📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 দেবতার উদ্দেশ্যে বলি দেয়া জন্তু

📄 দেবতার উদ্দেশ্যে বলি দেয়া জন্তু


হারাম জন্তুগুলোর মধ্যে দশম হচ্ছে সেই জন্তু, যা কোন দেবতার উদ্দেশ্যে বলিদানের জন্যে নির্দিষ্ট স্থানে হত্যা করা হবে। যার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হবে আল্লাহ্ ছাড়া অপর কোন শক্তি, ব্যক্তি বা দেবতার পূজা করা। জাহিলিয়াত যুগে কাবা ঘরের চতুর্দিকে এ রকমের অনেক 'স্থান' নির্মিত হয়েছিল। আর তখনকার লোকেরা তাদের উপাস্য দেবতাদের পূজা করা ও সে সবের নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে সেসব স্থানে পশু যবাই করত। এক কথায় এটাও অ-আল্লাহর উদ্দেশ্যে বলিদান মাত্র। উভয় ক্ষেত্রেই অ-আল্লাহ্ শক্তির প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধা জানানো ও তা বড় করে তোলা- তার বড়ত্ব দেখানই চরম লক্ষ্য। পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, 'অ-আল্লাহ্ নামে যবেহ করা জন্তু' কথাটি সে জন্তুর জন্যেও ব্যবহৃত হতে পারে, যেটিকে যবেহ করার সময় কোন 'বুত' সম্মুখে নেই। বরং কোন বুতের নামে যবেহ করা হলেই হলো। কিন্তু স্থান- এ যবেহ করা জন্তু আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারো নামে যবেহ না করা হলেও তা হারাম হবে। অন্য কথায় প্রথমাবস্থায় 'স্থান' নির্দিষ্ট থাকে না। আর দ্বিতীয় অবস্থায় স্থান সুনির্দিষ্ট থাকে।
কাবাঘরের চতুর্দিকে যেসব 'স্থান' নির্মিত হয়েছিল, লোকদের ধারণা ছিল, এসব স্থানে জন্তু যবেহ করা হলে তাতে আল্লাহ্ ঘরের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হবে। কুরআন এই ভুল ধারণার অপনোদন করেছে এবং এই কাজটিকে সুস্পষ্টভাবে হারাম ঘোষণা করেছে। নতুবা অ-আল্লাহ্ জন্যে যবেহ করা জন্তু বলতে 'স্থান'-এ যবেহ করা জন্তুটিও শামিল রয়েছে।

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 মাছ ও পঙ্গপাল সম্পর্কে স্বতন্ত্র বিধান

📄 মাছ ও পঙ্গপাল সম্পর্কে স্বতন্ত্র বিধান


ইসলামে মাছ ও এ ধরনের জলজ জন্তু সম্পর্কে স্বতন্ত্র বিধান দেয়া হয়েছে। তাকে হারাম করা জন্তুগুলোর মধ্যে গণ্য করা হয়নি। নবী করীম (স) সমুদ্র-পানি সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে তিনি জবাবে ইরশাদ করলেন:
هُوَ الطُّهُورُ مَاءَهُ وَالحِلُّ مَيْتَتُهُ .
সমুদ্রের পানি পবিত্র এবং তার মুর্দার হালাল। (আহম্মদ)
কুরআন মজীদে বলা হয়েছে: (المائدة (۹۲) أحلُّ لَكُمْ صَيْدُ البَحْرِ وَطَعَامُهُ .
সমুদ্রের শিকার এবং তার খাদ্য তোমাদের জন্যে হালাল করা হয়েছে। হযরত উমর (রা) এ আয়াতাংশের তাফসীর প্রসঙ্গে বলেছেন: 'সমুদ্রের শিকার' বলতে সমুদ্রে যা কিছু শিকার করা হয় সে সব জীব বোঝান হয়েছে। আর সমুদ্রের খাদ্য বলতে বুঝিয়েছে তা যা সমুদ্র নিজেই ওপরে নিক্ষেপ করে।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা)-ও বলেছেনঃ সমুদ্রের খাদ্য বলতে সমুদ্রের 'মৃত জীব' বুঝান হয়েছে।
বুখারী ও মুসলিম গ্রন্থে হযরত জাবির (রা) থেকে বর্ণিত এই হাদীস খানি উদ্ধৃত হয়েছে:
أَنَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَعَثَ سَرِيَّةً مِنْ أَصْحَا بِهِ فَوَ جَدُوا حُوتًا كَبِيرًا قَدْ جَزَرَعَنْهُ الْبَحْرُ أَي مَيْتًا فَأَكَلُوا مِنْهُ بِضْعَةَ وَعِشْرِينَ يَوْمًا ثُمَّ قدموا إلى المَدِينَة فَأَخْبَرُوا الرَّسُولَ عَلَيْهِ السَّلَامُ فَقَالَ كُلُوا رِزْقًا أَخْرَجَهُ اللَّهُ لَكُمْ أَطْعِمُونَا إِنْ كَانَ مَعَكُمْ فَآتَاهُ بَعْضُهُمْ بِشَيْءٍ فَأَكَلَهُ -
নবী করীম (স) সাহাবীদের একটি বাহিনীকে কোন বিশেষ অভিযানে প্রেরণ করেন। তাদের হাতে একটি বড় মাছ পড়ে। সমুদ্র মাছটিকে ওপরে নিক্ষেপ করেছিল অর্থাৎ সেটি ছিল মৃত। তারা মাছটিকে বিশ দিনেরও বেশি সময় ধরে আহার করতে থাকেন। পরে তাঁরা যখন মদীনায় প্রত্যাবর্তন করলেন, তখন তাঁরা নবী করীম (স)-কে এ বিষয়ে অবহিত করলেন। তিনি তাঁদের বললেন: 'আল্লাহ্ তোমাদের জন্যে যে রিস্ক বের করেছেন, তোমরা তা খাও। সে মাছটির কোন অংশ তোমাদের কাছে অবশিষ্ট থাকলে তা আমাদেরও খাওয়াও।' তখন কেউ কেউ সে মাছের কিছু অংশ নবী করীম (স)-এর খেদমতে পেশ করেন। তিনি তা আহার করেন। (বুখারী)
পঙ্গপাল সম্পর্কেও শরীয়তের এই বিধানই কার্যকর। নবী করীম (স) মৃত পঙ্গপাল আহার করার অনুমতি দিয়েছেন। কেননা তা যবেহ করা যায় না। হযরত ইবনে আবু লাইলা বলেছেন:
غَزَوْنَا مَعَ رَسُولِ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَبْعَ غَزَوَاتٍ نَاكُلُ مَعَهُ الخَبَرادَ -
আমরা রাসূলে করীম (স)-এর সঙ্গে সাতটি যুদ্ধাভিযানে গিয়েছি। আর তখন তাঁর সঙ্গে আমরা পঙ্গপাল আহার করেছি।

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 মৃত জন্তুর চামড়া, অস্থি ও পশম ব্যবহার

📄 মৃত জন্তুর চামড়া, অস্থি ও পশম ব্যবহার


'মুর্দার হারাম' অর্থ তা খাওয়া হারাম। কিন্তু মৃত জন্তুর চামড়া, শিং, অস্থি ও পশম ব্যবহার করায় কোন দোষ নেই। শুধু তাই নয়, তা কাম্যও বটে। কেননা তা এমন সম্পদ যা ব্যবহার করা ও কাজে লাগান সম্ভব। অতএব বিনষ্ট করা জায়েয হতে পারে না।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেছেন:
تُصُدِّقَ عَلَى مَوْلاةٍ لِمَيْمُونَةَ أُمِّ الْمُؤْمِنِينَ بِشَاةٍ فَمَا تَتْ فَمَرْبِهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ هَلَا أَخَذْتُمْ اِهَا بَهَا جِلْدَ هَافَدَ بَعْتُمُوهُ فَانْتَفَعْتُمْ بِهِ فَقَالُوا إِنَّهَا مَيْتَةً فَقَالَ إِنَّمَا حُرِّمَ أَكْلُهَا -
উম্মুল মু'মিনীন হযরত মায়মুনার ক্রীতদাস দানস্বরূপ একটা ছাগল লাভ করে। পরে সেটি মরে যায়। নবী করীম (স) তা দেখতে পেয়ে বললেন : তোমরা এটির চামড়া তুলে নিচ্ছ না কেন, তা পরিচ্ছন্ন ও পরিপক্ক করে তোমরা কাজে লাগাবে। লোকেরা বলল, ওটা তো মরে গেছে। রাসূল (স) বললেন : মুর্দার খাওয়াটাই শুধু হারাম।
নবী করীম (স) মৃত জন্তুর চামড়া পবিত্র পরিচ্ছন্ন করার নিয়ম জানিয়ে দিয়েছেন। বলেছেন : دِبَاغُ الْأَدِيمِ ذِكَاتُهَ - চামড়া দাবাগাত করে পবিত্র-পরিচ্ছন্ন করা জন্তুটিকে যবেহ করার শামিল। (আবূ দাউদ, নিসয়ী) دِبَاغُهُ يَذْهَبُ بِخُبْثِهِ - অপর একটি বর্ণনায় উদ্ধৃত হয়েছে : 'দাবাগাত' চামড়ার ময়লা অপবিত্রতাকে দূর করে দেয়। (হাকেম) 'মুসলিম' প্রভৃতি গ্রন্থে নবী করীম (স)-এর এ উক্তিটি উদ্ধৃত হয়েছে : أَيُّمَا اهَابٍ دُبِغَ فَقَدْ طَهَرَ - যে চামড়াই 'দাবাগাত' (Tanning) করা হবে সেটিই পবিত্র হয়ে যাবে।
এ এক সাধারণ বিধান। সকল প্রকার জন্তুর চামড়া সম্পর্কেই এ বিধান প্রযোজ্য। কুকুর ও শূকরের চামড়ার ব্যাপারও ভিন্নতর কিছু নয়। ফিকাহবিদদের এই মত।
উম্মুল মুমিনীন হযরত সওদা (রা) বলেছেনঃ আমাদের একটি ছাগল মরে গেল। তখন আমরা তার চামড়া দাবাগাত করে নিই। পরে আমরা সব সময় তাতে 'নবীয' (খেজুরের শরবত) তৈরী করতে থাকি। এভাবে সেটি আমাদের একটি পুরাতন মশক পাত্রে পরিণত হয়ে গেল। (বুখারী)

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 ঠেকাস অবস্থায় স্বতন্ত্র হুকুম

📄 ঠেকাস অবস্থায় স্বতন্ত্র হুকুম


এখানে যে হারামের বিধান ব্যাখ্যা করা হচ্ছে, আসলে তা সুস্থ ও শান্তিপূর্ণ অবস্থায় স্বাধীন ইচ্ছায় গ্রহণীয় নীতি। কিন্তু ঠেকার অবস্থা তা থেকে স্বতন্ত্র। পূর্বে এ পর্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। আল্লাহ্ বলেছেন:
وَقَدْ فَصَّلَ لَكُمْ مَّا حَرَّمَ عَلَيْكُمْ إِلَّا مَا اضْطُرِرْتُمْ إِلَيْهِ .
আল্লাহ্ তা'আলা ভিন্ন ভিন্ন করে তোমাদের বলে দিয়েছেন, যা কিছু তোমাদের জন্যে হারাম করেছেন। তবে ব্যতিক্রম রয়েছে যদি তোমরা ঠেকায় পড়ে গিয়ে তার কোনটি গ্রহণ করতে বাধ্য হও। (সূরা আন'আম: ১১৯)
'ঠেকায় পরে গ্রহণ করতে বাধ্য হওয়া' একটা সর্ববাদীসম্মত ও সমর্থিত ব্যাপার। খাদ্যের পর্যায়ে এই 'ঠেকায় পড়াটা'কে অনেক সময় লক্ষ্য করা যায়। যেমন কেউ ক্ষুধায় খুব বেশি কাতর হয়ে পড়ল। (কোন কোন ফিকাহবিদের মতে) এই ক্ষুধার্তাবস্তায় তার একটি দিন ও একটি রাত অতিবাহিত হয়ে গেল। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে সে এমন কিছু পেল না, যা খেয়ে সে তার ক্ষুধা নিবৃত্ত করতে পারে। এ সময় তার সম্মুখে সহজলভ্য হয়ে আছে শুধু হারাম খাদ্য। তখন সে নূন্যতম পরিমাণ গ্রহণ করে প্রয়োজন পূরণ করতে পারে ও নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে নিষ্কৃতি লাভ করতে সক্ষম হতে পারে। শরীয়তে তার জন্যে এ অনুমতি রয়েছে। ইমাম মালিক (র) বলেছেন:
حَدٌ ذَلِكَ السَّبْعُ وَالتَّزَوُّدُ مِنْهَا حَتَّى يَجِدَ غَيْرَهَا
ঠেকায় পড়ে হারাম খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ হচ্ছে পেট পূর্ণ হওয়া (Satisfaction) এবং হালাল খাদ্য পাওয়ার সময় পর্যন্ত তা থেকে পাথেয় গ্রহণ।
কিন্তু অন্যান্যরা বলেছেন:
لَا يَا كُلُّ مِنْهَا إِلَّا مَا يُمْسِكُ الرَّمَقَ -
এ ঠেকায় পড়া লোকটি শুধু এতটা পরিমাণ হারাম খাদ্য গ্রহণ করতে পারে, যতটা শেষ শ্বাস-প্রশ্বাসটা চলমান রাখার জন্যে যথেষ্ট হতে পারে।
সম্ভবত: এ মতটিই কুরআনের ঘোষণার غير باغ ولاعاد 'অধিক ইচ্ছুক-আগ্রহী ও সীমালংঘনকারী না হয়ে'- সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ক্ষুধার ব্যাপারটিকে সুস্পষ্ট করে দেয়ার জন্যে কুরআনে সুস্পষ্ট করে বলা হয়েছে:
فَمَنِ اضْطُرَّ فِي مَخْمَصَةٍ غَيْرَ مُتَجَا نِفَ لِإِثْمِ فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ -
যে লোক ক্ষুধার তাড়নায় বাধ্য হয় কোন হারাম জিনিস খায়, গুনাহর প্রতি কোনরূপ প্রবণতা ও আগ্রহ ব্যতীতই, তাহলে আল্লাহ্ নিশ্চয়ই ক্ষমাশীল ও দয়াবান।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00