📘 ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব 📄 কেয়ামতের দিন কোনরূপ বন্ধুত্ব ও সুপারিশ কাজে লাগবে না- এই আয়াতকে মিথ্যা মনে করা

📄 কেয়ামতের দিন কোনরূপ বন্ধুত্ব ও সুপারিশ কাজে লাগবে না- এই আয়াতকে মিথ্যা মনে করা


জাহেলী যুগের লোকেরা পবিত্র কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল-

‘হে বিশ্বাসীগণ। আমি তোমাদেরকে যে রুজি দিয়েছি তা থেকে (আল্লাহর রাস্তায়) ব্যয় করো, সেই চুড়ান্ত দিন আসার পূর্বে যে দিন আপোষে কোনরূপ বেচাকেনা, বন্ধুত্ব, সুপারিশ কিছুই থাকবে না। (এই সব) সত্য অস্বীকারকারীগণই প্রকৃত যালিম বা সীমা লঙ্ঘনকারী। (সূরা আল-বাক্বারাহ ২: আয়াত ২৫৪)

'শাফাআতের ভুল অর্থ গ্রহণ করা' এ কথার অর্থ, কেউ কারো জন্য কোনরূপ সুপারিশ করতে পারবে না, কেবল সেই ব্যক্তি ছাড়া আল্লাহ খুশী হয়ে যাকে অনুমতি দেবেন। উপরোক্ত তিনটি বিশেষণের উল্লেখ করার কারণ, মানুষ সাধারণতঃ উক্ত তিন উপায়েই পরস্পরকে সাহায্য করে থাকে। এখানে ইশারা করা হয়েছে যে, কোনো প্রকারেই মানুষ মানুষের জন্য কেয়ামতের দিন কোনরূপ সুপারিশ বা সাহায্য করতে পারবে না। না আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে, না বন্ধুর সাহায্যের মাধ্যমে, না কোনো সুপারিশকারীর সুপারিশের মাধ্যমে। বরং সকল সুযোগই ঐ দিন বন্ধ থাকবে। আল্লাহ ব্যতীত সাহায্য প্রার্থনার স্থল আর কোথাও নেই।

📘 ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব 📄 শাফাআতের ভুল অর্থ গ্রহণ করা

📄 শাফাআতের ভুল অর্থ গ্রহণ করা


তারা সূরা যুখরুফের নিম্নোক্ত আয়াতকেও মিথ্যা ভেবেছিল-

'আল্লাহকে ছেড়ে তারা অন্য যাদেরকে ডাকে, তারা শাফাআতের অধিকার রাখে না। তবে হ্যাঁ, যারা মনে-প্রাণে তাওহীদের সাক্ষ্য দিয়েছে (তারা ব্যতীত) যদিও তারা একথা নিজেরাও জানে'। (সূরা আয-যুখরুফ, ৪৩: আয়াত ৮৬)

তারা যাদেরকে ডাকে, তাদের মধ্যে আছে মালাইকা, ঈসা আলাইহিস সালাম, ওযায়ের আলাইহিস সালাম এবং অন্যান্য অসংখ্য কল্পিত ব্যক্তি যাদেরকে তারা তাদের জন্য শাফাআতকারী বলে মনে করে। আজকের দিনেও আমরা দেখতে পাই, মূর্তির সামনে লোকেরা দাড়িয়ে থাকে। তাদেরকে ধিক্কার দিলে জওয়াবে বলে এদেরকে তো আমরা মাবুদ বা উপাস্য মানি না বরং শাফাআতকারী মনে করি। কবর পূজারী মুসলিম আর মূর্তি পূজারী অমুসলিম কি একই ধারণায় বিশ্বাসী নয়?

📘 ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব 📄 আল্লাহর অলীদের হত্যা করা

📄 আল্লাহর অলীদের হত্যা করা


আল্লাহর অলীদেরকে হত্যা করা এবং সমাজের ন্যায় বিচারক লোকদেরকে হত্যা করা জাহেলী যুগের অন্যতম বদ-স্বভাব ছিল। আল্লাহ ইয়াহুদীদের সম্বন্ধে বলেন-

'তাদের উপর লাঞ্ছনা, দারিদ্র্য অর্পিত হলো, বরং তারা আল্লাহর ক্রোধের শিকার হলো। এটা এজন্য যে, তারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করতো এবং নবীদেরকে অন্যায়ভাবে হত্যা করতো। নিরন্তর অবাধ্যতা ও সীমা লংঘনের জন্যই তাদের এই পরিণতি বরণ করতে হলো'। (সূরা আল-বাক্বারাহ ২: আয়াত ৬১)

এমনিভাবে আরও বহু আয়াত রয়েছে যেখানে বর্ণনা করা হয়েছে অবিশ্বাসী, জাহেল ও সীমা লংঘনকারীদের হাতে নবী রাসূল ও তাদের একনিষ্ঠ অনুসারী ও হক্কের দিকে আহবানকারীদেরকে কিভাবে কত রকমের লাঞ্ছনা পোহাতে হয়েছে। উম্মতে মুহাম্মদীর শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিগণ, তাদের মর্যাদাবান আলেমগণ মানুষকে হকের দাওয়াত দিতে গিয়ে এত বেশী দুঃখ-কষ্টের সম্মুখীন হয়েছেন যে, ইতিহাসের পাতা মসীলিপ্ত হয়ে গেছে। তবে সান্ত্বনা এই যে, আম্বিয়ায়ে কিরাম ও তাঁদের অনুসারী মু'মিনগণ যদিও প্রথম অবস্থায় দুঃখ বরণ করেছেন, কিন্তু শুভ পরিণতি তাঁদের জন্যই।

যেমন আল্লাহ বলেন-
'এ সবকিছু গায়েবের খবর আমি তোমার নিকট অহী পাঠিয়েছি, ইতোপূর্বে তুমি বা তোমার কওমের কেউ তা জানতো না। তুমি ধৈর্য্য ধারণ করতে থাকো। কেননা অবশ্যই শেষ পরিণতি মুত্তাকীদের জন্যই।' (সূরা হুদ ১১: আয়াত ৪৯)

ছহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদীসে রয়েছে যে, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোম সম্রাটের দরবারে তাঁর দূত পাঠালেন তখন রোম সম্রাট রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চরিত্র জানার জন্য তাঁর দুশমন মুশরিকদের তলব করলেন। জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের ও তাঁর মধ্যে যুদ্ধের অবস্থা কি? তারা উত্তরে বলল, অবস্থা পরিবর্তনশীল। হার জিত দু'পক্ষেই হয়ে থাকে। রোম সম্রাট (হিরাক্লিয়াস) বললেন, রাসূলদের অবস্থাই এরকম। তবে শেষ পরিণতি তাদের জন্যই। যেমন বদরের দিন আল্লাহ মুসলিমদের সাহায্য করলেন। কিন্তু ওহুদের দিন তাদেরকে পরীক্ষায় ফেললেন। এরপর ইসলাম সম্পূর্ণরূপে বিজয় লাভ না করা পর্যন্ত মুসলিমরা কখনোই পরাজিত হয়নি।

যদি বলা হয় যে, বনী ঈস্রাইলের নবীগণ তাঁদের কওমের হাতে অন্যায়ভাবে নিহত হয়েছেন, সেকথা পূর্ববর্তী আয়াতসমূহে আল্লাহ বিবৃত করেছেন। কিংবা ধার্মিক লোকদের উপর আল্লাহ দুষ্ট লোকদেরকে রাজনৈতিক ক্ষমতা দান করে থাকেন। যেমন- 'বখত নছর' বনী ইস্রাইলদের উপর শাসন ক্ষমতার অধিকারী হয়েছিল। যেমন কাফির মুশরিকগণ এবং ইয়াহুদী-খৃষ্টানগণ কখনও কখনও মুসলিমদের উপর বিজয় লাভ করে থাকে। উপরে বলা হয়েছে যে, নিহত নবীগণ জিহাদে শহীদ মু'মিনদের মতই। যেমন আল্লাহ বলেন-

“এমন কত নবী যুদ্ধ করেছেন, যাঁদের সংগে বহু আল্লাহওয়ালা ছিলেন। আল্লাহর পথে তাদের কত বিপর্যয় ঘটেছে কিন্তু তাঁরা হীনবল হননি, দুর্বল হননি, কিংবা নত হননি। আল্লাহ ধৈর্য্যশীল ব্যক্তিদেরকেই ভালবাসেন। তাদের মুখে কোনো কথা ছিল না কেবল মাত্র একটি দোয়া ছাড়া, প্রভু হে! আমাদের গুনাহ গুলো এবং বাড়াবাড়িসমূহকে তুমি ক্ষমা করো। আমাদের পদ যুগল সুদৃঢ় রাখো এবং সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের উপর তুমি আমাদিগকে সাহায্য করো। অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে ইহকালীন ও পরকালীন পুরস্কার দান করেন। আল্লাহ সৎকর্মশীলদেরকে ভালবাসেন।” (সূরা আলে ইমরান ৩: আয়াত ১৪৬-১৪৮)

আর এটাতো জানা কথা যে, মুসলিমদের মধ্যে যাদের শাহাদাত বরণের সৌভাগ্য হয়েছে সাধারণভাবে মৃত্যু বরণকারীদের চেয়ে তারা অনেক মর্যাদার অধিকারী। যেমন আল্লাহ বলেন-
'যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদেরকে মৃত মনে করো না। বরং তারা তাদের প্রতিপালকের দৃষ্টিতে জীবিত ও জীবিকাপ্রাপ্ত’। (সূরা আলে ইমরান, ৩: আয়াত ১৬৯)

মুমিনদের প্রতি অবিশ্বাসীদের আচরণ বর্ণনা করতে গিয়ে অন্যত্র আল্লাহ বলেন-
(হে রাসূল) “আপনি (ওদেরকে) বলে দিন যে, তোমরা আমাদের জন্য শাহাদাত অথবা বিজয় দু'টির যে কোনো একটির জন্য অপেক্ষা করছো। আর আমরা অপেক্ষা করছি যে, আল্লাহ সরাসরি নিজের পক্ষ থেকে তোমাদেরকে শান্তি দেবেন, নাকি আমাদের হাত দিয়ে? অতএব তোমরা প্রতীক্ষা করো, আমরাও তোমাদের সংগে প্রতীক্ষায় রইলাম।” (সূরা আত-তাওবা ৯: আয়াত ৫২)

অতঃপর যে দ্বীনের জন্য শহীদগণ রক্ত দিলেন, সেই দ্বীন বিজয়ী হলো, যা মু'মিনদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে সৌভাগ্য বহন করে আনলো। এটাই হলো আল্লাহর পক্ষ হতে সাহায্যের প্রকৃত তাৎপর্য। মোটকথা, মৃত্যু যখন হবেই, তখন এমন মৃত্যুবরণ করা উচিত, যার দ্বারা দুনিয়া ও আখিরাতে সৌভাগ্যশালী হওয়া যায়। এমন মৃত্যু নিশ্চয়ই কারো কামনা করা উচিৎ নয়, যার দ্বারা না দুনিয়াতে কোনো স্থায়ী কল্যাণ লাভ হয়, না আখিরাতে কামিয়াবী হাছিল করা যায়। মুমিনদের মধ্যে যাঁরা শাহাদাত লাভে ধন্য হয়েছেন, তাঁরা ন্যায় কাজের নির্দেশ ও অন্যায় কাজের নিষেধকে জীবনের ব্রত হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। তাঁরা শাহাদাতকে কামনা করেছিলেন দুনিয়া ও আখিরাতে সৌভাগ্য লাভের জন্য। পক্ষান্তরে কাফিরদের মধ্যে যারা নিহত হয়, তারা নিজেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিহত হয়। তারা এর দ্বারা নিজেদের বা নিজেদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে কোনো কল্যাণ বা সৌভাগ্য কামনা করে না, বরং দুনিয়াতে সকলের অভিশাপগ্রস্ত এবং আখিরাতে নিন্দিতদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে।

এদের সম্পর্কেই আল্লাহ বলেন-
'এরা ছেড়ে গেছে দুনিয়াতে কতো না বাগ-বাগিচা, নির্ঝরিণী, কৃষিক্ষেতসমূহ, সুরম্য গৃহসমূহ এবং অসংখ্য নেয়াতম - যার মধ্যে তারা আনন্দে বিভোর ছিল। তাঁদের পরবর্তী লোকদের অবস্থাও এমন ছিল। আসমান ও জমিনের কেউ তাদের জন্য সামান্য চোখের পানিও ফেলেনি এবং (মৃত্যু ঘন্টা বাজার পর) তাদেরকে কোনরূপ ফুরসতও দেওয়া হয়নি'। (সূরা আদ-দুখান, ৪৪: আয়াত ২৫-২৯)

pবিত্র কুরআনেই সাক্ষ্য রয়েছে যে, বহু নবী ইতোপূর্বে নিহত হয়েছেন। সংগে নিহত হয়েছিলেন তাঁদের অসংখ্য আল্লাহভীরু অনুসারী। কিন্তু কোনরূপ দুর্বলতা ও হীনতা তাদেরকে স্পর্শ করতে পারেনি এবং শত্রুপক্ষের জয়লাভের কারণ হিসাবে নিজেদের ত্রুটিসমূহকে দায়ী করে তারা আল্লাহর নিকট ক্ষমা ভিক্ষা চেয়েছিলেন। আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে উত্তম পুরস্কার দ্বারা বিভূষিত করেছিলেন। সাধারণ মুমিনদের ঈমানী অবস্থা যখন এই ছিল তখন নবীগণের অবস্থা এর চাইতে কত উচ্চ মানের ছিল, সহজেই তা অনুমেয়।

মুসলিমদের উপর কাফিরদের যেসব সাময়িক বিজয় ঘটেছে, তার কারণ ছিল মুসলিমদের অন্যায় আচরণ। যেমন ওহুদের যুদ্ধে ঘটেছিল। যদি তারা তাওবা করে তাহলে কাফিরদের উপর বিজয় লাভ করে, যেমন অন্যান্য সমস্ত যুদ্ধসমূহে ঘটেছে। এটা নবুওতের নিদর্শন। মোদ্দাকথা, আল্লাহর পক্ষ হতে সাহায্য বিজয় লাভের মূল কথা হলো রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ বা ইত্তেবা। কেননা আল্লাহ চান তাঁর কালেমাকে বুলন্দ করতে এবং তিনি চান তাঁর বিজয়ীদের উপর রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুসারীদের বিজয় দান করতে। বনি ইসরাইলদের উপরে বখত নছরের বিজয়ের মূল কারণ ছিল এটাই যে, বনী ইসরাইলগণ মূছা আলাইহিস সালাম অনুসরণ ছেড়ে দিয়েছিল। অতএব তার শাস্তিস্বরূপ তাদের এই পরাজয় বরণ করতে হয়েছে। যদি তারা মূসা আলাইহিস সালামের অনুসরণে অটল থাকতো, তাহলে তারা অবশ্যই আল্লাহর সাহায্য পেত, যেমন- দাউদ ও সুলায়মান আলাইহিস সালামের সময়ে তারা পেয়েছিলেন।

সুরা আল-ইসরা ৪-৮ আয়াতে উক্ত বিষয়ে আল্লাহ বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন। মোটকথা, শত্রুপক্ষের, উপর বনী ঈস্রাইলদের বিজয় ও কখনো বণী ঈস্রাইলদের উপর শত্রুপক্ষের বিজয়, মূসা আলাইহিস সালামের নবুওতের নিদর্শন। যেমন মুসলিমদের ইতিহাসে অনুরূপ ঘটনা শেষ নবীর নবুওতের সত্যতার নিদর্শন। বিজয়ীদের উপর বিজয় লাভের এই ধারা মূসা আলাইহিস সালামের জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পরে ও ঈসা আলাইহিস সালাম প্রমুখের সময়ে যেমন চালু ছিল, আমাদের নবীর জীবদ্দশায় ও তাঁর মৃত্যুর পরে খুলাফায়ে রাশেদীনের আমলেও তেমনি চালু ছিল।

পক্ষান্তরে মু'মিনদের বিরুদ্ধে কাফিরদের মাঝে বিজয় লাভের দ্বারা মূলতঃ এটাই বলতে চায় যে, আমরা তোমাদের উপর জয়লাভ করেছি তোমাদের পাপের কারণে। নইলে তোমরা যদি তোমাদের দ্বীনের যথার্থ অনুসারী হতে তাহলে কখনোই আমরা জয়ী হতে পারতাম না। বলাবাহুল্য, জয়লাভ সত্বেও শুভ পরিণতি তাদের জন্য নয়। বরং আল্লাহ যালিমকে যালিম দ্বারাই ধ্বংস করে থাকেন। এমনি করে একদিন সমস্ত যালিমই ধ্বংস হয়ে যাবে। উপরন্তু এই নিহত যালিমরা মৃত্যুর পরে কিছুই সৌভাগ্য কামনা করতে পারে না। কতই না করুণ এদের অবস্থা। অতএব ইয়াহুদী খৃষ্টানদেরদের উপর মুসলিমদের বিজয় ইতোপূর্বে তাদের উপর বখত নছরের বিজয়ের মত নয়। যেমন- আহলে কিতাবদের অনেকে বলে থাকে যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর অনুসারীরা আমাদের উপর জয়লাভ করেছে আমাদের পাপের কারণে। আসলে আমাদের দ্বীন অত্যন্ত সঠিক ও নির্ভেজাল।

ইহা মূলতঃ একটি বাজে ধারণা। কেননা বখত নছর নবুওতের দাবী করেনি। সে ধর্মের জন্য যুদ্ধ করেনি। সে ইয়াহুদীদেরকে মুসা আলাইহিস সালামের ধর্ম ত্যাগ করে তার ধর্মে আসতে বলেনি। বরং তার এই হামলা ছিল লুটেরা ও ডাকাতের হামলার ন্যায়। এটা কখনোই সেই মহানবীর জয়লাভের মত নয়, যিনি নবুওতের দাবী করেছেন। মানুষকে সেই দাবী মেনে নেবার আহবান জানিয়েছেন। তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতের মঙ্গলের পথ বাতলে দিয়েছেন। সুসংবাদ ও জাহান্নামের ভয় দেখিয়েছেন। অতঃপর আল্লাহ তাকে সাহায্য করেছেন এবং দ্বীন বিজয় লাভ করেছে। সংগে সংগে তাঁর বিরোধীরা পর্যুদস্ত হয়েছে।

মোটকথা, অবিশ্বাসীদের উপর বিশ্বাসীদের বিজয় চিরন্তন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন-
'যদি অবিশ্বাসীরা তোমাদের সংগে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়, তাহলে অবশ্যই তারা পিছু হটবে। অতঃপর তারা কোনো বন্ধু বা সাহায্যকারী কিছুই পাবে না। আল্লাহর এই নির্ধারিত নিয়ম বিগত দিন থেকে চলে আসছে। তুমি কখনোই এই নিয়মের ব্যতিক্রম দেখবে না।' (সূরা আল-ফাতাহ্ ৪৮: আয়াত ২২-২৩)

কিন্তু উপরোক্ত বিজয় লাভের জন্য আবশ্যিক পূর্বশর্ত হলো ঈমান সঠিক হওয়া, যা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য ব্যতীত সম্ভব নয়। যখন বিভিন্ন পাপের কারণে ঈমান ত্রুটিপূর্ণ হবে তখন তার প্রতিফলও তেমনি হবে। যেমন- উহুদের যুদ্ধে হয়েছিল। আবু হোরায়রা রা. হতে ছহীহ হাদীছে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন যে, আল্লাহ যালিমদেরকেই ঢিল দিয়ে থাকেন। তারপর যখন ধরেন আর কোনো মতেই রেহাই দেন না। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
'কোন যালিম জনপদকে যখন আল্লাহ তা'আলা পাকড়াও করেন, তখন এমনিভাবেই পাকড়াও করে থাকেন। নিশ্চয়ই তাঁর পাকড়াও অত্যন্ত কঠিন মর্মন্তুদ'। (সূরা হুদ ১১: আয়াত ১০২)

অতএব মিথ্যাবাদী কদাচারী যারা, তাদের ধন-দৌলত যতই বেশী থাকুক না কেন, তাদের সব কিছুই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। সমাজে বেঁচে থাকবে কেবল তাদের বদনাম ও নিন্দাবাদ। এরা যেমন তাড়াতাড়ি উঠে, তেমনি তাড়াতাড়ি এদের পতন হয়। যেমন- (মিথ্যা নবীর দাবীদার) আসওয়াদ আনাসী, মুসায়লামা কাযযাব, হারেছ দামেস্কী, বাবক খরমী প্রমুখ।

পক্ষান্তরে নবীগণের জীবনে বহু বিপদ-মুসীবত এসেছে শুধুমাত্র তাদেরকে পরীক্ষা করবার জন্য। কেননা আল্লাহ পরীক্ষার মাধ্যমেই তাঁর বান্দাদেরকে মযবুত ও খাঁটি করে দেন এবং চারা গাছের মত ক্রমেই তাঁর ঈমানকে বিকশিত করে দেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
“মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর সহচরগণ অবিশ্বাসীদের উপর কঠোর, কিন্তু নিজেরা পরস্পরে সহানুভুতিশীল। তুমি তাদেরকে আল্লাহর করুণা ও সন্তুষ্টি লাভের জন্য (প্রায়ই) রুকু-সিজদায় রত দেখবে। তাদের চেহারায় সিজদার চিহ্ন দেখতে পাবে। তাওরাতে তাদের বর্ণনা এরূপ এবং ইঞ্জিলে তাদের করা এরূপ দেয়া হয়েছে, যেমন- একটি চারাগাছ, প্রথমে তার অঙ্কুরোদগম হয়, তারপর ক্রমে তা শক্তি সঞ্চয় করে ও শক্ত হয় এবং এক সময় নিজ পায়ে দাঁড়াতে সক্ষম হয়। চাষী এতে অত্যন্ত খুশী হয় যাতে আল্লাহ তাদের দ্বারা কাফিরদের অন্তর্জালা সৃষ্টি করেন। আল্লাহ তা'আলা ঈমানদার ও সৎকর্মশীলদের জন্য ক্ষমা ও উত্তম পুরস্কারের ওয়াদা করেছেন'। (সূরা আল-ফাতহ, ৪৮: আয়াত ২৯)

উপরোক্ত উদাহরণ এজন্য যে, নবীদের অনুসারী প্রথম দিকে তারাই হয়ে থাকে যারা সমাজের দুর্বল শ্রেণী। পরে ক্রমে তারা শক্তি সঞ্চয় করে থাকেন ও বিজয় লাভে ধন্য হন। অন্য আয়াতে আল্লাহ মুমিনদের লক্ষ্য করে বলেন-
'তোমরা কি এত সহজেই জান্নাতে যাবে বলে ভেবে নিয়েছো? অথচ তোমাদের পূর্ববর্তীদের মত কঠিন দুঃখ-কষ্ট-ক্লেশ ও ভূমিকম্প সদৃশ বিপদাপদসমূহের কিছুই তোমাদের কাছে আসেনি? যার ফলে রাসুল ও তাঁর সংগীরা বলতে বাধ্য হয়েছিলেন 'কখন আল্লাহর সাহায্য আসবে'। জেনে রাখো, আল্লাহ সাহায্য অতীব নিকটবর্তী’। (সূরা আল-বাক্বারাহ ২: আয়াত ২১৪)

উপরের বিস্তারিত আলোচনায় একথা প্রমাণিত হলো যে, হকপন্থী ও তাদের সাহায্যকারীদের যুলুম করা জাহেলী যুগের রীতি, যা এ যুগেও চলছে।

📘 ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব 📄 জিবত ও তাগুতের উপর ঈমান রাখা

📄 জিবত ও তাগুতের উপর ঈমান রাখা


'জিবত' প্রতিমার নাম। পারিভাষিক অর্থে আল্লাহ ব্যতীত সকল মা'বুদকেই বুঝানো হয়। 'তাগুত' অর্থ সকল ধরণের বাতিল। চাই সে মা'বুদ হোক বা অন্য কিছু। এ দু'টির উপরে ঈমান আনার অর্থ দু'ধরনের হতে পারে। দু'টিকেই প্রকৃত অর্থে মা'বুদ বা উপাস্য বলে বিশ্বাস করা এবং আল্লাহর ইবাদতে তাদেরকে শরীক করা। দুই-উক্ত 'জিবত' ও 'তাগুত' প্রসূত সকল প্রকারের বাতিল মতাদর্শের অনুসরণ করা। তবে প্রথমোক্ত ব্যাখ্যাই অধিক সংগত। এজন্য যে, তারা আল্লাহর সংগে উক্ত দুই বস্তুকে শরীক করতো এবং সিজদা করতো।

প্রতিমা ও তাগুতের উপর ঈমান আনা এবং মুসলিমদের উপর মুশরিকদের প্রাধান্য দেওয়া জাহেলী যুগের অন্যতম রীতি ছিল। আল্লাহ ইয়াহূদীদের সম্পর্কে বলেন-

আপনি কি লক্ষ্য করেননি এসব লোকদের দিকে? যারা কিতাবের কিছু অংশ পেয়েছে (অর্থাৎ তাওরাত) তারা (আল্লাহকে মানার দাবী করা সত্ত্বেও) জিবত ও তাগুতের প্রতি ঈমান এনেছে এবং কাফিরদেরকে বলছে যে, তোমরা মুমিন-মুসলিমদের চাইতে অধিকতর সৎপথ প্রাপ্ত। (সূরা আন-নিসা, ৪: আয়াত ৫১)

উপরোক্ত আয়াতটির শানে নুযূলঃ ওহুদ যুদ্ধে বিপর্যয়ের পর পূনরায় রাসূলুল্লাহ সা. এর বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার জন্য কুরাইশদের সংগে আঁতাত করার দুরভিসন্ধি নিয়ে হুয়াই ইবন আখতাব ও কা'আব ইবন আশরাফ নামক দুই ইয়াহূদী নেতা তাদের সাঙ্গ পাঙ্গ নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি ভংগ করে মক্কাভিমুখে রওয়ানা হয় এবং কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। আবু সুফিয়ান তাদেরকে উষ্ণ অভ্যর্থনা দান করেন। সঙ্গী অন্যান্য ইয়াহুদীকে কুরাইশদের বিভিন্ন লোকের বাড়ীতে থাকার ব্যবস্থা করে। তখন মক্কাবাসীরা তাদেরকে প্রশ্ন করে যে, তোমরা কিতাবধারী, মুহাম্মদও কিতাব আনয়নকারী। অতএব তোমরা যে আমাদের সঙ্গে ধোঁকাবাজি করতে আসোনি, তা আমরা কেমন করে বুঝবো? অতএব তোমরা যদি আমাদেরকে তোমদের সংগে নিয়ে যুদ্ধে বের হতে চাও, তাহলে এই দু'টি প্রতিমার নিকট সিজদা করো এবং এদের উপর ঈমান আনো।

কা'আব তাই-ই করলো। অতঃপর সে মক্কাবাসীকে লক্ষ্য করে বলল, তোমাদের মধ্যে ত্রিশজন ও আমাদের ত্রিশজন এসে কাবাঘরের সংগে স্ব-স্ব বুক চেপে ধরে দাঁড়াবে এবং শপথ পড়বে এই বলে যে এই মহিমান্বিত গৃহের মালিকের নামে শপথ করছি যে, আমরা সকলে সর্বশক্তি নিয়ে মুহাম্মাদের বিরুদ্ধে লড়াই করবো। তার প্রস্তাব মতে সবাই তাই করলো। পরিশেষে আবু সুফিয়ান কা'আবকে বলেন যে, আপনি এমন একজন ব্যক্তি, যিনি আল্লাহর কিতাব (তাওরাত) পড়ে থাকেন এবং অন্যকে শিখিয়ে থাকেন। আমরা মুর্খ, কিছুই জানি না। আচ্ছা বলুন তো মুহাম্মাদ ও আমাদের মধ্যে কে সঠিক পথে বা সত্যের নিকটবর্তী পথে আছে? কা'আব বলে- বেশ, তাহলে আপনাদের ধর্মের ব্যাখ্যা দিন।

আবু সুফিয়ান বললেন-
আমরা আমাদের সেরা উটগুলিকে হাজীদের জন্য যবেহ করে থাকি, তাদের দুধ পান করাই, মেহমানদারী করি, কয়েদীদের মুক্ত করি, আত্মীয়তা সম্পর্ক রক্ষা করি, আমাদের প্রতিপালকের এই গৃহ (কাবাগৃহ) সংস্কার করি ও তাওয়াফ করি এবং সবশেষে আমরা পবিত্র হারামের অধিবাসী।

পক্ষান্তরে মুহাম্মদ তার বাপ-দাদার ধর্ম ত্যাগ করেছে, আত্মীয়তা সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। আমাদের দ্বীন হলো প্রাচীন ও মুহাম্মদের দ্বীন হলো নূতন। এসব শুনে কা'আব উত্তরে বলল যে, আল্লাহর কসম! তোমরাই মুহাম্মদের চেয়ে অধিকতর হেদায়াতের পথে আছো। বলাবাহুল্য, এ পরিপ্রেক্ষিতে উপরোক্ত আয়াত নাযিল হয়।

ফন্ট সাইজ
15px
17px