📄 শিরকের কুফলসমূহ
আল্লাহ তা'আলা স্বীয় গ্রন্থের চারটি স্থানে শিরকের চারটি কুফল উল্লেখ করেছেন।
১) আল্লাহ তা'আলা বলেন: {إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْمًا عَظِيمًا (٤٨)} [النساء: ٤٨].
নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে লোক তাঁর সাথে শরীক করে। তিনি ক্ষমা করেন এর নিম্ন পর্যায়ের পাপ, যার জন্য তিনি ইচ্ছা করেন। আর যে লোক অংশীদার সাব্যস্ত করল আল্লাহর সাথে, সে যেন অপবাদ আরোপ করল। [আন নিসা: আয়াত নং ৪৮]
২) আল্লাহ তা'আলা বলেন: إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنْصَارٍ {۷۲)} [المائدة: ۷۲]. निश्चय যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থির করে, আল্লাহ তার জন্যে জান্নাত হারাম করে দেন। তার বাসস্থান হয় জাহান্নাম। অত্যাচারীদের কোন সাহায্যকারী নেই। [আল মায়িদাহ: আয়াত নং ৭২]
৩) আল্লাহ তা'আলা বলেন: {إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا بعيدًا (١١٦)} [النساء: ١١٦]. নিশ্চয় আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে তাঁর সাথে কাউকে শরীক করে। এছাড়া যাকে ইচ্ছা, ক্ষমা করেন। যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে সুদূর ভ্রান্তিতে পতিত হয়। [আন নিসা: আয়াত নং ১১৬]
৪) আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَكَأَنَّمَا خَرَّ مِنَ السَّمَاءِ فَتَخْطَفُهُ الطَّيْرُ أَوْ تَهْوِي بِهِ الرِّيحُ فِي مَكَانٍ سحيق (۳۱)} [الحج: ۳۱]. আল্লাহর দিকে একনিষ্ট হয়ে, তাঁর সাথে শরীক না করে; এবং যে কেউ আল্লাহর সাথে শরীক করল; সে যেন আকাশ থেকে ছিটকে পড়ল, অতঃপর মৃতভোজী পাখী তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল অথবা বাতাস তাকে উড়িয়ে নিয়ে কোন দূরবর্তী স্থানে নিক্ষেপ করল। [আল হাজ্ব: আয়াত নং ৩১]
📄 কুফুর ও শিরকের মাঝে পার্থক্য
কুফুর ও শিরক শব্দ দু’টি যদি একই স্থানে বা একই শব্দে ব্যবহৃত না হয়ে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে বা শব্দে ব্যবহৃত হয়, তবে উভয়টিই কুফর বা আল্লাহ তা'আলাকে অস্বীকার-এর অর্থে ব্যবহার হয়। আর যদি উভয়টি শব্দ একই আয়াত বা একই হাদীস বা একই বাক্যে ব্যবহৃত হয়, তবে কুফুর-এর অর্থ হল- সৃষ্টা আল্লাহ তা'আলাকে অস্বীকার করা এবং শিরকের অর্থ হল- আল্লাহ তা'আলার কোনো সৃষ্টিকে স্বয়ং আল্লাহ তা'আলার জন্য অংশীদার হিসেবে সাব্যস্ত করা। আল্লাহ তা'আলার কোনো সৃষ্টিকে সৃষ্টি, ইবাদহ বা উভয়টির ক্ষেত্রে আল্লাহ তা'আলার সমকক্ষ বানানো। সুতরাং কুফর-এর পুরোটাই হল- আল্লাহ তা'আলার রুবুবীয়্যাত বা রব হওয়ার বৈশিষ্ট্যকে মুছে ফেলা। আর শিরক-এর পুরোটাই হল- আল্লাহ তা'আলার উলুহীয়্যাত বা ইলাহ হওয়ার বৈশিষ্ট্যকে লঙ্ঘন করা। ইহা এবং উহা উভয়টিই সবচেয়ে জঘন্য অন্যায়, সবচেয়ে নিকৃষ্ট কর্ম ও সর্বাধিক বিপজ্জনক কাজ।
📄 শিরকের প্রকারসমূহ
শিরক দুই প্রকার:
প্রথম প্রকার হল– আল্লাহ তা'আলার সত্তা, নামসমূহ, গুণাবলী ও কার্যসমুহের সাথে সম্পর্কিত। এটা দুই প্রকার:
প্রথমটি হল– শিরক আল-তা'তীল বা আল্লাহ তা'আলার রুবুবীয়্যাতকে বা রব হওয়ার বৈশিষ্ট্যকে অস্বীকার করা। আর এটিই হল সবচে জঘন্যতম শিরক। যেমন– ফির'আউনের কথা:
وَمَا رَبُّ الْعَالَمِينَ (۲۳)
বিশ্ব জাহানের রব কে (আল-শুআরা: ২৩)
দ্বিতীয়টি হল– আল্লাহ তা'আলার পাশাপাশি অন্যকোনো বাতিল ইলাহকে আল্লাহ তা'আলার সমকক্ষ বানানো। যেমন– নাছারাদের কথা: আল্লাহ তা'আলা হলেন সংযুক্ত তিন ইলাহ-এর অন্যতম এবং মূর্তিসমূহ ও তারকারাজির পুজারীদের শিরক, যারা আল্লাহ তা'আলার সাথে অন্য ইলাহকে তার সমকক্ষ বানিয়েছে।
১) আল্লাহ তা'আলা বলেন:
لَقَدْ كَفَرَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ ثَالث ثَلَاثَةِ وَمَا مِنْ إِلَه إِلَّا إِلَهُ وَاحِدٌ وَإِنْ لَمْ يَنتَهُوا عَمَّا يَقُولُونَ لَيَمَسَّنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ (۷۳)
নিশ্চয় তারা কাফের, যারা বলেঃ আল্লাহ তিনের এক; অথচ এক উপাস্য ছাড়া কোন উপাস্য নেই। যদি তারা স্বীয় উক্তি থেকে নিবৃত্ত না হয়, তবে তাদের মধ্যে যারা কুফরে অটল থাকবে, তাদের উপর যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি পতিত হবে। [আল মায়িদাহ: আয়াত নং ৭৩]
২) আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَمِنْ آيَاتِهِ اللَّيْلُ وَالنَّهَارُ وَالشَّمْسُ وَالْقَمَرُ لَا تَسْجُدُوا لِلشَّمْسِ وَلَا لِلْقَمَرِ وَاسْجُدُوا لله الَّذِي خَلَقَهُنَّ إِنْ كُنتُمْ إِيَّاهُ تَعْبُدُونَ (۳۷)
তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে দিবস, রজনী, সূর্য ও চন্দ্র। তোমরা সূর্যকে সেজদা করো না, চন্দ্রকেও না; আল্লাহকে সেজদা কর, যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন, যদি তোমরা নিষ্ঠার সাথে শুধুমাত্র তাঁরই এবাদত কর। [হা-মীম সাজদাহ্: আয়াত নং ৩৭]
দ্বিতীয় প্রকার হল– শিরক ফিল-ইবাদাহ বা ইবাদাহ-এর ক্ষেত্রে আল্লাহ তা'আলার সাথে অংশীদার সাব্যস্ত করা।
শিরকের এই প্রকারটি প্রথমটির চেয়ে কম নিকৃষ্টতর। কেননা, এই শিরক এমন ব্যক্তি থেকে সংঘটিত হয়, যে বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত আর কোনো ইলাহ বা মা'বুদ নেই এবং আল্লাহ তা'আলা ছাড়া অন্যকেউ ক্ষতি বা উপকার করার ক্ষমতা রাখে না। কিন্তু সে একমাত্র আল্লাহ তা'আলার জন্য একনিষ্ঠতার সঙ্গে ইবাদহ ও লেনদেন সংক্রান্ত কার্যক্রম করে না। আর এটা হল– অধিকাংশ মানুষের অবস্থা।
যেমনটি আল্লাহ আ'লা বলেন:
وَمَا يُؤْمِنُ أَكْثَرُهُمْ بِاللَّهِ إِلَّا وَهُمْ مُشْرِكُونَ (١٠٦)
অনেক মানুষ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, কিন্তু সাথে সাথে শিরকও করে। [ইউসুফ: আয়াত নং ১০৬]
শিরক ফিল-ইবাদহ দুই প্রকার:
১– শিরকে আকবর বা বড় শিরক
২– শিরকে আছগর বা ছোট শিরক
শিরকে আকবর-এর সংজ্ঞা: শিরকে আকবর (الشرك الأكبر) হল– পূর্ণ ইবাদত বা আংশিক ইবাদতকে গায়রুল্লাহের জন্য ধার্য করা। যেমন– গায়রুল্লাহের নিকট প্রার্থনা করা, গায়রুল্লাহের জন্য জবেহ করা ও গায়রুল্লাহের জন্য মান্নত করা। গায়রুল্লাহ-এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল– জ্বিন, শয়তানসমূহ ও কবরবাসীগণ ইত্যাদি। এছাড়া গায়রুল্লাহের নিকট এমন কোনো বস্তু প্রার্থনা করা, যা আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত আর কেউ দান করতে সক্ষম নয়। যেমন– গায়রুল্লাহের নিকট সচ্ছলতা, সুস্থতা, বৃষ্টি বর্ষণ ও দুঃখ-কষ্ট ইত্যাদি থেকে মুক্তি চাওয়া। যেমনটি মূর্খরা চেয়ে থাকে ওলী-আউলিয়া ও সালেহীন-এর কবর বা গাছপালা ও পাথরের মূর্তির সম্মুখে দাঁড়িয়ে।
১) আল্লাহ তা'আলা বলেন:
قُلْ أَتَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَمْلِكُ لَكُمْ ضَرًّا وَلَا نَفْعًا وَاللَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ (٧٦)
বলে দিনঃ তোমরা কি আল্লাহ ব্যতীত এমন বস্তুর এবাদত কর যে, তোমাদের অপকার বা উপকার করার ক্ষমতা রাখে না? অথচ আল্লাহ সব শুনেন ও জানেন। [আল মায়িদাহ: আয়াত নং ৭৬]
২) ইবনু মাসউদ ( থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
سَأَلْتُ رَسُولَ الله – صلى الله عليه وسلم – : أَيُّ الذَّنْبِ أَعْظَمُ عِنْدَ اللَّهِ؟ قَالَ: «أَنْ تَجْعَلَ الله ندا وَهُوَ خَلَقَكَ». قَالَ : قُلْتُ لَهُ: إِنَّ ذَلِكَ لَعَظِيمٌ. قَالَ : قُلْتُ: ثُمَّ أَيُّ؟ قَالَ: «ثُمَّ أَنْ تَقْتُلَ وَلَدَكَ مَخَافَةَ أَنْ يَطْعَمَ مَعَكَ ». قَالَ : قُلْتُ: ثُمَّ أَيُّ؟ قَالَ: «ثُمَّ أَنْ تُزَانِي حليلة جارك» متفق عليه
আমি রসূল – ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে প্রশ্ন করলাম: আল্লাহ তা'আলার নিকট কোন অপরাধ সর্বাধিক বড়? তিনি বললেন: আল্লাহ তা'আলার সাথে যখন তুমি অংশীদার সাব্যস্ত করবে, অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন (কোনো অংশীদার ব্যতীত)। তিনি বলেন: অতঃপর আমি তাকে বললাম: এটাতো
অনেক বড় অপরাধ। তিনি বলেন: এরপর আমি তাকে বললাম: এরপর কোন অপরাধটি সবচে বড়। তিনি বললেন: তোমার সন্তান তোমার আয় থেকে ভোগ করবে (ফলে অভাব দেখা দিবে) এই ভয়ে নিজ সন্তানকে তোমার হত্যা করা। তিনি বলেন: এরপর আমি বললাম: তারপরের সবচে বড় অপরাধ কোনটি? তিনি বললেন: এরপর সবচেয়ে বড় অপরাধ হল– তোমার প্রতিবেশীর স্ত্রির সহিত ব্যভিচার করা। মুত্তাফাকুন আলাইহি, ছুহীহ বুখারী হা/৪৪ ৭৭, ছুহীহ মুসলিম হা/৮৬।
শিরকে আকবর-এর অনেকগুলো প্রকার রয়েছে।
প্রথম প্রকার: শিরক আল-খাওফ (شرك الخوف) শিরক আল-খাওফ হল– প্রতিমা, মূর্তি, ত্বগুত, মৃত ব্যক্তি, অদৃশ্য জ্বিন বা মানুষ– এর ব্যাপারে কোনোপ্রকার ক্ষতি করা বা অনিষ্টকর বিপদে আপতিত করতে পারে এই ভয় পাওয়া। আর এই ধরনের ভয় দীনের অন্যতম সর্বোচ্চ ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। যে এই জাতীয় ভয় গায়রুল্লাহের জন্য ধার্য করে, সে আল্লাহ তা'আলার সাথে শিরক আল-আকবার করল।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
إِنَّمَا ذَلِكُمُ الشَّيْطَانُ يُخَوِّفُ أَوْلِيَاءَهُ فَلَا تَخَافُوهُمْ وَخَافُونَ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ (١٧٥)
এরা যে রয়েছে, এরাই হলে শয়তান, এরা নিজেদের বন্ধুদের ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে। সুতরাং তোমরা তাদের ভয় করো না। আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর। [আলে ইমরান: আয়াত নং ১৭৫]
দ্বিতীয় প্রকার: শিরক ফিত-তাওয়াক্কুল (الشرك في التوكل) বা ভরসা করার ক্ষেত্রে শিরক করা:
শিরক ফিত-তাওয়াক্কুল হল– আল্লাহ তা'আলা ছাড়া অন্যকেউ সমাধান করতে পারে না এমন বিষয়ে গayরুল্লাহের উপর তাওয়াক্কুল বা ভরসা করা। প্রতিটি বিষয়ে আল্লাহ তা'আলার উপর তাওয়াক্কুল করা ইবাদতের অন্যতম সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকার, যা শুধুমাত্র আল্লাহ তা'আলার জন্য ধার্য করা ওয়াজিব। সুতরাং যে গায়রুল্লাহের প্রতি তাওয়াক্কুল করল – এমন বিষয়ে, যা আল্লাহ
তা'আলা ব্যতীত আর কেউ সমাধান করতে পারে না, যেমন– বিপদাপদ প্রতিহত করা, উপকার হাছিল করা ও রিযিক উপার্জন করা-এসকল ক্ষেত্রে মৃত ও অনুপস্থিত ব্যক্তিদের উপর তাওয়াক্কুল করা – সে আল্লাহ তা'আলার সাথে শিরক আল-আকবার করল।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
قَالَ رَجُلَانِ مِنَ الَّذِينَ يَخَافُونَ أَنْعَمَ اللهُ عَلَيْهِمَا ادْخُلُوا عَلَيْهِمُ الْبَابَ فَإِذَا دَخَلْتُمُوهُ فَإِنَّكُمْ غَالِبُونَ وَعَلَى اللَّه فَتَوَكَّلُوا إِنْ كُنتُمْ مُؤْمِنِينَ (۲۳)
খোদাভীরুদের মধ্য থেকে দু'ব্যক্তি বলল, যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছিলেনঃ তোমরা তাদের উপর আক্রমণ করে দরজায় প্রবেশ কর। অতঃপর তোমরা যখন তাতে পবেশ করবে, তখন তোমরাই জয়ী হবে। আর আল্লাহর উপর ভরসা কর যদি তোমরা বিশ্বাসী হও। [আল মায়িদাহ: আয়াত নং ২৩]
তৃতীয় প্রকার: শিরক ফিল-মাহাব্বাহ (الشرك في المحبة) বা আন্তরিক ভালোবাসার ক্ষেত্রে শিরক করা:
শিরক ফিল-মাহাব্বাহ হল– কাউকে আল্লাহ তা'আলার ন্যায় ভালোবাসা। যেহেতু আল্লাহ তা'আলার প্রতি ভালোবাসা আল্লাহ তা'আলার প্রতি চুড়ান্ত পর্যায়ের বিনয় ও সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শনকে আবশ্যক করে, বিধায় এই জাতীয় ভালোবাসা একমাত্র আল্লাহ তা'আলার জন্যই হতে হবে। এই ক্ষেত্রে অন্য কাউকে তার সাথে অংশীদার করা যাবে না। যে আল্লাহ তা'আলাকে ব্যতীত অন্য কাউকে আল্লাহ তা'আলার মত ভালোবাসে, সে ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শনের ক্ষেত্রে আল্লাহ তা'আলার সাথে অংশীদার সাব্যস্ত করল।
আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
وَمِنَ النَّاسِ مَن يَتَّخِذُ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَنْدَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لله وَلَوْ يَرَى الَّذِينَ ظَلَمُوا إِذْ يَرَوْنَ الْعَذَابِ أَنَّ الْقُوَّةَ لله جَمِيعًا وَأَنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعَذَابِ (١٦٥)
আর কোন লোক এমনও রয়েছে যারা অন্যান্যকে আল্লাহর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে এবং তাদের প্রতি তেমনি ভালবাসা পোষণ করে, যেমন আল্লাহর প্রতি ভালবাসা হয়ে থাকে। কিন্তু যারা আল্লাহর প্রতি ঈমানদার তাদের ভালবাসা ওদের তুলনায় বহুগুণ বেশী। আর কতইনা উত্তম হ'ত যদি এ জালেমরা পার্থিব কোন কোন
আযাব প্রত্যক্ষ করেই উপলব্ধি করে নিত যে, যাবতীয় ক্ষমতা শুধুমাত্র আল্লাহরই জন্য এবং আল্লাহর আযাবই সবচেয়ে কঠিনতর। [আল বাকারাঃ আয়াত নং ১৬৫]
চতুর্থ প্রকার: শিরক ফিত-ত্ব'আহ (الشراك في الطاعة) বা আনুগত্যের ক্ষেত্রে শিরক করা:
শিরক ফিত-ত্ব'আহ হল– আনুগত্যের ক্ষেত্রে আলেমগণ, আমীরগণ, নেতৃত্বশীল ব্যক্তিবর্গ ও বিচারকবৃন্দকে আল্লাহ তা'আলার সাথে অংশীদার করা এবং বিধান প্রণয়ন ও হালাল-হারাম নির্ণয়ের ক্ষেত্রে তাদের আনুগত্য করা, যেভাবে আল্লাহ তা'আলার আনুগত্য করা হয়।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا إِلَهًا وَاحِدًا لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ سُبْحَانَهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ (۳۱)
তারা তাদের পন্ডিত ও সংসার-বিরাগীদিগকে তাদের পালনকর্তারূপে গ্রহণ করেছে আল্লাহ ব্যতীত এবং মরিয়মের পুত্রকেও। অথচ তারা আদিষ্ট ছিল একমাত্র মাবুদের এবাদতের জন্য। তিনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই, তারা তাঁর শরীক সাব্যস্ত করে, তার থেকে তিনি পবিত্র। [আত তাওবাহ্: আয়াত নং ৩১]
পঞ্চম প্রকার: শিরক আল-দা'ওয়াহ (شرك الدعوة) বা দু'আ বা প্রার্থনার ক্ষেত্রে শিরক করা:
শিরক ফিদ-দা'ওয়াহ হল– দু'আ বা প্রার্থনার ক্ষেত্রে আল্লাহ তা'আলার সাথে গায়রুল্লাহকে অংশীদার করা। যেমন– গায়রুল্লাহের নিকট এমন বিষয়ে প্রার্থনা করা, যা আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত অন্য কেউ করার সামর্থ রাখে না।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
فَإِذَا رَكِبُوا فِي الْفُلْكِ دَعَوْا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ فَلَمَّا نَجَّاهُمْ إِلَى الْبَرِّ إِذَا هُمْ يُشْرِكُونَ (٦٥)
তারা যখন জলযানে আরোহণ করে তখন একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকে ডাকে। অতঃপর তিনি যখন স্থলে এনে তাদেরকে উদ্ধার করেন, তখনই তারা শরীক করতে থাকে। [আল আনকাবুত: আয়াত নং ৬৫]
ষষ্ঠম প্রকার: শিরক আল-নিয়্যাহ ওয়াল ইরাদাহ ওয়াল ক্বাছুদ বা নিয়্যাত, (شرك النية والإرادة والقصد) : উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণে শিরক করা।
শিরক আল-নিয়্যাহ ওয়াল ইরাদাহ ওয়াল ক্বাছুদ হল– কোনো শরয়ী আমলের ক্ষেত্রে আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত অন্যকারো সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়্যাত করা। সুতরাং যে ব্যক্তি স্বীয় আমলসমূহের ক্ষেত্রে আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত অন্যকারো সন্তুষ্টি অর্জনের ইচ্ছা করল এবং তার থেকেই প্রতিদান কামনা করল, সে আল্লাহ তা'আলার সাথে নিয়্যাত ও ইরাদাহ (ইবাদতের ইচ্ছা ও উদ্দেশ্য নির্ণয়)–এর ক্ষেত্রে শিরক করল।
ইবাদতের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নির্ণয়ে আল্লাহ তা'আলার সাথে শিরক করা–এর পরিধি এত বড় সমুদ্রের ন্যায়, যার কোনো কিনারা নেই। খুব কম সংখ্যাক মানুষই আছেন, যারা এটা থেকে বেচে থাকতে পারেন। অধিকাংশ মানুষই এই সমস্যায় পতিত হয়েছে। যেমনটি আল্লাহ আ'লা বলেন:
وَمَا يُؤْمِنُ أَكْثَرُهُمْ بِاللَّهِ إِلَّا وَهُمْ مُشْرِكُونَ (١٠٦)
অনেক মানুষ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, কিন্তু সাথে সাথে শিরকও করে। [ইউসুফ: আয়াত নং ১০৬]
এই শিরকের অধীনে শিরক ফিল-আক্বওয়াল ওয়াল আমাল বা কথা ও আমল সংক্রান্ত শিরকও অন্তর্ভুক্ত হবে। শিরক ফিল আক্বওয়াল-এর দৃষ্টান্ত হল– গায়রুল্লাহের নামে শপথ করা তাকে সম্মান প্রদর্শনের দৃষ্টিকোণ থেকে। আর শিরক ফিল-আমাল-এর দৃষ্টান্ত হল– গায়রুল্লাহের সামনে সেজদা দেয়া, কবরের সম্মুখে সেজদা দেয়া, কবরের চতুর্দিকে ত্বওয়াফ করা এবং কাবা শরীফ ব্যতীত অন্যকোনো ঘর ত্বওয়াফ করা ইত্যাদি।
১) আল্লাহ তা'আলা বলেন:
مَنْ كَانَ يُرِيدُ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا نُوَفِّ إِلَيْهِمْ أَعْمَالَهُمْ فِيهَا وَهُمْ فِيهَا لَا يُبْخَسُونَ (١٥) أُولَئِكَ الَّذِينَ لَيْسَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ إِلَّا النَّارُ وَحَبِطَ مَا صَنَعُوا فِيهَا وَبَاطِلٌ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ (١٦)
এরাই হল সেসব লোক আখেরাতে যাদের জন্য আগুন ছাড়া নেই। তারা এখানে যা কিছু করেছিল সবই বরবাদ করেছে; আর যা কিছু উপার্জন করেছিল, সবই বিনষ্ট হল। যে ব্যক্তি পার্থিবজীবন ও তার চাকচিক্যই কামনা করে, হয় আমি
তাদের দুনিয়াতেই তাদের আমলের প্রতিফল ভোগ করিয়ে দেব এবং তাতে তাদের প্রতি কিছুমাত্র কমতি করা হয় না। [হুদ: আয়াত নং ১৫-১৬]
২) আল্লাহ তা'আলা বলেন:
فَمَنْ كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشرك بعبادة ربه أَحَدًا (۱১০)
অতএব, যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সাক্ষাত কামনা করে, সে যেন, সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং তার পালনকর্তার এবাদতে কাউকে শরীক না করে। [আল কাহাফ: আয়াত নং ১১০]
৩) আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূল – ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম – বলেছেন,
«قَالَ اللَّهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى: أَنَا أَغْنَى الشَّرَكَاء عَنِ الشَّرْكَ، مَنْ عَمِلَ عَمَلاً أَشْرَكَ فِيهِ مَعِي غَيْرِي، تَرَكْتُهُ وَشِرْكَهُ». أخرجه مسلم
আল্লাহ তা'আলা বলেন, আমি সকল অংশীদারদের অংশীদারিত্ব থেকে সম্পূর্ণরূপে বিমুখ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ। যে ব্যক্তি কোনো আমলে আমার সাথে অন্য কাউকে অংশীদার করল, আমি তাকে এবং তার শিরককে পরিত্যাগ করলাম। ছুহীহ মুসলিম হা/২৯৮৫।
ইবাদতের ক্ষেত্রে শিরকের দ্বিতীয় প্রকার হল– শিরক আল-আছুগার বা ছোট শিরক:
শিরক আল-আছুগার (الشرك الأصغر) হল – যে কাজকে (নিদিষ্ট বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকার শর্তে) আল্লাহ তা'আলা ও তার রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম – শিরক বলেছে, কিন্তু তা শিরক আল-আকবার এর সীমা পর্যন্ত পৌঁছেনি। যা তাওহীদের (একত্ববাদের বিশ্বাস) মাত্রাকে কমিয়ে দেয়। যা দীন থেকে বহিষ্কার করে না। যা শিরক আল-আকবার এর দুয়ার খুলে দেয়।
শিরক আল-আছুগার দুই প্রকার:
প্রথম প্রকার: যাহেরী শিরক বা প্রকাশ্য শিরক (شرك ظاهر): এমন শিরক, যা মুখ ও শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা সংঘটিত হয়। আর তা হল মানুষের কথা-বার্তা ও কার্যক্রমসমূহ।
কথা-বার্তার উদাহরণ: গায়রুল্লাহের নামে শপথ করা এবং আল্লাহ তা'আলা যা চান এবং তুমি যা চাও, তাই হবে অথবা আমি আল্লাহর উপর ভরসা করেছি এবং তোমার উপর ভরসা করেছি অথবা আল্লাহ তা'আলা ও অমুক যদি না হতেন অথবা এটা আল্লাহ তা'আলার বরকতের ও তোমার বরকতের অংশ এমন কথা বলা। তবে সঠিকভাবে বলতে হলে এভাবে বলতে হবে: যদি আল্লাহ তা'আলা না হতেন অতঃপর অমুক না হতেন। এভবেই অন্যান্য কথাগুলো বলতে হবে।
কার্যক্রম-এর উদাহরণ: বিপদাপদ অপসারণের লক্ষ্যে কানের দুল পরিধান করা ও সুতা বা ফিতা পরিধান করা এবং চোখ লাগা বা এই জাতীয় কোনো ভয়ের কারণে মাদুলি-রক্ষাকবচ ইত্যাদি ঝুলানো। সুতরাং যে বিশ্বাস করে যে, এই মাধ্যমগুলো বিপদ অপসারণ করে বা প্রতিহত করে, তবে এটা শিরক আল-আছগার। কেননা, আল্লাহ তা'আলা এগুলো আসবাব বা মাধ্যম–এই স্বীকৃতি দেননি। আর যদি কোনো ব্যক্তি এই বিশ্বাস করে যে, এই মাধ্যমগুলো নিজেই বিপদ প্রতিহত করতে পারে বা অপসারণ করতে পারে, তবে এটা শিরক আল-আকবার হবে। কারণ, সে গায়রুল্লাহের সাথে তার বিশ্বাসকে সংমিশ্রিত করে ফেলেছে।
১) আল্লাহ তা'আলা বলেন:
أَيُشْرِكُونَ مَا لَا يَخْلُقُ شَيْئًا وَهُمْ يُخْلَقُونَ (۱۹۱) وَلَا يَسْتَطِيعُونَ لَهُمْ نَصْرًا وَلَا أَنْفُسَهُمْ ينصرون (۱۹۲)
তারা কি এমন কাউকে শরীক সাব্যস্ত করে, যে একটি বস্তুও সৃষ্টি করেনি, বরং তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর তারা, না তাদের সাহায্য করতে পারে, না নিজের সাহায্য করতে পারে। [আল আরাফ: আয়াত নং ১৯১-১৯২]
২) হুযায়ফা () নাবী কারীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন:
«لَا تَقُولُوا مَا شَاءَ اللَّهُ وَشَاءَ فُلَانٌ وَلَكِنْ قُولُوا مَا شَاءَ اللهُ ثُمَّ شَاءَ فُلَانٌ» صحيح أخرجه أحمد برقم (٢٣٥٤), وأخرجه أبو داود برقم (٤৯٨٠)
তোমরা একথা বোলো না আল্লাহ তা'আলা চেয়েছেন এবং অমুক চেয়েছেন, বরং তোমরা বলো আল্লাহ তা'আলা চেয়েছেন অতঃপর অমুক চেয়েছেন। ছুহীহ: মুসনাদে আহমাদ হা/২৩৫৪, সুনানে আবূ দাউদ হা/৪৯৮০
শিরক আল-আছুগার-এর দ্বিতীয় প্রকার: খফী শিরক বা গোপন শিরক: খফী শিরক (شرك خفي) হল– নিয়্যাত ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নির্ণয়ে শিরক করা।
যেমন– কোনো আমল করা লোক দেখানো বা সুখ্যাতি অর্জনের উদ্দেশ্যে। আর এই শিরক এই উম্মতের মধ্যে পিপড়ার মন্থর গতির চেয়েও বেশি গোপনীয়তার সহিত বিদ্যমান। আল্লাহ তা'আলার প্রতি যার ভালোবাসা কমে গেছে, সে গায়রুল্লাহকে ভালোবাসে। যদি আল্লাহ তা'আলার প্রতি তার পরিপূর্ণ ভালোবাসা বিদ্যমান থাকত, তবে সে আল্লাহ তা'আলাকে ছাড়া অন্য কাউকে ভালোবাসত না। যেমন– মানুষের প্রশংসা কুড়ানোর উদ্দেশ্যে কোনো আমল করা অথবা সুন্দরভাবে ছুলাত আদায় করা, ছুদক্বা দেয়া, ছীয়াম পালন করা ও আল্লাহ তা'আলার যিকির করা মানুষকে দেখানো বা শুনানোর উদ্দ্যেশ্যে বা প্রশংসা কুড়ানোর উদ্দেশ্যে। এটা এমন এক সমুদ্র, যার কোনো কিনারা নেই। খুব কম সংখ্যাক মানুষই এই শিরক থেকে বাঁচতে পারে। এই শিরক যখন কোনো আমলের সাথে মিশ্রিত হয়, তখন সেই আমলকে বাতিল করে দেয়।
১) আল্লাহ তা'আলা বলেন:
قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُوحَى إِلَيَّ أَنَّمَا إِلَهُكُمْ إِلَهُ وَاحِدٌ فَمَنْ كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّه أَḥদًا (۱۱۰)
বলুনঃ আমি ও তোমাদের মতই একজন মানুষ, আমার প্রতি প্রত্যাদেশ হয় যে, তোমাদের ইলাহই একমাত্র ইলাহ। অতএব, যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সাক্ষাত কামনা করে, সে যেন, সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং তার পালনকর্তার এবাদতে কাউকে শরীক না করে। [আল কাহাফ: আয়াত নং ১১০]
২) আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَلَقَدْ أُوحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ (٦٥) بَلِ اللَّهَ فَاعْبُدْ وَكُنْ مِنَ الشَّاكِرِينَ (٦٦)
আপনার প্রতি এবং আপনার পূর্ববর্তীদের পতি প্রত্যাদেশ হয়েছে, যদি আল্লাহর শরীক স্থির করেন, তবে আপনার কর্ম নিষ্ফল হবে এবং আপনি ক্ষতিগ্রস্তদের একজন হবেন। বরং আল্লাহরই এবাদত করুন এবং কৃতজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত থাকুন। [আয-যুমার: আয়াত নং ৬৫-৬৬]
৩) আবু হুরায়রা ( ) থেকে বর্ণিত, তিনি নাবী কারীম –হুল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম– থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
«قَالَ اللهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى: أَنَا أَغْنَى الشُّرَكَاء عَنِ الشَّرْكِ، مَنْ عَمِلَ عَمَلاً أَشْرَكَ فِيهِ مَعِي غيري، تركته وشركه» أخرجه مسلم برقم (٢٩٨٥).
আল্লাহ তা'আলা বলেন: আমি সকল অংশীদারদের থেকে সর্বাধিক স্বয়ংসম্পূর্ণ ও ক্ষমতাশালী। যে ব্যক্তি এমন কোনো আমল করল, যেই আমলে আমার সাথে অন্য কাউকে অংশীদার করে, আমি তাকে ও তার শিরকযুক্ত আমলকে পরিত্যাগ করি। ছুহীহ মুসলিম হা/২৯৮৫।
খফী শিরকের প্রকারসমূহ: খফী শিরক দুই প্রকার:
১– খফী শিরক আকবর (شرك خفي أكبر) বা বড় গোপন শিরক : বড় গোপন শিরক, যা নিফাক্ব আল-আকবার-এর সমতুল্য। খফী শিরক আকবর বা বড় গোপন শিরক হল– আল্লাহ তা'আলার বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্য যথা: সৃষ্টি, ইবাদত ইত্যাদির ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে গায়রুল্লাহকে সমতুল্য করা।
২– খফী শিরক আছুগার (شرك خفي أصغر) বা ছোট গোপন শিরক: ছোট গোপন শিরক এর ব্যবধান বিশিষ্ট অনেকগুলো স্তর রয়েছে, যেগুলোর ব্যাপারে গায়েবের বিষয়ে সবজান্তা আল্লাহ তা'আলাই ভালো জানেন। বড় গোপন শিরক-এ লিপ্ত ব্যক্তি চিরকাল জাহান্নামে অবস্থান করবে। আর ছোট গোপন শিরক-এ লিপ্ত ব্যক্তি অনেক বড় বিপদ ও ঝুঁকির সম্মুখীন, তবে আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী তার পরকালের পরিণতি নির্ধারিত হবে।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افترى إنما عظيمًا (٤٨)
নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে লোক তাঁর সাথে শরীক করে। তিনি ক্ষমা করেন এর নিম্ন পর্যায়ের পাপ, যার জন্য তিনি ইচ্ছা করেন। আর যে লোক অংশীদার সাব্যস্ত করল আল্লাহর সাথে, সে যেন অপবাদ আরোপ করল। [আন নিসা: আয়াত নং ৪৮]
📄 শিরক আল-আকবার এর বিধান
আল্লাহ তা'আলা এই শিরকের গুনাহ তাওবা ছাড়া ক্ষমা করবেন না। এই শিরকে লিপ্ত ব্যক্তি চিরস্থায়ী জাহান্নামী, এই শিরক সমস্ত আমল ধ্বংস করে দেয়। এই শিরকে লিপ্ত ব্যক্তিকে হত্যা করা এবং তার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা বৈধ।
১-আল্লাহ তা'আলা বলেন, {إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ به وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلكَ لِمَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افترى إنما عظيما (٤٨)} [النساء: ٤٨] .
নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে লোক তাঁর সাথে শরীক করে। তিনি ক্ষমা করেন এর নিম্ন পর্যায়ের পাপ, যার জন্য তিনি ইচ্ছা করেন। আর যে লোক অংশীদার সাব্যস্ত করল আল্লাহর সাথে, সে যেন অপবাদ আরোপ করল। [আন নিসা: আয়াত নং ৪৮]
২-আল্লাহ তা'আলা বলেন, {وَلَقَدْ أُوحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الخاسرين (٦٥)} [الزمر: ٦٥] .
আপনার প্রতি এবং আপনার পূর্ববর্তীদের পতি প্রত্যাদেশ হয়েছে, যদি আল্লাহর শরীক স্থির করেন, তবে আপনার কর্ম নিষ্ফল হবে এবং আপনি ক্ষতিগ্রস্তদের একজন হবেন। [আয-যুমার: আয়াত নং ৬৫]