📄 মাছ ও পঙ্গপাল সম্পর্কে স্বতন্ত্র বিধান
ইসলামে মাছ ও এ ধরনের জলজ জন্তু সম্পর্কে স্বতন্ত্র বিধান দেয়া হয়েছে। তাকে হারাম করা জন্তুগুলোর মধ্যে গণ্য করা হয়নি। নবী করীম (স) সমুদ্র-পানি সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে তিনি জবাবে ইরশাদ করলেন:
هُوَ الطُّهُورُ مَاءَهُ وَالحِلُّ مَيْتَتُهُ .
সমুদ্রের পানি পবিত্র এবং তার মুর্দার হালাল। (আহম্মদ)
কুরআন মজীদে বলা হয়েছে: (المائدة (۹۲) أحلُّ لَكُمْ صَيْدُ البَحْرِ وَطَعَامُهُ .
সমুদ্রের শিকার এবং তার খাদ্য তোমাদের জন্যে হালাল করা হয়েছে। হযরত উমর (রা) এ আয়াতাংশের তাফসীর প্রসঙ্গে বলেছেন: 'সমুদ্রের শিকার' বলতে সমুদ্রে যা কিছু শিকার করা হয় সে সব জীব বোঝান হয়েছে। আর সমুদ্রের খাদ্য বলতে বুঝিয়েছে তা যা সমুদ্র নিজেই ওপরে নিক্ষেপ করে।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা)-ও বলেছেনঃ সমুদ্রের খাদ্য বলতে সমুদ্রের 'মৃত জীব' বুঝান হয়েছে।
বুখারী ও মুসলিম গ্রন্থে হযরত জাবির (রা) থেকে বর্ণিত এই হাদীস খানি উদ্ধৃত হয়েছে:
أَنَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَعَثَ سَرِيَّةً مِنْ أَصْحَا بِهِ فَوَ جَدُوا حُوتًا كَبِيرًا قَدْ جَزَرَعَنْهُ الْبَحْرُ أَي مَيْتًا فَأَكَلُوا مِنْهُ بِضْعَةَ وَعِشْرِينَ يَوْمًا ثُمَّ قدموا إلى المَدِينَة فَأَخْبَرُوا الرَّسُولَ عَلَيْهِ السَّلَامُ فَقَالَ كُلُوا رِزْقًا أَخْرَجَهُ اللَّهُ لَكُمْ أَطْعِمُونَا إِنْ كَانَ مَعَكُمْ فَآتَاهُ بَعْضُهُمْ بِشَيْءٍ فَأَكَلَهُ -
নবী করীম (স) সাহাবীদের একটি বাহিনীকে কোন বিশেষ অভিযানে প্রেরণ করেন। তাদের হাতে একটি বড় মাছ পড়ে। সমুদ্র মাছটিকে ওপরে নিক্ষেপ করেছিল অর্থাৎ সেটি ছিল মৃত। তারা মাছটিকে বিশ দিনেরও বেশি সময় ধরে আহার করতে থাকেন। পরে তাঁরা যখন মদীনায় প্রত্যাবর্তন করলেন, তখন তাঁরা নবী করীম (স)-কে এ বিষয়ে অবহিত করলেন। তিনি তাঁদের বললেন: 'আল্লাহ্ তোমাদের জন্যে যে রিস্ক বের করেছেন, তোমরা তা খাও। সে মাছটির কোন অংশ তোমাদের কাছে অবশিষ্ট থাকলে তা আমাদেরও খাওয়াও।' তখন কেউ কেউ সে মাছের কিছু অংশ নবী করীম (স)-এর খেদমতে পেশ করেন। তিনি তা আহার করেন। (বুখারী)
পঙ্গপাল সম্পর্কেও শরীয়তের এই বিধানই কার্যকর। নবী করীম (স) মৃত পঙ্গপাল আহার করার অনুমতি দিয়েছেন। কেননা তা যবেহ করা যায় না। হযরত ইবনে আবু লাইলা বলেছেন:
غَزَوْنَا مَعَ رَسُولِ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَبْعَ غَزَوَاتٍ نَاكُلُ مَعَهُ الخَبَرادَ -
আমরা রাসূলে করীম (স)-এর সঙ্গে সাতটি যুদ্ধাভিযানে গিয়েছি। আর তখন তাঁর সঙ্গে আমরা পঙ্গপাল আহার করেছি।
📄 মৃত জন্তুর চামড়া, অস্থি ও পশম ব্যবহার
'মুর্দার হারাম' অর্থ তা খাওয়া হারাম। কিন্তু মৃত জন্তুর চামড়া, শিং, অস্থি ও পশম ব্যবহার করায় কোন দোষ নেই। শুধু তাই নয়, তা কাম্যও বটে। কেননা তা এমন সম্পদ যা ব্যবহার করা ও কাজে লাগান সম্ভব। অতএব বিনষ্ট করা জায়েয হতে পারে না।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেছেন:
تُصُدِّقَ عَلَى مَوْلاةٍ لِمَيْمُونَةَ أُمِّ الْمُؤْمِنِينَ بِشَاةٍ فَمَا تَتْ فَمَرْبِهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ هَلَا أَخَذْتُمْ اِهَا بَهَا جِلْدَ هَافَدَ بَعْتُمُوهُ فَانْتَفَعْتُمْ بِهِ فَقَالُوا إِنَّهَا مَيْتَةً فَقَالَ إِنَّمَا حُرِّمَ أَكْلُهَا -
উম্মুল মু'মিনীন হযরত মায়মুনার ক্রীতদাস দানস্বরূপ একটা ছাগল লাভ করে। পরে সেটি মরে যায়। নবী করীম (স) তা দেখতে পেয়ে বললেন : তোমরা এটির চামড়া তুলে নিচ্ছ না কেন, তা পরিচ্ছন্ন ও পরিপক্ক করে তোমরা কাজে লাগাবে। লোকেরা বলল, ওটা তো মরে গেছে। রাসূল (স) বললেন : মুর্দার খাওয়াটাই শুধু হারাম।
নবী করীম (স) মৃত জন্তুর চামড়া পবিত্র পরিচ্ছন্ন করার নিয়ম জানিয়ে দিয়েছেন। বলেছেন : دِبَاغُ الْأَدِيمِ ذِكَاتُهَ - চামড়া দাবাগাত করে পবিত্র-পরিচ্ছন্ন করা জন্তুটিকে যবেহ করার শামিল। (আবূ দাউদ, নিসয়ী) دِبَاغُهُ يَذْهَبُ بِخُبْثِهِ - অপর একটি বর্ণনায় উদ্ধৃত হয়েছে : 'দাবাগাত' চামড়ার ময়লা অপবিত্রতাকে দূর করে দেয়। (হাকেম) 'মুসলিম' প্রভৃতি গ্রন্থে নবী করীম (স)-এর এ উক্তিটি উদ্ধৃত হয়েছে : أَيُّمَا اهَابٍ دُبِغَ فَقَدْ طَهَرَ - যে চামড়াই 'দাবাগাত' (Tanning) করা হবে সেটিই পবিত্র হয়ে যাবে।
এ এক সাধারণ বিধান। সকল প্রকার জন্তুর চামড়া সম্পর্কেই এ বিধান প্রযোজ্য। কুকুর ও শূকরের চামড়ার ব্যাপারও ভিন্নতর কিছু নয়। ফিকাহবিদদের এই মত।
উম্মুল মুমিনীন হযরত সওদা (রা) বলেছেনঃ আমাদের একটি ছাগল মরে গেল। তখন আমরা তার চামড়া দাবাগাত করে নিই। পরে আমরা সব সময় তাতে 'নবীয' (খেজুরের শরবত) তৈরী করতে থাকি। এভাবে সেটি আমাদের একটি পুরাতন মশক পাত্রে পরিণত হয়ে গেল। (বুখারী)
📄 ঠেকাস অবস্থায় স্বতন্ত্র হুকুম
এখানে যে হারামের বিধান ব্যাখ্যা করা হচ্ছে, আসলে তা সুস্থ ও শান্তিপূর্ণ অবস্থায় স্বাধীন ইচ্ছায় গ্রহণীয় নীতি। কিন্তু ঠেকার অবস্থা তা থেকে স্বতন্ত্র। পূর্বে এ পর্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। আল্লাহ্ বলেছেন:
وَقَدْ فَصَّلَ لَكُمْ مَّا حَرَّمَ عَلَيْكُمْ إِلَّا مَا اضْطُرِرْتُمْ إِلَيْهِ .
আল্লাহ্ তা'আলা ভিন্ন ভিন্ন করে তোমাদের বলে দিয়েছেন, যা কিছু তোমাদের জন্যে হারাম করেছেন। তবে ব্যতিক্রম রয়েছে যদি তোমরা ঠেকায় পড়ে গিয়ে তার কোনটি গ্রহণ করতে বাধ্য হও। (সূরা আন'আম: ১১৯)
'ঠেকায় পরে গ্রহণ করতে বাধ্য হওয়া' একটা সর্ববাদীসম্মত ও সমর্থিত ব্যাপার। খাদ্যের পর্যায়ে এই 'ঠেকায় পড়াটা'কে অনেক সময় লক্ষ্য করা যায়। যেমন কেউ ক্ষুধায় খুব বেশি কাতর হয়ে পড়ল। (কোন কোন ফিকাহবিদের মতে) এই ক্ষুধার্তাবস্তায় তার একটি দিন ও একটি রাত অতিবাহিত হয়ে গেল। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে সে এমন কিছু পেল না, যা খেয়ে সে তার ক্ষুধা নিবৃত্ত করতে পারে। এ সময় তার সম্মুখে সহজলভ্য হয়ে আছে শুধু হারাম খাদ্য। তখন সে নূন্যতম পরিমাণ গ্রহণ করে প্রয়োজন পূরণ করতে পারে ও নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে নিষ্কৃতি লাভ করতে সক্ষম হতে পারে। শরীয়তে তার জন্যে এ অনুমতি রয়েছে। ইমাম মালিক (র) বলেছেন:
حَدٌ ذَلِكَ السَّبْعُ وَالتَّزَوُّدُ مِنْهَا حَتَّى يَجِدَ غَيْرَهَا
ঠেকায় পড়ে হারাম খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ হচ্ছে পেট পূর্ণ হওয়া (Satisfaction) এবং হালাল খাদ্য পাওয়ার সময় পর্যন্ত তা থেকে পাথেয় গ্রহণ।
কিন্তু অন্যান্যরা বলেছেন:
لَا يَا كُلُّ مِنْهَا إِلَّا مَا يُمْسِكُ الرَّمَقَ -
এ ঠেকায় পড়া লোকটি শুধু এতটা পরিমাণ হারাম খাদ্য গ্রহণ করতে পারে, যতটা শেষ শ্বাস-প্রশ্বাসটা চলমান রাখার জন্যে যথেষ্ট হতে পারে।
সম্ভবত: এ মতটিই কুরআনের ঘোষণার غير باغ ولاعاد 'অধিক ইচ্ছুক-আগ্রহী ও সীমালংঘনকারী না হয়ে'- সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ক্ষুধার ব্যাপারটিকে সুস্পষ্ট করে দেয়ার জন্যে কুরআনে সুস্পষ্ট করে বলা হয়েছে:
فَمَنِ اضْطُرَّ فِي مَخْمَصَةٍ غَيْرَ مُتَجَا نِفَ لِإِثْمِ فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ -
যে লোক ক্ষুধার তাড়নায় বাধ্য হয় কোন হারাম জিনিস খায়, গুনাহর প্রতি কোনরূপ প্রবণতা ও আগ্রহ ব্যতীতই, তাহলে আল্লাহ্ নিশ্চয়ই ক্ষমাশীল ও দয়াবান।
📄 চিকিৎসার প্রয়োজনে
চিকিৎসা পর্যায়ে ঠেকে যাওয়ার রূপটি হচ্ছে, কোন হারাম জিনিস ঔষধ হিসেবে গ্রহণ করার ওপরই যদি কারো রোগমুক্তি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে এ সম্পর্কে শরীয়তের হুকুম কি হবে তাই প্রশ্ন। ফিকাহবিদগণ এ বিষয়ে বিভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। কোন কোন ফিকাহবিদ চিকিৎসার ব্যাপারটিকে খাদ্যের মতো অতটা তীব্র কঠিন অনিবার্য প্রয়োজনীয় বলে মনে করেন না। এ মতের সমর্থনে তাঁরা রাসূলে করীম (স)-এর একটি বাণীরও উল্লেখ করেছেন। হাদীসটি হচ্ছে:
إِنَّ اللَّهَ لَمْ يَجْعَلْ شِفَاءَكُمْ فِيْمَا حُرِّمَ عَلَيْكُمْ -
তোমাদের প্রতি যা যা হারাম করা হয়েছে, তাতে আল্লাহ্ তোমাদের রোগমুক্তির ব্যবস্থা রাখেন নি। (বুখারী)
অনেক ফিকাহবিদ আবার চিকিৎসার প্রয়োজনটিকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করেছেন এবং ওষুধ বা চিকিৎসার ব্যাপারটিকেও খাদ্যের সমান প্রয়োজনীয় বলে মনে করেছেন। কেননা মূলত জীবনের জন্যে যেমন খাদ্য প্রয়োজনীয়, তেমনি ঔষধের প্রয়োজনও কোন ক্রমেই অস্বীকার করা যায় না। তাই এ নিষিদ্ধ দ্রব্যাদি প্রয়োজনে ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করা তাঁদের মতে নিশ্চয়ই মুবাহ হওয়া বাঞ্ছনীয়। দলিল হিসেবে তাঁরা আরও বলেছেন, হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ ও জুবাইর ইবনুর আওয়াম (রা) চর্ম রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। নবী করীম (স) তাঁদের জন্যে রেশমী পোশাক ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছিলেন—যদিও তা সাধারণভাবে নিষিদ্ধই ছিল এবং তা পরার ওপর নবী করীম (স) অভিশাপ বর্ষণ করেছেন।
সম্ভবত: এ মতটিই ইসলামের মৌল ভাবধারার সাথে সামঞ্জস্যশীল। কেননা মানুষের জীবন রক্ষার জন্যে যে-কোন কার্যকর পন্থা গ্রহণ প্রতিটি শরীয়তী ব্যবস্থারই মূল লক্ষ্য।
কিন্তু হারাম দ্রব্য সম্বলিত ঔষধ চিকিৎসার্থে ব্যবহার করার অনুমতি কতিপয় শর্তের ওপর ভিত্তিশীল। শর্তগুলো হচ্ছে:
১. সে ঔষধটি ব্যবহার করা না হলে স্বাস্থ্যের ওপর প্রকৃতই কোন বিপদ ঘনিয়ে আসতে পারে বলে নিশ্চিতভাবে বিবেচিত হতে হবে।
২. সে ঔষধটি ছাড়া তার স্থলাভিষিক্ত বা বিকল্প হতে পারে হালাল দ্রব্য সম্বলিত এমন কোন ঔষধ পাওয়াই যায় না- এমন অবস্থা হতে হবে।
৩. এ বিষয়ে আল্লাহ্ বিশ্বাসী মুসলিম চিকিৎসকের কাছ থেকে সুস্পষ্ট অনুমোদন পেতে হবে।
আমাদের নিজস্ব জ্ঞান তথ্য ও বিশ্বাসযোগ্য চিকিৎসাবিদদের থেকে প্রাপ্ত বর্ণনাসমূহের ভিত্তিতে একটি কথা আমরা অতিরিক্ত বলতে চাই। তা হচ্ছে, কোন হারাম দ্রব্য সম্বলিত ঔষধ ব্যবহার করা জীবন রক্ষার জন্যে একেবারে অপরিহার্য হয়ে দাঁড়াবে, এমন অবস্থা আসলেই নয়। তবু নীতিগতভাবে ও সতর্কতার ভিত্তিতে আমরা এ ধরনের ঔষধ ব্যবহারের অনিবার্যতাকে অস্বীকার করছি না। কেননা কোন মুসলিমের এমন স্থান বা অবস্থায় পড়ে যাওয়া- যেখানে এসব হারাম ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায় না- একেবারে অসম্ভব মনে করা ঠিক নহে।