📄 আল-কুফরুল আকবার ও আল-কুফরুল আছগার- এর মাঝে পার্থক্য
১. আল-কুফরুল-আকবর – ব্যক্তিকে দীন থেকে বহিষ্কার করে দেয়। তার আমলসমূহ বিনষ্ট করে দেয়। এই কুফুরে লিপ্ত ব্যক্তির জন্য চিরস্থায়ী জাহান্নাম অবধারিত হয়ে যায় এবং তাকে হত্যা করা ও তার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা বৈধ হয়ে যায়। কোনো মুমিনের জন্য তাকে ভালোবাসা ও তার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করা নিষিদ্ধ।
২. আল-কুফরুল আছগার ব্যক্তিকে দীন থেকে বহিষ্কার করে না। তার আমলসমূহ বিনষ্ট করে না, তবে কুফুরির পরিমাণ অনুপাতে আমলকে ত্রুটিযুক্ত করে দেয়। এ কুফুরে লিপ্ত ব্যক্তি শাস্তি ভোগ করার যোগ্য বলে বিবেচিত হয়। তবে তার জন্য জাহান্নাম চিরস্থায়ী অবধারিত হয় না। বিধায় তাকে শাস্তি দেয়ার পরে জাহান্নাম থেকে বের করে আনা হবে। আবার কাউকে আল্লাহ তা'আলা
ক্ষমা করে দিলে তাকে কখনোই জাহান্নামে প্রবেশ করান না। এই কুফুরে লিপ্ত ব্যক্তিকে হত্যা বা তার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা বৈধ নয় এবং এই কুফুর বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণকেও নিষিদ্ধ করে না। সুতরাং এই কুফুরে লিপ্ত ব্যক্তির সাথে তার মাঝে বিদ্যমান ঈমান অনুযায়ী বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করা হবে এবং তার মাঝে বিদ্যমান নাফরমানী অনুযায়ী তার সাথে শত্রুতা ও ঘৃণাপূর্ণ আচরণ করা হবে।
📄 কুফর-এর কারণসমূহ
কুফর-এর অনেকগুলো কারণ রয়েছে। তন্মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলি হল: ১- মূর্খতা ও বিপথগামীতা (الجهل والضلال), পূর্বসূরিদের অন্ধানুগত্য (و تقليد الأسلاف)। এটা হল অধিকাংশ জনসাধারণ ও অন্ধ অনুসারিদের কুফুর-এর কারণ।
(১) আল্লাহ তা'আলা বলেন:
{وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ اتَّبِعُوا مَا أَنْزَلَ اللَّهُ قَالُوا بَلْ نَتَّبِعُ مَا أَلْفَيْنَا عَلَيْهِ آبَاءَنَا أَوَلَوْ كَانَ آبَاؤُهُمْ لَا يَعْقِلُونَ شَيْئًا وَلَا يَهْتَدُونَ (۱۷۰)} [البقرة : ۱۷۰].
আর যখন তাদেরকে কেউ বলে যে, সে হুকুমেরই আনুগত্য কর যা আল্লাহ তা'আলা নাযিল করেছেন, তখন তারা বলে কখনো না, আমরা তো সে বিষয়েরই অনুসরণ করব। যাতে আমরা আমাদের বাপ-দাদাদেরকে দেখেছি। যদি ও তাদের বাপ দাদারা কিছুই জানতো না, জানতো না সরল পথও। [আল বাকারা: আয়াত নং ১৭০]
(২) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
{وَقَالُوا مَا هِيَ إِلَّا حَيَاتُنَا الدُّنْيَا نَمُوتُ وَنَحْيَا وَمَا يُهْلِكُنَا إِلَّا الدَّهْرُ وَمَا لَهُمْ بِذَلِكَ مِنْ عِلْمٍ إِنْ هُمْ إِلَّا يَظُنُّونَ (٢٤)} [الجاثية : ٢٤].
তারা বলে, আমাদের পার্থিব জীবনই তো শেষ; আমরা মরি ও বাঁচি মহাকালই আমাদেরকে ধ্বংস করে। তাদের কাছে এ ব্যাপারে কোন জ্ঞান নেই। তারা কেবল অনুমান করে কথা বলে। [আল জাসিয়াহ: আয়াত নং ২৪]
২- অস্বীকার ও একগুঁয়েমি (الجحود والعناد), হিংসা ও অহংকার (والحسد والکبر)। আর এই কারণটি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিলক্ষিত হয় ঐ সকল ব্যক্তির মাঝে, যাদের স্বীয় জাতির নিকট জ্ঞান-বিদ্যার ময়দানে শক্তিশালী নেতৃত্ব রয়েছে। যেমন- ইহুদী ও খ্রিস্টান্দের সন্ন্যাসী ও যাজকশ্রেণী। অথবা যাদের স্বীয় জাতির নিকট রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব রয়েছে। যেমন- ফির'আউন, কিসরা ও কায়ছার। অথবা যাদের স্বীয় জাতির নিকট বাণিজ্যিক স্বার্থ রয়েছে। যেমন- কারুন। সুতরাং ব্যবসায়ী তার সম্পদের হারানোর ব্যাপারে, বাদশাহ তার রাজত্ব সারানোর ব্যাপারে এবং যাজকশ্রেণী তাদের মর্যাদা হারানোর ব্যাপারে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে কুফুরিকে ঈমানের উপর প্রাধান্য দিয়ে থাকে।
(১) আল্লাহ তা'আলা বলেন: {وَلَمَّا جَاءَهُمْ كِتَابٌ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ مُصَدِّقٌ لِمَا مَعَهُمْ وَكَانُوا مِنْ قَبْلُ يَسْتَفْتِحُونَ عَلَى الَّذِينَ كَفَرُوا فَلَمَّا جَاءَهُمْ مَا عَرَفُوا كَفَرُوا بِهِ فَلَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الْكَافِرِينَ} [البقرة : ٨٩]. যখন তাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে কিতাব এসে পৌঁছাল, যা সে বিষয়ের সত্যায়ন করে, যা তাদের কাছে রয়েছে এবং তারা পূর্বে করত। অবশেষে যখন তাদের কাছে পৌঁছল যাকে তারা চিনে রেখেছিল, তখন তারা তা অস্বীকার করে বসল। অতএব, অস্বীকারকারীদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত। [আল বাকারা: আয়াত নং ৮৯]
(২) আল্লাহ তা'আলা বলেন: {ثُمَّ بَعَثْنَا مِنْ بَعْدِهِمْ مُوسَى وَهَارُونَ إِلَى فِرْعَوْنَ وَمَلَئِهِ بِآيَاتِنَا فَاسْتَكْبَرُوا وَكَانُوا قَوْمًا مُجْرِمِينَ (٧٥)} [يونس : ٧٥]. অতঃপর তাদের পেছনে পাঠিয়েছি আমি মূসা ও হারুনকে, ফেরাউন ও তার সর্দারের প্রতি স্বীয় নির্দেশাবলী সহকারে। অথচ তারা অহংকার করতে আরম্ভ করেছে। [ইউনুস: আয়াত নং ৭৫]
(৩) আল্লাহ তা'আলা বলেন: {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ كَثِيرًا مِنَ الْأَحْبَارِ وَالرُّهْبَانِ لَيَأْكُلُونَ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالْبَاطِلِ وَيَصُدُّونَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ} [التوبة : ٣٤].
হে ঈমানদারগণ! পন্ডিত ও সংসারবিরাগীদের অনেকে লোকদের মালামাল অন্যায়ভাবে ভোগ করে চলছে এবং আল্লাহর পথ থেকে লোকদের নিবৃত রাখছে। [আত তাওবাহ: আয়াত নং ৩৪]
(৪) আল্লাহ তা'আলা বলেন: {وَجَحَدُوا بِهَا وَاسْتَيْقَنَتُهَا أَنْفُسُهُمْ ظُلْمًا وَعُلُوًّا فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُفْسِدِينَ (١٤)}
[النمل: ١٤] . তারা অন্যায় ও অহংকার করে নিদর্শনাবলীকে প্রত্যাখ্যান করল, যদিও তাদের অন্তর এগুলো সত্য বলে বিশ্বাস করেছিল। অতএব দেখুন, অনর্থকারীদের পরিণাম কেমন হয়েছিল? [আন নামল: আয়াত নং ১৪]
৩- সত্যকে পরিপূর্ণরূপে অবজ্ঞা করা (الإعراض المحض عن الحق)। বিধায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সত্যের প্রতি দৃষ্টিপাত করে না, সত্যকে ভালোবাসতে পারে না, সত্যের প্রতি রাগও করে না, সত্যের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ বা শত্রুতাপূর্ণ আচরণ কোনোটিই করে না। কেননা, তার অন্তর অন্যকোনো বস্তুর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে আছে।
যেমন- সম্পদ ও প্রবৃত্তির প্রতি ভালোবাসা, দেশ ও মাতৃভূমির প্রতি আন্তরিক টান অনুভব করা ও নিজ পরিবার-পরিজন ও অভ্যাসের প্রতি দুর্বল থাকা। (১) আল্লাহ তা'আলা বলেন:
{مَا خَلَقْنَا السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا إِلَّا بِالْحَقِّ وَأَجَلٍ مُسَمًّى وَالَّذِينَ كَفَرُوا عَمَّا أُنْذِرُوا مُعْرِضُونَ (۳)} [الأحقاف : ٣].
নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু আমি যথাযথভাবেই এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্যেই সৃষ্টি করেছি। আর কাফেররা যে বিষয়ে তাদেরকে সতর্ক করা হয়েছে, তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। [আল আহকাফ: আয়াত নং ৩] (২) আল্লাহ তা'আলা বলেন:
{وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ اتَّبِعُوا مَا أَنزَلَ اللَّهُ قَالُوا بَلْ نَتَّبِعُ مَا وَجَدْنَا عَلَيْهِ آبَاءَنَا أَوَلَوْ كَانَ الشَّيْطَانُ يَدْعُوهُمْ إِلَى عَذَابِ السَّعِيرِ (۲۱)} [لقمان: ۲۱].
তাদেরকে যখন বলা হয়, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তোমরা তার অনুসরণ কর, তখন তারা বলে, বরং আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে যে বিষয়ের উপর পেয়েছি, তারই অনুসরণ করব। শয়তান যদি তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তির দিকে দাওয়াত দেয়, তবুও কি? [লোকমান: আয়াত নং ২১]
📄 কাফেরদের শাস্তি
প্রত্যেক কাফের দুনিয়াতে অমানিশা, হয়রানি-হতাশা, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও দুর্দশা-দুর্ভাগ্যের মাঝে বসবাস করে। কারণ, সে ঈমানের নূর থেকে বঞ্চিত হয়েছে এবং ছিরাতে মুসতাক্বীম থেকে বিচ্যুত হয়েছে।
আল্লাহ তা'আলা বলেন, {الر كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ لِتُخْرِجَ النَّاسَ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ بِإِذْنِ رَبِّهِمْ إِلَى صِرَاطِ الْعَزِيزِ الْحَمِيدِ (۱)} [إبراهيم : ١].
আলিফ-লাম-রা; এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি-যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন-পরাক্রান্ত, প্রশংসার যোগ্য পালনকর্তার নির্দেশে তাঁরই পথের দিকে। [ইব্রাহীম: আয়াত নং ১]
কাফেররা জাহান্নামে তাদের কুফরী কর্মের রূঢ়তা ও কঠোরতার আনুপাতিক হারে শাস্তি ভোগ করবে। কুফরীর কঠোরতা যা বাধ্যতামূলক শাস্তির সংঘটক তিনটি স্তরে বিভক্ত।
প্রথম: ঐ ব্যক্তি যে রাব্বুল আলামীনের অস্তিত্ব সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে এবং সৃষ্টিজগৎকে তার পরিচালনাকারী একমাত্র সৃষ্টা প্রতিপালক থেকে বিচ্ছিন্ন ও মুক্ত মনে করে। এরাই হল ঐ সকল নাস্তিক, যারা সৃষ্টিজগৎ-এর রবকে অস্বীকার করে, যাদের ইমাম হল ফির'আউন (وَإِمَامُهُمْ فِرْعَوْن)। এটা হল সবচে জঘন্যতম কুফরী। আর কেয়ামতের দিন এর শাস্তিও সবচে কঠোর হবে।
১) আল্লাহ তা'আলা বলেন: {وَقَالُوا مَا هِيَ إِلَّا حَيَاتُنَا الدُّنْيَا نَمُوتُ وَنَحْيَا وَمَا يُهْلِكُنَا إِلَّا الدَّهْرُ وَمَا لَهُمْ بِذَلِكَ مِنْ عِلْمٍ إِنْ هُمْ إِلَّا يَظُنُّونَ (٢٤)} [الجاثية : ٢٤].
তারা বলে, আমাদের পার্থিব জীবনই তো শেষ; আমরা মরি ও বাঁচি মহাকালই আমাদের ধ্বংস করে। তাদের কাছে এ ব্যাপারে কোন জ্ঞান নেই। তারা কেবল অনুমান করে কথা বলে। [আল জাসিয়াহ: আয়াত নং ২৪]
২) আল্লাহ তা'আলা বলেন: {وَحَاقَ بِآلِ فِرْعَوْنَ سُوءُ الْعَذَابِ (٤٥) النَّارُ يُعْرَضُونَ عَلَيْهَا غُدُوًّا وَعَشِيًّا وَيَوْمَ تَقُومُ السَّاعَةُ أَدْخِلُوا آلَ فِرْعَوْنَ أَشَدَّ الْعَذَابِ (٤٦)} [غافر : ٤٥ - ٤٦] .
অতঃপর আল্লাহ তাকে তাদের চক্রান্তের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করলেন এবং ফেরাউন গোত্রকে শোচনীয় আযাব গ্রাস করল। সকালে ও সন্ধ্যায় তাদেরকে আগুনের সামনে পেশ করা হয় এবং যেদিন কেয়ামত সংঘটিত হবে, সেদিন আদেশ করা হবে, ফেরাউন গোত্রকে কঠিনতর আযাবে দাখিল কর। [আল মু'মিন: আয়াত নং ৪৫-৪৬]
দ্বিতীয়: ঐ ব্যক্তি যার অন্তর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সত্যতার পক্ষে প্রমাণাদি স্বচক্ষে দর্শন করার পরেও একগুঁয়েমি ও বিদ্বেষমূলকভাবে কুফুরি করে। যেমন- মুনাফেক্বশ্রেণী ও তাদের ন্যায় অন্যান্যরা।
১) আল্লাহ তা'আলা বলেন: {كَيْفَ يَهْدِي اللَّهُ قَوْمًا كَفَرُوا بَعْدَ إِيمَانِهِمْ وَشَهِدُوا أَنَّ الرَّسُولَ حَقٌّ وَجَاءَهُمُ الْبَيِّنَاتُ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ (٨٦) أُولَئِكَ جَزَاؤُهُمْ أَنَّ عَلَيْهِمْ لَعْنَةَ اللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ (۸۷) خَالِدِينَ فِيهَا لَا يُخَفَّفُ عَنْهُمُ الْعَذَابُ وَلَا هُمْ يُنْظَرُونَ (۸۸))} [آل عمران : ٨٦ - ۸۸] .
কেমন করে আল্লাহ এমন জাতিকে হেদায়েত দান করবেন, যারা ঈমান আনার পর এবং রসূলকে সত্য বলে সাক্ষ্য দেয়ার পর এবং তাদের নিকট প্রমাণ এসে যাওয়ার পর কাফের হয়েছে। আর আল্লাহ জালেম সম্প্রদায়কে হেদায়েত দান করেন না। এমন লোকের শাস্তি হলো আল্লাহ, মালাইকা-ফেরেশতাগণ এবং মানুষ সকলেরই অভিসম্পাত। সর্বক্ষণই তারা তাতে থাকবে। তাদের আযাব হালকাও হবে না এবং তার এত অবকাশও পাবে না। [আলে ইমরান: আয়াত নং৮৬-৮৮]
২) আল্লাহ তা'আলা বলেন, {إِنَّ الْمُنَافِقِينَ فِي الدَّرْكِ الْأَسْفَلِ مِنَ النَّارِ وَلَنْ تَجِدَ لَهُمْ نَصِيرًا (١٤٥)} [النساء : ١٤٥].
নিঃসন্দেহে মুনাফেকরা রয়েছে দোযখের সর্বনিম্ন স্তরে। আর তোমরা তাদের জন্য কোন সাহায্যকারী কখনও পাবে না। [আন নিসা: আয়াত নং ১৪৫]
তৃতীয়: ঐ সকল কাফের, যারা আল্লাহ তা'আলার দীনের আলো নিভানো ও আল্লাহ তা'আলার বান্দাদেরকে তার দীন থেকে বিরত রাখার জন্য তাদের সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা-প্রচেষ্টা করে থাকে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, الَّذِينَ كَفَرُوا وَصَدُّوا عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ زِدْنَاهُمْ عَذَابًا فَوْقَ الْعَذَابِ بِمَا كَانُوا يُفْسِدُونَ (۸۸)} [النحل : ۸۸] .
যারা কাফের হয়েছে এবং আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টি করেছে, আমি তাদেরকে আযাবের পর আযাব বাড়িয়ে দেব। কারণ, তারা অশান্তি সৃষ্টি করত। [আন নাহল: আয়াত নং ৮৮]
কাফেরদের মধ্যে এরাই ক্বীয়ামতের দিন সর্বাপেক্ষা কঠোর শাস্তি ভোগ করবে। আর তাদের শাস্তি নির্ধারিত হবে তাদের কুফুরীর কঠোরতা, তাদের অবাধ্যতা ও তাদের অনিষ্টতার পরিমাণ অনুপাতে।
চতুর্থ: ঐ সকল মূর্খ ও সাধারণ কাফের, যারা পূর্বোক্ত কাফেরদের চেয়ে – কম কঠোর, যারা মুসলিমদেরকে কষ্ট দেয় না। তারা যদিও তাদের সঙ্গেই জাহান্নামে অবস্থান করবে, কিন্তু তাদের শাস্তির পরিমাণ পূর্বোক্ত কাফেরদের তুলনায় অনেকাংশেই কম হবে।
১-আল্লাহ তা'আলা বলেন, اللَّهُ وَلِيُّ الَّذِينَ آمَنُوا يُخْرِجُهُمْ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ وَالَّذِينَ كَفَرُوا أَوْلِيَاؤُهُمُ الطَّاغُوتُ يُخْرِجُونَهُمْ مِنَ النُّورِ إِلَى الظُّلُمَاتِ أُولَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ} [البقرة: . [٢٥٧
যারা ঈমান এনেছে, আল্লাহ তাদের অভিভাবক। তাদেরকে তিনি বের করে আনেন অন্ধকার থেকে আলোর দিকে। আর যারা কুফরী করে তাদের অভিভাবক হচ্ছে তাগুত। তারা তাদেরকে আলো থেকে বের করে অন্ধকারের দিকে নিয়ে
যায়। এরাই হলো দোযখের অধিবাসী, চিরকাল তারা সেখানেই থাকবে। [আল বাকারা: আয়াত নং ২৫৭]
২) আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: إِنَّ أَدْنَى أَهْلِ النَّارِ عَذَاباً ، يَنْتَعِلُ بِنَعْلَيْنِ مِنْ نَارٍ، يَغْلِي دِمَاغُهُ مِنْ حَرَارَةِ نَعْلَيْهِ» জাহান্নামের শাস্তি ভোগকারিদের মধ্যে সর্বনিম্ন শাস্তি ভোগকারির শাস্তি হল- তাকে আগুনের দু'টি পাদুকা পরিধান করানো হবে, যে পাদুকাদ্বয়ের আগুনের তাপের কারণে তার মস্তিষ্ক টগবগ করে ফুটতে থাকবে। ছুহীহ মুসলিম হা/২১১
মানবীয় আত্মার স্বভাব-প্রকৃতি
মানুষের হৃদয় যখন নিষ্কলুষ থাকে, তখন সে তাওহীদ, ঈমান, আনুগত্য ও কল্যাণকে প্রাধান্য দেয়। আর যখন তার হৃদয় কলুষিত হয়ে যায়, তখন কুফর, শিরক, নাফরমানী ও অনিষ্টতাকে প্রাধান্য দেয়।
মানুষ ও জ্বিন জাতির শয়তানরা এবং ইবলীস ও তার সেনাবাহিনী কুফর, শিরক, অনিষ্টতা ও নাফরমানিকে প্রাধান্য দেয় এবং এমন কুকর্মের দ্বারা তারা আনন্দ উপভোগ করে, এমন কুকর্মই তারা করতে চায় এবং এমন কুকর্মের প্রতি তারা সর্বদা আকৃষ্ট হয়ে থাকে তাদের অন্তরে বিদ্যমান প্রতারণা ও অনিষ্টতার কারণে, যদিও তা শাস্তিকে আবশ্যকীয় করে তুলে।
মানুষের স্বভাব-প্রকৃতি যখন নষ্ট হয়ে যায়, তখন সে তার জন্য ক্ষতিকর বস্তুর প্রতি আকৃষ্ট হয়, তা দ্বারা আনন্দ উপভোগ করে এবং তার প্রতি এমনভাবে অনুরাগী হয় যে, উক্ত বস্তুর কারণে সে তার বুদ্ধিমত্তা, দীন, চরিত্র, শরীর ও সম্পদ নষ্ট করে ফেলে। আর শয়তান অনিষ্টকারী শত্রু। সুতরাং যে শয়তানের প্রিয় বস্তু যেমন- কুফর, শিরক ইত্যাদি দ্বারা তার নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করে, শয়তান হয়তো তার কিছু প্রয়োজন পূরণ করে দেয়।
📄 ইসলাম ভঙ্গকারী ১০ টি বিষয়
ইসলাম লঙ্ঘনের অনেকগুলো কারণ রয়েছে, যেগুলোকে দশটি কারণে সীমাবদ্ধ করা যায়।
প্রথম: আল্লাহ তা'আলার সাথে শিরক করা )الشرك بالله(।
আল্লাহ তা'আলা বলেন: {إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْمًا عَظِيمًا (٤٨)} [النساء: ٤٨].
নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে লোক তাঁর সাথে শরীক করে। তিনি ক্ষমা করেন এর নিম্ন পর্যায়ের পাপ, যার জন্য তিনি ইচ্ছা করেন। আর যে লোক অংশীদার সাব্যস্ত করল আল্লাহর সাথে, সে যেন অপবাদ আরোপ করল। [আন নিসা: আয়াত নং ৪৮]
দ্বিতীয়: যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার মাঝে এবং তার মাঝে এমন মধ্যস্থ ব্যক্তিদের ব্যবধান রচনা করে, যাদের নিকট তারা প্রার্থনা করে, যাদের উপর পূর্ণরূপে ভরসা করে ويتوكل عليهم(এবং যাদের নিকট সুপারিশ কামনা করে ويسألهم الشفاعة), সে কাফের )فهو كافر(।
১) আল্লাহ তা'আলা বলেন: قُلْ أَفَرَأَيْتُمْ مَا تَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِنْ أَرَادَنِي اللَّهُ بِضُرٍّ هَلْ هُنَّ كَاشِفَاتُ ضُرِّهِ أَوْ أَرَادَنِي بِرَحْمَةٍ هَلْ هُنَّ مُمْسِكَاتُ رَحْمَتِهِ قُلْ حَسْبِيَ اللَّهُ عَلَيْهِ يَتَوَكَّلُ الْمُتَوَكِّلُونَ (۳۸)} [الزمر: ٣٨].
বলুন, তোমরা ভেবে দেখেছ কি, যদি আল্লাহ আমার অনিষ্ট করার ইচ্ছা করেন, তবে তোমরা আল্লাহ ব্যতীত যাদেরকে ডাক, তারা কি সে অনিষ্ট দূর করতে পারবে? অথবা তিনি আমার প্রতি রহমত করার ইচ্ছা করলে তারা কি সে রহমত রোধ করতে পারবে? বলুন, আমার পক্ষে আল্লাহই যথেষ্ট। নির্ভরকারীরা তাঁরই উপর নির্ভর করে। [আয-যুমার: আয়াত নং ৩৮]
২) আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَيَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنْفَعُهُمْ وَيَقُولُونَ هَؤُلَاءِ شُفَعَاؤُنَا عِنْدَ اللَّهِ قُلْ أَتُنَبِّئُونَ اللَّهَ بِمَا لَا يَعْلَمُ فِي السَّمَاوَاتِ وَلَا فِي الْأَرْضِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ [يونس : ١٨].(۱۸)
আর উপাসনা করে আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন বস্তুর, যা না তাদের কোন ক্ষতিসাধন করতে পারে, না লাভ এবং বলে, এরা তো আল্লাহর কাছে আমাদের সুপারিশকারী। তুমি বল, তোমরা কি আল্লাহকে এমন বিষয়ে অবহিত করছ, যে সম্পর্কে তিনি অবহিত নন আসমান ও যমীনের মাঝে? তিনি পুতঃপবিত্র ও মহান সে সমস্ত থেকে যাকে তোমরা শরীক করছ। [ইউনুস: আয়াত নং ১৮]
তৃতীয়: যে ব্যক্তি মুশরিকদেরকে কাফের মনে করে না (من لم يكفر المشركين) বা তাদের কুফুরির ব্যাপারে সন্দিহান (أو شك في كفرهم) অথবা তাদের মতাদর্শকে সঠিক মনে করে (أو صحح مذهبهم), সে কাফের (فهو كافر)।
১) আল্লাহ তা'আলা বলেন:
قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِي إِبْرَاهِيمَ وَالَّذِينَ مَعَهُ إِذْ قَالُوا لِقَوْمِهِمْ إِنَّا بُرَآءُ مِنْكُمْ وَمِمَّا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ كَفَرْنَا بِكُمْ وَبَدَا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةُ وَالْبَغْضَاءُ أَبَدًا حَتَّى تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَحْدَهُ} [الممتحنة: ٤].
তোমাদের জন্যে ইব্রাহীম ও তাঁর সঙ্গীগণের মধ্যে চমৎকার আদর্শ রয়েছে। তারা তাদের সম্প্রদায়কে বলেছিলঃ তোমাদের সাথে এবং তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যার এবাদত কর, তার সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদের মানি না। তোমরা এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন না করলে তোমাদের মধ্যে ও আমাদের মধ্যে চিরশত্রুতা থাকবে। [আল মুম্তাহিনাহ্: আয়াত নং ৪]
২) আল্লাহ তা'আলা বলেন:
{لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ قَدْ تَبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ فَمَنْ يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ وَيُؤْمِنُ بِاللَّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَى لَا انْفِصَامَ لَهَا وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ (٢٥٦)} [البقرة: ٢٥٦].
দীনের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি বা বাধ্য-বাধকতা নেই। নিঃসন্দেহে হেদায়াত গোমরাহী থেকে পৃথক হয়ে গেছে। এখন যারা গোমরাহকারী 'তাগুত'দেরকে মানবে না এবং আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন করবে, সে ধারণ করে নিয়েছে সুদৃঢ় হাতল যা ভাংবার নয়। আর আল্লাহ সবই শুনেন এবং জানেন। [আল বাকারা: আয়াত নং ২৫৬]
চতুর্থ: যে বিশ্বাস করে — মুহাম্মাদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম — এর আদর্শের চেয়ে অন্যকারো আদর্শ উত্তম বা অন্যকারো বিধান তার বিধান থেকে উত্তম, তবে সে কাফের।
১) আল্লাহ তা'আলা বলেন: {فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا (٦٥)} [النساء : ٦٥].
অতএব, তোমার পালনকর্তার কসম, সে লোক ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে ন্যায়বিচারক বলে মনে না করে। অতঃপর তোমার মীমাংসার ব্যাপারে নিজের মনে কোন রকম সংকীর্ণতা পাবে না এবং তা হৃষ্টচিত্তে কবুল করে নেবে। [আন নিসা: আয়াত নং ৬৫]
২) আল্লাহ তা'আলা বলেন: {وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ (٨٥)} [آل عمران : ٨٥] .
যে লোক ইসলাম ছাড়া অন্য কোন দীন তালাশ করে, কস্মিণকালেও তা গ্রহণ করা হবে না এবং আখেরাতে সে হবে ক্ষতিগ্রস্ত। [আলে ইমরান: আয়াত নং ৮৫]
পঞ্চম: যে ব্যক্তি রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আনীত কোনো বিধানের প্রতি ঘৃণা পোষণ করে – যদিও তার প্রতি সে আমল করে থাকে – তবে সে কুফরী করল।
১) আল্লাহ তা'আলা বলেন: {وَالَّذِينَ كَفَرُوا فَتَعْسًا لَهُمْ وَأَضَلَّ أَعْمَالَهُمْ (۸) ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَرِهُوا مَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأَحْبَطَ أَعْمَالَهُمْ (۹)} [محمد : ۸ - ۹] .
আর যারা কাফের, তাদের জন্যে আছে দুর্গতি এবং তিনি তাদের কর্ম বিনষ্ট করে দিবেন। এটা এজন্যে যে, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তারা তা পছন্দ করে না। অতএব, আল্লাহ তাদের কর্ম ব্যর্থ করে দিবেন। [মুহাম্মাদ: আয়াত নং ৮-৯]
২) আল্লাহ তা'আলা বলেন: { ذَلِكَ بِأَنَّهُمُ اتَّبَعُوا مَا أَسْخَطَ اللَّهَ وَكَرِهُوا رِضْوَانَهُ فَأَحْبَطَ أَعْمَالَهُمْ (۲۸)} [محمد : ۲۸] .
এটা এজন্যে যে, তারা সেই বিষয়ের অনুসরণ করে, যা আল্লাহর অসন্তোষ সৃষ্টি করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে অপছন্দ করে। ফলে তিনি তাদের কর্মসমূহ ব্যর্থ করে দেন। [মুহাম্মাদ: আয়াত নং ২৮]
ষষ্ঠ: যে ব্যক্তি রসূল - ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম - এর আনীত কোনো একটি বিধানের বা তার ছওয়াব বা শাস্তির প্রতি ঠাট্টা বিদ্রুপ করে, সে কুফুরি করল।
১) আল্লাহ তা'আলা বলেন: {وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنْتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ (٦٥) لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ إِنْ نَعْفُ عَنْ طَائِفَةٍ مِنْكُمْ نُعَذِّبْ طَائِفَةً بِأَنَّهُمْ كَانُوا مُجْرِمِينَ (٦٦)} [التوبة : ٦٥ - ٦٦].
আর যদি তুমি তাদের কাছে জিজ্ঞেস কর, তবে তারা বলবে, আমরা তো কথার কথা বলছিলাম এবং কৌতুক করছিলাম। আপনি বলুন, তোমরা কি আল্লাহর সাথে, তাঁর হুকুম আহকামের সাথে এবং তাঁর রসূলের সাথে ঠাট্টা করছিলে? ছলনা কর না, তোমরা যে কাফের হয়ে গেছ ঈমান প্রকাশ করার পর। তোমাদের মধ্যে কোন কোন লোককে যদি আমি ক্ষমা করে দেইও, তবে অবশ্য কিছু লোককে আযাবও দেব। কারণ, তারা ছিল গোনাহগার। [আত তাওবাহ্: আয়াত নং ৬৫-৬৬]
২) আল্লাহ তা'আলা বলেন: { وَقَدْ نَزَّلَ عَلَيْكُمْ فِي الْكِتَابِ أَنْ إِذَا سَمِعْتُمْ آيَاتِ اللَّهِ يُكْفَرُ بِهَا وَيُسْتَهْزَأُ بِهَا فَلَا تَقْعُدُوا مَعَهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ إِنَّكُمْ إِذًا مِثْلُهُمْ إِنَّ اللَّهَ جَامِعُ الْمُنَافِقِينَ وَالْكَافِرِينَ في جَهَنَّمَ جَمِيعًا (١٤٠)} [النساء : ١٤٠] .
আর কোরআনের মাধ্যমে তোমাদের প্রতি এই হুকুম জারি করে দিয়েছেন যে, যখন আল্লাহ তা'আলার আয়াতসমূহের প্রতি অস্বীকৃতি জ্ঞাপন ও বিদ্রুপ হতে শুনবে, তখন তোমরা তাদের সাথে বসবে না, যতক্ষণ না তারা প্রসঙ্গান্তরে চলে যায়। তা না হলে তোমরাও তাদেরই মত হয়ে যাবে। আল্লাহ দোযখের মাঝে মুনাফেক ও কাফেরদেরকে একই জায়গায় সমবেত করবেন। [আন নিসা: আয়াত নং ১৪০]
সপ্তম: যে ব্যক্তি এই কথা বিশ্বাস করে যে, কিছু মানুষের জন্য মুহাম্মাদ - ইস্তাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম - এর শরীয়তের সীমা লঙ্ঘনের অধিকার রাখে, সে কাফের।
১) আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَأَنَّ هَذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَنْ سَبِيلِهِ ذَلِكُمْ وَصَّاكُمْ بِهِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ (١٥٣)} [الأنعام: ١٥٣].
তোমাদেরকে এ নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর। নিশ্চিত এটি আমার সরল পথ। অতএব, এ পথে চল এবং অন্যান্য পথে চলো না। তা হলে সেসব পথ তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিবে। তোমাদেরকে এ নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তোমরা সংযত হও। [আল আনআম: আয়াত নং ১৫৩]
২) আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَمَنْ يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا (١١٥)} [النساء : ١١٥].
যে কেউ রসূলের বিরুদ্ধাচারণ করে, তার কাছে সরল পথ প্রকাশিত হওয়ার পর এবং সব মুসলমানের অনুসৃত পথের বিরুদ্ধে চলে, আমি তাকে ঐ দিকেই ফেরাব যে দিক সে অবলম্বন করেছে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। আর তা নিকৃষ্টতর গন্তব্যস্থান। [আন নিসা: আয়াত নং ১১৫]
অষ্টম: আল্লাহ তা'আলার দীন থেকে অবজ্ঞার সাথে এমনভাবে মুখ ফিরিয়ে নেয়া, যে তা শিক্ষার প্রতি এবং আমলের প্রতি কোনো প্রকার গুরুত্বই না থাকে।
১) আল্লাহ তা'আলা বলেন: {وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ ذُكِّرَ بِآيَاتِ رَبِّهِ ثُمَّ أَعْرَضَ عَنْهَا إِنَّا مِنَ الْمُجْرِمِينَ مُنْتَقِمُونَ (۲۲)}
[السجدة : ٢٢].
যে ব্যক্তিকে তার পালনকর্তার আয়াতসমূহ দ্বারা উপদেশ দান করা হয়, অতঃপর সে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার চেয়ে যালেম আর কে? আমি অপরাধীদেরকে শাস্তি দেব। [আস সাজদাহ্: আয়াত নং ২২]
২) আল্লাহ তা'আলা বলেন: {وَلَقَدْ ذَرَأْنَا لِجَهَنَّمَ كَثِيرًا مِنَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ لَهُمْ قُلُوبٌ لَا يَفْقَهُونَ بِهَا وَلَهُمْ أَعْيُنٌ لَا يُبْصِرُونَ بِهَا وَلَهُمْ آذَانٌ لَا يَسْمَعُونَ بِهَا أُولَئِكَ كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ أُولَئِكَ هُمُ الْغَافِلُونَ (۱۷۹)} [الأعراف: ۱۷۹].
আর আমি সৃষ্টি করেছি দোযখের জন্য বহু জ্বিন ও মানুষ। তাদের অন্তর রয়েছে, তার দ্বারা বিবেচনা করে না, তাদের চোখ রয়েছে, তার দ্বারা দেখে না, আর তাদের কান রয়েছে, তার দ্বারা শোনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত; বরং তাদের চেয়েও নিকৃষ্টতর। তারাই হল গাফেল, শৈথিল্যপরায়ণ। [আল আ'রাফ: আয়াত নং ১৭৯]
নবম: মুশরিকদের পৃষ্ঠপোষকতা করা এবং তাদেরকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহযোগীতা ও সমর্থন দেয়া।
১) আল্লাহ তা'আলা বলেন: {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى أَوْلِيَاءَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ مِنْكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ (٥١)} [المائدة : ٥١] .
হে মুমিণগণ! তোমরা ইহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ জালেমদেরকে পথ প্রদর্শন করেন না। [আল মায়িদাহ: আয়াত নং ৫১]
২) আল্লাহ তা'আলা বলেন: {لَا يَتَّخِذِ الْمُؤْمِنُونَ الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِ الْمُؤْمِنِينَ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ فَلَيْسَ مِنَ اللَّهِ فِي شَيْءٍ إِلَّا أَنْ تَتَّقُوا مِنْهُمْ تُقَاةً وَيُحَذِّرُكُمُ اللَّهُ نَفْسَهُ وَإِلَى اللَّهِ الْمَصِيرُ (۲۸)} [آل عمران : ۲۸].
মুমিনগন যেন অন্য মুমিনকে ছেড়ে কেন কাফেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। যারা এরূপ করবে আল্লাহর সাথে তাদের কেন সম্পর্ক থাকবে না। তবে যদি তোমরা তাদের পক্ষ থেকে কোন অনিষ্টের আশঙ্কা কর, তবে তাদের সাথে সাবধানতার সাথে থাকবে আল্লাহ তা'আলা তাঁর সম্পর্কে তোমাদের সতর্ক করেছেন। এবং সবাই কে তাঁর কাছে ফিরে যেতে হবে। [আলে ইমরান: আয়াত নং ২৮]
দশম: যাদু-টোনা করা এবং এর মাধ্যমে কাউকে বিপদে নিপতিত করা আবার কাউকে সহানুভূতি দেখানো। যে ব্যক্তি এমন কর্ম সাধন করে অথবা এমন কর্মের প্রতি সন্তুষ্ট হয়, সে কুফরী করল।
১) আল্লাহ তা'আলা বলেন: {وَاتَّبَعُوا مَا تَتْلُو الشَّيَاطِينُ عَلَى مُلْكِ سُلَيْمَانَ وَمَا كَفَرَ سُلَيْمَانُ وَلَكِنَّ الشَّيَاطِينَ كَفَرُوا يُعَلِّمُونَ النَّاسَ السِّحْرَ وَمَا أُنزِلَ عَلَى الْمَلَكَيْنِ بِبَابِلَ هَارُوتَ وَمَارُوتَ وَمَا يُعَلِّمَانِ مِنْ أَحَدٍ حَتَّى يَقُولَا إِنَّمَا نَحْنُ فِتْنَةٌ فَلَا تَكْفُرْ فَيَتَعَلَّمُونَ مِنْهُمَا مَا يُفَرِّقُونَ بِهِ بَيْنَ الْمَرْءِ وَزَوْجِهِ وَمَا هُمْ بِضَارِّينَ بِهِ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ وَيَتَعَلَّمُونَ مَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنْفَعُهُمْ وَلَقَدْ عَلِمُوا لَمَنِ اشْتَرَاهُ مَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِنْ خَلَاقٍ وَلَبِئْسَ مَا شَرَوْا بِهِ أَنْفُسَهُمْ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ} [البقرة : ١٠٢].
তারা ঐ শাস্ত্রের অনুসরণ করল, যা সুলায়মানের রাজত্ব কালে শয়তানরা আবৃত্তি করত। সুলায়মান কুফর করেনি; শয়তানরাই কুফর করেছিল। তারা মানুষকে জাদুবিদ্যা এবং বাবেল শহরে হারুত ও মারুত দুই মালাইকা-ফেরেশতাদ্বয়ের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছিল, তা শিক্ষা দিত। তারা উভয়ই একথা না বলে কাউকে শিক্ষা দিত না যে, আমরা পরীক্ষার জন্য; কাজেই তুমি কাফের হয়ো না। অতঃপর তারা তাদের কাছ থেকে এমন জাদু শিখত, যদ্বারা স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে। তারা আল্লাহর আদেশ ছাড়া তদ্দ্বারা কারও অনিষ্ট করতে পারত
না। যা তাদের ক্ষতি করে এবং উপকার না করে, তারা তাই শিখে। তারা ভালরূপে জানে যে, যে কেউ জাদু অবলম্বন করে, তার জন্য পরকালে কোন অংশ নেই। যার বিনিময়ে তারা আত্মবিক্রয় করেছে, তা খুবই মন্দ যদি তারা জানত। [আল বাকারা: আয়াত নং ১০২]
২) আল্লাহ তা'আলা বলেন:
{وَأَلْقِ مَا فِي يَمِينِكَ تَلْقَفْ مَا صَنَعُوا إِنَّمَا صَنَعُوا كَيْدُ سَاحِرٍ وَلَا يُفْلِحُ السَّاحِرُ حَيْثُ أَتَى (٦٩)} [طه: ٦৯] .
তোমার ডান হাতে যা আছে তুমি তা নিক্ষেপ কর। এটা যা কিছু তারা করেছে তা গ্রাস করে ফেলবে। তারা যা করেছে তা তো কেবল যাদুকরের কলাকৌশল। [ত্বোয়াহ: আয়াত নং ৬৯]
এটা ইসলাম ভঙ্গের সবচে বড়, সবচেয়ে বিপজ্জনক এবং সর্বাধিক সংঘটিত কারণ। উল্লিখিত লঙ্ঘনকারী কারণসমূহের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই ঠাট্টা- রসিকতা কারী, গুরুগম্ভীর ও ভীতসন্ত্রস্ত ব্যক্তির মাঝে। তবে চাপপ্রয়োগ কৃত ব্যক্তি এই বিধানের আওতাভুক্ত নয়। আর চাপপ্রয়োগ কথা ও কর্ম উভয়টির দ্বারাই হতে পারে।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
مَنْ كَفَرَ بِاللَّهِ مِنْ بَعْدِ إِيمَانِهِ إِلَّا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنَّ بِالْإِيمَانِ وَلَكِنْ مَنْ شَرَحَ بِالْكُفْرِ صَدْرًا فَعَلَيْهِمْ غَضَبٌ مِنَ اللَّهِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ (١٠٦)} [النحل : ١٠٦].
যার উপর জবরদস্তি করা হয় এবং তার অন্তর বিশ্বাসে অটল থাকে সে ব্যতীত যে কেউ বিশ্বাসী হওয়ার পর আল্লাহতে অবিশ্বাসী হয় এবং কুফরীর জন্য মন উম্মুক্ত করে দেয় তাদের উপর আপতিত হবে আল্লাহর গযব এবং তাদের জন্যে রয়েছে শাস্তি। [আন নাহল: আয়াত নং ১০৬]