📄 বংশ উল্লেখ করে তিরস্কার করা
বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনাতে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু মালিক আশআরীকে বলেন, দেখো 'আমার উম্মত জাহেলিয়াতের চারটি বদ স্বভাব ত্যাগ করতে পারবে না' যার মধ্যে একটি হলো বংশের নামে তিরস্কার করা। বংশের বড়াই করে তারা বলে- অমুকের বাপ-দাদারা পবিত্র বংশের ছিল না, কিংবা অমুকের পূর্ব পুরুষ উচচ মর্যাদার অধিকারী ছিল না প্রভৃতি। এমনিভাবে বংশ উল্লেখ করে তিরস্কার করা জাহেলী যুগের রীতি।
📄 কারো মৃত্যুর পর চিৎকার করে কান্নাকাটি করা
বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনাতে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু মালিক আশআরীকে বলেন, দেখো 'আমার উম্মত জাহেলিয়াতের চারটি বদ স্বভাব ত্যাগ করতে পারবে না' যার একটি হলো কারো মৃত্যুর ফলে চিৎকার করে কান্নাকাটি করা। এগুলো যে করবে কিয়ামতের দিন তাকে আলকাতরার পাজামা এবং সারা গায়ে খোস পাঁচড়ার পোষাক পরানো হবে।' মৃত ব্যক্তির উপরে শোক করার বিষয়টি অনেকে শ্রেষ্ঠ আমল ও আল্লাহর সন্তুষ্টির উপায় হিসাবে ধরে নিয়েছিলেন। যেমন- বিশেষ করে প্রতি বছর আশুরার সময় ইমাম হোসায়েনের রা. নামে 'তাযিয়া' বা শোক মিছিল বের করা হয়।
📄 বাপ-মায়ের কর্ম দ্বারা কাউকে তিরস্কার করা
অন্যের কর্ম দ্বারা বিশেষ করে বাপ-মায়ের কর্ম দ্বারা মানুষকে তিরস্কার করা জাহেলী যুগের অন্যতম রীতি ছিল। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই রীতির বিরোধিতা করলেন। অবশ্য এই অপকর্মের ফলে কেউ মুশরিক বলে গণ্য হবে না। সহীহ বুখারীর কিতাবুল ঈমানের মধ্যে মারুর রা. হতে বর্ণিত হয়েছে তিনি বলেন যে, আমি একদিন আবুযর গিফারী রা. এর সংগে রবযাহ নামক স্থানে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে দেখি যে, তাঁর ক্রীতদাস ও তিনি একই ধরণের পোষাক পরে আছেন। জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন যে, আমি একজন লোককে তার মায়ের নামে গালি দিয়েছিলাম তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বলেন, হে আবুযর! তুমি কি করে মায়ের নামে তিরস্কার করলে? তোমাদের অধীন যারা তারা তোমাদের ভাই। আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের অধীনস্ত করেছেন। অতএব তোমাদের কারো অধীনে কোনো ভাই থাকলে সে যেন নিজে যা খায়, তাই তাকে খাওয়ায়, নিজে যে পোশাক পরে তাই তাকে পরায় ও তাদেরকে অধিক না খাটায়। যদি খাটাতে হয়, তাহলে তোমারা নিজেরা ওদেরকে সাহায্য করো।
মোটকথা, এক জনের কর্মের কারণে অন্যকে তিরস্কার করা মোটেই পূর্ণ ঈমান ও দুরদর্শিতার পরিচায়ক নয়। আবুযর গিফারী রা. পূর্ণ ঈমান ও মারেফাত হাছিল করার পূর্বে এক সময় বিলালের রা. সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হন। এক পর্যায়ে তিনি বিলালকে রা. 'ইবনুস সওদা' বা কৃষ্ণমাতার সন্তান বলে গালি দেন। বিলাল রা. এ বিষয়ে রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট অভিযোগ করলে তিনি আবুযর গিফারীকে ডেকে বলেন যে, আবুযর তুমি কি বেলালকে গালি দিয়েছ? তুমি কি তাকে তার কৃষ্ণমাতার নামে ধিক্কার দিয়েছ? তিনি বলেন- জ্বী হ্যাঁ। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেন, আমার মনে হয় তোমার মধ্যে এখনও জাহেলী যুগের কিছু অংশ বাকী আছে। একথা শোনার সংগে সংগে আবুযর গিফারী রা. মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে গেলেন এবং বলেন আমি আমার চেহারা মাটি থেকে উঠাবো না, যতক্ষণ পর্যন্ত না বেলাল তার পা দিয়ে আমার চেহারা মাড়িয়ে যাবে।'
হায়! হায়! আজকের মানুষের মধ্যে জাহেলী যুগের এ সকল স্বভাব কত ব্যাপকহারেই না দেখা যাচ্ছে। তারা একটা দেশের একজন মানুষের অপকর্মের জন্য পুরা দেশবাসীকে তিরস্কার করেছে। জাহেলী স্বভাব থেকে এরা আর কত দূরে।
📄 কোনো বিশেষ ঘরের তত্ত্বাবধায়ক হওয়ার গর্ব করা
জাহেলী যুগের আরবরা কাবাগরের মুতাওয়াল্লী হওয়ার কারণে অহংকার করতো। আল্লাহ তাদের এই বদ স্বভাবের নিন্দা করে নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করেন- 'আমি যখন তাদের নেতাদের গ্রেফতার করবো, তখন তারা আর্তনাদ করে উঠবে। তাদেরকে বলা হবে আজ আর্তনাদ করো না, তোমাদের কোনরূপ সাহায্য করা হবে না। আমার আয়াতগুলো তোমাদের নিকট যখন তিলাওয়াত করা হতো, তখন তোমরা (কাবা ঘরের তত্ত্বাবধায়ক হওয়ার গর্বে) দম্ভ ভরে এ বিষয়ে আজে বাজে কথা বলতে বলতে পিছনে ফিরে চলে যেতে।' (সূরা আল-মুমিনুন, ২৩: আয়াত ৬৪-৬৭)
মোটকথা, জাহেলী যুগের অন্যতম স্বভাব ছিল কোনো পবিত্র স্থানের উপর দায়িত্বশীল হওয়ার কারণে অহংকার করা। আজকের যুগে যেমন অনেকেই এসব কারণে মর্যাদার দাবী করে থাকে। মক্কা- মদীনার উপরে নেতৃত্ব থাকার কারণে কেউ নিজেদেরকে সারা মুসলিম বিশ্বের উপরে মর্যাদা দাবী করে। কেউবা কোনো পূন্যস্থান বা নেককার লোকদের বাসস্থানের তত্ত্বাবধায়ক হওয়ার কারণে সম্মানের দাবী করে। যারা শায়খ আবদুল কাদের জিলানীর রহ. দিকে নিজেদেরকে সম্পর্কিত করেন, তারা তার কবরে তত্ত্বাবধানের গৌরবে নিজেদের জন্য কিছু মর্যাদা কামনা করেন। এর অন্যতম কারণ তারা এ সমস্ত নজর মানত এবং ছদকা কুরবানীসহ বিভিন্ন শিরকী উৎসর্গসমূহের তত্ত্বাবধান করে থাকে। যা হিন্দু, কুর্দী ও অন্যান্য মূর্খ মুসলিমরা সেখানে ভেট হিসাবে নিবেদন করে থাকে। এই সব কবরের তত্ত্বাবধানকারী তথাকথিত খাদেম ও মুতাওয়াল্লীরা আল্লাহর সৃষ্টিকুলের মধ্যে সবচে নিকৃষ্ট, সর্বাপেক্ষা নীচ ও মতবাদের দিক দিয়ে সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট।
টিকাঃ
৩১. যাঁরা আমাদের দেশে আওলাদে রাসূলের নামে কিংবা আবু বকর ছিদ্দিকের বা আলীর বংশধর হওয়ার নামে গর্ববোধ করেন কিংবা ঐ বংশের লোক হওয়ার কারণে তাদের প্রতি অহেতুক শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে থাকেন, তাঁরা একবার আলোচনাটি হৃদয়ঙ্গম করুন। (অনুবাদক)