📄 সত্য বিুচ্যুতির ফলে দলে দলে বিভক্তি
প্রকৃত সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার ফলে জাহেলী যুগের লোকেরা নিজেদের দ্বীনের মধ্যে অসংখ্য ফিরকায় বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। তাদের এই অবস্থান বর্ণনা প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন-
'আসল কথা হলো, তারা তাদের নিকট আগত সত্যকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে। ফলে তারা এমন দ্বিধা দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে আছে।' (সূরা কাফ, ৫০: আয়াত ৫)
এই দ্বিধা-সংকোচ কয়েক ধরণের ছিল। যেমন-
(ক) কোনো মানুষের নবী হওয়াকে কেউ কেউ অসম্ভব ভাবতো।
(খ) নবুওত কেবল বিরাট প্রতিপত্তিশালী ধনী ব্যক্তিদেরকে দেওয়া যেতে পারে। যেমন তারা প্রকাশ্যে বলেছিল-
'দুইটি বড় জনপদের কোনো মহান ব্যক্তির নিকট কেন এই কুরআন নাযিল হলো না?'
(গ) কারো ধারণা ছিল- নবুওত আসলে একটা যাদু মাত্র।
(ঘ) কারো ধারণা ছিল, এটি কোনো মন্ত্রতন্ত্র হবে।
সূরা যারিয়াতের ১১ আয়াতে আল্লাহ অবিশ্বাসীদের লক্ষ্য করে বলেন- নিশ্চয়ই তোমরা নানা কথার বেড়াজালে আটকা পড়ে আছো। যেমন-
(ক) তোমরা একদিকে বলছো আসমান-যমীন সবকিছুই আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। অন্যদিকে প্রতিমা পূজা করছো। (খ) রাসূল সম্পর্কে তোমরা একবার বলছ পাগল, একবার বলছ জাদুকর। অথচ বুদ্ধিমান লোক ছাড়া জাদুকর হতে পারে না। (গ) কেয়ামত সম্পর্কে তোমরা বলছ হাশর-নশর কিছুই নেই, পুণরুত্থান মিথ্যা। ওদিকে বলছ, তোমাদের হাতে গড়া মূর্তিগুলি কেয়ামতের দিবসে আল্লাহর নিকট শাফাআত করবে। এমনি আরো যুক্তি অপযুক্তির জালে আবদ্ধ হয়ে তোমরা পথ হাতড়ে বেড়াচ্ছ। অথচ সত্য দ্বীন তোমাদের বার বার আহবান জানাচ্ছে। কিন্তু সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করছ না।
পৌত্তলিক মুশরিকদের অবস্থা বর্ণনা শেষে সূরা আল-আনআমের ১৫৯ আয়াতে আল্লাহ কিতাবধারী ইয়াহুদী-খৃষ্টানদেরদের অবস্থা সম্পর্কে বলেন-
'যারা দ্বীনের মধ্যে নানা মতের সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে, আপনি তাদের কোনো ব্যাপারেই নয়। তাদের বিষয়টি সম্পূর্ণ আল্লাহর এখতিয়ারে। আল্লাহ তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে অবহিত করবেন।'
আবু দাউদ ও তিরমিযিতে আবু হুরায়রা রা. প্রমূখ রেওয়ায়েত করেছেন যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন যে, ইয়াহুদীরা ৭১ উপদলে ও নাছারাগণ ৭২ উপদলে বিভক্ত হয়েছিল। তাদের মধ্যে একটি দল ছাড়া বাকী সবাই জাহান্নামে যাবে। বলা বাহুল্য ইসলাম আসার পরে বর্তমান যুগের সকল ইয়াহুদী-খৃষ্টানরাই জাহান্নামী দলের অন্তর্ভুক্ত। কারণ, সত্য দ্বীন ইসলামের আবির্ভাবের পরে আগেকার সকল দ্বীন আল্লাহ বাতিল ঘোষণা করেছেন।
তিরমিযী, ইবনে জরীর, তাবারানী প্রমুখ বর্ণিত আবু হোরায়রা রা. কর্তৃক বর্ণনা আছে যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন যে, ইসলামের মধ্যে ফিরকা সৃষ্টিকারী তারাই, যারা আমার উম্মাতের মধ্যে বেদআতী ও প্রবৃত্তি পূজারী হবে।
মোটকথা, বিভক্তির মূল প্রেরণা আসে জাহেলিয়াত থেকে। নইলে সত্য দ্বীন চাই তা বিগত দিনের মূসা বা ঈসার আলাইহিস সালাম শরীয়ত হোক, চাই শেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরীয়ত হোক, উহাতে কোনই ইখতেলাফ বা স্ব-বিরোধিতা নেই। যেমন আল্লাহ বলেন-
'ঈমানদারদের অভিভাবক হলেন আল্লাহ, তিনি তাদেরকে অন্ধকারসমূহ থেকে আলোর পথে নিয়ে আসেন। পক্ষান্তরে যারা সত্য প্রথ্যাখ্যানকারী তাদের অভিভাবক হলো শয়তান। তারা তাদেরকে আলো হতে অন্ধকারসমূহের দিকে নিয়ে যায়। ওরা দোযখের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে।' (সূরা আল-বাক্বারাহ, ২: আয়াত ২৫৭)
অত্র আয়াতে আল্লাহ 'নূর' (আলো) এক বচন ও 'যুলুমাত' (অন্ধকারসমূহ) কে বহুবচন ব্যবহার করেছেন। কারণ নূর বা হক চিরদিনই অখন্ড অবিভাজ্য, তা কখনোই বিভক্ত হতে পারে না। পক্ষান্তরে যার উৎস অসংখ্য, তা সব সময়ই বিভক্ত হয়ে থাকে। কারণ নানা মুনির নানা মত থাকবেই। অতএব আক্বীদা ও বিশ্বাসে অনৈক্য জাহেলী যুগের রীতি এবং সত্য বিশ্বাসে ঐক্য এটাই ইত্তেবায়ে রাসূলের নীতি। আমাদেরকে সকল অনৈক্য ভুলে সেই নীতিতেই অটল থাকতে হবে।
📄 নিজেদের লালিত মতবাদকেই হক মনে করে তার উপরে আমল বজায় রাখার দাবী
এটা ছিল জাহেলী যুগে ইয়াহূদীদের স্বভাব, যেমন আল্লাহ বলেন- আল্লাহর নাযিলকৃত পাক কুরআনের উপর ইয়াহূদীদেরকে ঈমান আনতে বলা হলে তারা বলে ছিল যে, আমরা কেবলমাত্র বিশ্বাস করবো ঐ বস্তুর উপর যা আমাদের উপর নাযিল হয়েছে (অর্থাৎ তাওরাত) এবং তা ব্যতীত সব কিছুকে তারা প্রত্যাখ্যান করবে। অথচ কুরআনই প্রকৃত হক কিতাব যা তাদের (তাওরাত-ইঞ্জিল) সত্যতা প্রতিপন্ন করে থাকে। (হে নবী) আপনি বলুন যে, 'তোমরা যদি সত্যিকারের ঈমানদার হও, তাহলে কেন ইতোপূর্বে নবীদেরকে হত্যা করেছিলেন'? (সূরা আল-বাক্বারাহ, ২: আয়াত ৯১)
📄 ইবাদতের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা
যেমন তারা আশুরা প্রভৃতি দিনে নিজেদের পক্ষ থেকে ইবাদত বানিয়ে নিত।
📄 ইবাদতে কমতি করা
যেমন- কুরাইশ বংশের লোকেরা হজ্জের সময় অন্যান্যদের ন্যায় আরাফাতের ময়দানে অবস্থান (উকুফ) না করে মুযদালিফায় অবস্থান করতো এবং নিজেদেরকে 'হুমুস' বা কঠিন ধার্মিক বলে দাবী করতো। (বুখারী, মুসলিম আয়েশা রা. হতে)
আল্লাহ তাদের এই ইচ্ছাকৃতভাবে ইবাদতের কমতি বা ত্রুটির প্রতিবাদ করে ইরশাদ করেন-
‘অতএব তোমরা প্রত্যাবর্তন করো সেখান হতে যেখান হতে অন্যান্য লোকেরা প্রত্যাবর্তন করে থাকে। আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু।’ (সূরা আল-বাক্বারাহ ২: আয়াত ১৯৯)