📄 আল্লাহর পরিকল্পনাকে ত্রুটিপূর্ণ মনে করা
জাহেলী যুগের লোকেরা আল্লাহর সৃষ্টি-পরিকল্পনা ও তাঁর আদেশ নিষেধাবলীর মধ্যে কোনো হিকমত বা দূরদর্শিতা নেই বলে মনে করতো। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে তাদের এই অবস্থা বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন-
'আসমান-যমীন ও তন্মধ্যস্থিত কোনো কিছুকেই আমি নিষ্ফল সৃষ্টি করি নাই। যদিও অবিশ্বাসীদের ধারণা তাই। যারা কুফরী করে তাদের জন্য ধ্বংস, ওরা জাহান্নামী'। (সূরা ছাদ, ৩৮: আয়াত ২৭)
অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা বলেন-
'আমি আসমান যমীন ও তন্মধ্যস্থিত কোনো বস্তুকে খেলাচ্ছলে সৃষ্টি করি নাই। আমি যথার্থ কারণেই এগুলিকে সৃষ্টি করেছি। কিন্তু ওদের অধিকাংশই তা জানে না'। (সূরা আদ-দুখান, ৪৪: আয়াত ৩৮-৩৯)
এতদ্ব্যতীত আরও বহু আয়াত রয়েছে যেখানে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা কোনো বস্তুকেই বিনা হিকমতে ও বিনা কারণে সৃষ্টি করেনি। অথচ জাহেলী যুগের বাতিল পন্থীদের ধারণা ছিল তাই এবং এ যুগে এরূপ ধারণা অনেকেই করে থাকে। বিষয়টি দীর্ঘ আলোচনাসাপেক্ষ। মুসলিমদের মধ্যে অনেকগুলি ফিরকা এ নিয়ে আপোষে বহু ঝগড়া করেছে। তবে সত্য পথ সেটাই যার উপর উম্মতের প্রথম যুগের মনীষীগণ বা সালাফে ছালেহীনগণ প্রতিষ্ঠিত ছিলেন, যাঁরা আল্লাহর প্রতিটি কার্যে হিকমত ও কারণে বিশ্বাসী ছিলেন। হাফেজ ইবনুল কাইয়্যেম রহ. তাঁর 'শফাউল আলীল ফিল কাদা ওয়াল কাদরি ওয়াল হিকমাতি ওয়াত তালীল' নামক গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন। সেখানে তিনি আল্লাহর প্রতিটি সৃষ্টি ও আদেশ- নিষেধের পিছনে যে হিকমত, কল্যাণ ও ফলাফলসমূহ নিহিত রয়েছে, বিভিন্ন অধ্যায় রচনার মাধ্যমে তা সবিস্তারে আলোচনা করেছেন।
মুসলিমদের মধ্যে ঐ সমস্ত মাযহাবসমূহের মতে আল্লাহর সৃষ্টি ও হুকুমের মধ্যে বান্দার জন্য কোনরূপ দয়া, কল্যাণ বা হিকমত নেই। তাদের ধারণামতে নিষ্পাপ ব্যক্তিকেও আল্লাহ শাস্তি দিতে পারেন এবং পাপিষ্ঠ ব্যক্তিকে তিনি সওয়াব দান করতে পারেন। আরও বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, এই সব মাযহাবের নেতাদের অনেকেই আল্লাহকে তাঁর গুণাবলী থেকে পাক মনে করেন।
তাদের ধারণায় আল্লাহর সত্ত্বার সংগে কোনো গুণ সংযোগ করার অর্থ তাঁকে 'দেহবিশিষ্ট' (তাজসীম) ও বান্দার সঙ্গে সাদৃশ (তাশবীহ) সাব্যস্ত করা। তারা মনে করেন যে, আল্লাহকে গুণহীন সাব্যস্ত না করা পর্যন্ত তাওহীদে বিশ্বাস পূর্ণতা লাভ করতে পারে না। যেমন- তারা মনে করেন যে, আরশের উপর আল্লাহর আরোহন, আকাশের উপরে আরশের অবস্থান, (তাঁর কথা বলা ও বান্দার) মূসার আলাইহিস সালাম সাথে কথোপকথন এবং অন্যান্য গুণাবলীকে অস্বীকার না করা পর্যন্ত কারো তাওহীদে বিশ্বাস পূর্ণতা লাভ করতে পারে না। ইবনুল কাইয়্যেম রহ. এর আলোচনার সার সংক্ষেপ উপরে কিছুটা বর্ণনা করা হলো। পূর্ণ আলোচনার জন্য উপরোক্ত কিতাব দ্রষ্টব্য।
টিকাঃ
২০. এখানে লেখক আল্লাহর বিভিন্ন গুণাবলীর কিছু নমুনা উল্লেখ করেছেন। কলেবর বৃদ্ধির ভয়ে তা বাদ দেওয়া হলো।
📄 ফেরেশতা ও রাসূলগণকে অস্বীকার করা ও তাদের মধ্যে পার্থক্য করা
আল্লাহ তা'আলা বলেন-
'নিশ্চয়ই আমি মূসাকে কিতাব দিয়েছি এবং তারপরে পর্যায়ক্রমে রাসূলগণকে প্রেরণ করেছি। মরিয়ম পুত্র ঈসাকে স্পষ্ট প্রমাণ দান করেছি এবং তাকে পবিত্র 'াত্মা' দ্বারা শক্তিশালী করেছি। তবে আসল কথা হলো এই যে, যখনই কোনো রাসূল তোমাদের কাছে এমন কিছু নিয়ে আসেন যা তোমাদের মনঃপূত নয়, তখনই তোমরা অহংকার করেছ। ফলে অনেক নবীকে তোমরা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছ ও অনেক নবীকে হত্যা করেছ'। (সূরা আল- বাক্বারাহ, ২: আয়াত ৮৭)
'তারা বলতো যে, আমাদের হৃদয় আচ্ছাদিত। (তা বাজে কথা) বরং সত্য প্রত্যাখানের জন্য আল্লাহ তাদেরকে অভিসম্পাত করেছেন। তাদের খুব অল্প সংখ্যকই ঈমান এনেছে’। (সূরা আল-বাক্বারাহ, ২: আয়াত ৮৮)
সূরা আল-বাক্বারার ৯৮ আয়াতে আল্লাহ বলেন-
“যে কেউ আল্লাহর, তাঁর ফেরেশতাগণের, তাঁর রাসূলগণের এবং জিব্রীল ও মিকাইলের শত্রু সে জেনে রাখুক যে, আল্লাহ সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের শত্রু।” (সূরা আল-বাকারা : ৯৮)
উপরোক্ত আয়াতসমূহ দ্বারা একথা প্রমাণিত হলো যে, ইয়াহুদী ও নাছারাদের কেউ কেউ মালাইকা ও রাসূলগণকে অস্বীকার করতো এবং তাদের মধ্যে পার্থক্য করতো। অর্থাৎ তাদের কারও উপরে ঈমান আনতো ও কাউকে অবিশ্বাস করতো। এজন্যেই মুসলিমদেরকে আল্লাহ এ ধরণের পার্থক্য করতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ আলা বলেন-
'স্বীয় প্রতিপালকের পক্ষ হতে অবতীর্ণ বস্তুর (অহী) উপর রাসূল ও মুমিনগণ বিশ্বাস স্থাপন করেছে। তারা সবাই ঈমান এনেছে আল্লাহর উপর, তাঁর ফেরেশতাগণের উপর, তাঁর কিতাবসমূহ ও রাসূলগণের উপর। (এবং তারা বলেন যে,) আমরা আল্লাহর রাসূলগণের কোনরূপ তারতম্য করি না। তারা বলে যে, আমরা শুনেছি এবং পালন করেছি। হে প্রভু! তুমি আমাদেরকে ক্ষমা করো। কেননা প্রত্যাবর্তন তো কেবল তোমারই নিকটেই। (সূরা আল-বাক্বারাহ, ২: আয়াত ২৮৫)
📄 নবী ও রাসূলদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা
আল্লাহ বলেন-
'হে কিতাবীগণ (ইয়াহূদী ও নাছারা), তোমরা দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না এবং আল্লাহর সম্পর্কে সত্য ছাড়া বলো না। মরিয়মের পুত্র ঈসা মসীহ আল্লাহর রাসূল ও তাঁর কলেমা ও আদেশ মাত্র- যা তিনি মরিয়মের প্রতি নিক্ষেপ করেছিলেন। অতএব, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের উপর বিশ্বাস স্থাপন করো এবং বলো না যে, আল্লাহ 'তিন'। (এমন বলা হতে) বিরত হও, তোমাদের কল্যাণ হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ একমাত্র উপাস্য। 'তাঁর সন্তান হবে' এসব বিষয় হতে তিনি পবিত্র। (সূরা আন-নিসা, ৪: আয়াত ১৭১)
সৃষ্টিকর্তার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা যখন এতবড় মহাপাপ, তখন সৃষ্টির ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা কত বড় অন্যায়। যেমন মূর্তি পূজা, অলী আওলিয়ার পূজা প্রভৃতি করা হয়ে থাকে। নূহ আলাইহিস সালামের কওম যেমন নাসর, সোআ, ইয়াগুছ প্রভৃতির এবং খৃষ্টানরা ঈসা আলাইহিস সালামের পূজা করে থাকে। লোকেরা আল্লাহর উপরে এমনি ধরণের আরও বহু অসত্যারোপ করে থাকে।
📄 না জেনে ঝগড়া করা
বিভিন্ন ধরণের বেদআত ও কুসংস্কারে লিপ্ত অজ্ঞ জনসাধারণকে যখন কোনো বিজ্ঞ হকপন্থী আলেম ঐ সকল শরীয়ত বিরোধী কাজকর্ম হতে বিরত থাকতে বলেন, তখন জাহেল লোকেরা জিদের বশবর্তী হয়ে তাদের সংগে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়। এটা নিঃসন্দেহে জাহেলী যুগের একটি রীতি। আল্লাহ আমাদেরকে এ বদ অভ্যাস থেকে নিষেধ করেছেন।
তিনি ইরশাদ করেছেন-
'হে কিতাবীগণ, ইব্রাহীম (ইয়াহুদী ছিলেন, না নাছারা ছিলেন সে) সম্পর্কে তোমরা অযথা কেন তর্ক কর। অথচ আসল অবস্থা এই যে, তাওরাত ও ইঞ্জীল তাঁর পরবর্তীকালে নাযিল হয়েছিল। তোমরা কি কিছুই বুঝ না? দেখ, যে বিষয়ে তোমাদের কিছু জ্ঞান আছে সে বিষয়ে তোমরা ঝগড়া করে থাকো। এখন যে বিষয়ে তোমাদের কোনো জ্ঞান নেই সে বিষয়ে তোমরা কেন অহেতুক ঝগড়ায় লিপ্ত হচ্ছ। আল্লাহ সব জানেন, তোমরা কিছু জানো না। (সূরা আলে ইমরান ৩: আয়াত ৬৫-৬৬)
ইবনে ইসহাক ও ইবনে জারীর রহ. ইবনে আব্বাস রা. এর বরাতে বর্ণনা করেন যে, নাজরানের খৃষ্টান ও ইয়াহূদী পুরোহিতগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট জমায়েত হয়ে আপোষে তর্ক শুরু করলো। ইয়াহূদী পুরোহিতরা বলল যে, ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম ইয়াহূদী ছিলেন। অপর পক্ষে খৃষ্টানরা বলল যে, ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম খৃষ্টান ছিলেন। আল্লাহ তখন উপরোক্ত আয়াত নাযিল করেন।