📄 দ্বীনের ব্যাপারে না জেনেশুনে কথা বলা
জাহেলী যুগের আরবরা এবং ইয়াহুদী-খৃষ্টানরা দ্বীনের নামে এমন বহু কিছু চালু করেছিল যা করবার হুকুম আল্লাহ তাদেরকে দেননি। আরবদের অধিকাংশই ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম ও ইসমাঈল আলাইহিস সালামের দ্বীনের অনুসারী ছিল। কিন্তু তাদের মধ্যে আমর ইবন লুহাই (খুযা'ঈ) নামক এক ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটলো। সে দ্বীনে ইব্রাহীমের মধ্যে বহু পরিবর্তন ঘটালো। অনেক রকমের বেদআত চালু করলো এবং লোকদেরকে মূর্তি পূজায় প্ররোচিত করলো। এতদ্ব্যতীত উটের কান কেটে ছেড়ে দেওয়া, আরোহনের অযোগ্য ঘোষণা করে ষাড় ছেড়ে দেওয়া, ভাগ্যের তীর বন্টন করা প্রভৃতি অন্যান্য 'বেশরা' কাজে তাদেরকে লিপ্ত করালো। সূরা আন'আমে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে।
অতঃপর জাহেলী ইয়াহুদী ও খৃষ্টানরা তাদের পীর পুরোহিতগণকে এবং ঈসা আলাইহিস সালামকে প্রভূর আসনে বসিয়েছিল। এইসব সাধু সন্যাসীগণ রকমারী বেদআতসমূহ চালু করেছিল। ইচ্ছামত হালাল-হারাম নির্ধারণ করেছিল। লোকেরা তাদের ফতওয়া গ্রহণ করলো এবং এ সবের অনুসরণ করতে লাগলো। যদিও দ্বীন সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর অহীর উপর নির্ভরশীল। তা কখনোই লোকদের ব্যক্তিগত খেয়াল-খুশীর অনুসারী হতে পারে না। অতএব প্রত্যেক বস্তু যার উপর কিতাব ও সুন্নাতের কোনো দলীল নেই, সেটা তার প্রচলন ও অনুসরণকারীর দিকেই প্রত্যাবর্তিত হবে। ইয়াহুদীদের এই বদ-স্বভাবের নিন্দা করে আল্লাহ বলেন-
'তাদের মধ্যে একদল লোক আছে যারা (নিজেদের লিখিত) কিতাবকে জিহবা দ্বারা বিকৃত ভাবে পাঠ করে, যাতে তোমরা (তাকে) আল্লাহর কিতাব বলে মনে করো। কিন্তু আসলে তা (আল্লাহর) কিতাবের অংশ নয়। তারা বলে যে, তা আল্লাহর নিকট হতে। অথচ তা আল্লাহর পক্ষ হতে প্রেরিত নয়। তারা জেনে শুনে আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা বলে।” (সূরা আলে ইমরান ৩: আয়াত ৭৮)
যে ব্যক্তি কিতাব ও সুন্নাতের দলীলসমূহকে নিজেদের চাহিদা ও খেয়াল খুশীর পক্ষে ব্যাখ্যা দানে প্রবৃত্ত হয়, সে ব্যক্তি অবশ্যই উপরোক্ত আয়াতের মর্ম অনুযায়ী জিহবা বিকৃতকারীদের দলভুক্ত হবে। জ্ঞানী পাঠকদের অবশ্যই জানা আছে, যে বর্তমান যুগে রচিত ধর্মীয় পুস্তকাদির মধ্যে এই ধরণের অসংখ্য মাসায়েল স্থান লাভ করেছে, শরীয়তের যার কোনো ভিত্তি নেই। বাতিলের ব্যাপক হামলা ও হকের অস্পষ্টতা হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাই।
📄 কেয়ামতকে অস্বীকার করা
তারা পরকালকে অস্বীকার করতো এবং পরকালে আল্লাহর সঙ্গে দীদার, সকলের পুনর্জীবন লাভ ও জান্নাত-জাহান্নাম সম্পর্কে নবীদের বর্ণিত বিবরণসমূহকে তারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করতো। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন-
(হে নবী) "আপনি বলুন যে, আমি কি তোমাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের সম্পর্কে বলবো যারা তাদের সারা জীবনের প্রচেষ্টাকে বরবাদ করেছে? অথচ ধারণা করে নিয়েছে যে, তারা খুবই নেকীর কাজ করেছে। ঐসব লোকেরা আল্লাহর আয়াতসমূহ ও তাঁর সহিত দীদারকে অস্বীকার করেছে। তাদের কর্মসমূহ নিষ্ফল হয়ে গেছে। কেয়ামতে তাদের জন্য কোনো ওযন করব না।" (সূরা কাহাফ, ১৮: আয়াত ১০৪-১০৫)
অন্যত্র আল্লাহ বলেন-
“লোকেরা আল্লাহর নামে শপথ করে বলে যে, আল্লাহ কখনোই মৃত ব্যক্তির পুনরুত্থান ঘটাবেন না। হ্যাঁ, আল্লাহর ওয়াদাই যথার্থ। কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না। যারা উক্ত বিষয়ে মতবিরোধ করে তাদেরকে চাক্ষুস দেখিয়ে দেয়ার জন্য এবং কাফিরগণই যে মিথ্যাবাদী সে কথা জানিয়ে দেওয়ার জন্যই (আমি এটা ঘটাবো)। (সূরা আন-নাহল, ১৬: আয়াত ৩৮-৩৯)
বর্তমানে এই ধরণের জাহেলী আক্বীদার লোকের মোটেই অভাব নেই।
📄 আল্লাহ বিচার দিবসের মালিক এই আয়াতকে মিথ্যা মনে করা
তারা আল্লাহকে বিচার দিবসের মালিক হিসাবে বিশ্বাস করতো না বরং ‘মালিক ইয়াওমিদ্দীন’ এই আয়াতকে তারা মিথ্যা মনে করতো। এটা সেই মহা বিচারের দিন, যে দিন আল্লাহ প্রতিটি বান্দাকে তার ভাল কাজসমূহের পুরস্কার ও মন্দ কাজসমূহের বদলা দিবেন। বর্তমান যুগে শুধু বিচারকেই নয়, বরং খোদ কেয়ামত দিবস ও জান্নাত-জাহান্নামকেই লোকে অস্বীকার করতে শুরু করেছে।
📄 কেয়ামতের দিন কোনরূপ বন্ধুত্ব ও সুপারিশ কাজে লাগবে না- এই আয়াতকে মিথ্যা মনে করা
জাহেলী যুগের লোকেরা পবিত্র কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল-
‘হে বিশ্বাসীগণ। আমি তোমাদেরকে যে রুজি দিয়েছি তা থেকে (আল্লাহর রাস্তায়) ব্যয় করো, সেই চুড়ান্ত দিন আসার পূর্বে যে দিন আপোষে কোনরূপ বেচাকেনা, বন্ধুত্ব, সুপারিশ কিছুই থাকবে না। (এই সব) সত্য অস্বীকারকারীগণই প্রকৃত যালিম বা সীমা লঙ্ঘনকারী। (সূরা আল-বাক্বারাহ ২: আয়াত ২৫৪)
'শাফাআতের ভুল অর্থ গ্রহণ করা' এ কথার অর্থ, কেউ কারো জন্য কোনরূপ সুপারিশ করতে পারবে না, কেবল সেই ব্যক্তি ছাড়া আল্লাহ খুশী হয়ে যাকে অনুমতি দেবেন। উপরোক্ত তিনটি বিশেষণের উল্লেখ করার কারণ, মানুষ সাধারণতঃ উক্ত তিন উপায়েই পরস্পরকে সাহায্য করে থাকে। এখানে ইশারা করা হয়েছে যে, কোনো প্রকারেই মানুষ মানুষের জন্য কেয়ামতের দিন কোনরূপ সুপারিশ বা সাহায্য করতে পারবে না। না আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে, না বন্ধুর সাহায্যের মাধ্যমে, না কোনো সুপারিশকারীর সুপারিশের মাধ্যমে। বরং সকল সুযোগই ঐ দিন বন্ধ থাকবে। আল্লাহ ব্যতীত সাহায্য প্রার্থনার স্থল আর কোথাও নেই।