
অতঃপর তিনি সূরা আল-আনয়াম-এর পূর্বোদ্ধৃত ১৪৫ নং আয়াতটি পাঠ করেন। এ আয়াতের আলোকেই হযরত ইবনে আব্বাস (রা) মনে করেন যে, গৃহপালিত গাধার গোস্ত খাওয়া হালাল। ইমাম মালিক (র)-ও এ মতই গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেছেন, হিংস্র ও ছিন্ন-ভিন্ন করে আহারকারী জন্তুগুলোর গোস্ত খাওয়া হারাম নয়, বড়জোর মাকরূহ।
তবে একথা চূড়ান্ত যে, হারাম জন্তুগুলো যবেহ করলেই তা হালাল হয়ে বাবে, এমন কোন কথা নেই। যবেহ করা হলে চামড়া ট্রেনিং না করেই পবিত্র বিবেচিত হতে পারে মাত্র।