📘 ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব 📄 নেককার লোকদের কবরগুলিকে মসজিদে পরিণত করা

📄 নেককার লোকদের কবরগুলিকে মসজিদে পরিণত করা


এই স্বভাব ছিল ইয়াহুদী খৃষ্টানদের। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এদের বিরুদ্ধে লা'নত করে বলেন, 'আল্লাহ ইয়াহুদী ও নাছারাদেরকে অভিশপ্ত করুন, তারা তাদের নবীদের কবরগুলিকে সিজদার স্থানে পরিণত করেছে।' বুখারী ও মুসলিমে আবু হোরায়রা রা. হতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন যে, আল্লাহ ইয়াহুদী ও খৃষ্টানদের ধংস করুন, যারা তাদের নবীদের কবরগুলোকে মসজিদে পরিণত করেছে।

আয়েশা রা. প্রমুখ সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে যে, একদা উম্মে সালমা ও উম্মে হাবীবা রা. রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট হাবাশাতে (ইথিওপিয়া) দেখে আসা মারিয়া নামক একটি ইয়াহূদী গীর্জা সম্পর্কে বর্ণনা করছিলেন। তারা উক্ত গীর্জার সৌন্দর্য ও তার মধ্যে টাঙানো ছবিসমূহের কথা উল্লেখ করলে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন যে, উক্ত সম্প্রদায়ের মধ্যকার কোনো একজন নেককার লোক যখন মারা যায়, তখন তারা তার কবরে মসজিদ নির্মাণ করে এবং বিভিন্ন ছবিসমূহ সেখানে লটকিয়ে রাখে। এরা আল্লাহর নিকট সৃষ্টিকুলের সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট জীব।

সুনানে আর বাআ'র অন্য বর্ণনাতে ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত হয়েছে যে- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর যিয়ারতকারিণী মহিলাদেরকে এবং কবরের উপরে মসজিদ নির্মাণ ও বাতি দানকারীদেরকে লা'নত করেছেন।

ইয়াহূদী নাছারাদের অনুকরণে সৎলোকদের কবরে এইভাবে মসজিদ নির্মাণ করাকে প্রকাশ্যভাবেই নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এতদসত্ত্বেও একথা সকলেই জানেন যে, বর্তমান মুসলিম সমাজে কবরে মসজিদের সৌধ নির্মাণ করা হোক বা না হোক কবরকে সিজদার স্থানে পরিণত করা যে হারাম এবং সেই হারাম কর্ম সম্পাদনকারী যে স্পষ্ট মালাউন বা অভিশপ্ত, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। বিষয়টির উপর বহু হাদীস ও বর্ণনা রয়েছে এবং সে কারণে সালাফে ছালেহীনগণ উহার নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোরতা অবলম্বন করতেন।

📘 ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব 📄 নবীদের স্মৃতিচিহ্নসমূহে মসজিদ নির্মাণ করা

📄 নবীদের স্মৃতিচিহ্নসমূহে মসজিদ নির্মাণ করা


এ বিষয়টিও ইয়াহুদী খৃষ্টানদেরদের আবিস্কৃত। যেমন- ওমর রা. হতে বর্ণিত হয়েছে যে, তারা তাদের নবীদের নিদর্শনসমূহকে মসজিদে পরিণত করতো। এদের অনুকরণে বহু জাহেল মুসলিম এ ধরনের কাজ শুরু করেছে। যেমন তারা সৌধ নির্মাণ করেছে সেই স্থানে, যেখানে আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আত্মগোপন করেছিলেন। অথবা যেখানে পা রেখেছিলেন, কিংবা যেখানে দাড়িয়ে ইবাদত করেছিলেন। অথচ ইসলামে এইসব অতি ভক্তির কোনো স্থান নেই।

ইরাকে এমন বহু স্থান আছে, যেখানে বড় বড় সৌধ নির্মাণ করা হয়েছে। যেমন একটি জায়গা আছে, লোকদের ধারণা সেখানে শায়খ আব্দুল কাদের জীলানী রহ. ইবাদত করতেন। আর এক জায়গায় একটি পাথরের উপরে হাতের তালুর চিহ্ন আছে। শিয়াদের ধারণায় এটি তাদের ইমাম আলীর রা. হাতের তালুর চিহ্ন। এমনিভাবে আরো কয়েকটি জায়গা আছে, যেসব জায়গা সম্বন্ধে লোকদের ধারণা এই যে, এসব স্থানে খিযির আলাইহিস সালামকে দেখা গিয়েছিল। যদিও তার কোনো ভিত্তি নেই। এমনিভাবে আরো বহু স্থান আছে, যে সবের নাম করতে গেলে স্থান সংকুলান হবে না। অতএব যারা ইসলামের দাবীদার, তাদের উচিত এসব থেকে দূরে থাকা।

বিষয়টির বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিলে আশা করি অন্যায় হবে না। শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তায়মিয়াহ রহ. বলেন যে, উপরোক্ত ব্যাপারে খ্যাতনামা ওলামায়ে কেরামের মধ্যে দু'ধরণের মতামত দেখতে পাওয়া যায়। এক - ঐ সমস্ত স্থানে ইবাদত করা নিষিদ্ধ। তবে যেসব স্থান সম্পর্কে শরীয়তের নির্দেশ আছে, সেগুলির হুকুম স্বতন্ত্র। যেমন মাকামে ইবরাহীমে সালাত আদায় করা, কাবা ঘরে খুঁটির নিকটে সালাত পাঠ করা, মসজিদসমূহে এবং পয়লা কাতারে ছালাতের আকাংখা করা ইত্যাদি।

দ্বিতীয় মত হলো- বিশেষ কোনো গুরুত্ব না দিয়ে এসব স্থানে ইবাদত করায় তেমন কোনো দোষ নেই। যেমন আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. আল্লাহর নবীর চলার পথের নিদর্শনসমূহকে অধিক গুরুত্ব দিতেন। যদিও নবী করীম এসব স্থানে হঠাৎ কখনো চলেছেন। ইমাম আহমদ ইবন হাম্বলকে রহ. উক্ত বিষয়ে কেউ জিজ্ঞেস করলে এর সমর্থনে তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রা. (অন্ধ ছাহাবী) কি নিজ বাড়ীতে সালাত আদায় করার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট অনুমতি চাননি? আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা.কি রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চলার পথের নিদর্শনসমূহের অনুগমন করতেন না? অতএব এসব স্থানে যাতায়াত করায় কারুর জন্য ক্ষতির কারণ নেই। তবে বাড়াবাড়ি করা অন্যায়। আহমদ ইবনে কাসেম এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে তিনিও উপরোক্ত মন্তব্য করেন এবং বলেন যে, এক সময় ইবনে ওমর রা. কে একস্থানে পানি ঢালতে দেখা গেল। জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন যে, আমি এই স্থানে আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পানি ঢালতে দেখেছি। আহমদ রহ. বলতেন যে, এতটুকু করায় কোনো দোষ বর্তায় না। কিন্তু আজকাল লোকেরা এ ব্যাপারে খুব বাড়াবাড়ি করছে। যেমন- ইমাম হোসাইয়েন রা. এর কবর প্রভৃতি সম্বন্ধে। উপরের আলোচনা দু'টি কিতাবুল আদবের মধ্যে 'খেলাল' বর্ণনা করেছেন।

সহীহ বুখারীতে মুসা ইবন উকবা হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন যে, আমি সালেম ইবন আবদুল্লাহকে রাস্তায় বিভিন্ন স্থানে দাঁড়াতে ও সালাত আদায় করতে দেখেছি। তিনি বলতেন, আমার পিতা আবদুল্লাহ ইবন ওমর রা. এসব স্থানে রাসূলকে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ছালাত আদায় করতে দেখার কারণে নিজেও সালাত আদায় করতেন। এসব কারণেই ইমাম আহমদ রহ. এ ব্যাপারে অনুমতি দিয়েছেন।

পক্ষান্তরে যারা এটাকে অপছন্দ করেন, তাদের যুক্তি নিম্নরূপঃ
সাঈন ইবন মানছুর স্বীয় সুনানে মারুর ইবন সুওয়াইদ হতে বর্ণনা করেন যে, আমরা একদা ওমরের রা. সংগে হজ্জের সফরে বের হলাম। তিনি আমাদের সংগে ফজরের জামা'আতে প্রথম রাকা'আতে সুরা ফীল ও দ্বিতীয় রাকা'আতে সূরা কুরাইশ তিলাওয়াত করলেন। অতঃপর হজ্জ থেকে ফেরার পথে দেখলেন যে, এক জায়গায় সালাত পাঠ করার জন্য লোকেরা খুব তাড়াতাড়ি কছে। তিনি জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন যে, এখানে রাসূলুল্লাহ সালাত আদায় করেছিলেন। একথা শুনে ওমর রা. বলেন, তোমাদের পূর্বে ইয়াহুদী খৃষ্টানরা এভাবেই ধ্বংস হয়েছে। তারা তাদের নবীদের স্মৃতি চিহ্নগুলিকে ইবাদতগাহে পরিণত করেছিল। এতএব তোমাদের মধ্যে যাদের (ফরয) সালাত বাকী আছে, তারা আদয় করে নাও। যাদের সালাতের প্রয়োজন নেই, তারা চলে যাও।

অন্য বর্ণনায় মুহাম্মাদ ইবন আযযাহ প্রমুখ বর্ণনা করেন যে, হুদায়বিয়ার সন্ধিকালীন যে ঐতিহাসিক গাছ তলায় দাঁড়িয়ে উপস্থিত সকল মুসলিম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র হাতে হাত রেখে মৃত্যুশপথ নিয়েছিলেন, পরবর্তীকালে যখন লোকেরা ঐ গাছের কাছে যাতায়াত শুরু করলো, তখন ওমর রা. ভবিষ্যৎ ফেৎনার আশংকায় গাছটি কেটে ফেলার নির্দেশ দিলেন।

এখানে ওমর রা. যে দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন উহাই গ্রহণযোগ্য। তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র আবদুল্লাহ ইবন ওমর ব্যতীত সকল ছাহাবীর মতামত উহাই। অতএব তার উপরেই আমাদের আমল করা ওয়াজিব এবং সেদিকেই ফিরে যাওয়া উচিত। গ্রন্থকার মুহাম্মাদ ইবন সুলায়মান আল তামিমী যে একজন স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কুর'আন ও সুন্নাহপন্থী চিন্তাবিদ ছিলেন এবং হাম্বলী মাযহাবের মুকাল্লিদ ছিলেন না, উপরোক্ত আলোচনা তাঁর একটি প্রকৃষ্ট প্রমাণ।

📘 ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব 📄 কবরে বাতি দেওয়া

📄 কবরে বাতি দেওয়া


ইতোপূর্বে এর নিষেধাজ্ঞা সম্বলিত হাদীস উল্লেখিত হয়েছে। প্রিয় পাঠক! বিশেষ করে যদি আপনি একবার শিয়া ইমাম বা রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিবারভূক্ত ইমামদের কবরগুলিকে দেখতেন। সেখানে রমযানের রাত্রি ও অন্যান্য পবিত্র রাত্রিগুলিতে যেভাবে আলোকসজ্জা করা হয় (তা দারুণভাবে নিন্দনীয়)। অথচ তারা এক অতীব পূণ্যের কাজ বলে ভেবে থাকে।

📘 ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব 📄 কবরগুলিকে ঈদের স্থানে পরিণত করা

📄 কবরগুলিকে ঈদের স্থানে পরিণত করা


আবু হুরায়রা রা. বলেন- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি যে তোমরা (যিকির-আযকার ও সালাত থেকে খালি করে) তোমাদের ঘরগুলিকে কবরস্থানে পরিণত করো না। তোমরা আমার কবরকে ঈদ-উৎসবের স্থানে পরিণত করো না। তোমরা আমার উপর দরূদ পড়ো। যে স্থান থেকেই তোমরা দরুদ পড়ো না কেন, তা আমার কাছে পৌঁছানো হয়। (নাসাঈ, মেশকাত ৮৬ পৃঃ)

প্রিয় পাঠক! জেনে রাখুন যে, ঈদ বলা হয় ঐ সাধারণ সম্মেলনকে যা প্রতি বছর, সপ্তাহে বা মাসে নিয়মিতভাবে ফিরে আসে বা আবর্তিত হয়। যেমন- ঈদুল ফিতর, জুমু'আ বা অনুরূপ কোনো উপাসনা সম্মেলন অথবা সাধারণ সম্মেলন। কখনো তা নির্দিষ্ট স্থানকে কেন্দ্র করে হয়ে থাকে। কখনো বা অনির্দিষ্ট স্থানে। ইরাকবাসী মুসলিমদের অবস্থা হলো এই যে, তারা দেশের প্রত্যেক অলির কবরে নির্দিষ্ট একটি দিনে যিয়ারতের উদ্দেশ্যে জমায়েত হবে। (যেমন- আমাদের দেশে 'উরস' উৎসবে জমায়েত হয়ে থাকে)। কেউ জুমু'আর দিনকে নির্দিষ্ট করে নিয়েছে, কেউ মঙ্গলবার, কেউ বা অন্যান্য সময়ে। এমনিভাবে কোনো কোন রাতকেও তারা (যিয়ারত ও জমায়েতের উদ্দেশ্যে) নির্দিষ্ট করে নিয়েছে। যেমন- শবে কদর, শবেবরাত বা ঈদের দিনগুলিতে যেসব বিষয়ে আল্লাহ কোনো দলীল নাযিল করেন নি।

টিকাঃ
২৮. মাননীয় লেখক হাদীসটি ভুলক্রমে উল্লেখ করেননি। আলোচ্য বিষয়ের সহিত মিল থাকায় সংযোজন করা হল। (অনুবাদক)

ফন্ট সাইজ
15px
17px