📄 অনুকূল পরিবেশ তৈরী করা
যে ব্যক্তিকে আপনি সম্বোধন করছেন, তার নিকট গ্রহণযোগ্যতা পেতে এবং আপনার নিশ্চিত প্রভাব বিস্তার করতে হলে অবশ্যই আপনাকে উপযুক্ত সময় নির্বাচন করতে হবে। প্রথমেই নিশ্চিত হয়ে নেবেন- কাঙ্ক্ষিত উপদেশ শ্রবণের জন্য সে সম্পূর্ণ প্রস্তুত কিনা। আপনি যদি এটা নিশ্চিত হতে না পারেন তাহলে পরিবেশ তৈরী করে তাকে প্রস্তুত করে নেন। আর সেটা এভাবেও হতে পারে, যেমন- আপনি তাকে বলবেন, আসসালামু আলাইকুম। উত্তরে সে আপনাকে স্বাগতম... ধন্যবাদ বলবে। এখন আপনি তার সঙ্গে ইসলামের ক্ষুদ্র একটি বিষয়- সালামের শিক্ষা দেয়ার মাধ্যমে আলোচনা শুরু করতে পারেন- তার নিকট স্পষ্ট করে দেবেন যে, অপেক্ষাকৃত উত্তম বাক্যে সালামের উত্তর প্রদান একজন মুসলমানের অন্যতম দায়িত্ব। সে ক্ষেত্রে স্বাগতম, মারহাবা ইসলামী সালাম এর সমকক্ষ নয়। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন:
وَإِذَا حُيِّيتُمْ بِتَحِيَّةٍ فَحَيُّوا بِأَحْسَنَ مِنْهَا أَوْ رُدُّوهَا
"আর তোমাদেরকে যদি সালাম দেয়, তাহলে তোমরাও তাকে সালাম দাও; তার চেয়ে উত্তম পন্থায় অথবা তারই মত করে।”¹ আপনি এর দ্বারা আলোচনার পথ তৈরী করে নেবেন এবং ভালবাসার রশি শক্ত করে বেঁধে নেবেন। এরপর আপনি উপদেশ প্রদান করতে পারবেন। এভাবে আপনি তার নিশ্চিত গ্রহণযোগ্যতা পাবেন।
টিকাঃ
১. সূরা আন-নিসা, আয়াত- ৮৬
📄 রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মধ্যেই রয়েছে আমাদের জন্য উত্তম আদর্শ
এখানে কিছু প্রনিধানযোগ্য বিষয় রয়েছে যা সর্বাগ্রে উল্লেখ করার প্রয়াস পাবো: সরাসরি উপদেশ প্রদান রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অভ্যাস ছিল না। বরং তিনি অন্য বিষয় দ্বারা সেটাকে প্রস্তুত করে নিতেন। কখনো বা কোন জানা বিষয় প্রশ্ন করার মাধ্যমে আরম্ভ করতেন অথবা একটা বিষয় দ্বারা অন্য বস্তুর দিকে ইঙ্গিত করতেন। যেমন তিনি একবার একজনের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে বললেন:
قد سألت عن عظيم، وإنه ليسير على من يسره الله عليه
'তুমি একটি মহান বিষয় প্রশ্ন করেছো, তবে আল্লাহ তাআলা যার উপর সহজ করেছেন তার জন্য এটা অবশ্যই সহজ।' অর্থাৎ তোমার এই প্রশ্নটা অত্যন্ত গুরুত্বের দাবীদার। তুমি আরাম করে বস এবং মনোযোগ দিয়ে শোন!
تعبد الله ولا تشرك به شيئا، تقيم الصلاة وتوتي الزকاة وتصوم رمضان وتحج البيت.
'আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তার সঙ্গে কোন কিছুকে শরীক করবে না, নামাজ কায়েম করবে, যাকাত প্রদান করবে, রমজান মাসে রোজা রাখবে এবং বাইতুল্লাহর হজ করবে।' আবার তিনি অন্য পদ্ধতি অবলম্বন করলেন। উৎসাহ ও উদ্দীপনা প্রদান পদ্ধতির দিকে মনোনিবেশ করলেন, যাতে করে বক্তব্যটা অন্তরের মধ্যে অর্থবহ ও কার্যকর প্রভাব ফেলে। যেমন তিনি বললেন:
ألا أدلك على أبواب الخير عامة ؟ . . الصوم جنة، والصدقة تطفئ الخطيئة كما يطفئ الماء النار، وصلاة الرجل في جوف الليل، ثم تلا قوله تعالى : تتجافى جنوبهم عن المضاجع.
'আমি কি তোমাদেরকে ব্যাপকতর কল্যাণের পথসমূহ বাতলে দেবো না? বললেন, 'রোজা হচ্ছে ঢাল স্বরূপ, সদকা পাপরাশি মোচন করে দেয় যেভাবে পানি আগুনকে নিভিয়ে দেয় এবং গভীর রাতে তাহাজ্জুদ নামাজ। অতঃপর তিনি আল্লাহ তাআলার বাণী তেলাওয়াত করলেন, 'তাদের পার্শ্ব শয্যা থেকে আলাদা থাকে।' কখনো তিনি বলেছেন এভাবে:
ألا أخبرك برأس الأمر وعموده وذروة سنامه
'তোমাকে কি ধর্মীয় বিষয়গুলোর মূল, তার স্তম্ভসমূহ ও শীর্ষ চূড়া সম্পর্কে সংবাদ দেব না?"
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উৎসাহ প্রদান করার জন্য ভিন্ন একটি পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। যার অর্থ দাঁড়ায় এ রকম যে, তুমি ইতিপূর্বে যা শুনেছো ব্যাপক কল্যাণের পথ সম্পর্কে তারপরেও সকল কাজের শীর্ষবিন্দু হিসাবে বিবেচিত ও তোমার শ্রুত বিষয়ের চেয়ে উন্নত আরো কিছু আছে। এ কথার মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিক্ষার্থীর মাথায় এমন একটা বিদ্যানুরাগ ঢুকিয়ে দিলেন, যা তাকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শ্রবণ করার যোগ্য করে গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। উত্তরে শ্রোতারা বলল, 'হ্যাঁ, অবশ্যই বলুন; হে আল্লাহর রাসুল! তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করলেন:
رأس الأمر الإسلام، وعموده الصلاة وذروة سنامه الجهاد
"সকল কল্যাণের মূল বা মাথা হচ্ছে ইসলাম, তার স্তম্ভ হলো নামাজ এবং জিহাদ হল তার শীর্ষচূড়া।”
এরপর তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
ألا أخبرك بملاك ذلك كله
"আমি কি তোমাকে এই সবগুলোর ধ্বংসকারী সম্পর্কে অবহিত করবো না?"
अर्थাৎ ধর্মের মূল, স্তম্ভ ও শীর্ষ চূড়া সম্পর্কে তুমি যা কিছু শুনলে এ সবকিছুর পরও একটি বিষয় রয়ে গেছে, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যা এগুলো শেষ করে দেয়। সে সম্পর্কে আমি কি তোমাদের সংবাদ দেবো না?' তারা বলল, 'অবশ্যই বলুন, হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।' অতঃপর তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের জিহ্বাটি চেপে ধরে বললেন:
أمسك عليك هذا
“এটা খুব সংযত করে রেখ।"
শ্রোতা বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল! আমরা যত কথা বলি সে সকল কথার জন্য কি আমাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে?' তিনি বললেন,
ثقلتك أمك يا معاذ! وهل يكب الناس على وجوههم في النار إلا حصائد ألسنتهم ؟
"হে মুআয! তোমার মা তোমার জন্য বিলাপ করুক! লোকদেরকে কি তাদের রসনার অর্জন ব্যতীত অন্য কিছু তাদের অধমুখী করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে?” (তিরমিযী বর্ণিত হাদিস)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কথা-বার্তা, শ্রোতার মনোযোগ আকর্ষণ, তার মন ও মস্তিস্ককে জাগ্রত করণ এবং যে উপদেশ, জ্ঞান ও সংবাদ পরিবেশন করার ক্ষেত্রে, তার প্রতি অনুপ্রেরণা দানে বিভিন্ন রকম পদ্ধতি প্রয়োগ করেছেন। যেমন দেখুন রাসুলুল্লাহ'র সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাণী:
ألا اعلمكم شيئا تدرکون به من سبقكم؟ (صحيح الجامع)
"তোমাদেরকে কি আমি এমন বস্তু শিক্ষা দেবো, যার মাধ্যমে তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তীদের নাগাল পেতে পারো?” এরকম কথা শোনার পর স্বভাবতই আমরা পরস্পর জিজ্ঞাসা করতে থাকি; সেই মহান কাজটি কি যা করতে পারলে আমরা বিশাল মর্যাদা, বিনিময় ও পুরস্কারের দিক থেকে আমাদের পূর্ববর্তীদের পর্যন্ত পৌঁছতে পারবো? অনুরূপ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আর একটি বাণী:
ألا أدلكم على كنز من كنوز الجنة (صحيح الجامع)
“আমি কি তোমাদেরকে জান্নাতের খাজানাসমূহের থেকে একটি খাযানার কথা বলবো না?" আমাদেরকে এক সঙ্গে লক্ষ্য রাখতে হবে, আলোচনায় উৎসাহ ও প্রেরণাদান পদ্ধতি, পদ্ধতির বিভিন্ন ধরণ এবং শ্রোতার মন ও অবস্থা অনুযায়ী ধীরতা অবলম্বনের দিকে। প্রথম শিক্ষক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মধ্যেই রয়েছে আমাদের জন্য উত্তম আদর্শ। আমরা যদি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাদীসসমূহ অনুসন্ধান করি, তাহলে দেখতে পাবো কিভাবে তিনি কালজয়ী হয়েছেন এবং সাম্প্রতিক কালে আধুনিক প্রশিক্ষণ পদ্ধতিতে কঠিন সাধনা করে অর্জিত বিভিন্ন বিভাগে বিশেষজ্ঞ মনীষীদের উপর কি করে প্রাধান্য বিস্তার করে গেছেন।
📄 ব্যক্তিত্বের নিরুপন
এখানে আমাদের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়ে গেছে, আর তা হচ্ছে- আমরা কিভাবে মানুষের ব্যক্তিত্বকে নির্ণয় করবো ও কিভাবে তা চিনবো? এই প্রশ্নের উত্তর দেয়ার পূর্বে আমাদের জানতে হবে ব্যক্তিত্বটা কি?
মানব ব্যক্তিত্ব সেটা রকমারি বৈশিষ্ট্য ও বিচিত্র শক্তির মূল, যার দ্বারা প্রত্যেকটি মানুষকে অন্যদের থেকে আলাদা করা যায়। অথবা নির্দিষ্ট গুণাবলী যার দ্বারা একজন গুণান্বিত, অন্য জন নয়। এই বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী মানুষের কর্মতৎপরতা ও তার উপর সংঘটিত ঘটনা প্রবাহ থেকে চয়নকৃত হবে। আমরা লক্ষ্য করবো সে মানুষের সঙ্গে কিরূপ আচরণ করছে? বিভিন্ন ঘটনার সম্মুখীন হলে সে কি ভাবে কর্মতৎপরতা চালায়। তার দৃষ্টিভঙ্গি কি এবং ঝোঁক কোন দিকে? চাই সেটা উত্তরাধিকার সূত্রে জন্মগত হউক বা অর্জিত; তাও আমাদেরকে লক্ষ্য রাখতে হবে। প্রত্যেকটি মানুষের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও স্বতন্ত্র আকর্ষণ থাকতেই পারে, থাকাটাও জরূরী। তবে প্রকাশ্য নিদর্শন তাকে অন্যদের থেকে পৃথক করে দেয়। এই ভদ্রলোক আবেগপ্রবণ, দ্রুত রেগে যায়; কিন্তু সে মানুষের সঙ্গে বিনম্র, স্বভাবত সে কাউকে কষ্ট দিতে চায় না। এটা তার একটা ব্যতিক্রমধর্মী বৈশিষ্ট্য। তবে তার কতিপয় সাধারণ গুণও আছে, যা অন্য মানুষের মধ্যেও পাওয়া যায়। যথা- ক্রোধ, অনুমাননির্ভরতা, ত্বরাপ্রবণতা ও তাড়াহুড়ো। আর এগুলো মানুষের স্বভাবজাত সাধারণ প্রবণতা। আল্লাহ তাআ'লা এরশাদ করেন:
وَكَانَ الْإِنْسَانُ عَجُولًا
"মানুষ ত্বরাপ্রবণ।” (সূরা আল-ইসরা -১১)
কিন্তু এর সাথে সাথে স্বভাবের ভিন্নতা রয়েছে। যেমন- আমরা প্রত্যেকেই ক্রোধান্বিত হই, ক্রোধের স্তর, কারণসমূহ একজনের থেকে অন্যজনেরটা আলাদা। একজন খুব দ্রুত ক্রোধান্বিত হয়ে যায়, আর একজন একান্ত অনন্যোপায় না হলে ক্রোধান্বিত হয় না। অতএব তাকে কেউ ক্রোধান্বিত অথবা চাপ প্রয়োগ না করলে সে রাগ করে না। এমনিভাবে মানুষের মধ্যে অধৈর্য ও অনুভূতি প্রবণতার শ্রেণির মধ্যেও বিচিত্রতা রয়েছে, আরো রয়েছে অতিরঞ্জিত ভাব ও যুক্তিযুক্ত পরিমাণের মধ্যে তারতম্য।
ব্যক্তিত্বের উল্লেখযোগ্য নিদর্শন: ধৈর্য নেতৃত্ব প্রদানের যে সকল গুণাবলীর প্রয়োজন তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ধৈর্য; যাতে করে মানুষের সঙ্গে তার বুদ্ধির পরিমাণ অনুযায়ী সে ব্যবহার করতে পারে। এবং মানুষের পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করার জন্য একেবারে কঠিন থেকে কঠিনতর মুহূর্তেও ধৈর্যের সঙ্গে দায়িত্বভার বহন করতে পারে। একজন মানুষ অন্য মানুষের সঙ্গে যখন সমাজে একসাথে জীবন যাপন করবে, তখন সে তাদের ব্যক্তিত্বসমূহ শনাক্ত করতে পারবে; তাদের সম্পর্কে জানতে পারবে। নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে দীর্ঘ ভ্রমণ, একসঙ্গে নিকটে থেকে বসবাস ও অবস্থানের মাধ্যমেও ব্যক্তিত্ব শনাক্ত করা সম্ভব। বিশেষ করে -উদাহরণ স্বরূপ- ব্যবসা বাণিজ্য ও সম্পদের বিনিময় দ্বারা। একসঙ্গে বসবাস ব্যক্তিত্ব নিরূপণ করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কারণ আপনি যখন নির্দিষ্ট সময় বসবাস করার পর কোন লোকের ব্যক্তিত্ব নির্ণয় ও ব্যক্তিত্ব শনাক্ত করতে পারেন, তাহলে সে ক্ষেত্রে আপনার সিদ্ধান্ত ও নিরূপণ নির্ভুল ও সঠিক হবে। পক্ষান্তরে আপনি যদি শুধু পথে সাক্ষাতের মাধ্যমে প্রথম আবেগের উপর নির্ভর করে ব্যক্তিত্ব শনাক্ত করে ফেলেন এবং সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেন তাহলে সেটা হবে ভুল।
ভদ্রলোকটির উপর আপনার আরোপিত প্রশ্ন দ্বারাও আপনি তার ব্যক্তিত্ব শনাক্ত করতে পারেন। কোন প্রশ্নকারী যখন আপনার নিকট যে কোন বিষয় বা নির্দিষ্ট একটি সমস্যা নিয়ে প্রশ্ন করতে আসে, প্রথমেই আপনি তার প্রশ্নগুলো পর্যবেক্ষণ করুন! যেমন আপনি বলতে পারেন- 'আপনি কোন শ্রেণিভুক্ত মানুষ? যাদের চিন্তাভাবনার দায়িত্বভার আছে তাদের মধ্য হতে, নাকি যাদের কোন চিন্তাভাবনার দায়িত্বভার নেই তাদের মধ্য হতে আপনি?' যদি সে স্পষ্ট ও দৃঢ়তার সাথে উত্তর দেয় যে, যারা নিজের সহায়তা করতে পারে সে ঐ শ্রেণিভুক্ত, তাহলে আপনি তাকে একভাবে মূল্যায়ন করতে পারেন। অথবা তার বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয় স্বজনদের থেকে - যারা তার সঙ্গে বসবাস করে- জিজ্ঞাসা করেও আপনি তার ব্যক্তিত্ব চিহ্নিত করে নিতে পারেন। যেমন- সরাসরি নয় এমন একটি প্রশ্ন আপনি তাকে করতে পারেন; 'ভাই! আপনার এত অসংখ্য বন্ধু-বান্ধব কেন?' উত্তরের মধ্য দিয়ে সে তার সকল গুণাবলীর বিবরণ দিয়ে দেবে। কখনো আপনি তার নিন্দুক অথবা শত্রু সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে পারেন। কারণ নিঃসন্দেহে প্রতিটি মানুষ- বিশেষ করে সে যদি জীবনে সফল ব্যক্তি হয়- তার জন্য হিংসুক-নিন্দুক আর শত্রুর অভাব হয় না। অথবা নিন্দুক ও শত্রুরা তার সম্পর্কে কি বলে তা জেনে নিতে পারেন। এই সকল উত্তর ও কথামালার মধ্য দিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্যাবলীর পর্যাপ্ত সংগ্রহ আপনার হাতে এসে যাবে, যা দ্বারা আপনি ব্যক্তিত্বের একেবারে সূক্ষাতিসূক্ষ্ম গুণটিও নির্ণয় করতে পারবেন।
তবে এমন এক শ্রেণির মানুষ আছে যাদের সঙ্গে একটু ভিন্ন রকমের আচরণের প্রয়োজন হয় যেমন-
স্বেচ্ছাচারী প্রকৃতির মানুষ: কোন দিন আপনি যদি তাকে উগ্র মেজাজে অথবা অস্বাভাবিক দেখতে পান, তখন স্বেচ্ছাচারের কারণ জানতে চেয়ে আপনি নিজেকে বিপদে ফেলবেন না। কারণ সে এরকম-ই।
ইতস্ততকারী ব্যক্তি: যে একা কখনই সাধারণ বা বিশেষ- কোন ব্যাপারেই কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারে না; তার নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেয়ার ব্যাপারে আপনি তাকে সহযোগিতা করতে পারেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সকল সাহাবীদের রা. পরিচয় লাভ করতে সক্ষম হয়েছিলেন -যাদের সঙ্গে তিনি জীবন যাপন করেছেন। উপরন্তু তিনি যাদের সঙ্গে জীবন যাপন করেননি, তাদের পরিচয়ও শুধুমাত্র সংবাদ ও অবস্থা শ্রবণের মাধ্যমে জানতে সক্ষম হয়েছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন:
يا عبد الرحمن بن سمرة لا تسأل الإمارة، فإنك إن أعطيتها من غير مسألة أعنت عليها.
'হে আব্দুর রহমান বিন সামুরাহ! নেতৃত্ব চেয়ে নিয়ো না, কারণ চাওয়া ব্যতীত নেতৃত্ব প্রদান করা হলে তোমাকে সে ক্ষেত্রে সহযোগিতা করা হবে।' আব্দুর রহমান বিন সামুরাহ নেতৃত্বের নিকটবর্তী হওয়ার কারণে বা নেতৃত্ব চাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়ায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে শিক্ষা দিচ্ছিলেন। এ দ্বারা প্রমাণিত হয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্বভাব সম্পর্কে জেনে শুনে নিয়েছেন। আবু যার রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন:
يَا أَبَا ذَرٍّ إِنِّي أَرَاكَ ضَعِيفًا، إِنِّي أُحِبُّ لَكَ مَا أُحِبُّ لِنَفْسِي ... لَا تَأَمَّرَنَّ عَلَى اثْنَيْنِ .
'হে আবু জর! আমি তোমাকে দুর্বল মনে করি, তোমার জন্য তা-ই পছন্দ করি যা আমি নিজের জন্য পছন্দ করি। তুমি কখনো নেতৃত্ব করবে না তা দু'জনের উপরে হলেও।' রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতেন তার ব্যক্তিত্ব খুবই দুর্বল, কাজেই তিনি নেতৃত্ব সামাল দিতে পারবেন না। শুধুমাত্র এই জন্যেই কথাটা তিনি বলেছিলেন। (বুখারী ও মুসলিম)
ব্যক্তিত্ব নির্ণয়ে রাসুলুল্লাহ'র অন্যতম পদ্ধতি সম্পর্কে আরো দৃষ্টান্ত আছে। যেমন, একজন সাহাবী এসে বললো, 'হে আল্লাহ'র রাসুল! আমাকে উপদেশ দিন!' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: 'তুমি রাগ করবে না।' সে আবার বললো, 'আমাকে উপদেশ দিন।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তুমি রাগ করবে না।' আবার সে বললো, আমাকে উপদেশ দিন! তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তুমি রাগ করবে না।' যাতে সে বুঝতে পারে যে, এই দোষটা তার মধ্যে প্রবল। আর একজন সাহাবী এসে বললো, 'হে আল্লাহর রাসুল! আমাকে উপদেশ দিন!' তিনি তাকে আল্লাহর জিকির করার উপদেশ দিলেন।
এখানে আমার প্রশ্ন হচ্ছে: দুইজন প্রশ্নকারী একই প্রশ্ন করল অথচ তাদের উভয়ের উত্তর অথবা উপদেশের মধ্যে কেন পরিবর্তন আনা হল? কারণ, 'উপদেশ নিছক কথা নয়, অনন্তর তা হচ্ছে বর্নমালায় নোক্বতা প্রদান অথবা উপযুক্ত স্থানে উপযুক্ত কথা বলার নাম।' রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা আমাদের নিকট স্পষ্ট করতে চেয়েছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীদের অসংখ্য গুণের বিবরণ দিয়েছেন, বিভিন্ন সময়। তিনি বলেন:
أفضل أمتي أبو بكر، وأشدهم في الله عمر، وأكثرهم حياء عثمان، وأقرؤهم لكتاب الله أبي بن كعب، وأقربهم إلى زيد بن ثابت، وأعلمهم بالحلال والحرام معاذ بن جبل، ألا وإن لكل أمة أمينا، وأمين هذه الأمة : أبو عبيدة عامر بن الجراح.
"আমার উম্মতের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ট ব্যক্তি আবু বকর, আল্লাহর ব্যাপারে সবার চেয়ে কঠিন উমার, সর্বাপেক্ষা লজ্জাশীল উসমান, কুরআন সর্বাপেক্ষা ভাল তেলাওয়াতকারী হল উবাই বিন কা'আব, আমার সবচেয়ে নিকটতম ব্যক্তি যায়েদ বিন সাবিত এবং হালাল হারামের ব্যাপারে সর্বাধিক বিজ্ঞ হল মুআজ বিন জাবাল। সাবধান! প্রত্যেক জাতির একজন সবচেয়ে বিশ্বস্ত ব্যক্তি থাকে, আর আমার উম্মতের বিশ্বস্ত ব্যক্তি হচ্ছে- আবু উবাইদাহ আমের ইবনুল-জাররাহ।" (তিরমিযী ও আহমদ)
প্রতিটি গোত্র, সম্প্রদায় ও জাতির স্বভাব-প্রকৃতি, সভ্যতা-সংস্কৃতি ও চরিত্র-বৈশিষ্ট্যাবলী আপনাকে জানতে হবে, এবং নির্ণয় করতে হবে সেই ব্যাপকতর গুণগুলো যা তাদের সকলের মধ্যে সমান ভাবে পরিলক্ষিত হয়। যাতে আপনি তাদের সঙ্গে সার্থক ভাবে লেনদেন করতে পারেন। কতিপয় সম্প্রদায় ও জাতি এমন, যাদের কিছু সুনির্দিষ্ট স্বভাব ও গুণাবলী আছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় যখন ওমরাহ ব্রত পালন করতে আসলেন, তখন কাফেররা সে বছর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ওমরাহ ব্রত পালন করতে বাধা দিয়েছিল। ঘটনার বিবরণ: কাফেররা সর্ব সম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নিল, তাদের পক্ষ থেকে একজন প্রতিনিধি পাঠাবে, যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে আলাপ-আলোচনা করে তাকে ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হবে। অতঃপর বনু কেনানাহ'র এক ব্যক্তি এগিয়ে এসে বলল, 'আমাকে দায়িত্ব দিন, আমি গিয়ে সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে তাঁকে ফিরিয়ে দিয়ে আসি।' রাসুলুল্লাহ'র সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিকট যখন লোকটি আগমন করল, এবং তিনি জানতে পারলেন যে, এ ব্যক্তি বনু কিনানার অমুক; আর ঐ গোত্রের লোকজন উটকে সীমাহীন ভক্তি করে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন আগন্তুকের পথের নিকটতর প্রান্তরে অথবা নিশ্চিত ভাবে সে যে উপত্যকা অতিক্রম করবে- সেখানে উট ছেড়ে আসতে নির্দেশ করলেন। এরপর সে যখন আগমন করল, সাহাবায়ে কেরাম তালবিয়া পাঠরত অবস্থায় তাকে স্বাগত জানালো। এবং সে দেখতে পেল উটগুলো বাধা অবস্থায় উপত্যকায় বিচরণ করছে। সে বুঝে নিল বাইতুল্লাহ শরীফে নাজরানা পেশ করার জন্য এই উটগুলো আনা হয়েছে; অতএব সে খুব গভীরভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে পড়লো এবং বলে উঠলো এদেরকে বাইতুল্লাহ শরীফে ঢুকতে বাধা দেয়া উচিত হবে না। অতঃপর সে তার সঙ্গীদের নিকট ফিরে গেল এবং তারা তার কর্মতৎপরতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে সে বলে- 'আমি তাদের উটগুলো বাধা এবং প্রতীক লাগানো অবস্থায় দেখেছি। সে কারণে তাদেরকে বাইতুল্লাহ থেকে ফিরিয়ে দেয়া আমি সঙ্গত মনে করিনি।'
এখানে আমাদেরকে বিশেষভাবে লক্ষ্য করতে হবে- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ সম্প্রদায় সম্পর্কে সংগৃহীত এই তথ্যাবলী কত সফলভাবে প্রয়োগ করতে সক্ষম হয়েছেন। সে কারণে আলাপ-আলোচনা ও সেখানে ব্যয়িত পরিশ্রমের দায়িত্বটা তিনি নিজের কাঁধে নিয়েছেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্য একটি তথ্য থেকেও উপকৃত হতে সক্ষম হয়েছিলেন, যখন তিনি জানতে পারলেন- ইথিওপিয়ায় একজন ন্যায়পরায়ণ রাজা আছে। তিনি যখন দেখতে পেলেন- মুমিনদের উপর অত্যাচার-নিপীড়ন ও শাস্তির মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলছে, কাফেরদের অবরোধের কারণে তাদের জন্য পৃথিবী সংকীর্ণ হয়ে গেছে। সে কারণে তারা একটু শান্তিতে আল্লাহর ইবাদত পর্যন্ত করতে পারছে না। এহেন নাজুক পরিস্থিতিতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে ইথিওপিয়ায় হিজরত করতে নির্দেশ দিলেন। যেহেতু সেখানে একজন খৃষ্টান রাজা আছে, যার নাম নাজ্জাশী। তার নিকট কেহ অত্যাচারিত হয় না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা তোমাদের জন্য- তোমরা যে কষ্টের মধ্যে আছো তা হতে- মুক্তির কোন পথ বের করে দেবেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিশ্চিত সত্য বলেছেন, সম্রাট নাজ্জাশী কোরাইশদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ ঈমান নিয়ে পালাতক সাহাবীদের আশ্রয় দিয়েছিলেন এবং তাদের জান-মালের নিরাপত্তা বিধান করেছিলেন। অতঃপর তারা নিরাপদে সেখানে আল্লাহ তা'আলার ইবাদত-বন্দেগী করতে থাকেন। উপরোন্ত নাজ্জাশী ও মনে মনে ঈমান গ্রহণ করেছিল। তার পরলোক গমনের সংবাদ জানার পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য গায়েবানা জানাযা পড়েছেন।
মানুষের আচার-ব্যবহার ও তাদের সভ্যতা-সংস্কৃতির প্রতি লক্ষ্য রাখা ও অত্যন্ত প্রয়োজন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে আবর্জনা ফেলানোর অপরাধে এক কাফেরকে মসজিদের খুটির সঙ্গে বেঁধে রেখে ছিলেন তাকে শাস্তি দেয়ার জন্যে। আর লোকজন নামাজ পড়তো, মসজিদে প্রবেশ করতো ও বেরিয়ে যেত আর সে শুধু তাদের দিকে তাকিয়ে থাকত। কিছুদিন পর অবশ্য সে ইসলাম গ্রহণ করেছে। কারণ, সে মুসলমানদের সুন্দর আচরণ, ভ্রাতৃত্ববোধ ও মসজিদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে।
📄 উত্তম চরিত্র ও সৎস্বভাবের মূল্যায়ন করার গুরুত্ব
দাওয়াতের ক্ষেত্রে উত্তম চরিত্রের মূল্যায়ন করা এবং তার প্রতি প্রেরণার সঞ্চার করা গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এটা মানবহৃদয়ে বিরাট প্রভাব বিস্তার করে এবং ভাল কাজ ও নন্দিত আচরণের জন্য তাকে আরো গতিশীল হতে উদ্বুদ্ধ করে। কাল্পনিক কিংবা রূপকথার থেকে ধার নিয়ে নয়, বরং গুরুত্বের জন্য আমাদের সামাজিক জীবনে সংগঠিত ঘটনা থেকে তার উদাহরণ পেশ করছি: বর পক্ষ সকল আত্মীয় স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের নিমন্ত্রণ জানিয়ে বিবাহ অনুষ্ঠানের আয়োজন করল। আমরা সকলেই জানি এতে তাদের কত শ্রম ঝরাতে ও কষ্ট করতে হয়েছে। কারণ, এখন তারা আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের সম্মুখে যাচাইয়ের পাত্র। সবাই তাদের আতিথেয়তা ও ব্যবস্থাপনার উপর মন্তব্য করবে। সুতরাং তারা স্বীয় সাধ্যের ক্ষেত্রে কোন ত্রুটিই রাখে না। যেহেতু সুন্দর ও উৎকৃষ্ট সেবা প্রদান একমাত্র উদ্দেশ্য। তবুও তাড়াহুড়ো, সময়ের স্বল্পতা ও মানসিক টেনশনের দরুন আয়োজক কিংবা পরিবেশনকারীদের সামান্য ভুল-চুক হয়ে যাওয়া বা দু-একটি আইটেম ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক। সেখানে কারো কারো উপর কেয়ামত বয়ে যায়, ক্রোধে সজোরে হুংকার করে উঠে। উপস্থিত উৎকৃষ্ট খানার পসরার কথা পর্যন্ত ভুলে যায় সে, উপরন্তু পরিবেশনকারীদের পরিশ্রমটুকুও অস্বীকার করে বসে। এটা কোন যুক্তিসঙ্গত কাজ?
এ জাতীয় প্রেক্ষিতে ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরে উৎসাহ দেয়া উচিত। ত্রুটি বিচ্যুতিগুলোর পুনরাবৃত্তি না করা। তবেই তারা সামনের কাজে ক্রমাগত উৎকর্ষ সাধন, সংশোধন ও শোধরানোর অনুপ্রেরণা লাভ করবে। যেমন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসাজ ইবনে আবদে কায়েসকে উৎসাহ প্রদানের জন্য বলেছিলেন:
إن فيك خصلتين يحبهما الله : الحلم والإنائة .
"তোমার মধ্যে দু'টো গুণ রয়েছে যা আল্লাহ পছন্দ করেন: ধৈর্য ও ধীরস্থিরতা।” (রওয়াহু মুসলিম)
আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, যখন চরিত্র দু'টো ভদ্রলোকের মধ্যে বিদ্যমান তখন তা উল্লেখ করার আবশ্যক কি? এর উত্তর: ইতিবাচক দিক বা ভাল গুণের উল্লেখ আলোচিত ব্যক্তিকে গভীর থেকে নিজের নেতিবাচক দিকগুলো অনুসন্ধানে তৎপর ও সক্রিয় করে তুলবে। সে আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য অর্জনের লক্ষ্যে উত্তম গুণাবলীতে আরো সমৃদ্ধ হতে সচেষ্ট হবে। অন্যরাও এরকম প্রশংসার জন্য উদগ্রীব থাকবে এবং এর মর্যাদায় উন্নীত হতে চেষ্টা করবে।
এ ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুসৃত পদ্ধতিটি হচ্ছে অভিনব, ফলপ্রসূ ও অত্যন্ত কার্যকর। তিনি কারো মধ্যে অনুকরণ যোগ্য গুণ, ভাল স্বভাব ও সুন্দর নীতির প্রমাণ পেলে উত্তম উপাধি, সুন্দর সুন্দর নাম ও উপনাম দিয়ে আখ্যায়িত করতেন। যার ভেতর তাদের অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলো ফুটে উঠত এবং তারা নিজেরাও এর কারণে গর্ববোধ করতেন, ঈর্ষণীয় হতেন অন্যদের কাছে। এভাবেই সবার সামনে দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট হয়ে যেত উত্তম চরিত্রের মহত্ব, মূল্য ও গুরুত্ব। যেমন তিনি খালিদ বিন ওয়ালীদ রা.-কে 'সাইফুল্লাহ আল-মাসলুল', উসমান বিন আফ্ফন রা.-কে 'জিন্নু-রাইন', উমার বিন খাত্তাবের রা.-কে 'আল-ফারুক' এবং আবু উবাইদাহ ইবনুল যারাাহ রা.-কে 'আমিনুল উম্মাহ' বিশেষণ দ্বারা আখ্যা দিয়েছেন। অবশ্যই এখানে মহান উদ্দেশ্য নিহিত রয়েছে। ফলশ্রুতিতে তারা এবং তাদের সমসাময়িকরা নিজের জান-প্রাণকে ইসলামের জন্য উৎসর্গ করার নিমিত্তে উদ্দীপ্ত হয়েছেন। এবং জীবন, সাধনা ও সম্পদ ইসলামের দাওয়াতের জন্য উজাড় করে দিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা উৎসাহ প্রদান, অন্তরে আকর্ষণ সৃষ্টি ও ইসলামের উপর দৃঢ়পদ ও অনঢ় রাখার জন্য যাকাতের একটা অংশ অমুসলিমদের জন্য বরাদ্দ করেছেন। ফলে তাদের অনেকেই ইসলামের মূল্য অনুভব করতে পেরে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছে।
উত্তম চরিত্রগুলো তুলে ধরা, তার প্রতি তাগিদ ও উৎসাহ প্রদান আমাদের যেমন দায়িত্ব, মন্দ স্বভাব ও বিচ্যুতিগুলো ভুলে যাওয়া, তা এড়িয়ে চলা ও ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখা তেমন দায়িত্ব। অতএব আপনার নিকট যদি তা পরিবর্তন করে সুন্দরে রূপান্তর করার সামর্থ্য থাকে, তবে করে ফেলুন। যদি তা পরিবর্তন করার সামর্থ্য না থাকে, তবে ভুলে যেতে চেষ্টা করুন। কারণ, মন্দ বিষয় প্রকাশ করা ও জনসম্মুখে তুলে ধরা তার প্রতি তাগিদ প্রদানেরই নামান্তর। আপনি যদি কোন লোককে উপদেশ দিতে চান, তাহলে আপনাকে ইতিবাচক বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে হবে, এবং এত বেশী পরিমাণ আলোচনা করতে হবে যে, নেতিবাচক বিষয়ের উপর যেন আপনিই বিরুদ্ধাচারী হয়ে যান। হ্যাঁ, তাকে কোনরূপ আঘাত না করে বিনম্রভাবে নেতিবাচক বিষয়গুলোর প্রতি তার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেন। যাতে তার ও আপনার মধ্যে সম্পর্কের পথরুদ্ধ হয়ে না যায়। আপনাকে আরো মনে রাখতে হবে আদম সন্তান ভুলে-ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত। অসংখ্য মানুষ ভুল করার পরও অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর নিকট তওবা করে সঠিক পথে ফিরে এসেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন:
خير الخطائين التوابون
"উত্তম ভুলকারীগণ তারাই যারা তওবাকারী।"