📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 এসব মুর্দার হারাম করার কারণ

📄 এসব মুর্দার হারাম করার কারণ


এসব মুর্দার হারাম হওয়ার মূলে সেসব কারণ ও উদ্দেশ্যই নিহিত রয়েছে যা ইতিপূর্বে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষভাবে বলা চলে, মানুষ জন্তু-জানোয়ারের প্রতি দয়াশীল এবং ওসবের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সম্পর্কে পূর্ণ অনুকম্পা সম্পন্ন হয়ে উঠুক- শরীয়তের এটাই লক্ষ্য। মানুষ যেন জন্তুগুলোকে অসহায় করে ছেড়ে না দেয়। এ রকম যে, কোনটি গলায় ফাঁস লাগিয়ে মরল, আর কোনটি উচুস্থান থেকে পড়ে গিয়ে মরল, আর কোনটি অন্য জন্তুর সাথে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়ে শিং-এর গুঁতা খেয়ে মরে গেল, জন্তুর মালিক সে ব্যাপারে নিজের কোন দায়িত্বই অনুভব করে না, তা আল্লাহ্র আদৌ পছন্দ নয়। মানুষ তার মালিকানাধীন জন্তুগুলোকে রোগাক্রান্ত বা দুর্বল হয়ে ধ্বংস হয়ে যাবার জন্যে ফেলে না রাখে। বরং হয় চিকিৎসা করাবে অবিলম্বে কিংবা যবেহ করে চিরশান্তি দান করবে।
হিংস্র জন্তুর ছিন্নভিন্ন করে দেয়া পশু খাওয়াও হারাম। তাতে মানুষের মর্যাদা রক্ষাই আসল লক্ষ্য। কেননা, পশুর উচ্ছিষ্ট খাওয়া মানুষের জন্যে শোভন হতে পারে না। তা থেকে মানুষকে দূরে রাখতে চাওয়া হয়েছে। জাহিলিয়াত যুগে এসব জন্তুকে লোকেরা নিঃসংকোচে খেত। কিন্তু আল্লাহ্ তা'আলা হিংস্র জন্তুর উচ্ছিষ্ট খাওয়া মুমিনদের জন্যে হারাম করে দিয়েছেন।

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 দেবতার উদ্দেশ্যে বলি দেয়া জন্তু

📄 দেবতার উদ্দেশ্যে বলি দেয়া জন্তু


হারাম জন্তুগুলোর মধ্যে দশম হচ্ছে সেই জন্তু, যা কোন দেবতার উদ্দেশ্যে বলিদানের জন্যে নির্দিষ্ট স্থানে হত্যা করা হবে। যার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হবে আল্লাহ্ ছাড়া অপর কোন শক্তি, ব্যক্তি বা দেবতার পূজা করা। জাহিলিয়াত যুগে কাবা ঘরের চতুর্দিকে এ রকমের অনেক 'স্থান' নির্মিত হয়েছিল। আর তখনকার লোকেরা তাদের উপাস্য দেবতাদের পূজা করা ও সে সবের নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে সেসব স্থানে পশু যবাই করত। এক কথায় এটাও অ-আল্লাহর উদ্দেশ্যে বলিদান মাত্র। উভয় ক্ষেত্রেই অ-আল্লাহ্ শক্তির প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধা জানানো ও তা বড় করে তোলা- তার বড়ত্ব দেখানই চরম লক্ষ্য। পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, 'অ-আল্লাহ্ নামে যবেহ করা জন্তু' কথাটি সে জন্তুর জন্যেও ব্যবহৃত হতে পারে, যেটিকে যবেহ করার সময় কোন 'বুত' সম্মুখে নেই। বরং কোন বুতের নামে যবেহ করা হলেই হলো। কিন্তু স্থান- এ যবেহ করা জন্তু আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারো নামে যবেহ না করা হলেও তা হারাম হবে। অন্য কথায় প্রথমাবস্থায় 'স্থান' নির্দিষ্ট থাকে না। আর দ্বিতীয় অবস্থায় স্থান সুনির্দিষ্ট থাকে।
কাবাঘরের চতুর্দিকে যেসব 'স্থান' নির্মিত হয়েছিল, লোকদের ধারণা ছিল, এসব স্থানে জন্তু যবেহ করা হলে তাতে আল্লাহ্ ঘরের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হবে। কুরআন এই ভুল ধারণার অপনোদন করেছে এবং এই কাজটিকে সুস্পষ্টভাবে হারাম ঘোষণা করেছে। নতুবা অ-আল্লাহ্ জন্যে যবেহ করা জন্তু বলতে 'স্থান'-এ যবেহ করা জন্তুটিও শামিল রয়েছে।

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 মাছ ও পঙ্গপাল সম্পর্কে স্বতন্ত্র বিধান

📄 মাছ ও পঙ্গপাল সম্পর্কে স্বতন্ত্র বিধান


ইসলামে মাছ ও এ ধরনের জলজ জন্তু সম্পর্কে স্বতন্ত্র বিধান দেয়া হয়েছে। তাকে হারাম করা জন্তুগুলোর মধ্যে গণ্য করা হয়নি। নবী করীম (স) সমুদ্র-পানি সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে তিনি জবাবে ইরশাদ করলেন:
هُوَ الطُّهُورُ مَاءَهُ وَالحِلُّ مَيْتَتُهُ .
সমুদ্রের পানি পবিত্র এবং তার মুর্দার হালাল। (আহম্মদ)
কুরআন মজীদে বলা হয়েছে: (المائدة (۹۲) أحلُّ لَكُمْ صَيْدُ البَحْرِ وَطَعَامُهُ .
সমুদ্রের শিকার এবং তার খাদ্য তোমাদের জন্যে হালাল করা হয়েছে। হযরত উমর (রা) এ আয়াতাংশের তাফসীর প্রসঙ্গে বলেছেন: 'সমুদ্রের শিকার' বলতে সমুদ্রে যা কিছু শিকার করা হয় সে সব জীব বোঝান হয়েছে। আর সমুদ্রের খাদ্য বলতে বুঝিয়েছে তা যা সমুদ্র নিজেই ওপরে নিক্ষেপ করে।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা)-ও বলেছেনঃ সমুদ্রের খাদ্য বলতে সমুদ্রের 'মৃত জীব' বুঝান হয়েছে।
বুখারী ও মুসলিম গ্রন্থে হযরত জাবির (রা) থেকে বর্ণিত এই হাদীস খানি উদ্ধৃত হয়েছে:
أَنَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَعَثَ سَرِيَّةً مِنْ أَصْحَا بِهِ فَوَ جَدُوا حُوتًا كَبِيرًا قَدْ جَزَرَعَنْهُ الْبَحْرُ أَي مَيْتًا فَأَكَلُوا مِنْهُ بِضْعَةَ وَعِشْرِينَ يَوْمًا ثُمَّ قدموا إلى المَدِينَة فَأَخْبَرُوا الرَّسُولَ عَلَيْهِ السَّلَامُ فَقَالَ كُلُوا رِزْقًا أَخْرَجَهُ اللَّهُ لَكُمْ أَطْعِمُونَا إِنْ كَانَ مَعَكُمْ فَآتَاهُ بَعْضُهُمْ بِشَيْءٍ فَأَكَلَهُ -
নবী করীম (স) সাহাবীদের একটি বাহিনীকে কোন বিশেষ অভিযানে প্রেরণ করেন। তাদের হাতে একটি বড় মাছ পড়ে। সমুদ্র মাছটিকে ওপরে নিক্ষেপ করেছিল অর্থাৎ সেটি ছিল মৃত। তারা মাছটিকে বিশ দিনেরও বেশি সময় ধরে আহার করতে থাকেন। পরে তাঁরা যখন মদীনায় প্রত্যাবর্তন করলেন, তখন তাঁরা নবী করীম (স)-কে এ বিষয়ে অবহিত করলেন। তিনি তাঁদের বললেন: 'আল্লাহ্ তোমাদের জন্যে যে রিস্ক বের করেছেন, তোমরা তা খাও। সে মাছটির কোন অংশ তোমাদের কাছে অবশিষ্ট থাকলে তা আমাদেরও খাওয়াও।' তখন কেউ কেউ সে মাছের কিছু অংশ নবী করীম (স)-এর খেদমতে পেশ করেন। তিনি তা আহার করেন। (বুখারী)
পঙ্গপাল সম্পর্কেও শরীয়তের এই বিধানই কার্যকর। নবী করীম (স) মৃত পঙ্গপাল আহার করার অনুমতি দিয়েছেন। কেননা তা যবেহ করা যায় না। হযরত ইবনে আবু লাইলা বলেছেন:
غَزَوْنَا مَعَ رَسُولِ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَبْعَ غَزَوَاتٍ نَاكُلُ مَعَهُ الخَبَرادَ -
আমরা রাসূলে করীম (স)-এর সঙ্গে সাতটি যুদ্ধাভিযানে গিয়েছি। আর তখন তাঁর সঙ্গে আমরা পঙ্গপাল আহার করেছি।

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 মৃত জন্তুর চামড়া, অস্থি ও পশম ব্যবহার

📄 মৃত জন্তুর চামড়া, অস্থি ও পশম ব্যবহার


'মুর্দার হারাম' অর্থ তা খাওয়া হারাম। কিন্তু মৃত জন্তুর চামড়া, শিং, অস্থি ও পশম ব্যবহার করায় কোন দোষ নেই। শুধু তাই নয়, তা কাম্যও বটে। কেননা তা এমন সম্পদ যা ব্যবহার করা ও কাজে লাগান সম্ভব। অতএব বিনষ্ট করা জায়েয হতে পারে না।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেছেন:
تُصُدِّقَ عَلَى مَوْلاةٍ لِمَيْمُونَةَ أُمِّ الْمُؤْمِنِينَ بِشَاةٍ فَمَا تَتْ فَمَرْبِهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ هَلَا أَخَذْتُمْ اِهَا بَهَا جِلْدَ هَافَدَ بَعْتُمُوهُ فَانْتَفَعْتُمْ بِهِ فَقَالُوا إِنَّهَا مَيْتَةً فَقَالَ إِنَّمَا حُرِّمَ أَكْلُهَا -
উম্মুল মু'মিনীন হযরত মায়মুনার ক্রীতদাস দানস্বরূপ একটা ছাগল লাভ করে। পরে সেটি মরে যায়। নবী করীম (স) তা দেখতে পেয়ে বললেন : তোমরা এটির চামড়া তুলে নিচ্ছ না কেন, তা পরিচ্ছন্ন ও পরিপক্ক করে তোমরা কাজে লাগাবে। লোকেরা বলল, ওটা তো মরে গেছে। রাসূল (স) বললেন : মুর্দার খাওয়াটাই শুধু হারাম।
নবী করীম (স) মৃত জন্তুর চামড়া পবিত্র পরিচ্ছন্ন করার নিয়ম জানিয়ে দিয়েছেন। বলেছেন : دِبَاغُ الْأَدِيمِ ذِكَاتُهَ - চামড়া দাবাগাত করে পবিত্র-পরিচ্ছন্ন করা জন্তুটিকে যবেহ করার শামিল। (আবূ দাউদ, নিসয়ী) دِبَاغُهُ يَذْهَبُ بِخُبْثِهِ - অপর একটি বর্ণনায় উদ্ধৃত হয়েছে : 'দাবাগাত' চামড়ার ময়লা অপবিত্রতাকে দূর করে দেয়। (হাকেম) 'মুসলিম' প্রভৃতি গ্রন্থে নবী করীম (স)-এর এ উক্তিটি উদ্ধৃত হয়েছে : أَيُّمَا اهَابٍ دُبِغَ فَقَدْ طَهَرَ - যে চামড়াই 'দাবাগাত' (Tanning) করা হবে সেটিই পবিত্র হয়ে যাবে।
এ এক সাধারণ বিধান। সকল প্রকার জন্তুর চামড়া সম্পর্কেই এ বিধান প্রযোজ্য। কুকুর ও শূকরের চামড়ার ব্যাপারও ভিন্নতর কিছু নয়। ফিকাহবিদদের এই মত।
উম্মুল মুমিনীন হযরত সওদা (রা) বলেছেনঃ আমাদের একটি ছাগল মরে গেল। তখন আমরা তার চামড়া দাবাগাত করে নিই। পরে আমরা সব সময় তাতে 'নবীয' (খেজুরের শরবত) তৈরী করতে থাকি। এভাবে সেটি আমাদের একটি পুরাতন মশক পাত্রে পরিণত হয়ে গেল। (বুখারী)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00