📄 বিদ‘আত চেনার পদ্ধতিগত উপায়সমূহ
সকল বিদ'আহ – চাই তা কোনো কথা, কোনো কাজ বা কোনো আক্বীদাগত বিশ্বাস, যাই হোকনা কেনো – তিনটি সম্পূরক মূলনীতির আওতাভুক্ত হবে। মূলনীতিগুলো হল:
১-আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করা শরী'আহ বহির্ভূত কোনো পদ্ধতিতে।
২-দীনের বিধিমালার বিরুদ্ধাচারণ করা।
৩-বিদ'আহ পর্যন্ত উপনীতকারী মাধ্যমসমূহ।
প্রথম মূলনীতি: আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করা শরী'আহ বহির্ভূত কোনো পদ্ধতিতে
কোনো ইবাদত এর মাধ্যমে আল্লাহ নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করার ক্ষেত্রে দু’টি বিষয় লক্ষনীয়:
প্রথম বিষয়: মূল ইবাদতটা ছুহীহ শরী'আহ সম্মত দলীল দ্বারা প্রমাণিত থাকতে হবে।
দ্বিতীয় বিষয়: সংশ্লিষ্ট ইবাদতের অবকাঠামো সম্পূর্ণরূপে রসূল- ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুকরণে হতে হবে।
সুতরাং প্রথম মূলনীতির বিরোধিতা করা হবে নিম্নোক্ত ক্ষেত্রগুলোতে:
সংশ্লিষ্ট ইবাদতটাকে কোনো বিথ্যা-বানোয়াট হাদীসের দিকে সম্পৃক্ত করা অথবা যার কথা দলীল হতে পারে না এমন ব্যক্তির কথার দিকে সম্পৃক্ত করা বা ইবাদতটা সুন্নাহ বিরোধী হওয়া বা ইবাদতটি সালাফদের আমলের বিরোধী হওয়া বা ইবাদতটি শরী'আহ এর মৌলিক নীতিমালার বিরোধী হওয়া।
ক- প্রত্যেক এমন ইবাদত, যা মিথ্যা-বানোয়াট হাদীসের উপর ভিত্তিশীল, তা বিদ'আহ; কারণ, এটা এমন বিধান প্রণয়ন, যে প্রণয়নের বিষয়ে আল্লাহ তা'আলা অনুমতি দেননি।
খ- প্রত্যেক এমন ইবাদত, যা শুধুমাত্র মস্তিষ্কপ্রসূত চিন্তা ও প্রবৃত্তির চেতনার উপর ভিত্তিশীল, তা পথভ্রষ্টতামূলক বিদ'আহ। যেহেতু আল্লাহর কিতাব ও সুন্নাহ উভয়টিই আল্লাহর নিকট হতে জ্ঞানাহরণের মাধ্যম এবং আল্লাহর বিধিনিষেধ ও তার শরী'আহ চেনার একমাত্র উপায়, বিধায় প্রত্যেক এমন ইবাদত, যা কিতাব অথবা সুন্নাহ এর উপর ভিত্তিশীল নয়, তা পথভ্রষ্টতামূলক বিদ'আহ এর অন্তর্ভুক্ত।
সঠিক পথের দিশারী কোনো আলেম কখনোই বিদ'আত চালু করতে পারেন না, কিন্তু মানুষ আলেমই নয় এমন ব্যক্তির কাছে ফাতওয়া জিজ্ঞাসা করে, যার ফলে সে নিজেও পথভ্রষ্ট হয়, অন্যকে পথভ্রষ্ট করে এবং ধ্বংস করে।
আব্দুল্লাহ বিন আমর ইবনুল আছ () থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি রসূল -ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- কে বলতে শুনেছি:
«إِنَّ اللَّهَ لا يَقْبِضُ العِلْمَ انتزاعاً ينتَزِعُهُ مِنَ العِبَادِ، وَلَكِنْ يَقْبِضُ العِلْمَ بِقَبْضِ العُلَمَاءِ، حتى إذا لم يبق عالماً، اتخذ الناس رؤوساً جهالا ، فسئلوا، فَأَفتوا بغير علم، فضلوا وأضلوا» متفق عليه، أخرجه البخاري برقم (۱০০)، واللفظ له, ومسلم برقم (٢٦٧٣).
"আল্লাহ তা'আলা ইলমকে সরাসরি স্বীয় বান্দাদের থেকে ছিনিয়ে নেয়ার মত উঠিয়ে নিবেন না, বরং তিনি তা উঠিয়ে নিবেন আলেমদের উঠিয়ে নেয়ার মাধ্যমে। এমনকি যখন তিনি ভূ-পৃষ্ঠে আর কোনো আলেমই অবশিষ্ট রাখবেন না, তখন মানুষ মূর্খদেরকে সর্দার বানিয়ে ফেলবে। তাদেরকে তারা প্রশ্ন করলে তারা না জেনেই ফাতওয়া প্রদান করবে, ফলে তারা নিজেরাও পথভ্রষ্ট হবে এবং তাদেরকেও পথভ্রষ্ট করবে।" মুত্তাফাকুন আলাইহি, বুখারী হা/১০০, মুসলিম হা/২৬৭৩।
কোনো কাজ, যা পরিস্থিতির দাবী অনুযায়ী করা দরকার এবং উক্ত কাজে কোনো প্রকার বাধা-বিপত্তিও নেই, তথাপি রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা করেননি, তা করা বিদ'আহ। যেমন: জ্বালাতে প্রবেশকালে মুখে নিয়্যাত করা, দুই ঈদের আযান দেয়া এবং সাফা-মারওয়ার মাঝে সা'ঈ করার পরে দুই রাক'আত জ্বলাত আদায় করা।
রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কোনো কাজ পরিত্যাগ করা তিনটি অবস্থা থেকে মুক্ত নয়:
প্রথম অবস্থা: কোনো কাজ তিনি পরিত্যাগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কাজে পরিস্থিতির দাবি না থাকার কারণে। যেমন: যাকাত আদায়ে অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিত্যাগ করা, এমন পরিস্থিতিতে এই কাজ পরিত্যাগ করার দ্বারা সংশ্লিষ্ট পরিত্যাগ সুন্নাহ হতে পারে না।
দ্বিতীয় অবস্থা: তিনি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিস্থিতির দাবি সত্ত্বেও কোনো কাজ পরিত্যাগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কাজ সম্পাদনের ক্ষেত্রে কোনো বাধা-বিপত্তি বিদ্যমান থাকার কারণে। যেমন: রমাদ্বান মাসে রসূল-ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- জামা'আতের সাথে ক্বীয়ামুল লাইল পরিত্যাগ করেছেন - ক্বীয়امুল লাইল জামা'আতের সাথে আদায় করা মুসলিম উম্মাহর উপর ওয়াজিব হয়ে গেলে তারা এটা পালনে অক্ষম হয়ে যাবে এই ভয়ে। এই পরিত্যাগ সুন্নাহ হতে পারে না। অতঃপর তার মৃত্যুর দ্বারা যখন উক্ত বিপত্তি দূর হয়ে যায়, তখন তা বৈধ হয়ে যায়।
গেল, তখন তার ছেড়ে দেয়া কাজটি সাধন করাই শরী'আহ সম্মত হয়ে গেল এবং তার সুন্নাহকে কার্যকরীভাবে প্রতিষ্ঠিত করা হল। যেমনটি উমার (রাঃ) এক ইমামের অধীনে মানুষদেরকে একত্রিত করেছেন তারাবীহ এর জ্বালাতে।
তৃতীয় অবস্থা: কোনো কাজ তিনি পরিত্যাগ করেছেন পরিস্থিতির দাবি ও সংশ্লিষ্ট কাজের ব্যাপারে কোনো বাধা-বিপত্তি না থাকা সত্ত্বেও। এমন পরিত্যাগ সুন্নাহের অন্তর্ভুক্ত। যেমন: পাঁচ ওয়াক্ত ছুলাত ব্যতীত আন্যান্য ছুলাত যেমন, তারাবীহ ও দুই ঈদের ছুলাত ইত্যাদি ছুলাতগুলোতে আযান না দেয়া।
প্রতিটি ইবাদত, যা সালাফরা পরিস্থিতির দাবি থাকা ও কোনোপ্রকার বিপত্তি না থাকা সত্ত্বেও - ছেড়ে দিয়েছেন, এমন ইবাদত করা বিদ'আহ এর অন্তর্ভুক্ত। যেমন: জ্বলাত আল-রাগায়িব, নবীর জন্মদিবস, হিজরী বর্ষবরণ ও ইসরা-মে'রাজের রাত্রি কেন্দ্রিক অনুষ্ঠানের আয়োজন।
সুতরাং যেসকল ইবাদত - রসূল - ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিত্যাগ করেছেন, যদি সাহাবাগণও তার মৃত্যুর পর সংশ্লিষ্ট ইবাদতগুলো পরিত্যাগ করে থাকেন, তবে এমন পরিত্যাগ অবশ্যই অকাট্য প্রমাণরূপে সাব্যস্ত করবে যে, সংশ্লিষ্ট ইবাদতগুলো নিঃসন্দেহে বিদ'আহ। আর যদি তার মৃত্যুর পর সাহাবাগণ সংশ্লিষ্ট ইবাদতগুলো করে থাকেন, তবে আমরা বুঝব যে, তিনি উক্ত ইবাদতগুলো পরিত্যাগ করেছেন বিশেষ কোনো বিপত্তির কারণে। যেমন, তারাবীহ এর ছুলাত, যা তিনি জামা'আতের সাথে আদায় করা পরিত্যাগ করেছেন উম্মাহর উপর উক্ত ছুলাত ফরয হয়ে যাওয়ার ভয়ে। বিধায় এমন প্রতিটি ইবাদত, যা রসূল - ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর সাহাবাগণ পালন করেননি, তা পালন করা জায়েয হবে না। আর এমন প্রত্যেকটি ইবাদত, যা রসূল - ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও উম্মাহর পূর্বসূরীগণ সম্মিলিতভাবে পরিত্যাগ করেছেন, তা নিঃসন্দেহে পথভ্রষ্টতামূলক বিদ'আহ।
প্রত্যেক এমন ইবাদত, যা শরী'আহ এর মৌলিক নীতিমালা ও উদ্দ্যেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তবে এটা নিঃসন্দেহে বিদ'আহ। যেমন: ছুলাত আর-রাগায়িব।’ কারণ, নফল ছুলাতগুলো মূলত মাসজিদে আদায় করার চেয়ে ঘরে
আদায় করাটাই অধিক উত্তম। আর এই জ্বলাতগুলো জামা'আতের সাথে আদায় করার চেয়ে একাকী আদায় করাটাই অধিক উত্তম, তবে যেটাকে শরী'আহ এগুলো থেকে ভিন্ন করেছে সেটার কথা ভিন্ন। যেমন: ছলাত আত-তারাবীহ। এমনিভাবে নফল ছলাত যেমন, দুই ঈদের জ্বলাত ও বৃষ্টি প্রার্থনার জ্বলাত ইত্যাদি জ্বলাতগুলোর আযানের জন্যেও একই বিধান প্রযোজ্য। কেননা, আযান ধার্য করা হয়েছে ফরয জ্বলাতগুলোর জন্য, নফলের জন্য নয়। প্রত্যেক এমন অভ্যাস বা লেনদেন মূলক কার্যক্রম, যার দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের আশা করা হয়, কিন্তু আল্লাহ তা'আলা ও তার রসূল-ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-তার কোনো বিধানগত সম্মতি প্রদান করেননি, তাই বিদ'আহ বলে বিবেচিত হবে। যেমন: সর্বদা চুপ করে থাকা বা সূর্যের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অথবা পশম ও তালি লাগানো পোশাক পরিধান করা ইবাদত হিসেবে বা ত্বরীক্বা হিসেবে। অথবা নিজেকে পানাহার, সহবাস ইত্যাদি থেকে বঞ্চিত রাখা।
১- আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (র) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: بَيْنَا النَّبِيُّ - صلى الله عليه وسلم - يَخْطُبُ إِذَا هُوَ بِرَجُلٍ قَائِمٍ، فَسَأَلَ عَنْهُ ۚ فَقَالُوا: أَبُو إِسْرَائِيلَ، نَذَرَ أَنْ يَقُومَ وَلَا يَقْعُدَ، وَلَا يَسْتَظِلَّ، وَلَا يَتَكَلَّمَ، وَيَصُومَ، فَقَالَ النَّبِيُّ - صلى الله عليه وسلم -: «مره فليتكلم وليستظل وليقعد وليتم صومه» أخرجه البخاري برقم .(٦٧٠٤)
"একদা রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মামাদিগকে উপদেশ দিচ্ছিলেন, এমন সময় এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে গেল। তখন তিনি তাদেরকে তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তারা উত্তরে বললেন, সে আবূ ইসরাঈল, সে এই মর্মে মান্নত করেছে যে, সে সর্বদা দাঁড়িয়ে থাকবে, বসবে না, কোনো ছায়ার নিচে আশ্রয় নিবে না, কোনো কথা বলবে না, তবে শুধুমাত্র ছুওম পালন করবে। তখন নাবী হুল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে যেন কথা বলে, ছায়ার নিচে আশ্রয় নেয়, বসে এবং তার ছুওম পূর্ণ করে।" (ছহীহ বুখারী, ৬৭০৪)
২-আনাস বিন মালেক (র) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
جَاءَ ثَلَاثَةُ رَهْطٍ إِلَى بُيُوتِ أَزْوَاجِ النَّبي - صلى الله عليه وسلم -، يَسْأَلُونَ عَنْ عِبَادَةِ النبي - صلى الله عليه وسلم - ، فَلَمَّا أُخبِرُوا كَأَنَّهُمْ تَقَالُوهَا، فَقَالُوا: وَأَيْنَ نَحْنُ مِنَ النبي - صلى الله عليه وسلم - ؟ قَدْ غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ وَمَا تَأَخَّرَ، قَالَ أَحَدُهُمْ: أَمَّا أَنَا فَإِنِّي أُصَلِّي اللَّيْلَ أَبَداً، وَقَالَ آخَرُ: أَنَا أَصُومُ الدَّهْرَ وَلَا أُفْطِرُ، وَقَالَ آخَرُ: أَنَا أَعْتَزِلُ النِّسَاءَ فَلَا أَتَزَوَّجُ أَبَداً، فَجَاءَ رَسُولُ الله - صلى الله عليه وسلم - فَقَالَ: «أَنْتُمُ الَّذِينَ قُلْتُمْ كَذَا وَكَذَا؟ أَمَا وَاللهُ إِنِّي لأَخْشَاكُمْ اللهُ وَأَتْقَاكُمْ لَهُ، لَكُنِّي أَصُومُ وَأَفْطُرُ، وأُصَلِّي وَأَرْقُدُ، وَأَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ، فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ منِّي» متفق عليه، أخرجه البخاري برقم (٥٠٦٣), واللفظ له، ومسلم برقم (١٤٠١).
“তিনজন ব্যক্তি আল্লাহর রসূলের স্ত্রীগণের ঘরের নিকট এসে রসূল - ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম - এর ইবাদত সম্পর্কে তাদেরকে প্রশ্ন করলেন, যখন তাদেরকে তার ইবাদত সম্পর্কে জানানো হল, তারা এমন ইবাদতকে অনেক অল্প মনে করল, তারা বলল: নাবী কারীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম - এর মর্তবা কত উর্ধ্বে আমাদের মর্তবা কত নিম্নে? তার পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। তাদের একজন বলল: আমি সারারাত ছুলাত আদায় করি। অপরজন বলল: আমি যুগ যুগ ধরে ছুওম পালন করে আসছি বিরতিহীনভাবে। অপর একজন বলল: আমি মহিলাদের সঙ্গ পরিত্যাগ করেছি, তাই আর কখনোই বিবাহ করব না। তখন রসূল - ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- আসলেন এবং বললেন: তোমরা এমন এমন কথা বলছ? তাহলে শুন, আল্লাহর শপথ! আমি তোমাদের মধ্যে আল্লাহকে সর্বাধিক বেশী ভয় করি এবং আমিই আল্লাহকে সর্বাপেক্ষা মান্যকারী, কিন্তু আমি ছুওম পালন করি আবার দিবসে পানাহারও করি। ছুলাত আদায় করি আবার নিদ্রা গ্রহণ করি এবং বিবাহ করি। যে আমার সুন্নাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল, সে আমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।” (মুত্তাফাকুন আলাইহি) ছুহীহ বুখারী, ৫০৬৩ ছুহীহ মুসলিম, ১৪০১
* এমন প্রত্যেক কাজ, যা আল্লাহ ও তার রসূলের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ছুওয়াবের আশায় পালন করা হয়, তাই বিদ'আত।
যেমন: কেউ কাফেরদের সাদৃশ্যকরণের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের আশা করল। অথবা গান-বাজনা নৃত্যগীত শুনে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের আশা করল। আর এটা হল- ইবাদতের সত্তাগত দিক থেকেও বিদ'আহ, আবার
বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকেও বিদ'আহ। বিধায় এটা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করা এমন বিধান দ্বারা, যা আল্লাহ তা'আলা শুধুমাত্র শরী'আহ সম্মত করেননি তাই নয়, বরং তা নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন। এটা হল- আল্লাহর শত্রুদের সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করে দীনের নিয়মানুবর্তিতা থেকে বেরিয়ে যাওয়া। আর যখন এমন কাজ বিজ্ঞ আলেমগণ ও দীনদাররাও করতে শুরু করেন, তখন এটা- দীনের অংশ - এমন আক্বীদাগত বিশ্বাসের পন্থাও উন্মুক্ত করে দেয়। এগুলোই হল বিদ'আহ এর ভিত্তিমূল।
* প্রত্যেক এমন ইবাদত, যা শরীয়তে নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে বিধিসম্মত করা হয়েছে, এমন ইবাদত পালনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন সাধন করাও বিদ'আহ বলে বিবেচিত হবে।
বিধায় প্রতিটি ইবাদতেরই নির্দিষ্ট কাল, নির্ধারিত স্থান, নির্দিষ্ট শ্রেণী, নিদিষ্ট পরিমাণ ও বিশেষ অবস্থা আছে। নিদিষ্ট কাল যেমন, রমযান মাসের তারাবীহের ছুলাত, যা অন্য মাসে আদায় করা বিদ'আহ। নির্দিষ্ট স্থান যেমন, মাসজিদে ই'তিকাফ করা, যা মাসজিদ ব্যতীত অন্য কোথাও করা বিদ'আহ। নির্দিষ্ট শ্রেণী যেমন, চতুষ্পদ জন্তু দ্বারা কুরবানী করা, যে কুরবানী অন্যকোনো পশু দ্বারা করা বিদ'আহ। নির্দিষ্ট পরিমাণ যেমন, ফরয ছুলাতগুলো দিনে পাঁচবার আদায় করা, যেখানে অতিরিক্ত ছয়বার কোনো ছুলাত(ফরয মনে করে) আদায় করা বিদ'আহ। বিশেষ অবস্থা যেমন, ধারাবাহিকতা বজায় রেখে শরীয়তসম্মত পদ্ধতিতে ওযু করা, যেখানে দুই পা ধৌত করে ওযু শুরু করা অতঃপর দুই হাত ধৌত করা বিদ'আহ।
* প্রত্যেক সাধারণ ইবাদত, যা শরীয়তে সাধারণ কোনো দলীল দ্বারা সাব্যস্ত হয়েছে, সেটাকে কোনো কাল, স্থান অথবা এ জাতীয় কোনো বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সীমাবদ্ধ করে দেয়া বিদ'আহ।
এর দৃষ্টান্ত হল- নফল ছুলাত, নফল ছিয়াম ও এ জাতীয় অন্যান্য ইবাদত। বিধায় ছুওম হল- সামগ্রিকভাবে একটি মুস্তাহাব ইবাদত, যেটাকে শরীয়ত নির্দিষ্ট কোনো সময়ের সঙ্গে সীমাবদ্ধ করে দেয়নি। সুতরাং মানুষ যখন এটাকে নিদিষ্ট কোনো দিবসের সাথে সীমাবদ্ধ করে দিবে যেমন, বুধবার অথবা মাসের নির্দিষ্ট কতগুলো তারিখের সাথে যেমন, পাঁচ বা দশ তারিখ, অথবা মর্যাদাপূর্ণ দিবসগুলোর সাথে এমন কোনো ইবাদতকে ধার্য করে দেয়া, যেই ইবাদতকে উক্ত দিবসগুলোর সাথে ধার্য করা হয়নি। যেমন, এই এই দিবসকে ছদক্বা করা বা আহার করা অথবা দ্বীয়াম পালন করার সাথে ধার্য করে দেয়া। আর এই এই
রাত্রিকে বিশেষ বিশেষ ইবাদতের সাথে ধার্য করে দেয়া যেমন, শা'বান মাসের মধ্যতম রজনীকে ছুলাত আদায় ও কুরআন তিলাওয়াত ইত্যাদি জাতীয় ইবাদতের সাথে ধার্য করা। এই জাতীয় সর্বপ্রকার ইবাদত পথভ্রষ্টতামূলক বিদ'আহ।
টিকাঃ
১. ছলাত আল-রাগায়িব এর ব্যাখ্যা: দুলাত আর-রাগায়িব হল রজব মাসের প্রথম শুক্রবারের রাত্রিতে যেই ছলাত আদায় করা হয়, সেটাই ছলাত আল-রাগায়িব। ৪৮০ হিজরীতে এই ছুলাত সর্বপ্রথম বায়তুল মুকাদ্দাসে প্রবর্তন করা হয়। এর পূর্বে ইতিহাসে এমন কোনো ছুলাতের কথা জানা যায়নি। আর শা'বান মাসের পনেরো তারীখের রাত্রির ছলাতকেও ছুলাত আল-রাগায়িব বলা হয়, যা ৪৪৮ হিজরীতে প্রবর্তন করা হয়। আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা'আহ এর আলেমগণের নিকট এই রাত্রির দুলাতের ফযীলতের ব্যাপারে কোনো ছুহীহ বা হাসান হাদীসের অস্তিত্ব নেই। এই বিষয়ে বর্ণিত যাবতীয় হাদীসগুলো দুর্বল অথবা জাল। আর এই জ্বলাত সাধারণত: মাগরিব আর ঈশার জ্বলাতের মধ্যবর্তী সময়ে আদায় করা হয়। এই দুলাতের বিধান: এই ছলাত সম্পূর্ণ বিদ'আহ ও ইসলাম পরিপন্থি।
📄 ইবাদতের বিষয়ে বাড়াবাড়ি করার বিধান
ইবাদত করার ক্ষেত্রে শরী'আহ বহির্ভূত অতিরিক্ত ইবাদত করার মাধ্যমে বাড়াবাড়ি করা। যেমন: ধারাবাহিক সারারাত্রি যাবৎ ক্বীয়ামুল লাইল আদায় করা বা সারা জীবন ধরে ছিয়াম পালন করা বা স্ত্রী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এবং সহবাস পরিত্যাগ করে এবং হজ্বে মীনায় উপস্থিত হয়ে কংকর নিক্ষেপের ক্ষেত্রে (ছোট পাথর বাদ দিয়ে) বড় পাথরগুলো ব্যবহার করা আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য অর্জনের চেষ্টায়। গোসল ও ওযুর মধ্যে ওয়াসওয়াসা বা সন্দেহে গুরুত্ব দেয়া এবং ওযু, গোসল ও পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রে কঠোরতা ও বাড়াবাড়ি করা।
দীনের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি দু’টি দরজা দিয়ে প্রবেশ করে:
প্রথমটি হল- ইবাদতের দরজা (باب العبادات)। এই ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করা হয় ওয়াজিব নয় এবং মুস্তাহাবও নয় এমন বিধানকে ওয়াজিব ও মুস্তাহাবের স্তরে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে। যেমন, যুগ যুগ ধরে বিরতিহীন ছুওম পালন করা ও সারারাত্রি যাবৎ ক্বীয়ামুল লাইল আদায় করা।
দ্বিতীয়টি হল- মু'আমালাত-লেনদেন এর দরজা (باب المعاملات)। যেখানে হারামও নয় মাকরূহও নয় এমন বস্তুকে হারাম ও মাকরূহের স্তরে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে। যেমন, আয়-উপার্জন, বিবাহ ও হালাল খাদ্য পরিত্যাগ করা।
📄 বিদ‘আত এর বিধান
দ্বীনের মধ্যে নব্যসৃষ্ট প্রতিটি বস্তুই বিদ‘আহ, আর প্রতিটি বিদ‘আহ পথভ্রষ্টতা হারাম এবং বিবর্জিত, আর প্রতিটি পথভ্রষ্টতাই জাহান্নামের আগুনে প্রবেশ করবে। বিদ‘আহ এর নিষিদ্ধতা বিদ‘আহ এর স্তরভেদে বিভিন্ন রকম হতে পারে। এমনও বিদ‘আহ আছে যা, স্পষ্ট কুফর। যেমন, কবরের চতুর্দিকে ত্বাওয়াফ করা, তাদের কাছে প্রার্থনা করা, তাদের নিকট ফরিয়াদ করা এবং তাদের জন্য জবেহকৃত পশু ও মান্নতের জন্য ধার্য কৃত সম্পদ তাদের নিকট পেশ করা।
আবার কিছু বিদ‘আহ এমনও আছে, যেগুলো শিরকের মাধ্যমরূপে কাজ করে। যেমন, কবরের উপরের সংযুক্ত স্থানটি পাকা করা, সেখানে ছলাত আদায় করা এবং সেখানে বসে সংশ্লিষ্ট কবরবাসীদের ওয়াসীলা দিয়ে আল্লাহকে ডাকা। আবার কিছু বিদ‘আহ এমনও আছে, যেগুলো আক্বীদাগত বিশ্বাসে অন্যায় ও অনাচারের জন্ম দেয়। যেমন, শর‘য়ী দলীল-প্রমাণের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিদ‘আহসমূহ। আবার কিছু বিদ‘আহ এমনও আছে, যেগুলো সাধারণ অপরাধের ন্যায়। যেমন, চির কুমার হয়ে থাকা, সূর্যের আলোতে দাঁড়িয়ে দ্বীয়াম পালন করা এবং সঙ্গমের চাহিদা নষ্ট করে ফেলার উদ্দ্যেশ্যে যৌনাঙ্গ কর্তন করা।
আলেমগণের উপর ওয়াজিব হল- স্পষ্টরূপে সুন্নাহ এর বর্ণনা দেয়া, যাতে বিদ‘আহ দূরীভূত হয় এবং বিদ‘আহ ও বিদ‘আহ এর সাথে সংযুক্ত ব্যক্তিদের থেকে মানুষকে সাবধান করা; যাতে করে মানুষ তাদের দ্বারা ধোকায় পতিত না হয়।
আর মুসলিম রাষ্ট্রনায়কদের উপর ওয়াজিব হল- বিদ‘আহকে বাধা দেয়া, এর সাথে সংযুক্ত ব্যক্তিদের হস্ত বেধে রাখা এবং তাদেরকে অনিষ্ট সাধন করা থেকে বিরত রাখা; যাতে করে তারা দীনের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সুযোগ না পায় এবং সুন্নাহ-এর বিনাশ করতে না পারে।
(১) আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَمَنْ يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا (١١٥)} [النساء : ١١٥].
"যে কেউ রসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে, তার কাছে সরল পথ প্রকাশিত হওয়ার পর এবং সব মুসলমানের অনুসৃত পথের বিরুদ্ধে চলে, আমি তাকে ঐ দিকেই ফেরাব যে দিক সে অবলম্বন করেছে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। আর তা নিকৃষ্টতর গন্তব্যস্থান।” [আন নিসা: আয়াত নং ১১৫]
(২) আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{فَإِنْ لَمْ يَسْتَجِيبُوا لَكَ فَاعْلَمْ أَنَّمَا يَتَّبِعُونَ أَهْوَاءَهُمْ وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنِ اتَّبَعَ هَوَاهُ بِغَيْرِ هُدًى مِنَ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ (٥٠)} [القصص : ٥٠] .
"অতঃপর তারা যদি আপনার কথায় সাড়া না দেয়, তবে জানবেন, তারা শুধু নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে। আল্লাহর হেদায়েতের পরিবর্তে যে ব্যক্তি নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, তার চাইতে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে? নিশ্চয় আল্লাহ জালেম সম্প্রদায়কে পথ দেখান না।” [আল কাসাস: আয়াত নং ৫০]
(৩) আয়েশা () থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ فِيهِ فَهُوَ رَدُّ متفق عليه، أخرجه البخاري برقم (٢٦٩٧), ومسلم برقم (۱۷۱۸).
"আমাদের দীনের অংশ নয় এমন কোনো বিষয় যে আমাদের এই দীনের মধ্যে নতুনভাবে অন্তর্ভুক্ত করল, তার উক্ত কমটি সম্পূর্ণরূপে পরিত্যক্ত।” (মুত্তাফাকুন আলাইহি) ছুহীহ বুখারী, ২৬৯৭ ছুহীহ মুসলিম, ১৭১৮।