📄 মনোবিজ্ঞানের পদ্ধতি
মনোবিজ্ঞানে আমাদের নিকট যে বিষয়টা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে- একজন মনোবিজ্ঞানী তথ্যাদি সংগ্রহ সংরক্ষণে, মানুষের আস্থা অর্জন ও তাদের মধ্যে প্রভাব বিস্তারে যে পদ্ধতিটা অবলম্বন করে থাকেন। তাদের ব্যক্তিত্বের পরিচিতি, মন্দ আচরণ পরিবর্তন পদ্ধতি ও তাদের ভাল আচরণের প্রশংসা; এটাই হচ্ছে এই পুস্তকের প্রতিপাদ্য বিষয়। সুতরাং এখানে আলোচনা হবে শুধুমাত্র ঐ পদ্ধতি সম্পর্কে যা একজন মনোবিজ্ঞানী প্রয়োগ করে থাকেন। তবে আত্মিক রোগ সমূহ ইত্যাদি ...... বিষয় এখানে আলোচনা হবে না। এমনিভাবে ইসলামের দাওয়াতের ক্ষেত্রে আমরা মানুষের সঙ্গে আচার-আচরণ, লেনদেন ও কথা-বার্তায় সর্বোত্তম পদ্ধতি গ্রহণের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আদিষ্ট। আল্লাহ তাআ'লা এরশাদ করেন-
ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالحِكْمَةِ وَالمُوْعِظَةِ الحُسَنَةِ وَجَادِلُهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ.
"তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপ্রতিপালকের পথে আহ্বান করো হিকমত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সাথে আলোচনা করো উত্তম পদ্ধতিতে।”¹
কাঙ্ক্ষিত জ্ঞান, উত্তম উপদেশ ও উৎকৃষ্ট পদ্ধতি ইসলামের দাওয়াতের প্রত্যেকটি ক্ষেত্র উন্মুক্ত; যতক্ষণ পর্যন্ত তা শরীয়তের মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়। সুতরাং দাওয়াত-কর্মীগণ আমলের উৎকর্ষ সাধনে প্রয়োজনীয় সকল তথ্যাদি, মাধ্যম ও প্রকাশ পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারবে। মনোবিজ্ঞান এমনি একটা উত্তম পদ্ধতি; যদি তা শরিয়তের কোন বিষয়ের সাথে সাংঘর্ষিক না হয়। তখন আমরা যে কোন সুদৃঢ় ও স্থায়ী পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারবো- যা ইসলামের দাওয়াতের ক্ষেত্রে আমরা প্রয়োগ করতে পারি। দাওয়াতের উদ্দেশ্য শুধুমাত্র শিক্ষা নয়; বরং আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে-পরিচর্যা, শিক্ষা এবং আচার-ব্যবহারকে উত্তম রূপ দেয়া।
ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্বকে আল্লাহর সঠিক পথে ও ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে সুন্দর ও সঠিকভাবে লালন করা ও বিকাশ ঘটানো। আর এটাই হচ্ছে দাওয়াতের প্রতিপাদ্য, অভীষ্ট লক্ষ্য। দাওয়াতের দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত ব্যক্তিদের নিকট বিষয়টা নতুন ও অপরিচিত মনে হতে পারে। কিন্তু দাওয়াতী কাজে বিশেষ নৈপুণ্য অর্জন করতে এ পদ্ধতি প্রয়োগের বিকল্প নেই। প্রত্যেক বিশেষজ্ঞকে তার অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দিয়ে তার সত্য ধর্মের সেবা করা ইসলামী দাওয়াতের দাবী। অতএব আমরা এই বিশেষ জ্ঞান ও ব্যুৎপত্তিকে শুধু রুজী ও জীবিকা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করতে এবং এর মাধ্যমে কোন চাকুরী বা সুযোগ বাগিয়ে নিতে চাই না। বরং তার এ বিশেষ জ্ঞানের উত্তরোত্তর উৎকর্ষ সাধন, এর ব্যাপক ও সঠিক প্রয়োগ করতে চাই। এ বাপারে সংশ্লিষ্ট কারো দ্বিমত নেই।
আমি বিপুল সংখ্যক পাঠক ভাইদের কথা বিবেচনা করে- যারা জানতে চায় কিভাবে এবং কোন পদ্ধতিতে আমরা মানুষের মাঝে প্রভাব বিস্তার করতে পারবো- এ মৌলিক বিষয়টার উপর খানিকটা আলোকপাত করতে চাই। শুরুতে এটা একটা দুর্বোধ্য বিষয় ছিল। যেমন কিভাবে একজন মনোবিজ্ঞানী মানুষের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করতে পারবে এবং কি করে তাদের আস্থা অর্জন করতে পারে। আগে তো মানুষ আশঙ্কা, ভয় ও উৎকণ্ঠার মধ্যে জীবন কাটাতো। মনোবিজ্ঞানীকে এই ভেবে ভয় করতো যে, সে তার ব্যক্তিগত বিষয়গুলো প্রকাশ করে দেবে কারণ তার সকল কর্মকাণ্ড সে জানে। তখন এই ধারণাটা বর্তমান সময়ের ইন্টারনেট ও স্যাটেলাইটের মত সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। তবে এই সমস্যাটা এতটা সহজ নয় যে, এই ক্ষুদ্রপুস্তিকার মাধ্যমে এর ব্যাখ্যা দেবো কিংবা কঠিন বিষয়কে সহজ করে দেবো। আমি সে সকল বিষয় অনুসন্ধান করি যা মনোবিজ্ঞানের পদ্ধতি এবং ইসলামের দাওয়াতে তার প্রয়োগের সম্ভাবনা আছে। আমাকে পরিপূর্ণ তৃপ্তি দান করেছে যে বিশ্বাস টা তা হচ্ছে, অবশ্যই দাওয়াৎ-কর্মীগণ এক মহান বিষয় ও শাশ্বত গবেষণার অধিকারী হয়েছে। কিন্তু যাকে দাওয়াত দেয়া হবে তার মধ্যে প্রভাব বিস্তার, বিষয়বস্তুকে গ্রহণযোগ্য ও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপনের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি প্রয়োজন। আর এটাতো এমন একটি বিষয় যা অধিকাংশ দাওয়াত-কর্মীর নেহায়েত প্রয়োজন। কখনো বা বিজ্ঞানীদেরও এর প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
আমি আপনাদের জন্য এখানে কয়েকটি উদাহরণ দেবো। নিশ্চয়ই ইসলাম আমাদের জন্য বহুবিধ বিষয় বিধিবদ্ধ করেছেন। আর বিস্তারিত বিধানে -যা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়েছে- আমাদের আচরণ কি হবে? যা তার সুবিস্তীর্ণ পথসমূহ বাতলে দিয়েছে। যখন আমরা মনোবিজ্ঞানের জন্য কোন বস্তু বা বিষয় নিয়ে আসবো, তখন এ দ্বারা কোন অনভিপ্রেত বা নবআবিষ্কৃত বিষয় কখনোই আমাদের উদ্দেশ্য নয়।
উদাহরণত: একজন যুবক এসে যদি বলে- 'এটা একটা নতুন কারণ অথবা নব আবিষ্কৃত বিষয়। এ জাতীয় বিষয় কি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যবহার করেছেন?' তখন আমরা তাকে উত্তরে বলবো, 'হ্যাঁ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এজাতীয় বিষয় ব্যবহার করেছেন।' এখানে আমাদের লক্ষ্য করা উচিত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীদের রা. সঙ্গে কিরূপ আচরণ করেছেন। এবং তাঁকেই আমাদের সর্বোচ্চ উদাহরণ ও আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।
উল্লেখ থাকে যে, মনোবিজ্ঞানীদের নিকট মানুষের সঙ্গে ব্যবহার পদ্ধতিতে সুনির্দিষ্ট ও অতিসূক্ষ্ম কিছু উপায় থাকে। যেমন কিভাবে আমরা তার আস্থা অর্জন করতে পারি এবং কিভাবে একটি মানুষের চেহারার অভিব্যক্তি বুঝতে পারি?
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাদীস ভাণ্ডারকে তুমি যদি উদাহরণ হিসেবে নিতে পারো, তাহলে এই বস্তুর জোগাড় ও মন্দ ব্যাখ্যার তোমার আর প্রয়োজন হবে না। কিন্তু এটা অবশ্যই বুঝতে হবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অর্থ কিভাবে বুঝেছিলেন এবং এর মর্মই বা কিভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। যখন একই প্রশ্নের উত্তরে একাধিক প্রশ্নকারীর ভিন্ন ভিন্ন উত্তর দিয়েছেন। আর এটা একমাত্র রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় সূক্ষ্ম বিচক্ষণতার মাধ্যমে তাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত ব্যাপারেও অবহিত হতে সক্ষম হয়েছিলেন। অতএব বিশেষজ্ঞ দায়ীবৃন্দকে সীরাতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধ্যয়ন এবং কিভাবে তিনি মানুষের সঙ্গে ব্যবহার করেছেন তা জানা কর্তব্য। এর প্রমাণ স্বরূপ কতিপয় বিবাদমান বিষয়ে কোন অভিমতকে বিশ্লেষণ করার জন্য শরিয়তের কয়েকটি প্রমাণ শুনিয়ে দেয়া দরকার; কিভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের আস্থা ও ভালবাসা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
উদাহরণ স্বরূপ: মনোবিজ্ঞানী রোগীর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাত থেকে - যা রোগীর সঙ্গে এক ঘণ্টা বা তার অধিক সময় পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল- সে অনেক বিষয় জানতে সক্ষম হবে। অতএব আপনি একজন দায়ী হিসেবে যদি এ পদ্ধতিটা প্রয়োগ করতে পারেন তাহলে নিশ্চয়ই আপনি প্রথম সাক্ষাতেই কাঙ্ক্ষিত দাওয়াত দিতে সক্ষম হবেন; চাই সুস্থ বা অসুস্থ যে অবস্থায়ই সে থাকক না কেন। সর্বোপরি আপনি তার আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করতেও সক্ষম হবেন। এ অবস্থায় আপনার প্রভাব তার উপর দ্রুত ও গভীরভাবে পড়বে। সুতরাং এখন আপনার কর্তব্য হচ্ছে, প্রথমে তাকে নিজের সম্পর্কে বলতে দিন। কারণ মানুষের স্বভাবজাত চাহিদাও এটা। তাকে ক্রমাগত বলে যেতে দিন আর আপনি শুধু মনোযোগ দিয়ে শুনতে থাকুন। কারণ এর দ্বারা তার মধ্যে যে পুঞ্জীভূত চাপ ও আত্মিক জড়তা আছে, তা আপনি বের করে ফেলতে পারবেন। যখন নিজের সম্পর্কে পর্যাপ্ত কথা বলা শেষ হবে, তখন তার অন্তর স্বস্তি লাভ করবে, মনে প্রশান্তি অনুভব করবে এবং মনের মধ্যে আরামবোধ হবে। এ পর্যায়ে আপনি তো তার আস্থা অর্জনে বিরাট একটি পদক্ষেপ নিলেন। সে যা বলে তা আপনার গ্রহণ করা উচিত এই ভিত্তিতে যে, এটা তার স্বভাবজাত বিষয়। তার প্রদত্ত বক্তব্যকে অনভিপ্রেত মনে করবেন না। অবহেলে করবেন না। কারণ আপনি যদি তার বক্তব্যকে অনভিপ্রেত মনে করেন এবং 'বোধগম্য নয়' কথার দ্বারা যদি বিরক্তিভাব প্রকাশ করে দেন। তাহলে আপনার এই অনভিপ্রেত মনে করাটা তাকে আপনার সম্পর্কে নেতিবাচক দিকে তার মন নিয়ে যাবে। অতঃপর অন্তর দিয়ে সকল কথা বলা থেকে সে বিরত থাকবে।
আপনার শুধুমাত্র কথার মাধ্যমে দুর্বোধ্য মনে করা, যেমন, 'আপনার বক্তব্য বোধগম্য নয়' অথবা 'এটা কি ঠিক হয়েছে?' অথবা কখনো আপনার চেহারার অভিব্যক্তি পরিবর্তন করে তার মাধ্যমে নিজের বিরক্তি প্রকাশ করলেন। এমতাবস্থায় ঐ ভদ্রলোক ভাববে যে, আপনি তার কথা বিশ্বাস করছেন না ; তখন সে আলোচনা স্থগিত করে দেবে। এবং আপনাকে বলবে, আপনার সঙ্গে অন্য সময় সাক্ষাত করবো। তার সকল বক্তব্যের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে আপনাকে অনুভব করাতে হবে আমরা তাদের সঙ্গে কিরূপ আচরণ করছি। তাহলে ভদ্রলোক অনেক কথা বলবে। তার ভিতরে যা আছে তা উদগীরণ করার জন্য অনর্গল বলে যাবে সে। যাতে সে দুশ্চিন্তামুক্ত হয়ে আত্মিক প্রশান্তি অনুভব করতে পারে। 'বক্তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার প্রতি গুরুত্বারোপ করা' একজন দাওয়াত-কর্মীর কাছ থেকে একান্তভাবে কাম্য। কথা হেলান দিয়ে শুনবে না। এমনকি গুরুত্ব না দেয়ার কারণে আপনি তার কথা উপলব্ধি করতে নাও পারেন। আর সে যখন এটা টের পেয়ে যাবে, তখনই সে তার কথা বলা বন্ধ করে দেবে। এবং সে বুঝাতে চেষ্টা করবে যে, অপর বিষয়টা সে একেবারে ভুলে গেছে। বরং কথার গতি তখন অন্য বাঁকে ঘুরিয়ে দেবে। ফলে আপনি দেখবেন, যে বিষয় সে কথা আরম্ভ করেছিল তার সম্পূর্ণ বিপরীত বিষয় শুরু করে দিয়েছে।
দাওয়াতের ক্ষেত্রে সভা-সেমিনারের গুরুত্ব অপরিসীম। এ প্রেক্ষিতে আপনার কর্তব্য হচ্ছে- আপনার প্রদত্ত বক্তব্যে তার প্রতি আপনার আন্তরিকতা, ভালোবাসা ও মহব্বতের কথাটা ফুটিয়ে তুলতে হবে।
উদাহরণ স্বরূপ- তার সঙ্গে এমন অবস্থায় আলোচনা জুড়ে দেয়া ঠিক হবে না, যখন আপনি চেয়ারে এবং সে মেঝেতে বসে থাকবে- যাতে সে একথা মনে করতে না পারে যে, আপনার ও তার মধ্যে অনেক ব্যবধান, অথবা মনে করবে আপনি তার উপর কর্তৃত্ব করছেন। এই অভিমতটি ব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে নিম্নে আর একটি সহায়ক উদাহরণ দিচ্ছি:
যখন আপনি কোন সরকারী উর্ধ্বতন কর্মকর্তার নিকট যাবেন, তাকে একটি উঁচু চেয়ারে এবং আপনি অপেক্ষাকৃত একটু কম উঁচু চেয়ারে বা ছোট চেয়ারে বসা থাকবেন। অতঃপর আপনি যখন কথা বলবেন- তখন অবশ্যই আপনাকে নিচ থেকে উপরের দিকে লক্ষ্য করতে হবে। এমতাবস্থায় আপনি বেশি কথা বলতে পারবেন না। কারণ আপনি মনে করছেন সে আপনার উপর আধিপত্য বিস্তার করে আছে। উপরন্তু আপনি এটাও উপলব্ধি করছেন যে, সে আপনার উপর অহংকার প্রদর্শনকারী। আপনাদের মধ্যে সম্পূর্ণ ব্যবধানটা তেমন -উঁচু চেয়ার যার উপর সে বসে আছে এবং ছোট আসন যার উপর আপনি বসে আছেন-এ দু'টি আসনের মধ্যে পার্থক্য যেমন। পক্ষান্তরে আপনাকে যদি তার পাশে একই চেয়ারে বসায় অথবা আপনারা দু'জন এক সঙ্গে একই স্তরে বসেন; তখন সে আপনার বিনয় উপলব্ধি করতে পারবে ও আপনাদের মধ্যে আন্তরিকতা ও ভালোবাসার সৃষ্টি হবে। এটা এমন একটি বিষয় যার প্রতি আমাদের সকলকেই খেয়াল রাখতে হবে।
অতএব এটা প্রমাণিত হয়ে গেল যে, বসার স্থান ও আসনের সমতা শ্রোতার অন্তরে একটা বিরাট প্রভাব থাকে। সে যদি আপনার সঙ্গে কোন বিষয় কথা বলতে প্রস্তুত নয়, তা সত্ত্বেও এই সুযোগে আপনি তার সঙ্গে কথা বলার প্রস্তুতি নিতে পারেন। সে তাতে সাড়া দেবে। যে সাড়াটা আপনি আসন বৈষম্যের সময় পেতেন না।
জনসাধারণের সঙ্গে কথা বলার জন্য উপযুক্ত সময় নির্বাচন করা কর্তব্য। যেমন- আপনার নিকট যদি একজন লোক এসে বলে, আমার একটি প্রশ্ন আছে, অথচ আপনারা উভয় তখন একটি সংকীর্ণ স্থান অতিক্রম করছেন, অথবা একটি রাস্তার মধ্যে তার সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন। এটা কি কথা বলার কোন উপযুক্ত স্থান হলো? অবশ্যই আপনাকে একটি উপযুক্ত স্থান নির্বাচন করতে হবে যেখানে আপনার সঙ্গী আপনার বিশেষত্ব উপলব্ধি করতে পারবে।
এবং আলোচনার জন্য উপযুক্ত সময় নির্বাচন ও অনুকূল পরিবেশ তৈরী করতে হবে। উভয়ের জন্য উপযুক্ত স্থান, নির্ধারিত সময় ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে। যেমন- আপনি তাড়াহুড়া করছেন, এ অবস্থায় কেহ আপনার সঙ্গে সাক্ষাত করে কথা বলতে চায়; অতঃপর আপনি তাকে বললেন- আমার একটু তাড়া আছে, আপনার সঙ্গে এ মুহূর্তে কয়েক মিনিটের বেশি কথা বলতে পারছি না। এ অবস্থাতো আপনি কিছুতেই তার হক আদায় করতে পারছেন না।
বরং এ ধরনের প্রেক্ষাপটে আপনাকে অন্য একটি সময় বেছে নিতে হবে যেখানে সে বিশেষত্ব অনুভব করবে। এবং উপলব্ধি করতে পারবে- নিশ্চয়ই আপনি তার প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছেন ও তার প্রতি মনোযোগ নিবদ্ধ করে রেখেেছন। আর তখনই আপনি তার আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হবেন। এবং তার অন্তরে আপনার বিশাল প্রভাব পড়বে।
যখন আপনারা উভয়ে এক সঙ্গে বসবেন তখন তার কথার মধ্যে যে বিষয়টাকে সে মূলত বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে তা উপলব্ধি করা আপনার কর্তব্য। বক্তার কথা আপনি সম্পূর্ণ বুঝছেন, এটা তাকে বুঝাতে হবে। আপনার বুঝার প্রমাণ হিসেবে আপনি তার সম্পূর্ণ বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারেন, সে আপনাকে তার বক্তব্য সংক্ষিপ্তকরণের সুযোগ দিয়েছে। আপনি তাকে এভাবে বলতে পারেন- নিশ্চয়ই আপনার এ কথার উদ্দেশ্য হচ্ছে 'এটা...', অথবা আপনি এরকম বলতে চাচ্ছেন... এরকম..... বলেছেন। তখন সে অনুভব করবে- নিশ্চয়ই সম্পূর্ণ মনোযোগ সহকারে আপনি তার কথা শুনছেন। এ কারণে সে আপনার সঙ্গে কথা চালিয়ে যাবে আপনার প্রতি তার সৃষ্ট আস্থার সঙ্গে; যা সৃষ্টি হয়েছে মনোযোগ সহকারে তার ক্রমাগত কথা শ্রবণ করার কারণে। এ অবস্থায় তাকে আপনি সম্পূর্ণ প্রশান্ত, ধীর-স্থির ও ফুরফুরে মেজাজে পাবেন। অথবা আপনি তাকে বলতে পারেন, আমার ভুল হলে শুধরে দেবেন- 'আপনি সম্ভবত এটাও বুঝাতে চেয়েছেন।' তখন সে আপনাকে উত্তর দেবে, 'হ্যাঁ; আপনি যা বলেছেন তা ঠিক।' আপনি তখন বলবেন, 'কিন্তু আমি এর সঙ্গে এটাও সংযোজন করতে চাই..।'
আপনি যদি হুবহু ঐ শব্দগুলো ব্যবহার করতে পারেন যা সে তার বক্তব্যে প্রয়োগ করেছে; তাহলে সে আরো বেশী কথা বলবে এবং মনে করবে নিশ্চয়ই আপনি তাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। পক্ষান্তরে আপনি যদি তাকে কোন অস্পষ্ট কথা বলেন, এ কারণে যে, আপনি তার কথা ভাল করে শুনেননি অথবা আপনি তার সঙ্গে বাক্যালাপ করেছেন সে আপনার কথা বুঝতে পারেনি তাহলে তাকে উপলব্ধি করতে দেয়া যাবে না যে, সে আপনার কথা সে বুঝতে পারেনি। বরং এ প্রেক্ষিতে আপনার কর্তব্য হচ্ছে- তখন এর বিশদ ব্যখ্যা করে দেয়া; অতএব আপনি তাকে বলতে পারেন ‘আশা করি আপনি বিষয়টা বুঝতে পেরেছেন।’ এটা আপনার প্রতি তাকে আরো সজাগ করবে এবং তার প্রতি আপনার অব্যাহত আনুগত্য বজায় রাখবে, নিজেকে নিরাপদ ভাবতে এবং ক্রমাগত কথা চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করবে। আপনি তাকে ক্রমাগত প্রশ্ন করতে থাকুন, কারণ আপনি যদি প্রশ্ন না করেন তাহলে সে তার প্রতি আপনার গুরুত্বহীনতা মনে করে বসবে। এবং বলবে লোকটার নিকট আমি যে উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছিলাম সে তার কোন গুরুত্বই দিলো না।
কখনো এমন বিষয় নিয়ে কথা বলতে থাকবে যা আপনি চাচ্ছেন না, উপরন্তু আলোচ্য বিষয়টা আপনি পরিবর্তন করতে চান। তাহলে এ ক্ষেত্রে তা সরাসরি পরিবর্তন না করে, বরং বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে হবে। আর তা এভাবে করা যেতে পারে, আপনি কৌশলে তাকে অন্য প্রসঙ্গে নিয়ে যাবেন অথচ সে মনে করবে তার বিষয়ে-ই সে আছে। কিন্তু আপনি তার সঙ্গে স্পষ্টবাদী হবেন এবং তাকে উদাত্ত্ব আহ্বান জানাবেন-আলোচ্য বিষয়টা যেন গুরুত্বপূর্ণ ও পরিষ্কার হয়। আর একটু অগ্রসর হয়ে তাকে বলবেন ‘তার কাঙ্ক্ষিত বিষয়টা যেন অপ্রাসঙ্গিকতা হতে মুক্ত হয়।’ যাতে সে বুঝতে পারে নিশ্চয়ই আপনি তাকে এবং তার বিষয়টাকে খুব গুরুত্ব দিচ্ছেন।
টিকাঃ
১. সূরা আন নাহল: ১২৫
📄 আলোচনার পদ্ধতি ও সত্যবাদিতা
আলোচনা ও বাক্যালাপের পদ্ধতি জানা আপনার কর্তব্য। মানুষের সঙ্গে সততা, সত্যবাদিতা আপনাকে তাদের বিশ্বাস ও আস্থার কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত করবে। এর দ্বারা আপনি হবেন তাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়। অতএব কখনোই অন্যকে বোকা ঠাওরানোর পদ্ধতি প্রয়োগ করবেন না। কখনো লোকদেরকে এ জানান দেবেন না যে, আপনি তাদের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান, যদি হয়েই থাকেন ঠিক আছে, তবে আপনি একাই বুদ্ধিমান নন- মানুষের মধ্যে তো আরো অনেক বুদ্ধিমান রয়েছে। আপনি যেমন বোঝেন তারাও তো বোঝে। বরং আপনার কর্মতৎপরতা ও তাদের সঙ্গে কথোপকথন পদ্ধতি তারা ধারণ করে রাখে। সুতরাং এ ক্ষেত্রে আপনার কর্তব্য হচ্ছে- আপনার সঙ্গে যিনি কথা বলছেন তাকে বলবেন আপনার কথাগুলো খুবই চমৎকার। কিন্তু আমি এ মুহূর্তে আপনার কথাগুলো গুরুত্ব দিয়ে শুনতে পারছি না। সেহেতু উপযুক্ত ও ব্যাপক সময় নিয়ে আমরা এ আলোচনাটি করতে পারি।
এখন আমাদের দ্বিতীয় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা দরকার। তা হচ্ছে: প্রশ্নের পদ্ধতি: মানুষের প্রশ্ন করার পদ্ধতি বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। কেউ করে উন্মুক্ত প্রশ্ন; উন্মুক্ত প্রশ্ন দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে- যার উত্তর শুধু হ্যাঁ বা না দ্বারা নয়, বরং অনেকগুলো উত্তর হতে পারে। তবে অবশ্যই সেই উত্তরগুলো হতে হবে সংক্ষিপ্ত ও নাতিদীর্ঘ। এটা বিশেষজ্ঞদের মত (হ্যাঁ অথবা না): কিন্তু উন্মুক্ত প্রশ্ন বলতে সাধারণভাবে তুমি কেমন আছো? বিশেষ করে তোমার পরিবার-পরিজনদের নিয়ে তোমার দিন কেমন কাটছে? সাধারণভাবে ইসলামের অনুসরণ কতটুকু করতে পেরেছো? এর উত্তরে সে ঐ প্রশ্নগুলো সমর্থন করে অথবা অসমর্থন করে কথা বলবে। অথবা এখানে আরো অনেক উত্তর থাকতে পারে। এমনকি আপনি যে উত্তরের অপেক্ষা করছেন তার বিপরীত উত্তরও সে দিয়ে ফেলতে পারে। অতএব আপনি তাকে বলতে পারেন তোমার পরিবারের সঙ্গে তুমি কেমন দিন কাটাচ্ছো? উত্তরে সে বলবে- আমার পরিবারের অনেক সমস্যা, এবং কথার প্রসঙ্গ অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে যাবে। অর্থ্যাৎ মূল আলোচ্য বিষয়টাই পরিবর্তন করে ফেলবে। সুতরাং এই ভদ্রলোককে প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে অবশ্যই আপনাকে পারদর্শিতার পরিচয় দিতে হবে। যাকে তারা 'ব্যাখ্যা সাপেক্ষ প্রশ্নমালা' বলে অভিহিত করেছেন- ঐ প্রশ্নগুলো আপনি ব্যবহার করবেন না।
কিন্তু প্রশ্ন করার আরো কিছু বিকল্প উপকরণ রয়েছে যা আলোচনাকে প্রাণবন্ত করণ, গতিশীলতা আনয়ন ও অধিক বাক্যালাপে সহায়তা করবে। আপনার প্রশ্নগুলো সুস্পষ্ট ভাষায় করবেন; এভাবে বলবেন, 'হ্যাঁ, এ বিষয় সে আমার সঙ্গে অনেক আলোচনা করেছে। অথবা তার কথার সংশ্লিষ্ট কোন একটা অংশের দিকে ইঙ্গিত করবেন, যার নিশ্চয়তা প্রদান ও ব্যখ্যার প্রয়োজন। অতঃপর তার কথার বৃদ্ধি কামনা করবেন।
কখনো একথা বলে আপনি তার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেন, 'তোমাকে তো আজ খুব বিষণ্ণ ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় মনে হচ্ছে!' উত্তরে সে বলবে- কার্যত আমি হতবুদ্ধি ও দিশেহারাই বটে; কারণ আমি এরকম, এইরকম......। দেখেন! আপনি এখানে তেমন কিছুই বললেন না এবং আপনি এও জানতেন না যে বাস্তবিকই সে পরিশ্রান্ত কি না। কিন্তু আপনার উক্ত মন্তব্যে আপনার গুরুত্ব সে ঠিকই উপলব্ধি করে নিয়েছে। আবার কখনো বা সে পূর্ব থেকে ক্লান্ত নাও থাকতে পারে; কিন্তু আপনার এই উক্তি যেন তাকে বিষণ্ণ ও পরিশ্রান্ত-ক্লান্ত করে ফেলেছে। তখন এর উত্তরে সে আরো সংযোজন করে বলবে- আমাকে পরিশ্রান্ত করে দিয়েছে এটা এটা...। মনে হচ্ছে আপনি যেন তার অনুভূতির উপর আঘাত করেছেন। সে এখন বেশ কথা বলতে থাকবে।
ইসলামের দাওয়াতের কাজে নিয়োজিত প্রত্যেকটি ব্যক্তির এটা শিখে নেয়া একান্ত কর্তব্য, যাতে তার সম্মুখস্থ ব্যক্তি তার সমস্যা ও বিষয়াবলী সম্পর্কে যে কথা বলছে- তার সঠিক সমাধান দিতে পারে।
উদাহরণ: তার অনুভূতির উপর মন্তব্য করতে গিয়ে এভাবে বলতে পারেন- আজ তোমাকে খুব ফুরফুরে মেজাজে ও প্রফুল্ল লাগছে। উত্তরে সে বলবে- আল্লাহর কসম, আমি এরকম..., আমি সেরকম... সফলতা অর্জন করেছি। অতঃপর সে বলবে আপনি তো খুব তাড়াতাড়ি সংবাদটা জেনে ফেললেন। এরপর তার সূত্রধরে (উদাহরণ স্বরূপ) বলবে; আজ আমার একটি নবজাতক জন্ম গ্রহণ করেছে। অতঃপর আপনি তাকে বলতে পারেন, 'এইমাত্র আমি তোমার আনন্দের মূল কারণটা জানতে পারলাম।' ইতিমধ্যে আপনাদের পরস্পরের মধ্যে আলোচনা, ভালবাসা ও শুভেচ্ছা বিনিময় আরম্ভ হয়ে যাবে। ইসলামের দাওয়াত প্রেক্ষিতে এর ব্যাপক ভূমিকা অনস্বীকার্য।
কিছু অর্থহীন শব্দ ও মুখের প্রকাশভঙ্গী রয়েছে। যেমন কেহ কথা বলতে থাকলে আপনি তাকে লক্ষ করে বলবেন; (আহ), (উহ্), এই প্রকাশ ভঙ্গির মাধ্যমে আপনি বক্তাকে মনে মনে বলছেন 'আপনি একজন ভাল শ্রোতা।' (জি) (হ্যাঁ) এর দ্বারা আপনার উদ্দেশ্য হবে- আলোচনা চালিয়ে যান, আমি আপনার সঙ্গে আছি, আপনার কথা শুনছি। আর একটি উদাহরণ হতে পারে দুরালাপনীতে কথোপকথন: যখন বক্তা কথা বলতে আরম্ভ করবে, বিবরণ দেবে ও এক কথার মধ্যে অন্য কথা টেনে আনবে; এ অবস্থায়ও আপনি কোন মন্তব্য ছাড়া একেবারে চুপ করে থাকবেন। তখন যদি সে আপনাকে জিজ্ঞাসা করে বসে, 'আপনি কি আমার কথা শুনছেন?' উত্তরে আপনি বলবেন, 'হ্যাঁ, আমি তোমার কথা শুনছি', এবং তার আলোচনার শেষ বাক্যটা পুনরাবৃত্তি করে দেবেন। ফলে সে আপনার নাম লিপিবদ্ধ করে নেবে এবং আপনাকে অনেক নম্বর দেবে। তখন আপনি বলবেন, 'হ্যাঁ, এই বক্তব্যটা গতরাতে রেডিওতেও প্রচারিত হয়েছে।' মানুষের বেশি কথা আদায় করার ক্ষেত্রে এই অর্থহীন শব্দগুলোরও বিরাট প্রভাব রয়েছে। কারণ মানুষ সাধারণত এই অর্থহীন বাক্য ও কথা থেকে সুনির্দিষ্ট প্রকাশভঙ্গি ব্যক্ত করে থাকে।
মানুষ আপনার কাছে সমস্যা নিয়ে আসে সমাধানের জন্য। কখনো এই সমস্যাগুলো ছোট হয়, আবার কখনো হয় বড়। তা যাই হোক, তার প্রতি অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে এবং যেটার সমাধান করতে পারছেন না তার জন্য একটা অঙ্গীকার করবেন। এ ক্ষেত্রে আপনার কর্তব্য হচ্ছে- স্পষ্টভাবে বলে দেয়া। 'আমি এ সমস্যার সমাধানে আপনার সাহায্যের জন্য আমার সাধ্যমত সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবো।' কারণ আপনি যদি সময় বেঁধে দেন, অথবা এই সমস্যাটি সমাধানের জন্য কোন প্রতিশ্রুতি দেন -অথচ এ দু'এর কোনটিই পূর্ণ করার সামর্থ্য আপনার নেই- তখন আপনি অসুবিধায় পড়ে যাবেন এবং লোকটির আস্থা হারাবেন, যা আপনি প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে তার সঙ্গে বেঁধে রেখেছিলেন। তখন আপনার সম্পর্কে সে বলবে, 'ভদ্রলোক ওয়াদা করে তা রাখে না।' এ সবকিছুর পরও আপনি যদি তাকে আশ্বস্ত করতে পারেন যে, নিশ্চয়ই আপনি আপনার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাবেন এবং যদি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেন তাহলে তো খুবই ভাল কথা। সে তার কাঙ্ক্ষিত বস্তু পেয়ে গেলে সে মনে করবে নিশ্চয়ই আপনি তার সঙ্গ দিচ্ছেন, তাকে সাহায্য সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। তবে মনে রাখতে হবে সে যতক্ষণ আপনার শরণাপন্ন থাকবে- আপনি কখনোই কোন সমস্যার মধ্যে তাকে একা ফেলে যেতে পারবেন না।
আপনার জেনে রাখা দরকার যে, মানুষ তাদের অসুবিধা ও সমস্যাবলীর কথা বলতে সদা উদ্গ্রীব থাকে। সর্বদা তাদের এমন একজন লোকের প্রয়োজন যিনি তাদের কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনবেন, তাদের সঙ্গে নম্র আচরণ করবেন এবং তাদের সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন। শুধুমাত্র এই ভূমিকা বা তাগাদাটাই আপনাকে তাদের মূল্যায়ন ও আস্থার পাত্র বানাতে সক্ষম। এমনকি যদি আপনার এই ভূমিকা ও তাগাদা শুধুমাত্র মৌখিকই হোক না কেন। শুধু গুরুত্ব দিয়ে তার অবস্থাটা জিজ্ঞাসা করা আপনাকে তার আস্থা ও বিশ্বাসের পাত্রে পরিণত করতে পারে, যদি আপনি তার কোন ইতিবাচক সহযোগিতা করতে নাও পারেন। অতএব প্রমাণিত হল- একটি মিষ্টি কথা মানুষের হৃদয়কে খুব গভীরভাবে আকর্ষণ করে।
মানুষ যা শুনে তা দ্বারা প্রভাবিত হয় : আমি এখন তার একটি উদাহরণ দেবো: আমি যখন সর্বপ্রথম ব্রিটেন গিয়ে মসজিদের নিকটে বসবাস করার জন্য একটি বাসা খোঁজ করছিলাম, এ উদ্দেশ্যে একটি মসজিদের নিকট গেলাম এবং ভাড়া নিয়ে বসবাস করা যাবে এমন একটি বাসা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তখন ঐ মসজিদে অবস্থিত এক ভদ্রলোক আমাকে সালাম দিল এবং আমার হাতে একটি ঠিকানা দিয়ে বলল; এই ঠিকানায় একটি ইসলামী কনফারেন্স আছে। আমি বললাম- আরে ভাই! আমি ভাড়া নেয়ার জন্য একটি বাসা খুঁজছি। অথচ আপনি আমাকে বলছেন- ঐখানে একটি ইসলামী কনফারেন্স আছে। আমি আরো বললাম, 'আমি ঠিকানাটা নেবো।' অতঃপর সে বলল, আমি এ এলাকার বাসিন্দা নই, তাই এ ব্যাপারে আপনাকে সাহায্য করতে পারছি না।' হয়ত সে এই এলাকার কিছুই চেনে না। অথবা সে প্রশ্নটাই বুঝতে পারেনি কিংবা সে এর প্রতি কোন গুরুত্ব দেয়নি। তবে আমাকে কনফারেন্সের তথ্য দেয়ার জন্য আমার প্রশ্নটাকেই সুবর্ণ সুযোগ মনে করেছে এবং তা কাজে লাগিয়েছে।
মানুষের অভাব ও প্রয়োজনের মূল্যায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। উপরোন্তু ক্ষেত্রবিশেষে তা দাওয়াত ও উপদেশের চেয়েও বেশি গুরুত্বের দাবীদার। কারণ এই পাঠের জন্য দাওয়াত মানুষের কল্যাণ ও সৌভাগ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত। মানুষের সৌভাগ্য অর্জিত হয় তার প্রয়োজনে সাড়া দেয়া ও কল্যাণের পূর্ণতাপ্রাপ্তি থেকে। আপনি যখন তার স্বার্থ পূরণ করে দেবেন, তাহলে সে আপনার যে কোন ডাকে সাড়া দিতে প্রস্তুত থাকবে। কারণ আপনি তার আগ্রহ সৃষ্টি করেছেন অথবা তাকে এমন সেবা প্রদান করেছেন যা তার নেহায়েত প্রয়োজন ছিল। আর সে কারণেই আপনি তার শ্রদ্ধা ও আস্থার পাত্র হয়ে গেলেন।
কেউ বা কখনো আবার নিজের সম্পর্কে আলোচনা জুড়ে দেয় এবং দীর্ঘায়িত করে ফেলে। সে যদি বুঝতে পারে যে, আপনি কথার সমর্থন করছেন না, তাহলে কথা বন্ধ করে দেবে। তবে হ্যাঁ, যদি অনুভব করে আপনি তাকে সমর্থন বা তার কথা সত্যায়ন করছেন তাহলে নিশ্চয়ই সে আপনার প্রতি আস্থাশীল হবে ও আপনার সঙ্গে অনেক কথা বলবে। আপনি তার কথাগুলো এভাবে সমর্থন করতে পারেন: তার সমস্যার অনুরূপ ঘটনা আপনার অথবা আপনার সঙ্গীদের বেলায় ঘটে গেল।
কখনো আবার আপনি মানুষের সঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে তাদেরকে বলবেন- আমার নিকট একজন ভদ্রলোক এসে আমাকে এই, এই... সম্পর্কে বিবরণ দিল। কার্যত ঘটেছেও তাই। কখনো আবার সেই ভদ্রলোক ঐ তথ্যাবলীর সঙ্গে অপরকে সম্পৃক্ত করতে চায় না। আপনি ব্যতীত অন্য কারো কাছ থেকে ঘটনার বিবরণ- আপনার সঙ্গে যেভাবে আলোচনা করেছে হুবহু ঐ শব্দেই শুনে তাহলে সে হতচকিত হয়ে যাবে। এই শব্দগুলোও তার অনুভূতিতে আঘাত করতে পারে অথবা সেটা তার একান্ত ব্যক্তিগত গোপন বিষয়ও হতে পারে; অথবা কোন পদস্খলন যা তার থেকে সংঘটিত হয়ে গেছে। অতএব আপনার সঙ্গে যে কথা বলেছে তার গোপনীয়তা রক্ষার নিশ্চয়তা আপনাকেই দিতে হবে। এমনিভাবে আপনি সকল কথা জানতে পারবেন, তার সমস্যা ও বিষণ্ণতার অনেক কথা শুনতে পারবেন।
ব্যক্তিগত সাক্ষাতের সময় আপনার সম্মুখস্থ লোকটির কোন সেবা করার চেষ্টা করা আপনার নৈতিক দায়িত্ব- যে সেবাটা সে পেতে চায়। এবং আপনিও তার সেবা করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন- এ ভাব দেখিয়ে আপনি তাকে সম্ভাব্য সহযোগিতা করবেন। তবে যদি আপনি তার সহযোগিতা করতে না পারেন, তাহলে কমপক্ষে যে সহযোগিতা করতে পারবে এমন একজন লোকের সন্ধান দিন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণীর অনুসরণ করে অপরের সেবায় তৎপর থাকা আপনার কর্তব্য।
أن أسعى بحاجة أخي خير من أن اعتكف شهرا. ( رواه الطبراني في معجمه الكبير وخرجه الألباني في السلسلة الصحيحة)
"আমার ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণে প্রচেষ্টা চালানো আমার নিকট একমাস ই'তিকাফ করার চেয়েও উত্তম।"
অপরের সেবার প্রয়াস দাওয়াতী কাজে বিরাট ভূমিকা রাখে। কারণ আপনি এর মাধ্যমে তাদের হৃদয়কে প্রভাবিত ও তাদের ভালোবাসা কুড়াতে পারবেন। সে কারণে তা একমাস ই'তিকাফ করার চেয়েও উত্তম বলা হয়েছে। কারণ যে ব্যক্তি মানুষকে নিঃস্বার্থ সেবা দিয়ে যায়, সে-ই তাদের ভালোবাসা পায় ও আস্থা অর্জন করতে পারে। অতএব মানুষের আস্থা ও শ্রদ্ধা অর্জনের পর সে যদি মানুষের কাছে কিছু চায়, তা যাই হোকনা কেন; তাদের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তার আবেদন প্রত্যাখ্যান করা যুক্তিসঙ্গত নয়।
📄 মানুষের মধ্যে আপনি কিভাবে প্রভাব বিস্তার করবেন?
প্রভাব বিস্তারের মূল প্রধান ও প্রথম স্তর হচ্ছে আস্থা অর্জন। আর তা অর্জিত হবে কতিপয় সেবা প্রধানের মাধ্যমে যা ইতিপূর্ব উল্লেখ করেছি। আস্থা অর্জন মানুষের মধ্যে ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের জন্ম দেয়। অতএব যে আপনাকে ভালোবাসবে সে অবশ্যই আপনার আনুগত্য করবে। কারণ প্রভাব বিস্তারে ভালোবাসা অত্যন্ত শক্তিশালী, সক্রিয় ও কার্যকর মাধ্যম। যেমন একটি প্রসিদ্ধ কথা আছে :
إن المحب لمن يحب مطيع 'অবশ্যই প্রেমিক তার প্রেমাস্পদের আনুগত্য করে।'
এখানে অন্ধ আনুগত্য কখনোই আমাদের কাম্য নয়। যে আনুগত্য অন্ধ ভালোবাসা থেকে সৃষ্টি হয় তা কোন দোষ-ত্রুটি দেখে না। কারণ যে অন্ধের মত আনুগত্য করে সে আমাদের উদ্দেশ্য নয়। তবে আমরা এমন যুবসমাজ এবং ব্যক্তিদের চাই, যারা ব্যক্তিত্বের স্বাধীনতা, মুক্তচিন্তা, পরিচ্ছন্ন মতামতের স্বাধীনতা ও সত্যের ব্যাপারে সাহসিকতার পরিচয়ে অনন্য। অপরের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় যে গুণটি তা হচ্ছে উত্তম আদর্শ। শুধু কথা ও উপদেশ দ্বারা মানুষ প্রভাবিত হয় না। শুধুমাত্র কথামালা ও উপদেশ কি করতে পারবে? যখন মানুষ এমন কোন আদর্শ দাওয়াত-কর্মী পাবে না যে উক্ত উপদেশ প্রথমে নিজের উপর প্রয়োগ করতে ও নিজ জীবনে বাস্তবায়নে যত্নবান হবে। যখন সে নিজেই তার কাজকর্ম ও আচার-ব্যবহারে অপরের জন্য আদর্শ নয়; তখন মানুষ তা দেখে কি তার পদাঙ্ক অনুসরণ করবে?
আপনি যখন ভুল-ত্রুটি অথবা উপদেশ সংক্রান্ত আলোচনা করার সংকল্প করবেন, তখন আলোচনায় অন্য লোকদের প্রতি 'ইঙ্গিত পদ্ধতি' ব্যবহার করা কর্তব্য। যেমন আপনি বলতে পারেন- আল্লাহ তা'আলা চেয়েছেন অমুক ব্যক্তি এটা...করুক। আপনি যদি তার মেজাজ বোঝেন এবং জানতে পারেন যে, সামান্য একটু প্রশংসা পেলে সে অধিক নেক কাজ করতে বেশ উৎসাহিত হবে। তখন আপনি কেন তার প্রশংসা করবে না? আর মানুষের স্বভাব সর্বদা এরকমই হয়ে থাকে যে, সে নিজের প্রশংসা পেতে ভালবাসে। আপনি দেখতে পাবেন লোকজন তারই প্রশংসা করছে যে, সে এ..টা করেছে, সে সে. টা. করেছে তখন তা তার কাছে খুব ভালো লাগবে। কেউ কেউ মনে করেন এটা একটা ভালো উদ্যোগ।
আবার কখনোবা কেউ বলেও ফেলতে পারেন 'আমি কি শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করছি না মানুষের জন্য কাজটি করছি?' কিন্তু মানবস্বভাব অপর মানুষের মন্তব্য শোনার জন্য সর্বদা উৎকর্ণ থাকে। সুতরাং সে নিজের দিকে মানুষের দৃষ্টি আকৃষ্ট করার জন্য দৃঢ়ভাবে সংকল্পবদ্ধ হয়ে কষ্ট স্বীকার করবে। কারণ, তার একটাই উদ্দেশ্য মানুষ যেন তার দিকে সুন্দর ও ভালো দৃষ্টিতে তাকায়। এর সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে- সালেম বিন আব্দুল্লাহ বিন ওমর বিন খাত্তাব কর্তৃক তার পিতা হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণী। তিনি এরশাদ করেন:
نعم الرجل عبد الله لو كان يصلى الليل، قال سالم : فكان عبد الله آنذاক لا ينام الليل إلا قليلا. (متفق عليه)
'যদি রাতে নামাজ আদায় করত আব্দুল্লাহ রা. তাহলে সে কত ভালো মানুষ হতে পারতো।' সালেম বলেন, 'তখন থেকে আব্দুল্লাহ রা. রাতে খুব সামান্যই ঘুমাতেন।' তিনি এ কথাটা আব্দুল্লাহ কে এভাবে বললেন না, 'তুমি রাতে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করো না' অথবা 'তুমি কেন তাহাজ্জুদ আদায় করছো না?' তিনি বলেছেন, 'আব্দুল্লাহ রা. কত ভালো লোক হতো যদি সে রাতে নামাজ আদায় করতো!' তাঁর উদ্দেশ্য ছিল আব্দুল্লাহর রা. সকল গুণই উত্তম হয়ে যেত যদি এই আমলটিও সে করতে পারতো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানে শুধুমাত্র এই একটি আমলকেই চিহ্নিত করেছেন যা তিনি আব্দুল্লাহ রা. থেকে প্রত্যাশা করতেন। তিনি মানুষের প্রশংসা অনুসন্ধান করেননি। কিন্তু যখনই কোন দোষ-ত্রুটি দেখেছেন অমনি তা ইঙ্গিত পদ্ধতি প্রয়োগে শোধরাতে চেষ্টা করেছেন। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সরাসরি তিরস্কার কিংবা শাস্তি প্রদানের পথ অবলম্বন করেননি; ইশারা-ইঙ্গিতের মাধ্যমে তাঁর ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন।
📄 মানুষকে তার বুদ্ধি অনুযায়ী সম্বোধন করা
দাওয়াতের ক্ষেত্রে মানুষকে তার বুদ্ধি অনুযায়ী সম্বোধন করা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ আমরা বিশ্বাস করি বুদ্ধির বিচিত্রতা ও বুঝের মধ্যেও তারতম্য রয়েছে। সুতরাং সকল মানুষ একই পরিমাণ মেধা ও ধীশক্তির অধিকারী নয়। অতএব সকল মানুষের সঙ্গে একই মানের আলোচনা করলে সেটা আপনার ভুল হবে। তাহলে প্রথমেই আপনাকে মানুষের শ্রেণি ও তাদের বুদ্ধির পরিধি জেনে নিতে হবে। আপনার নিকট প্রশ্নকারী লোকটির প্রশ্নের ধরন- গঠন, তার শিক্ষা ও জ্ঞানের পরিধি অথবা চাকুরীর মান দেখে খুব সহজেই আপনি তার শ্রেণিবিন্যাস করে নিতে পারবেন। আলী বিন আবু তালেব রা. বর্ণিত তিনি বলেন, 'মানুষের সঙ্গে তাদের পরিচিত বিষয় নিয়ে আলোচনা কর। তোমরা কি এটা পছন্দ করবে যে, আল্লাহ তাআলা ও তদীয় রাসুলকে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হবে?' তাঁর এ কথার উদ্দেশ্য হচ্ছে, মানুষের সঙ্গে আপনি এমন বিষয় নিয়ে কথা বলবেন, যেটা তারা বুঝতে পারে। কারণ আপনি যদি এমন বিষয় নিয়ে কথা বলেন যা তার বুদ্ধির পরিধির বাহিরে, তখন সে নিশ্চয়ই এ কথা বলে ফেলবে, 'এটা আমার বোধগম্য নয়, এ কথা আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেননি।' আলী রা. এর এ বাণী ইমাম বুখারী র. তার কিতাবে বর্ণনা করেছেন। ইবনে মাসউদ রা. এর বাণী হতে ইমাম মুসলিম র. এর বর্ণনা এ রকম, 'আপনি যদি কোন সম্প্রদায়কে এমন একটি কথা বলেন, যা তাদের বোধগম্য নয়, তাহলে এটা তো তাদের মধ্য হতে অনেককেই বিভ্রান্তিতে ফেলে দেবে।' অর্থ্যাৎ আপনি যদি মানুষের সঙ্গে এমন কথা বলেন, যা তাদের বোধ ও বুঝের স্তরভুক্ত নয়, তখন অনেকের জন্য এই কথাটা তার দীনের ব্যপারে বিভ্রান্তির কারণ হবে। কারণ এই বিষয়টা তারা আয়ত্ত করতে পারেনি।