📄 ছবি ও প্রতিকৃতির অপকারিতা
ইসলাম কোন বস্তুকে কেবল এ কারণেই হারাম করেছে যে, এতে ধর্মীয় অথবা চারিত্রিক অথবা সম্পদগত ইত্যাদির যে কোন দিক থেকে ক্ষতি রয়েছে। আর প্রকৃত মুসলিম ব্যক্তি আল্লাহ ও রসূল (ﷺ)-এর আদেশকে কারণ ও হেতু না জেনেই মাথা পেতে মেনে নেয়।
ছবি ও প্রতিকৃতির বহু অপকারিতা রয়েছে তার বিশেষ দিকগুলো :
১. ধর্ম ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে: আমরা প্রত্যক্ষ করেছি যে, ছবি ও প্রতিকৃতিগুলো অনেক মানুষের 'আক্বীদাহ্ বিশ্বাস বিনষ্ট করেছে, খৃষ্টানরা ঈসা, মারইয়াম ও ক্রুসের দাসত্ব করছে, ইউরোপ ও রাশিয়ানরা স্বীয় নেতাদের প্রতিকৃতিকে পূজা করছে এবং এসবের উদ্দেশে শ্রদ্ধা জানিয়ে মাথা নত করছে। তাদের সাথে যোগ দিয়েছে কিছু মুসলিম ও 'আরব রাষ্ট্র এবং তারাও স্বীয় নেতাদের প্রতিকৃতি স্থাপন করেছে অতঃপর সূফীদের মধ্য হতে কিছু ত্বরীক্বতপন্থীরা সলাত আদায়কালে তাদের সম্মুখে স্বীয় পীর-মুরশিদদের ছবি রাখতে শুরু করে। তারা বলে, এ দিয়ে খুশু (একাগ্রতা) লাভ করা যায়।
তারা আল্লাহর যিক্র অবস্থায় আল্লাহর ধ্যান করা ও তিনি তাদেরকে দেখছেন বলে জ্ঞান করার পরিবর্তে স্বীয় পীরদের ধ্যান করে।
অথবা তাদের পীরদের সম্মানার্থে ও তাদের দ্বারা বারকাত অর্জনার্থে তাদের ছবিগুলো ঝুলিয়ে রাখে।
অন্য দিকে গায়ক ও নাট্য শিল্পীদের ভক্তরা তাদেরকে ভালবাসে ও তাদের ছবিগুলো সংগ্রহ করে ভক্তি ও ভালবাসা নিয়ে ঝুলিয়ে রাখে। এরই ফলশ্রুতিতে ১৯৬৭ সালের ইয়াহূদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের দিন এক 'আরবীয় ঘোষক সৈন্যদের সম্বোধন করে বলেছিল, ওহে সেনাদল! তোমরা সম্মুখপানে এগুতে থাক কেননা তোমাদের সাথে অমুক অমুক নাট্য শিল্পীরা রয়েছে এই বলে তাদের নামও উল্লেখ করে। অথচ উচিত ছিল এই কথা বলা যে, তোমরা সম্মুখপানে চল, আল্লাহ তাঁর সাহায্য সহায়তা ও সামর্থ নিয়ে তোমাদের সাথে আছেন।
যুদ্ধের পরিণতি ছিল পরাজয়। কেননা, আল্লাহ তা'আলা তাদের থেকে দায়িত্ব মুক্ত হয়ে গিয়েছিলেন। ফলে পুরুষ ও মহিলা কোন শিল্পীই তাদের উপকারে আসেনি বরং তারাই ছিল পরাজয়ের মূল কারণ।
আহা যদি 'আরবরা এ পরাজয় থেকে শিক্ষা গ্রহণ করত এবং আল্লাহর দিকে সাহায্যের উদ্দেশে প্রত্যাবর্তন করত।
২. যুবক ও যুবতীদের চরিত্র বিনষ্ট করার ক্ষেত্রে ছবি ও প্রতিকৃতির কুপ্রভাব সম্পর্কে যা ইচ্ছা বলতে পারেন। কারণ আপনি দেখতেই পাবেন রাস্তা-ঘাট ও ঘর-বাড়ীগুলো পুরুষ ও মহিলা শিল্পীদের ছবি দ্বারা ভরপুর হয়ে আছে। পর্দাহীন ও বস্ত্রহীন অবস্থায় তাদেরকে দেখে যুবকরা প্রেমে পড়ে যায়। ফলে প্রকাশ্য, অপ্রকাশ্য সব ধরনের পাপে তারা লিপ্ত হয়, তাদের চারিত্রিক অবক্ষয় ঘটে এবং স্বভাব বিনষ্ট হয়। এর পরে তাদের ধর্ম, অধিকৃত ভূখণ্ড, পবিত্রভূমি, সম্ভ্রম ও জিহাদ নিয়ে ভাবনা করার কোন অবকাশই থাকে না।
ছবির ব্যাপক প্রসার ঘটেছে বিশেষতঃ লোভনীয় মহিলাদের ছবিসমূহ এমনকি জুতার বাক্সেও শোভা পেতে দেখা যায়, আরো দেখা যায় ম্যাগাজিন, পত্রিকা ও বই-পুস্তক এবং টেলিভিশনে। বিশেষ করে যৌন ও পলিসি সংক্রান্ত ধারাবাহিক অনুষ্ঠানগুলোতে।
📄 ছবি কি প্রতিকৃতির বিধান রাখে
এ বিষয়ে হারাম বলতে অনেকে শুধু জাহিলী যুগে প্রচলিত প্রতিকৃতিকেই বুঝে, তারা মনে করে যে, ছবি হারামের ভিতর গণ্য নয়; এটা উদ্ভট ধারণা, তারা যেন সে সব স্পষ্ট দলীলগুলোকেই পড়েইনি যেগুলো ছবিকে হারাম সাব্যস্ত করে। দলীলগুলো দেখুন :
১. 'আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি এক খণ্ড কাপড় ক্রয় করেন যাতে ছবি ছিল। রসূল (ﷺ) যখন এটা দেখলেন তখন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং প্রবেশ করলেন না। তিনি ('আয়িশাহ্) তাঁর চেহরায় অসন্তুষ্টির ছাপ লক্ষ্য করলেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রসূল (ﷺ)! আমি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের দিকে প্রত্যাবর্তন করছি আমি কি অপরাধ করেছি বলুন? রসূল (ﷺ) বললেন: এসব ছবিধারী লোকদেরকে ক্বিয়ামাতের দিন শাস্তি দেয়া হবে এবং তাদেরকে বলা হবে: তোমরা যা সৃষ্টি করেছ তাতে জীবন দাও। অতঃপর বললেন :
إِنَّ البَيْتَ الَّذِي فِيهِ الصُّوَرُ لَا تَدْخُلُهُ المَلَائِكَةُ
অর্থ : যে ঘরে ছবি রয়েছে তাতে ফিরিশতাগণ প্রবেশ করেন না। ২০
২. রসূল (ﷺ) আরো বলেন:
أَشَدُّ النَّاسِ عَذَابًا يَوْمَ القِيَامَةِ الَّذِينَ يُضَاهُونَ بِخَلْقِ اللَّهِ
অর্থ: ক্বিয়ামাত দিবসে সবচেয়ে কঠিন শাস্তি ভোগ করবে ঐসব লোকেরা যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির সাথে সাদৃশ্য করে। ২৪
আর্ট ও ফটোগ্রাফাররা আল্লাহর সন্তুষ্টির সাথে সাদৃশ্য দানকারী।
أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ لَمَّا رَأَى الصُّوَرَ فِي البَيْتِ لَمْ يَدْخُلْ حَتَّى أَمَرَ بِهَا. فَمُحِيَتْ
৩. নাবী (ﷺ) ঘরে ছবি দেখলে যতক্ষণ তা মিটানো হ'ত ততক্ষণ তাতে প্রবেশ করতেন না। ২৫
أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ نَهَى عَنِ الصُّوَرِ فِي الْبَيْتِ وَنَهَى الرَّجُلَ أَنْ يَصْنَعَ ذَلِكَ
৪. নাবী (ﷺ) ঘরে ছবি রাখতে নিষেধ করেছেন এব কেউ ছবি উঠাক এটাও তিনি নিষেধ করেছেন। ২৬
টিকাঃ
*. সহীহুল বুখারী তাও, ২১০৫, আ.প্র. ১৯৬০, ই.ফা. ১৯৭৫।
২৪. সহীহুল বুখারী তাও. ৫৯৫৪, আ.প্র. ৫৫২২, ই.ফা. ৫৪১৭।
২৫. সহীহুল বুখারী তাও. ৩৩৫২, আ.প্র. ৩১০৪, ই.ফা. ৩১১২এ
২৬. মুসনাদ আহমাদ হাঃ ১৪৫৯৬। শায়খ নাসিরুদ্দীন আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলে মন্তব্য করেছেন।
📄 যেসব ছবি ও প্রতিকৃতিতে আপত্তি নেই
১. বৃক্ষরাজি, তারকারাজি, সূর্য-চন্দ্র, পাহাড়, পাথর, সাগর, নদী, সুন্দরতম (প্রাকৃতিক) দৃশ্যের, পবিত্র স্থানসমূহের যেমন মাসজিদুল হারাম, মাসজিদে নাবাবী, বায়তুল মাকদিস ও অন্যান্য মাসজিদসমূহ যদি মানুষ কিংবা অন্য কোন প্রাণী না থাকে তবে এ সবের ছবি ও প্রতিকৃতি তৈরী করতে অনুমতি রয়েছে। প্রমাণ ইবনু 'আব্বাস (রাঃ)-এর বাণী:
إِنْ كُنْتَ لَا بُدَّ فَاعِلًّا فَاصْنَعِ الشَّجَرَ وَمَا لَا نَفْسَ لَهُ
অর্থ : যদি একান্ত করতেই হয় তবে বৃক্ষের এবং এমন বস্তুর ছবি কর যার প্রাণ নেই। ২৭
২. পরিচয়পত্র বা ভ্রমণের পাসপোর্ট কিংবা গাড়ীর লাইসেন্স ইত্যাদি অপরিহার্য বস্তুতে স্থাপিত ছবি অনুমোদিত।
৩. হত্যা, চুরি ইত্যাদির আসামী ব্যক্তির প্রতিশোধ নেয়ার লক্ষ্যে তাদের গ্রেফতারের উদ্দেশে ছবি তোলা বা বিভিন্ন বিদ্যায় যে সব ছবি তোলার প্রয়োজন হয় তা যেমন উদাহরণস্বরূপ ডাক্তারী বিদ্যা (সেগুলোও আপত্তিহীন)।
৪. কন্যা শিশুদের জন্য কাপড়ের খণ্ড দ্বারা প্রস্তুতকৃত এমন শিশু সাদৃশ পুতুল দ্বারা খেলা করা, একে কাপড় পরানো, পরিষ্কার করা, ঘুম পাড়ানো বৈধ। আর তা এজন্য যে, সে যখন মা হবে তখন সন্তানদের প্রতিপালন করা শিখতে পারবে।
'আয়িশাহ্ (রাঃ) বলেন :
كُنْتُ أَلْعَبُ بِالْبَنَاتِ عِنْدَ النَّبِيِّ ﷺ
অর্থ : আমি নাবী (ﷺ)-এর কাছে পুতুল নিয়ে খেলা করতাম। ২৮
কিন্তু শিশুদের জন্য বৈদেশিক খেলনা ক্রয় করা বৈধ নয় বিশেষতঃ পর্দাহীন বিবস্ত্র কিশোরীদের প্রতিমূর্তি। কারণ, এ থেকে সে পর্দাহীনতা শিখবে এবং এর অনুকরণ করবে ও সমাজকে বিনষ্ট করবে সেই সাথে রয়েছে ইয়াহূদ ও ভিন্ন দেশের জন্য অর্থ ক্ষয়।
৫. ছবির মাথা কেটে ফেললে আর সমস্যা থাকে না, কেননা মাথাটাই ছবির মূল। তাই একে কেটে ফেললে তাতে আর আত্মা থাকে না এবং তা জড় পদার্থে পরিণত হয়ে যায়। জিব্রীল (আঃ) রসূল (ﷺ)-কে বলেছিলেন :
مُرْ بِرَأْسِ التِّمْثَالِ الَّذِي فِي الْبَيْتِ يُقْطَعُ فَيَصِيرُ كَهَيْئَةِ الشَّجَرَةِ وَمُرْ بِالسِّتْرِ فَلْيُقْطَعُ فَلْيُجْعَلْ مِنْهُ وِسَادَتَيْنِ مَنْبُوذَتَيْنِ توطان
অর্থ : প্রতিমূর্তির মাথা কেটে ফেলতে বল তাতে বৃক্ষের রূপধারণ করবে এবং (ছবি সম্বলিত) পর্দা কেটে দু' টুকরা করে ফেলতে আদেশ দাও যাতে পদদলিত হয়। ২৯
উল্লেখ্য যে, উক্ত পর্দায় ছবি বিদ্যমান ছিল।
وآخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين
টিকাঃ
২৭. সহীহ মুসলিম হাঃ একাঃ ৫৪৩৩-(৯৯/২১১০), ই.ফা. ৫৩৫৯, ই.সে. ৫৩৭৭।
২৮. সহীহুল বুখারী তাও, ৬১৩০, আ.প্র. ৫৬৯০, ই.ফা. ৫৫৮৭।
২৯. সুনান আবু দাউদ হাঃ ৪১৫৮। শায়খ নাসিরুদ্দীন আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলে মন্তব্য করেছেন।