📘 ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব 📄 যমানাকে গালি দেয়া

📄 যমানাকে গালি দেয়া


জাহেলী যুগের লোকেরা যামানাকে গালি দিত। যেমন তারা বলতো-

‘দুনিয়ার এই জীবনই সবকিছু। এখানেই আমরা মরি, এখানেই বাচি। কাল বা প্রকৃতিই আমাদেরকে ধ্বংস করে। আসলে এ ব্যাপারে তাদের কোনো জ্ঞানই নেই। তারা কেবল কল্পনা করছে মাত্র। (সূরা আল-জাছিয়া, ৪৫: আয়াত ২৪)

তারা তাদের সমস্ত ঘটনা-দূর্ঘটনাসমূহকে কালচক্রের দিকে সম্পর্কিত করতো। যামানাকে দোষারোপ করে তারা ভুরি ভুরি কবিতাও রচনা করেছে। কিন্তু তারা মোটেই প্রকৃতিবাদী ছিল না। তারা আল্লাহর অস্তিত্বকে স্বীকার করতো।

যামানাকে গালি দেওয়ার নিষেধাজ্ঞা সম্বলিত বহু হাদীস রয়েছে। যেমন, সহীহ মুসলিমের এক বর্ণনায় রয়েছে- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন যে, তোমরা যামানাকে গালি দিয়ো না। কেননা আল্লাহই যামানা (অর্থাৎ যামানার নিয়ামক)। এমনিভাবে আবু দাউদ, হাকেম ও বায়হাক্বীতে বিভিন্ন বর্ণনায় দেখতে পাওয়া যায়।

মোটকথা, যারা দুনিয়ার বিভিন্ন ঘটনাসমূহকে আল্লাহ ব্যতীত যামানা প্রভৃতির দিকে সম্পর্কিত করে, তাদের পক্ষে কুরআন-হাদীস কিংবা বিবেকের কোনো সমর্থন নেই।

“আল্লাহ কতইনা পবিত্র মহান, তিনি তাদের এসব কল্পিত কথার বহু ঊর্ধ্বে। (সূরা আল-ইসরা, ১৭: আয়াত ৪৩)

এ সব প্রকৃতিবাদীরা প্রাচীনকালের হোক বা আধুনিক কালের হোক, কট্টর জাহিল ছাড়া এরা কিছুই নয়। এই বাতিল আক্বীদায় বিশ্বাসী লোকের সংখ্যা আজকের দিনে ভুরি ভুরি। আল্লাহ আমাদের সাহায্য করুন।

📘 ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব 📄 আল্লাহর নেয়ামতসমূহকে অন্যের দিকে সম্পর্কিত করা

📄 আল্লাহর নেয়ামতসমূহকে অন্যের দিকে সম্পর্কিত করা


যেমন আল্লাহ বলেন-

‘তারা আল্লাহর অনুগ্রহসমূহ জ্ঞাত আছে। কিন্তু সেগুলিকে তারা অস্বীকার করে। উহাদের অধিকাংশই সত্য প্রত্যাখ্যানকারী’। (সূরা আন-নাহল, ১৬: আয়াত ৮৩)

এর আগে ৭৮ হতে ৮২ আয়াত পর্যন্ত আল্লাহ মানুষের প্রতি তাঁর নেয়ামতসমূহের বর্ণনা দিয়ে বলেন-

'আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের মাতৃগর্ভ হতে বের করেছেন এমন অবস্থায় যে, তোমরা কিছুই জানতে না। তিনি তোমাদেরকে কর্ণ, চক্ষু ও হৃদয় দান করেছেন যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হও। তারা কি লক্ষ্য করে না পাখীকুলের দিকে, যারা আকাশে বিচরণ করে? আল্লাহই ওদেরকে শুন্যে ধরে রাখেন। অবশ্যই এর মধ্যে নিদর্শন রয়েছে বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য। আল্লাহ তোমাদের ঘরগুলিকে তোমাদের জন্য আবাসস্থল এবং পশুর চামড়া হতে তোমাদের জন্য তাবুর ব্যবস্থা করেছেন, যাতে ভ্রমণকালে তোমরা তা সহজে বহন করতে পারো। এবং অবস্থানকালে সহজে খাটাতে পারো। তিনি চতুষ্পদ জন্তুসমূহের পশম, লোম ও কেশ হতে তোমাদের কিছু কালের ব্যবহার্য হিসাবে গৃহ সামগ্রীর ব্যবস্থা করেছেন। আল্লাহ তোমাদের জন্য ছায়ার ব্যবস্থা, পাহাড়ে আশ্রয়ের ব্যবস্থা এবং পরিধেয় বস্ত্রের সংস্থান করেছেন, যা তোমাদেরকে উত্তাপ হতে রক্ষা করে। তিনি তোমদেরকে যুদ্ধে আত্মরক্ষার জন্য বর্মের ব্যবস্থা করেছেন। এইভাবে তিনি তোমাদের প্রতি তাঁর নেয়ামতসমূহ পূর্ণ করেন, যাতে তোমরা মুসলিম বা আত্মসমর্পনকারী হও। এরপরেও যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে হে নবী, পরিষ্কারভাবে বক্তব্য পৌঁছে দেওয়া ব্যতীত আপনার আর কিছুই করার নেই'। (সূরা আন- নাহল, ১৬: আয়াত ৭৮-৮২)

উপরোক্ত নেয়ামতসমূহকে জেনে শুনেও জাহেলরা অস্বীকার করে থাকে। তারা ইসলাম থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং আল্লাহর জন্য ইবাদতকে খালেছ করে না। অথচ তারা ভালভাবেই জানে যে, এসব নেয়ামত আল্লাহ দিয়েছেন। ইবনে জারীর প্রমুখ মুজাহিদ হতে বর্ণনা করেন যে, তাদের অস্বীকারের ধরণ ছিল এই প্রকারের যে, 'আমরা এসব আমাদের বাপ-দাদাদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেছি'। কেউ কেউ বলতো 'যদি অমুক না থাকতো, তাহলে আমার অমন বিপদ ঘটে যেতো। অথচ 'যদি অমুক না থাকতো তাহলে আমার অমন বিপদ ঘটতো না'। কেউ বলতো 'এটি তাদের দেব- দেবীদের সুপারিশে হয়েছে। কেউ এমনও বলতো যে, আমাদের মধ্যে আল্লাহর নেয়ামত হিসাবে মুহাম্মাদ আছে'। অর্থাৎ তারা সত্যিকারের নবী হিসাবে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানতো। কিন্তু স্বীকার করতো না।

এখানে ইনকার বা অস্বীকার অর্থাৎ মূল স্রষ্টার দিকে সম্বন্ধ না করে আসবাব বা কার্যকারকসমূহের দিকে সম্পর্কিত করা। তাদের অধিকাংশই অস্বীকারকারী, একথা কয়েকটি কারণে বলা হয়েছে। যেমন- তাদের মধ্যে কেউ কেউ কমবুদ্ধি হওয়ার কারণে হক চিনতে পারে না। কেউ এমন আছে যারা যুক্তি প্রমাণের দিকে খেয়াল করে না, যদ্বারা উদ্দেশ্য হাছিল সম্ভব হয়। কেউ এমন আছে, শৈশব অবস্থা বা অন্য কারণে যাদের উপর শরীয়তের আদেশ-নিষেধাবলী জারি করার যোগ্য বিবেচিত হয় না। এজন্য সকলকে অস্বীকারকারী না বলে অধিকাংশকে অস্বীকারকারী বলা হয়েছে।

সূরা ওয়াকেয়ার ৮১-৮২ আয়াতে উপরোক্ত মর্ম ব্যক্ত করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন-

'তোমরা কি এইসব কথার প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করবে এবং সৃষ্টিকেই সবকিছু ধরে নিবে? অথচ (একথা গুলিকে) মিথ্যা মনে করলে?

মুসলিম শরীফে ও অন্যান্য হাদীস গ্রন্থে আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রা. হতে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময়ে একবার বৃষ্টি হলে তিনি ইরশাদ করলেন যে, আজ কেউ শুকরগুযার ও কেউ কাফির হিসাবে প্রভাতে উঠেছে। কেননা, লোকদের কেউ বলেছে, ইহা আল্লাহর পক্ষ হতে রহমত হিসাবে এসেছে। আবার কেউ বলেছে যে, অমুক নক্ষত্রের কারণে বৃষ্টি হয়েছে'। এই উপলক্ষে উপরোক্ত আয়াত নাযিল হয়।

মোটকথা, নেয়ামতসমূহকে উহার মূল সৃষ্টিকর্তার দিকে সম্বন্ধিত না করাই হলো মূলতঃ আল্লাহকে অস্বীকার করা। বৃষ্টি বা নক্ষত্রের ব্যাপারে আরবদের ধারণা ও এ সম্পর্কে তাদের রচিত বহু কবিতা রয়েছে।

📘 ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব 📄 আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করা

📄 আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করা


এ বিষয়ে কুরআনে বহু জায়গায় বর্ণিত হয়েছে। যেমন সূরায়ে কাহাফে বলা হয়েছে-

'(হ নবী) আপনি বলুন যে, আমি কি তোমাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের সম্পর্কে খবর দিব যারা তাদের সারা জীবনের প্রচেষ্টাসমূহ বরবাদ করেছে? অথচ ভাবতো যে, তারা অতি উত্তম কাজই করছে। এরাই হচ্ছে আল্লাহর আয়াতসমূহকে ও আল্লাহর সাক্ষাতকে অস্বীকারকারী। ফলে তাদের সমস্ত আমল নিষ্ফল হয়েছে। আমরা এদের জন্য কেয়ামতের দিনে দাঁড়িপাল্লা খাঁড়া করবো না। তাদের এই অস্বীকৃতির বদলা একমাত্র জাহান্নাম। কেননা তারা আমার আয়াতসমূহকে এবং রাসূলদেরকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করেছিল'। (সূরা আল-কাহাফ, ১৮: আয়াত ১০৩-১০৬)

দলীলসমূহ দ্বারা একথাও প্রমাণিত হয়েছে যে, তাদের মধ্যে কিছু লোক ছিল যারা আল্লাহর আয়াতসমূহের কিছু কিছু অস্বীকার করতো এবং কেউ কেউ পুরোপুরি মুখ ফিরিয়ে নিত। প্রিয় পাঠকের নিকট একথা নিশ্চয় গোপন নেই যে, জাহেলী যুগের উপরোক্ত স্বভাবের অধিকারী বরং তার চাইতেও কঠোর প্রকৃতির লোকের বর্তমান যুগে মোটেই অভাব নেই।

📘 ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব 📄 বাতিল বই-পত্র পড়াশুনা করা

📄 বাতিল বই-পত্র পড়াশুনা করা


আজেবাজে বাতিল বইপত্র ক্রয় করা এবং সেগুলোকে আল্লাহর আয়াতসমূহের উপর স্থান দেওয়ার জাহেলী যুগের স্বভাব সম্পর্কে সূরা বাক্কারায় বলা হয়েছে-

'যখন কিতাবীদের নিকট তাদের কিতাবসমূহের (তাওরাত ও ইঞ্জীল) সত্যতা জ্ঞাপনকারী আল্লাহর (কিতাবসহ) কোনো রাসূলের আগমন ঘটে, তখন তাদের একদল উক্ত কিতাবকে পিছনে নিক্ষেপ করে। ভাবখানা এই যেন তারা ওসবের কিছুই জানে না। বরং তারা সোলায়মানের আমলে শয়তানরা যা কিছু আবৃত্তি করতো, তারই অনুসরণ করে। সোলায়মান কুফরী করেননি। শয়তানরাই কুফরী করেছিল ও তারা মানুষকে যাদুবিদ্যা শিক্ষা দিত। (আর তারা অনুসরণ করতো ঐ সব বস্তুর যা) হারুত ও মারুত (ফেরেশতাদ্বয়ের উপর পরীক্ষামূলক ভাবে) নাযিল করা হয়েছিল। তারা কাউকে কিছু শিক্ষা দেওয়ার আগে বলতো যে, আমরা পরীক্ষাস্বরূপ (এসেছি)। অতএব তোমরা (এসব শিখে) কাফির হয়ো না। (কিন্তু এসব উপেক্ষা করে) তারা ঐ দু'জনের কাছ থেকে ঐসব বিদ্যা শিখে নিত, যার ফলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে এবং যে সব বিষয় শিখত যা দ্বারা মানুষের কোনো উপকার নয় বরং ক্ষতিসাধন করা সম্ভব হয়। যদিও আল্লাহর অনুমতি ব্যতিরেকে তারা কারো কোনরূপ ক্ষতিসাধনের ক্ষমতা রাখে না। ওরা অবশ্যই জানে যে, এসব বাজে বিদ্যার খরিদকারীদের জন্য আখেরাতে কিছুই পাবার নেই। তা কত না নিকৃষ্ট, যার বিনিময়ে তারা নিজেদেরকে বিক্রি করেছে, যদি তারা জানতো!' (সূরা বাক্বারাহ, ২: আয়াত ১০১-১০২)

এমনিভাবে অন্য আয়াতে বলা হয়েছে-

'তাদের মধ্যে এমন কতক মূর্খ আছে, যারা আল্লাহর কিতাব সম্পর্কে একটা ভাসা ভাসা ধারণা ছাড়া কিছুই জ্ঞান রাখে না। অতএব ধ্বংস ঐসব লোকদের জন্য, যারা সামান্য অর্থ উপার্জনের (হীন স্বার্থ হাসিলের) জন্য নিজেরা কিতাব লিখে আল্লাহর কিতাব বলে চালিয়ে দেয়। ধ্বংস তাদের লেখনীর এবং ধ্বংস তাদের উপার্জনের'! (সূরা আল-বাক্বারাহ, ২: আয়াত ৭৮-৭৯)

এই আয়াতটি ইয়াহূদী পীর-পুরোহিতদের উদ্দেশ্যে নাযিল হয়েছিল। যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গুণাবলীকে তাদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখার বিরুদ্ধে প্রতিবন্ধক মনে করে রাসূলের গুণাবলী পরিবর্তন করতঃ মনগড়া কিতাবাদী লিখে আল্লাহর কিতাব বলে প্রচার করতো।

টিকাঃ
* মিথ্যা হাদীস ও বাজে কেচ্ছা কাহিনী ভর্তি করে যারা তথাকথিত ধর্মীয় কিতাবপত্র লিখে প্রচার করেন, তারা সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। (অনুবাদক)।
১৯. জানা আবশ্যক যে, পবিত্র কুরআনের কোন আয়াত কোন নির্দিষ্ট সময় উপলক্ষে নাযিল হলেও তার হুকুম সকল যুগে সকলের জন্য প্রযোজ্য। (অনুবাদক)

ফন্ট সাইজ
15px
17px