📄 মুমনিদের বিরুদ্ধে সমাজে ফাসাদ সৃষ্টির অভিযোগ
মুমিনদেরকে সমাজে ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারী বলে অভিহিত করা জাহেলী যুগের একটি রীতি। যেমন- সূরা বাক্বারার ১১ ও ১২ আয়াতে পরিষ্কার বলা হয়েছে,
“যখন তাদেরকে বলা হয় পৃথিবীতে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করো না, তখন তারা বলে আমরাইতো শান্তি স্থাপনকারী। সাবধান এরাই (আসলে) অশান্তি সৃষ্টির হোতা। কিন্তু ওরা (নিজেদের দোষ) বুঝতে অপারগ।” (সূরা আল-বাকারা : ১১-১২)
এমনিভাবে একই রীতি চলছে প্রতি যুগে, ঐ সমস্ত লোকের মধ্যে যাদের অন্তরে বিভিন্ন বেদআতী রেওয়াজ প্রথা ও বিভ্রান্তিসমূহ দানা বেঁধে আছে।
📄 মুমনিদের বিরুদ্ধে ধর্ম পরিবর্তনের অভিযোগ
জাহেলী যুগের অন্যতম রীতি ছিল যে, তারা যে নীতির উপরে চলতো, সেটাকেই এক মাত্র হক মনে করতো। এর বাইরে সব কিছুকে গুমরাহী ভাবতো। কেউ তাদের ভুল ধরিয়ে হক পথের সন্ধান দিলে উল্টা তাকেই দ্বীন পরিবর্তনকারী ও ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারী বলে আখ্যায়িত করতো। যেমন আল্লাহ উদ্ধৃতি করে বলেন-
'আমি আশংকা করছি যে, এই ব্যক্তি তোমাদের ধর্মকে পাল্টে দেবে এবং দেশে ফ্যাসাদ ব্যপ্ত করে দেবে।' (সূরা আল-গাফের, ৪০: আয়াত ২৬)
প্রতি যুগেই হকপন্থীদের বিরুদ্ধে বাতিল পন্থীদের এমনি আচরণ চলে আসছে।
📄 হকপন্থীদের বিরুদ্ধে সরকারের নিকট কুপরামর্শ
যখন বাতিলপন্থীরা যুক্তিতে হেরে যায় তখন তারা অস্ত্রের আশ্রয় নেয় এবং দেশের সরকারকে কুমন্ত্রণা দিতে শুরু করে। হকপন্থীদের বিরুদ্ধে সরকার বিরোধী চক্রান্তের মিথ্যা অপবাদ রটিয়ে দেয়। আরও বলে, এরা দেশের প্রতিষ্ঠিত সরকারকে হেয় করছে এবং জনসাধারণকে তাদের ধর্ম সম্পর্কে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
যেমন- ফেরাউনকে তার সম্প্রদায়ের নেতারা কুমন্ত্রণা দিয়ে বলেছিল-
'আপনি কি মূসা ও তার কওমকে রাজ্যে বিপর্যয় সৃষ্টি করার জন্য সুযোগ দিবেন'? (সূরা আল-আরাফ, ৭: আয়াত ১২৭)
এ নিয়ম সব যুগেই ছিল, আজও আছে।
📄 সত্য বিুচ্যুতির ফলে দলে দলে বিভক্তি
প্রকৃত সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার ফলে জাহেলী যুগের লোকেরা নিজেদের দ্বীনের মধ্যে অসংখ্য ফিরকায় বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। তাদের এই অবস্থান বর্ণনা প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন-
'আসল কথা হলো, তারা তাদের নিকট আগত সত্যকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে। ফলে তারা এমন দ্বিধা দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে আছে।' (সূরা কাফ, ৫০: আয়াত ৫)
এই দ্বিধা-সংকোচ কয়েক ধরণের ছিল। যেমন-
(ক) কোনো মানুষের নবী হওয়াকে কেউ কেউ অসম্ভব ভাবতো।
(খ) নবুওত কেবল বিরাট প্রতিপত্তিশালী ধনী ব্যক্তিদেরকে দেওয়া যেতে পারে। যেমন তারা প্রকাশ্যে বলেছিল-
'দুইটি বড় জনপদের কোনো মহান ব্যক্তির নিকট কেন এই কুরআন নাযিল হলো না?'
(গ) কারো ধারণা ছিল- নবুওত আসলে একটা যাদু মাত্র।
(ঘ) কারো ধারণা ছিল, এটি কোনো মন্ত্রতন্ত্র হবে।
সূরা যারিয়াতের ১১ আয়াতে আল্লাহ অবিশ্বাসীদের লক্ষ্য করে বলেন- নিশ্চয়ই তোমরা নানা কথার বেড়াজালে আটকা পড়ে আছো। যেমন-
(ক) তোমরা একদিকে বলছো আসমান-যমীন সবকিছুই আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। অন্যদিকে প্রতিমা পূজা করছো। (খ) রাসূল সম্পর্কে তোমরা একবার বলছ পাগল, একবার বলছ জাদুকর। অথচ বুদ্ধিমান লোক ছাড়া জাদুকর হতে পারে না। (গ) কেয়ামত সম্পর্কে তোমরা বলছ হাশর-নশর কিছুই নেই, পুণরুত্থান মিথ্যা। ওদিকে বলছ, তোমাদের হাতে গড়া মূর্তিগুলি কেয়ামতের দিবসে আল্লাহর নিকট শাফাআত করবে। এমনি আরো যুক্তি অপযুক্তির জালে আবদ্ধ হয়ে তোমরা পথ হাতড়ে বেড়াচ্ছ। অথচ সত্য দ্বীন তোমাদের বার বার আহবান জানাচ্ছে। কিন্তু সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করছ না।
পৌত্তলিক মুশরিকদের অবস্থা বর্ণনা শেষে সূরা আল-আনআমের ১৫৯ আয়াতে আল্লাহ কিতাবধারী ইয়াহুদী-খৃষ্টানদেরদের অবস্থা সম্পর্কে বলেন-
'যারা দ্বীনের মধ্যে নানা মতের সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে, আপনি তাদের কোনো ব্যাপারেই নয়। তাদের বিষয়টি সম্পূর্ণ আল্লাহর এখতিয়ারে। আল্লাহ তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে অবহিত করবেন।'
আবু দাউদ ও তিরমিযিতে আবু হুরায়রা রা. প্রমূখ রেওয়ায়েত করেছেন যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন যে, ইয়াহুদীরা ৭১ উপদলে ও নাছারাগণ ৭২ উপদলে বিভক্ত হয়েছিল। তাদের মধ্যে একটি দল ছাড়া বাকী সবাই জাহান্নামে যাবে। বলা বাহুল্য ইসলাম আসার পরে বর্তমান যুগের সকল ইয়াহুদী-খৃষ্টানরাই জাহান্নামী দলের অন্তর্ভুক্ত। কারণ, সত্য দ্বীন ইসলামের আবির্ভাবের পরে আগেকার সকল দ্বীন আল্লাহ বাতিল ঘোষণা করেছেন।
তিরমিযী, ইবনে জরীর, তাবারানী প্রমুখ বর্ণিত আবু হোরায়রা রা. কর্তৃক বর্ণনা আছে যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন যে, ইসলামের মধ্যে ফিরকা সৃষ্টিকারী তারাই, যারা আমার উম্মাতের মধ্যে বেদআতী ও প্রবৃত্তি পূজারী হবে।
মোটকথা, বিভক্তির মূল প্রেরণা আসে জাহেলিয়াত থেকে। নইলে সত্য দ্বীন চাই তা বিগত দিনের মূসা বা ঈসার আলাইহিস সালাম শরীয়ত হোক, চাই শেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরীয়ত হোক, উহাতে কোনই ইখতেলাফ বা স্ব-বিরোধিতা নেই। যেমন আল্লাহ বলেন-
'ঈমানদারদের অভিভাবক হলেন আল্লাহ, তিনি তাদেরকে অন্ধকারসমূহ থেকে আলোর পথে নিয়ে আসেন। পক্ষান্তরে যারা সত্য প্রথ্যাখ্যানকারী তাদের অভিভাবক হলো শয়তান। তারা তাদেরকে আলো হতে অন্ধকারসমূহের দিকে নিয়ে যায়। ওরা দোযখের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে।' (সূরা আল-বাক্বারাহ, ২: আয়াত ২৫৭)
অত্র আয়াতে আল্লাহ 'নূর' (আলো) এক বচন ও 'যুলুমাত' (অন্ধকারসমূহ) কে বহুবচন ব্যবহার করেছেন। কারণ নূর বা হক চিরদিনই অখন্ড অবিভাজ্য, তা কখনোই বিভক্ত হতে পারে না। পক্ষান্তরে যার উৎস অসংখ্য, তা সব সময়ই বিভক্ত হয়ে থাকে। কারণ নানা মুনির নানা মত থাকবেই। অতএব আক্বীদা ও বিশ্বাসে অনৈক্য জাহেলী যুগের রীতি এবং সত্য বিশ্বাসে ঐক্য এটাই ইত্তেবায়ে রাসূলের নীতি। আমাদেরকে সকল অনৈক্য ভুলে সেই নীতিতেই অটল থাকতে হবে।