📄 আল্লাহ তা‘আলা ও তার বান্দাদের মাঝে মাধ্যমসমূহ তৈরী করার বিধান
মানুষ ও রাজা-বাদশাদের মাঝে মধ্যস্থতা নিয়োজিত করা হয় তিনটি কারণে:
প্রথম কারণ: রাজা-বাদশাদেরকে ঐ সকল মানুষের অবস্থার সংবাদ দেয়ার জন্য, যাদের ব্যাপারে তারা জানে না। অথচ আল্লাহ তা'আলা তাদের মত নয়। কেননা, তিনি সর্ব শ্রোতা সর্ব দ্রষ্টা সবকিছু জানেন। বিধায় তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন।
দ্বিতীয় কারণ: বাদশা কখনো স্বীয় প্রজাদের ব্যাপারে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ ও স্বীয় শত্রুদের দমনে অপারগ হয়ে যান। ফলে তার দুর্বলতা ও অপারগতার কারণে তিনি সহযোগী নিয়োগ দেন। অথচ আল্লাহ তা'আলা হলেন- স্বয়ংসম্পূর্ণ ও সর্বশক্তিমান। তিনি ব্যতীত সকলেই তার নিকট মুখাপেক্ষী। বিধায় তার কোনো সহযোগীর প্রয়োজন নেই।
তৃতীয় কারণ: কখনো বাদশাহ একান্তই বিশেষ চালিকা শক্তির ব্যবস্থাপনা ব্যতীত স্বীয় প্রজাদের উপকার করেন না। যখন তাকে তার প্রজাদের নেতৃবৃন্দ অনুরোধ করেন, তখনি কেবল স্বীয় প্রজাদের উপকার করার পরিকল্পনা তার মধ্যে জাগ্রত হয়ে ওঠে এবং তাদের সুপারিশ কবুল করেন তাদের নিকট স্বীয় স্বার্থ বিদ্যমান থাকার কারণে বা তাদেরকে ভয় করার কারণে বা তার প্রতি তাদের ইহসান থাকার জারণে। অথচ আল্লাহ তা'আলা কারোর নিকট কোনোকিছু আশা করেন না, কাউকে ভয় করেন না এবং কারো নিকট মুখাপেক্ষী নন। বরং তিনি মহাধনী সকল ত্রুটি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত, সকল বস্তুর রব ও মালিক। তিনি স্বীয় বান্দাদের প্রতি সন্তানের প্রতি জননী মাতার চেয়েও অধিক দয়ালু। তিনি যা চান, তাই হয়। যা চান না, তা হয়না। সুতরাং আমাদের রব কোনো শিক্ষকের মুখাপেক্ষী নন। কেননা, তিনি সর্ববিষয়ে জ্ঞানী। তার কোনো সহযোগীর প্রয়োজন নেই। কেননা, তিনি সকল বস্তুর উপর সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। স্বীয় বান্দাদেরকে ইহসান করার জন্য তার নিকট কোনো সুপারিশকারী থাকার প্রয়োজন নেই। কারণ, তিনি মহাধনী, সর্বাধিক মহান ও
সর্বোচ্চ দয়ালু। সুতরাং যে মূর্তি ও প্রতিমাসমূহকে আল্লাহ ও তার বান্দাদের মাঝে মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে, সে মুশরিক।
১-আল্লাহ তা'আলা বলেন: {وَيَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنفَعُهُمْ وَيَقُولُونَ هَؤُلَاءِ شُفَعَاؤُنَا عِنْدَ اللَّهِ قُلْ أَتُنَبِّئُونَ اللَّهَ بِمَا لَا يَعْلَمُ فِي السَّمَاوَاتِ وَلَا فِي الْأَرْضِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ} [يونس: ١٨] (۱۸)
"তারা আল্লাহ তা'আলাকে বাদ দিয়ে অন্যদের পূজা করে, যারা তাদের উপকার-ক্ষতি কোনোটাই করতে পারেনা। আর তারা বলে যে, এরাই হল আল্লাহর নিকট আমাদের জন্য সুপারিশকারী। বলুন, তোমরা কি আল্লাহ তা'আলাকে মহাবিশ্ব ও পৃথিবীর এমন কোনো বিষয়য়ের সংবাদ দিচ্ছ, যে বিষয়ে আল্লাহ তা'আলা জানেন না? তিনি সর্বপ্রকার ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে মুক্ত, তিনি তাদের অংশীদারদের চেয়েও অনেক অনেক উর্ধ্বে।" [সূরা ইউনুস: ১৮]
২-আল্লাহ তা'আলা বলেন: {قُلْ أَرَأَيْتُمْ مَا تَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَرُونِي مَاذَا خَلَقُوا مِنَ الْأَرْضِ أَمْ لَهُمْ شِرْكٌ فِي السَّمَاوَاتِ ائْتُونِي بِكِتَابٍ مِنْ قَبْلِ هَذَا أَوْ أَثَارَةٍ مِنْ عِلْمٍ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ (٤)} [الأحقاف: ٤] .
"আপনি বলুন, তোমরা কি ভেবে দেখেছ, আল্লাহকে বাদ দিয়ে তোমরা যাদের উপাসনা কর, আমাকে দেখাওতো তারা পৃথিবির কী সৃষ্টি করেছে, আর না মহাবিশ্বে তাদের কোনো অঙ্গশীদারিত্ব আছে? এই কিতাবের পূর্বে নাযিল হওয়া কোনো কিতাব অথবা পরম্পরাগত কোনো বিদ্যা আমার সামনে উপস্থিত কর, যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক।" [সূরা আল আহক্বাফ: ৪]
৩-আল্লাহ তা'আলা বলেন: {قُلِ ادْعُوا الَّذِينَ زَعَمْتُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ لَا يَمْلِكُونَ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ فِي السَّمَاوَاتِ وَلَا فِي الْأَرْضِ وَمَا لَهُمْ فِيهِمَا مِنْ شَرْك وَمَا لَهُ مِنْهُمْ مِنْ ظَهِيرِ (۲۲) وَلَا تَنْفَعُ الشَّفَاعَةُ عِنْدَهُ إِلَّا لِمَنْ أَذِنَ لَهُ حَتَّى إِذَا فُزِّعَ عَنْ قُلُوبِهِمْ قَالُوا مَاذَا قَالَ رَبُّكُمْ قَالُوا الْحَقِّ وَهُوَ الْعَلِيُّ الْكَبِيرُ (۲۳)} [سبأ: ۲۲ - ۲۳].
বলুন, তোমরা তাদেরকে আহবান কর, যাদেরকে উপাস্য মনে করতে আল্লাহ ব্যতীত। তারা নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের অনু পরিমাণ কোন কিছুর মালিক নয়, এতে তাদের কোন অংশও নেই এবং তাদের কেউ আল্লাহর সহায়কও নয়। যার জন্যে অনুমতি দেয়া হয়, তার জন্যে ব্যতীত আল্লাহর কাছে কারও সুপারিশ ফলপ্রসূ হবে না। যখন তাদের মন থেকে ভয়-ভীতি দূর হয়ে যাবে, তখন তারা পরস্পরে বলবে, তোমাদের পালনকর্তা কি বললেন? তারা বলবে, তিনি সত্য বলেছেন এবং তিনিই সবার উপরে মহান। [সূরা সাবা: ২২-২৩]
শিরকের অসারতা
কুফর ও শিরক-এর প্রত্যেকটিই বাতিল ও সর্বোচ্চ যুলুম। কুফুরির উপর একমাত্র নিজের ব্যাপারে অজ্ঞ, আল্লাহ তা'আলার সত্তা, তার নামসমূহ ও গুণাবলীর ব্যাপারে অজ্ঞ ও তার দীন ও শরীয়তের ব্যাপারে অজ্ঞ ব্যক্তিই অটল থাকে। তাওহীদ সম্পূর্ণটাই হক্ব (সত্য ও বাস্তবমুখী) এবং শিরকের সম্পূর্ণটাই বাতিল তথা অবাস্তব ও ভুয়া।
১-আল্লাহ তা'আলা বলেন:
{ ذَلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمْ لَهُ الْمُلْكُ وَالَّذِينَ تَدْعُونَ مِنْ دُونِهِ مَا يَمْلِكُونَ مِنْ قِطْمِيرٍ (۱۳) إِنْ تَدْعُوهُمْ لَا يَسْمَعُوا دُعَاءَكُمْ وَلَوْ سَمِعُوا مَا اسْتَجَابُوا لَكُمْ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يَكْفُرُونَ بشرككُمْ وَلَا ينبئك مثل خبير (١٤)} [فاطر: ١٣ - ١٤].
"তিনি আল্লাহই একমাত্র তোমাদের রব, সমস্ত কিছুর সার্বভৌমত্ব একমাত্র তারই। তোমরা তাকে বাদ দিয়ে যাদের উপাসনা কর, তারা সামান্য একটি খেজুরের আঁটিরও মালিক নয়। তোমরা যখন তাদেরকে ডাক, তারা তোমাদের ডাক শুনে না। আর যদিওবা শুনে, তথাপি তোমাদের ডাকে সাড়া দিতে পারে না। ক্বীয়ামতের দিন তারাই তোমাদের এই শিরককে অস্বীকার করবে। বস্তুতঃ মহান সংবাদ দাতা আল্লাহর ন্যায় আর কেউ তোমাকে এই ব্যাপারে অবহিত করতে পারবে না।" [সূরা আল ফাত্বির: ১৩-১৪]
২-আল্লাহ তা'আলা বলেন:
{قُلْ أَرَأَيْتُمْ شُرَكَاءَكُمُ الَّذِينَ تَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَرُونِي مَاذَا خَلَقُوا مِنَ الْأَرْضِ أَمْ لَهُمْ شِرْكُ فِي السَّمَاوَاتِ أَمْ آتَيْنَاهُمْ كِتَابًا فَهُمْ عَلَى بَيِّنَتْ مِنْهُ بَلْ إِنْ يَعِدُ الظَّالِمُونَ بَعْضُهُمْ بَعْضًا إِلَّا غُرُورًا (٤٠)} [فاطر: ٤٠].
"আপনি বলুন, তোমরা কি তোমাদের সেই শরীকদের কথা ভেবে দেখেছ, যাদেরকে আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা ডাক? তারা পৃথিবীতে কিছু সৃষ্টি করে থাকলে তা আমাকে দেখাও। না মহাবিশ্ব সৃষ্টিতে তাদের কোনো অংশ আছে আর না আমি তাদেরকে কোনো কিতাব দিয়েছি, যে কিতাবের প্রমাণের উপর তারা প্রতিষ্ঠিত রয়েছে? বরং জালেমরা একে অপরের সাথে শুধুই প্রতারণামূলক অঙ্গীকার করে থাকে।" [সূরা আল ফাত্বির: ৪০]
৩-আল্লাহ তা'আলা বলেন:
{وَاتَّخَذُوا مِنْ دُونِهِ آلِهَةً لَا يَخْلُقُونَ شَيْئًا وَهُمْ يُخْلَقُونَ وَلَا يَمْلِكُونَ لِأَنْفُسِهِمْ ضَرًّا وَلَا نَفْعًا وَلَا يَمْلِكُونَ مَوْتًا وَلَا حَيَاةً وَلَا نُشُورًا (۳)} [الفرقان: ٣].
"তারা তার পরিবর্তে কত উপাস্য গ্রহণ করেছে, যারা নিজেরাই সৃষ্টি কোনোকিছু সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখে না, তারা নিজেদের ভাল-মন্দ কোনটাই করতে পারে না এবং তারা জীবন, মৃত্যু ও পুনরুজ্জীবন কোনোটারই মালিক নয়।" [সূরা আল ফুরক্বান: ৩]
৪-আল্লাহ তা'আলা বলেন:
{ذَلكَ بِأَنَّ اللَّهَ هُوَ الْحَقُّ وَأَنَّ مَا يَدْعُونَ مِنْ دُونِهِ الْبَاطِلُ وَأَنَّ اللَّهَ هُوَ الْعَلِيُّ الْكَبِيرُ (۳۰)} [لقمان: ۳০].
এটাই প্রমাণ যে, আল্লাহ-ই সত্য এবং আল্লাহ ব্যতীত তারা যাদের পূজা করে সব মিথ্যা। আল্লাহ সর্বোচ্চ, মহান। [সূরা লুকমান: ৩০]
📄 শিরকের আস্তানাসমূহ অবশিষ্ট রাখার বিধান
মুসলিমদের উপর সত্যকে প্রতিষ্ঠা করা, বাতিলকে ধ্বংস করা, তাওহীদের প্রচার করা, শিরকের চিহ্ন মুছে দেয়া, দীন ও সুন্নাহ-এর নিদর্শনগুলোকে জাহির করা এবং শিরকের জন্মভূমি ও স্থাপনাসমূহ মিটিয়ে দেয়া ওয়াজিব। মুসলিমদের জন্য শিরক ও মূর্তিসমূহের জন্মভূমি যখন তাদের সেগুলোকে মিটিয়ে দেয়া ও ধুলিস্যাৎ করার ক্ষমতা থাকে একদিনের জন্যও অবশিষ্ট রাখা জায়েয নেই। নাবী - ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দূতগণ ও সৈন্যদল পাঠিয়েছেন মূর্তিসমূহ এবং আল্লাহকে ব্যতীত অন্য সকল উপাস্যদেরকে ভেঙ্গে ফেলা এবং ধ্বংস করার জন্য, যাতে সমস্ত বিধান শুধুমাত্র আল্লাহ তা'আলার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। বরং কা'বা শরীফে অবস্থিত মূর্তিসমূহ তিনি-ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- স্বীয় হস্তে চূর্ণ করেছেন।
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُودٍ رَضِيَ اللهُ عَنهُ قال : دَخَلَ النَّبِيُّ - صلى الله عليه وسلم - مَكَّةَ، وَحَوْلَ الكَعْبَةِ ثَلاثُ مِائَةٍ وَستُونَ نُصُباً ، فَجَعَلَ يَطْعُنُهَا بِعُودٍ فِي يَدِهِ، وَجَعَلَ يَقُولُ: جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ}» متفق عليه، أخرجه البخاري برقم (٢٤٧٨), واللفظ له، و مسلم برقم (۱۷۸۱)
আব্দুল্লাহ ইবনু মাস'উদ () এর সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন: নাবী-ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- মক্কায় প্রবেশ করলেন এই সময়- কা'বার চতুর্পাশে তিনশত ষাটটি মূর্তির বেদী ছিল। তিনি সেগুলোকে নিজ হাতের দণ্ড দ্বারা আঘাত করছিলেন আর বলছিলেন: "সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয় মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।" (সূরা আল ইসরা: ৮১)। মুত্তাফাকুন আলাইহি, বুখারী হা/২৪৭৮, মুসলিম হা/১৭৮১।
📄 মুশরিকদের সঙ্গে সমঝৌতা করার বিধান
মুশরিকদের সঙ্গে বাহ্যিকভাবে সমঝোতা করার তিনটি অবস্থা:
প্রথম অবস্থা: তাদের সঙ্গে একজন মুসলিম বাহ্যিকভাবে ও আন্তরিকভাবে ঐকমত্য পোষণ করবে। এমন ব্যক্তি কাফের, চাই সে এমনটি স্বেচ্ছায় বা বাধ্য হয়ে যেভাবেই করুকনা কেনো।
দ্বিতীয় অবস্থা: মুসলিম ব্যক্তি তাদের সঙ্গে আন্তরিকভাবে ঐকমত্য পোষণ করবে আর বাহ্যিকভাবে তাদের সঙ্গে বিরোধিতা করবে। এমন ব্যক্তি কাফেরের চেয়েও ভয়ঙ্কর মুনাফিক্ব।
তৃতীয় অবস্থা: মুসলিম ব্যক্তি তাদের সঙ্গে বাহ্যিকভাবে ঐকমত্য পোষণ করবে আর আন্তরিকভাবে তাদের বিরোধিতা করবে। এই তৃতীয় অবস্থাটির দুইটি প্রেক্ষাপট হতে পারে।
প্রথম প্রেক্ষাপট: সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির এমনটি করার পিছনে কারণ হল- সে তাদের ক্ষমতাধীন কোনো অঞ্চলে অবস্থানরত। এমন অবস্থায় তারা তাকে মার-পিট করা ও হত্যার হুমকি দিবে। তাহলে এমন ব্যক্তির জন্য বাহ্যিকভাবে তাদের সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করা জায়েয হবে যদি তার অন্তর ঈমানের প্রশান্তি দ্বারা পূর্ণ থাকে।
দ্বিতীয় প্রেক্ষাপট: সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তাদের ক্ষমতাধীন কোনো অঞ্চলে অবস্থানের কারণে নয়, বরং সম্পদের প্রতি লালসা বা নেতৃত্বের প্রতি আকাংক্ষা বা জন্মভূমির প্রতি টান থাকার কারণে সে এমনটি করেছে। এমন ব্যক্তি মুরতাদ, যে আল্লাহ তা'আলার নি'আমতকে কুফর এর দ্বারা বিনিময় করেছে।
১-আল্লাহ তা'আলা বলেন: {مَنْ كَفَرَ بِالله مِن بَعْدِ إِيمَانِه إِلَّا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنَّ بِالْإِيمَانِ وَلَكِنْ مَنْ شَرَحَ بِالْكُفْرِ صَدْرًا فَعَلَيْهِمْ غَضَبٌ مِنَ الله وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ (١٠٦)} [النحل: ١٠٦].
"যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার প্রতি ঈমান আনার পরেও কুফর করে- তবে ঐ ব্যক্তি ব্যতীত, যাকে কুফর করতে বাধ্য করা হয় এবং তার হৃদয় ঈমানের উপর অবিচল থাকে - তবে সে যদি নিজের হৃদয়কে কুফরীর জন্য প্রশস্ত করে দেয়, তবে তাদের উপর আল্লাহ তা'আলার গযব পতিত হবে। আর তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।” (সূরা আন নাহল: ১০৬)
২-আল্লাহ তা'আলা বলেন:
{أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ بَدَّلُوا نِعْمَتَ الله كُفْرًا وَأَحَلُّوا قَوْمَهُمْ دَارَ الْبَوَارِ (۲۸) جَهَنَّمَ يَصْلُّونَهَا وَبِئْسَ الْقَرَارُ (۲۹)} [إبراهيم: ۲৮ - ২৯] .
"আপনি তাদেরকে দেখেননি, যারা আল্লাহর নি'আমতকে অকৃতজ্ঞতা তথা কুফর দ্বারা পরিবর্তন করেছে এবং স্বজাতিকে তারা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত জাহান্নামে পৌঁছে দিয়েছে, যেই আগুনে তারা প্রবেশ করবে। আর তা কতইনা নিকৃষ্ট ঠিকানা।” (সূরা ইবরাহীম: ২৮-২৯)
📄 মুশরিকের বিধান
মুশরিকের দুনিয়া ও আখেরাতের বিধানসমূহ:
১। দুনিয়াতে মুশরিকের বিধানসমূহ )أحكام المشرك في الدنيا
প্রথম বিধান- মুশরিকের শিরকযুক্ত কোনো আমল কবুল হবে না (المشرك لا يقبل ا منه أي عمل مع الشرك
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
{وَلَقَدْ أُوحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنْ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ (٦٥)} [الزمر: ٦٥].
"আপনার নিকট এবং আপনার পূর্ববর্তীদের নিকট এই মর্মে প্রত্যাদেশ পাঠানো হয়েছে যে, যদি আপনি আল্লাহর সঙ্গে অংশীদার সাব্যস্ত করেন, তবে আপনার আমল ধ্বংস হয়ে যাবে এবং আপনি চিরস্থায়ী ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।” (সূরা আয-যুমার: ৬৫)
দ্বিতীয় বিধান- মুশরিকের সাথে বিবাহ বৈধ নয় )ا المشرك لا تحل مناكحته
আল্লাহ তা'আলা বলেন: { وَلَا تُنْكِحُوا الْمُشْرِكِينَ حَتَّى يُؤْمِنُوا ولعبد مؤمن خير مِنْ مُشْرِكَ وَلَوْ أَعْجَبَكُمْ أُولَئِكَ يَدْعُونَ إِلَى النَّارِ وَاللَّهُ يَدْعُو إلى الجنة والمغفرة بإذنه ويبين آياته للناس لعلهم يتذكرُونَ} [البقرة: ۲۲۱] . (۲۲۱)
"মুশরিক মেয়েদেরকে তোমরা বিবাহ করো না, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে। মুসলিম ক্রীতদাসী মুশরিক নারী অপেক্ষা উত্তম, যদিও মুশরিক নারী তোমাদেরকে অভিভূত করে। আর (তোমাদের নারীদেরকে) মুশরিক পরুষদের সঙ্গে বিবাহ দিয়োনা, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা ঈমান না আনে। মুমিন ক্রীতদাস মুশরিক অপেক্ষা উত্তম, যদিও সে তোমাদের কাছে মোহনীয় লাগে। তারা জাহান্নামের দিকে আহবান করে আর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় আদেশ দ্বারা জান্নাত ও ক্ষমার দিকে আহবান করেন, স্বীয় নিদর্শনাবলী মানুষের জন্য স্পষ্টরূপে বর্ণনা করেন, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করতে পারে।" (সূরা আল বাক্বারাহ: ২২১)
তৃতীয় বিধান- মুশরিক ব্যক্তিকে হত্যা করা ও তার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা বৈধ ا المشرك حلال الدم والمال
আল্লাহ তা'আলা বলেন: {فَإِذَا انْسَلَخَ الْأَشْهُرُ الْحَرِّمُ فَاقْتُلُوا الْمُشْرِكِينَ حَيْثُ وَجَدتُمُوهُمْ وَخُذُوهُمْ وَاحْصُرُوهُمْ وَاقْعُدُوا لَهُمْ كُلَّ مَرْصَدٍ فَإِنْ تَابُوا وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ فَخَلُّوا سَبِيلَهُمْ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ (٥)} [التوبة: ٥].
"অতঃপর পবিত্র মাসগুলো অতিবাহিত হলে মুশরিকদেরকে যেখানেই (আরবের সীমানায়) পাও, হত্যা কর, বন্দী কর এবং ঘিরে ধর। প্রতিটি ঘাঁটিতে তাদের সন্ধানে ওঁৎ পেতে বসে থাক। আর যদি তারা তাওবা করে, ছলাত আদায় করে এবং যাকাত প্রদান করে, তবে তাদের রাস্তা ছেড়ে দাও। নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।” (সূরা তাওবা: ৫)
চতুর্থ বিধান- মুশরিক ব্যক্তি নাপাক, তার জন্য মাসজিদুল হারামে প্রবেশ করা নিষিদ্ধ )ا المشرك نجس لا يحل له دخول المسجد الحرام
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْمُشْرِكُونَ نَجَسٌ فَلَا يَقْرَبُوا الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ بَعْدَ عَامِهِمْ هَذَا وَإِنْ خِفْتُمْ عَيْلَةً فَسَوْفَ يُغْنِيكُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ إِنْ شَاءَ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ حَكِيمٌ (۲۸)} [التوبة: ٢٨].
"হে ইমানদারগণ, নিশ্চয় মুশরিকরা অপবিত্র। বিধায় এ বছরের পর আর কখনো তারা যেন মাসজিদুল হারাম এর নিকট না আসে। আর যদি তোমরা দারিদ্র্যের ভয় কর, তবে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় অনুগ্রহে যখন তিনি চান- তোমাদেরকে স্বচ্ছলতা দান করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা মহা জ্ঞানী ও মহা প্রজ্ঞাময়।” (সূরা তাওবা: ২৮)
পঞ্চম বিধান- মুশরিক ব্যক্তি মুসলিম ব্যক্তির ওয়ারিস হতে পারবে না এবং মুসলিম ব্যক্তি মুশরিক ব্যক্তির ওয়ারিস হতে পারবে না ) المشرك لا يرث المسلم ( وعكسه)।
উছামা বিন যায়েদ থেকে বর্ণিত, নাবী-হুল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- বলেন:
«لا يَرِثُ المُسْلِمُ الكَافِرَ وَلا الكَافِرُ المُسْلِم» متفق عليه، أخرجه البخاري برقم (٦٧٦٤) ومسلم برقم (١٦١٤).
"মুসলিম কাফেরের ওয়ারিস হতে পারবে না আর কাফেরও মুসলিমের ওয়ারিস হতে পারবে না। মুত্তাফাকুন আলাইহি, বুখারী হা/৬৭৬৪, মুসলিম হা/১৬১৪।
ষষ্ঠ বিধান- মুশরিক ব্যক্তির জবেহকৃত পশু হারাম, তার অভিভাবকত্ব (সন্তান ও দাসদের) বাতিল হয়ে যাবে এবং তার সন্তান লালন-পালনের অধিকার নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে। কারণ, সে কাফের )تحرم ذكاة المشرك، وتسقط ولايته، ويسقط حقه ا في الحضانة؛ لأنه كافر.
সপ্তম বিধান- মুশরিক ব্যক্তি মারা গেলে তাকে গোসল করানো যাবে না, তাকে কাফন দেয়া যাবে না, তার জানাযার ছলাত আদায় করা যাবে না, তার জন্য রহমতের দু'আ করা যাবে না, তাকে মুসলিমদের কবরে দাফন করা যাবে না এবং তার কোনো ওয়ারিস হবে না। কারণ, সে কাফের ) إذا مات المشرك على
আল-শিরক ফায়ানিহু লা ইউগাসসালু, ওয়ালা ইউকাফফানু, ওয়ালা ইউসাল্লা আলাইহি, ওয়ালা ইউদআ লাহু বিররাহমাতি, ওয়ালা ইউদফানু ফি (মাকাবিরিল মুসলিমিন, ওয়ালা ইউরিসু; লিআন্নাহু কাফির)।
২। আখেরাতে মুশরিকের বিধানসমূহ : (আহকামুল মুশরিক ফি আল-আখিরাহ)
প্রথম বিধান- যদি মুশরিক ব্যক্তি শিরকের উপরে মৃত্যু বরণ করে, তাহলে আল্লাহ তা'আলা তাকে কোনোভাবেই ক্ষমা করবেন না (ইযা মাতাল মুশরিকু আলাশ শিরকি)। (আল-শিরকু ফায়ান্নাল্লাহা লা ইয়াগফিরু লাহু)।
আল্লাহ তা'আলা বলেন: إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْمًا عَظِيمًا [النساء: 48]
"নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা তাঁর সঙ্গে শিরক করার গুনাহ ক্ষমা করবেন না, এছাড়া অন্যসকল গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন যাকে চান। আর যে আল্লাহর সঙ্গে অংশীদার করল, সে মহা অপবাদ আরোপ করল।" (আন নিসা: ৪৮)
দ্বিতীয় বিধান- যদি মুশরিক ব্যক্তি শিরকের উপর মৃত্যু বরণ করে, তাহলে তার জন্য জান্নাত চিরস্থায়ীভাবে হারাম হয়ে যাবে (ইযা মাতাল মুশরিকু আলাশ শিরকি ফায়ান্নাহু তাহরুম)। (আলাইহিল জান্নাতু তাহরিমান মুআববাদান)।
আল্লাহ তা'আলা বলেন: إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنْصَارٍ [المائدة: 72].
"নিশ্চয় যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে সাব্যস্ত করল, আল্লাহ তা'আলা তার উপর জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন এবং তার ঠিকানা হল জাহান্নাম। আর জালেমদের কোনো সাহায্যকারী নেই।" (আল-মায়িদাহঃ ৭২)
তৃতীয় বিধান- মুশরিক ব্যক্তি যদি শিরকের উপর মৃত্যু বরণ করে, তাহলে তার ঠিকানা হবে চিরস্থায়ী জাহান্নাম (ইযা মাতাল মুশরিকু আলাশ শিরকি ফামাওয়াহু জাহান্নাম খালিদান)। (ফিহা আবাদান)।
১-আল্লাহ তা'আলা বলেন:
{وَعَدَ اللَّهُ الْمُنَافِقِينَ وَالْمُنَافِقَاتِ وَالْكُفَّارَ نَارَ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا هِي حسبهم ولعنهم الله وَلَهُمْ عَذَابٌ مقيم (٦٨)} [التوبة: ٦٨].
"আল্লাহ তা'আলা অঙ্গীকার করেছেন মুনাফেক্ব পুরুষ ও মুনাফেক্ব নারী এবং কাফেরদের জন্যে জাহান্নামের অঙ্গীকার করেছেন, যেখানে তারা চিরকাল বসবাস করবে। এটাই তাদের জন্যে যথেষ্ট। আল্লাহ তাদের উপর অভিশাপ করেছেন, তাদের জন্যে রয়েছে স্থায়ী শাস্তি।” (সূরা আত তাওবা: ৬৮)
২-আল্লাহ তা'আলা বলেন:
{إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا وَمَاتُوا وَهُمْ كُفَّارٌ أُولَئِكَ عَلَيْهِمْ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ (١٦١) خالدين فيها لا يخفف عنهم العذاب ولا هم ينظرُونَ (١٦٢)} [البقرة: ١٦١ .[١٦٢ -
"নিশ্চয় যারা কুফর করল এবং কাফের থাকাবস্থায় মৃত্যুবরণ করল, তাদের উপর আল্লাহর অভিশাপ, মালাইকা-ফেরেশতাদের অভিশাপ এবং সমস্ত মানুষের অভিশাপ। সেখানে তারা স্থায়ীভাবে বসবাস করবে, তাদের শাস্তি সামান্য পরিমাণেও লাঘব করা হবে না এবং তাদের দিকে ভ্রুক্ষেপও করা হবে না।" (সূরা আল বাক্বারাহ: ১৬১-১৬২)
৩-আব্দুল্লাহ ইবনু মাস'উদ () থেকে বর্ণিত, তিনি নাবী কারীম-ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
«مَنْ مَاتَ وَهُوَ يَدْعُو مِنْ دُونِ اللَّهِ نِدَا دَخَلَ النَّارَ» متفق عليه، أخرجه البخاري برقم (٤٤٩٧), واللفظ له، ومسلم برقم (۹۲).
"যে আল্লাহ তা'আলার পরিবর্তে অন্যকাউকে সমকক্ষকে বানিয়ে তার কাছে প্রার্থনা করে এবং এই বিশ্বাসের উপরেই সে মৃত্যু বরণ করল, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।" মুত্তাফাকুন আলাইহি, বুখারী হা/৪৪৯৭, মুসলিম হা/৯২।