📄 কোনো বিশেষ ঘরের তত্ত্বাবধায়ক হওয়ার গর্ব করা
জাহেলী যুগের আরবরা কাবাগরের মুতাওয়াল্লী হওয়ার কারণে অহংকার করতো। আল্লাহ তাদের এই বদ স্বভাবের নিন্দা করে নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করেন- 'আমি যখন তাদের নেতাদের গ্রেফতার করবো, তখন তারা আর্তনাদ করে উঠবে। তাদেরকে বলা হবে আজ আর্তনাদ করো না, তোমাদের কোনরূপ সাহায্য করা হবে না। আমার আয়াতগুলো তোমাদের নিকট যখন তিলাওয়াত করা হতো, তখন তোমরা (কাবা ঘরের তত্ত্বাবধায়ক হওয়ার গর্বে) দম্ভ ভরে এ বিষয়ে আজে বাজে কথা বলতে বলতে পিছনে ফিরে চলে যেতে।' (সূরা আল-মুমিনুন, ২৩: আয়াত ৬৪-৬৭)
মোটকথা, জাহেলী যুগের অন্যতম স্বভাব ছিল কোনো পবিত্র স্থানের উপর দায়িত্বশীল হওয়ার কারণে অহংকার করা। আজকের যুগে যেমন অনেকেই এসব কারণে মর্যাদার দাবী করে থাকে। মক্কা- মদীনার উপরে নেতৃত্ব থাকার কারণে কেউ নিজেদেরকে সারা মুসলিম বিশ্বের উপরে মর্যাদা দাবী করে। কেউবা কোনো পূন্যস্থান বা নেককার লোকদের বাসস্থানের তত্ত্বাবধায়ক হওয়ার কারণে সম্মানের দাবী করে। যারা শায়খ আবদুল কাদের জিলানীর রহ. দিকে নিজেদেরকে সম্পর্কিত করেন, তারা তার কবরে তত্ত্বাবধানের গৌরবে নিজেদের জন্য কিছু মর্যাদা কামনা করেন। এর অন্যতম কারণ তারা এ সমস্ত নজর মানত এবং ছদকা কুরবানীসহ বিভিন্ন শিরকী উৎসর্গসমূহের তত্ত্বাবধান করে থাকে। যা হিন্দু, কুর্দী ও অন্যান্য মূর্খ মুসলিমরা সেখানে ভেট হিসাবে নিবেদন করে থাকে। এই সব কবরের তত্ত্বাবধানকারী তথাকথিত খাদেম ও মুতাওয়াল্লীরা আল্লাহর সৃষ্টিকুলের মধ্যে সবচে নিকৃষ্ট, সর্বাপেক্ষা নীচ ও মতবাদের দিক দিয়ে সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট।
টিকাঃ
৩১. যাঁরা আমাদের দেশে আওলাদে রাসূলের নামে কিংবা আবু বকর ছিদ্দিকের বা আলীর বংশধর হওয়ার নামে গর্ববোধ করেন কিংবা ঐ বংশের লোক হওয়ার কারণে তাদের প্রতি অহেতুক শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে থাকেন, তাঁরা একবার আলোচনাটি হৃদয়ঙ্গম করুন। (অনুবাদক)
📄 নবী বংশের লোক হওয়ার গর্ব
ইয়াহূদী ও নাছারাগণ (ইব্রাহীম, ইয়াকুব তথা বনী ইস্রাইলের হাজার হাজার নবীর) বংশধর হওয়ার কারণে আত্মগর্বে গর্বিত ছিল। আল্লাহ রাববুল আলামীন তাদের এই হীন মানসিকতার প্রতিবাদ করে বলেন-
‘(নবীদের) সেই দল চলে গেছেন। তাদের আমল ছিল তাদের। তোমাদের আমল হবে তোমাদের। তোমাদেরকে তাঁদের আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না।’ (সূরা আল-বাক্বারাহ ২: আয়াত ১৩৪)
অর্থাৎ শুধুমাত্র বংশীয় সম্পর্ক কোনো কাজ দেবে না। বরং পূর্ব পুরুষদের মত সৎকর্মশীল ও পূণ্যবান হতে পারলে তবেই কিছু ফায়দা হতে পারে। কেননা তাদের পাপের জন্য তোমাদের জিজ্ঞেস করা হবে না, কিংবা তাদের পূন্যের ছওয়াবও তোমরা পাবে না।
একবার রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ বংশের লোকদের ডেকে বলেন- 'হে কুরাইশগণ। নবীদের নিকট সমস্ত লোকদের মধ্যে আপন তারাই যারা মুত্তাকী। তোমরা সেই পথের পথিক হও। দেখো, আমার কাছে কোনো লোক দুনিয়াদারী কাজকর্ম নিয়ে আসে না। অথচ তোমরা কেবল ঐ স্বার্থের কাছে এসে থাকো। ফলে আমি তোমাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিই।
উক্ত আয়াতটি পবিত্র কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতেরই সমর্থক-
'হে মানব জাতি! আমরা তোমাদের নারী ও পুরুষের সমবায়ে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর তোমাদের বিভিন্ন শাখা ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, কেবল তোমাদের (পারস্পরিক সহজ) পরিচিতি লাভের জন্য। নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সম্মানিত সেই ব্যক্তি যিনি সর্বাপেক্ষা বেশী মুত্তাকী বা পরহেজগার। নিশ্চয় আল্লাহ (তোমাদের) সব কিছু জানেন, খবর রাখেন।’ (সূরা আল-হুজরাত, ৪৯: আয়াত ১৩)
ইয়াহুদী-নাছারাদের যে স্বভাবের কথা উপরে বিধৃত হলো, উক্ত জাহেলী স্বভাব আজ বহু মুসলিমদের মধ্যে দৃষ্ট হয়। যাদের একমাত্র পুঁজিই হলো, বাপ দাদার গর্ব। যেমন কেউ কেউ বলে থাকেন আমি আব্দুল কাদের জিলানীর রহ. বংশধর। কেউ বলেন আমি আহমদ রিফাঈর আওলাদ। কেউ বলেন আমি আবু বকরী, কেউ বা ওমরী, কেউবা আলুবী, কেউবা হাসানী, কেউবা হুসাইনী ইত্যাদি। অথচ কেয়ামতের মহাবিচারের দিনে এসব সম্পর্কে কোনো কাজ দিবে না। পরিত্রাণ পাবেন ঐদিন কেবলমাত্র সেই ব্যক্তি যিনি সমর্পিত অন্তঃকরণ নিয়ে আল্লাহর সম্মুখে হাযির হতে পারবেন।
বিস্মিত হতে হয় এসব লোকদের অবস্থা দেখে। যেখানে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ আদরের দুলালী ফাতেমা রা. কে বলছেনঃ 'হে মুহাম্মদের কন্যা ফাতেমা! আল্লাহর দরবারে আমি তোমার কোনই উপকারে আসবো না।' সেখানে এইসব বংশগবী লোকেরা কিভাবে পরিত্রাণ পেতে পারে? অথচ বিভিন্ন অন্যায় কলা কৌশলের মাধ্যমে মানুষের সম্পদ শোষণ করা ব্যতীত এদের অন্য কোনো যোগ্যতা নেই।
কবির বলেনঃ
'নিশ্চয়ই প্রকৃত যুবক সেই যে, বলে যে, আমি বা আমার পরিচয় এই। সে কখনোই সত্যিকারের যুবক নয়, যে বলে আমার পিতা অমুক ছিলেন।'
অন্য এক কবি বলেন-
'আমার কাছে প্রতিদিন সকালে একব্যক্তি এসে বংশের প্রাক্তন লোকদের নিয়ে বড়াই করে। অবশেষে আমি তাকে একদিন বললাম, তুমি যে শুধু বংশের হাড়-গোড় নিয়ে গৌরব করো, অথচ তুমি তা ভাল করেই জানো যে, কুকুরই শুধু হাড়-গোড় নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে'।
টিকাঃ
৩১. যাঁরা আমাদের দেশে আওলাদে রাসূলের নামে কিংবা আবু বকর ছিদ্দিকের বা আলীর বংশধর হওয়ার নামে গর্ববোধ করেন কিংবা ঐ বংশের লোক হওয়ার কারণে তাদের প্রতি অহেতুক শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে থাকেন, তাঁরা একবার আলোচনাটি হৃদয়ঙ্গম করুন। (অনুবাদক)
📄 পেশার অহংকার
পেশার কারণে একে অপরকে ঘৃণা ও গর্ববোধ করা জাহেলী যুগের অন্যতম রীতি ছিল। যেমন- কুরাইশ বংশের লোকেরা ব্যবসায়ী ছিল। তারা শীত মওসুমে (অপেক্ষাকৃত উষ্ণ এলাকায়) ইয়ামনে এবং গ্রীষ্ম মওসূমে (তুলনামূলক ঠান্ডা এলাকা) সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের দিকে ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা করতো। যে কথা সূরা কুরাইশের মধ্যে বিধৃত হয়েছে। (ব্যবসায়ী হওয়ার কারণে তারা স্বাস্থ্য ও সম্পদশালী) সে কারণে- কৃষিকর্মে নিয়োজিত চাষীদের উপরে অহংকার প্রদর্শন করতো (যেমন আমাদের দেশে শেখ, সৈয়দ, খান ও চৌধুরী সাহেবরা চাষী ও কারিগর সম্প্রদায়ের ভাইদেরকে 'চাষা' ও 'জোলা' বলে টিটকারী করে থাকে)। অথচ এ বিষয়ে আল্লাহ পরিষ্কার নিষেধাজ্ঞা উচ্চারণ করে বলেন-
'হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য সম্প্রদায়ের লোককে ঠাট্টা-বিদ্রুপ না করে। কোনো মহিলাও যেন কোনো মহিলাকে বিদ্রুপ না করে'। (সূরা আল-হুজরাত, ৪৯: আয়াত ১১)
মোটকথা, কোনো পেশাদার ব্যক্তি যেমন অন্য কোনো পেশার ব্যক্তিকে শুধু পেশাগত কারণে টিটকারী না করে। কেননা দুনিয়াবী যে কোনো হালাল পেশার উদ্দেশ্য হলো তদ্বারা আল্লাহর আদেশ নিষেধের আনুগত্য করা এবং পরিশেষে জান্নাতের চিরস্থায়ী মুক্তি ও শান্তি অর্জন করা। আর যাবতীয় পর্বের মূল হলো সেখানে। তা ব্যতীত বাদবাকী সবকিছু অপসৃয়মান ছায়ার ন্যায়। অতএব কোনো প্রকৃত জ্ঞানী ব্যক্তির জন্য পার্থিব জীবনের চাকচিক্য নিয়ে গর্ব করা উচিত নয়। যে কোনো মুহুর্তে এসব ছেড়ে চলে যেতে হবে। (আসুন) আল্লাহর নিকটে আমরা সেইসব সৎকর্ম সম্পাদনের শক্তি কামনা করি, যা করলে তিনি সন্তুষ্ট হন। (আমিন)
📄 ধন সম্পদের অহংকার
এটাও জাহেলী যুগের একটা রীতি। শেষ নবীর বিরুদ্ধে আরবদের এক যুক্তি ছিল যে-
'এই কুরআন কেন (মক্কা ও তায়েফের) দুই প্রধান জনপদের কোনো ব্যক্তির উপর নাযিল হলো না? তারা কি আপনার প্রভুর রহমত (অর্থাৎ পবিত্র কুরআন) (নিজেদের ইচ্ছামত) বন্টন করে নিতে চায়? আমরাই তাদের জীবন-জিন্দেগীতে তাদের মধ্যে জীবিকা বন্টন করে থাকি এবং একজনকে অপর জনের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে থাকি, যাতে তারা একে অপর থেকে কাজ নিতে পারে। তারা যেসব ধন-সম্পদ জমা করেছে, তার চাইতে আপনার প্রভুর দেওয়া রহমত (নবুওত ও অন্যান্য যে সব বস্তু ইহকাল ও পরকালের সৌভাগ্য আনয়ন করে) অনেক উত্তম'। (সূরা আয-যুখরুফ, ৪৩: আয়াত ৩১-৩২)
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, যে দুই প্রধান জনপদের মধ্যে মক্কার ছিলেন ওলিদ ইবন মুগীরা আল মাখযুমী এবং তায়েফে ছিলেন হাবীব ইবন উমর ইবন উমায়ের আছ-ছাক্কাফী। দু'জনেই ছিলেন প্রভুত মান-সম্মান ও ধন সম্পদের অধিকারী। অলীদ ইবন মুগীরা- যাকে কুরাইশের “থোকা ফুল বা রায়হানাতু কুরাইশ” বলা হতো- তিনি বলতেন, যদি মুহাম্মাদের কথাই সব সত্যি হতো, তাহলে তা (অর্থাৎ কুরআন) আমার উপর নাযিল হতো অথবা আবু মাসউদের উপর।
মোটকথা, ধন-সম্পদ সঞ্চয় কোনো প্রকৃত সঞ্চয় নয়, বরং নশ্বর দুনিয়ার সঞ্চয়ের চেয়ে আখিরাতের সঞ্চয়ই বড় সঞ্চয়। অথচ প্রিয় পাঠক! তুমি দেখতে পাবে আমাদের সমাজে বহু লোকের মধ্যে ব্যাপকহারে ঢুকে পড়েছে। তুমি দেখতে পাবে যে, একজন তিনি যত বড় বিদ্বান হোন না কেন, যদি তিনি দরিদ্র হন, তাহলে লোকেরা তাকে কোনই মূল্য দিবে না। বরং তার ধনী লোকের দিকে তাকিয়ে থাকবে ও তাদের কথার মূল্য দিবে। এ জন্যেই তো রাসূলুল্লাহ এর কবি হাসসান ইবন ছাবিত রা. কবিতা রচনা করেন- যার অর্থ নিম্নরূপ: 'দরিদ্রতা বহু জ্ঞানী-ধৈর্য্যশীলকে ধ্বংস করেছে। পক্ষান্তরে বহু মূর্খ লোক স্বচ্ছলতার মধ্যে ডুবে আছে।'