📘 ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব 📄 পেশার অহংকার

📄 পেশার অহংকার


পেশার কারণে একে অপরকে ঘৃণা ও গর্ববোধ করা জাহেলী যুগের অন্যতম রীতি ছিল। যেমন- কুরাইশ বংশের লোকেরা ব্যবসায়ী ছিল। তারা শীত মওসুমে (অপেক্ষাকৃত উষ্ণ এলাকায়) ইয়ামনে এবং গ্রীষ্ম মওসূমে (তুলনামূলক ঠান্ডা এলাকা) সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের দিকে ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা করতো। যে কথা সূরা কুরাইশের মধ্যে বিধৃত হয়েছে। (ব্যবসায়ী হওয়ার কারণে তারা স্বাস্থ্য ও সম্পদশালী) সে কারণে- কৃষিকর্মে নিয়োজিত চাষীদের উপরে অহংকার প্রদর্শন করতো (যেমন আমাদের দেশে শেখ, সৈয়দ, খান ও চৌধুরী সাহেবরা চাষী ও কারিগর সম্প্রদায়ের ভাইদেরকে 'চাষা' ও 'জোলা' বলে টিটকারী করে থাকে)। অথচ এ বিষয়ে আল্লাহ পরিষ্কার নিষেধাজ্ঞা উচ্চারণ করে বলেন-
'হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য সম্প্রদায়ের লোককে ঠাট্টা-বিদ্রুপ না করে। কোনো মহিলাও যেন কোনো মহিলাকে বিদ্রুপ না করে'। (সূরা আল-হুজরাত, ৪৯: আয়াত ১১)

মোটকথা, কোনো পেশাদার ব্যক্তি যেমন অন্য কোনো পেশার ব্যক্তিকে শুধু পেশাগত কারণে টিটকারী না করে। কেননা দুনিয়াবী যে কোনো হালাল পেশার উদ্দেশ্য হলো তদ্বারা আল্লাহর আদেশ নিষেধের আনুগত্য করা এবং পরিশেষে জান্নাতের চিরস্থায়ী মুক্তি ও শান্তি অর্জন করা। আর যাবতীয় পর্বের মূল হলো সেখানে। তা ব্যতীত বাদবাকী সবকিছু অপসৃয়মান ছায়ার ন্যায়। অতএব কোনো প্রকৃত জ্ঞানী ব্যক্তির জন্য পার্থিব জীবনের চাকচিক্য নিয়ে গর্ব করা উচিত নয়। যে কোনো মুহুর্তে এসব ছেড়ে চলে যেতে হবে। (আসুন) আল্লাহর নিকটে আমরা সেইসব সৎকর্ম সম্পাদনের শক্তি কামনা করি, যা করলে তিনি সন্তুষ্ট হন। (আমিন)

📘 ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব 📄 ধন সম্পদের অহংকার

📄 ধন সম্পদের অহংকার


এটাও জাহেলী যুগের একটা রীতি। শেষ নবীর বিরুদ্ধে আরবদের এক যুক্তি ছিল যে-
'এই কুরআন কেন (মক্কা ও তায়েফের) দুই প্রধান জনপদের কোনো ব্যক্তির উপর নাযিল হলো না? তারা কি আপনার প্রভুর রহমত (অর্থাৎ পবিত্র কুরআন) (নিজেদের ইচ্ছামত) বন্টন করে নিতে চায়? আমরাই তাদের জীবন-জিন্দেগীতে তাদের মধ্যে জীবিকা বন্টন করে থাকি এবং একজনকে অপর জনের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে থাকি, যাতে তারা একে অপর থেকে কাজ নিতে পারে। তারা যেসব ধন-সম্পদ জমা করেছে, তার চাইতে আপনার প্রভুর দেওয়া রহমত (নবুওত ও অন্যান্য যে সব বস্তু ইহকাল ও পরকালের সৌভাগ্য আনয়ন করে) অনেক উত্তম'। (সূরা আয-যুখরুফ, ৪৩: আয়াত ৩১-৩২)

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, যে দুই প্রধান জনপদের মধ্যে মক্কার ছিলেন ওলিদ ইবন মুগীরা আল মাখযুমী এবং তায়েফে ছিলেন হাবীব ইবন উমর ইবন উমায়ের আছ-ছাক্কাফী। দু'জনেই ছিলেন প্রভুত মান-সম্মান ও ধন সম্পদের অধিকারী। অলীদ ইবন মুগীরা- যাকে কুরাইশের “থোকা ফুল বা রায়হানাতু কুরাইশ” বলা হতো- তিনি বলতেন, যদি মুহাম্মাদের কথাই সব সত্যি হতো, তাহলে তা (অর্থাৎ কুরআন) আমার উপর নাযিল হতো অথবা আবু মাসউদের উপর।

মোটকথা, ধন-সম্পদ সঞ্চয় কোনো প্রকৃত সঞ্চয় নয়, বরং নশ্বর দুনিয়ার সঞ্চয়ের চেয়ে আখিরাতের সঞ্চয়ই বড় সঞ্চয়। অথচ প্রিয় পাঠক! তুমি দেখতে পাবে আমাদের সমাজে বহু লোকের মধ্যে ব্যাপকহারে ঢুকে পড়েছে। তুমি দেখতে পাবে যে, একজন তিনি যত বড় বিদ্বান হোন না কেন, যদি তিনি দরিদ্র হন, তাহলে লোকেরা তাকে কোনই মূল্য দিবে না। বরং তার ধনী লোকের দিকে তাকিয়ে থাকবে ও তাদের কথার মূল্য দিবে। এ জন্যেই তো রাসূলুল্লাহ এর কবি হাসসান ইবন ছাবিত রা. কবিতা রচনা করেন- যার অর্থ নিম্নরূপ: 'দরিদ্রতা বহু জ্ঞানী-ধৈর্য্যশীলকে ধ্বংস করেছে। পক্ষান্তরে বহু মূর্খ লোক স্বচ্ছলতার মধ্যে ডুবে আছে।'

📘 ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব 📄 দরিদ্রদের ঘৃণা করা

📄 দরিদ্রদের ঘৃণা করা


ইমাম আহমদ ও তাবরানী প্রমুখ আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণনা করেন যে, একদল কুরাইশ রাসূলে করীমের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তার নিকটে সুহাইব, আম্মার, খাববাব ও অনুরূপ দুর্বল মুসলিমরা বসেছিলেন। কুরাইশগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উদ্দেশ্য করে বলল, হে মুহাম্মদ, তুমি এইসব লোক নিয়ে সন্তুষ্ট? আল্লাহ কি আমাদের মধ্যে কেবল এই লোকগুলির উপরে মেহেরবাণী করলেন? আমরা কিভাবে এদেরই নীচে থাকবো? ওদেরকে তোমার ওখান থেকে বের করে দাও। তাহলে হয়তবা আমরা তোমার অনুসরণ করতে পারি।

ইবনে জারীর আবু শায়খ, বায়হাকী, দালায়েল প্রভৃতি গ্রন্থের মধ্যে খাব্বাব রা. হতে বর্ণনা করেন যে, আকরা' ইবন হাবিস তামীমী, 'উয়াইনা ইবন হিসন ফাযারী আল্লাহর নবীর দরবারে বলেন, আমরা চাই, হে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তুমি আমাদের সংগে পৃথক মজলিসে বসো। বিভিন্ন আরব প্রতিনিধি দলের সম্মুখে আমরা আমাদের ঐসব কৃতদাসদের সংগে একত্রে বসতে লজ্জাবোধ করি। এসো, আমরা এই মর্মে একটা লিখিত চুক্তি করি যে, যখন আমরা আসবো, তখন তুমি ওদেরকে উঠিয়ে দেবে। তারপর যখন আমরা চলে যাবো, তখন তুমি চাইলে ওদেরকে নিয়ে বসতে পারো।

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতে সম্মত হলেন এবং আলীকে চুক্তিনামা লিপিবদ্ধ করার জন্য কাগজ কলম নিয়ে আসতে বলেন। এমতাবস্থায় আমরা সবাই এই কোণে উপবিষ্ট ছিলাম। হঠাৎ নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল হলো-
'যারা সকাল-সন্ধ্যায় তাদের প্রতিপালককে তাঁর সন্তুষ্টি লাভের জন্য ডাকে, তাদেরকে তুমি বিতাড়িত করবে না। তাদের কর্মের জওয়াবদিহির দায়িত্ব তোমার নয়, বা তোমার কর্মের জওয়াবদিহিতার দায়িত্বও তাদের নয় যে, তুমি তাদেরকে বিতাড়িত করবে। যদি তা করো, তুমি সীমালঙ্ঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।’ (সূরা আল-আন'আম, ৬: আয়াত ৫২)

অতঃপর তিনি আমাদের কাছে ডাকলেন এবং পরবর্তী আয়াতটিও শুনিয়ে দিলেন-
'যারা আমার নিদর্শনসমূহে বিশ্বাস স্থাপন করে, তারা তোমার নিকট এলে তাদেরকে বল, তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হউক- তোমাদের প্রতিপালক দয়া করাকে নিজের উপর অবশ্যকরণীয় নির্ধারণ করে নিয়েছেন। তোমদের মধ্যে অজ্ঞতাবশতঃ কেউ কোনো মন্দকার্য করার পর যদি তাওবা ও সংশোধনে ব্রতী হয়, তবে আল্লাহতো মহা ক্ষমাশীল ও পরম কৃপানিধান।' (সূরা আল-আনআম, ৬: আয়াত ৫৪)।

এরপর থেকে আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংগে নিয়মিত বসতাম এবং তিনি যখন চাইতেন আমাদেরকে ছেড়ে যেতেন। ফলে নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল হলো-
'তুমি নিজেকে ঐসব লোকদের সংগে ধরে রাখ, যারা তাদের প্রতিপালকে সন্তুষ্ট করার জন্য সকাল-সন্ধ্যায় ডাকে। তুমি পার্থিব সৌন্দর্য্য উপভোগের জন্য তাদের থেকে নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে নিবে না এবং যার অন্তঃকরণকে আমি আমার স্মরণ থেকে গাফেল করে দিয়েছি, যে ব্যক্তি নিজের খেয়াল খুশীমত কাজ করে ও যার কার্যকলাপ সীমা অতিক্রম করে- তুমি তার আনুগত্য করবে না। তুমি বলে দাও যে, সত্য তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে প্রেরিত। যে চায় তা বিশ্বাস করুক, যে চায় তা প্রত্যাখ্যান করুক। তবে আমরা সীমা লংঘনকারীদের জন্য প্রস্তুত রেখেছি জাহান্নাম'। (সূরা আল- কাহাফ, ১৮: আয়াত ২৯-৩০)

এই আয়াত নাযিল হওয়ার পর আমরা মজলিস থেকে উঠে গেলে সবশেষে আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উঠে দঁড়াতেন।

টিকাঃ
৩৩. মাননীয় গ্রন্থকার একই মর্মে ইবনুল মুনযির হতে আরেকটি দীর্ঘ বর্ণনার অবতারণা করেছেন। যা বাদ দেওয়া হলো। (অনুবাদক)

📘 ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব 📄 ফেরেশতা অহী, রেসালাত ও কেয়ামতকে অস্বীকার করা

📄 ফেরেশতা অহী, রেসালাত ও কেয়ামতকে অস্বীকার করা


তাফসীর, হাদীছ ও আক্বায়েদের কিতাবসমূহে জাহেলী আরবদের উপরোক্ত অস্বীকৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। এখানে এর পক্ষে পবিত্র কুরআনের কয়েকটি আয়াত পেশ করা হলো। যেমন আল্লাহ বলেন-
'অবিশ্বাসীরা ধারণা করছে যে, তাদেরকে পুনরুত্থিত হতে হবে না। তুমি বলে দাও যে, হ্যাঁ (আমার প্রতিপালকের শপথ) তোমাদেরকে সকলকে অবশ্য অবশ্যই উঠানো হবে। অতঃপর অবশ্যই তোমাদেরকে তোমাদের (সারা জীবনের) কাজকর্ম সম্পর্কে খবর দেওয়া হবে। আর এ বিষয়টি আল্লাহর জন্য অতীব সহজ।’ (সূরা আত-তাগাবুন ৬৪: আয়াত ৭)

জাহেলী আরবদের রচিত বহু কবিতায় তাদের এই অস্বীকৃতির প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন-জনৈক কবি বলেছেন-
'এই রাসূল আমাদেরকে বলেন যে, আমরা পুনরায় জীবিত হবো। কিন্তু কেমন করে জং ও মাথার মরা খুপরীর মধ্যে জীবন আসতে পারে?'

আর এক কবি বলেন-
'জীবন, ফের মরণ, আবার পূনরুত্থান। হে আমরের মা, এসবই বাজে কথা।'

অন্যত্র আল্লাহ অবিশ্বাসীদের বক্তব্য তুলে ধরে বলেন যে, তারা বলত-
'আমরা মরে গিয়ে হাড্ডি-মাটি সার হবো। তারপরও আমাদের বাপ-দাদা পূর্ব পুরুষ সবাই পূনরায় জীবন্ত উঠবো।’ (সূরা আছ-ছাফফাত, ৩৭: আয়াত ১৬-১৭)

বিষয়টির উপরে আমরা অত্র গ্রন্থের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্নভাবে আলোচনা করেছি।

ফন্ট সাইজ
15px
17px