📄 কুফরীর প্রকারসমূহ
কুফরী মুলত দুই প্রকার (الكفر قسمان):
প্রথম প্রকার: আল-কুফরুল আকবার বা বড় কুফরী (كفر أكبر), যা ব্যক্তিকে দীন থেকে বহিষ্কার করে দেয়। এটি পাঁচ প্রকার:
১. কুফর আত-তাকযীব-অবিশ্বাসমূলক কুফরী (كفر التكذيب):
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللَّهِ كَذِبًا أَوْ كَذَّبَ بِالْحَقِّ لَمَّا جَاءَهُ أَلَيْسَ فِي جَهَنَّمَ مَثْوًى لِلْكَافِرِينَ (٦٨)} [العنكبوت : ٦٨].
যে আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা কথা গড়ে অথবা তার কাছে সত্য আসার পর তাকে অস্বীকার করে, তার কি স্মরণ রাখা উচিত নয় যে, জাহান্নামই সেসব কাফেরের আশ্রয়স্থল হবে? [আল আনকাবুত: আয়াত নং ৬৮]
২- কুফর আল-ইবা ওয়াল ইস্তিকবার মা'আ আত-তাসদীক্ব -সত্যায়নের পাশাপাশি অহংকার ও অস্বীকারমূলক কুফরী (كفر الإباء والاستكبار مع التصديق):
আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ أَبَى وَاسْتَكْبَرَ وَكَانَ مِنَ الْكَافِرِينَ (٣٤)} [البقرة : ٣٤].
এবং যখন আমি হযরত আদম (আঃ)-কে সেজদা করার জন্য মালাইকা-ফেরেশতাগণকে নির্দেশ দিলাম, তখনই ইবলীস ব্যতীত সবাই সিজদা করলো। সে (নির্দেশ) পালন করতে অস্বীকার করল এবং অহংকার প্রদর্শন করল। ফলে সে কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল। [আল বাকারা: আয়াত নং ৩৪]
৩- কুফর আল-যন্ন ওয়াল-শাক্ক-সন্দেহ ও অনিশ্চয়তামুলক কুফর (كفر الظن والشك:) আল্লাহ তা'আলা বলেন:
{وَدَخَلَ جَنَّتَهُ وَهُوَ ظَالِمٌ لِنَفْسِهِ قَالَ مَا أَظُنُّ أَنْ تَبِيدَ هَذِهِ أَبَدًا (٣٥) وَمَا أَظُنُّ السَّاعَةَ قَائِمَةً وَلَئِنْ رُدِدْتُ إِلَى رَبِّي لَأَجِدَنَّ خَيْرًا مِنْهَا مُنْقَلَبًا (٣٦) قَالَ لَهُ صَاحِبُهُ وَهُوَ يُحَاوِرُهُ أَكَفَرْتَ بِالَّذِي خَلَقَكَ مِنْ تُرَابٍ ثُمَّ مِنْ نُطْفَةٍ ثُمَّ سَوَّاكَ رَجُلًا (۳۷) لَكِنَّا هُوَ اللَّهُ رَبِّي وَلَا أُشْرِكُ بِرَبِّي أَحَدًا (۳۸)} [الكهف: ٣٥ - ٣٨].
নিজের প্রতি যুলুম করে সে তার বাগানে প্রবেশ করল। সে বললঃ আমার মনে হয় না যে, এ বাগান কখনও ধ্বংস হয়ে যাবে। এবং আমি মনে করি না যে, কেয়ামত অনুষ্ঠিত হবে। যদি কখনও আমার পালনকর্তার কাছে আমাকে পৌঁছে দেয়া হয়, তবে সেখানে এর চাইতে উৎকৃষ্ট পাব। তার সঙ্গী তাকে কথা প্রসঙ্গে বললঃ তুমি তাঁকে অস্বীকার করছ, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে, অতঃপর বীর্য থেকে, অতঃপর পূর্নাঙ্গ করেছেন তোমাকে মানবাকৃতিতে? কিন্তু আমি তো একথাই বলি, আল্লাহই আমার পালনকর্তা এবং আমি কাউকে আমার পালনকর্তার শরীক মানি না। [সূরা আল কাহফঃ ৩৫-৩৮]
৪- কুফুর আল-ই'রাজ-অবজ্ঞামূলক কুফুরি (كفر الإعراض:) আল্লাহ তা'আলা বলেন:
{مَا خَلَقْنَا السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا إِلَّا بِالْحَقِّ وَأَجَلٍ مُسَمًّى وَالَّذِينَ كَفَرُوا عَمَّا أُنْذِرُوا مُعْرِضُونَ (۳)} [الأحقاف : ٣].
নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু আমি যথাযথভাবেই এবং নিদিষ্ট সময়ের জন্যেই সৃষ্টি করেছি। আর কাফেররা যে বিষয়ে তাদেরকে সতর্ক করা হয়েছে, তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। [আল আহ্কাফ: আয়াত নং ৩]
৫- কুফর আন-নিফাক্ব-কপটতামূলক কুফুরি (كفر النفاق:) আল্লাহ তা'আলা বলেন:
{ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ آمَنُوا ثُمَّ كَفَرُوا فَطُبِعَ عَلَى قُلُوبِهِمْ فَهُمْ لَا يَفْقَهُونَ (۳)} [المنافقون : ٣].
এটা এজন্য যে, তারা বিশ্বাস করার পর পুনরায় কাফের হয়েছে। ফলে তাদের অন্তরে মোহর মেরে দেয়া হয়েছে। অতএব তারা বুঝে না। [আল মুনাফিকূন: আয়াত নং ৩]
দ্বিতীয় প্রকার: আল-কুফরুল আছগার বা ছোট কুফুরি (كفر أصغر), যা ব্যক্তিকে দীন থেকে বহিষ্কার করে না। এটা হল কর্মর্গত কুফুরি, যেমন- ঐ সকল গুনাহ, যেগুলোকে কুরআন ও সুন্নাহ-এর মধ্যে কুফুরি বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। যেগুলো বড় কুফুরির সীমা পর্যন্ত পৌঁছে না। যেমন: নি'আমতের অবজ্ঞা করা, গায়রুল্লাহ-এর নাম নিয়ে শপথ করা ও কোনো মুসলিমের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া ইত্যাদি।
১-আল্লাহ তা'আলা বলেন: {وَضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا قَرْيَةً كَانَتْ آمِنَةً مُطْمَئِنَّةً يَأْتِيهَا رِزْقُهَا رَغَدًا مِنْ كُلِّ مَكَانٍ فَكَفَرَتْ بِأَنْعُمِ اللَّهِ فَأَذَاقَهَا اللَّهُ لِبَاسَ الْجُوعِ وَالْخَوْفِ بِمَا كَانُوا يَصْنَعُونَ (۱۱۲)} [النحل: ١١٢]. আল্লাহ দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন একটি জনপদের, যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত, তথায় প্রত্যেক জায়গা থেকে আসত প্রচুর জীবনোপকরণ। অতঃপর তারা আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল। তখন আল্লাহ তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের কারণে স্বাদ আস্বাদন করালেন, ক্ষুধা ও ভীতির। [আন নাহল: আয়াত নং ১১২]
২-ইবনু মাসউদ (رضي الله عنه) থেকে বর্ণিত, তিনি নাবী কারীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন – তিনি বলেন: «سِبَابُ المُسْلِمِ فُسُوقٌ، وَقِتَالُهُ كُفْرٌ» কোনো মুসলিমকে গালি দেয়া ফাসেক্বী (অন্যায় ও পাপাচারমূলক কাজ) আর কোনো মুসলিমের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া কুফুরী। (মুত্তাফাকুন আলাইহি) ছুহীহ বুখারী হা/৪৮, ছুহীহ মুসলিম হা/ ৬৪
৩-ইবনু উমার (رضي الله عنه) থেকে বর্ণিত – একদা তিনি কোনো এক ব্যক্তিকে বলতে শুনলেন, কাবার শপথ! তখন তিনি বললেন: গাইরুল্লাহ-এর নামে শপথ করা বৈধ নয়। কেননা, আমি রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি- «مَنْ حَلَفَ بِغَيْرِ اللَّهِ فَقَدْ كَفَرَ أَوْ أَشْرَكَ»
যে ব্যক্তি গাইরুল্লাহ-এর নামে শপথ করে, সে কুফুরি বা শিরকে লিপ্ত হল। ছুহীহ: সুনানু আবী দাউদ, হা/৩২৫১, সুনান আত তিরমিযী, হা/১৫৩৫।
আল্লাহ তা'আলা কাবীরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তিকে মুমিন বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং তাদের সকলকে ভাই বলেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَإِنْ طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا فَإِنْ بَغَتْ إِحْدَاهُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِيءَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ فَإِنْ فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ (۹) إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ (۱۰)} [الحجرات : ۹ - ۱۰] .
যদি মুমিনদের দুই দল যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তবে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দিবে। অতঃপর যদি তাদের একদল অপর দলের উপর চড়াও হয়, তবে তোমরা আক্রমণকারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে; যে পর্যন্ত না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। যদি ফিরে আসে, তবে তোমরা তাদের মধ্যে ন্যায়ানুগ পন্থায় মীমাংসা করে দিবে এবং ইনছাফ করবে। নিশ্চয় আল্লাহ ইনছাফকারীদেরকে পছন্দ করেন। মুমিনরা তো পরস্পর ভাই-ভাই। অতএব, তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করবে এবং আল্লাহকে ভয় করবে-যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও। [আল হুজুরাত: আয়াত নং ৯-১০]
📄 আল-কুফরুল আকবার ও আল-কুফরুল আছগার- এর মাঝে পার্থক্য
১. আল-কুফরুল-আকবর – ব্যক্তিকে দীন থেকে বহিষ্কার করে দেয়। তার আমলসমূহ বিনষ্ট করে দেয়। এই কুফুরে লিপ্ত ব্যক্তির জন্য চিরস্থায়ী জাহান্নাম অবধারিত হয়ে যায় এবং তাকে হত্যা করা ও তার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা বৈধ হয়ে যায়। কোনো মুমিনের জন্য তাকে ভালোবাসা ও তার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করা নিষিদ্ধ।
২. আল-কুফরুল আছগার ব্যক্তিকে দীন থেকে বহিষ্কার করে না। তার আমলসমূহ বিনষ্ট করে না, তবে কুফুরির পরিমাণ অনুপাতে আমলকে ত্রুটিযুক্ত করে দেয়। এ কুফুরে লিপ্ত ব্যক্তি শাস্তি ভোগ করার যোগ্য বলে বিবেচিত হয়। তবে তার জন্য জাহান্নাম চিরস্থায়ী অবধারিত হয় না। বিধায় তাকে শাস্তি দেয়ার পরে জাহান্নাম থেকে বের করে আনা হবে। আবার কাউকে আল্লাহ তা'আলা
ক্ষমা করে দিলে তাকে কখনোই জাহান্নামে প্রবেশ করান না। এই কুফুরে লিপ্ত ব্যক্তিকে হত্যা বা তার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা বৈধ নয় এবং এই কুফুর বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণকেও নিষিদ্ধ করে না। সুতরাং এই কুফুরে লিপ্ত ব্যক্তির সাথে তার মাঝে বিদ্যমান ঈমান অনুযায়ী বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করা হবে এবং তার মাঝে বিদ্যমান নাফরমানী অনুযায়ী তার সাথে শত্রুতা ও ঘৃণাপূর্ণ আচরণ করা হবে।
📄 কুফর-এর কারণসমূহ
কুফর-এর অনেকগুলো কারণ রয়েছে। তন্মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলি হল: ১- মূর্খতা ও বিপথগামীতা (الجهل والضلال), পূর্বসূরিদের অন্ধানুগত্য (و تقليد الأسلاف)। এটা হল অধিকাংশ জনসাধারণ ও অন্ধ অনুসারিদের কুফুর-এর কারণ।
(১) আল্লাহ তা'আলা বলেন:
{وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ اتَّبِعُوا مَا أَنْزَلَ اللَّهُ قَالُوا بَلْ نَتَّبِعُ مَا أَلْفَيْنَا عَلَيْهِ آبَاءَنَا أَوَلَوْ كَانَ آبَاؤُهُمْ لَا يَعْقِلُونَ شَيْئًا وَلَا يَهْتَدُونَ (۱۷۰)} [البقرة : ۱۷۰].
আর যখন তাদেরকে কেউ বলে যে, সে হুকুমেরই আনুগত্য কর যা আল্লাহ তা'আলা নাযিল করেছেন, তখন তারা বলে কখনো না, আমরা তো সে বিষয়েরই অনুসরণ করব। যাতে আমরা আমাদের বাপ-দাদাদেরকে দেখেছি। যদি ও তাদের বাপ দাদারা কিছুই জানতো না, জানতো না সরল পথও। [আল বাকারা: আয়াত নং ১৭০]
(২) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
{وَقَالُوا مَا هِيَ إِلَّا حَيَاتُنَا الدُّنْيَا نَمُوتُ وَنَحْيَا وَمَا يُهْلِكُنَا إِلَّا الدَّهْرُ وَمَا لَهُمْ بِذَلِكَ مِنْ عِلْمٍ إِنْ هُمْ إِلَّا يَظُنُّونَ (٢٤)} [الجاثية : ٢٤].
তারা বলে, আমাদের পার্থিব জীবনই তো শেষ; আমরা মরি ও বাঁচি মহাকালই আমাদেরকে ধ্বংস করে। তাদের কাছে এ ব্যাপারে কোন জ্ঞান নেই। তারা কেবল অনুমান করে কথা বলে। [আল জাসিয়াহ: আয়াত নং ২৪]
২- অস্বীকার ও একগুঁয়েমি (الجحود والعناد), হিংসা ও অহংকার (والحسد والکبر)। আর এই কারণটি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিলক্ষিত হয় ঐ সকল ব্যক্তির মাঝে, যাদের স্বীয় জাতির নিকট জ্ঞান-বিদ্যার ময়দানে শক্তিশালী নেতৃত্ব রয়েছে। যেমন- ইহুদী ও খ্রিস্টান্দের সন্ন্যাসী ও যাজকশ্রেণী। অথবা যাদের স্বীয় জাতির নিকট রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব রয়েছে। যেমন- ফির'আউন, কিসরা ও কায়ছার। অথবা যাদের স্বীয় জাতির নিকট বাণিজ্যিক স্বার্থ রয়েছে। যেমন- কারুন। সুতরাং ব্যবসায়ী তার সম্পদের হারানোর ব্যাপারে, বাদশাহ তার রাজত্ব সারানোর ব্যাপারে এবং যাজকশ্রেণী তাদের মর্যাদা হারানোর ব্যাপারে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে কুফুরিকে ঈমানের উপর প্রাধান্য দিয়ে থাকে।
(১) আল্লাহ তা'আলা বলেন: {وَلَمَّا جَاءَهُمْ كِتَابٌ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ مُصَدِّقٌ لِمَا مَعَهُمْ وَكَانُوا مِنْ قَبْلُ يَسْتَفْتِحُونَ عَلَى الَّذِينَ كَفَرُوا فَلَمَّا جَاءَهُمْ مَا عَرَفُوا كَفَرُوا بِهِ فَلَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الْكَافِرِينَ} [البقرة : ٨٩]. যখন তাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে কিতাব এসে পৌঁছাল, যা সে বিষয়ের সত্যায়ন করে, যা তাদের কাছে রয়েছে এবং তারা পূর্বে করত। অবশেষে যখন তাদের কাছে পৌঁছল যাকে তারা চিনে রেখেছিল, তখন তারা তা অস্বীকার করে বসল। অতএব, অস্বীকারকারীদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত। [আল বাকারা: আয়াত নং ৮৯]
(২) আল্লাহ তা'আলা বলেন: {ثُمَّ بَعَثْنَا مِنْ بَعْدِهِمْ مُوسَى وَهَارُونَ إِلَى فِرْعَوْنَ وَمَلَئِهِ بِآيَاتِنَا فَاسْتَكْبَرُوا وَكَانُوا قَوْمًا مُجْرِمِينَ (٧٥)} [يونس : ٧٥]. অতঃপর তাদের পেছনে পাঠিয়েছি আমি মূসা ও হারুনকে, ফেরাউন ও তার সর্দারের প্রতি স্বীয় নির্দেশাবলী সহকারে। অথচ তারা অহংকার করতে আরম্ভ করেছে। [ইউনুস: আয়াত নং ৭৫]
(৩) আল্লাহ তা'আলা বলেন: {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ كَثِيرًا مِنَ الْأَحْبَارِ وَالرُّهْبَانِ لَيَأْكُلُونَ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالْبَاطِلِ وَيَصُدُّونَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ} [التوبة : ٣٤].
হে ঈমানদারগণ! পন্ডিত ও সংসারবিরাগীদের অনেকে লোকদের মালামাল অন্যায়ভাবে ভোগ করে চলছে এবং আল্লাহর পথ থেকে লোকদের নিবৃত রাখছে। [আত তাওবাহ: আয়াত নং ৩৪]
(৪) আল্লাহ তা'আলা বলেন: {وَجَحَدُوا بِهَا وَاسْتَيْقَنَتُهَا أَنْفُسُهُمْ ظُلْمًا وَعُلُوًّا فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُفْسِدِينَ (١٤)}
[النمل: ١٤] . তারা অন্যায় ও অহংকার করে নিদর্শনাবলীকে প্রত্যাখ্যান করল, যদিও তাদের অন্তর এগুলো সত্য বলে বিশ্বাস করেছিল। অতএব দেখুন, অনর্থকারীদের পরিণাম কেমন হয়েছিল? [আন নামল: আয়াত নং ১৪]
৩- সত্যকে পরিপূর্ণরূপে অবজ্ঞা করা (الإعراض المحض عن الحق)। বিধায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সত্যের প্রতি দৃষ্টিপাত করে না, সত্যকে ভালোবাসতে পারে না, সত্যের প্রতি রাগও করে না, সত্যের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ বা শত্রুতাপূর্ণ আচরণ কোনোটিই করে না। কেননা, তার অন্তর অন্যকোনো বস্তুর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে আছে।
যেমন- সম্পদ ও প্রবৃত্তির প্রতি ভালোবাসা, দেশ ও মাতৃভূমির প্রতি আন্তরিক টান অনুভব করা ও নিজ পরিবার-পরিজন ও অভ্যাসের প্রতি দুর্বল থাকা। (১) আল্লাহ তা'আলা বলেন:
{مَا خَلَقْنَا السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا إِلَّا بِالْحَقِّ وَأَجَلٍ مُسَمًّى وَالَّذِينَ كَفَرُوا عَمَّا أُنْذِرُوا مُعْرِضُونَ (۳)} [الأحقاف : ٣].
নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু আমি যথাযথভাবেই এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্যেই সৃষ্টি করেছি। আর কাফেররা যে বিষয়ে তাদেরকে সতর্ক করা হয়েছে, তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। [আল আহকাফ: আয়াত নং ৩] (২) আল্লাহ তা'আলা বলেন:
{وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ اتَّبِعُوا مَا أَنزَلَ اللَّهُ قَالُوا بَلْ نَتَّبِعُ مَا وَجَدْنَا عَلَيْهِ آبَاءَنَا أَوَلَوْ كَانَ الشَّيْطَانُ يَدْعُوهُمْ إِلَى عَذَابِ السَّعِيرِ (۲۱)} [لقمان: ۲۱].
তাদেরকে যখন বলা হয়, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তোমরা তার অনুসরণ কর, তখন তারা বলে, বরং আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে যে বিষয়ের উপর পেয়েছি, তারই অনুসরণ করব। শয়তান যদি তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তির দিকে দাওয়াত দেয়, তবুও কি? [লোকমান: আয়াত নং ২১]
📄 কাফেরদের শাস্তি
প্রত্যেক কাফের দুনিয়াতে অমানিশা, হয়রানি-হতাশা, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও দুর্দশা-দুর্ভাগ্যের মাঝে বসবাস করে। কারণ, সে ঈমানের নূর থেকে বঞ্চিত হয়েছে এবং ছিরাতে মুসতাক্বীম থেকে বিচ্যুত হয়েছে।
আল্লাহ তা'আলা বলেন, {الر كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ لِتُخْرِجَ النَّاسَ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ بِإِذْنِ رَبِّهِمْ إِلَى صِرَاطِ الْعَزِيزِ الْحَمِيدِ (۱)} [إبراهيم : ١].
আলিফ-লাম-রা; এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি-যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন-পরাক্রান্ত, প্রশংসার যোগ্য পালনকর্তার নির্দেশে তাঁরই পথের দিকে। [ইব্রাহীম: আয়াত নং ১]
কাফেররা জাহান্নামে তাদের কুফরী কর্মের রূঢ়তা ও কঠোরতার আনুপাতিক হারে শাস্তি ভোগ করবে। কুফরীর কঠোরতা যা বাধ্যতামূলক শাস্তির সংঘটক তিনটি স্তরে বিভক্ত।
প্রথম: ঐ ব্যক্তি যে রাব্বুল আলামীনের অস্তিত্ব সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে এবং সৃষ্টিজগৎকে তার পরিচালনাকারী একমাত্র সৃষ্টা প্রতিপালক থেকে বিচ্ছিন্ন ও মুক্ত মনে করে। এরাই হল ঐ সকল নাস্তিক, যারা সৃষ্টিজগৎ-এর রবকে অস্বীকার করে, যাদের ইমাম হল ফির'আউন (وَإِمَامُهُمْ فِرْعَوْن)। এটা হল সবচে জঘন্যতম কুফরী। আর কেয়ামতের দিন এর শাস্তিও সবচে কঠোর হবে।
১) আল্লাহ তা'আলা বলেন: {وَقَالُوا مَا هِيَ إِلَّا حَيَاتُنَا الدُّنْيَا نَمُوتُ وَنَحْيَا وَمَا يُهْلِكُنَا إِلَّا الدَّهْرُ وَمَا لَهُمْ بِذَلِكَ مِنْ عِلْمٍ إِنْ هُمْ إِلَّا يَظُنُّونَ (٢٤)} [الجاثية : ٢٤].
তারা বলে, আমাদের পার্থিব জীবনই তো শেষ; আমরা মরি ও বাঁচি মহাকালই আমাদের ধ্বংস করে। তাদের কাছে এ ব্যাপারে কোন জ্ঞান নেই। তারা কেবল অনুমান করে কথা বলে। [আল জাসিয়াহ: আয়াত নং ২৪]
২) আল্লাহ তা'আলা বলেন: {وَحَاقَ بِآلِ فِرْعَوْنَ سُوءُ الْعَذَابِ (٤٥) النَّارُ يُعْرَضُونَ عَلَيْهَا غُدُوًّا وَعَشِيًّا وَيَوْمَ تَقُومُ السَّاعَةُ أَدْخِلُوا آلَ فِرْعَوْنَ أَشَدَّ الْعَذَابِ (٤٦)} [غافر : ٤٥ - ٤٦] .
অতঃপর আল্লাহ তাকে তাদের চক্রান্তের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করলেন এবং ফেরাউন গোত্রকে শোচনীয় আযাব গ্রাস করল। সকালে ও সন্ধ্যায় তাদেরকে আগুনের সামনে পেশ করা হয় এবং যেদিন কেয়ামত সংঘটিত হবে, সেদিন আদেশ করা হবে, ফেরাউন গোত্রকে কঠিনতর আযাবে দাখিল কর। [আল মু'মিন: আয়াত নং ৪৫-৪৬]
দ্বিতীয়: ঐ ব্যক্তি যার অন্তর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সত্যতার পক্ষে প্রমাণাদি স্বচক্ষে দর্শন করার পরেও একগুঁয়েমি ও বিদ্বেষমূলকভাবে কুফুরি করে। যেমন- মুনাফেক্বশ্রেণী ও তাদের ন্যায় অন্যান্যরা।
১) আল্লাহ তা'আলা বলেন: {كَيْفَ يَهْدِي اللَّهُ قَوْمًا كَفَرُوا بَعْدَ إِيمَانِهِمْ وَشَهِدُوا أَنَّ الرَّسُولَ حَقٌّ وَجَاءَهُمُ الْبَيِّنَاتُ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ (٨٦) أُولَئِكَ جَزَاؤُهُمْ أَنَّ عَلَيْهِمْ لَعْنَةَ اللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ (۸۷) خَالِدِينَ فِيهَا لَا يُخَفَّفُ عَنْهُمُ الْعَذَابُ وَلَا هُمْ يُنْظَرُونَ (۸۸))} [آل عمران : ٨٦ - ۸۸] .
কেমন করে আল্লাহ এমন জাতিকে হেদায়েত দান করবেন, যারা ঈমান আনার পর এবং রসূলকে সত্য বলে সাক্ষ্য দেয়ার পর এবং তাদের নিকট প্রমাণ এসে যাওয়ার পর কাফের হয়েছে। আর আল্লাহ জালেম সম্প্রদায়কে হেদায়েত দান করেন না। এমন লোকের শাস্তি হলো আল্লাহ, মালাইকা-ফেরেশতাগণ এবং মানুষ সকলেরই অভিসম্পাত। সর্বক্ষণই তারা তাতে থাকবে। তাদের আযাব হালকাও হবে না এবং তার এত অবকাশও পাবে না। [আলে ইমরান: আয়াত নং৮৬-৮৮]
২) আল্লাহ তা'আলা বলেন, {إِنَّ الْمُنَافِقِينَ فِي الدَّرْكِ الْأَسْفَلِ مِنَ النَّارِ وَلَنْ تَجِدَ لَهُمْ نَصِيرًا (١٤٥)} [النساء : ١٤٥].
নিঃসন্দেহে মুনাফেকরা রয়েছে দোযখের সর্বনিম্ন স্তরে। আর তোমরা তাদের জন্য কোন সাহায্যকারী কখনও পাবে না। [আন নিসা: আয়াত নং ১৪৫]
তৃতীয়: ঐ সকল কাফের, যারা আল্লাহ তা'আলার দীনের আলো নিভানো ও আল্লাহ তা'আলার বান্দাদেরকে তার দীন থেকে বিরত রাখার জন্য তাদের সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা-প্রচেষ্টা করে থাকে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, الَّذِينَ كَفَرُوا وَصَدُّوا عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ زِدْنَاهُمْ عَذَابًا فَوْقَ الْعَذَابِ بِمَا كَانُوا يُفْسِدُونَ (۸۸)} [النحل : ۸۸] .
যারা কাফের হয়েছে এবং আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টি করেছে, আমি তাদেরকে আযাবের পর আযাব বাড়িয়ে দেব। কারণ, তারা অশান্তি সৃষ্টি করত। [আন নাহল: আয়াত নং ৮৮]
কাফেরদের মধ্যে এরাই ক্বীয়ামতের দিন সর্বাপেক্ষা কঠোর শাস্তি ভোগ করবে। আর তাদের শাস্তি নির্ধারিত হবে তাদের কুফুরীর কঠোরতা, তাদের অবাধ্যতা ও তাদের অনিষ্টতার পরিমাণ অনুপাতে।
চতুর্থ: ঐ সকল মূর্খ ও সাধারণ কাফের, যারা পূর্বোক্ত কাফেরদের চেয়ে – কম কঠোর, যারা মুসলিমদেরকে কষ্ট দেয় না। তারা যদিও তাদের সঙ্গেই জাহান্নামে অবস্থান করবে, কিন্তু তাদের শাস্তির পরিমাণ পূর্বোক্ত কাফেরদের তুলনায় অনেকাংশেই কম হবে।
১-আল্লাহ তা'আলা বলেন, اللَّهُ وَلِيُّ الَّذِينَ آمَنُوا يُخْرِجُهُمْ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ وَالَّذِينَ كَفَرُوا أَوْلِيَاؤُهُمُ الطَّاغُوتُ يُخْرِجُونَهُمْ مِنَ النُّورِ إِلَى الظُّلُمَاتِ أُولَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ} [البقرة: . [٢٥٧
যারা ঈমান এনেছে, আল্লাহ তাদের অভিভাবক। তাদেরকে তিনি বের করে আনেন অন্ধকার থেকে আলোর দিকে। আর যারা কুফরী করে তাদের অভিভাবক হচ্ছে তাগুত। তারা তাদেরকে আলো থেকে বের করে অন্ধকারের দিকে নিয়ে
যায়। এরাই হলো দোযখের অধিবাসী, চিরকাল তারা সেখানেই থাকবে। [আল বাকারা: আয়াত নং ২৫৭]
২) আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: إِنَّ أَدْنَى أَهْلِ النَّارِ عَذَاباً ، يَنْتَعِلُ بِنَعْلَيْنِ مِنْ نَارٍ، يَغْلِي دِمَاغُهُ مِنْ حَرَارَةِ نَعْلَيْهِ» জাহান্নামের শাস্তি ভোগকারিদের মধ্যে সর্বনিম্ন শাস্তি ভোগকারির শাস্তি হল- তাকে আগুনের দু'টি পাদুকা পরিধান করানো হবে, যে পাদুকাদ্বয়ের আগুনের তাপের কারণে তার মস্তিষ্ক টগবগ করে ফুটতে থাকবে। ছুহীহ মুসলিম হা/২১১
মানবীয় আত্মার স্বভাব-প্রকৃতি
মানুষের হৃদয় যখন নিষ্কলুষ থাকে, তখন সে তাওহীদ, ঈমান, আনুগত্য ও কল্যাণকে প্রাধান্য দেয়। আর যখন তার হৃদয় কলুষিত হয়ে যায়, তখন কুফর, শিরক, নাফরমানী ও অনিষ্টতাকে প্রাধান্য দেয়।
মানুষ ও জ্বিন জাতির শয়তানরা এবং ইবলীস ও তার সেনাবাহিনী কুফর, শিরক, অনিষ্টতা ও নাফরমানিকে প্রাধান্য দেয় এবং এমন কুকর্মের দ্বারা তারা আনন্দ উপভোগ করে, এমন কুকর্মই তারা করতে চায় এবং এমন কুকর্মের প্রতি তারা সর্বদা আকৃষ্ট হয়ে থাকে তাদের অন্তরে বিদ্যমান প্রতারণা ও অনিষ্টতার কারণে, যদিও তা শাস্তিকে আবশ্যকীয় করে তুলে।
মানুষের স্বভাব-প্রকৃতি যখন নষ্ট হয়ে যায়, তখন সে তার জন্য ক্ষতিকর বস্তুর প্রতি আকৃষ্ট হয়, তা দ্বারা আনন্দ উপভোগ করে এবং তার প্রতি এমনভাবে অনুরাগী হয় যে, উক্ত বস্তুর কারণে সে তার বুদ্ধিমত্তা, দীন, চরিত্র, শরীর ও সম্পদ নষ্ট করে ফেলে। আর শয়তান অনিষ্টকারী শত্রু। সুতরাং যে শয়তানের প্রিয় বস্তু যেমন- কুফর, শিরক ইত্যাদি দ্বারা তার নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করে, শয়তান হয়তো তার কিছু প্রয়োজন পূরণ করে দেয়।