📘 ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব 📄 সমস্ত নবুওয়তকে অস্বীকার করা

📄 সমস্ত নবুওয়তকে অস্বীকার করা


যেমন আল্লাহ বলেন-

‘তারা আল্লাহর যথাযোগ্য মর্যাদা দান করেনি যখন তারা দাবী করে যে, আল্লাহ কোনো মানুষের কাছে কোনো কিছুই নাযিল করেননি। আপনি বলে দিন (হে নবী) মুসা যে গ্রন্থ নিয়ে এসেছিল তা কে নাযিল করেছে? যার মধ্যে ছিল মানুষের জন্য আলোক ও এবং হিদায়েত। যা তোমরা কাগজের পৃষ্ঠাসমূহে লিপিবদ্ধ করে কিছু অংশ প্রকাশ করো এবং অধিকাংশ গোপন রাখো। তার মধ্যে এমন বস্তু তোমরা জানতে পেরেছ যেসব তোমরা বা তোমাদের বাপ-দাদারা জানতো না। আপনি বলুন, তা আল্লাহই (নাযিল করেছিলেন) অতঃপর ছেড়ে দিন, ওরা ওদের বাজে তর্কের খেলায় মত্ত থাকুক'। (সূরা আল-আন'আম ৬: আয়াত ৯১)

অধিকাংশ তাফসীরকারের মতে এই আয়াত ইয়াহূদীদের উদ্দেশ্যে নাযিল হয়েছে অর্থাৎ তোমরা যদি মূসা আলাইহিস সালামের উপর তাওরাত নাযিলের বিষয়টি স্বীকার করে থাকো, তাহলে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর কুরআন নাযিলকে অস্বীকার করো কেন? কারো মতে এ আয়াত মক্কার মুশরিকদের শানে নাযিল হয়েছিল, যারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নবী হিসাবে মানতে রাযী হয়নি। মোটকথা, নবুয়তের অস্বীকার করা জাহেলী রীতির অন্তর্ভুক্ত। বর্তমান যুগে একই রীতির ও ধারণার অনুসারী বহু লোককে পাওয়া যাবে।

📘 ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব 📄 তাকদীরকে অস্বীকার করা

📄 তাকদীরকে অস্বীকার করা


তারা তাক্বদীরকেই কেবল অস্বীকার করতো না, বরং তাক্বদীরের দোহাই দিয়ে আল্লাহর বিপক্ষে যুক্তি দাঁড় করাতো এবং তাঁর শরীয়তকে তাকদীরের বিরোধী সাব্যস্ত করতো ও খোঁড়া যুক্তিসমূহ পেশ করতো। এটি শরীয়তের সুক্ষ্ম বিষয়সমূহের অন্যতম এবং এর তাৎপর্য কেবল তারাই অনুধাবন করতে পারে যাদেরকে আল্লাহ বিশেষভাবে বুঝবার ক্ষমতা দান করেছেন।

জাহেলী যুগের উপরোক্ত ধারণা আল্লাহ বাতিল ঘোষণা করেন এমনিভাবে-

'মুশরিকরা বলবে, যদি আল্লাহ চাইতেন তাহলে আমরা বা আমাদের বাপ-দাদারা মুশরিক হতাম না এবং কোনো কিছুকে হারাম করতাম না। তাদের পূর্ববর্তী মুশরিকগণ ঐ একই অজুহাতে সত্যকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। অবশেষে তারা আমাদের আযাবের স্বাদ গ্রহণ করেছিল। আপনি বলে দিন, তোমাদের নিকট কোনো সঠিক যুক্তি (ইলম) আছে কি? থাকলে তা আমাদের কাছে পেশ করো। আসলে তোমরা কেবল কল্পনারই অনুসরণ করে থাকো এবং আন্দাজে কথা বলো। আপনি বলে দিন চুড়ান্ত প্রমাণতো কেবল আল্লাহরই, তিনি যদি ইচ্ছা করতেন, তাহলে তোমাদের সকলকে হিদায়েত করতেন'। (সূরা আল-অনআম ৬: আয়াত ১৪৮-১৪৯)

ব্যাখ্যাঃ "যদি আল্লাহ চাইতেন তাহলে আমরা বা আমাদের বাপ- দাদারা মুশরিক হতাম না এবং কোনো কিছুকে হারাম করতাম না।” মুশরিকরা উক্ত কথাগুলোকে তাদের অপকর্মে লিপ্ত হবার যুক্তি হিসাবে পেশ করতো না। কেননা তারা তো এগুলোকে অপকর্ম ভাবতো না, বরং কুরআনের সাক্ষ্য অনুযায়ী তারা এগুলোকে পূণ্য কাজ বলেই ধারণা করতো। আর তারা যে মূর্তিপূজা করতো এটাকে তারা আল্লাহর নৈকট্য হাসিলের উপায় মনে করত। অথচ তা আল্লাহর পক্ষ হতে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বুঝা গেল যে, উপরোক্ত যুক্তি দ্বারা তারা এ কথাই প্রমাণ করতে চায় যে, তারা যা কিছু করছে সবই আল্লাহ কর্তৃক নির্দেশিত এবং তিনি এর উপর সন্তুষ্ট। মুতাযিলাদের ধারণা অনুযায়ী আল্লাহর ইচ্ছা তাঁর হুকুমের শামিল এবং এতে তার সন্তুষ্টি অবশ্যই থাকে।

এদের উক্ত দাবীর অসারতায় আল্লাহর পক্ষ হতে বলা হয়েছে যে, কথাগুলি সঠিক কিন্তু তার দ্বারা বাতিল অর্থ গ্রহণ করা হয়েছে। আল্লাহ তাদের মিথ্যাচারকে নিন্দা করেছেন এজন্য যে, আল্লাহর ইচ্ছা কার্যকর হওয়ার সঙ্গে নবুওত ও শরীয়ত মান্য করার প্রতি নবীদের দাওয়াত সাংঘর্ষিক নয়। কারণ, এ দু'টি বস্তু তো মধ্যম পন্থা প্রকাশ করে দেওয়া ও দলীল পৌঁছে দেওয়ার জন্যই।

অনেকের মতে আয়াতে মূলতঃ প্রতিবাদ করা হয়েছে মুশরিকদের এই আক্বীদা বিশ্বাসের যে, তাদের যাবতীয় এখতিয়ার ও ক্ষমতা হরণ করা হয়েছে এবং তাদের আচরণে যে শির্ক প্রকাশ পাচ্ছে তা তাদের বাধ্যতার কারণেই। তারা একথাও ধারণা করে যে, এর দ্বারা আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে তারা যুক্তি দাঁড় করাবে।

মানুষের নিজস্ব কোনো কিছুর এখতিয়ার নেই আল্লাহ তাদের এই ধারণার প্রতিবাদ করেন এবং পূর্ববর্তীদের সংগে তাদের তুলনা করেন, যারা ঐ খোঁড়া যুক্তির দোহাই দিয়ে রাসূলদেরকে অবিশ্বাস করে এবং আল্লাহর সংগে শির্কে লিপ্ত হয় এই বিশ্বাস নিয়ে যে, তারা আল্লাহর ইচ্ছাতেই শির্ক করছে। এমনকি উক্ত সন্দেহের বশবর্তী হয়ে তারা রাসূলদেরকে বিভিন্ন ফালতু যুক্তির মাধ্যমে চুপ করিয়ে দেওয়ার ধারণাও পোষণ করতো।

অতঃপর আল্লাহ একথা পরিষ্কার করে দেন যে, প্রতিটি কাজ তাঁর ইচ্ছাতেই সম্পন্ন হয়। তবে তিনি ইচ্ছা প্রয়োগ করেন না। যতক্ষণ না তাদের থেকে কোনো কাজ সম্পাদিত হয় (অর্থাৎ তাঁর ইচ্ছার অর্থ সম্মতি, বাধ্য করা নয়) অবশ্য যদি তিনি চাইতেন, সকলকেই হিদায়েত দান করতে পারতেন।

(হে পাঠক) যদি আপনি আয়াতটির প্রতি গভীরভাবে দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন তাহলে দেখবেন যে, আয়াতের প্রথমাংশে জাবারিয়াদের এবং শেষাংশে মুতাযিলাদের যুক্তি খন্ডন করা হয়েছে। প্রথমাংশে প্রমাণ করা হয়েছে যে, বান্দার নিজস্ব ক্ষমতা ও এখতিয়ার রয়েছে। সে কারণে তার নাফরমানীর দায়িত্ব তাকেই বহন করতে হবে। শেষাংশে প্রমাণ করা হয়েছে যে বান্দার মধ্যে আল্লাহর ইচ্ছার প্রয়োগ ঘটে এবং বান্দার সকল কাজই আল্লাহর ইচ্ছার অনুকুলেই হয়ে থাকে (তাঁর ইচ্ছার বাইরে কিছুই করার ক্ষমতা কারো নেই) এখানে মুতাযিলাদের বিরুদ্ধে আহলে সুন্নাতগণের যুক্তি প্রমাণিত হলো। আলহামদুল্লিাহ।

অন্যভাবেও ব্যাখ্যা করা যায়। যেমন, অবিশ্বাসীগণ নবীদের দাওয়াতকে রদ করতে চেয়েছিল এই যুক্তিতে যে, আল্লাহ আমাদের থেকে শির্ক আশা করেছিলেন বলেই আমরা মুশরিক হয়েছি। অথচ তোমরা আল্লাহর সেই ইচ্ছার বিরোধিতা করে আমাদেরকে ঈমানের দাওয়াত দিচ্ছ।

আল্লাহ তাদের এই অপযুক্তিকে ধিক্কার দিয়েছেন কয়েকটি উপায়ে। যেমন- (১) তোমাদের উপরোক্ত যুক্তিই যদি সত্যিকারের প্রমাণ বলে তোমরা ভেবে থাকো, তবে জেনে রাখো কেবলমাত্র আল্লাহর জন্যই রয়েছে চূড়ান্ত প্রমাণ। (২) তিনি ইচ্ছা করলে তোমাদেরকে ও তোমাদের বিরোধী সকলকে হিদায়েত দান করতে পারতেন। কিন্তু ইচ্ছার প্রকৃত তাৎপর্য তোমরা যা বুঝেছ, যদি তাই সঠিক হয়, তাহলে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে তাদেরকে তোমরা খামাখা নিষেধ করো কেন? ওরাতো তোমাদের ধারণাতে আল্লাহর ইচ্ছাকেই কার্যকর করেছে মাত্র। অতএব, তোমাদের ও মুসলিমদের মধ্যে কোনোরূপ শত্রুতা থাকা উচিত নয়। বরং বন্ধুত্ব ও সহানুভূতি থাকা প্রয়োজন। কেননা তোমাদের ধারণা মতে উভয়েই আল্লাহর ইচ্ছা পূরণ করছে। এমনিভাবে অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, যেমন-

'মুশরিকগণ বলে থাকে যে, যদি আল্লাহ চাইতেন, তাহলে আমরা বা আমাদের বাপ-দাদারা তাঁকে ছেড়ে অন্যের ইবাদত করতাম না, তাঁর নিষেধ ব্যতীত কোনো কিছুকে হারাম করতাম না। আসলে তাদের পূর্ববর্তীরা এই একই কাজ করতো। কিন্তু স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়া ব্যতীত রাসূলদের আর কিছুই করণীয় আছে কি'? (সূরা আন-নাহল, ১৬: আয়াত ৩৫)

অত্র আয়াতের মর্ম পূর্বের আয়াতটির মতই। অর্থাৎ তাদের যাবতীয় কাজ-কর্মের দায়-দায়িত্ব আল্লাহর উপরে ছেড়ে দিয়ে তারা নিশ্চিন্তে নিজেদের অন্যায় অপকর্ম চালিয়ে যেতে চায়। অথচ একথা তারা বুঝতে নারাজ যে, আল্লাহর ইচ্ছায় সবকিছু সম্পন্ন হলেও বান্দার প্রত্যেক কাজ-কর্মের প্রতিফল হিসাবে শাস্তি বা পুরস্কারের ব্যবস্থা যেহেতু আছে, সেহেতু সব কাজেই তার আংশিক ও সীমিত এখতিয়ার অবশ্যই আছে। নইলে শাস্তি ও পুরস্কার বাধ্যতামূলক হয়ে যাবে। (যা প্রকৃত অবস্থার সম্পূর্ণ বিপরীত)।

মোটকথা, কোনো বাধ্যতা বা স্বেচ্ছাচারিতা নয়, বরং প্রকৃত অর্থ দু'য়ের মাঝখানে। অতএব উক্ত রাজত্ব হতে যে ব্যক্তির পদস্খলন ঘটবে, সে ব্যক্তি জাহেলী যুগের লোকদের তরীকার অনুসারী হবে। আল্লাহ যা থেকে নিষেধ করেছেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা আছে তাফসীরে রুহুল মাআনীসহ প্রভৃতি তাফসীরে।

টিকাঃ
১৪. এ বিষয়ে ইমাম ইবনুল কাইয়েমের লিখিত 'শিফাউল আলীল ফিল কাদা ওয়াল কাদরি ওয়াল হিকমাতি ওয়াত তা'লীল' বইটি সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
১৫. যারা বিশ্বাস করে যে, তাদের ইচ্ছা বলে কিছু নেই। বরং যা কিছু হয় কেবল আল্লাহ হতেই হয়। তারা নিজেদেরকে অদৃষ্টের পুতুল মনে করে।
১৬. অতি যুক্তিবাদী এ দল কুর'আন ও হাদীসের ঊর্ধ্বে যুক্তিকে প্রাধান্য দেয়।
১৭. সুন্নী মুসলিমদেরকে আহলে সুন্নাত বলা হয়। যারা পবিত্র কুর'আন ও সুন্নাহর নীতি-নির্দেশকে সকল কিছুর উর্ধ্বে স্থান দেয়। (অনুবাদক)

📘 ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব 📄 যমানাকে গালি দেয়া

📄 যমানাকে গালি দেয়া


জাহেলী যুগের লোকেরা যামানাকে গালি দিত। যেমন তারা বলতো-

‘দুনিয়ার এই জীবনই সবকিছু। এখানেই আমরা মরি, এখানেই বাচি। কাল বা প্রকৃতিই আমাদেরকে ধ্বংস করে। আসলে এ ব্যাপারে তাদের কোনো জ্ঞানই নেই। তারা কেবল কল্পনা করছে মাত্র। (সূরা আল-জাছিয়া, ৪৫: আয়াত ২৪)

তারা তাদের সমস্ত ঘটনা-দূর্ঘটনাসমূহকে কালচক্রের দিকে সম্পর্কিত করতো। যামানাকে দোষারোপ করে তারা ভুরি ভুরি কবিতাও রচনা করেছে। কিন্তু তারা মোটেই প্রকৃতিবাদী ছিল না। তারা আল্লাহর অস্তিত্বকে স্বীকার করতো।

যামানাকে গালি দেওয়ার নিষেধাজ্ঞা সম্বলিত বহু হাদীস রয়েছে। যেমন, সহীহ মুসলিমের এক বর্ণনায় রয়েছে- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন যে, তোমরা যামানাকে গালি দিয়ো না। কেননা আল্লাহই যামানা (অর্থাৎ যামানার নিয়ামক)। এমনিভাবে আবু দাউদ, হাকেম ও বায়হাক্বীতে বিভিন্ন বর্ণনায় দেখতে পাওয়া যায়।

মোটকথা, যারা দুনিয়ার বিভিন্ন ঘটনাসমূহকে আল্লাহ ব্যতীত যামানা প্রভৃতির দিকে সম্পর্কিত করে, তাদের পক্ষে কুরআন-হাদীস কিংবা বিবেকের কোনো সমর্থন নেই।

“আল্লাহ কতইনা পবিত্র মহান, তিনি তাদের এসব কল্পিত কথার বহু ঊর্ধ্বে। (সূরা আল-ইসরা, ১৭: আয়াত ৪৩)

এ সব প্রকৃতিবাদীরা প্রাচীনকালের হোক বা আধুনিক কালের হোক, কট্টর জাহিল ছাড়া এরা কিছুই নয়। এই বাতিল আক্বীদায় বিশ্বাসী লোকের সংখ্যা আজকের দিনে ভুরি ভুরি। আল্লাহ আমাদের সাহায্য করুন।

📘 ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব 📄 আল্লাহর নেয়ামতসমূহকে অন্যের দিকে সম্পর্কিত করা

📄 আল্লাহর নেয়ামতসমূহকে অন্যের দিকে সম্পর্কিত করা


যেমন আল্লাহ বলেন-

‘তারা আল্লাহর অনুগ্রহসমূহ জ্ঞাত আছে। কিন্তু সেগুলিকে তারা অস্বীকার করে। উহাদের অধিকাংশই সত্য প্রত্যাখ্যানকারী’। (সূরা আন-নাহল, ১৬: আয়াত ৮৩)

এর আগে ৭৮ হতে ৮২ আয়াত পর্যন্ত আল্লাহ মানুষের প্রতি তাঁর নেয়ামতসমূহের বর্ণনা দিয়ে বলেন-

'আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের মাতৃগর্ভ হতে বের করেছেন এমন অবস্থায় যে, তোমরা কিছুই জানতে না। তিনি তোমাদেরকে কর্ণ, চক্ষু ও হৃদয় দান করেছেন যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হও। তারা কি লক্ষ্য করে না পাখীকুলের দিকে, যারা আকাশে বিচরণ করে? আল্লাহই ওদেরকে শুন্যে ধরে রাখেন। অবশ্যই এর মধ্যে নিদর্শন রয়েছে বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য। আল্লাহ তোমাদের ঘরগুলিকে তোমাদের জন্য আবাসস্থল এবং পশুর চামড়া হতে তোমাদের জন্য তাবুর ব্যবস্থা করেছেন, যাতে ভ্রমণকালে তোমরা তা সহজে বহন করতে পারো। এবং অবস্থানকালে সহজে খাটাতে পারো। তিনি চতুষ্পদ জন্তুসমূহের পশম, লোম ও কেশ হতে তোমাদের কিছু কালের ব্যবহার্য হিসাবে গৃহ সামগ্রীর ব্যবস্থা করেছেন। আল্লাহ তোমাদের জন্য ছায়ার ব্যবস্থা, পাহাড়ে আশ্রয়ের ব্যবস্থা এবং পরিধেয় বস্ত্রের সংস্থান করেছেন, যা তোমাদেরকে উত্তাপ হতে রক্ষা করে। তিনি তোমদেরকে যুদ্ধে আত্মরক্ষার জন্য বর্মের ব্যবস্থা করেছেন। এইভাবে তিনি তোমাদের প্রতি তাঁর নেয়ামতসমূহ পূর্ণ করেন, যাতে তোমরা মুসলিম বা আত্মসমর্পনকারী হও। এরপরেও যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে হে নবী, পরিষ্কারভাবে বক্তব্য পৌঁছে দেওয়া ব্যতীত আপনার আর কিছুই করার নেই'। (সূরা আন- নাহল, ১৬: আয়াত ৭৮-৮২)

উপরোক্ত নেয়ামতসমূহকে জেনে শুনেও জাহেলরা অস্বীকার করে থাকে। তারা ইসলাম থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং আল্লাহর জন্য ইবাদতকে খালেছ করে না। অথচ তারা ভালভাবেই জানে যে, এসব নেয়ামত আল্লাহ দিয়েছেন। ইবনে জারীর প্রমুখ মুজাহিদ হতে বর্ণনা করেন যে, তাদের অস্বীকারের ধরণ ছিল এই প্রকারের যে, 'আমরা এসব আমাদের বাপ-দাদাদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেছি'। কেউ কেউ বলতো 'যদি অমুক না থাকতো, তাহলে আমার অমন বিপদ ঘটে যেতো। অথচ 'যদি অমুক না থাকতো তাহলে আমার অমন বিপদ ঘটতো না'। কেউ বলতো 'এটি তাদের দেব- দেবীদের সুপারিশে হয়েছে। কেউ এমনও বলতো যে, আমাদের মধ্যে আল্লাহর নেয়ামত হিসাবে মুহাম্মাদ আছে'। অর্থাৎ তারা সত্যিকারের নবী হিসাবে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানতো। কিন্তু স্বীকার করতো না।

এখানে ইনকার বা অস্বীকার অর্থাৎ মূল স্রষ্টার দিকে সম্বন্ধ না করে আসবাব বা কার্যকারকসমূহের দিকে সম্পর্কিত করা। তাদের অধিকাংশই অস্বীকারকারী, একথা কয়েকটি কারণে বলা হয়েছে। যেমন- তাদের মধ্যে কেউ কেউ কমবুদ্ধি হওয়ার কারণে হক চিনতে পারে না। কেউ এমন আছে যারা যুক্তি প্রমাণের দিকে খেয়াল করে না, যদ্বারা উদ্দেশ্য হাছিল সম্ভব হয়। কেউ এমন আছে, শৈশব অবস্থা বা অন্য কারণে যাদের উপর শরীয়তের আদেশ-নিষেধাবলী জারি করার যোগ্য বিবেচিত হয় না। এজন্য সকলকে অস্বীকারকারী না বলে অধিকাংশকে অস্বীকারকারী বলা হয়েছে।

সূরা ওয়াকেয়ার ৮১-৮২ আয়াতে উপরোক্ত মর্ম ব্যক্ত করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন-

'তোমরা কি এইসব কথার প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করবে এবং সৃষ্টিকেই সবকিছু ধরে নিবে? অথচ (একথা গুলিকে) মিথ্যা মনে করলে?

মুসলিম শরীফে ও অন্যান্য হাদীস গ্রন্থে আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রা. হতে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময়ে একবার বৃষ্টি হলে তিনি ইরশাদ করলেন যে, আজ কেউ শুকরগুযার ও কেউ কাফির হিসাবে প্রভাতে উঠেছে। কেননা, লোকদের কেউ বলেছে, ইহা আল্লাহর পক্ষ হতে রহমত হিসাবে এসেছে। আবার কেউ বলেছে যে, অমুক নক্ষত্রের কারণে বৃষ্টি হয়েছে'। এই উপলক্ষে উপরোক্ত আয়াত নাযিল হয়।

মোটকথা, নেয়ামতসমূহকে উহার মূল সৃষ্টিকর্তার দিকে সম্বন্ধিত না করাই হলো মূলতঃ আল্লাহকে অস্বীকার করা। বৃষ্টি বা নক্ষত্রের ব্যাপারে আরবদের ধারণা ও এ সম্পর্কে তাদের রচিত বহু কবিতা রয়েছে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px