📄 আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করা
এ বিষয়ে কুরআনে বহু জায়গায় বর্ণিত হয়েছে। যেমন সূরায়ে কাহাফে বলা হয়েছে-
'(হ নবী) আপনি বলুন যে, আমি কি তোমাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের সম্পর্কে খবর দিব যারা তাদের সারা জীবনের প্রচেষ্টাসমূহ বরবাদ করেছে? অথচ ভাবতো যে, তারা অতি উত্তম কাজই করছে। এরাই হচ্ছে আল্লাহর আয়াতসমূহকে ও আল্লাহর সাক্ষাতকে অস্বীকারকারী। ফলে তাদের সমস্ত আমল নিষ্ফল হয়েছে। আমরা এদের জন্য কেয়ামতের দিনে দাঁড়িপাল্লা খাঁড়া করবো না। তাদের এই অস্বীকৃতির বদলা একমাত্র জাহান্নাম। কেননা তারা আমার আয়াতসমূহকে এবং রাসূলদেরকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করেছিল'। (সূরা আল-কাহাফ, ১৮: আয়াত ১০৩-১০৬)
দলীলসমূহ দ্বারা একথাও প্রমাণিত হয়েছে যে, তাদের মধ্যে কিছু লোক ছিল যারা আল্লাহর আয়াতসমূহের কিছু কিছু অস্বীকার করতো এবং কেউ কেউ পুরোপুরি মুখ ফিরিয়ে নিত। প্রিয় পাঠকের নিকট একথা নিশ্চয় গোপন নেই যে, জাহেলী যুগের উপরোক্ত স্বভাবের অধিকারী বরং তার চাইতেও কঠোর প্রকৃতির লোকের বর্তমান যুগে মোটেই অভাব নেই।
📄 বাতিল বই-পত্র পড়াশুনা করা
আজেবাজে বাতিল বইপত্র ক্রয় করা এবং সেগুলোকে আল্লাহর আয়াতসমূহের উপর স্থান দেওয়ার জাহেলী যুগের স্বভাব সম্পর্কে সূরা বাক্কারায় বলা হয়েছে-
'যখন কিতাবীদের নিকট তাদের কিতাবসমূহের (তাওরাত ও ইঞ্জীল) সত্যতা জ্ঞাপনকারী আল্লাহর (কিতাবসহ) কোনো রাসূলের আগমন ঘটে, তখন তাদের একদল উক্ত কিতাবকে পিছনে নিক্ষেপ করে। ভাবখানা এই যেন তারা ওসবের কিছুই জানে না। বরং তারা সোলায়মানের আমলে শয়তানরা যা কিছু আবৃত্তি করতো, তারই অনুসরণ করে। সোলায়মান কুফরী করেননি। শয়তানরাই কুফরী করেছিল ও তারা মানুষকে যাদুবিদ্যা শিক্ষা দিত। (আর তারা অনুসরণ করতো ঐ সব বস্তুর যা) হারুত ও মারুত (ফেরেশতাদ্বয়ের উপর পরীক্ষামূলক ভাবে) নাযিল করা হয়েছিল। তারা কাউকে কিছু শিক্ষা দেওয়ার আগে বলতো যে, আমরা পরীক্ষাস্বরূপ (এসেছি)। অতএব তোমরা (এসব শিখে) কাফির হয়ো না। (কিন্তু এসব উপেক্ষা করে) তারা ঐ দু'জনের কাছ থেকে ঐসব বিদ্যা শিখে নিত, যার ফলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে এবং যে সব বিষয় শিখত যা দ্বারা মানুষের কোনো উপকার নয় বরং ক্ষতিসাধন করা সম্ভব হয়। যদিও আল্লাহর অনুমতি ব্যতিরেকে তারা কারো কোনরূপ ক্ষতিসাধনের ক্ষমতা রাখে না। ওরা অবশ্যই জানে যে, এসব বাজে বিদ্যার খরিদকারীদের জন্য আখেরাতে কিছুই পাবার নেই। তা কত না নিকৃষ্ট, যার বিনিময়ে তারা নিজেদেরকে বিক্রি করেছে, যদি তারা জানতো!' (সূরা বাক্বারাহ, ২: আয়াত ১০১-১০২)
এমনিভাবে অন্য আয়াতে বলা হয়েছে-
'তাদের মধ্যে এমন কতক মূর্খ আছে, যারা আল্লাহর কিতাব সম্পর্কে একটা ভাসা ভাসা ধারণা ছাড়া কিছুই জ্ঞান রাখে না। অতএব ধ্বংস ঐসব লোকদের জন্য, যারা সামান্য অর্থ উপার্জনের (হীন স্বার্থ হাসিলের) জন্য নিজেরা কিতাব লিখে আল্লাহর কিতাব বলে চালিয়ে দেয়। ধ্বংস তাদের লেখনীর এবং ধ্বংস তাদের উপার্জনের'! (সূরা আল-বাক্বারাহ, ২: আয়াত ৭৮-৭৯)
এই আয়াতটি ইয়াহূদী পীর-পুরোহিতদের উদ্দেশ্যে নাযিল হয়েছিল। যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গুণাবলীকে তাদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখার বিরুদ্ধে প্রতিবন্ধক মনে করে রাসূলের গুণাবলী পরিবর্তন করতঃ মনগড়া কিতাবাদী লিখে আল্লাহর কিতাব বলে প্রচার করতো।
টিকাঃ
* মিথ্যা হাদীস ও বাজে কেচ্ছা কাহিনী ভর্তি করে যারা তথাকথিত ধর্মীয় কিতাবপত্র লিখে প্রচার করেন, তারা সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। (অনুবাদক)।
১৯. জানা আবশ্যক যে, পবিত্র কুরআনের কোন আয়াত কোন নির্দিষ্ট সময় উপলক্ষে নাযিল হলেও তার হুকুম সকল যুগে সকলের জন্য প্রযোজ্য। (অনুবাদক)
📄 আল্লাহর পরিকল্পনাকে ত্রুটিপূর্ণ মনে করা
জাহেলী যুগের লোকেরা আল্লাহর সৃষ্টি-পরিকল্পনা ও তাঁর আদেশ নিষেধাবলীর মধ্যে কোনো হিকমত বা দূরদর্শিতা নেই বলে মনে করতো। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে তাদের এই অবস্থা বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন-
'আসমান-যমীন ও তন্মধ্যস্থিত কোনো কিছুকেই আমি নিষ্ফল সৃষ্টি করি নাই। যদিও অবিশ্বাসীদের ধারণা তাই। যারা কুফরী করে তাদের জন্য ধ্বংস, ওরা জাহান্নামী'। (সূরা ছাদ, ৩৮: আয়াত ২৭)
অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা বলেন-
'আমি আসমান যমীন ও তন্মধ্যস্থিত কোনো বস্তুকে খেলাচ্ছলে সৃষ্টি করি নাই। আমি যথার্থ কারণেই এগুলিকে সৃষ্টি করেছি। কিন্তু ওদের অধিকাংশই তা জানে না'। (সূরা আদ-দুখান, ৪৪: আয়াত ৩৮-৩৯)
এতদ্ব্যতীত আরও বহু আয়াত রয়েছে যেখানে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা কোনো বস্তুকেই বিনা হিকমতে ও বিনা কারণে সৃষ্টি করেনি। অথচ জাহেলী যুগের বাতিল পন্থীদের ধারণা ছিল তাই এবং এ যুগে এরূপ ধারণা অনেকেই করে থাকে। বিষয়টি দীর্ঘ আলোচনাসাপেক্ষ। মুসলিমদের মধ্যে অনেকগুলি ফিরকা এ নিয়ে আপোষে বহু ঝগড়া করেছে। তবে সত্য পথ সেটাই যার উপর উম্মতের প্রথম যুগের মনীষীগণ বা সালাফে ছালেহীনগণ প্রতিষ্ঠিত ছিলেন, যাঁরা আল্লাহর প্রতিটি কার্যে হিকমত ও কারণে বিশ্বাসী ছিলেন। হাফেজ ইবনুল কাইয়্যেম রহ. তাঁর 'শফাউল আলীল ফিল কাদা ওয়াল কাদরি ওয়াল হিকমাতি ওয়াত তালীল' নামক গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন। সেখানে তিনি আল্লাহর প্রতিটি সৃষ্টি ও আদেশ- নিষেধের পিছনে যে হিকমত, কল্যাণ ও ফলাফলসমূহ নিহিত রয়েছে, বিভিন্ন অধ্যায় রচনার মাধ্যমে তা সবিস্তারে আলোচনা করেছেন।
মুসলিমদের মধ্যে ঐ সমস্ত মাযহাবসমূহের মতে আল্লাহর সৃষ্টি ও হুকুমের মধ্যে বান্দার জন্য কোনরূপ দয়া, কল্যাণ বা হিকমত নেই। তাদের ধারণামতে নিষ্পাপ ব্যক্তিকেও আল্লাহ শাস্তি দিতে পারেন এবং পাপিষ্ঠ ব্যক্তিকে তিনি সওয়াব দান করতে পারেন। আরও বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, এই সব মাযহাবের নেতাদের অনেকেই আল্লাহকে তাঁর গুণাবলী থেকে পাক মনে করেন।
তাদের ধারণায় আল্লাহর সত্ত্বার সংগে কোনো গুণ সংযোগ করার অর্থ তাঁকে 'দেহবিশিষ্ট' (তাজসীম) ও বান্দার সঙ্গে সাদৃশ (তাশবীহ) সাব্যস্ত করা। তারা মনে করেন যে, আল্লাহকে গুণহীন সাব্যস্ত না করা পর্যন্ত তাওহীদে বিশ্বাস পূর্ণতা লাভ করতে পারে না। যেমন- তারা মনে করেন যে, আরশের উপর আল্লাহর আরোহন, আকাশের উপরে আরশের অবস্থান, (তাঁর কথা বলা ও বান্দার) মূসার আলাইহিস সালাম সাথে কথোপকথন এবং অন্যান্য গুণাবলীকে অস্বীকার না করা পর্যন্ত কারো তাওহীদে বিশ্বাস পূর্ণতা লাভ করতে পারে না। ইবনুল কাইয়্যেম রহ. এর আলোচনার সার সংক্ষেপ উপরে কিছুটা বর্ণনা করা হলো। পূর্ণ আলোচনার জন্য উপরোক্ত কিতাব দ্রষ্টব্য।
টিকাঃ
২০. এখানে লেখক আল্লাহর বিভিন্ন গুণাবলীর কিছু নমুনা উল্লেখ করেছেন। কলেবর বৃদ্ধির ভয়ে তা বাদ দেওয়া হলো।
📄 ফেরেশতা ও রাসূলগণকে অস্বীকার করা ও তাদের মধ্যে পার্থক্য করা
আল্লাহ তা'আলা বলেন-
'নিশ্চয়ই আমি মূসাকে কিতাব দিয়েছি এবং তারপরে পর্যায়ক্রমে রাসূলগণকে প্রেরণ করেছি। মরিয়ম পুত্র ঈসাকে স্পষ্ট প্রমাণ দান করেছি এবং তাকে পবিত্র 'াত্মা' দ্বারা শক্তিশালী করেছি। তবে আসল কথা হলো এই যে, যখনই কোনো রাসূল তোমাদের কাছে এমন কিছু নিয়ে আসেন যা তোমাদের মনঃপূত নয়, তখনই তোমরা অহংকার করেছ। ফলে অনেক নবীকে তোমরা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছ ও অনেক নবীকে হত্যা করেছ'। (সূরা আল- বাক্বারাহ, ২: আয়াত ৮৭)
'তারা বলতো যে, আমাদের হৃদয় আচ্ছাদিত। (তা বাজে কথা) বরং সত্য প্রত্যাখানের জন্য আল্লাহ তাদেরকে অভিসম্পাত করেছেন। তাদের খুব অল্প সংখ্যকই ঈমান এনেছে’। (সূরা আল-বাক্বারাহ, ২: আয়াত ৮৮)
সূরা আল-বাক্বারার ৯৮ আয়াতে আল্লাহ বলেন-
“যে কেউ আল্লাহর, তাঁর ফেরেশতাগণের, তাঁর রাসূলগণের এবং জিব্রীল ও মিকাইলের শত্রু সে জেনে রাখুক যে, আল্লাহ সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের শত্রু।” (সূরা আল-বাকারা : ৯৮)
উপরোক্ত আয়াতসমূহ দ্বারা একথা প্রমাণিত হলো যে, ইয়াহুদী ও নাছারাদের কেউ কেউ মালাইকা ও রাসূলগণকে অস্বীকার করতো এবং তাদের মধ্যে পার্থক্য করতো। অর্থাৎ তাদের কারও উপরে ঈমান আনতো ও কাউকে অবিশ্বাস করতো। এজন্যেই মুসলিমদেরকে আল্লাহ এ ধরণের পার্থক্য করতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ আলা বলেন-
'স্বীয় প্রতিপালকের পক্ষ হতে অবতীর্ণ বস্তুর (অহী) উপর রাসূল ও মুমিনগণ বিশ্বাস স্থাপন করেছে। তারা সবাই ঈমান এনেছে আল্লাহর উপর, তাঁর ফেরেশতাগণের উপর, তাঁর কিতাবসমূহ ও রাসূলগণের উপর। (এবং তারা বলেন যে,) আমরা আল্লাহর রাসূলগণের কোনরূপ তারতম্য করি না। তারা বলে যে, আমরা শুনেছি এবং পালন করেছি। হে প্রভু! তুমি আমাদেরকে ক্ষমা করো। কেননা প্রত্যাবর্তন তো কেবল তোমারই নিকটেই। (সূরা আল-বাক্বারাহ, ২: আয়াত ২৮৫)