📘 ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব 📄 বড় ধরণের মকরবাজি

📄 বড় ধরণের মকরবাজি


যেমন নূহ আলাইহিস সালামের কওম তাদের নবীর সংগে করেছিল। তারা নূহ আলাইহিস সালামের দ্বীন গ্রহণের ব্যাপারে বিভিন্ন হিলা বা টালবাহানার আশ্রয় নিয়েছিল লোকদেরকে দ্বীন কবুলের সাথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল। তাদেরকে বরং প্ররোচিত করেছিল নবীকে কষ্ট দেওয়ার জন্য। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
‘তারা বড় বড় ধোঁকাবাজির আশ্রয় নিয়েছিল। তারা লোকদের বলেছিল, তোমরা কোনো অবস্থাতেই তোমাদের উপাস্য আদ, সুআ, ইয়াগুছ, ইয়াউক, নাসর প্রভৃতি দেব-দেবীকে ছেড়ো না। এইভাবে তারা বহু লোককে বিভ্রান্ত করে।’ (সূরা নূহ, ৭১: আয়াত ২২-২৪)

এইসব মকরবাজদের উত্তরসূরী স্বেচ্ছাচারী দুনিয়া পূজারীগণ পরবর্তীকালে যুগে যুগে নবীদের বিরুদ্ধে ও হকের পথে দাওয়াত দানকারীদের বিরুদ্ধে অনুরূপ ধোঁকাবাজিই করে গিয়েছে। এ সব দাজ্জালদের কূটনীতি ও মকরবাজি হতে আল্লাহর নিকট পানাহন চাই।

টিকাঃ
* আমি তাদেরকে পরখ করে দেখলাম যে, সবাই খবীছ। অতএব আমি মহান প্রভুর শরণাপন্ন হলাম। (অনুবাদক)।

📘 ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব 📄 আলেমদের অবস্থা

📄 আলেমদের অবস্থা


জাহেলী যুগের নেতারা হয় বদকার আলেম হতো, নতুবা মূর্খ আবেদ হতো। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন-
'তোমরা কি এটাই আকাংখা করছো যে, ওরা সবাই ঈমান আনবে। অথচ বাস্তব অবস্থা হলো এই যে, ওদের মধ্যে এক দল আছে যারা আল্লাহর কালাম শ্রবণ করে, অতঃপর তা হৃদয়ঙ্গম করার পর জেনেবুঝে তার পরিবর্তন সাধন করে।...তাদের মধ্যে আর একটা দল আছে যারা মূর্খ। যারা মিথ্যা আশা ব্যতীত আল্লাহর কিতাব সম্পর্কে কিছুই জানে না। বরং তারা কল্পনা করতেই অভ্যস্ত।' (সূরা আল-বাক্বারাহ, ২: আয়াত ৭৫-৭৮)

উপরোক্ত আয়াতে ইয়াহুদী সমাজের দু'টি সম্প্রদায়ের চরিত্র ব্যাখ্যা করা হয়েছে। প্রথমোক্ত দলটি হলো ইয়াহূদী আলেমদের। যাদের সাধারণ চরিত্র ছিল এই যে, তারা তাওরাতের আয়াতসমূহ পাঠ করতো বা শুনতো। তারপর নিজেদের স্বার্থে ইচ্ছামত অপব্যাখ্যা করতো। এমনকি তারা নিজেদের তৈরী অনেক কথাও তাওরাতে ঢুকিয়ে দিতো। যেমন তাওরাতে শেষ নবীর দৈহিক গঠন সম্পর্কে বর্ণনা আছে যে, তিনি মধ্যম আকৃতির গৌরবর্ণ হবেন, ইয়াহূদী আলেমরা নিজেদের স্বার্থে তার পরিবর্তন করে লিখলো, তিনি হবেন 'দীর্ঘাঙ্গ মেটে রঙের'। এমনিভাবে তারা বিবাহিত ব্যভিচারীকে পাথর মেরে হত্যা করার শাস্তির বিধান সম্বলিত আয়াতকে পরিবর্তন করে তাদের চেহারায় 'কালো রং' দেওয়ার বিধান জারি করলো। বুখারীতে এসবের বর্ণনা আছে।

দ্বিতীয় দলটি হলো ঐ সকল মূর্খ মুকাল্লিদ, যারা উপরোক্ত আলেমদের অনুসরণ করতো। যাদের নিজেদের কোনো বিচারশক্তি ছিল না।

জাহেলী যুগের উক্ত রীতি আজকের মুসলিম সমাজে ব্যাপক হারে বিস্তার লাভ করেছে। আজকের আলেমগণ বদ-স্বভাব এবং অলী- দরবেশগণ প্রবৃত্তি পরায়ণতায় সীমা ছাড়িয়ে গেছেন। আর তারা আল্লাহ সম্পর্কে এমন এমন কথা বলেন যার কোনো ভিত্তি নেই। শরীয়তের এমন এমন ব্যাখ্যা দেন যে, সম্পর্কে খোদ ইসলামই লজ্জাবোধ করে। সবকিছুর ফয়সালা আল্লাহর হাতে।

📘 ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব 📄 নিজেদেরকেই কেবল আল্লাহর অলী ধারণা করা

📄 নিজেদেরকেই কেবল আল্লাহর অলী ধারণা করা


মদীনার ইয়াহুদীরা খায়বরের ইয়াহূদীদের নিকট এই মর্মে লিখলো যে, মুহাম্মাদের আনুগত্য ও বিরোধিতার বিষয়ে তোমরা যেটা করবে আমরা সেটাই করবো। জওয়াবে খায়বরের ইয়াহূদীরা লিখলোঃ আমরা আল্লাহর বন্ধু ইবরাহীমের সন্তান। আমাদেরই মধ্যে আল্লাহর পুত্র ওযায়ের ও অন্যান্য নবীদের আগমন ঘটেছে। অতএব আরবদের মধ্য হতে কখনই নবী আসতে পারে না। নবী হওয়ার ব্যাপারে মুহাম্মাদের চাইতে আমরাই অধিক হকদার। সুতরাং তার প্রতি আনুগত্যের কোনো প্রশ্নই উঠে না। আল্লাহ তা'আলা তখন নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করলেন-
'(হে নবী) আপনি বলে দিন যে, হে ইয়াহুদীগণ যদি দুনিয়ার সমস্ত লোকদের মধ্যে কেবলমাত্র নিজেদেরকেই তোমরা আল্লাহর অলী বা প্রিয় বান্দা হিসাবে ধারণা করে থাকো এবং এই দাবী যদি তোমরা যথার্থভাবেই করে থাকো তাহলে তোমরা মৃত্যু কামনা করো। (নিজেদের অবাধ্যতার কারণে) তারা কখনো মৃত্যু কামনা করবে না। আল্লাহ যালিমদের সম্পর্কে খুব ভালভাবেই জ্ঞাত আছেন'। (সূরা আল-জুমু'আ, ৬২: আয়াত ৬-৭)

ইয়াহুদীদের দাবীর অসারতা প্রমাণের জন্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এরূপ চ্যালেঞ্জ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কেননা ইয়াহূদীরা নিজেদেরকে আল্লাহর সন্তান ও প্রিয় বান্দা বলে দাবী করতো। উপরন্তু বলতো যে, তারাই কেবল জান্নাতের অধিকারী হবে, আর কেউ নয়। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করে বলেন-
'তারা দাবী করতো যে, ইয়াহূদী বা খৃষ্টানরা ব্যতীত কেউই কখনো জান্নাতে প্রবেশাধিকার পাবে না। এটা তাদের আশা মাত্র। আপনি বলে দিন যে, তোমরা তোমাদের দাবীর সমর্থনে দলীল পেশ করো, যদি সত্যবাদী হয়ে থাকো'। (সূরা আল-বাক্বারাহ ৩: আয়াত ১১১)।

বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়াহুদীদেরকে উপরোক্ত মৃত্যু কামনার আহবান পেশ করার সময় বলেছিলেন যে, তোমদের কেউই মৃত্যু কামনার কথা মুখে প্রকাশ করতে গেলেই তার থুথু শুকিয়ে যাবে। বস্তুতপক্ষে তাদের কেউই মৃত্যু কামনার কথা বলেনি। কেননা, তারা আসলে শেষ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনের বাস্তবতায় বিশ্বাসী ছিল। তারা একথাও জানতো যে, তারা মৃত্যু কামনার কথা প্রকাশ করার সাথে সাথেই মৃত্যুবরণ করবে এবং জাহান্নামের খোরাক হবে। এটি ছিল শেষ নবীর অন্যতম মো'জেযা। এ কারণেই ইয়াহুদীরা আল- কুরআনের এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেনি।

ইয়াহুদীদের ন্যায় ইসলামী ফেরকাগুলির মধ্যেও আজকাল অনুরূপ ধারণার প্রসার লাভ ঘটে। তারা প্রত্যেকেই নিজেদেরকে আল্লাহর অলী বলে দাবী করছে। অথচ আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্ব্যর্থহীনভাবে 'নাজী' ফিরকা বা মুক্তিপ্রাপ্ত দল হিসাবে কেবল তাদের কথাই বলে গেছেন, যারা নবী ও তার সাহাবীদের তরীকার উপরে কায়েম থাকবে'।

টিকাঃ
২৬. লেখক আলোচনার শুরুতেই আয়াত পেশ করেছেন এবং মাঝখানে যেয়ে শানে নুযুল উল্লেখ করেছেন। পাঠকের সহজবোধ্য হওয়ার জন্য শানে নুযূল আগে দিলাম।

📘 ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব 📄 শরীয়ত ত্যাগ করে আল্লাহর মহব্বত দাবী করা

📄 শরীয়ত ত্যাগ করে আল্লাহর মহব্বত দাবী করা


জাহেলী যুগের এই রীতির বিরুদ্ধে আল্লাহ তা'আলা বলেন-
(হে নবী) আপনি বলে দিন যে, যদি তোমরা যথার্থই আল্লাহর মহব্বতের দাবীদার হয়ে থাকো, তাহলে আমার অনুসরণ করো। তা হলেই আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ মার্জনা করবেন। আল্লাহ মহা ক্ষমাশীল ও কৃপানিধাণ'। (সূরা আলে ইমরান ৩: আয়াত ৩১)

শানে নুযূলঃ হাসান রহ. ও ইবনে জুরায়েজ রহ. বলেন যে, রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যামানায় একদল লোক আল্লাহর মহব্বতের দাবীর কথা নবীর দরবারে পেশ করলে উপরোক্ত আয়াত নাযিল হয়।

ইবনে আব্বাস রা. হতে যোহাক বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদুল হারামে দাঁড়িয়েছিলেন। এমতাবস্থায় কুরাইশগণ তাদের প্রতিমাগুলো সাজিয়ে রাখছিল। তারা প্রতিমার দেহে উট পাখীর ডিমের খোসা এবং কানে দুলসমূহ ঝুলিয়ে রাখছিল। অতঃপর তাকে সিজদা করছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তাদেরকে সম্বোধন করে বললেন- হে কুরায়েশরা, তোমরা তোমাদের পিতা ইব্রাহীম ও ইসমাঈল আলাইহিস সালামের দ্বীনের বিরোধিতা করছ। তাঁরা উভয়ে ইসলামের উপরই কায়েম ছিলেন। তারা তখন উত্তরে বলল, হে মুহাম্মদ! আমরা আল্লাহর মহব্বতেই এদের পূজা করি, যাতে এরা আমাদেরকে আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছে দেয়। এর পরে এই আয়াত নাযিল হয়।

আবু ছালেহ বর্ণনা করেন যে, যখন ইয়াহুদীরা নিজেদেরকে আল্লাহর সন্তান ও প্রিয় পাত্র বলে দাবী করে, তখন এই আয়াত নাযিল হয়, কিন্তু ইয়াহূদীদের সম্মুখে উক্ত আয়াত পেশ করা হলে তারা তা অস্বীকার করে।

মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক রা. বর্ণনা করেন যে, নাজরানের খৃষ্টানদের সম্পর্কে উক্ত আয়াত নাযিল হয়। যখন তারা দাবী করে যে, আমরা ঈসা মসীহকে সম্মান করি, তাকে পূজা করি কেবলমাত্র আল্লাহর মহববতের খাতিরে। তাদের দাবীর প্রতিবাদে আল্লাহ উপরোক্ত আয়াত নাযিল করেন।

মোটকথা, পাপ-পূণ্যের জগাখিঁচুড়ি দিয়ে কেউ আল্লাহর মহব্বতের দাবী করতে পারে না। কবি কত সুন্দরই না বলেছেন-
'তুমি আল্লাহর অবাধ্য আচরণ করবে, অথচ মুখে তার প্রতি মহব্বত প্রকাশ করবে। আমার জীবনের কসম এটি একটি অভিনব যুক্তি। 'যদি তোমার ভালবাসা খাঁটি হয়, তাহলে অবশ্যই তুমি তার আনুগত্য করবে। নিশ্চয়ই প্রেমিক তার প্রেমাস্পদের প্রতি অনুগত থাকে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية