📄 নিফাক্বেন পরিণাম
নিফাক্ব হল- কুফর এর চেয়েও মারাত্মক ও ভয়াবহ। মুনাফিক্ব ব্যক্তি জাহান্নামের সর্বনিম্নস্তরে অবস্থান করবে। কারণ, ইসলাম ও মুসলিম জাতি তাদের দ্বারা ব্যাপক বিপদাপদ ও কঠিন দুর্দশার শিকার হয়ে থাকে।
১-আল্লাহ তা'আলা বলেন:
{إِذَا جَاءَكَ الْمُنَافِقُونَ قَالُوا نَشْهَدُ إِنَّكَ لَرَسُولُ الله وَاللهُ يَعْلَمُ إِنَّكَ لَرَسُولُهُ وَاللَّهُ يَشْهَدُ إِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَكَاذِبُونَ (۱) اتَّخَذُوا أَيْمَانَهُمْ جُنَّةً فَصَدُّوا عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ إِنَّهُمْ سَاءَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ (٢) ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ آمَنُوا ثُمَّ كَفَرُوا فَطُبِعَ عَلَى قُلُوبِهِمْ فَهُمْ لَا يَفْقَهُونَ (۳)} [المنافقون: ١ - ٣] .
"যখন মুনাফেক্বরা আপনার কাছে আসে এবং বলে, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর রসূল। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা জানেন, আপনি তাঁর রসূল এবং
আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, মুনাফেক্বরা মিথ্যাবাদী। তারা তাদের সাক্ষ্য-শপথসমূহকে ঢালরূপে ব্যবহার করে। অতঃপর আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বাধা দেয়। তারা যা করছে, তা খুবই জঘন্য কাজ।” (সূরা আল মুনাফিকূন: ১-৩)
২-আল্লাহ তা'আলা বলেন: إِنَّ الْمُنَافِقِينَ فِي الدَّرْكِ الْأَسْفَلِ مِنَ النَّارِ وَلَنْ تَجِدَ لَهُمْ نَصِيرًا (١٤٥)} [النساء: ١٤٥].
"নিশ্চয় মুনাফেক্বরা জাহান্নামের সর্বনিম্নস্তরে অবস্থান করবে এবং আপনি তাদের পক্ষে কোনো সাহায্যকারী খুজে পাবেন না।” (সূরা আন নিসা: ১৪৫)
৩-আল্লাহ তা'আলা বলেন: الْمُنَافِقُونَ وَالْمُنَافِقَاتُ بَعْضُهُمْ مِنْ بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمُنْكَرِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمَعْرُوفِ وَيَقْبِضُونَ أَيْدِيَهُمْ نَسُوا اللَّهَ فَنَسِيَهُمْ إِنَّ الْمُنَافِقِينَ هُمُ الْفَاسِقُونَ (٦٧)} [التوبة: ٦٧].
"মুনাফেক নর-নারী একে অপরের সংযুক্ত অঙ্গের ন্যায়, তারা সকলেই খারাপ কাজের আদেশ দেয়, অসৎ কাজে নিষেধ করে এবং নিজের হাত গুটিয়ে রাখে। তারা আল্লাহকে ভুলে যাওয়ায় আল্লাহও তাদেরকে ভুলে গেছেন। মুনাফেক্বরা প্রত্যেকেই ফাসেক-নাফরমান।” (সূরা আত তাওবা: ৬৭)
📄 নিফাক্বেন প্রকারসমূহ
নিফাক্ব দুই প্রকার: প্রথম প্রকার: নিফাক্ব আল-আকবার (النفاق الأكبر)
নিফাক্ব আল-আকবার বা বড় নিফাক্ব হল- বাহ্যিকভাবে নিজেকে মুসলিম জাহির করা আর অন্তরে কুফর লালন করা। এটাকে বলা হয় নিফাক্ব আল-ই'তিক্বাদী (النفاق الاعتقادي) বা বিশ্বাসমূলক নিফাক্ব। এটা সেই নিফাক্ব, যা রাসুলুল্লাহ-হুল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে বিদ্যমান ছিল, যেই নিফাকের ধারক-বাহকদের সমালোচনা ও কাফের ঘোষণা দিয়ে কুরআনের আয়াত নাযিল হয়েছে। কুরআন তাদের ব্যাপারে আরো সংবাদ দিয়েছে যে, তারা জাহান্নামের সর্বনিম্নস্তরে অবস্থান করবে। কেননা, তারা ইসলাম থেকে বের হয়ে গিয়েছে।
আল্লাহ তা'আলা এই নিফাক্বের ধারক-বাহকদেরকে শিরকের যে সকল বিশেষণে বিশেষায়িত করেছেন:
مِنَ الْكُفْرِ بِاللَّهِ .. وَعَدَمِ الإِيمَانِ .. وَالاسْتِهْزَاءُ بِالدِّينِ وَأَهْلِهِ .. وَالسُّخْرِيَةُ بِهِمْ .. وَالصَّدُّ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ .. وَعَدَاوَةُ الْمُؤْمِنِينَ .. وَالْكَيْدُ لَهُمْ .. وَتَفْرِيقُ صُفُوفِهِمْ .. وَتَمْزِيقُ وَحْدَتِهِمْ.
আল্লাহর সাথে কুফর করা, অবিশ্বাস করা, দীন ও দীনের অনুসারীদের তুচ্ছ জ্ঞান করা, তাদের সাথে ঠাট্টা করা, আল্লাহ তা'আলার রাস্তায় চলতে বাধা প্রদান করা, মুমিনদের সাথে শত্রুতা পোষণ করা, তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা, তাদের সারিবদ্ধতাকে বিচ্ছিন্ন করা এবং তাদের ঐক্যে ফাটল সৃষ্টি করা।
১-আল্লাহ তা'আলা বলেন:
{إِذَا جَاءَكَ الْمُنَافِقُونَ قَالُوا نَشْهَدُ إِنَّكَ لَرَسُولُ اللَّهِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ إِنَّكَ لَرَسُولُهُ وَاللَّهُ يَشْهَدُ إِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَكَاذِبُونَ (۱) اتَّخَذُوا أَيْمَانَهُمْ جُنَّةً فَصَدُّوا عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ إِنَّهُمْ سَاءَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ (٢) ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ آمَنُوا ثُمَّ كَفَرُوا فَطُبِعَ عَلَى قُلُوبِهِمْ فَهُمْ لَا يَفْقَهُونَ (۳)} [المنافقون: ١ - ٣].
"যখন মুনাফেক্বরা আপনার কাছে আসে এবং বলে, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর রসূল। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা জানেন, আপনি তাঁর রসূল এবং আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, মুনাফেক্বরা মিথ্যাবাদী। তারা তাদের সাক্ষ্য-শপথসমূহকে ঢালরূপে ব্যবহার করে। অতঃপর আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বাধা দেয়। তারা যা করছে, তা খুবই জঘন্য কাজ।” (সূরা আল মুনাফিকূন: ১-৩)
২-আল্লাহ তা'আলা বলেন:
{وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ (٦٥) لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ إِنْ نَعْفُ عَنْ طَائِفَةٍ مِنْكُمْ نُعَذِّبْ طَائِفَةً بِأَنَّهُمْ كَانُوا مُجْرِمِينَ (٦٦)} [التوبة: ٦٥ - ٦٦] .
"আর যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন, তবে তারা বলবে, আমরা তো কথার কথা বলছিলাম আর ঠাট্টা-কৌতুক করছিলাম। আপনি বলুন, তোমরা কি আল্লাহর সাথে, তাঁর আয়াতসমূহের সাথে এবং তাঁর রসূলের সাথে ঠাট্টা করছ? তোমরা ছলনা করো না, তোমরা ঈমান আনার পর কাফের হয়ে গেছ। তোমাদের
কিছু লোককে আমি ক্ষমা করে দিলেও কিছু লোককে অবশ্যই শাস্তি দিব। কারণ, তারা প্রকৃতপক্ষেই অপরাধী।” (সূরা আত তাওবা: ৬৫-৬৬)
নিফাক্ব আল-আকবার-এর প্রকারসমূহ: নিফাক্ব আল-ই'তিক্বাদী আট প্রকার:
১- রসূল-ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে মিথ্যা ঘোষণা করা。
২- রসূল-ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আনিত আংশিক দীনকে মিথ্যা বলা বা অস্বীকার করা。
৩- রসূল-ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি রাগ পোষণ করা。
৪- রসূল-ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আনিত আংশিক দীনের প্রতি বিরক্তি পোষণ করা。
৫- রসূল-ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দীনের বিজয় দেখে নাখোশ হওয়া。
৬- রসূল-ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দীনের অবনতি দেখে খুশী হওয়া。
৭- রসূল-ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দেয়া সংবাদকে সত্যায়ন করা ওয়াজিব এই বিশ্বাস না রাখা。
৮- রসূল-ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদেশের আনুগত্য করা ওয়াজিব এই বিশ্বাস না রাখা。
উপরোক্ত বিষয়গুলোসহ আরো যেসকল বিষয়ে কুরআন ও সুন্নাহ প্রমাণ করে যে, বিষয়টি নিফাক্ব আল-আকবার এর অন্তর্ভুক্ত যা ইসলাম থেকে বহিষ্কারকারী। যার ধারক আল্লাহ ও তার রাসূলের শত্রু ছাড়া কিছুই নয়。
উপরোক্ত আট প্রকার সহ আরো যতপ্রকার কুরআন ও সুন্নাহে বিবৃত হয়েছে - এগুলোর ধারক-বাহকগণ - জাহান্নামের সবনিম্নস্তরে অবস্থান করবে。
-কুরআনে বর্ণিত মুনাফিক্বদের বৈশিষ্ট্যসমূহ:
১-আল্লাহ তা'আলা বলেন:
{الْمُنَافِقُونَ وَالْمُنَافِقَاتُ بَعْضُهُمْ مِنْ بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمُنْكَرِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمَعْرُوفِ وَيَقْبِضُونَ أَيْدِيَهُمْ نَسُوا اللَّهَ فَنَسِيَهُمْ إِنَّ الْمُنَافِقِينَ هُمُ الْفَاسِقُونَ (٦٧)} [التوبة: ٦٧] .
"মুনাফেক নর-নারী একে অপরের সংযুক্ত অঙ্গের ন্যায়, তারা সকলেই খারাপ কাজের আদেশ দেয়, অসৎ কাজে নিষেধ করে এবং নিজের হাত গুটিয়ে রাখে। তারা আল্লাহকে ভুলে যাওয়ায় আল্লাহও তাদেরকে ভুলে গেছেন। মুনাফেক্বরা প্রত্যেকেই নাফরমান।” (সূরা আত তাওবা: ৬৭)
২-আল্লাহ তা'আলা বলেন:
{وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ آمِنُوا كَمَا آمَنَ النَّاسُ قَالُوا أَنُؤْمِنُ كَمَا آمَنَ السُّفَهَاءُ أَلَا إِنَّهُمْ هُمُ السُّفَهَاءُ وَلَكِنْ لَا يَعْلَمُونَ (۱۳) وَإِذَا لَقُوا الَّذِينَ آمَنُوا قَالُوا آمَنَّا وَإِذَا خَلَوْا إِلَى شَيَاطِينِهِمْ قَالُوا إِنَّا مَعَكُمْ إِنَّمَا نَحْنُ مُسْتَهْزِئُونَ (١٤) اللهُ يَسْتَهْزِئُ بِهِمْ وَيَمُدُّهُمْ فِي طُغْيَانِهِمْ يَعْمَهُونَ (١٥)} [البقرة: ١٣ - ١٥].
"আর যখন তাদেরকে বলা হয়, তোমরা ঈমান আনয়ন কর, মানুষ যেভাবে ঈমান আনয়ন করেছে, তারা বলে মূর্খদের ন্যায় ঈমান আনয়ন করব। জেনে রাখ, নিঃসন্দেহে তারাই মূর্খ, কিন্তু তারা তা জানে না। যখন তারা ইমানদারদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে, তারা বলে আমরা ঈমান আনয়ন করেছি। আর যখন তাদের শয়তানদের সঙ্গে নিরালায় মিলিত হয়, তাদেরকে বলে আমরা তোমাদের সাথে আছি, তাদের সঙ্গে তো আমরা শুধু ঠাট্টা-বিদ্রূপ করছিলাম। বরঙ আল্লাহই তাদের সঙ্গে উপহাস করেন। আর তাদেরকে তিনি তাদের সীমালঙ্ঘন ও অবাধ্যতার ময়দানে ছেড়ে দিয়েছেন, যেখানে তারা দিশেহারা হয়ে ঘুরপাক খেতে থাকবে।” (সূরা আল বাক্বারাহ: ১৩-১৫)
৩-আল্লাহ তা'আলা বলেন:
{اتَّخَذُوا أَيْمَانَهُمْ جُنَّةً فَصَدُّوا عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ إِنَّهُمْ سَاءَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ (٢)} [المنافقون: ٢].
"তারা তাদের সাক্ষ্য-শপথসমূহকে ঢালরূপে ব্যবহার করে। অতঃপর আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বাধা দেয়। তারা যা করছে, তা খুবই জঘন্য কাজ।” (সূরা আল মুনাফিকূন: ২)
৪-আল্লাহ তা'আলা বলেন: {وَإِذَا رَأَيْتَهُمْ تُعْجِبُكَ أَجْسَامُهُمْ وَإِنْ يَقُولُوا تَسْمَعْ لِقَولُهُمْ كَأَنَّهُمْ خُشُبٌ مُسَنَّدَةٌ يَحْسَبُونَ كُلَّ صَيْحَة عَلَيْهِمْ هُمُ الْعَدُو فَاحْذَرْهُمْ قَاتَلَهُمُ اللَّهُ أَنَّى يُؤْفَكُونَ (٤)} [المنافقون: ٤] .
"আপনি যখন তাদেরকে লক্ষ করবেন, তাদের শারিরীক ভূষণ আপনাকে বিমোহিত করবে। আর তারা যদি কথা বলে, তবে আপনিও তাদের কথা গুরুত্ব দিয়ে শ্রবণ করবেন; যেন তারা প্রাচীরের উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কতগুলো কাষ্ঠখণ্ড। প্রত্যেক শোরগোলকে তারা নিজেদের বিরুদ্ধে মনে করে। তারাই শত্রু, অতএব তাদের সম্পর্কে সচেতন হোন। আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন। তারা কোন পথে গমন করছে?” (সূরা আল মুনাফিকূন: ৪)
৫-আল্লাহ তা'আলা বলেন: {إِنْ تُصِبْكَ حَسَنَةٌ تَسُؤْهُمْ وَإِنْ تُصِبْكَ مُصِيبَةٌ يَقُولُوا قَدْ أَخَذْنَا أَمْرَنَا مِنْ قَبْلُ وَيَتَوَلَّوا وهم فرحون (٥٠)} [التوبة: ٥٠].
"যদি আপনাকে কোনো কল্যাণ স্পর্শ করে, তবে তারা ব্যথিত হয়, আর যদি আপনাকে কোনো বিপদ আক্রান্ত করে, তবে তারা বলে আমরা ইতোপূর্বেই আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। এ কথা বলে তারা আনন্দে প্রস্থান করে।" (সূরা আত তাওবা: ৫০)
৬-আল্লাহ তা'আলা বলেন: {وَمَا مَنَعَهُمْ أَنْ تُقْبَلَ مِنْهُمْ نَفَقَاتُهُمْ إِلَّا أَنَّهُمْ كَفَرُوا بالله وَبِرَسُولِهِ وَلَا يَأْتُونَ الصَّلَاةَ إِلَّا وَهُمْ كُسَالَى وَلَا يُنْفِقُونَ إِلَّا وَهُمْ كَارِهُونَ (٥٤)} [التوبة: ٥٤].
"তাদের ছুদক্বা কবুল না হওয়ার এ ছাড়া আর কী কারণ আছে যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি কুফর: করেছে, তারা জ্বালাতে আসে অলসতার সহিত এবং তারা দান করে সঙ্কীর্ণমনা হয়ে।" (সূরা আত তাওবা: ৫৪)
৭-আল্লাহ তা'আলা বলেন: {وَمِنْهُمْ مَنْ يَلْمِرُكَ فِي الصَّدَقَاتِ فَإِنْ أُعْطُوا مِنْهَا رَضُوا وَإِنْ لَمْ يُعْطَوْا مِنْهَا إِذَا هُمْ يَسْخَطُونَ (৫৮)} [التوبة: ٥٨].
"তাদের মধ্যে অনেকে এমনও রয়েছে, যারা আপনাকে ছাদাক্বা বণ্টনে দোষারোপ করে। যদি তাদেরকে এখান থেকে কিছু দেয়া হয়, তারা খুশী হয়, আর যদি তাদেরকে না দেয়া হয়, তবে তারা মনঃক্ষুণ্ণ করে।" (সূরা আত তাওবা: ৫৮)
৮-আল্লাহ তা'আলা বলেন: {يَحْذَرُ الْمُنَافِقُونَ أَنْ تُنَزِّلَ عَلَيْهِمْ سُورَةٌ تُنَبِّئُهُم بِمَا فِي قُلُوبِهِمْ قُلِ اسْتَهْزِئُوا إِنَّ اللَّهَ مُخْرِجٌ مَا تَحْذَرُونَ (৬৪)} [التوبة: ٦٤] .
"মুনাফিক্বরা এ ব্যাপারে ভয় করে যে, মুসলিমদের উপর এমন কোনো সূরা নাযিল না হয়, যা তাদের হৃদয়ের সুপ্ত রহস্যকে ফাঁস করে দেয়। আপনি বলুন, তোমরা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করতে থাক, আল্লাহ তা'আলা অবশ্যই তা প্রকাশ করবেন, যার ব্যাপারে তোমরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে আছ।" (সূরা আত তাওবা: ৬৪)
৯-আল্লাহ তা'আলা বলেন: {يَحْلِفُونَ بِاللَّهِ لَكُمْ لِيُرْضُوكُمْ وَاللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَقُّ أَنْ يُرْضُوهُ إِنْ كَانُوا مُؤْمِنِينَ (৬২)} [التوبة: ٦٢] .
"তারা তোমাদেরকে সন্তুষ্ট করার জন্য তোমাদের সামনে আল্লাহর নামে শপথ করে, অথচ আল্লাহ ও তাঁর রসূল কে সন্তুষ্ট করা তাদের জন্য অধিক গুরুত্বপূর্ণ যদি তারা সত্যিকারার্থেই ঈমানদার হয়ে থাকে।" (সূরা আত তাওবা: ৬২)
১০-আল্লাহ তা'আলা বলেন: {يَحْلِفُونَ بِاللَّهِ مَا قَالُوا وَلَقَدْ قَالُوا كَلِمَةَ الْكُفْرِ وَكَفَرُوا بَعْدَ إِسْلَامِهِمْ وَهَمُوا بِمَا لَمْ يَنَالُوا وَمَا نَقَمُوا إِلَّا أَنْ أَغْنَاهُمُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ مِنْ فَضْلِهِ} [التوبة: ٧٤].
"তারা আল্লাহর নামে শপথ করে বলে, তারা বলে নি, অথচ তারা কুফরী কথা বলেছে এবং ইসলাম গ্রহণের পরে কুফুরে লিপ্ত হয়েছে। তারা এমন বস্তু অর্জন করতে চেয়েছিল, তা তারা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা কোনো কিছুই আত্মসাৎ করতে পারে নি, বরং আল্লাহ ও তাঁর রসূল অনুগ্রহ বশত যতটুকু
তাদেরকে দান করেছেন, ততটুকুই তারা পেয়েছে। যদি তারা তাওবা করে, তবে এটা তাদের জন্য কল্যাণকর হবে, অন্যথায় আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে দুনিয়াতে ও আখিরাতে বেদনাদায়ক শাস্তি দিবেন এবং পৃথিবীতে তাদের কোনো অভিভাবক ও সহযোগী থাকবে না।" (সূরা আত তাওবা: ৭৪)
১১-আল্লাহ তা'আলা বলেন:
{الَّذِينَ يَلْمِزُونَ الْمُطَّوِّعِينَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ فِي الصَّدَقَاتِ وَالَّذِينَ لَا يَجِدُونَ إِلَّا جُهْدَهُمْ فَيَسْخَرُونَ مِنْهُمْ سَحْرَ اللهُ مِنْهُمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ (۷۹)} [التوبة: ٧٩].
"তারা দোষারোপ করে ঐ সকল মুমিনকে, যারা ছেচ্ছায় নফল ছদকা করে এবং যারা স্বীয় পারিশ্রমিক ব্যতীত আর কিছুই উপার্জন করতে পারে না, তাদেরকে নিয়ে তারা ঠাট্টা করে। আল্লাহ তাদের প্রতি উপহাস করেন আর তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।” (সূরা আত তাওবা: ৭৯)
১২-আল্লাহ তা'আলা বলেন:
{وَإِذَا أُنْزِلَتْ سُورَةٌ أَنْ آمَنُوا بِالله وَجَاهِدُوا مَعَ رَسُوله اسْتَأْذَنَكَ أُولُو الطَّولِ مِنْهُمْ وَقَالُوا ذَرْنَا نَكُنْ مَعَ الْقَاعِدِينَ (٨٦)} [التوبة: ٨٦].
"আর যখন এই মর্মে কোনো সূরা নাযিল হয় যে, তোমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন করো এবং তাঁর রসূলের সাথে একাত্ম হয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হও, তখন তাদের সামর্থবান ব্যক্তিরা আপনার নিকট বিদায় নেয়ার অনুমতি প্রার্থনা করে এবং বলে, আমাদিগকে অব্যাহতি দিন, আমরা অক্ষমদের সাথে নিষ্ক্রিয়ভাবে থেকে যাব।” (সূরা আত তাওবা: ৮৬)
১৩-আল্লাহ তা'আলা বলেন:
{يُخَادِعُونَ اللَّهَ وَالَّذِينَ آمَنُوا وَمَا يَخْدَعُونَ إِلَّا أَنْفُسَهُمْ وَمَا يَشْعُرُونَ (۹) فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ فَزَادَهُمُ اللَّهُ مَرَضًا وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ بِمَا كَانُوا يَكْذِبُونَ (۱۰)} [البقرة: ۹ - .[١٠
"তারা আল্লাহকে ও ইমানদারদের সাথে প্রতারণা করে, অথচ প্রকৃতপক্ষে তারা নিজেদের সাথেই প্রতারণা করছে। তাদের অন্তরে রয়েছে ব্যাধি, যেই ব্যাধি আল্লাহ তা'আলা আরো অধিক পরিমাণে বৃদ্ধি করে দিয়েছেন। আর তাদের জন্য
রয়েছে বেদনাদায়ক শান্তি তাদের মিথ্যা বলার কারণে।" (সূরা আল বাক্বারাহ: ৯-১০)
দ্বিতীয় প্রকার: নিফাক্ব আল-আছগার )النفاق الأصغر :
নিফাক্ব আল-আছগার হল- অন্তরে ঈমান থাকাকালীন মুনাফেক্বীর কোনো একটি কাজ সংঘটিত করা। এটাকে নিফাক্ব আল-আ'মালী )النفاق العملي( বলা হয়, যার সুস্পষ্ট বর্ণনা নাবী কারীম-ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দিয়েছেন। এই নিফাক্ব আল-আছগার দীন থেকে বহিষ্কার করে না। কিন্তু এটা দীন থেকে বহিষ্কার হওয়ার মাধ্যম। এই নিফাক্বের ধারকের মাঝে ঈমান ও নিফাক্ব দুটিই বিদ্যমান থাকে। তবে এই নিফাক্বের পরিমাণ বেশী হলে তা প্রকৃত মুনাফেক্ব হওয়ার কারণ হতে পারে।
নিফাক্ব আল-আছগার এর ভিত্তিসমূহ
নিফাক্ব আল-আছগার এর মূলভিত্তি হল পাঁচটি: إذا حدث كذب .. وإذا عاهد غدر .. وإذا وعد أخلف .. وإذا خاصم فجر .. وإذا اؤتمن خان.
যখন কথা বলে মিথ্যা বলে। চুক্তি করে তা ভঙ্গ করে। অঙ্গীকার করে তা পূরণ করে না। বিতর্কে লিপ্ত হলে গালিগালাজ করে। আমানত রাখা হলে তার খেয়ানত করে।
১-আব্দুল্লাহ বিন আমর থেকে বর্ণিত, নাবী কারীম-ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: أربع مَنْ كُنْ فِيهِ كَانَ مُنَافِقاً خالصاً ، وَمَنْ كَانَتْ فيه خصلة منْهُنَّ كَانَتْ فيه خصلة من النفاق حَتَّى يَدَعَهَا: إِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ، وَإِذَا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَا عَاهَدَ غَدَرَ، وَإِذَا خاصم فجر» متفق عليه، أخرجه البخاري برقم (۳۳), ومسلم برقم (٥٩).
"এমন চারটি স্বভাব, যেগুলো কোনো ব্যক্তির মধ্যে পাওয়া গেলে সে নিরেট মুনাফেক্ব বলে বিবেচিত হবে। আর যার মধ্যে এই চারটি স্বভাবের কোনো একটি স্বভাব বিদ্যমান থাকবে, তার মধ্যে নিফাক্বের একটি অন্যতম স্বভাব বিদ্যমান
বলে বিবেচিত হবে যতক্ষণ পর্যন্ত সে উক্ত স্বভাব পরিত্যাগ না করবেঃ যখন তার নিকট কোনো বস্তু আমানত রাখা হয়, সে তার খিয়ানত করে। যখন সে কথা বলে, মিথ্যা কথা বলে। অঙ্গীকার করলে তা ভঙ্গ করে। বিতর্কে লিপ্ত হলে গালিগালাজ করে।"
২। আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, নাবী কারীম-ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-বলেন:
آيَةُ الْمُنَافِقِ ثَلَاثَ إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ، وَإِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ» متفق عليه، أخرجه البخاري برقم (٣٤), واللفظ له، ومسلم برقم (٥٨).
"মুনাফেক্বের আলামত তিনটি, যখন সে কথা বলে, মিথ্যা বলে। অঙ্গীকার করলে তা ভঙ্গ করে। কোনো বস্তু তার কাছে আমানত রাখা হলে তার খিয়ানত করে।"
📄 নিফাক্ব আল-আছগার ও আল-আকবার এর মাঝে পার্থক্য
নিফাক্ব আল-আছগার ও আল-আকবার এর মাঝে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যসমূহঃ ১-নিফাক্ব আল-আকবার দীন থেকে বহিষ্কার করে দেয়, কিন্তু নিফাক্ব আল-আছুগার দীন থেকে বহিষ্কার করে না।
২-নিফাক্ব আল-আকবার এর ধারক চিরস্থায়ী জাহান্নামী, পক্ষান্তরে নিফাক্ব আল-আছুগার এর ধারক চিরস্থায়ী জাহান্নামী নয়।
৩-নিফাক্ব আল-আকবার মুমিন থাকা অবস্থায় সংঘটিত হতে পারে না, কিন্তু নিফাক্ব আল-আছুগার মুমিন থেকেও সংঘটিত হতে পারে।
৪-নিফাক্ব আল-আকবার হল- নিয়্যাতের ক্ষেত্রে বাহ্যিক ও আন্তরিক অবস্থার ভিন্নতা। পক্ষান্তরে নিফাক্ব আল-আছুগার হল- আ'মলের ক্ষেত্রে বাহ্যিক ও আন্তরিক অবস্থার ভিন্নতা।
৫-নিফাক্ব আল-আকবার এর ধারক এর ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময়ই তাওবা নছীব হয় না। পক্ষান্তরে নিফাক্ব আল- আছুগার এর ধারক কখনো কখনো তাওবা করে সঠিক পথে ফিরে আসে, ফলে আল্লাহ তা'আলা তাকে ক্ষমা করে দেন।
📄 মুনাফিক্বদের অস্তিত্ব
মুনাফিক্বরা সর্বযুগে সর্বস্থানে বিদ্যমান থাকে। তারা সংখ্যায় অধিক হয়, তাদের আবির্ভাব বেশী হয় যখন ইসলামের শক্তি বৃদ্ধি লাভ করে এবং তারা ইসলামের সাথে মুখোমুখী সংঘর্ষে লিপ্ত হতে পারে না। ফলে তারা নিজেদেরকে মুসলিম হিসেবে দেখায়, যাতে করে অভ্যন্তরীণভাবে তারা সংঘর্ষ ও চক্রান্তে লিপ্ত হতে পারে। আর মুসলিমদের ঐক্যে ফাটল সৃষ্টি করতে পারে। এমনিভাবে তারা ইসলামকে জাহির করে কুফরকে আন্তরিকভাবে লালন করে, যাতে করে তারা মুসলিমদের সঙ্গে বেঁচে থাকতে পারে তাদের জান-মালের নিরাপত্তা সহকারে। তারা প্রত্যেক যুগে প্রত্যেক স্থানে ভিন্ন ভিন্ন বেশে যেমন: সরদার, আমীর, আলেম, আবেদ, ব্যবসায়ী ও ডাক্তারদের রূপে আত্মপ্রকাশ করে। তাদের ভয়াবহ আশঙ্কা ও দুর্দশার কারণেই আল্লাহ তা'আলা কুরআনুল কারীমে তাদের পর্দা উঠিয়ে দিয়েছেন এবং তাদের রহস্য উন্মোচন করেছেন। স্বীয় বান্দাদের সামনে তিনি তাদের বৈশিষ্ট্য ও কার্যক্রমগুলি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, যাতে তারা তাদের থেকে সাবধান থাকতে পারে এবং তাদের বিষয়ে স্পষ্ট দলীলের উপর অবিচল থাকতে পারে। তারা সবচেয়ে ভয়ঙ্কর শত্রু, সর্বাধিক ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তকারী এবং সর্বোচ্চ ধোঁকাবাজ ও প্রতারক। তারা নিজেদেরকে কখনো জাহির করে, আবার কখনো আত্মগোপন করে থাকে। তারা সংখ্যায় কখনো বেশী হয়, আবার কখনো কম হয়। আল্লাহ তা'আলাই তাদের কার্যক্রমের ব্যাপারে সবচেয়ে ভালো জানেন।
আল্লাহ তা'আলা বলেন: {وَلَوْ نَشَاءُ لَأَريناكهم فلعرفتهم بسيماهم ولتعرفتُهُمْ فِي لَحْنِ الْقَوْلِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ أَعْمَالَكُمْ (۳۰)} [محمد: ٣٠].
"আমি যদি চায়, তবে তাদের চেহারা আপনাকে দেখিয়ে দিতে পারি, ফলে আপনি তাদেরকে তাদের চেহারা দেখে চিনতে পারতেন। তবে আপনি অবশ্যই তাদেরকে কথার ভঙ্গিতে চিনতে পারবেন। আর আল্লাহ তা'আলা তোমাদের আমল সম্পর্কে ভালোভাবেই অবগত আছেন।” (সূরা মুহাম্মাদ: ৩০)