📘 ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব 📄 জিবত ও তাগুতের উপর ঈমান রাখা

📄 জিবত ও তাগুতের উপর ঈমান রাখা


'জিবত' প্রতিমার নাম। পারিভাষিক অর্থে আল্লাহ ব্যতীত সকল মা'বুদকেই বুঝানো হয়। 'তাগুত' অর্থ সকল ধরণের বাতিল। চাই সে মা'বুদ হোক বা অন্য কিছু। এ দু'টির উপরে ঈমান আনার অর্থ দু'ধরনের হতে পারে। দু'টিকেই প্রকৃত অর্থে মা'বুদ বা উপাস্য বলে বিশ্বাস করা এবং আল্লাহর ইবাদতে তাদেরকে শরীক করা। দুই-উক্ত 'জিবত' ও 'তাগুত' প্রসূত সকল প্রকারের বাতিল মতাদর্শের অনুসরণ করা। তবে প্রথমোক্ত ব্যাখ্যাই অধিক সংগত। এজন্য যে, তারা আল্লাহর সংগে উক্ত দুই বস্তুকে শরীক করতো এবং সিজদা করতো।

প্রতিমা ও তাগুতের উপর ঈমান আনা এবং মুসলিমদের উপর মুশরিকদের প্রাধান্য দেওয়া জাহেলী যুগের অন্যতম রীতি ছিল। আল্লাহ ইয়াহূদীদের সম্পর্কে বলেন-

আপনি কি লক্ষ্য করেননি এসব লোকদের দিকে? যারা কিতাবের কিছু অংশ পেয়েছে (অর্থাৎ তাওরাত) তারা (আল্লাহকে মানার দাবী করা সত্ত্বেও) জিবত ও তাগুতের প্রতি ঈমান এনেছে এবং কাফিরদেরকে বলছে যে, তোমরা মুমিন-মুসলিমদের চাইতে অধিকতর সৎপথ প্রাপ্ত। (সূরা আন-নিসা, ৪: আয়াত ৫১)

উপরোক্ত আয়াতটির শানে নুযূলঃ ওহুদ যুদ্ধে বিপর্যয়ের পর পূনরায় রাসূলুল্লাহ সা. এর বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার জন্য কুরাইশদের সংগে আঁতাত করার দুরভিসন্ধি নিয়ে হুয়াই ইবন আখতাব ও কা'আব ইবন আশরাফ নামক দুই ইয়াহূদী নেতা তাদের সাঙ্গ পাঙ্গ নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি ভংগ করে মক্কাভিমুখে রওয়ানা হয় এবং কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। আবু সুফিয়ান তাদেরকে উষ্ণ অভ্যর্থনা দান করেন। সঙ্গী অন্যান্য ইয়াহুদীকে কুরাইশদের বিভিন্ন লোকের বাড়ীতে থাকার ব্যবস্থা করে। তখন মক্কাবাসীরা তাদেরকে প্রশ্ন করে যে, তোমরা কিতাবধারী, মুহাম্মদও কিতাব আনয়নকারী। অতএব তোমরা যে আমাদের সঙ্গে ধোঁকাবাজি করতে আসোনি, তা আমরা কেমন করে বুঝবো? অতএব তোমরা যদি আমাদেরকে তোমদের সংগে নিয়ে যুদ্ধে বের হতে চাও, তাহলে এই দু'টি প্রতিমার নিকট সিজদা করো এবং এদের উপর ঈমান আনো।

কা'আব তাই-ই করলো। অতঃপর সে মক্কাবাসীকে লক্ষ্য করে বলল, তোমাদের মধ্যে ত্রিশজন ও আমাদের ত্রিশজন এসে কাবাঘরের সংগে স্ব-স্ব বুক চেপে ধরে দাঁড়াবে এবং শপথ পড়বে এই বলে যে এই মহিমান্বিত গৃহের মালিকের নামে শপথ করছি যে, আমরা সকলে সর্বশক্তি নিয়ে মুহাম্মাদের বিরুদ্ধে লড়াই করবো। তার প্রস্তাব মতে সবাই তাই করলো। পরিশেষে আবু সুফিয়ান কা'আবকে বলেন যে, আপনি এমন একজন ব্যক্তি, যিনি আল্লাহর কিতাব (তাওরাত) পড়ে থাকেন এবং অন্যকে শিখিয়ে থাকেন। আমরা মুর্খ, কিছুই জানি না। আচ্ছা বলুন তো মুহাম্মাদ ও আমাদের মধ্যে কে সঠিক পথে বা সত্যের নিকটবর্তী পথে আছে? কা'আব বলে- বেশ, তাহলে আপনাদের ধর্মের ব্যাখ্যা দিন।

আবু সুফিয়ান বললেন-
আমরা আমাদের সেরা উটগুলিকে হাজীদের জন্য যবেহ করে থাকি, তাদের দুধ পান করাই, মেহমানদারী করি, কয়েদীদের মুক্ত করি, আত্মীয়তা সম্পর্ক রক্ষা করি, আমাদের প্রতিপালকের এই গৃহ (কাবাগৃহ) সংস্কার করি ও তাওয়াফ করি এবং সবশেষে আমরা পবিত্র হারামের অধিবাসী।

পক্ষান্তরে মুহাম্মদ তার বাপ-দাদার ধর্ম ত্যাগ করেছে, আত্মীয়তা সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। আমাদের দ্বীন হলো প্রাচীন ও মুহাম্মদের দ্বীন হলো নূতন। এসব শুনে কা'আব উত্তরে বলল যে, আল্লাহর কসম! তোমরাই মুহাম্মদের চেয়ে অধিকতর হেদায়াতের পথে আছো। বলাবাহুল্য, এ পরিপ্রেক্ষিতে উপরোক্ত আয়াত নাযিল হয়।

📘 ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব 📄 সত্যের উপর মিথ্যার আবরণ দেওয়া

📄 সত্যের উপর মিথ্যার আবরণ দেওয়া


আহলে কিতাব ইয়াহুদী-খৃষ্টানদের দের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন-

‘হে কিতাবধারীগণ! তোমরা সব কিছু জানা সত্বেও কেন সত্য গোপন করছো এবং তার উপর মিথ্যার আবরণ ছড়াচ্ছ? (সূরা আলে ইমরান ৩: আয়াত ৭১)

এখানে ইয়াহুদী-খৃষ্টানদেরদের সত্য গোপন করার চারটি তাৎপর্য হতে পারে। যেমন- একঃ তাওরাত ও ইঞ্জিলের মূল গ্রন্থে রদবদল। দুইঃ তারা মুখে ইসলামকে স্বীকার করে ও মুনাফেকীকে গোপন করে। তিনঃ মুসা আলাইহিস সালাম ও ঈসা আলাইহিস সালামের উপর ঈমান আনে, কিন্তু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অবিশ্বাস করে এবং চারঃ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতের সত্যতাকে মনে মনে বিশ্বাস করে, কিন্তু মুখে মিথ্যা বলে।

📘 ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব 📄 সত্যকে প্রতিরোধ করার জন্য সাময়িকভাবে তাকে স্বীকার করে নেওয়া

📄 সত্যকে প্রতিরোধ করার জন্য সাময়িকভাবে তাকে স্বীকার করে নেওয়া


নিজ মাযহাবের উপর গোড়ামী ঠিক রেখে সত্যকে প্রতিরোধ করার জন্য আহলে কিতাবগণ তাদের লোকদেরকে কিভাবে পরিচালিত করতো, তার পরিচয় মিলবে নিম্নোক্ত আয়াতে-

'কিতাবধারীদের একটি দল বলে যে, মুমিনদের উপর যা নাযিল হয়েছে অর্থাৎ কুর'আনের উপরে তোমরা দিনের বেলায় ঈমান প্রদর্শন করো এবং দিনের শেষে তা প্রত্যাখ্যান করো, হয়ত বা এতে মুমিনরা পুনরায় ফিরে আসবে। তবে (সাবধান) যারা তোমাদের দ্বীনের অনুসারী (ইয়াহূদী কিংবা খৃষ্টান) তাদেরকে ছাড়া অন্য কাউকে বিশ্বাস করবেনা'। (সূরা আলে ইমরান ৩: আয়াত ৭২-৭৩)

উক্ত আয়াতের শানে নুযুল সম্পর্কে হাসান ও সুদ্দী রহ. বলেন, খায়বরের ১২ জন ইয়াহুদী ধর্মনেতা এ বিষয়ে একমত হলেন যে, আমাদের মধ্যে কেউ কেউ দিনের প্রথমাংশে মুখে মুখে ইসলাম গ্রহণ করবে ও শেষের দিকে কুফরী করবে। অতঃপর মুসলিমদের সংগে বলবে আমরা আমাদের ঐশী কিতাবসমূহ দেখেছি ও আমাদের আলিমদের সংগে আলোচনা করেছি। তাতে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর দ্বীনকে মিথ্যা পেয়েছি। এমনিভাবে আমরা করতে থাকলে মুসলিমরা সন্দেহে পড়ে যাবে এবং বলবে কিতাবধারীরা বেশী বিদ্বান। তারা মুহাম্মদের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাইতে বড় আলেম।' অতএব এইভাবে ক্রমে তারা ইসলাম ত্যাগ করে আমাদের ধর্মে (ইয়াহুদী-নাছারা) চলে আসবে।

📘 ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব 📄 নবীদের রবের আসন দেওয়া

📄 নবীদের রবের আসন দেওয়া


আল্লাহ বলেন-

'কোন মানুষের জন্য ইহা শোভন নয় যে, তাকে কিতাব, হিকমত ও নবুওয়ত দান করার পর সে লোকদেরকে বলবে যে, তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে আমার গোলাম বনে যাও। বরং সে বলবে যে, তোমরা সবাই আল্লাহওয়ালা হয়ে যাও। এজন্য যে, তোমরা লোকদেরকে কিতাব শিক্ষা দিয়ে থাকো এবং তা অধ্যয়ন করে থাকো। সে তোমাদের এ নির্দেশ ও দিবে না যে, তোমরা মালাইকা ও নবীদেরকে রব বা প্রতিপালক হিসাবে গ্রহণ করো। সে কি তোমাদেরকে মুসলিম হওয়ার পরে পুনরায় কাফির হতে বলবে'? (সূরা আলে ইমরান, ৩: ৭৯-৮০)

ইবনে ইসহাক স্বীয় সনদে বর্ণনা করেছেন যে, নাজরানবাসী ইয়াহুদী ও খৃষ্টান ধর্মনেতাগণ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে হাজির হলে তিনি তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেন। উত্তরে তারা বলল- 'হে মুহাম্মদ, তুমি কি মনে করো যে, আমরা ইবাদত করবো যেমন খৃষ্টানেরা ঈসা ইবনে মারইয়ামকে করে থাকে? উপস্থিত একজন খৃষ্টান সর্দার এ কথার পুনরুক্তি করে জিজ্ঞেস করলো- মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তুমি সত্যিই কি তাই চাও? উত্তরে নবী করিম বলেন, 'আমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় ভিক্ষা করছি গায়রুল্লাহর ইবাদত করা হতে এবং অন্যকে এ কাজের হুকুম করা হতে। আল্লাহ এজন্য আমাকে পাঠাননি এবং এজন্য তিনি আমাকে নির্দেশ দেননি'। এই সময় উপরোক্ত আয়াত নাযিল হয়।

ফন্ট সাইজ
15px
17px