📘 ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব 📄 সত্যকে প্রতিরোধ করার জন্য সাময়িকভাবে তাকে স্বীকার করে নেওয়া

📄 সত্যকে প্রতিরোধ করার জন্য সাময়িকভাবে তাকে স্বীকার করে নেওয়া


নিজ মাযহাবের উপর গোড়ামী ঠিক রেখে সত্যকে প্রতিরোধ করার জন্য আহলে কিতাবগণ তাদের লোকদেরকে কিভাবে পরিচালিত করতো, তার পরিচয় মিলবে নিম্নোক্ত আয়াতে-

'কিতাবধারীদের একটি দল বলে যে, মুমিনদের উপর যা নাযিল হয়েছে অর্থাৎ কুর'আনের উপরে তোমরা দিনের বেলায় ঈমান প্রদর্শন করো এবং দিনের শেষে তা প্রত্যাখ্যান করো, হয়ত বা এতে মুমিনরা পুনরায় ফিরে আসবে। তবে (সাবধান) যারা তোমাদের দ্বীনের অনুসারী (ইয়াহূদী কিংবা খৃষ্টান) তাদেরকে ছাড়া অন্য কাউকে বিশ্বাস করবেনা'। (সূরা আলে ইমরান ৩: আয়াত ৭২-৭৩)

উক্ত আয়াতের শানে নুযুল সম্পর্কে হাসান ও সুদ্দী রহ. বলেন, খায়বরের ১২ জন ইয়াহুদী ধর্মনেতা এ বিষয়ে একমত হলেন যে, আমাদের মধ্যে কেউ কেউ দিনের প্রথমাংশে মুখে মুখে ইসলাম গ্রহণ করবে ও শেষের দিকে কুফরী করবে। অতঃপর মুসলিমদের সংগে বলবে আমরা আমাদের ঐশী কিতাবসমূহ দেখেছি ও আমাদের আলিমদের সংগে আলোচনা করেছি। তাতে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর দ্বীনকে মিথ্যা পেয়েছি। এমনিভাবে আমরা করতে থাকলে মুসলিমরা সন্দেহে পড়ে যাবে এবং বলবে কিতাবধারীরা বেশী বিদ্বান। তারা মুহাম্মদের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাইতে বড় আলেম।' অতএব এইভাবে ক্রমে তারা ইসলাম ত্যাগ করে আমাদের ধর্মে (ইয়াহুদী-নাছারা) চলে আসবে।

📘 ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব 📄 নবীদের রবের আসন দেওয়া

📄 নবীদের রবের আসন দেওয়া


আল্লাহ বলেন-

'কোন মানুষের জন্য ইহা শোভন নয় যে, তাকে কিতাব, হিকমত ও নবুওয়ত দান করার পর সে লোকদেরকে বলবে যে, তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে আমার গোলাম বনে যাও। বরং সে বলবে যে, তোমরা সবাই আল্লাহওয়ালা হয়ে যাও। এজন্য যে, তোমরা লোকদেরকে কিতাব শিক্ষা দিয়ে থাকো এবং তা অধ্যয়ন করে থাকো। সে তোমাদের এ নির্দেশ ও দিবে না যে, তোমরা মালাইকা ও নবীদেরকে রব বা প্রতিপালক হিসাবে গ্রহণ করো। সে কি তোমাদেরকে মুসলিম হওয়ার পরে পুনরায় কাফির হতে বলবে'? (সূরা আলে ইমরান, ৩: ৭৯-৮০)

ইবনে ইসহাক স্বীয় সনদে বর্ণনা করেছেন যে, নাজরানবাসী ইয়াহুদী ও খৃষ্টান ধর্মনেতাগণ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে হাজির হলে তিনি তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেন। উত্তরে তারা বলল- 'হে মুহাম্মদ, তুমি কি মনে করো যে, আমরা ইবাদত করবো যেমন খৃষ্টানেরা ঈসা ইবনে মারইয়ামকে করে থাকে? উপস্থিত একজন খৃষ্টান সর্দার এ কথার পুনরুক্তি করে জিজ্ঞেস করলো- মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তুমি সত্যিই কি তাই চাও? উত্তরে নবী করিম বলেন, 'আমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় ভিক্ষা করছি গায়রুল্লাহর ইবাদত করা হতে এবং অন্যকে এ কাজের হুকুম করা হতে। আল্লাহ এজন্য আমাকে পাঠাননি এবং এজন্য তিনি আমাকে নির্দেশ দেননি'। এই সময় উপরোক্ত আয়াত নাযিল হয়।

📘 ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব 📄 আল্লাহর কিতাবের শব্দসমূহকে স্থানচ্যুত করা

📄 আল্লাহর কিতাবের শব্দসমূহকে স্থানচ্যুত করা


ইয়াহুদীদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন-

'ইয়াহুদীদের জন্য কতক লোক (তাওরাতের) কথাগুলিকে স্থানচ্যুত করে এবং বলে আমরা শুনলাম ও অমান্য করলাম, তুমিও শুনো, না শোনার মত। (সূরা আন-নিসা ৪: আয়াত ৪৬)

অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা বলেন-

'তাদের মধ্যে একদল লোক আছে যারা কিতাবকে জিহবা দ্বারা এমনভাবে বিকৃত করে পড়ে যেন তোমরা উহাকে যথার্থই আল্লাহর কিতাব বলে ধারণা করো। অথচ তা মোটেই আল্লাহর কিতাবের অংশ নয়। তারা বলে যে, তা আল্লাহর নিকট হতে, অথচ আসলে তা নয়। বরং ওরা জেনেশুনে আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা বলে'। (সূরা আলে ইমরান ৩: আয়াত ৭৮)

ইয়াহূদীরা তাদের মূল কিতাবে কোনরূপ রদবদল করেছে, নাকি নিজেদের রচিত কিতাবে রদবদল করেছে এ বিষয়ে দ্বিমত রয়েছে। এ বিষয়ে তাফসীরে রুহুল মা'আনী এবং শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ রহ. প্রণীত 'আলজাওয়াবুছ ছহীহ,' নামক গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা রযেছে।

বলাবাহুল্য, আজকাল উম্মতে মুহাম্মদীর মধ্যেও কিতাবীদের মত কুরআন ও হাদীসের নিজেদের মন মত তাহরীফ ও তাবীলের ব্যধি ঢুকে পড়েছে। আমাদের এ বিষয়ে কঠোর সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।

📘 ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব 📄 হেদায়েতপ্রাপ্ত লোকদের অভিনব উপাধিসমূহ দ্বারা অভিহিত করা

📄 হেদায়েতপ্রাপ্ত লোকদের অভিনব উপাধিসমূহ দ্বারা অভিহিত করা


জাহেলী যুগের লোকেরা তাদের মাযহাব ত্যাগকারীদেরকে 'ছাবেয়ী' বলতো। ছহীহ বুখারী, মুসলিম ও অন্যান্য হাদীসসমূহ হতে জানা যায় যে, তার নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে 'ছাবেয়ী' বলে ডাকতো। যাতে লোকেরা তাদের চিরাচরিত মাযহাব ছেড়ে চলে না যায়। বর্তমান যুগের মুসলিমদের মধ্যে আপনি এমন লোক বহু পাবেন, যাদেরকে বেদআতপন্থী হওয়ার কারণে লোকেরা ত্যাগ করেছে। অথচ উল্টা হক পন্থীদেরকেই তারা বিভিন্ন অপছন্দনীয় নামে অভিহিত করে থাকে।

ইমাম ইবনে কুতাইবা স্বীয় 'তাবীলু মুখতালাফিল হাদীস' নামক যুগান্তকারী গ্রন্থে বলেন যে, 'বিদআত পন্থীরা আহলে হাদীসদেরকে হাশবিয়া, নাবেতা, জাবরিয়া প্রভৃতি নামে অভিহিত করে। অথচ এ সবই মিথ্যা উপাধি মাত্র। এইসব নামের পশ্চাতে আল্লাহর রাসূলের কোনো সমর্থনই নাই। যেমন- তিনি নিম্নোক্ত নামসমূহ দ্বারা অভিহিত করে তাদেরকে বিভিন্নভাবে লা'নত করেছেন। যেমন- (১) কাদরিয়াদের সম্পর্কে তিনি বলেছেন- 'তারা এই উম্মতের (মুসলিম মিল্লাতের) মজুসী বা অগ্নি উপাসক। যদি ওরা পীড়িত হয় তবে সেবা করো না, যদি মারা যায় জানাযায় শরীক হয়োনা' (২) রাফেযী সম্পর্কে-শেষ যামানায় রাফেযী বলে একটি দল হবে, যারা ইসলামকে ত্যাগ করবে এবং দূরে নিক্ষেপ করবে। তোমরা ওদেরকে হত্যা করো। কেননা ওরা মুশরিক। (৩) মুর্জিয়া সম্পর্কে- 'আমার উম্মতের মধ্যে দু'টি দল হবে যারা আমার শাফায়াত পাবে না, যারা সত্তর জন নবী কর্তৃক অভিশপ্ত হয়েছে। তারা হলো মুর্জিয়া ও কাদরিয়া'। (৪) খারেজীদের সম্পর্কে- 'তারা দ্বীন থেকে বেরিয়ে যাবে'। যেমন তীর তার ধনুক থেকে বেরিয়ে যায়'। অন্য বর্ণনায় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এদেরকে 'জাহান্নামবাসীদের কুত্তা' বলেছেন।

'গুনিয়াতুত্ত্বালেবীন' নামক কিতাবে শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী রহ. বলেন যে, 'বাতেনীরা আহলে হাদীসগণকে হাশবিয়া বলে। শাহ ওয়ালীউল্লাহ রহ. স্বীয় প্রসিদ্ধ গ্রন্থ 'হুজ্জাতুল্লাহিল্লাহিল বালেগাহ' এর মধ্যে বলেন যে, এই সমস্ত অনুপ্রবেশকারীরা আহলে হাদীস জামা'আতের উপর অযথা বাড়াবাড়ি করেছে। তারা উল্টা এদেরকে মুজাসসিমা মুশাববিহা বলেছে এবং দোষারোপ করেছে এই যে, 'আহলে হাদীসরা আল্লাহর গুণাগুণের ধরণ না জানা সম্পর্কিত ছদ্ম দাবী করছে মাত্র। তাদের আসল মতবাদ আল্লাহ আকার হওয়ার পক্ষে। অথচ আমার নিকট অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, এই সব অনুপ্রবেশকারীদের এই অযথা বাড়াবাড়ির পিছনে রিওয়ায়াত ও দেরায়াত (হাদীস ও প্রজ্ঞা) কোনদিক দিয়েই কোনো যুক্তি নেই। এরা হিদায়েতের অগ্রপথিক। আহলে হাদীসগণের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে মাত্র।'

হাফেয ইবনুল কাইয়্যেম রহ. তাঁর 'নূনিয়্যাহ্' বা 'আল-কাফিয়াতুশ শাফিয়া' নামক কিতাবের মধ্যে আলাদা অধ্যায় রচনা করে বেদআতীরা যে প্রথম কুরআন ও সুন্নাহর অনুসারী সালাফী আহলে হাদীস জামাআতকে 'হাশবিয়া' প্রভৃতি নামে অভিহিত করেছে ২০ লাইন কবিতার মাধ্যমে সুন্দরভাবে তা ফুটিয়ে তুলেছেন। আহলে হাদীসগণের বিরুদ্ধে ইহা একটি বিরাট অপবাদ। যদিও এই ধরণের অপবাদ অন্যেরা দেয় না। আজকের দিনেও হকের এ শত্রু যারা, তারা পূর্ববর্তী জাহিলদের তরীকা অনুসরণ করে কুর'আন ও সুন্নাহর অনুসারী এইসব হকপন্থী লোকদেরকে বিভিন্ন খারাপ নামে অভিহিত করে থাকে।

টিকাঃ
২১. মাননীয় লেখক মূল বইতে সমস্ত কবিতা নকল করেছেন। পাঠকের ধৈর্য্যচ্যুতির ভয়ে বাদ দিলাম। (অনুবাদক)

ফন্ট সাইজ
15px
17px