📄 উত্তম চরিত্র ও সৎস্বভাবের মূল্যায়ন করার গুরুত্ব
দাওয়াতের ক্ষেত্রে উত্তম চরিত্রের মূল্যায়ন করা এবং তার প্রতি প্রেরণার সঞ্চার করা গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এটা মানবহৃদয়ে বিরাট প্রভাব বিস্তার করে এবং ভাল কাজ ও নন্দিত আচরণের জন্য তাকে আরো গতিশীল হতে উদ্বুদ্ধ করে। কাল্পনিক কিংবা রূপকথার থেকে ধার নিয়ে নয়, বরং গুরুত্বের জন্য আমাদের সামাজিক জীবনে সংগঠিত ঘটনা থেকে তার উদাহরণ পেশ করছি: বর পক্ষ সকল আত্মীয় স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের নিমন্ত্রণ জানিয়ে বিবাহ অনুষ্ঠানের আয়োজন করল। আমরা সকলেই জানি এতে তাদের কত শ্রম ঝরাতে ও কষ্ট করতে হয়েছে। কারণ, এখন তারা আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের সম্মুখে যাচাইয়ের পাত্র। সবাই তাদের আতিথেয়তা ও ব্যবস্থাপনার উপর মন্তব্য করবে। সুতরাং তারা স্বীয় সাধ্যের ক্ষেত্রে কোন ত্রুটিই রাখে না। যেহেতু সুন্দর ও উৎকৃষ্ট সেবা প্রদান একমাত্র উদ্দেশ্য। তবুও তাড়াহুড়ো, সময়ের স্বল্পতা ও মানসিক টেনশনের দরুন আয়োজক কিংবা পরিবেশনকারীদের সামান্য ভুল-চুক হয়ে যাওয়া বা দু-একটি আইটেম ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক। সেখানে কারো কারো উপর কেয়ামত বয়ে যায়, ক্রোধে সজোরে হুংকার করে উঠে। উপস্থিত উৎকৃষ্ট খানার পসরার কথা পর্যন্ত ভুলে যায় সে, উপরন্তু পরিবেশনকারীদের পরিশ্রমটুকুও অস্বীকার করে বসে। এটা কোন যুক্তিসঙ্গত কাজ?
এ জাতীয় প্রেক্ষিতে ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরে উৎসাহ দেয়া উচিত। ত্রুটি বিচ্যুতিগুলোর পুনরাবৃত্তি না করা। তবেই তারা সামনের কাজে ক্রমাগত উৎকর্ষ সাধন, সংশোধন ও শোধরানোর অনুপ্রেরণা লাভ করবে। যেমন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসাজ ইবনে আবদে কায়েসকে উৎসাহ প্রদানের জন্য বলেছিলেন:
إن فيك خصلتين يحبهما الله : الحلم والإنائة .
"তোমার মধ্যে দু'টো গুণ রয়েছে যা আল্লাহ পছন্দ করেন: ধৈর্য ও ধীরস্থিরতা।” (রওয়াহু মুসলিম)
আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, যখন চরিত্র দু'টো ভদ্রলোকের মধ্যে বিদ্যমান তখন তা উল্লেখ করার আবশ্যক কি? এর উত্তর: ইতিবাচক দিক বা ভাল গুণের উল্লেখ আলোচিত ব্যক্তিকে গভীর থেকে নিজের নেতিবাচক দিকগুলো অনুসন্ধানে তৎপর ও সক্রিয় করে তুলবে। সে আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য অর্জনের লক্ষ্যে উত্তম গুণাবলীতে আরো সমৃদ্ধ হতে সচেষ্ট হবে। অন্যরাও এরকম প্রশংসার জন্য উদগ্রীব থাকবে এবং এর মর্যাদায় উন্নীত হতে চেষ্টা করবে।
এ ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুসৃত পদ্ধতিটি হচ্ছে অভিনব, ফলপ্রসূ ও অত্যন্ত কার্যকর। তিনি কারো মধ্যে অনুকরণ যোগ্য গুণ, ভাল স্বভাব ও সুন্দর নীতির প্রমাণ পেলে উত্তম উপাধি, সুন্দর সুন্দর নাম ও উপনাম দিয়ে আখ্যায়িত করতেন। যার ভেতর তাদের অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলো ফুটে উঠত এবং তারা নিজেরাও এর কারণে গর্ববোধ করতেন, ঈর্ষণীয় হতেন অন্যদের কাছে। এভাবেই সবার সামনে দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট হয়ে যেত উত্তম চরিত্রের মহত্ব, মূল্য ও গুরুত্ব। যেমন তিনি খালিদ বিন ওয়ালীদ রা.-কে 'সাইফুল্লাহ আল-মাসলুল', উসমান বিন আফ্ফন রা.-কে 'জিন্নু-রাইন', উমার বিন খাত্তাবের রা.-কে 'আল-ফারুক' এবং আবু উবাইদাহ ইবনুল যারাাহ রা.-কে 'আমিনুল উম্মাহ' বিশেষণ দ্বারা আখ্যা দিয়েছেন। অবশ্যই এখানে মহান উদ্দেশ্য নিহিত রয়েছে। ফলশ্রুতিতে তারা এবং তাদের সমসাময়িকরা নিজের জান-প্রাণকে ইসলামের জন্য উৎসর্গ করার নিমিত্তে উদ্দীপ্ত হয়েছেন। এবং জীবন, সাধনা ও সম্পদ ইসলামের দাওয়াতের জন্য উজাড় করে দিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা উৎসাহ প্রদান, অন্তরে আকর্ষণ সৃষ্টি ও ইসলামের উপর দৃঢ়পদ ও অনঢ় রাখার জন্য যাকাতের একটা অংশ অমুসলিমদের জন্য বরাদ্দ করেছেন। ফলে তাদের অনেকেই ইসলামের মূল্য অনুভব করতে পেরে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছে।
উত্তম চরিত্রগুলো তুলে ধরা, তার প্রতি তাগিদ ও উৎসাহ প্রদান আমাদের যেমন দায়িত্ব, মন্দ স্বভাব ও বিচ্যুতিগুলো ভুলে যাওয়া, তা এড়িয়ে চলা ও ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখা তেমন দায়িত্ব। অতএব আপনার নিকট যদি তা পরিবর্তন করে সুন্দরে রূপান্তর করার সামর্থ্য থাকে, তবে করে ফেলুন। যদি তা পরিবর্তন করার সামর্থ্য না থাকে, তবে ভুলে যেতে চেষ্টা করুন। কারণ, মন্দ বিষয় প্রকাশ করা ও জনসম্মুখে তুলে ধরা তার প্রতি তাগিদ প্রদানেরই নামান্তর। আপনি যদি কোন লোককে উপদেশ দিতে চান, তাহলে আপনাকে ইতিবাচক বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে হবে, এবং এত বেশী পরিমাণ আলোচনা করতে হবে যে, নেতিবাচক বিষয়ের উপর যেন আপনিই বিরুদ্ধাচারী হয়ে যান। হ্যাঁ, তাকে কোনরূপ আঘাত না করে বিনম্রভাবে নেতিবাচক বিষয়গুলোর প্রতি তার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেন। যাতে তার ও আপনার মধ্যে সম্পর্কের পথরুদ্ধ হয়ে না যায়। আপনাকে আরো মনে রাখতে হবে আদম সন্তান ভুলে-ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত। অসংখ্য মানুষ ভুল করার পরও অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর নিকট তওবা করে সঠিক পথে ফিরে এসেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন:
خير الخطائين التوابون
"উত্তম ভুলকারীগণ তারাই যারা তওবাকারী।"
📄 দাওয়াতের ক্ষেত্রে কোন সামাজিক চিকিৎসা আছে কি?
মনোবিজ্ঞান কখনো সামাজিক চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকে নির্দিষ্ট সংখ্যক জনসাধারণকে সমবেত করে, মনোবিজ্ঞানী যখন উপলব্ধি করতে পারে তাদের সকলের পরিবেশ ও অবস্থার মধ্যে সামঞ্জস্য আছে। এ জাতীয় চিকিৎসার ক্ষেত্রে মনোবিজ্ঞানীগণ আদর্শ সংখ্যাটাকে ৬-৮ ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে পারে। তবে সংখ্যা এর চেয়ে বৃদ্ধি পেলে তাদের মধ্যে শৃংখলা বজায় রাখা দুরূহ ব্যাপার হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে উক্ত সংখ্যা এর কম হলেও কার্যকারিতা হ্রাস পাবে। এই দলটির এক সঙ্গে বসবাসের মধ্য দিয়েই চিকিৎসা হয়ে যাবে। দাওয়াতের ক্ষেত্রে এই দৃষ্টিকোণ ও এই সহাবস্থান একটি মহতী উদ্যোগ এবং আচরণের সংস্কারে প্রভাব বিস্তারকারী। কারণ সেই দলের প্রত্যেকটি সদস্য মনে করে সে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মুখোমুখি। যেহেতু তা অসংখ্য মানুষের মধ্য হতে বাছাই করে তাকে মনোনীত করা হয়েছে। সে কারণে প্রত্যেকেই চেষ্টা করবে দলের মধ্যে ব্যতিক্রম ও অনন্য হতে। অতএব এই দৃষ্টিকোণ ও তাদের জন্য অনুপ্রেরণা।
সর্বশেষে একটি বিষয় থেকে যায়, যা কোন ঘটনা সংঘটিত হওয়ার সময় আচার-আচরণের ধরণ-প্রকৃতি ও নতুনত্ব বিশেষ পর্যবেক্ষণ ও গুরুত্বের দাবীদার। ব্যাপক অনুভূতি সৃষ্টি অথবা কোন আচরণকে উৎকৃষ্টতার দিকে রূপান্তরের লক্ষ্যে জীবনের সকল ঘটনার সঙ্গে সাধারণভাবে সংযোগ স্থাপন করা কর্তব্য। যখনই কোন ঘটনা সংঘটিত হয়, তখন তার সাথে যুক্ত হয় ভুল-ত্রুটির অনুভূতি। অতঃপর সেটা তার স্মৃতিতে জাগ্রত থাকে। এভাবে অন্য ঘটনা সকল ঘটনা প্রবাহের সঙ্গে যুক্ত হয়। আর সবগুলো একত্রিত হয়ে তার অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ হয়ে আচরণ পরিবর্তনের কারণ হয়।
ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট আচার-আচরণ, ধরণ-প্রকৃতি যে কতখানি প্রভাবিত করে এর একটি উদাহরণ হিসেবে জিবরীল এর ঈমান ও ইসলামের ব্যাখ্যা সম্বলিত হাদীসের ঘটনা পেশ করা যেতে পারে। যা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীদের নিকট বর্ণনা করেছেন। জিবরীলের মানুষের আকৃতি ধারণ করা, প্রশ্নকারীর চরিত্রে অভিনয় করা, এসবের উদ্দেশ্য হলো বিষয়বস্তু অন্তরে গেঁথে দেয়া অথবা তাদেরকে একটি তথ্য প্রদান।
অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্য এ রকম বলা সহজ ছিল যে, ইসলামের রোকন হচ্ছে- এই, এই..., কিয়ামতের নিদর্শন হচ্ছে-এই, এই...; কিন্তু এই বয়ানটা একটি প্রাণবন্ত, হৃদয়গ্রাহী ও প্রত্যক্ষরূপে উপস্থাপন করা হয়েছে যা ভুলে যাওয়া সহজ হয় না। যেমন বর্ণনাকারী বললেন, 'আমাদের নিকট ধপধপে সাদা পোশাক পরিহিত, ঘনকাল কেশধারী এক ব্যক্তি আগমন করল, যাকে আমাদের মধ্যে কেউ চেনে না। আবার তার শরীরে ভ্রমণের কোন চিহ্ন দেখা যায় না ...।' এটা একটি অনভিপ্রেত বিষয় ও অবিস্মরণীয় ঘটনা যা তাদের স্মৃতিতে চির ভাস্বর হয়ে থাকে।
আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করি, তিনি আমাদের যা শিক্ষা দিয়েছেন তা দ্বারা আপনাদেরকে এবং আমাকে উপকৃত করুন।
أسأل الله أن ينفعني وإياكم بما علمنا، وصلى الله على سيدنا محمد وعلى آله وصحبه وسلم।