📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 গ্রন্থকারের ভূমিকা

📄 গ্রন্থকারের ভূমিকা


ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে গ্রন্থ প্রণয়নের উদ্দেশ্যে মিসরের জামে আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত ইসলামী সংস্কৃতি কেন্দ্রে একটি পরিকল্পনা গৃহীত হয়। বিশেষ করে ইউরোপ ও আমেরিকায় বসবাসকারী মুসলিম ও অমুসলিমদের সম্মুখে ইসলামের আদর্শ ও শিক্ষার ব্যাপক ও পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা উপস্থাপিত করাই এ পরিকল্পনার লক্ষ্য। এজন্যে রচিত গ্রন্থাদি ইংরেজী ভাষায় অনুবাদ করাও এ পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত। এ মহতী পরিকল্পনায় কার্যত অংশ গ্রহণের জন্যে জামে আযহার কর্তৃপক্ষই আমাকে আহ্বান জানিয়েছিলেন।
সন্দেহ নেই, গ্রন্থ প্রণয়ন সংক্রান্ত এ পরিকল্পনা অত্যন্ত মূল্যবান এবং আদর্শিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। এ ধরনের একটি পরিকল্পনা নিয়ে বহু পূর্ব থেকে কাজ করা আবশ্যক ছিল। কেননা বস্তুতই ইউরোপ-আমেরিকায় বসবাসকারী মুসলিম জনগণ ইসলাম সম্পর্কে খুব সামান্যই জানেন। আর সে সামান্য জ্ঞানও নানাবিধ বিকৃতি ও সংশয়ে জর্জরিত। এরই কাছাকাছি সময়ে আমার এক আযহারী বন্ধু আমেরিকা পরিভ্রমণ করে আমাকে লিখলেন যে, এসব দেশে বসবাসকারী বিপুল সংখ্যক মুসলিম মদ্য ব্যবসা ও পানশালা (Bar) চালিয়ে বিপুল অর্থ উপার্জন করছে। কিন্তু মুসলিমদের জন্যে এ কাজ যে সম্পূর্ণ হারাম ও কঠিন গুনাহ, সে বিষয়ে এদের একবিন্দু চেতনা নেই।
তিনি আরও লিখেছেন, মুসলিম পুরুষরা খ্রীস্টান ও ইয়াহুদী— এমনকি নাস্তিক, পৌত্তলিক, মূর্তিপূজারী (Heathen, Idolater)-দের কন্যা স্ত্রীরূপ গ্রহণ করছে, মুসলিম কন্যাদের বিয়ে করতে প্রস্তুত হচ্ছে না।
আর মুসলিমদের অবস্থা যখন এই, তখন অমুসলিমদের অবস্থা কি হতে পারে, তা বলাই নিষ্প্রয়োজন। তারা তো ইসলামের একটা বাহ্যিক বীভৎস রূপই দেখতে পাচ্ছে। ইসলামের অন্তর্নিহিত প্রকৃত সত্য ও সৌন্দর্যের সাথে পরিচিত হওয়ার কোন সুযোগই তারা পাচ্ছে না। ফলে তারা ইসলামের ও মুসলিমদের (মুসলিম হওয়ার দাবিদারদের) প্রতি সকল শ্রদ্ধা-ভক্তি নিঃশেষে হারিয়ে ফেলে ফেলছে। বিশেষ করে ইসলামের দুশমন খ্রীস্টান মিশনারীরা ও হিংসুক সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোই তাদের সামনে ইসলামের এ বিকৃত চেহারা তুলে ধরে আসছে আবহমান কাল থেকে। এ জন্যে তারা দিনরাত অত্যন্ত হীন চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে আবহমান কাল থেকে। অথচ দুনিয়ার মুসলিম চিন্তাবিদগণ এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ অচেতন ও অনবহিত হয়ে রয়েছেন।
তাই এক্ষণে যদি আমাদের চিন্তাবিদদের চেতনা জেগে থাকে ও এ মহতী কার্যক্রমের পরিকল্পনা নেয়া হয়ে থাকে, তবে তা অত্যন্ত মুবারক ও সময়োপযোগী হয়েছে, যা ব্যাখ্যা করে বলার প্রয়োজন হয় না। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং ইসলামী দাওয়াতের এ মহামূল্য কাজে সর্বপ্রকার সাহায্য ও সহযোগিতা মুসলিম মাত্রেরই কর্তব্য, তাতেও কোন সন্দেহ নেই। এ কাজ কেবল যে 'জামে আযহার' (আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়) কেন্দ্রিক হওয়া উচিত তা-ই নয়, তা তার বাইরে সমগ্র মুসলিম জাহানেও হওয়া বাঞ্ছনীয় বলে আমি মনে করি।
উক্ত ইসলামী সংস্কৃতি কেন্দ্র থেকে এ গ্রন্থকারকে একখানি গ্রন্থ রচনা করতে বলা হয়। তার শিরোনাম দেয়া হয়: الْحَلَالُ وَالْحَرَامُ فِي الْإِسْلَامِ (ইসলামে হালাল হারামের বিধান)। সেই সঙ্গে বলে দেয়া হয় যে, গ্রন্থখানি যেন বিস্তারিত আলোচনা-সম্বলিত ও সহজবোধ্য ভাষায় রচিত হয় এবং তাতে দুনিয়ার অন্যান্য ধর্মমত ও সাংস্কৃতিব দৃষ্টিকোণের সাথে তুলনামূলক আলোচনা পেশ করা হয়।
প্রথম দৃষ্টিতে 'হালাল-হারাম' বিষয়টি যদিও সহজ মনে হয়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বিষয়টি অত্যন্ত জটিল। বিশেষত এজন্যেও যে, এ বিষয়ের ওপর দ্বীনী সাহিত্যে এখন পর্যন্ত কোন গ্রন্থ লিখিত হয় নি, না প্রাচীন কালে, না আধুনিক কালে। বিষয়টির উপকরণসমূহ যদিও তাফসীর, হাদীস ও ইসলামী ফিকাহ্র বিস্তারিত অধ্যায়সমূহে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে রয়েছে এবং পাঠকগণ সেসব অধ্যয়নকালে বিভিন্ন পর্যায়ে তার সাথে পরিচিত হন, কিন্ত সে সমস্ত উপকরণ একখানি গ্রন্থে একত্রে সন্নিবেশিত করা কিছুমাত্র সহজ কার্য নয়।
তা ছাড়া বিষয়টি এমন যে, লেখককে এমন বহু ব্যাপারেই একটা চূড়ান্ত ও নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়, যেসব ব্যাপারে প্রাচীন কালের মনীষীদের মধ্যে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে। উপরন্তু সেসব বিষয় মুহাদ্দিসদের রায় সর্বতভাবে এক এবং অভিন্নও নয়। আর হালাল-হারামের ব্যাপারে বিভিন্ন মতের মধ্য থেকে একটি মাত্র মতকে অগ্রাধিকার দিতে হলেও বিস্তারিতভাবে আলোচনা-পর্যালোচনা করতে হয়। শুধু তাই নয়, এ পর্যায়ের আলোচনায় আলোচনাকারীকে ঐকান্তিক নিষ্ঠা সহকারে সত্যের সন্ধানে আত্মনিয়োগ করতে হয় এবং সেজন্যে প্রাণপণ পরিশ্রম করাও অপরিহার্য হয়ে পড়ে।
ইসলাম বিষয়ে একালের লেখক, গবেষক ও গ্রন্থকারদের দুভাগে ভাগ করা যায়:
এক ভাগের লোকদের সম্পর্কে বলা যায়, পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সাংস্কৃতির ঢাকচিক্যে তাদের চোখ ঝলসে গেছে। শুধু তাই নয়, পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে তাঁরা এক বিরাট দেবতারূপেই গণ্য করেছেন। তার প্রতি তাঁরা পূর্ণ আনুগত্য জানিয়ে তারই পূজা, উপাসনা ও আরাধনায় নিমগ্ন হয়েছেন। তাঁরা সে দেবতার সম্মুখে পূজার উপাচার ও ভেট-উপঢৌকনও পেশ করছেন একনিষ্টভাবে। তার সম্মুখে এঁদের দৃষ্টি ভীত-সন্ত্রস্ত ও অবনত হয়ে আছে। তাঁরা পাশ্চাত্য-সভ্যতা-সংস্কৃতি উৎসারিত সব কিছুকেই চূড়ান্ত সত্য ও চিরকালীন অনুসরণীয় মনে করে নিয়েছেন। তার সাথে মতবিরোধ করতে বা তা থেকে ভিন্নতর মত গ্রহণ করতে ও বিপরীত মতকে খণ্ডন করতে তাঁরা আদৌ প্রস্তুত নন। এ পর্যায়ে কোন বিষয়ের সাথে যদি মিল ঘটে যায়, তাহলে তাঁরা উল্লসিত হয়ে চিৎকার করে উঠেন। আর যেখানেই বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হয়, সেখানেই কোন-না-কোনরূপে সামঞ্জস্য বা সমন্বয় সাধনে ব্রতী হন অথবা ইসলামের দিক দিয়ে কৈফিয়তের সুরে কথা বলতে শুরু করেন কিংবা ইসলামের দৃষ্টিকোণকে বিকৃতি করে এমন একটা ব্যাখ্যা পেশ করেন, যার সাথে ইসলামের আদৌ কোন মিল নেই। তাতে তাদের এ ধারণাই প্রকট হয়ে উঠে যে, পাশ্চাত্য সভ্যতা-সংস্কৃতি ও দর্শনের বিরুদ্ধে ইসলামের যেন কিছু বলবার নেই। প্রতিকৃতি, ছবি, প্রতিমূর্তি, জীবের ভাস্কর্য, সুদী ব্যবসায় ও ভিন্ন স্ত্রীলোকের সাথে নিভৃত নিবিড় সাক্ষাতকার, নারীদের নারীত্ব থেকে বিদ্রোহ এবং পুরুষদের স্বর্ণ-রৌপ্যের ভূষণ বা অলংকারাদির ব্যবহার প্রভৃতি বিষয়ে তাদের বক্তব্য থেকে আমি এ মনোভাবেরই স্পষ্ট পরিচিতি আঁচ করতে পেরেছি। ইসলামে তালাক ও এক সঙ্গে একাধিক স্ত্রী গ্রহণের যে অনুমতি রয়েছে, সেক্ষেত্রেও তাদের মনোভাব কিছুমাত্র ভিন্নতর নয়। মনে হচ্ছে, তাদের বিশ্বাস, পাশ্চত্য যা হালাল করেছে তা অবশ্যই হালাল, যা হারাম করেছে তা অবশ্যই হারাম হবে অথচ ইসলাম একটা স্বতন্ত্র জীবন দর্শন, তা মহান আল্লাহ্র নাযিল করা বিধান আর আল্লাহর বিধানই সর্বপরি ও সর্বজয়ী হবে, এটাই বাঞ্ছনীয়। ইসলামকেই অনুসরণ করতে হবে, তা কাউকে বা অন্য কিছুকে অনুসরণ করতে পারে না- একথা তারা সম্পূর্ণরূপে ভুলে গেছেন। আল্লাহ্ই হচ্ছেন মাবুদ আর সব বান্দা। মাবুদ কখনই বান্দাকে অনুসরণ করতে, তার অধীন হয়ে থাকতে রাজী হতে পারেন না। স্রষ্টা কোন্ কারণে সৃষ্টির কাছে নতি স্বীকার করবেন? আল্লাহ নিজেই বলেছেন:
وَلَوِ اتَّبَعَ الْحَقُّ أَهْوَاءَ هُمْ لَفَسَدَتِ السَّمَوتُ وَلْأَرْضُ وَمَنْ فِيهِنَّ
প্রকৃত সত্য- মহান আল্লাহ- যদি লোকদের খামখেয়ালীর অনুসরণ কে চলে, তাহলে তো নভোমণ্ডল, পৃথিবী ও তাতে যা কিছু রয়েছে তা সব কিছুই কঠিনভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে।
قُلْ هَلْ مِنْ شُرَكَائِكُمْ مِّنْ يُهْدِي إِلَى الْحَقِّ - قُلِ اللَّهُ يَهْدِي لِلْحَقِّ أَفَمَنْ يَهْدِي إِلَى الْحَقِّ أَحَقُّ أَنْ يَتْبَعَ أَمَنْ لَا يَهْدِى إِلَّا أَنْ يُهْدَى - فَمَا لَكُمْ كَيْفَ تَحْكُمُونَ
বল, তোমরা আল্লাহ্র সাথে যাদের শরীক করছ, তাদের মধ্যে কেউ কি পরম সত্যের পথ প্রদর্শন করে। আর বল, যিনি পরম সত্যের পথ প্রদর্শন করেন তিনি অনুসৃত হওয়ার বেশি অধিকারী, না যা আদৌ কোন পথ দেখায় না- তাকেই বরং পথ দেখাতে হয়, এ ব্যাপারে সে-ই বেশি অধিকারসম্পন্ন
এ হচ্ছে লেখক গ্রন্থকারদের এক শ্রেণী সম্পর্কিত কথা। আর দ্বিতীয় শ্রেণীর লোকেরা তো হালাল হারামের বিষয়ে একটা নির্দিষ্ট মতের ওপর অবিচল হয়ে রয়েছে। এ ব্যাপারে তাঁরা হয়ত কোন কিতাবের ভাষ্যের ওপর নির্ভর করেছেন অথবা ধারণা করেছেন ওটাই ইসলাম হবে। ফলে তাঁরা তাঁদের বদ্ধমূল ধারণা থেকে একবিন্দু সরে দাঁড়াতেও প্রস্তুত নন। এমন কি, এ বিষয়ে শরীয়াতের দলিল-প্রমাণের পরীক্ষা-পর্যালোচনা করে দেখতেও তাঁরা সম্পূর্ণ নারাজ অথচ স্বমত ও ভিন্ন মতের দলিল-প্রমাণসমূহ তুলনামূলকভাবে পরীক্ষণ ও আলোচনা-পর্যালোচনা করলেই প্রকৃত সত্যে উপনীত হওয়া সম্ভবপর হতো।
এ শ্রেণীর লোকদের কাছে যদি জিজ্ঞেস করা হয় যে, বাদ্যযন্ত্র, সঙ্গীত, দাবা খেলা, নারী শিক্ষা, মেয়েদের মুখমণ্ডল ও বাহুদ্বয় অনাবৃত রাখা প্রভৃতি সম্পর্কে আপনাদের মত কি? তাহলে তাঁরা বলে বা লিখে দেবেন 'হারাম'। এক্ষেত্রে পূর্বকালীন মনীষীবৃন্দ কি ভূমিকা গ্রহণ করতেন বা কথা বলার কি ধরণ বা ভঙ্গি অনুসরণ করতেন, তাও তাঁরা ভুলে গেছেন। কেননা যে জিনিস বা কাজ সম্পর্কে চূড়ান্ত ও নিঃসন্দেহভাবে জানা যায়নি যে, তা হারাম, তাঁরা কখনই তাকে হারাম বলতেন না। বরং তাঁরা বলতেন, আমি এটা পছন্দ করি না বা আমি এটা ঘৃণা করি ইত্যাদি। এই প্রেক্ষিতে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে, এ দুই শ্রেণীর কোন বিশেষ একটি শ্রেণীর মধ্যে নিজেকে শামিল করব না। কেননা আমার দ্বীনই আমাকে পাশ্চাত্যের বান্দা- অন্ধ অনুসরণকারী হতে দেয় না। কেননা আমি তো মহান আল্লাহকেই আমার রব্বরূপে স্বীকার করেছি, ইস্লামকে আমার জীবনের পূর্ণাঙ্গ বিধানরূপে মেনে নিয়েছি এবং বিশ্বাস করেছি মুহাম্মাদ (স)-ই আল্লাহ্‌র শেষ রাসূল।
দ্বিতীয়ত, আমার বিবেক-বুদ্ধি যেহেতু এখনও জাগ্রত, সচেতন, এ কারণে কোন একটি ফকীহ্ মাযহাবকেই আমি সকল বিষয়ের চূড়ান্ত বলে স্বীকার করে নিতে পারি না। কেননা তা যেমন নির্ভুল হতে পারে, তেমনি তা ভুল হওয়ার আশংকা থেকেও সম্পূর্ণ মুক্ত নয়। ইমাম ইবনুল জাওজী বলেছেন, অন্ধ অনুসরণকারী এক অনির্ভরযোগ্য ভিত্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকে। আর তাতে বিবেক-বুদ্ধিকে সম্পূর্ণ অকেজ করে রাখা হয়। বিবেক-বুদ্ধি ও চিন্তা-বিবেচনা শক্তি মানুষের জন্যে আল্লাহ প্রদত্ত একটি মহৎ গুণ। তাকলীদ বা অন্ধ অনুসরণের নীতি গ্রহণ করা হলে এ মহৎ গুণের যাবতীয় কল্যাণ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করা হয়। যার হাতে আলোর মশাল রয়েছে সে যদি তা নিভিয়ে অন্ধকারে পথ চলতে শুরু করে, তবে তার এ হাস্যকর আচরণ কোনক্রমেই যুক্তিসঙ্গত বিবেচিত হতে পারে না।
এ কারণে আমি নিজেকে বিশেষ কোন মাযহাবী গোষ্ঠীর সাথে জড়িত করিনি। কেননা আমার মতে প্রকৃত সত্য বিশেষ একটি মাযহাবী মতের মধ্যে সীমিত হয়ে থাকে নি। দুনিয়ার প্রচলিত এসব মাযহাবের ইমামগণ নিজেদের নির্ভুল নিষ্পাপ হওয়ার দাবিও করেননি কখনও। আসলে তাঁরা ছিলেন সত্যানুসন্ধানের জন্যে প্রাণপণ চেষ্টাকারী মুজতাহিদ। আর কোন ভুল করে থাকলেও তারা এক গুণ সওয়াব পাবেন, আর যদি নির্ভুল ইজতিহাদী মত প্রকাশে সক্ষম হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁরা দ্বিগুণ সওয়াব পাবেন। বস্তুতঃ ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানে নিষ্ঠাপূর্ণ ও অনাসক্ত সত্যানুসন্ধানের এটাই হচ্ছে ঘোষিত মর্যাদা।
ইমাম মালিক (র) বলেছেন:
كُلُّ اَحَدٍ يُؤْخَذُ مِنْ كَلَامِهِ - وَيُتْرَكَ إِلَّا النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ -
নবী করীম (স) ব্যতীত অন্যান্য সব মানুষের মর্যাদাই হচ্ছে এই যে, তার কথার কিছু অংশ গ্রহণও করা যায়, বর্জনও করা যায়।
ইমাম শাফেয়ী (র) বলেছেনঃ
راني صواب يَحْتَمِلُ الخَطَاءَ وَرَأَى غَيْرِي خَطَاء يَحْتَمِلُ الصُّوابُ -
আমার মত নির্ভুল, তবে ভুল হওয়ার আশংকা আছে। আর আমার ছাড়া অন্যান্যদের মত ভুল, তবে নির্ভুল হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
যে সুবিজ্ঞ মুসলিম জ্ঞানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন মতের মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা-পর্যালোচনা করার এবং তন্মধ্য থেকে কোন একটি মতকে অগ্রাধিকার দিতে যোগ্যতা ও উপকরণের অধিকারী, তার পক্ষে মাযহাব সমূহের মধ্য থেকে বিশেষ কোন একটি মাযহাবের নিকট বন্দী হয়ে থাকা কিংবা বিশেষ কোন ফিকাহ্ বিশারদের মতের অন্ধ অনুসারী হওয়া কোনক্রমেই বাঞ্ছনীয় হতে পারে না। বরং তার তো দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে চলার নীতি অবলম্বন করা কর্তব্য। তখন যে দলিলটি নির্ভল হবে, যার প্রমাণ অকাট্য হবে, সেটিকেই অনুসরণ করে চলবে। আর যার সনদ দুর্বল, দলিলের অকাট্যতা অপ্রমাণিত তা সহজেই পরিত্যক্ত হবে। অতএব এরূপ একটি মত গৃহীত হয়ে থাকলে তাও অবশ্যই পরিত্যক্ত হওয়া উচিত। হযরত আলী (রা) নীতিকতা হিসেবে বলেছিলেন:
لَا تَعْرِفِ الْحَقِّ بِالرِّجَالِ بَلِ أَعْرَفَ الْحَقُّ تَعْرِفُ أَهْلَهُ -
লোকদের দেখে সত্যকে চিনবার ও জানবার চেষ্টা কর না। বরং সত্যকে সত্য হিসেবেই জানতে ও চিনতে চেষ্টা কর এবং তারই ভিত্তিতে খোঁজ কর সেই সত্যের ধারক লোকদের।
জামে আযহারের সংস্কৃতি পরিষদের নির্দেশ পালন করতে আমি যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়েছি। প্রতিটি বিষয়কেই আমি দলিলের ভিত্তিতে পরীক্ষা করতে এবং তুলনা করে মৌল কারণের দৃষ্টিতে কোন একটি মতকে অগ্রাধিকার দিতে চেষ্টা করেছি। এ পর্যায়ে আমি আধুনিক যুগের চিন্তা-ভাবনা ও জ্ঞান-তথ্যকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছি। সর্বক্ষেত্রেই আমি ইসলামের দৃষ্টিকোণকে স্বর্ণোজ্জ্বল ও অকাট্য যুক্তি-প্রমাণ ভিত্তিকই পেয়েছি। আর এটাই স্বাভাবিক। কেননা ইসলাম তো বিশ্বমানবতার দ্বীন। আল্লাহ নিজেই বলেছেন:
صِبْغَةَ اللهِ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ صِبْغَةً -
আল্লাহ্র রঙ। আর আল্লাহ্র রঙের তুলনায় 'অধিক উত্তম রঙ আর কি হতে পারে?
হালাল-হারামের ব্যাপারটি একটি চিরন্তন ব্যাপার। প্রাচীনকাল থেকেই প্রতিটি জাতির জীবনে এ প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দিয়েছে। তবে হারামের পরিমাণ ও তার প্রকৃতি পর্যায়ে যে মতভেদ রয়েছে তা অস্বীকার করা যায় না। অবশ্য তার কারণও ভিন্ন রয়েছে। এ পর্যায়ের দৃষ্টিকোণ প্রতিটি জাতির প্রাথমিক পর্যায়ের আকীদা-বিশ্বাস ও আবহমানকালের সংস্কার ঐতিহ্যের সাথে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট।
উত্তরকালে বড় বড় আসমানী দ্বীন শরীয়াতের বিধানসমূহ উপস্থাপিত করেছে। আর তাতে হালাল-হারামের ব্যাপারটি অবশ্যই উপস্থিত রয়েছে। দ্বীনের প্রতি ঈমান গ্রহণের পর ব্যাপারটি নিছক সংস্কার বা গোষ্ঠীগত প্রচলন কিংবা রেওয়াজের ব্যাপার হয়ে থাকে নি। তখন তা মানবীয় আদর্শের পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। কিন্তু তখন হালাল-হারাম নির্ধারণের অনেক ক্ষেত্রেই সমসাময়িক সমাজ দৃষ্টি ও প্রবণতার প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছে। অবস্থার পরিবর্তনে হালাল-হারামেরও পরিবর্তন ঘটেছে। সময়ের পরিবর্তনের প্রভাবকেও অস্বীকার করা যায় নি। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, ইয়াহুদীদের সমাজে অনেক হারামই ছিল সাময়িক। সে হারাম- সীমালংঘন করার অপরাধে আল্লাহ তা'আলা বনী ইসরাঈলকে শাস্তি দিয়েছেন। যদিও এ হারাম কোন চিরন্তন ব্যাপার ছিল না। হযরত ঈসা (আ) বনী ইসরাঈলদের লক্ষ্য করে যে কথা বলেছিলেন, কুরআনে তা উদ্ধৃত হয়েছে এ ভাষায়:
وَمُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَى مِنَ التَّوْرَاةِ وَلِأُحِلَّ لَكُمْ بَعْضَ الَّذِي حُرِّمَ عَلَيْكُمْ -
আমার পূর্ববর্তী তওরাতের সত্যতা ঘোষণাকারী এবং আমি তোমাদের জন্যে হালাল করে দেব এমন কিছু কিছু জিনিস, যা তোমাদের প্রতি হারাম করে দেয়া হয়েছিল।
পরে দ্বীন-ইসলাম যখন অবতীর্ণ হল, তখন মানবতা পূর্ণতা লাভ করেছে, তা নবুওয়্যাত ও রিসালাতের সর্বশেষ অবদান গ্রহণের জন্যে উপযুক্ত হয়ে উঠেছিল। তখন আল্লাহ তা'আলা ইসলামের সর্বশেষ শরীয়াতের শাশ্বত ও চিরস্থায়ী বিধান নাযিল করলেন। সূরা আল-মায়িদার আয়াতে বিভিন্ন হারাম খাদ্যের উল্লেখ করার পর আল্লাহ তা'আলা একথাই ঘোষণা করেছেন নিম্নোদ্ধৃত ভাষায়:
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا
আজ তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত দান সম্পূর্ণ ও সমাপ্ত করলাম এবং তোমাদের জন্যে ইসলামকে দ্বীন হিসেবে মনোনীত করে দিলাম।
বস্তুত ইসলামে হালাল-হারামের চিন্তা অত্যন্ত সহজ-সরল ও সুস্পষ্ট। নভোমণ্ডল ও পৃথিবী আল্লাহ্র কাছ থেকে যে আমানতের বোঝা বহনে অক্ষমতা ও অস্বীকৃতি জানিয়েছিল, এ ব্যাপারটি সে আমানতেরই অংশ। কেননা তা মানুষ নিজের স্কন্ধে সাগ্রহে গ্রহণ করেছিল। আর তা হচ্ছে আল্লাহ প্রদত্ত আইন-বিধান পালন ও পৃথিবীতে আল্লাহ্ প্রতিনিধিত্ব বহনের আমানত। এ এক কঠিন ও দুর্বহ দায়িত্ব। এ দায়িত্ব গ্রহণের ভিত্তিতেই মানুষকে সওয়াব কিংবা আযাব দেয়া হবে কিয়ামতের দিন। মানুষ যাতে এ আমানতের বোঝা যথাযথভাবে বহন করতে পারে এবং এতদসংক্রান্ত দায়িত্ব পালনে সমর্থ হয় সেজন্যেই আল্লাহ তা'আলা মানুষকে বিবেক-বুদ্ধি ও ইচ্ছাশক্তি দান করেছেন, নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন এবং জীবন বিধানরূপে নাযিল করেছেন তাঁর মহান গ্রন্থাবলী।
এমতাবস্থায় মানুষের এরূপ প্রশ্ন করার অধিকার নেই যে, তাদের জন্যে হালাল-হারাম বিধান কেন দেয়া হল, কেন তাদের উন্মুক্ত ও বল্লাহারা করে ছেড়ে দেয় হল না? বস্তুত এ হচ্ছে আল্লাহ্ পরীক্ষণ ব্যবস্থার পরিশিষ্ট। এটা কেবল মানুষের ওপরই প্রবর্তিত। আল্লাহর অসংখ্য সৃষ্টিকুলের মধ্য থেকে কেবলমাত্র মানব জাতিকেই এজন্যে বাছাই করে মনোনীত করা হয়েছে। কেননা মানুষ ফেরেশতাদের ন্যায় নিছক 'আত্মা' নয়, নিছক লালসা-কামনা সর্বস্বও নয় জন্তু-জানোয়ারের মতো। মানুষ এ দুটির সমন্বয়- অতীব ভারসাম্যপূর্ণ সৃষ্টি। মানুষ তার এ সমন্বিত সত্তা উন্নীত করে ফেরেশতাদের মর্যাদায় পৌঁছতে পারে, হতে পারে তার চাইতেও উত্তম ও উন্নত। সে সঙ্গে অধঃপতনের নিম্নতম পংকে ডুবে গিয়ে জন্তু-জানোয়ার কিংবা তার চাইতেও নীচে ও নিকৃষ্ট অবস্থায় উপনীত হতে পারে।
অপর এক দৃষ্টিতে এ হালাল-হারামের ব্যাপারটি ইসলামী শরীয়াত বিধানের আকাশে সদা আবর্তনশীল। মানুষের কল্যাণ বিধান এবং ক্ষতি ও দুর্ভাগ্য মোচনের ভিত্তির ওপর তা প্রতিষ্ঠিত। এর দ্বারা মানুষের জীবনকে সুষ্ঠ, সুন্দর ও সহজতর করাই উদ্দেশ্য। এ বিধান যেমন একদিকে সমস্ত বিপর্যয় প্রতিরোধ করে, তেমনি সমস্ত কল্যাণকে সক্রিয় করে তোলে। সমগ্র মানবতার সার্বিক কল্যাণ বিধানই তার চরম লক্ষ্য। তার আত্মার কল্যাণ, দেহের কল্যাণ, বিবেক-বুদ্ধির সুস্থতা এ বিধান পালনেই নিহিত। মানুষ বিভিন্ন জাতি, বর্ণ, দেশ-কাল প্রভৃতিতে বিভক্ত হওয়া সত্ত্বেও এ বিধান থেকেই কল্যাণ লাভ করতে সক্ষম।
এ বিধান দ্বীন-ইসলামের অবিচ্ছিন্ন অংশ। এ দ্বীন নাযিল হয়েছে সমগ্র মানুষের জন্যে সার্বিক কল্যাণের ও রহমতের বাহন হিসেবে। এ কথা আল্লাহ তা'আলা বলেছেন তাঁর সর্বশেষ রাসূলকে সম্বোধন করে :
সমগ্র বিশ্বজগতের প্রতি রহমতরূপেই তোমাকে পাঠিয়েছি। রাসূল নিজেও বলেছেন : وَمَا أَرْسَلْتُكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَلَمِينَ -
إِنَّمَا أَنَا رَحْمَةً مَهْدَاةٌ -
'নিঃসন্দেহে আমি সুপরিশীলিত রহমত মাত্র।
এ রহমতের ফল হিসেবেই আল্লাহ তাঁর এ সর্বশেষ উম্মতের উপর থেকে সর্বপ্রকার কষ্ট, কঠোরতা ও কৃচ্ছ সাধনার নিয়মাদি তুলে নিয়েছেন। 'সব কিছু বৈধ- কোন কিছুই নিষিদ্ধ নয়', এ নীতির কদর্যতা থেকেও তাদের মুক্ত করেছেন। মূর্তিপূজারী ও কোন কোন কিতাবী ধর্ম-পালনকারী গোষ্ঠী আবার কৃচ্ছ সাধনা ও কষ্ট-কঠোরতার নীতি অনুসরণ করতে গিয়ে সকল প্রকার পাক-পবিত্র জিনিসকে নিজেদের' জন্যে হারাম করে নিয়েছে এবং বহু প্রকার জঘন্য ঘৃণ্য কাজ বা জিনিসকে নিজেদের জন্যে 'হালাল' করে নিয়েছে। আল্লাহ, নিজেই বলেছেন : وَرَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ فَسَأَكْتُبُهَا لِلَّذِينَ يَتَّقُونَ وَيُؤْتُونَ الزَّكُوةَ وَالَّذِينَ هُمْ بِأَيْتِنَا يُؤْمِنُونَ - الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيِّ الْأُمِّيِّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوبًا عِنْدَهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَالِإِنْجِيلِ - يَأْمُرُهُمْ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَا هُمْ عَنِ الْمُنْكَرَ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ وَيَضَعْ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلُلَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ -
আমার রহমত প্রতিটি জিনিসকেই আচ্ছন্ন করে রেখেছে। আমি অবশ্য তা নির্দিষ্ট করে দেব সেসব লোকদের জন্যে, যারা আল্লাহকে ভয় করে, যাকাত দেয় এবং যারা আমাদের আয়াতসমূহের প্রতি ঈমানদার তারাই উম্মী নবীকে অনুসরণ করে চলে। তাদের কাছে রক্ষিত তওরাত ও ইঞ্জিলে তাঁর কথা লিখিত দেখতে পায়। এ নবীই তাদের ভাল ভাল কাজের আদেশ করে, অন্যায় ও পাপ কাজ থেকে বিরত থাকতে বলে, তাদের জন্যে ভাল ভাল ও পবিত্র জিনিসসমূহ হালাল ঘোষণা করে, তাদের জন্যে হারাম ঘোষণা করে সব নিকৃষ্ট ও জঘন্য বীভৎস কাজ বা দ্রব্যসমূহ এবং তাদের ওপর যে বোঝা ও শৃঙ্খল আবহমানকাল থেকে চেপে বসে আছে, তা থেকে তাদের মুক্ত করে।
হালাল-হারামের ব্যাপারে ইসলামী বিধান যে দুটি আয়াতের ওপর ভিত্তিশীল, তার উল্লেখ এ গ্রন্থের শুরুতে দেয়া হয়েছে।
শেষ কথা হচ্ছে, হালাল-হারাম বিষয়ে লিখিত এ ক্ষুদ্র পরিসর গ্রন্থখানির গুরুত্ব স্বীকৃত হতে হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। আধুনিক মুসলিম গ্রন্থ প্রণয়ন পর্যায়ে এটি একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন বলে মনে করি। এ গ্রন্থ মুসলিম জীবনের বহু সমস্যার সমাধান করবে এবং বহু ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত বিষয়াদি সংক্রান্ত প্রশ্নের সঠিক জবাব জনসমক্ষে উপস্থাপিত করবে। মুসলিমদের জন্যে হালাল কি, হারাম কি এবং তার নিহিত প্রকৃত কারণ ও যুক্তি কি, তা সব বিস্তারিতভাবে এ গ্রন্থের মাধ্যমে জানা যাবে বলে আমার দৃঢ় প্রত্যয় রয়েছে।
সর্বশেষে জামে আযহারের ভাইস চ্যান্সেলর ও ইসলামী সংস্কৃতি পরিষদের প্রতি শুকরিয়া না জানালে আমার দায়িত্ব পালন হবে না। কেননা তাঁদের কথানুযায়ীই আমি এ গ্রন্থ প্রণয়নে উদ্যোগী হয়েছি।
ইউসুফ-আল-কারযাভী

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 উপসংহার

📄 উপসংহার


এই গ্রন্থে আমরা মুসলমানের কাজকর্ম ও বাহ্যিক আচার-আচরণের ক্ষেত্রে হালাল ও হারাম পর্যায়ের আলোচনা বিস্তারিতভাবে পেশ করার সংকল্প গ্রহণ করেছিলাম। আর তা আমাদের সাধ্যানুসারে সম্পন্ন করেছি। এ ছাড়া মন-মগজের কার্যাবলী, মনস্তত্ত্বের গতি-বিধি ইচ্ছা-বাসনা কল্পনা-এর মধ্যে কি হারাম, কি হালাল এবং কোন কোনটি তীব্রভাবে হারাম- যেমন হিংসা-দ্বেষ-পরশ্রীকাতরতা, গৌরব-অহংকার, দেখানোপনা, মুনাফিকী, লোভ-লালসা-কৃপণতা প্রভৃতি বিষয়ে এ গ্রন্থে আলোচনা করার আমাদের কোন পরিকল্পনাই ছিল না। যদিও এ মনস্তাত্ত্বিক অবস্থাসমূহ অতিবড় হারাম এবং ইসলাম এ সবের বিরুদ্ধে কঠিনভাবে যুদ্ধ ও মুকাবিলা করেছে, নবী করীম (স) এ সবের অনিষ্ট সম্পর্কে সতর্ক করেছেন, কোন কোনটিকে মুসলিম উম্মতের পক্ষে মারাত্মক রোগ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো নির্মূলকারী বলে অভিহিত হয়েছে। কিন্তু সেগুলো এই আলোচনার আওতার মধ্যে নিয়ে আসা হয়নি।

বস্তুত কুরআন মজীদ ও সুন্নাতে মুহাম্মাদীয়া মানুষের অন্তর্জগতকে নির্মল নিষ্কলুষ করে গড়ে তুলে তাকে ব্যক্তি ও সমষ্টির সার্বিক কল্যাণ এবং ইহকাল ও পরকালীন মুক্তির ভিত্তি বানাতে চেয়েছে। এ দিকে ইঙ্গিত করেই কুরআন মজীদে বলা হয়েছে:

লোকেরা নিজেদের মন-অন্তর-হৃদয়কে পরিবর্তিত না করা পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা তাদের সামষ্টিক অবস্থারও কোন পরিবর্তন করবেন না। (সূরা রা'দ: ১১)

কিয়ামতের দিন ধন-মাল, পুত্র-সন্তানাদি কোন কল্যাণ দেবে না- কল্যাণ পাবে শধু সেই লোক, যে আল্লাহর কাছে সুস্থ নির্দোষ হৃদয়-অন্তর নিয়ে উপস্থিত হবে। (সূরা শুআরা: ৮৮-৮৯)

নবী করীম (স) এ দৃষ্টিতেই তাঁর প্রখ্যাত হাদীসে বলেছেন:
হালাল স্পষ্ট, হারামও স্পষ্ট। এ দুটির মাঝে অনেকগুলো সন্দেহের ব্যাপার রয়েছে। যে লোক সেগুলোতে আত্মরক্ষা করবে- এড়িয়ে চলবে সে তার দ্বীন ও মর্যাদা রক্ষা করতে পারবে। আর যে তার মধ্যে পড়ে যাবে, তার পক্ষে সুস্পষ্ট হারামের মধ্যে পড়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে আর প্রত্যেক রাজারই একটা সংরক্ষিত এলাকা থাকে। পৃথিবীতে আল্লাহর সংরক্ষিত এলাকা হচ্ছে তাঁর হারাম করে দেয়া বিষয়গুলো। (বুখারী, মুসলিম)

অতঃপর মানবদেহে হৃদয়ের গুরুত্বের কথা বলেছেন। আর তা থেকে যেসব প্রতিরোধ, ঝোঁক-প্রবণতা ও ইচ্ছা-বাসনা উৎসারিত হবে যার প্রেরণায় মানুষের বাহ্যিক আচরণ গড়ে উঠে, সেদিকেও ইঙ্গিত করেছেন। বলেছেন:

জেনে রাখ, মানবদেহে একটা মাংসখণ্ড রয়েছে। তা যদি সুস্থ থাকে, তাহলে গোটা দেহই সুস্থ হয়ে যায়। আর সেটি যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে, তাহলে গোটা দেহই অসুস্থ হয়ে যায়। জানো সেটি হচ্ছে হৃদয়- অন্তর। (বুখারী, মুসলিম)

এ হাদীস অনুযায়ী হৃদয়ই হচ্ছে প্রধান ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। অন্যান্য সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তারই নির্দেশে পরিচালিত হয়। এ চালক বা চালিকা শক্তি ভাল হলে সমগ্র দেহ-প্রজাবর্গও ভাল হবে। আর সেটি খারাপ হলে সবই খারাপ হয়ে যাবে। এতো অতি স্বাভাবিক কথা।

মানুষের আমল আল্লাহর কাছে গৃহীত হওয়ার মানদণ্ড হচ্ছে হৃদয়- মনোভাব বা নিয়ত। মানুষের বাহ্যিক আকার আকৃতি ও মুখের কথার কোন গুরুত্ব এক্ষেত্রে স্বীকৃত নয়। কেননা আল্লাহ তো মানুষের আকার-আকৃতির প্রতি দৃষ্টি দেয় না। তিনি দেখেন মনের অবস্থা- মানসিকতা। রাসূলের হাদীস: সমস্ত কাজের মূল্যায়ন হয় নিয়তের ভিত্তিতে— এর অর্থও তাই। মানুষ তা-ই পায়, যা পাওয়ার সে নিয়ত করেছে।

অন্তর বা হৃদয় সংক্রান্ত সমস্ত কাজের প্রকৃত পজিশন এ-ই এবং ইসলামে মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপারাদির যে খুব বেশি গুরুত্ব, তা এ থেকেই স্পষ্ট হয়ে উঠে। কিন্তু আমরা তার উল্লেখ এ গ্রন্থে করিনি। কেননা তা নৈতিকতা পর্যায়ের বিষয়াদি। আর তাতেও হালাল-হারামের প্রশ্ন রয়েছে। মুসলিম নৈতিকতা বিশারদ ও তাসাউফপন্থিগণ তার গুরুত্ব আরোপ করেছেন। সে দৃষ্টিতে যা যা হারাম, তাসাউফের পরিভাষায় তার নাম দেয়া হয়েছে ‘আমরাজুল কুলুব’ ‘হৃদয়ের রোগ সমূহ’। তাঁরা তার কারণ নির্ধারণ করেছেন এবং তার প্রতিবিধানের জন্যে ব্যবস্থাপত্রও দিয়েছেন। তাতে কুরআন ও সুন্নাতকে ভিত্তি করা হয়েছে। ইমাম গাযযালীর ‘ইহয়াউল-উলুম’ গ্রন্থের এক-চতুর্থাংশ এ আলোচনা সমন্বিত। তিনি তার নাম দিয়েছেন ‘আল-মুহলিকাত’— ধ্বংসকারী বিষয়াদি। কেননা এগুলোই তাসাউফের দৃষ্টিতে ইহকাল পরকাল সর্বত্র ব্যাপক ধ্বংস বিপর্যয় ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণ।

আমরা যখন হারাম জিনিসসমূহের কথা বলি, তখন আমরা শুধু ইতিবাচক হারামসমূহই বোঝাতে চাই। কেননা হারাম দু'প্রকারের। একটি হচ্ছে অন্যায় কাজ করা। এগুলো নেতিবাচক। এ দ্বিতীয় প্রকারের বিষয়াদি মূলত এ গ্রন্থের আলোচ্য নয়। প্রসঙ্গত কখনও উল্লেখ হওয়া ভিন্ন কথা। সে বিষয়ে আলোচনা করতে গেলে আমাদেরকে ভিন্নতর বিষয়ের দিকে চলে যেতে হতো। তখন আল্লাহ যত কর্তব্যের কথা বলেছেন, সেই সব বিষয়েরও উল্লেখ করার প্রয়োজন দেখা দিত। কেননা তা পরিহার কিংবা উপেক্ষা করা নিঃসন্দেহে হারাম। যেমন ইলম হাসিল করা প্রত্যেক মুসলিমেরই কর্তব্য। আর মুসলমানকে মুর্খতার মধ্যে ফেলে রাখা হলে তার পক্ষে হারামের মধ্যে পড়ে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক। আর নামায-রোযা-যাকাত-হজ্জ প্রভৃতি ফরয ইবাদতসমূহ ইসলামের প্রাথমিক পর্যায়ের রুকন। বিনা ওযরে তা ত্যাগ করা কোন মুসলমানের জন্যেই জায়েয নয়। তা সত্ত্বেও যদি কেউ তা তরক করে, তাহলে সে কবীরা গুনাহ করে। আর যে লোক সেগুলোর প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন করে, সেসবকে ফরয বলে স্বীকার না করে, সে ইসলামের রজ্জু নিজের গলদেশ থেকে খুলে দূরে ছুড়ে ফেলে।

উম্মতের নিজের প্রতিরক্ষা এবং তার শত্রুকে ভীত শংকিত করে দেয়ার জন্যে যতটা সম্ভব শক্তি-সামর্থ্য অর্জন সমগ্র জাতির একটি অতিবড় ইসলামী কর্তব্য। বিশেষ করে জাতির দায়িত্বশীল রাষ্ট্রপ্রধানের এ কর্তব্য সর্বোপরি। এ কর্তব্য পালিত না হলে- উপেক্ষিত হলে একটা বড় হারাম- বড় অপরাধ করা হবে। জীবনের বিশেষ ও সাধারণ- সবগুলো কর্তব্য সম্পর্কেই এ কথা।

আমরা এ গ্রন্থে হালাল-হারাম পর্যায়ের ছোট বড় সবগুলো জরুরী বিষয়েই আলোচনা করেছি, এমন দাবি আমরা করছি না। তবে এ গ্রন্থে এমনভাবে আলোচনা করেছি, যার আলোকে মুসলিম মাত্রই বুঝতে পারবেন, তার জন্যে হালাল কি হারাম কি- তার ব্যক্তিগত জীবনে ও সামষ্টিক পর্যায়ে। সাধারণ মানুষ যেসব হালাল হারামের মৌল কার্যকরণ ও যুক্তি সম্পর্কে আদৌ কিছু জানে না, সেই পর্যায়ের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েরই ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ দেয়া হয়েছে, আমরা মনে করি এ গ্রন্থ তাই আমাদের জন্যে যথেষ্ট।

আমি মনে করি, ইসলামের ঘোষিত হালাল হারামের মূলে যে নিবিড় গভীর কার্যকারণ নিহিত রয়েছে, এ গ্রন্থে সেই পর্যায়ে অনেক জরুরী কথাই বলা হয়েছে। এ থেকে দৃষ্টিমান প্রত্যেক ব্যক্তিই স্পষ্ট বুঝতে পারবেন যে, আল্লাহ যা হালাল করেছেন তার দ্বারা লোকদের লাঞ্ছিত করতে চেয়েছেন এবং যা হারাম করেছেন তার দ্বারা তাদের জীবনকে সংকীর্ণ করে দিয়েছেন, এমন কথা মনে করা কিছুতেই উচিত হতে পারে না। আসলে এটা সম্পূর্ণত আল্লাহর বিধান এবং তিনি মানুষের জন্যে যা কিছু কল্যাণকর মনে করেছেন, তারই ভিত্তিতে এ বিধান দান করেছেন। এর দ্বারা তিনি তাদের দ্বীনকে রক্ষা করেছেন, তাদের বৈষয়িক জীবনকেও সুন্দর করে গড়ে তোলার ব্যবস্থা করেছেন। তার দ্বারা তাদের মন, বিবেক-বুদ্ধি, চরিত্র, তাদের ইজ্জত-আবরু ও ধনমাল সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করেছেন। ব্যক্তি ও সমষ্টি উভয় দিক দিয়েই মানবতার উন্নয়ন ও অগ্রগতির ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন।

একটি বিষয় সর্বদা স্মরণীয়। মানবীয় আইন প্রণয়ন মানবীয় দুর্বলতার প্রতীক ও প্রতিচ্ছবি। তা হয় অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ, অসম্পূর্ণ। এ আইনের রচয়িতা ব্যক্তি হোক, সরকার হোক বা পার্লামেন্টই হোক, নিছক বৈষয়িক ও বস্তুগত কল্যাণের দৃষ্টিতেই আইন রচনা করে। কিন্তু দ্বীনের দাবি-দাওয়া ও চরিত্র-নৈতিকতার তাগিদ প্রভৃতির দিকে তখন তাদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয় না। মানুষ সব সময়ই তার দেশমাতৃকা ও ভৌগোলিক জাতীয়তার সংকীর্ণ পরিবেষ্টনীর মধ্যে থেকে চিন্তা করে। বিশাল মানবতা ও বৃহত্তর পৃথিবীর উদার উন্মুক্ত পরিবেশে চিন্তা করা ও সেই প্রেক্ষিতে আইন রচনা করার ক্ষমতা মানুষের নেই।

মানুষ আইন রচনা করে উপস্থিত সমস্যা সমাধানের জন্যে, আজকের জন্যে, আগামীকালের- ভবিষ্যতের অনন্তকালের প্রয়োজন পূরণের জন্যে আইন রচনা করা মানুষের সাধ্যাতীত। সর্বোপরি মানুষ মানবীয় দুর্বলতায় সংকীর্ণতায় ভরপুর। তার অক্ষমতা, দৃষ্টি সংকীর্ণতা নিজস্ব স্পৃহা ঝোঁক-প্রবণতার স্পষ্ট ছাপ থাকতে বাধ্য মানুষের রচিত আইনে।

ফলে মানবীয় আইন যেমন সংকীর্ণ পরিবেশ সমন্বিত, তেমনি স্কুল দৃষ্টিসম্পন্ন বস্তুগত ও সাময়িক ভাবধারায় ভারাক্রান্ত। লক্ষণীয় যে, মানবীয় আইনে হালাল-হারাম নির্ধারণ হয় তাদের নিজস্ব কামনা-বাসনার দৃষ্টিতে, জনমতকে শান্ত ও তৃপ্ত করাই থাকে তাদের লক্ষ্য। তাতে কঠিন বিপদ আসতে পারে এবং বিরাট ক্ষতি হয়ে যেতে পারে, তা দেখে এবং বুঝেও সেই আইন রচনায় প্রবৃত্ত হয়। আমেরিকায় মদ্যপান নিষিদ্ধ আইন বাতিল করে মদ্যপান আইনসম্মত হওয়ার আইন পাশ হওয়ার ঘটনাটিই এ পর্যায়ে উপযুক্ত দৃষ্টান্তরূপে উল্লেখ করা যথেষ্ট। কিন্তু ইসলামী আইন প্রণয়নের মূলে এসব দোষত্রুটি অক্ষমতা ও সংকীর্ণতার কোনই স্থান নেই।

ইসলামী আইন মহান সৃষ্টিকর্তা রচিত আইন। সৃষ্টিকর্তা সব বিষয়ে পূর্ণ ও পুংখানুপুংখ অবহিত। মানুষের প্রকৃত কল্যাণ কিসে, তারা কিভাবে কল্যাণকর হতে পারে তাদের নিজেদের ও গোটা সৃষ্টিলোকের জন্যে তা সৃষ্টিকর্তাই ভালভাবে জানেন। তিনিই বলেছেন:

আল্লাহই জানেন বিপর্যয়কারী- বিধ্বংসী কি এবং কল্যাণকর কি। (বাকারা: ২২০)

সৃষ্টিকর্তা তার সৃষ্টি সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়ে অবহিত হওয়াই তো স্বাভাবিক।

জেনে রাখ, সৃষ্টিকর্তাই জানেন। তিনি সূক্ষ্মদর্শী, সর্ববিষয়ে অবহিত। (মুলক : ১৪)

ইসলামী আইন মহাজ্ঞানী মহাবিজ্ঞানী আল্লাহর রচিত। তিনি নিরর্থকভাবে কোন কিছু হারাম করেন না, অনিয়মিতভাবে কোন কিছু হালাল করেন না। প্রতিটি জিনিসই তিনি পরিমিত মাত্রায় সৃষ্টি করেছেন, তুলাদণ্ডে ওজন করে করে তিনি তাঁর বিধান রচনা করেছেন।

মহা দয়াবান লালন-পালনকারী আল্লাহ রচিত আইনই হচ্ছে ইসলামী আইন। এ আইন দ্বারা তিনি তাঁর বান্দাদের জন্যে সহজ সুন্দর জীবন-ধারার ব্যবস্থা করেছেন। মানুষকে কোনরূপ কষ্টদান বা অসুবিধায় ফেলার তাঁর কোন ইচ্ছাই থাকতে পারে না। তিনি তো তাঁর সৃষ্টি মানুষের প্রতি পিতামাতার তুলনায়ও অধিক- অধিক মাত্রায় দয়াবান।

মহাশক্তিমান বাদশাহর রচিত ইসলামী আইন। তিনি তাঁর বান্দাদের প্রতি মুখাপেক্ষী নন, নির্ভরশীল নন, তিনি কারো পক্ষপাতী নন, না কোন গোষ্ঠীর, জাতির, বংশের, সীমাবদ্ধও নন কোন কিছুতেই। অন্যদের জন্যে হালাল-হারামের বিধান কারার যোগ্যতা তাঁরই থাকতে পারে। কেননা তিনিই সবকিছুর রাব্বুল আলামীন।

মুসলমানদের জন্যে হালাল ও হারামের যে বিধান করা হয়েছে, যে বিষয়ে মুসলিম মাত্রেই আকীদা এই। এ আকীদা পুরাপুরি যুক্তিসঙ্গত, বিবেকসম্মত। মুসলমান পূর্ণ সন্তুষ্টি ও প্রত্যয় সহকারেই তা কুবল করে। এ বিধান কার্যকর করার পূর্ণ ইচ্ছা ও সংকল্প থাকা বাঞ্ছনীয়। মুসলমানের ঈমান হচ্ছে, দুনিয়ায় তার সৌভাগ্য এবং পরকালীন মুক্তি ও সাফল্য আল্লাহর আদেশ-নিষেধ নির্ধারিত সীমাসমূহ যথাযথভাবে রক্ষা ও পালন করার মধ্যেই নিহিত রয়েছে একান্তভাবে।

এ কারণে তার সর্ব প্রথম কর্তব্য হচ্ছে, সেই সীমা- হালাল-হারামসমূহেই যথার্থভাবে জানা। তা জানলে ও ঠিকভাবে পালন করলেই উভয় জগতের কল্যাণ, সৌভাগ্য এবং সাফল্য লাভ করা সম্ভব।

এ কথাটির ব্যাখ্যার জন্যে প্রাথমিক কালের মুসলিম জীবনের দুটি দৃষ্টান্ত এখানে পেশ করতে চাই। তাঁরা কি ভাবে আল্লাহ হালাল-হারাম নির্ধারিত সীমা রক্ষা করতে ও আল্লাহর বিধানকে কার্যকর করতে প্রাণপণে চেষ্টা করতেন ও তাতে প্রতিযোগিতা করতেন, তা স্পষ্টভাবে জানা যাবে।

একটা দৃষ্টান্তের কথা আমরা ইতিপূর্বে মদ্যপান হারাম করণ পর্যায়ে উল্লেখ করে এসেছি। আরবরা ছিল মদ্যপানের জন্যে পাগল। মদ্য প্রীতি ছিল তাদের মজ্জাগত। সে জন্যে তারা বিশেষ পানপাত্র ও বিশেষ পান-মজলিসের ব্যবস্থা করত। আল্লাহ তা'আলা তাদের এ অবস্থা ভালভাবেই জানতেন। এ কারণে হারাম করণে তিনি ক্রমিক রীতি অবলম্বন করলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি চূড়ান্তভাবে হারাম করার ঘোষণা দিলেন। বললেনঃ

শয়তানী কাজের চরম কদর্যতা, অতএব তা পরিহার কর। (মায়িদা: ৯০)

এ কারণে নবী করীম (স) তা পান করা, বিক্রয় করা ও অমুসলমানদের জন্যে হাদিয়া হিসেবে দেয়া হারাম বলে ঘোষণা করলেন। এ সময় মুসলমানদের কাছে প্রচুর পরিমাণ মদ্য ও পাত্র ছিল। তারা এ নিষেধ শোনামাত্রই মদীনার অলিতে গলিতে মদের স্রোত প্রবাহিত করলেন ও চিরদিনের তরে ত্যাগ করলেন।

শরীয়তের বিধান পালনের জন্যে তাদের মধ্যে একটা প্রবল আনুগত্যপূর্ণ ভাবধারার অপূর্ব নিদর্শন লক্ষ্য করা গেছে। নিষেধ ঘোষণা শ্রবণের সময় কারো হাতে মদ্যভর্তি পাত্র ছিল। তার কিছু অংশ পান করেছিল, কিছু অংশ তখনও পান করার জন্যে অবশিষ্ট ছিল। কিন্তু তবুও নিষেধ ঘোষণা শোনার সাথে সাথে তা দূরে নিক্ষেপ করলেন। আল্লাহর জিজ্ঞাসা : তোমরা কি তা থেকে বিরত হবে?

এর জবাবে তারা কার্যত বললেন : হ্যাঁ আল্লাহ আমরা বিরত হয়ে গেলাম।

ইসলামী সমাজে মদ্যপানের বিরুদ্ধে এ সংগ্রাম এবং তার ওপর চূড়ান্ত ফয়সালার ইতিহাসকে যদি আমেরিকার মদ্যপান নিষিদ্ধকরণের ঘটনার সাথে তুলনা করা যায়, তাহলে স্পষ্ট প্রমাণিত হবে যে, আল্লাহর আইন ছাড়া মানব-প্রকৃতির সাথে আর কোনটিরই কোন সামঞ্জস্য নেই। সেই আইনেই মানব-মনের স্বস্তি ও স্থিতি লাভ সম্ভব। শক্তি ও আধিপত্য কর্তৃত্ব ছাড়া শুধু ঈমানই এ ব্যাপারে অধিকতর সফল হাতিয়ার- তা বুঝতে একটুও কষ্ট হয় না।

দ্বিতীয় দৃষ্টান্তটি হচ্ছে, প্রাথমিক কালের মুসলিম মহিলাদের পর্দা পালনের জন্যে প্রস্তুত হওয়া। আল্লাহ তা'আলা তাদের ওপর জাহিলিয়াতের যুগের ন্যায় উচ্ছৃঙ্খলতা ও অবাধে চলাফেরা হারাম করে দিলেন। আত্মমর্যাদা রক্ষা ও দেহাবয়ব আবৃত করে চলাফেরা করা তাদের জন্যে ফরয করা হয় অথচ জাহিলিয়াতের যুগে মেয়েরা বক্ষ উন্মুক্ত করে ঘরের বাইরে চলাফেরা করত। দেহের কোন অঙ্গই তারা আবৃত করত না। গলা-গ্রীবা খোলাই থাকত। চুল পিছনের দিকে পিঠের ওপর মেঘের মতোই ভেসে থাকত, কর্ণে স্বর্ণদ্যুতি চিকচিক করত। আল্লাহ তা'আলা এভাবে চলাফেরা করাকে হারাম ঘোষণা করলেন। তাদের সেকালের থেকে স্বতন্ত্র ও ভিন্নতর নীতি অনুসরণ করতে হবে। জাহিলিয়াতকে অনুসরণ-অনুকরণ করা বন্ধ করতে হবে। নিজেদের দেহাবয়ব পূর্ণ মাত্রায় আবৃত করেই চলতে হবে। বক্ষের ওপর আচল বা দোপট্টা চেপে রাখতে হবে। মাথায়ও কাপড় রাখতে হবে।

মুহাজির ও আনসার ঘরের মেয়েরা আল্লাহর এ আইন কিভাবে সম্বর্ধনা জানালেন এবং ইসলামী সমাজে তা নির্বিঘ্নে ও দ্রুততার সাথে কিভাবে কার্যকর করলেন, হযরত আয়েশা (রা) তা বর্ণনা করেছেন। আল্লাহর এই আইন ও আদেশ নারী জীবনে মৌলিক পরিবর্তনের দাবি নিয়ে এসেছিল। আর তার প্রভাব পড়েছিল তাদের রূপ-শোভা ও সৌন্দর্যের ওপর। হযরত আয়েশা (রা) বলেনঃ প্রাথমিক কালের মুহাজির মেয়েদের প্রতি আল্লাহ রহমত বর্ষণ করুন। কুরআনের আয়াত : তারা যেন তাদের আচল তাদের কাঁধে ও বক্ষের ওপর শক্ত করে বেঁধে নেয়। যখন নাযিল হল তখন দেখা গেল, তারা গায়ের চাদর দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে নিল। (বুখারী)

একদিন কতিপয় মহিলা তাঁর কাছে বসেছিলেন। তখন কুরাইশ বংশের মহিলাদের এবং তাদের মান-মর্যাদার বিষয়ে আলোচনা হলো। তখন তিনি বললেন: কুরাইশ-বংশের মহিলাদের মর্যাদা তো আছেই। তবে আমি আল্লাহর কসম, আনসার বংশের মহিলাদের চাইতে উত্তম কোথাও দেখিনি। তাঁরা আল্লাহর কিতাব বাস্তবায়িত করেছেন এবং যা কিছু নাযিল হতো তার প্রতি তাঁরা সাথে সাথেই ঈমান আনতেন। সূরা নূর-এর উপরিউক্ত আয়াত নাযিল হওয়ার পর তাদের পুরুষরা সে আয়াতটি তাদের কাছে পড়ে শোনালেন। প্রত্যেক ব্যক্তি তার স্ত্রী-কন্যা ও বোনকে শোনালেন। এখানে প্রত্যেক পুরুষই তাঁর নিকটাত্মীয়া মহিলাকে আল্লাহর এ হুকুম জানালেন। তখন আনসার বংশের প্রতিটি মহিলা নিজের ছবি খচিত ও চাকচিক্যপূর্ণ দোপাট্টা শক্ত করে নিজের মাথায় বেঁধে নিলেন। এভাবে তাঁরা আল্লাহর নির্দেশ বাস্তবায়িত করলেন এবং পরের দিন ফজরের নামাযে যত মহিলা শরীক হয়েছিলেন, তাঁরা সকলেই দোপাট্টা দিয়ে শক্ত করে মাথা আবৃত করেছিলেন।

আল্লাহর বিধানের প্রতি মুমিন মহিলাদের আচরণ ছিল এরূপ। তাঁরা অনতিবিলম্বে আল্লাহর হুকুম পালনে তৎপর হতেন। যা করতে নিষেধ করা হতো, পরিত্যাগ করতেন; এতে কোনরূপ দ্বিধা-সংকোচ বা ইতস্তত ভাব পর্যন্ত দেখা যেত না। এজন্যে তাঁরা অপেক্ষাও করতেন না, অনুসরণ বিলম্বিত করতেন না। একদিন বা দুইদিন বা ততোধিক সময় অতিবাহন করতেন না এই বলে যে, আচ্ছা, পরে নতুন কাপড় কিনে তদনুযায়ী পরা হবে। বরং ঠিক তখনই যে কাপড় তাদের ছিল, যে বর্ণের বা রঙের কাপড় পাওয়া গেল, তাকেই তাঁরা আল্লাহর হুকুম পালনে ব্যবহার করলেন। তেমন কাপড় পাওয়া না গেলে যে কাপড় আছে, তাই ছিঁড়ে মাথার ওপর শক্ত করে বাঁধলেন।

এ পর্যায়ে আমরা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, হালাল-হারাম শুধু জানলে বুঝলেই চলবে না। প্রকৃতপক্ষে হালাল-হারাম সুস্পষ্ট ব্যাপার- তার কোন কিছুই কোন মুসলমানের অজানা নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও বহু মুসলমানই হারামের আবর্তে পড়ে যায়। আর তার পরিণতিতে জাহান্নামের ইন্ধন হওয়ার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছে সব দেখে-শুনে ও জেনে বুঝেও।

আসলে প্রয়োজন হচ্ছে তাকওয়ার- আল্লাহর ভয় অন্তরের মধ্যে থাকা। এ তাকওয়াই হচ্ছে আল্লাহ শরীয়ত পালনের মৌলিক চালিকাশক্তি। আর আজকের ভাষায় বলতে গেলে প্রয়োজন হচ্ছে জীবন্ত মন-মানসিকতার। তা-ই মুসলিমকে হালালের সীমার মধ্যে ঠেকিয়ে রাখতে পারে এবং হারাম কাজ করা থেকে বিরত রাখতে সক্ষম। আর এ ধরনের মন-মানসিকতা কেবলমাত্র আল্লাহর ও পরকালের প্রতি ঈমানের প্রশিক্ষণ দ্বারাই হতে পারে।

তখন একদিকে যদি মুসলমান দ্বীন ও শরীয়তের সীমাসমূহ সম্পর্কে অবগতি প্রবল হয় এবং অপরদিকে জাগ্রত মান-মানসিকতা ও সীমাসমূহের পাহারাদারী করে- তা অতিক্রম করতে বা তার কাছেও পৌঁছতে না দেয়, তাহলেই তার জন্যে সামগ্রিক কল্যাণেরই দ্বার উন্মুক্ত হতে পারে। নবী করীম (স) সত্যিই বলেছেন:

আল্লাহ যখন কোন ব্যক্তির কল্যাণ চাহেন, তখন তার নিজের মধ্যেই তার জন্যে একজন উপদেশদাতা সৃষ্টি করেন। (মুসনাদে ফিরদাউস)

হে আল্লাহ! আমাদের বাঁচাও তোমার হালাল দ্বারা তোমরা হারাম থেকে, তোমার আনুগত্য দ্বারা তোমার নাফরমানী থেকে, তোমার অনুগ্রহ দ্বারা- তুমি ছাড়া অন্য সব কিছু থেকে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00